অসুস্থ মন থেকে মুক্তি

ভোরের নরম আলোটা যখন জানালার ভারী পর্দা গলে ঘরে এসে পড়ল, তাহসিন তখনও বসে ছিল ঘরের এক কোণে রাখা সোফাটিতে। তার সামনে রাখা কাঠের ছোট টি-টেবিলে তখনও ভাসছে এক কাপ হালকা ধোঁয়া ওঠা কফি। তাহসিনের চোখজোড়া স্থির হয়ে ছিল বিছানায় শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকা আনায়ার মুখের দিকে। আলোটা এসে আনায়ার ফরসা গালে আর আধবোজা চোখের পাতায় এসে পড়েছে, যেন কোনো তুলির হালকা ছোঁয়া। আনায়ার এই নিশ্চিন্ত ঘুম তাহসিনের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি আনে, কিন্তু ঠিক তার পরমুহূর্তেই এক বিষাক্ত আতঙ্ক চেপে ধরে তার গলা।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

"যদি ও চলে যায়? যদি ও আমাকে ছেড়ে অন্য কোথাও হারিয়ে যায়?" —এই একটিমাত্র ভাবনা তাহসিনের মগজে দিনরাত পোকার মতো কিলবিল করে।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

ভালোবাসা তাহসিনের কাছে কোনো মুক্ত আকাশ নয়, ভালোবাসা তার কাছে এক আতঙ্কের নাম। কাউকে গভীরভাবে বুকে জড়িয়ে ধরার পর তাকে হারানোর ভয়টা তার কাছে মৃত্যুমুখী বেদনার মতো। আর সেই ভয় থেকেই জন্মেছে তার মাত্রাতিরিক্ত অধিকারবোধ, তীব্র হিংসা এবং আনায়ার ওপর প্রতি মুহূর্তে নজরদারি করার এক অসুস্থ মানসিকতা।

 

আনায়া একটু নড়েচড়ে উঠল। তার রেশমের মতো কালচে চুলগুলো বালিশজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। পিঠের ওপর থেকে পাতলা চাদরটা কিছুটা সরে যাওয়ায় তার মসৃণ ফর্সা কাধ আর গলার একাংশ উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। তাহসিন সোফা থেকে উঠে ধীরপায়ে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। ঘরের পরিবেশটা ভারী, সুবাসিত আর এক ধরণের গভীর মাদকতায় ভরা। তাহসিন হাঁটু গেড়ে বসল বিছানার পাশে। তার দীর্ঘ আঙুলগুলো খুব সাবধানে আনায়ার কপালে চেপে থাকা চুলগুলোকে সরিয়ে দিল কানের পেছনে।

 

আনায়া হালকা চোখ মেলল। ঘুমজড়ানো চোখে তাহসিনের দিকে তাকিয়ে সে মিষ্টি করে একটু হাসল। "তুমি এত সকালে উঠে বসে আছ কেন, তাহসিন?"

 

তাহসিন কোনো কথা বলল না। তার গভীর তামাটে চোখ দুটো স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল আনায়ার ঠোঁটের দিকে। তার হৃদস্পন্দন দ্রুত হতে শুরু করেছে। এক হাত দিয়ে সে আনায়ার চিবুকটা স্পর্শ করল, তারপর ধীরে ধীরে নিজের বুড়ো আঙুলটা ঘষে দিল তার নিচের ঠোঁটে। আনায়ার শরীরটা এক অদ্ভুত শিহরণে কেঁপে উঠল। তাহসিন নিচু হয়ে আনায়ার ঘাড়ের কাছে নিজের মুখটা নিয়ে গেল। তার তপ্ত নিঃশ্বাস আনায়ার ত্বকে আছড়ে পড়তে লাগল।

 

"তুমি কোথাও যাবে না তো, আনায়া? আমাকে ছেড়ে কখনো যাবে না তো?" তাহসিনের কণ্ঠস্বর ভারী, কিছুটা ব্যাকুল।

 

আনায়া দুই হাতে তাহসিনের চুল আঁকড়ে ধরে তাকে নিজের কাছে টেনে নিল। "কী বলছ তুমি? আমি তো তোমার কাছেই আছি, তাহসিন।"

 

তাহসিন আর কোনো কথা সহ্য করতে পারল না। সে আনায়ার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল—এক তীব্র, বাঁধভাঙা আর আধিপত্য বিস্তারকারী অনুভূতির জোয়ারে। এই চুমুতে কোনো নরম কোমলতা ছিল না, ছিল এক ধরণের উগ্র তীব্রতা। যেন সে চুষে নিতে চায় আনায়ার সমস্ত সত্তা, বুক থরথর করে কাঁপা এক প্রবল আকাক্সক্ষায় সে আনায়াকে নিজের শরীরের সাথে পিষে ফেলতে চাইল। আনায়া প্রথমে কিছুটা স্তম্ভিত হয়ে গেলেও, তাহসিনের এই অন্ধ কামনার গভীরে লুকিয়ে থাকা অতল ভালোবাসা তাকেও ভাসিয়ে নিয়ে গেল।

 

তাহসিনের হাত দুটো আনায়ার সুগঠিত কোমরে চেপে বসল। পাতলা নাইট গাউনের উপর দিয়েই সে অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল আনায়ার শিরায় শিরায়। তাহসিন আনায়ার ওপর ঝুঁকে পড়ে তার গলার খাঁজে গভীর উষ্ণ চুমু আঁকল। আনায়ার বুক থেকে এক হালকা স্বস্তির ও কামনার আর্তনাদ বের হয়ে এল। তাহসিনের হাত দুটো কোনো বাধা না মেনে আরও গভীরে শাড়ির খাঁজে বা পোশাকের বাঁধন ঠেলে এগোতে লাগল। আনায়ার ত্বকের প্রতিটি ইঞ্চি তাহসিনের উষ্ণ স্পর্শে আগুনের মতো উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল।

 

তাহসিনের এই স্পর্শে যতটা ব্যাকুলতা ছিল, ততটাই ছিল নিজের করে বেঁধে রাখার এক আদিম বাসনা। সে আনায়ার নগ্ন পিঠে নিজের আঙুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরে তাকে আরও কাছে টেনে আনল। দুজনের দেহের দূরত্ব বলতে তখন আর কিছুই ছিল না। আনায়ার নিঃশ্বাসের গতি দ্রুত হচ্ছিল, তার হাত দুটো তাহসিনের চওড়া পিঠে নখ বসিয়ে দিচ্ছিল স্বতঃস্ফূর্তভাবে। কামনার এই গভীর তরঙ্গে আনায়া নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু মনের কোনো এক গোপন কোণে এক অজানা আশঙ্কা তাকে আচ্ছন্ন করছিল।

 

কয়েক ঘণ্টার গভীর ও তীব্র শারীরিক অনুভূতির পর, যখন কামনার ঝড় কিছুটা শান্ত হলো, তখন তাহসিন আনায়াকে নিজের শক্ত বুকের মাঝে জড়িয়ে শুয়ে রইল। তাহসিনের বুকে মাথা রেখে আনায়া শুনতে পাচ্ছিল তার অনবরত ও দ্রুত ধুকপুক করা হৃদস্পন্দন। কিন্তু এই পরম উষ্ণতার পরপরই শুরু হলো সেই চেনা বন্দিদশা।

 

সকালের নাশতার টেবিলে বসতেই তাহসিনের রূপ বদলে গেল। একটু আগেই যে পুরুষটি আনায়ার শরীরে ভালোবাসার আগুন জেলে দিয়েছিল, এখন সেই পুরুষটির চোখে সন্দেহের এক কালো ছায়া।

 

"আজকে অফিসে তোমার এত দেরি হওয়ার কথা নয়, আনায়া। আর কাল রাতে তোমার ফোনে ওই সহকর্মীর বার্তা কেন এসেছিল?" তাহসিন কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে শান্ত অথচ কঠোর গলায় প্রশ্ন করল।

 

আনায়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "তাহসিন, ওটা অফিসের প্রজেক্টের জরুরি বার্তা ছিল। আমি তো তোমাকে কাল রাতেও দেখিয়েছি।"

 

"আমি চাই না তুমি ওই ছেলের সাথে আর কোনো কথা বলো।" তাহসিনের কণ্ঠস্বরে আদেশ ফুটে উঠল। "অফিসের বাইরে ওর সাথে কোনো যোগাযোগ থাকবে না। এমনকি অফিসেও না।"

 

আনায়া চোখ তুলে তাকাল। তার দৃষ্টিতে কিছুটা বিরক্তি আর আঘাতের ছাপ। "তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না, তাই তো? প্রতিনিয়ত তুমি আমাকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করো যেন আমি তোমার কোনো সম্পত্তি! ঘরের বাইরে গেলে ১০ বার ফোন দেবে, কার সাথে কথা বলছি তার হিসেব নেবে—এগুলো কী তাহসিন?"

 

"আমি তোমাকে ভালোবাসি, আনায়া!" তাহসিন টেবিল চাপড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে। "আমি তোমাকে হারানোর ভয় পাই! আর তুমি এটাকে নিয়ন্ত্রণ বলছ?"

 

"ভালোবাসা আর বন্দিদশা এক জিনিস নয়, তাহসিন!" আনায়াও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল। "ভালোবাসা মানুষের মনকে মুক্ত করে, দমবন্ধ করে মেরে ফেলে না। তোমার এই অতিরিক্ত অধিকারবোধ আমাকে প্রতিদিন তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে।"

 

তাহসিন দ্রুত আনায়ার কাছে এগিয়ে এসে তার দুই বাহু শক্ত করে ধরে ঝাঁকুনি দিল। "তুমি আমার, আনায়া! শুধু আমার! আমি অন্য কাউকে তোমার দিকে তাকাতেও দেব না, আর তোমাকেও আমার থেকে দূরে যেতে দেব না।"

 

তাহসিনের হাতের চাপ এতটাই শক্ত ছিল যে আনায়ার ফর্সা ত্বকে লাল দাগ বসে গেল। কিন্তু তার চেয়েও বেশি ব্যথা পাচ্ছিল আনায়ার মন। তাহসিনের ভালোবাসা একটা সুন্দর সুরের মতো হতে পারত, কিন্তু তা এখন একটা বিশাল লোহার শিকল হয়ে তার পায়ে পেঁচিয়ে ধরেছে।

 

পরের দিনগুলোতে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে লাগল। তাহসিন আনায়ার ফোনে গোপনে ট্র্যাকিং অ্যাপ বসাল, সে আনায়ার পোশাকের কাটছাঁট নিয়ে কটূক্তি করতে শুরু করল, এমনকি আনায়ার বন্ধুদের সাথেও তার যোগাযোগ একপ্রকার বন্ধ করে দিল। ভালোবাসা যেখানে বিশ্বাস ও শ্রদ্ধার ওপর দাঁড়ায়, সেখানে তাহসিনের হিংসা আর ভয়ের বীজ প্রতিদিন সম্পর্কের গোড়ায় বিষ ঢালছিল।

 

একদিন সন্ধ্যায়, যখন আনায়া কিছুটা দেরি করে বাসায় ফিরল, তাহসিন ঘরের দরজা লক করে দিল। তার চেহারায় ভর করেছিল তীব্র ক্ষোভ আর সন্দেহের উন্মাদনা।

 

"কোথায় ছিলে এতক্ষণ?" তাহসিনের হিংস্র প্রশ্ন।

 

"রাস্তায় প্রচণ্ড যানজট ছিল, তাহসিন। তুমি তো আমার লোকেশন দেখতেই পাচ্ছ, তবুও কেন এমন করছ?" আনায়া ক্লান্ত গলায় বলল।

 

তাহসিন আনায়ার কোনো কথা শুনল না। সে আনায়ার হাত ধরে এক টান মেরে তাকে সোফায় ছুঁড়ে ফেলল। "তুমি আমাকে মিথ্যা বলছ! তুমি নিশ্চয়ই কারও সাথে দেখা করতে গিয়েছিলে!"

 

আনায়া আর সহ্য করতে পারল না। তার চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু তার দৃষ্টিতে এবার স্পষ্ট হয়ে উঠল এক দৃঢ় সিদ্ধান্ত। "তাহসিন, থামো! অনেক হয়েছে। আমি আর এটা সহ্য করতে পারছি না। তোমার এই সন্দেহ, তোমার এই ভয়ের অসুস্থতা আমাকে প্রতিদিন মেরে ফেলছে।"

 

তাহসিন কোনো কথা না শুনে আনায়ার ওপর ঝাপিয়ে পড়ল। তার কামনার মাঝে এখন আছড়ে পড়ছিল রাগ আর হারানোর ভয়। সে আনায়ার ঠোঁটে আবার নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাইল, তার জামাকাপড় টেনে ছিঁড়ে ফেলার উপক্রম করল। তাহসিনের উন্মত্ত স্পর্শে আনায়া নিজের সবটুকু জোর দিয়ে তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।

 

"না, তাহসিন! আর না!" আনায়া চিৎকার করে উঠল। তার চোখ থেকে অঝোরে জল ঝরছিল, কিন্তু তার কণ্ঠ ছিল স্পষ্ট ও কঠোর। "শরীর দিয়ে তুমি আমাকে আটকে রাখতে পারবে না। এই ভালোবাসা নয়, তাহসিন। এটা একটা শাস্তি! আর ভালোবাসা কখনো কোনো মানুষের জন্য শাস্তি হতে পারে না!"

 

তাহসিন মেঝেতে বসে পড়ে হাঁপাতে লাগল। তার চুলগুলো উসকোখুসকো, চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা। সে দেখল আনায়া ধীরে ধীরে সোফা থেকে উঠে নিজের জামাকাপড় ঠিক করল, তারপর এক ফোঁটা চোখের জল মুছে বেডরুমে গিয়ে একটা ছোট ব্যাগ গুছিয়ে নিল।

 

"আনায়া... তুমি কী করছ?" তাহসিন তোতলাতে তোতলাতে উঠে দাঁড়াল। তার ভেতরের সেই দাপুটে পুরুষটি এক নিমেষে মিলিয়ে গেছে, সেখানে এখন শুধুই এক অসহায় আকুতি। "তুমি আমাকে ছেড়ে যাচ্ছ?"

 

আনায়া ব্যাগের জিপার বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে এখন আর কোনো ভয় নেই, শুধু আছে এক গভীর কষ্ট আর মুক্তির তীব্র তৃষ্ণা।

 

"হ্যাঁ, তাহসিন। আমি চলে যাচ্ছি। আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম, কিন্তু তোমার এই বিষাক্ত মানসিকতাকে ভালোবাসতে পারিনি। নিজেকে পরিবর্তন না করা পর্যন্ত, বি

শ্বাস করতে না শেখা পর্যন্ত তুমি কখনো কাউকে সুখী করতে পারবে না।"

আনায়া দরজার দিকে হেঁটে গেল। তাহসিন তার পথ আটকানোর জন্য পা বাড়াতে চাইল, কিন্তু তার পা যেন মেঝেতে জমে গেছে। সে শুধু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল, আনায়া দরজার লক খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল। ভারী কাঠের দরজাটা সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল।

 

বিশাল ঘরের মধ্যে তখন শুধুই এক গাঢ়, নিস্তব্ধ নীরবতা। তাহসিন হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল দরজার গোড়ায়। সে যে ভয়টা সারাজীবন পেয়ে এসেছে, নিজের হাতেই সে সেই ভয়টাকে সত্যি করে তুলল। আনায়া তাকে ছেড়ে চলে গেছে। আর তার রেখে যাওয়া শেষ কথাটা তাহসিনের মাথায় কানের কাছে অনবরত বাজতে লাগল—"ভালোবাসা কখনো শাস্তি হতে পারে না।"

আনায়া চলে যাওয়ার পর ঘরটার প্রতিটি কোণ যেন নিঃশব্দে ফিসফিস করে কথা বলতে লাগল। চারপাশের এই নীরবতা তাহসিনের বুকের ভেতর এক গভীর খাঁ খাঁ শূন্যতা তৈরি করল। সোফায় পঁচে থাকা কফির কাপ, বিছানার এলোমেলো চাদর, ঘরের বাতাসে আনায়ার ব্যবহৃত হালকা সুবাস—সবকিছু মিলে তাহসিনকে এক চরম যন্ত্রণার সাগরে ডুবিয়ে দিল। প্রথম কয়েকদিন সে ঘরের আলো জ্বালায়নি। নেশাগ্রস্তের মতো ঘরে পড়ে থেকে সে আনায়ার ফোন নম্বরে বার বার ডায়াল করেছে, একের পর এক বার্তা পাঠিয়েছে। কিন্তু অপরপ্রান্ত থেকে কেবলই ছিল এক পাথুরে নীরবতা।

 

তাহসিন ধীরে ধীরে নিজেকে তিলে তিলে শেষ হতে দেখল। আয়নায় নিজের চেহারার দিকে তাকিয়ে সে চিনতে পারল না সেই মানুষটিকে—উসকোখুসকো চুল, বসে যাওয়া চোখ আর লাল হয়ে থাকা চোখের কোণে জমা অসীম বিষাদ। আনায়ার শেষ শব্দগুলো তার মস্তিষ্কে আঘাত করতেই থাকল—"ভালোবাসা কখনো শাস্তি হতে পারে না।"

 

সেদিন রাতে তাহসিন একা একা ঘরে দাঁড়িয়ে নিজের আচরণের প্রতিটি মুহূর্ত পুনর্নির্বাচন করল। সে বুঝতে পারল, তার নিজের ভেতরের এক গভীর নিরাপত্তাহীনতা আর অতীত থেকে বয়ে নিয়ে আসা হারানোর ভয়ই তাকে আজ এই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। আনায়াকে সে মুক্ত মনে বিশ্বাস করতে পারেনি বলেই, আজ তাকে চিরতরে হারিয়েছে। তাহসিন সিদ্ধান্ত নিল, এভাবে সে নিজেকে শেষ হতে দেবে না। সে বদলাবে। ভালোবাসার নামে যে বিষাক্ত শিকল সে তৈরি করেছিল, তা ভেঙে ফেলে সে শিখবে কীভাবে মুক্ত আকাশে কাউকে স্থান দিতে হয়।

 

পরের কয়েকটি মাস তাহসিনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। সে পেশাদার কাউন্সিলরের সাহায্য নেওয়া শুরু করল। নিজের মানসিক রোগ ও অতিরিক্ত অধিকারবোধের গভীর কারণগুলো খুঁজে বের করে তা শুধরে নেওয়ার তীব্র লড়াই শুরু হলো তার ভেতর। সে কাজ শুরু করল নিজের রাগ ও ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য। বন্ধুদের সাথে মেলামেশা বাড়াল, নতুন করে বই পড়তে শুরু করল এবং নিজের কাজের মধ্যে মন দিল। সে বুঝতে পারল, কাউকে নিজের খাঁচায় বন্দী রাখা ভালোবাসা নয়, বরং তাকে নিজের মতো করে বাঁচতে দেওয়াই প্রকৃত ভালোবাসা।

 

ছয় মাস পর...

 

আনায়া নিজের একটা নতুন অ্যাপার্টমেন্টে উঠেছে। জীবনটা তার আগের চেয়ে অনেক শান্ত হলেও, মন থেকে তাহসিনের স্মৃতিগুলো সে পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারেনি। কিন্তু সে নিজেকে শক্ত রেখেছিল। একদিন বিকেলে তার অফিসের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল তাহসিনকে।

 

আনায়া অফিস থেকে বেরিয়ে থমকে দাঁড়াল। তাহসিন আগের মতো আর সেই বিধ্বংসী চেহারায় নেই। সে পরেছে একটা সাধারণ হালকা নীল শার্ট, চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ানো, আর তার মুখে সেই আগের হিংস্রতা বা ব্যাকুলতার চিহ্নমাত্র নেই। তার চোখে এখন কেবলই এক স্থির, গভীর ও পরিপক্ব দৃষ্টি।

 

তাহসিন ধীরপায়ে এগিয়ে এল। "ভয় পেও না, আনায়া। আমি তোমার পিছু নিতে আসিনি। শুধু দূর থেকে তোমাকে একবার দেখার তীব্র ইচ্ছে ছিল, আর... একটা কথা বলার ছিল।"

 

আনায়া শক্ত গলায় বলল, "কী কথা, তাহসিন?"

 

"আমি ক্ষমা চাইতে এসেছি," তাহসিনের গলাটা একটুও কেঁপে উঠল না, অথচ তাতে ছিল এক পরম সত্যতা। "আমি বুঝেছি আমার ভুলটা কোথায় ছিল। আমি ভালোবেসেছিলাম ঠিকই, কিন্তু সেই ভালোবাসার ওপর আমার নিজের ভয়ের কালো ছায়া ফেলেছিলাম। আমি তোমাকে বন্দি করতে চেয়েছিলাম, কারণ আমি বিশ্বাস করতে পারতাম না। কিন্তু এই ছয় মাসে আমি শিখেছি—কাউকে বিশ্বাস করার অর্থ তাকে মুক্ত করে দেওয়া। তুমি আমার জীবনে ফেরো বা না ফেরো, আমি আর কোনোদিন তোমার স্বাধীনতা কাড়তে চাইব না।"

 

তাহসিনের এই শান্ত, দৃঢ় আর বিনয়ী রূপ দেখে আনায়ার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত দোলা দিল। সেই আগের রাগী, সন্দেহপ্রবণ লোকটির কোনো অস্তিত্বই যেন নেই এখন।

 

"আমি আশা করি তুমি ভালো আছ," তাহসিন হালকা একটু হেসে বলল, তারপর আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে পেছনে ঘুরে হাঁটতে শুরু করল। সে আনায়াকে চেপে ধরল না, কোনো জোর করল না, এমনকি উত্তর শোনার জন্যও দাঁড়িয়ে রইল না।

 

আনায়া স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তাহসিনের এই স্বাভাবিক বিদায় নেওয়াটাই যেন তার পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রমাণ ছিল। আনায়ার মন ভেঙে যাওয়া বিশ্বাসের কাচগুলো যেন আবার জোড়া লাগার একটা মৃদু আভাস পেল।

 

সেই সন্ধ্যার পর থেকে তাহসিন আর আনায়াকে বিরক্ত করেনি। কিন্তু ভাগ্য তাদের আবার মুখোমুখি করল কয়েক সপ্তাহ পর, একটা যৌথ সামাজিক অনুষ্ঠানে। সেখানে তাহসিনকে দূর থেকে অন্য সবার সাথে স্বাভাবিকভাবে হাসিমুখে কথা বলতে দেখল আনায়া। তাহসিন এক মুহূর্তের জন্যও আনায়ার ওপর নিজের দৃষ্টি আটকে রাখেনি বা তার দিকে ধাবিত হয়নি। তার এই স্বাবলম্বী ও পরিপক্ব আচরণ আনায়াকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করতে লাগল।

 

অনুষ্ঠান শেষে যখন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হলো, আনায়া গাড়ির জন্য বাইরে অপেক্ষা করছিল। তাহসিন তার ছাতাটি নিয়ে এগিয়ে এসে আনায়ার মাথার ওপর ধরল, তবে নিজে ভিজে রইল বৃষ্টির পানিতে।

 

"আজ অনেক রাত হয়েছে, আনায়া। ট্যাক্সি পেতে কষ্ট হবে। তুমি চাইলে আমি তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে পারি। তবে তুমি না চাইলে আমি একটা ক্যাব ডেকে দিচ্ছি," তাহসিন অত্যন্ত সাধারণ ও ভদ্রভাবে বলল।

 

আনায়া তাহসিনের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে আর কোনো ভয়ের হিংস্রতা নেই, আছে শুধু এক গভীর শ্রদ্ধা।

 

"আমি তোমার সাথেই যাব, তাহসিন," আনায়া মৃদুকণ্ঠে বলল।

 

গাড়িতে পাশাপাশি বসে দীর্ঘদিনের জমে থাকা নিস্তব্ধতা ভাঙতে লাগল। তাহসিন খুব স্বাভাবিকভাবে গল্প করতে লাগল তার পরিবর্তন, তার নতুন জীবনভাবনা আর আনায়াকে ছাড়া কাটানো বিষাদময় দিনগুলোর কথা নিয়ে—তবে কোনো প্রকার সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা ছাড়াই।

 

আনায়ার অ্যাপার্টমেন্টের সামনে যখন গাড়ি থামল, আনায়া গাড়ি থেকে না নেমে চুপ করে বসে রইল। বৃষ্টির ছাঁট গাড়ির কাচে তীব্র আঘাত করছিল।

 

"ধন্যবাদ, তাহসিন," আনায়া বলল।

 

"ধন্যবাদ তোমাকে, আমাকে এতটুকু কথা বলার সুযোগ দেওয়ার জন্য," তাহসিন মিষ্টি একটা হাসি দিল।

 

আনায়া আর নিজের ভেতরের সুপ্ত অনুভূতিগুলোকে ধরে রাখতে পারল না। তাহসিনের এই নতুন রূপ, তার এই শালীনতা আর আত্মনিয়ন্ত্রণ আনায়ার মনের কোণে লুকিয়ে থাকা সেই পুরোনো ভালোবাসার আগুনকে আবার জ্বালিয়ে দিল। সে বুঝল, তাহসিন সত্যিই নিজেকে বদলে ফেলেছে।

 

"তুমি কি ভেতরে আসবে না?" আনায়া নিচু গলায় বলল, তার চোখে এক নতুন আমন্ত্রণ।

 

তাহসিন আনায়ার দিকে তাকাল। আনায়ার চোখের সেই গভীর তৃষ্ণা আর আমন্ত্রণ চিনতে তার ভুল হলো না। তবে এবার আর কোনো উগ্রতা বা জোর জবরদস্তি ছিল না।

 

আনায়ার অ্যাপার্টমেন্টে ঢোকার পর ঘরের ভেতরের পরিবেশটা থমথমে হয়ে উঠল। বাতির ডিম লাইটের আলোয় ঘরের আবহাওয়া এক গভীর মাদকতায় ভরে উঠল। ভিজে যাওয়া কাপড় থেকে বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছিল আনায়ার ঘাড়ে।

 

তাহসিন ছাতাটা একপাশে রেখে আনায়ার খুব কাছে এসে দাঁড়াল। সে হাত বাড়াল, কিন্তু আনায়ার অনুমতি ছাড়া তাকে ছুঁল না। "আমি কি তোমাকে স্পর্শ করতে পারি, আনায়া?"

 

এই একটি প্রশ্ন আনায়ার হৃদয়ে গভীর দোলা দিল। যে পুরুষটি একসময় অধিকারের নামে তাকে জোর করত, আজ সে অনুমতির অপেক্ষা করছে। আনায়া কোনো কথা না বলে তাহসিনের শার্টের কলার ধরে তাকে নিজের দিকে টেনে আনল।

 

পরমুহূর্তেই শুরু হলো তাদের পুনর্মিলনের এক তীব্র, গভীর ও কামনাময় অধ্যায়। তবে এই স্পর্শে কোনো হিংসা বা ভয়ের উত্তাপ ছিল না; এতে ছিল এতদিন দূরে থাকার তীব্র আকুলতা আর এক গভীর আত্মসমর্পণ। তাহসিন আনায়ার ভেজা ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মেলাল। এবার সেই চুমুতে ছিল অপার প্রেম, ব্যাকুল তৃষ্ণা আর এক গভীর সুর।

 

তাহসিনের হাত দুটো আনায়ার শাড়ির আঁচল সরিয়ে তার নগ্ন পিঠে নেমে এল। আনায়ার শরীরের প্রতিটি কোণে জ্বলে উঠল বাসনার চরম শিখা। তাহসিন আনায়াকে আলতো করে তুলে নিয়ে বেডরুমের দিকে হেঁটে গেল। আনায়া নিজের দু'হাত দিয়ে তাহসিনের গলা জড়িয়ে ধরে তার ঘাড়ে গভীর চুমু আঁকল।

 

বিছানায় আনায়াকে শুইয়ে দিয়ে তাহসিন তার ওপরে ঝুঁকে পড়ল। কামনার তপ্ত নিঃশ্বাস দুজনের শরীরকে যেন এক অদৃশ্য আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছিল। তাহসিন অত্যন্ত নিপুণভাবে আনায়ার পোশাকের বন্ধনগুলো একে একে খুলে ফেলল। আনায়ার গাঢ় নগ্ন ত্বকে ঘরের আলো এসে পড়তেই তাহসিনের চোখ আনন্দে বিষাদ মিলিয়ে এক অদ্ভুত অনুভূতিতে ভরে উঠল। সে আনায়ার বুকের খাঁজে, তলপেটে আর উরুতে নিজের তপ্ত ঠোঁট ডুবিয়ে দিল।

 

আনায়া কামনার চরম শিখরে উঠে তাহসিনের নাম ধরে কোঁকাতে লাগল। তার হাতের নখগুলো তাহসিনের চওড়া পিঠে শক্ত হয়ে বসে গেল। কিন্তু এবার এই তীব্র শারীরিক মিলনের মাঝে আনায়া কোনো বন্দিদশা অনুভব করল না; সে অনুভব করল এক পরম মুক্তি। তাহসিনের শরীরের প্রতিটি নড়াচড়ায় ছিল প্রেম আর আনায়ার আনন্দের প্রতি অসীম খেয়াল। দুজন দুজনের শরীরের অতল গভীরে ডুবে গিয়ে সৃষ্টি করল এক অবিশ্বাস্য অনুভূতির ঝড়, যা ঘরের পরিবেশকে পূর্ণ করে তুলল এক আদিম ভালোবাসার মহাকাব্যে।

 

অনেক রাতে, যখন কামনার সেই ঝড় শান্ত হলো, তাহসিন আনায়াকে নিজের বুকের মাঝে সযত্নে জড়িয়ে রাখল। তবে এবার সে আনায়াকে শক্ত করে চেপে ধরল না, বরং তাকে নিজের মতো করে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দিল।

 

আনায়া তাহসিনের বুকে নিজের মুখ গুঁজে ফিসফিস করে বলল, "তুমি সত্যি বদলে গেছ, তাহসিন।"

 

তাহসিন আনায়ার চুলে একটা চুমু খেয়ে বলল, "আমি শুধু তোমাকে ভালোবাসতে শিখেছি, আনায়া। মুক্ত করে ভালোবাসতে শিখেছি।"

 

কিন্তু আনায়ার মনে কি এখনও কোনো সংশয় রয়ে গেছে? তারা কি পারবে তাদের এই নতুন সম্পর্ককে অতীতের সেই কালো ছায়া থেকে চিরতরে মুক্ত রাখতে? নাকি এই নতুন ভালোবাসার রূপ আরও কোনো বড় পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়াবে?

কামনা আর ভালোবাসার জোয়ারে ভেসে যাওয়া রাতের পর সকালের আলোটা যখন ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল, তখন আর পুরোনো সেই থমথমে বাতাস ছিল না। আনায়া চোখ মেলে দেখল তাহসিন পাশে নেই, তবে রান্নাঘর থেকে হালকা টুংটাং শব্দ আসছে। আনায়া গায়ে একটা হালকা চাদর জড়িয়ে ধীরপায়ে গিয়ে দাঁড়াল রান্নাঘরের দরজায়। তাহসিন খালি গায়ে, শুধু একটা ট্রাউজার পরে আনায়ার জন্য কফি বানাচ্ছে। তার পিঠে আনায়ার নখের গভীর দাগগুলো তখনও স্পষ্ট—যা কাল রাতের সেই ব্যাকুল কামনার সাক্ষ্য দিচ্ছে।

 

তাহসিন ঘুরে তাকাল। আনায়াকে দেখে তার মুখে ফুটে উঠল এক অপরূপ, শান্ত হাসি। সে এগিয়ে এসে কফির কাপটা আনায়ার হাতে দিল, তবে জোর করে তাকে কাছে টেনে নিল না।

 

"শুভ সকাল," তাহসিনের কণ্ঠে এক পরম পরিচিত মিষ্টি সুর।

 

আনায়া কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, "তুমি এত সকালে উঠেছ?"

 

"হ্যাঁ, ভাবলাম তোমার প্রিয় ব্ল্যাক কফিটা বানিয়ে রাখি। তবে তোমার যদি অন্য কোনো কাজ থাকে বা আজকে একা থাকতে চাও, আমি চলে যেতে পারি," তাহসিন খুব স্বাভাবিকভাবে বলল।

 

আনায়া থমকে গেল। একসময় যে পুরুষটি তাকে এক মুহূর্ত নিজের চোখের আড়াল হতে দিতে চাইত না, আজ সে কত সহজভাবে আনায়ার নিজস্ব সময়কে সম্মান জানাচ্ছে। আনায়া কফির কাপটা টেবিলে রেখে এগিয়ে গিয়ে তাহসিনের খালি বুকে নিজের কপাল ঠেকাল।

 

"আমি চাই না তুমি চলে যাও, তাহসিন। কিন্তু আমার ভেতরের ভয়টা পুরোপুরি মোছার জন্য আমাদের আরেকটু সময় দরকার," আনায়া সত্যিটা প্রকাশ করল।

 

তাহসিন আনায়ার চিবুকটা আলতো করে ধরে ওপরে তুলল। তার চোখে ছিল অগাধ গভীরতা। "আমি তোমাকে ততটা সময় দেব, যতটা তোমার প্রয়োজন, আনায়া। এবার আর কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো চাপ নেই।"

 

পরের কয়েকটা মাস ছিল তাদের সম্পর্কের আসল পুনর্গঠনের সময়। তাহসিন আর আগের মতো ঘনঘন ফোন করে খোঁজ নিত না, আনায়া কার সাথে কথা বলছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলত না। বরং সে আনায়াকে তার স্বপ্নের ক্যারিয়ার গড়তে পূর্ণ সমর্থন দিল। আনায়া যখন অফিসের কাজে অন্য শহরে যেত, তাহসিন তাকে দূর থেকে শুভকামনা জানাত, কিন্তু কখনোই তার ওপর সন্দেহের ছায়া ফেলেনি। সে প্রতিদিন নিজেকে প্রমাণ করছিল যে, তার ভালোবাসা এখন আর শিকল নয়, বরং ডানা।

 

একদিন রাতে আনায়ার অ্যাপার্টমেন্টের ছাদে দুজনে বসেছিল। আকাশে তখন আলো ছড়ানো এক মায়াবী পূর্ণিমা। হালকা ঠান্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছিল। তাহসিন আনায়ার পাশে বসে তার একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল।

 

আনায়া তাহসিনের কাঁধে মাথা রেখে বলল, "তুমি কীভাবে এত বদলে গেলে, তাহসিন? এত তীব্র ক্ষোভ আর ভয় তুমি কীভাবে জয় করলে?"

 

তাহসিন আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "তোমাকে হারানোর ওই চরম দিনটা আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, আনায়া—যে জিনিসটাকে আমরা ধরে রাখার জন্য জোর করি, সেটাই সবচেয়ে আগে ভেঙে যায়। আমি তোমাকে ভালোবাসতাম, কিন্তু তার চেয়ে বেশি ভালোবাসতাম নিজের অহংকার আর হারানোর ভয়কে। কিন্তু যখন কাউন্সিলিং শুরু করলাম, যখন নিজের ভেতরের দুর্বলতাগুলোকে মুখোমুখি দাঁড় করালাম, তখন বুঝলাম ভালোবাসা কোনো দখলদারি নয়। ভালোবাসা হলো এমন এক অনুভূতির নাম, যেখানে অন্য মানুষটি মুক্ত অনুভব করে।"

 

কথাগুলো বলতে বলতে তাহসিনের গলা কিছুটা ধরে এল। সে আনায়ার দিকে ঘুরে বসল। আনায়ার শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ছিল, আর চাঁদের আলোয় তার মুখটা দেখাচ্ছিল এক অপ্সরীর মতো।

 

তাহসিনের চোখে আবার সেই পুরোনো আকুলতা জেগে উঠল, তবে এবার তাতে কোনো হিংস্রতা ছিল না—ছিল এক পবিত্র ও নিবিড় ফিসফিসানি। "আমি তোমাকে আবারও চাই, আনায়া। তবে বন্দি হিসেবে নয়, আমার জীবনের একমাত্র সঙ্গী হিসেবে।"

 

আনায়া আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তাহসিনের এই মানসিক রূপান্তর, তার সততা আর এই দীর্ঘ সময়ের ধৈর্য আনায়ার হৃদয়ের সব দ্বিধা এক নিমেষে চুরমার করে দিল। সে তাহসিনের শার্টের বোতামগুলো একে একে খুলতে লাগল।

 

চাঁদের আলোর নিচে, ছাদের সেই নির্জন কোণে দুজন আবার এক হলো। তবে এই মিলন ছিল আগের সব মিলনের চেয়ে আলাদা। এতে কোনো তাড়া ছিল না, ছিল না কোনো হারানোর ভয়। তাহসিন আনায়ার নগ্ন গায়ে নিজের ঠোঁট দিয়ে ভালোবাসার কাব্য লিখতে লাগল। আনায়ার উরু, কোমর আর গলার খাঁজে তাহসিনের উষ্ণ স্পর্শ আগুনে জ্বালিয়ে দিল কামনার পরম আনন্দ।

 

আনায়া তাহসিনের পিঠ আঁকড়ে ধরে নিজের সমস্ত সত্তা সঁপে দিল তার মাঝে। রাতের নিস্তব্ধতা চিরে দুজনের ঘন নিঃশ্বাস আর আনন্দের গোঙানি এক অদ্ভুত সুর তৈরি করল। দেহের সাথে দেহের এই পরম মিশেল তাদের মন দুটোকেও চিরতরে এক সূত্রে গেঁথে দিল। কামনার চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে আনায়া তাহসিনের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, "আমি আবার তোমার হতে চাই, তাহসিন। কারণ এবার আমি মুক্ত।"

 

পরের সপ্তাহে তারা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিল। কোনো বিশাল জমকালো আয়োজন নয়, শুধু প্রিয় কয়েকজন মানুষকে নিয়ে এক সাধারণ ঘরোয়া পরিবেশে তাদের বিয়ে হলো।

 

বিয়ের পর প্রথম রাতে, যখন তাহসিন আর আনায়া তাদের নতুন সাজানো বেডরুমে একা হলো, তখন চারপাশজুড়ে এক গভীর প্রশান্তি। তাহসিন এগিয়ে এসে আনায়ার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল।

 

"এখনো কি তোমার ভয় করে, আনায়া?" তাহসিন নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল।

 

আনায়া হেসে তাহসিনের ঠোঁটে একটা গভীর ও উষ্ণ চুমু এঁকে দিল। "না, তাহসিন। এখন আর কোনো ভয় নেই। কারণ আমি জানি, তুমি আমাকে বন্দি করোনি, তুমি আমাকে ভালোবাসতে শিখেছ।"

 

তাহসিন আনায়াকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। জানালার বাইরে তখন ভোরের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করেছে। সেই আলোর সুতোয় লেখা হলো তাদের এক নতুন গল্প—যেখানে আর কোনো সন্দেহ নেই, কোনো হিংসা নেই, আছে শুধু অসীম বিশ্বাস আর মুক্ত আকাশের মতো এক অসীম ভালোবাসা।

....
👁 12