ঢাকায় তখন কড়া রোদ। আর চট্টগ্রাম শহরের এক ছোট্ট বারান্দায় বসে ল্যাপটপের কিবোর্ডে আঙুল চালাচ্ছিল নেহা। স্নাতক শেষ হওয়ার পর থেকে সময়টা যেন আর কাটে না তার। তার ওপর পারিবারিক আর্থিক অবস্থা দিন দিন বেশ খারাপের দিকে যাচ্ছে। বাবার পেনশনের টাকাটা আটকে আছে, ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ—সব মিলিয়ে এক অস্থির পরিবেশ। নেহা তাই পাগলের মতো একটা কাজের সন্ধান করছিল, অন্তত নিজের হাতখরচটা বাগে রাখা আর পরিবারকে সামান্য সাহায্য করার আশায়।
ঠিক সেই সময়েই সোশ্যাল মিডিয়ার একটা প্রফেশনাল গ্রাফিক ডিজাইন পেজে এক তরুণের সাথে তার যোগাযোগ হয়। নাম প্রীতম। পেজটি প্রীতমেরই ছিল। নেহা তাকে মেসেজ দিয়ে কাজের সুযোগ আছে কি না তা জানতে চায়। প্রীতম খুব বেশি কথা না বাড়িয়ে সংক্ষিপ্ত ও মার্জিত ভঙ্গিতে তার কাজের স্যাম্পল দেখতে চায়। নেহা নিজের করা কিছু পেজ কভার আর লোগো ডিজাইনের ফাইল পাঠিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে।
কয়েক ঘণ্টা পর প্রীতমের মেসেজ এলো, "আপনার ডিজাইনগুলো বেশ রুচিশীল। কাল থেকে আপনি কাজ শুরু করতে পারেন। রিমোটলি কাজ করবেন, মাস শেষে পেমেন্ট পেয়ে যাবেন।"
নেহার যেন বুক থেকে একটা বিশাল পাথর নেমে গেল। কাজের সুযোগ পাওয়ার আনন্দে তার চোখে জল চলে এসেছিল। সেদিনই প্রীতমের সাথে নেহার অফিশিয়াল হোয়াটসঅ্যাপে যুক্ত হওয়া।
প্রথম প্রথম কথা হতো শুধু কাজের কাজের। প্রীতম নির্দেশ দিত, নেহা সেই অনুযায়ী ক্লায়েন্টের প্রজেক্ট জমা দিত। কিন্তু প্রীতম মানুষটা অন্য সবার চেয়ে আলাদা। তার পেজে বা টিমপ্যানেলে আরও সাত-আটজন ফ্রিল্যান্সার কাজ করত, যাদের মধ্যে অনেকেই বেশ অভিজ্ঞ। কিন্তু রহস্যজনকভাবে প্রীতম নেহার সাথেই বেশি যোগাযোগ রাখত। সামান্য প্রজেক্টের আপডেট দিতে গিয়েও কথা বাড়াত।
"নেহা, কাজটা বেশ ভালো হয়েছে। তবে নীল রঙটা একটু হালকা দিলে কেমন হতো?" কিংবা, "আজ তো বৃষ্টি হচ্ছে চট্টগ্রামে, আপনার ওখানকার কাজের কাজ কতদূর?"
প্রীতমের এই বাড়তি মনোযোগ নেহা প্রথম প্রথম বুঝেও না বোঝার ভান করত। প্রীতম ছেলেটা নেহার চেয়ে বয়সে দুই বছরের ছোট। নেহা যখন অনার্সের শেষ বর্ষে, প্রীতম তখন মাত্র সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে, তবে এই বয়সেই নিজস্ব এজেন্সির কাজ সামলাচ্ছে দারুণ দক্ষতায়। বয়সের এই পার্থক্য আর নিজের ব্যাকগ্রাউন্ডের কথা চিন্তা করে নেহা নিজেকে সবসময় গুটিয়ে রাখার চেষ্টা করত।
দিন যত যেতে লাগল, কাজের আড়ালে তাদের কথাবলার পরিধি কেবল বাড়তেই থাকল। দিনে তো বটেই, রাতের বেলা প্রজেক্ট জমা দেওয়ার পরও হোয়াটসঅ্যাপের চ্যাট উইন্ডো বন্ধ হতো না। প্রীতমের খেয়াল রাখা, নেহার শরীর কেমন আছে খোঁজ নেওয়া কিংবা নেহার পারিবারিক কষ্টের কথা মন দিয়ে শোনা—সবকিছুই আস্তে আস্তে ভালোবাসার এক অচেনা অনুভূতি তৈরি করছিল।
একদিন গভীর রাতে কাজ শেষ করে ফাইল পাঠানোর পর প্রীতম লিখল, "নেহা, আপনি এত বেশি পরিশ্রম করেন কেন? মাঝেমধ্যে একটু নিজের যত্নও নেবেন তো।"
নেহা মুচকি হেসে রিপ্লাই দিল, "পরিস্থিতি মানুষ বানায়, প্রীতম। পরিস্থিতি আমার অনুকূলে নেই, তাই কাজটাই আমার একমাত্র আশ্রয়।"
প্রীতম উত্তর দিল, "আমি জানি আপনি অনেক কিছু সহ্য করছেন। তবে একলা ভাববেন না নিজেকে। অন্তত আমার সাথে কথা বলার সময় একটু মন খুলে হাসবেন।"
নেহা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রয়। প্রীতম ছেলেটা খুব যত্ন করে কথা বলে, খুব মায়ায় জড়াতে জানে। নেহার হৃদয় এক অজানা টানে চঞ্চল হয়ে উঠত ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই নিজের পরিবারের অভাব আর বাস্তবতার কথা মনে করে সে অনুভূতির সেই দরজায় কড়া পাহারা বসাত। প্রীতমের দেওয়া ছোট ছোট ইঙ্গিতগুলো নেহা না বোঝার ভান করে পাশ কাটিয়ে যেত। ভাবত, "ছেলেটা কত ছোট, তার ভবিষ্যৎ কত বড়, আর আমি নিজের ভাঙা সংসারের বোঝা কেন ওর ওপর চাপাব?"
কিন্তু মন তো আর বয়সের হিসাব কিংবা সংসারের দেনা-পাওনার সমীকরণ বোঝে না। সুদূর ঢাকা আর চট্টগ্রামের মধ্যকার এই দূরত্বের সীমান্ত পেরিয়ে তাদের এই অনলাইন যোগাযোগ কখন যে প্রতিদিনের বেঁচে থাকার অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল, তারা দুজনই তা জানত। শুধু মুখ ফুটে বলা বাকি ছিল, যা বলতে প্রীতম একদিন সব দ্বিধা এক পাশে সরিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।
দিন কাটছিল নিজের নিয়মেই। প্রীতম আর নেহার মধ্যে না-বলা ভালোবাসার টানটা প্রতিদিন একটু একটু করে গাঢ় হচ্ছিল। চট্টগ্রামের শান্ত বিকেলে নেহা যখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে চা খেত, তার চোখ জোড়া কেবল ফোনের মেসেজ টোনের অপেক্ষায় থাকত। কিন্তু একই সাথে মনের ভেতরের ভয়টাও প্রতিনিয়ত তাকে তাড়া করে ফিরত। প্রীতম তার থেকে বয়সে দুই বছরের ছোট, তাছাড়া নেহার নিজের পরিবারের যে করুণ দশা, তা প্রীতমকে জড়ানোর জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়।
একদিন প্রীতম আর সহ্য করতে পারল না। রাতের বেলায় কাজের শেষ মেসেজ পাঠানোর পর প্রীতম টাইপ করতে শুরু করল।
"নেহা, আমার কিছু কথা বলার আছে। আপনি কি সময় দিতে পারবেন?"
নেহার বুকটা ধপ করে উঠল। সে যেন আন্দাজ করতে পারছিল কী আসছে। সে উত্তর দিল, "হ্যাঁ, বলুন প্রীতম।"
প্রীতম একদম সরাসরি বলে ফেলল, "আমি আপনাকে ভালোবাসি, নেহা। এতদিন কাজের দোহাই দিয়ে আপনার সাথে কথা বলেছি, কারণ আমি আপনাকে নিজের করে পেতে চাই। বয়স কিংবা দূরত্বের ফারাক আমার কাছে কোনো বাধা নয়। আমি আপনার পাশে সারা জীবন থাকতে চাই।"
মেসেজটা পড়ে নেহার হাত কেঁপে উঠল। চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল মোবাইল স্ক্রিনের ওপর। তার মন চিৎকার করে বলতে চাইছিল যে সেও প্রীতমকে ভীষণ ভালোবাসে, তার ওই মায়াবী কণ্ঠ আর যত্নের কাছে সে আগেই হেরে গেছে। কিন্তু বাস্তবতার নির্মম চাবুক তাকে থামিয়ে দিল।
পরদিন সকালে নেহা সাহস সঞ্চয় করে তার মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ইতস্তত করে মায়ের কাছে প্রীতমের কথা, তার ভালোবাসার কথা আর তার সাথে সংসার বাঁধার ইচ্ছার কথা জানাল। কিন্তু কথা শেষ হতে না হতেই মা ভীষণ রেগে উঠলেন।
"তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে নেহা?" মায়ের কণ্ঠে ক্ষোভ আর বিষাদ একসাথে ঝরে পড়ল। "আমাদের পরিবারে এখন কী কঠিন সময় যাচ্ছে তুই দেখছিস না? বাবার শরীর ভালো না, দেনার দায়ে সংসার ডুবতে বসেছে, আর তুই এই সময়ে বিয়ের চিন্তা মাথায় আনছিস? তাও আবার তোর চেয়ে বয়সে ছোট একটা ছেলের সাথে? লোকে শুনলে হাসবে না? তোর কি একটুও লজ্জা নেই?"
মায়ের প্রতিটি কথা নেহার হৃদয়ে বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধল। নেহা বুঝতে পারল, এই পরিস্থিতিতে নিজের ভালোবাসাকে আঁকড়ে ধরা মানে পরিবারের ওপর আরও বড় আঘাত হানা। তাছাড়া প্রীতম বয়সে ছোট বলে তার পরিবারও হয়তো কোনো দিন একে মেনে নেবে না।
হৃদয়ে পাথর চাপা দিয়ে নেহা ফোনটা হাতে নিল। প্রীতমকে টেক্সট করল, "প্রীতম, আপনি যা ভেবেছেন তা সম্ভব নয়। আমি আপনাকে ভালোবাসতে পারব না। আমাদের মধ্যে এসব কোনো দিন হতে পারে না। আপনি এই চিন্তা মাথা থেকে ফেলে দিন।"
প্রীতম মেসেজটা দেখে হতবাক হয়ে গেল। সে সাথে সাথে ফোন করল। নেহা ফোন ধরতেই প্রীতম আকুল হয়ে বলতে লাগল, "কেন নেহা? আপনি মিথ্যা বলছেন! আমি জানি আপনিও আমাকে ভালোবাসেন। আপনার চোখ, আপনার কণ্ঠ সব বলে দেয়। প্লিজ নেহা, আমাকে না করবেন না! আমার আপনাকে ছাড়া চলবে না, আপনি আমাকে এভাবে ফিরিয়ে দেবেন না, প্লিজ!"
প্রীতমের এই আকুতি শুনে নেহার বুক ভেঙে যাচ্ছিল। প্রীতমের কন্ঠে এতটা কাতরতা সে আগে কখনো শোনেনি। কিন্তু কান্না চেপে রেখে নেহা কঠোর গলায় বলল, "প্রীতম, জোর করবেন না। আমার সিদ্ধান্ত শেষ। আমি আপনাকে গ্রহণ করতে পারব না।"
নেহা কলটা কেটে দিল। ফোনের ওপাশে বসে নেহা হাত দিয়ে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। তার মনে হচ্ছিল, নিজের কলিজাটা নিজের হাতে কেটে আলাদা করে দিল সে।
পরদিন নেহার নিজেকে খুব অপরাধী মনে হতে লাগল। সে প্রীতমকে একদম হারিয়ে ফেলতে পারছিল না। তাই মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য আর প্রীতমকে কাছে পাওয়ার লোভে সে আবার মেসেজ দিল, "প্রীতম, আমরা কি আগের মতো ভালো বন্ধু হয়ে থাকতে পারি না? প্লিজ, কাজ আর সাধারণ বন্ধুত্বের সম্পর্কটা শেষ করবেন না।"
কিন্তু ততক্ষণে প্রীতমের ভেতরের কোমল মানুষটা বদলে যেতে শুরু করেছে। প্রীতম ভীষণ আঘাত পেয়েছিল। সে বুজতে পারছিল নেহা তাকে বন্ধুত্বের অজুহাতে আটকে রাখতে চাইছে, কিন্তু সে তো নেহাকে শুধু বন্ধু হিসেবে ভাবতে পারবে না।
প্রীতম খুব ঠান্ডা গলায় রিপ্লাই দিল, "না নেহা, যে মানুষকে আমি ভালোবাসার আসনে বসিয়েছি, তাকে বন্ধু বানিয়ে পাশে রাখার মতো অভিনয় আমি করতে পারব না। আপনি আমাকে অপেক্ষায় রাখতে চাইলেও আমি নিজেকে আর কষ্ট দেব না।"
নেহা মেসেজটা পড়ে আবার অনুনয় করল, "প্রীতম, আমি আপনাকে কোনো অপেক্ষায় রাখতে চাই না। আপনি ভালো থাকুন, নিজের যত্ন নিন।"
প্রীতম আর কোনো উত্তর দিল না। সে নিজেকে কঠিন এক খোলসের ভেতর গুটিয়ে ফেলল। নেহার দেওয়া এই প্রত্যাখ্যান তার আত্মসম্মানে ও হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। সে স্থির করল, আর কোনো দিন নেহার সামনে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করবে না। নেহাকে এড়িয়ে চলাই এখন তার একমাত্র পথ।
দিন কেটে যেতে লাগল, কিন্তু ঢাকা আর চট্টগ্রামের দূরত্বটা এখন আর শুধু ভৌগোলিক রইল না, তা হয়ে উঠল দুটো হৃদয়ের মধ্যকার এক গভীর মরুভূমি। প্রীতম নিজেকে পুরোপুরি বদলে ফেলল। কাজের প্রয়োজনে যেটুকু কথা না বললেই নয়, প্রীতম শুধু সেটুকুই বলত—একেবারে পেশাদার ও কঠোর মেজাজে। আগে যেখানে নেহার সামান্য ভুলত্রুটিও প্রীতম হেসে উড়িয়ে দিত, এখন সেখানে গম্ভীর গলায় শুধু কাজের ঘাটতিটুকু ধরিয়ে দিত। কোনো কুশল বিনিময় নেই, অতিরিক্ত কোনো কথা নেই।
নেহা প্রীতমের এই শীতল আচরণ সহ্য করতে পারছিল না। প্রীতমকে এভাবে পাথর হয়ে যেতে দেখে নেহার ভেতরটা প্রতিদিন দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছিল। সে নানা বাহানায় প্রীতমের সাথে কথা বলার চেষ্টা করত।
"প্রীতম, প্রজেক্টের কালার কম্বিনেশনটা একটু দেখবেন?"
প্রীতমের সংক্ষিপ্ত উত্তর আসত, "ঠিক আছে, মেইল করে রাখুন।"
"প্রীতম, শরীর ভালো তো আপনার?"
এই মেসেজের পর প্রীতমের কোনো সিন হতো না, কিংবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা পর শুধু একটা ঠাণ্ডা 'হ্যাঁ' রিপ্লাই আসত।
অবশেষে একদিন প্রীতম সিদ্ধান্ত নিল, এই যন্ত্রণাময় যোগাযোগ সে একদম বন্ধ করে দেবে। নেহার প্রতিটা মেসেজ তাকে অতীতের সেই ভালোবাসার কথা মনে করিয়ে দেয়, যা সে আর সহ্য করতে পারছিল না। প্রীতম নিঃশব্দে তার পুরানো হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরটি পরিবর্তন করে ফেলল। নেহাকে নতুন নম্বর আর দেওয়া হলো না।
হোয়াটসঅ্যাপে প্রীতমের প্রোফাইল ছবি আর লাস্ট সিন হঠাৎ গায়েব হয়ে যেতেই নেহা বুঝতে পারল কী ঘটেছে। নেহার বুকের ভেতরটা যেন খাঁ খাঁ করে উঠল। নম্বর বদলে ফেলে প্রীতম তার সাথে শেষ যোগাযোগের সুতোটাও কেটে দিয়েছে।
অন্যদিকে প্রীতম নম্বর বদলে ফেললেও মন থেকে নেহাকে মুছে ফেলতে পারেনি। সে প্রতিদিন নিয়ম করে তার পুরানো সেই বন্ধ নম্বরের হোয়াটসঅ্যাপ খুলত। নিজের অজান্তেই চেক করত—নেহা কি কোনো নতুন মেসেজ দিয়েছে? নেহা কি এখনও তার জন্য কোনো আকুতি পাঠিয়ে রেখেছে? কিন্তু পুরানো নম্বরটি বন্ধ থাকায় কোনো মেসেজই পেত না প্রীতম, তাও কেবল এক চিলতে আশা আর অভ্যাসের বশে সে প্রতিদিন ওই স্ক্রিনে তাকিয়ে লাস্ট সিন চেক করত।
নেহার জীবনের আলো যেন পুরোপুরি নিভে গেল। একদিকে পরিবারের চরম অশান্তি ও অভাব, অন্যদিকে প্রীতমের এই কঠিন নীরবতা—দুটো মিলে তাকে পঙ্গু করে দিচ্ছিল। নেহা সারারাত বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদত। চোখের জলে ভিজে যেত বিছানা। দিন পার হওয়ার সাথে সাথে কাঁদতে কাঁদতে নেহা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার পাশাপাশি শারীরিকভাবে প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়ল। তীব্র ডিপ্রেশন, না খাওয়া আর নিয়মিত মানসিক চাপে তার প্রেসার ভীষণ কমে গেল, রক্তে হিমোগ্লোবিন তলানিতে গিয়ে ঠেকল।
কিন্তু পরিবারের সামনে নেহা নিজেকে শক্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেল। মা-বাবার সামনে সে কোনো দিন চোখের জল ফেলেনি। নিজের অসুস্থতার কথা লুকিয়ে রেখে মুখে একরাশ কৃত্রিম হাসি মাখিয়ে ঘরের কাজ করত, ছোট ভাইয়ের পড়া দেখাত। মা-বাবা ভাবতেন মেয়ে হয়তো স্বাভাবিক হয়ে গেছে, সংসারের পরিস্থিতি মেনে নিয়েছে। কিন্তু হাসিমুখের আড়ালে নেহার শরীর যে প্রতিদিন একটু একটু করে ক্ষয়ে যাচ্ছিল, তা বাড়ির কেউ টের পায়নি।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নেহার অবস্থা এতই আশঙ্কাজনক হলো যে সে আর বিছানা ছেড়ে ওঠার শক্তি পেল না। টানা উচ্চ জ্বরে অজ্ঞান হয়ে পড়ার পর তাকে দ্রুত স্থানীয় এক হাসপাতালে ভর্তি করতে হলো। ডক্টররা জানালেন, চরম মানসিক দুশ্চিন্তা ও পুষ্টিহীনতায় তার অর্গান ফেলিউরের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
হাসপাতালের বেডে ফ্যাকাশে মুখে শুয়ে থাকা নেহা তখনও বিড়বিড় করে প্রীতমের নামটাই বলছিল। তার ফোনটা পড়ে ছিল টেবিলের ওপর—যেখানে প্রীতমের কোনো ফোন বা মেসেজ আর আসার সুযোগ ছিল না।
হাসপাতালের কেবিনে বেডের পাশে রাখা মনিটরের রুটিন শব্দ ছাড়া আর কোনো সাড়াশব্দ ছিল না। নেহার হাতটা বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে এসেছিল। নেহার এই অবস্থার কথা চট্টগ্রামেই থাকা প্রীতমের এক দূরসম্পর্কের বন্ধুর মাধ্যমে প্রীতম জানতে পারে। মেয়েটা যে তিল তিল করে শেষ হয়ে যাচ্ছিল, আর তার এই অবস্থার পেছনে যে লুকিয়ে আছে সম্পর্কের অপূর্ণতা ও গভীর মানসিক যন্ত্রণা—তা বুঝতে প্রীতমের এক মুহূর্তও সময় লাগেনি।
সংবাদটা শোনামাত্রই প্রীতম আর স্থির থাকতে পারল না। বুকের ভেতর জমানো সমস্ত ক্ষোভ, অভিমান আর রাগ মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। প্রীতম বুঝতে পারল, নেহা মুখে তাকে ফিরিয়ে দিলেও মন থেকে কোনো দিন তাকে দূরে ঠেলে দেয়নি। সবটুকু কষ্ট নেহা একা বুকে চেপে রেখেছিল।
পরদিনই প্রীতম ঢাকা থেকে সোজা চট্টগ্রামে নেহাদের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলো। দরজায় প্রীতমকে দেখে নেহার মা-বাবা অবাক হলেন। প্রীতম নিজের পরিচয় দিয়ে অত্যন্ত নম্র কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "মাসি, আমি প্রীতম। আমি নেহাকে ভালোবাসি। আমি জানি আপনাদের পারিবারিক অবস্থা এখন কঠিন, এবং আমি নেহার চেয়ে বয়সে দুই বছর ছোট। কিন্তু আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, আমি নেহাকে সারাজীবন সম্মান ও ভালোবাসায় আগলে রাখতে পারব। আজ নেহা হাসপাতালের বেডে শুধু আমার আর তার মনের বিরুদ্ধে নেওয়া সিদ্ধান্তের জন্য। আমাকে একবার তার পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ দিন।"
প্রীতমের চোখের বিশ্বাস ও স্পষ্ট কথা শুনে নেহার মা-বাবার ভেতরের সব ভুল ধারণা এক নিমেষে ভেঙে গেল। তারা বুঝতে পারলেন, মেয়ের জীবনের চেয়ে বড় কোনো অহংকার বা সামাজিক নিয়ম হতে পারে না। প্রীতমের মতো দায়িত্বশীল আর ভালোবাসায় ভরা এক তরুণকে জামাই হিসেবে পাওয়ার ভাগ্য সবার হয় না। কান্নাভেজা চোখে নেহার মা প্রীতমের মাথায় হাত রেখে সম্মতি দিলেন।
মায়ের সম্মতি পেয়ে প্রীতম ছুটে গেল হাসপাতালে।
সাদা চাদরে ঢাকা কেবিনের দরজায় এসে প্রীতম দাঁড়াল। ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে নেহার ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া হাতের ওপর নিজের হাত রাখল। নেহা চোখ মেলে তাকাল। সামনে প্রীতমকে দেখে নেহার মনে হলো সে হয়তো স্বপ্ন দেখছে। অস্ফুট স্বরে বলল, "প্রীতম... তুমি?"
প্রীতম নেহার কপালে হাত রেখে খুব নরম গলায় বলল, "হ্যাঁ নেহা, আমি এসে গেছি। আর কোনো পালিয়ে যাওয়া নয়, আর কোনো বানিয়ে বলা বারণ নয়। আমি তোমার মা-বাবার অনুমতি নিয়েই তোমার হাত ধরতে এসেছি।"
নেহার চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। তবে এবার তা কষ্টের জল নয়, পরম শান্তির জল। প্রীতম নেহার হাত শক্ত করে ধরে বলল, "তুমি আমাকে ভুল বুঝেছিলে নেহা। ভালোবাসা কোনো বয়স বা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে না। তুমি সুস্থ হয়ে ওঠো, আমরা এক সাথেই সব লড়াই লড়ব।"
প্রীতমের ছোঁয়ায় আর মানসিক আশ্বাসে নেহা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে লাগল। চিকিৎসকরাও নেহার এই দ্রুত উন্নতি দেখে অবাক হয়ে যান। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার কিছুদিন পরই প্রীতম ও নেহার পরিবারের উপস্থিতিতে অত্যন্ত সাদামাটা কিন্তু সুন্দর পরিবেশে তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলো।
চট্টগ্রামের সেই ছোট বারান্দায় এখন আর নেহা একা বসে থাকে না। বিকেলের রোদে প্রীতম আর নেহা পাশাপাশি বসে চা খায়, ল্যাপটপে একসাথে এজেন্সির কাজ সামলায়। ঢাকার রোদ আর চট্টগ্রামের বৃষ্টি এখন আর আলাদা নয়, দুটো শহরের দূরত্ব পেরিয়ে তারা এখন এক নতুন জীবনের ভালোবাসার বন্ধনে বাঁধা। সব বাধা পার হয়ে তাদের ভালোবাসার গল্পটা পেল এক সুন্দর ও শুভ পরিণতি।
....