বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে এসেছিল। ঢাকার রাজপথ ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাওয়া শ্রাবণের এক সন্ধ্যায়, গুলশানের ছোট ফ্ল্যাটটিতে তখন নীরবতার পাহাড় জমেছিল। ঘরের কোণে ডিম লাইটের ঝাপসা আলোয় ফুটে উঠছিল দুই যুবকের ছায়া—ইহান আর নেহা। বহু রাতের মতো আজকেও তাদের মধ্যে ঝগড়াটা তুঙ্গে উঠেছে। কিন্তু আজকের ঝগড়ার ধরনটা অন্যদিনের মতো নয়। এতে কোনো চিৎকার নেই, আছে এক ধরনের পাথর চাপা হাহাকার।
নেহা সোফায় বসেছিল, হাত দুটো হাঁটুর ওপর শক্ত করে বাঁধা। তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ, অশ্রুর সজল রেখা গাল বেয়ে নেমে চিবুকে জমে আছে। ইহান ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হেঁটে বেড়াচ্ছিল, তার লম্বা চুলগুলো কিছুটা উস্কোখুস্কো, পরনের টি-শার্টের হাতা কিছুটা গোটানো।
"তুমি বিশ্বাস করো নেহা, আমি ইচ্ছা করে দেরি করিনি," ইহান গলার স্বর কিছুটা নিচে নামিয়ে বলল, যেন সে শেষবারের মতো একটা চেষ্টা করছে।
"ইহান, সমস্যা তো শুধু দেরি করা নিয়ে নয়," নেহা চোখ তুলে তাকাল। তার কণ্ঠে যে শীতলতা ছিল, তা ইহানের বুকের ভেতর তীরের মতো বিঁধল। "সমস্যা হলো তোমার মানসিকতা। আমরা গত চার বছর ধরে একই চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছি। একবার তীব্র প্রেম, তারপর সন্দেহ, ঝগড়া, আর তারপর আবার বিচ্ছেদ। আমি আর পারছি না ইহান। আমার শরীরের প্রতিটি রন্ধ্র, প্রতিটি স্নায়ু এখন ক্লান্ত।"
"আমাদের ভালোবাসা কি তবে এতই সস্তা নেহা?" ইহান এগিয়ে এসে নেহার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। সে নেহার দুটো হাত নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় নিল। "আমরা কি কম ভালোবাসি একে অপরকে? বল?"
"ভালোবাসা আছে বলেই তো এত কষ্ট ইহান," নেহা হাত দুটো ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে মৃদুস্বরে বলল। "কিন্তু শুধু ভালোবাসা দিয়ে একটা সম্পর্ক টিকে থাকে না। সম্মান কোথায়? পারস্পরিক বিশ্বাস কোথায়? তুমি যখন রেগে যাও, তখন ভুলে যাও আমি তোমার কত কাছের। আর আমি যখন রেগে যাই, আমি ভুলে যাই তুমি আমার জীবনের কতটা জুড়ে আছ।"
ইহান থমকে গেল। নেহার চোখে সে আজ এক অদ্ভুত শূন্যতা দেখতে পাচ্ছিল। এর আগের প্রতিটা ঝগড়ায় নেহার চোখে রাগ থাকত, অভিমান থাকত, কিন্তু আজ সেখানে শুধু এক প্রকাণ্ড সিদ্ধান্ত। নেহা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
"আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি ইহান। এবার সত্যিই সব শেষ। আমরা আর একসাথে থাকতে পারি না।"
কথাটা বলেই নেহা ব্যালকনির দিকে হেঁটে গেল। বাইরের ঠান্ডা বাতাস তার উড়ন্ত চুলে দোলা দিচ্ছিল। ইহান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছু মুহূর্ত। তার মস্তিষ্ক কাজ করছিল না। নেহা ছাড়া তার জীবন? যে মেয়েটি চার বছর ধরে তার নিঃশ্বাসের সাথে জড়িয়ে আছে, তাকে ছাড়া সে কীভাবে বাঁচবে? এক তীব্র উন্মাদনা ইহানের পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। সে ধীর পায়ে ব্যালকনির দরজায় গিয়ে দাঁড়াল।
বৃষ্টির ঝাটকা এসে নেহার সুতি কামিজ ভিজিয়ে দিচ্ছিল। কাপড়ের পাতলা আস্তরণ নেহার পিঠের সাথে লেপ্টে গিয়ে তার শরীরের নিখুঁত খাঁজ ফুটিয়ে তুলেছিল। ইহান পেছন থেকে গিয়ে নেহাকে জড়িয়ে ধরল। দুটো শক্ত বাহু নেহার পেটের ওপর চেপে বসল, আর ইহানের বুক লেপ্টে গেল নেহার ভেজা পিঠে।
"ইহান, ছাড়ো আমাকে..." নেহা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু তার কন্ঠ কেঁপে উঠল।
"পারব না ছাড়তে," ইহানের উষ্ণ নিঃশ্বাস নেহার ঘাড়ের পেছনে আছড়ে পড়ল। তার ঠোঁট ছুঁয়ে গেল নেহার কানের লতি। "তুমি আমাকে ছেড়ে যেতে পারো না নেহা। তোমার শরীরের প্রতিটি কণা জানে তুমি শুধু আমার।"
নেহার হৃদস্পন্দন দ্রুত হতে শুরু করল। ইহানের এই স্পর্শ তার খুব পরিচিত, আবার ভীষণ বিপজ্জনক। সে যখনই নেহাকে ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, ইহানের এই তীব্র আকর্ষণ তাকে বারবার দুর্বল করে দেয়। ইহান নেহাকে ঘুরিয়ে নিজের দিকে মুখ করাল। বৃষ্টির ফোঁটা নেহার ঠোঁটে এসে জমেছিল। ইহান কোনো কথা না বলে নেহার ভেজা ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল।
সে এক তীব্র, উন্মত্ত চুম্বন। চার বছরের জমে থাকা সমস্ত রাগ, অনুরাগ, যন্ত্রণা আর তৃষ্ণা যেন সেই একটি চুম্বনে গলে জল হয়ে যাচ্ছিল। নেহা প্রথমে পিছু হঠতে চেয়েছিল, ইহানের বুকে হাত দিয়ে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ইহানের বাহুর বাঁধন ছিল লোহার মতো শক্ত। ইহানের জিব যখন নেহার ঠোঁটের সীমানা পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল, নেহার সব প্রতিরোধ এক মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। নেহার হাতের আঙুলগুলো ইহানের চুলে আটকে গেল, সেও তীব্র আবেগে সাড়া দিতে শুরু করল।
বৃষ্টির জলের সাথে মিশে গেল তাদের উথলে ওঠা শারীরিক তৃষ্ণা। ইহান এক হাতে নেহার কোমর পেঁচিয়ে ধরে তাকে তুলে নিল আর অন্য হাতে নেহার সুতি কামিজের রেশমি কাপড় টেনে কিছুটা নামিয়ে দিল। তার ঠোঁট নেমে এল নেহার গলার ভাঁজে, তারপর ধীরে ধীরে নেমে গেল বুকের ওপরের উন্মুক্ত অংশে। সেখানে প্রতিটি স্পর্শে আগুন জ্বলছিল। নেহার মুখ থেকে এক হালকা সুখানভূতির শব্দ বের হয়ে এল, সে নিজের চোখ দুটো বুজে ইহানের চুলে মুখ লুকাল।
"তুমি শুধুই আমার, নেহা..." ইহান নেহার কানে কিসকিস করে বলল, তার হাত ততক্ষণে নেহার কোমরের ভাঁজে মেতে উঠেছে ব্যাকুল খেলায়। নেহার কামিজের ভেজা কাপড় আর তাদের শরীরের উত্তাপ মিলেমিশে এক অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি করেছিল। ইহান নেহার পপলিন কাপড়ের নিচে হাত গলিয়ে তার উরুর কোমল চামড়ায় নিজের আঙুলের ছোঁয়া দিল।
সোফায় এনে ইহান নেহাকে শুইয়ে দিল। ঘরের আলো-আঁধারিতে নেহার শরীরের প্রতিটি মোচড় ইহানের ভেতরের কামনাকে আরও বাড়িয়ে তুলছিল। সে নেহার ওপর ঝুঁকে পড়ল, তার বুকের ভারী নিঃশ্বাস নেহার উন্মুক্ত পেটে আছড়ে পড়ছিল। নেহার শাড়ির আঁচল বা কামিজের বাঁধন ততক্ষণে আলগা হয়ে গেছে। ইহানের ঠোঁট এবার নেমে এল নেহার তলপেটে। নেহার শরীরটা ধনুকের মতো বেঁকে উঠল। আনন্দের এক তীব্র অনুভূতি নেহার পুরো মেরুদণ্ড বেয়ে মস্তিষ্কে পৌঁছে গেল।
ইহান নেহার উরুর খাঁজে নিজের মুখ গুঁজে দিল, তার উগ্র স্পর্শে নেহা নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট পাচ্ছিল। "ইহান... আঃ... না..." নেহা মুখ দিয়ে অসমাপ্ত বাক্য বের হলেও সে ইহানকে সরিয়ে দিচ্ছিল না, বরং নিজের অজান্তেই ইহানের মাথাটা আরও শক্ত করে নিজের শরীরের সাথে চেপে ধরছিল। তাদের দুটো ভেজা শরীর তখন এক তীব্র কামনার আগুনে পুড়ছিল। কিন্তু এই কামনার গভীরে কোথাও যেন লুকিয়ে ছিল এক বুক ভাঙা কষ্ট।
দেড় ঘণ্টার তীব্র শারীরিক অনুভূতির পর, যখন সব নিস্তব্ধ হয়ে এল, তখন ঘরের ভেতর শুধু দুটো মানুষের ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। নেহা সোফায় শুয়েছিল, তার শাড়ি এলোমেলো, বুকের কাপড় সরে যাওয়া। ইহান পাশে বসে তার কপালে হাত রাখছিল।
হঠাৎ করেই নেহার চোখ থেকে আবার জল গড়িয়ে পড়ল। সে ধীরে ধীরে উঠে বসল এবং নিজের এলোমেলো পোশাক ঠিক করতে শুরু করল।
"তুমি আবার সেটাই করলে ইহান," নেহার গলা ধরে এল। "শারীরিক আকর্ষণ আর কামনাক দিয়ে তুমি আবার আমাদের আসল সমস্যাটাকে ঢেকে দিতে চাইলে। কিন্তু কাল সকালে যখন সূর্য উঠবে, তখন ঝগড়াটা আবার ফিরে আসবে। সন্দেহটা আবার ফিরে আসবে।"
ইহান চমকে তাকাল, "নেহা, আমি তোমাকে ভালোবাসি!"
"কিন্তু তুমি আমাকে সম্মান করো না ইহান," নেহা সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার চেহারায় এখন এক অদ্ভুত স্থিরতা। "আর আমিও নিজেকে সম্মান করি না যখনই তোমার এই স্পর্শের কাছে আত্মসমর্পণ করি। এই শরীরী প্রেম আমাদের সম্পর্ককে আর বাঁচাতে পারবে না।"
নেহা ভেজা চুলে খোপা বাঁধল। তার ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
"নেহা, শোনো! বাইরে এখনো বৃষ্টি হচ্ছে, তুমি এখন কোথায় যাবে?" ইহান পিছু পিছু দৌড়ে এল।
নেহা দরজার হ্যান্ডেলে হাত রেখে একবার পেছন ফিরে তাকাল। তার চোখে তখন আর কোনো অশ্রু ছিল না, শুধু ছিল এক কঠিন বাস্তবতার ছাপ। "আমি আর কোনোদিন ফিরে আসব না ইহান। আমরা দুজনেই বিষাক্ত হয়ে গেছি। ভালোবাসা মানে শুধু এক বিছানায় আসা নয়, ভালোবাসা মানে একে অপরকে শান্তিতে বাঁচতে দেওয়া। আমরা সেটা পারছি না।"
কথাটা শেষ করেই নেহা দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল। বাইরের সিঁড়ি দিয়ে তার নেমে যাওয়ার জুতো জোড়ার শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
ইহান খোলা দরজার সামনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বাইরে তখনও অবিশ্রান্ত ধারায় বৃষ্টি পড়ছে। তার ভেজা শরীর এখন ঠান্ডা হয়ে আসছে। তার মনে হতে লাগল, সে শুধু নেহাকে হারায়নি, সে নিজের অস্তিত্বের একটা বড় অংশ আজ হারিয়ে ফেলল। ঘরের ভেতরের আলোটা আরও ঝাপসা হয়ে এল, আর একা ইহান মেঝেতে বসে নিজের হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে রইল, যে হাত দুটো কিছুক্ষণ আগেও নেহাকে ধরে রাখতে চেয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলো।
নেহা চলে যাওয়ার পর ছয়টি মাস কীভাবে কেটেছিল, তা ইহান নিজেও বলতে পারে না। গুলশানের সেই ফ্ল্যাটটি এখন আর আগের মতো প্রাণবন্ত নেই। চারপাশের দেয়ালগুলো যেন এক একটি নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাদের পুরনো স্মৃতির। ইহান নিজেকে ঘরের মধ্যে বন্দি করে ফেলেছিল। শুরুর দিকে সে মদ আর সিগারেটের ধোঁয়ায় নিজের যন্ত্রণা ভোলার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু প্রতি রাতে যখন সে নেহার শূন্য সোফাটার দিকে তাকাত, তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যেত।
ইহান প্রথমবার নিজের ভেতরের অহংকার আর রুগ্ন মানসিকতাকে দেখতে পেল। সে অনুধাবন করল, নেহা একদম ঠিক বলেছিল—সে নেহাকে ভালোবেসেছিল সত্য, কিন্তু তাকে কোনোদিন একজন স্বাধীন মানুষ হিসেবে সম্মান জানায়নি। তার অতিরিক্ত অধিকারবোধ, অহেতুক সন্দেহ আর রাগের মাথায় কটু কথা বলাটাই ছিল তাদের সম্পর্কের আসল বিষ।
ছয় মাস পর, ইহান সিদ্ধান্ত নিল সে আর এভাবে নিজেকে ধ্বংস হতে দেবে না। সে যদি নেহাকে সত্যি ভালোবাসে, তবে তাকে নিজেকে আগে একজন সুস্থ ও পরিপক্ব মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সে তার পুরানো চাকরি ছেড়ে দিয়ে নতুন এক আইটি ফার্মে যোগ দিল, নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাইকোলজিস্টের কাছে কাউন্সিলিং শুরু করল এবং নিয়মিত জিম ও বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলল। সে বুঝতে পারল, কাউকে ধরে রাখার নাম ভালোবাসা নয়, নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তোলার নামই ভালোবাসা।
অন্যদিকে, নেহা তখন ধানমন্ডিতে তার নিজের ছোট্ট ফ্ল্যাটে সম্পূর্ণ একা। ইহানকে ছেড়ে আসা তার জন্য সহজ ছিল না। প্রতি রাতে বালিশে মুখ গুঁজে সে কেঁদেছে। ইহানের স্পর্শের উত্তাপ, তার গায়ের চেনা সুবাস তাকে বারবার পাগল করে তুলত। কিন্তু নেহা জানত, সে যদি আবার সেই বিষাক্ত চক্রে ফিরে যায়, তবে তাদের দুজনকেই ধ্বংস হতে হবে। সে নিজেকে কাজের মধ্যে ডুবিয়ে দিয়েছিল। একটি খ্যাতনামা আর্কিটেকচারাল ফার্মে তার পদোন্নতি হয়েছিল, কিন্তু কাজের শেষে যখন সে একা ঘরে ফিরত, তার সমস্ত মন জুড়ে শুধুই ইহানের স্মৃতি ঘুরে বেড়াত।
অবশেষে, এক সোনালী শরতের বিকেলে তাদের আবার দেখা হলো। ধানমন্ডির এক শান্ত ক্যাফেতে ইহান তাকে ডেকেছিল। নেহা বেশ কিছুক্ষণ দ্বিধা করার পর রাজী হয়েছিল।
ক্যাফেটার এক কোণে বসেছিল ইহান। পরনে হালকা নীল রঙের শার্ট, চুলগুলো পরিপাটি করে ছাঁটা, আর চোখে এক ধরণের অদ্ভুত স্থিরতা। নেহা ক্যাফেতে ঢুকতেই ইহান উঠে দাঁড়াল।
"কেমন আছ নেহা?" ইহানের গলায় কোনো তাড়া ছিল না, ছিল না কোনো অধিকার ফলানোর চেষ্টা।
"ভালো। তুমি?" নেহা চেয়ার টেনে বসল। সে লক্ষ্য করল, ইহানের চেহারায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। সেই অধৈর্য আর হিংস্র ভাবটা আর নেই, তার জায়গায় এসেছে এক গভীর প্রশান্তি।
"আমিও ভালো হওয়ার চেষ্টা করছি," ইহান মৃদু হেসে বলল। "আমি তোমাকে কোনো পুরানো কথা বলতে বা ক্ষমা চাইতে ডাকি নি নেহা। আমি শুধু তোমাকে জানাতে চেয়েছিলাম, তোমার সেই দিনের সিদ্ধান্তটা একদম সঠিক ছিল। তুমি না চলে গেলে আমি কোনোদিন বুঝতে পারতাম না আমি কতটা ভুল ছিলাম।"
নেহা অবাক হয়ে ইহানের দিকে তাকিয়ে রইল। যে ইহান কোনোদিন নিজের ভুল স্বীকার করত না, সে আজ কত সহজভাবে কথাটা বলল!
চা আর স্ন্যাকসের সাথে তাদের কথা এগোতে লাগল। কোনো ঝগড়া নেই, কোনো ক্ষোভ নেই—যেন দুটো অচেনা মানুষ নতুন করে একে অপরকে জানার চেষ্টা করছে। ক্যাফে থেকে বের হওয়ার সময় সন্ধ্যা নেমে এসেছে। আকাশে হালকা মেঘের আনাগোনা।
"তোমাকে কি পৌঁছে দেব?" ইহান শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল।
"হাঁটা যাক না কিছুটা পথ," নেহা বলল।
তারা ধানমন্ডি লেকের পাশ দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। নির্জন এক গাছের ছায়ায় এসে নেহা থামল। বাতাসের দোলায় নেহার সুতির শাড়ির আঁচল উড়ছিল। ইহান শান্ত চোখে তার দিকে তাকাল। সেই চোখে আর আগের মতো কোনো হিংস্র তৃষ্ণা ছিল না, ছিল এক গভীর শ্রদ্ধা আর অপরিসীম মায়া।
নেহার বুকের ভেতরটা হঠাৎ হাহাকার করে উঠল। সে এই পরিবর্তন দেখতে চেয়েছিল, এই সুস্থ মানুষটাকে ভালোবাসতে চেয়েছিল। নেহা নিজেই এক ধাপ এগিয়ে এসে ইহানের খুব কাছে দাঁড়াল।
"তুমি সত্যি অনেক বদলে গেছ, তাই না ইহান?" নেহার গলাটা কেঁপে উঠল।
"তোমার জন্য বদলেছি নেহা। কিন্তু এই বদলটা আমার নিজেরও দরকার ছিল," ইহান মৃদু স্বরে বলল।
নেহা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে হাত বাড়িয়ে ইহানের শার্টের কলার চেপে ধরল এবং তার বুকে নিজের মাথাটা গুঁজে দিল। ছয় মাসের জমে থাকা শূন্যতা আর তৃষ্ণা এক মুহূর্তে বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এল। ইহান শক্ত করে তাকে নিজের বাহুডোরে জড়িয়ে নিল। তবে এবারের জড়ানোয় কোনো জোর ছিল না, ছিল শুধু আগলে রাখার আকুলতা।
ইহান নেহার মুখটা ওপরে তুলল। অন্ধকার ঘনিয়ে আসা গাছের ছায়ায় নেহার ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল। ইহান আস্তে আস্তে তার ঠোঁট নামিয়ে আনল নেহার ঠোঁটে।
এবারের চুম্বনটা আগের মতো উত্তাল বা হিংস্র ছিল না। এতে ছিল এক গভীর অনুতাপ, সহমর্মিতা আর খাঁটি তৃষ্ণা। ইহানের ঠোঁটের কোমল স্পর্শে নেহা নিজেকে হারিয়ে ফেলতে লাগল। সে ইহানের পিঠের মাংসপেশি শক্ত করে চেপে ধরল। ইহান তার এক হাত নেহার কোমরের ভাঁজে রেখে তাকে আরও কাছে টেনে নিল, অন্য হাতের আঙুলগুলো গলিয়ে দিল নেহার রেশমি চুলে।
নেহার শাড়ির আঁচলটা খসে মাটিতে পড়ে গেল। ইহানের উত্তপ্ত ঠোঁট নেহার থুতনি বেয়ে তার গলার খাঁজে নেমে এল। সেখানে প্রতিটি চুম্বনে যেন এক নতুন জীবনের অঙ্গীকার ছিল। নেহা চোখ বন্ধ করে ইহানের ছোঁয়া উপভোগ করছিল। ইহানের হাত ধীরে ধীরে নেহার পিঠের উন্মুক্ত অংশে নেমে এল, ব্লাউজের ফিতা পার হয়ে তার আঙুলগুলো নেহার নরম চামড়ায় আগুনের মতো আঁচ এনে দিল।
"ইহান..." নেহা ফিসফিস করে বলল, তার নিঃশ্বাসের উত্তাপ ইহানের কানে আছড়ে পড়ল। "আমি তোমাকে কত যে মিস করেছি..."
ইহান নেহাকে আরও গভীরে জড়িয়ে ধরল। তার ঠোঁট আবার নেমে এল নেহার বুকের ওপরের অংশটিতে, ব্লাউজের ওপর দিয়েই সে নেহার বুকের উঠানামাকে অনুভব করতে লাগল। নেহার শরীর জুড়ে অনুভূতির শিহরণ বয়ে গেল, সে উরু দুটো শক্ত করে ইহানের শরীরের সাথে সেঁটে দিল। লেকের ধারের সেই শান্ত অন্ধকারে দুটো হৃদয় এক হয়ে ধুকধুক করছিল। ইহান নেহার তলপেটে হাত রেখে তার কানের কাছে মুখ এনে বলল, "আমি আর কোনোদিন তোমাকে কষ্ট দেব না নেহা। এবার যদি শুরু হয়, তবে তা ভালোবাসার মান রেখে হবে।"
নেহা ইহানের চুলে মুখ গুঁজে এক তীব্র আবেগে তাকে জড়িয়ে ধরে রাখল। তারা দুজনেই বুঝতে পারছিল, তাদের শরীরের এই আগুন এখন আর শুধু কামনার নয়, এটি তাদের পুনর্জন্মের আগুন।
শরতের সেই সন্ধ্যার পর থেকে ইহান আর নেহার জীবন একদম অন্য এক খাতে বইতে শুরু করল। তারা প্রতিদিন দেখা করত না, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে ঝগড়া বা অযথা অধিকার ফলানোর খেলাতেও মাতত না। এবার তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—সম্পর্ককে স্বাভাবিক গতিতে এগোতে দিতে হবে, কোনো তাড়াহুড়ো বা উগ্র আবেগ দিয়ে নয়।
তিনটি মাস কেটে গেল। এই তিন মাসে নেহা লক্ষ্য করল, ইহান সত্যি বদলে গেছে। নেহার কাজের ব্যস্ততা, তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি এবং তার সিদ্ধান্তকে ইহান এখন মন থেকে সম্মান করে। আবার নেহাও নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিল; অতিরিক্ত সন্দেহ আর হুটহাট বিচ্ছেদের হুমকি দিয়ে সে-ও কম কষ্ট দেয়নি ইহানকে। দুজনেই নিজেদের ভাঙা অংশগুলোকে জোড়া লাগিয়ে এক নতুন, পরিপক্ব মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিল।
এক শুক্রবারের সকালে ইহান নেহাকে প্রস্তাব দিল কক্সবাজার যাওয়ার। তবে কোনো বিলাসবহুল ফাইভ স্টার হোটেল নয়, ইনানীর এক নিরিবিলি কটেজে, যেখানে শুধুই সমুদ্রের গর্জন আর তারা দুজন থাকবে। নেহা কোনো দ্বিধা ছাড়াই রাজী হয়ে গেল।
কটেজটি ছিল একদম সমুদ্রের পাড়ে। কাঠের তৈরি ছোট দোতলা বাড়ি, যার ব্যালকনিতে দাঁড়ালে বিশাল বঙ্গোপসাগর আর ঢেউয়ের ফেনা চোখে পড়ে। সন্ধ্যায় যখন সূর্যটা সমুদ্রের নীল বুকে ডুবে যাচ্ছিল, তখন আকাশে নেমে এসেছিল লালচে-বেগুনি রঙের এক অপূর্ব মায়াজাল।
নেহা ব্যালকনির রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। পরনে হালকা বেগুনি রঙের একটি শিফন শাড়ি, চুলগুলো খোলা, বাতাসের সাথে আনন্দে নাচছিল। ইহান পেছন থেকে এসে দাঁড়াল। হাতে দুটো কফির মগ। সে একটি মগ নেহার দিকে বাড়িয়ে দিল।
"কক্সবাজারের সূর্যস্ত এত সুন্দর, আগে কখনও এভাবে খেয়াল করিনি," নেহা কফিতে চুমুক দিয়ে বলল।
"কারণ তুমি আগে সমুদ্র দেখতে আসনি নেহা, আসতে নিজের ভেতরের অশান্তি আর কোলাহল সাথে নিয়ে," ইহান শান্ত কণ্ঠে বলল। "আজ তোমার মন শান্ত, তাই চারপাশের সৌন্দর্যও তোমাকে স্পর্শ করছে।"
নেহা ইহানের দিকে তাকাল। সত্যি, ইহানের এই গভীর, পরিপক্ব কথাগুলো এখন নেহার মন ছুঁয়ে যায়। কফির মগ দুটো পাশে টেবিলের ওপর রেখে ইহান নেহার হাত দুটি নিজের হাতে নিল।
"নেহা, চার বছর আগে আমরা একে অপরকে ভালোবেসেছিলাম, কিন্তু সেই ভালোবাসায় অপরিণত মানসিকতা ছিল। আজ এই প্রকাণ্ড সমুদ্র আর নিঃসঙ্গ সন্ধ্যার সামনে দাঁড়িয়ে আমি তোমাকে আবার প্রস্তাব দিতে চাই। এবার কোনো আবেগি তাড়াহুড়ো নয়, সম্মান, শ্রদ্ধা আর আজীবন পাশে থাকার এক সুস্থ অঙ্গীকার নিয়ে। তুমি কি আমার স্ত্রী হয়ে আমার এই নতুন জীবনের সঙ্গী হবে?"
নেহার চোখে জল এসে গেল, কিন্তু এবার সেই জল কষ্টের নয়, অসীম আনন্দের। সে কোনো কথা বলতে পারল না, শুধু মাথা নেড়ে 'হ্যাঁ' জানাল।
ইহান নেহাকে বুকে টেনে নিল। সমুদ্রের গর্জনের সাথে সাথে তাদের নিঃশ্বাস এক হয়ে গেল। ব্যালকনি থেকে সরিয়ে ইহান নেহাকে কটেজের ঘরের ভেতরে নিয়ে এল। ঘরের কবাট বন্ধ হয়ে গেল, বাইরে শুধু থেকে গেল সাগরের মাতাল করা হাওয়া।
ঘরের কোণে মোমবাতির নরম, উষ্ণ আলো জ্বলছিল। ইহান ধীরে ধীরে নেহার শাড়ির আঁচলটা ধরে টান দিল। শাড়িটা নরম হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। মোমবাতির ঝাপসা আলোয় নেহার ফরসা শরীর যেন এক রূপালী নদীর মতো জলজল করে উঠল। নেহা কিছুটা লজ্জায় চোখ নিচু করতেই ইহান তার থুতনি ধরে মুখটা ওপরে তুলল।
"আজ আর কোনো সংশয় নেই নেহা, আজ শুধুই তুমি আর আমি," ইহান ফিসফিস করে বলল।
ইহান নেহার রেশমি ব্লাউজের ফিতা আর হুকগুলো একে একে আলগা করে দিল। কাপড়ের বাঁধন মুক্ত হতেই নেহার সুগঠিত বক্ষযুগল মুক্ত হয়ে উঠল। ইহান তার উষ্ণ ঠোঁট নামিয়ে আনল নেহার কলারবোনে। এক তীব্র শিহরণ নেহার পুরো শরীরে বিদ্যুতের মতো খেলে গেল। সে ইহানের পিঠের শক্ত মাংশের ওপর নিজের নখ ডেবে দিল।
ইহান নেহাকে তুলে নিয়ে বিছানার তুলতুলে তোশকে শুইয়ে দিল। নেহার পেটিকোটের বাঁধন আলগা হয়ে তার উরু ও কোমরের খাঁজ পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে পড়ল। ইহান তার নিজের শার্ট খুলে ছুড়ে ফেলে দিল ঘরের কোণে। দুটো উলঙ্গ প্রায় শরীর যখন একে অপরের সাথে লেপ্টে গেল, ঘরের উত্তাপ এক মুহূর্তে দ্বিগুণ হয়ে গেল।
ইহানের ঠোঁট নেহার ঠোঁটে এক গভীর, অনন্ত চুম্বনে হারিয়ে গেল। সেই চুম্বনে ছিল দীর্ঘদিনের তৃষ্ণা আর এক হওয়ার আকুলতা। ইহানের হাত ধীরে ধীরে নেহার ভেজা উরুর খাঁজে নেমে এল, তার আঙুলের সুনিপুণ ছোঁয়ায় নেহা ছটফট করে উঠল।
"ইহান... আমি আর সহ্য করতে পারছি না..." নেহা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, তার বুকের গভীর ওঠানামা ইহানের খালি বুকে লেপ্টে যাচ্ছিল।
ইহান নেহার উরু দুটো দুই দিকে ছড়িয়ে দিয়ে তার ওপর পুরোপুরি ঝুঁকে পড়ল। তাদের কামনার চূড়ান্ত শিখায় পৌঁছে দুটো শরীর একাকার হয়ে গেল। সমুদ্রের ঢেউ যেমন তীরের ওপর আছড়ে পড়ে, তেমনি তাদের শরীরী মিলনে ভালোবাসার এক অভূতপূর্ব ঝড় বয়ে গেল। নেহার কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসা হালকা অনুভূতির গুঞ্জন আর ইহানের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দে ঘরটি ভরে উঠল। ইহানের প্রতিটি উগ্র অথচ মায়াবী চালনে নেহা যেন স্বর্গের আনন্দ খুঁজে পাচ্ছিল। তার আঙুলগুলো ইহানের চুল আর পিঠে গভীর আঁচড় কেটে দিচ্ছিল।
বেশ কিছুটা সময় ভালোবাসার সেই উত্তাল সাগরে ভেসে চলার পর, যখন শারীরিক আর মানসিক তৃপ্তির চূড়ান্ত শিখা শান্ত হলো, তারা দুজনেই এক গভীর প্রশান্তিতে ঢলে পড়ল।
নেহা ইহানের চওড়া বুকের ওপর মাথা রেখে শুয়েছিল। তার এলোমেলো চুলগুলো ইহানের আঙুল পরম যত্নে গুছিয়ে দিচ্ছিল। ঘরের মোমবাতিটা তখন প্রায় নিভে এসেছে, কিন্তু তাদের জীবনের নতুন আলো তখন সবেমাত্র জ্বলতে শুরু করেছে।
"জান ইহান," নেহা ইহানের বুকে হাত রেখে মৃদুস্বরে বলল, "ভাঙা জিনিস কুড়িয়ে এনে জোড়া লাগালে নাকি দাগ থেকে যায়। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, আমাদের সেই পুরনো ভাঙা সম্পর্কটা আর নেই। আমরা নতুন একটা সম্পর্কের ভিত্তি গড়েছি।"
ইহান নেহার কপালে গভীর একটা চুমু খেল। "একদম ঠিক। বিষাক্ত অতীতকে আমরা পেছনে ফেলে এসেছি। আজ থেকে আমাদের পথচলা শুরু হলো কেবল একে অপরের প্রেমে নয়, একে অপরের শান্তিতে।"
বাইরে সমুদ্রের গর্জন তখনও অব্যাহত, কিন্তু ঘরের ভেতরের দুটি আত্মায় তখন এক অনাবিল, স্থায়ী শান্তির সুবাতাস বইছিল। ভাঙাগড়ার পথ পেরিয়ে ইহান আর নেহা অবশেষে খুঁজে পেল তাদের নিজেদের সুন্দর, সুস্থ ও ভালোবাসাময় এক নতুন পৃথিবী।
....