ভুল স্বীকারে নতুন সম্পর্ক

নাভিদের ঘরের আধো-অন্ধকার কোণটিতে তখনও বৃষ্টির টাপুটুপ শব্দ একটা নেশা ধরানো আবহ তৈরি করছিল। বাইরে শ্রাবণের অঝোর ধারা, আর ভেতরে এসি থেকে বের হওয়া ঠান্ডা হাওয়া ঘরের তাপমাত্রা নামিয়ে এনেছে বেশ খানিকটা। খাটের একপাশে বসেছিল রাইসা। পরনে একটা গাঢ় নীল রঙের সুতি শাড়ি, ভিজে যাওয়া আঁচলটা শাড়ির ভাঁজ থেকে খসে গিয়ে ওর কোঁকড়ানো চুলের আড়ালে ঢেকে রেখেছে উন্মুক্ত কাঁধ আর গলার একাংশ।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

নাভিদ দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। রাইসার এই রূপটা তার খুব চেনা, আবার একই সঙ্গে এক অজানা উত্তেজনার জন্ম দেয় ভেতরে। তাদের সম্পর্কের বছর তিনেকের মধ্যে ঝুল জমেছে অনেক—তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তীব্র ঝগড়া, অহেতুক সন্দেহ, আর অভিমানের এমন প্রাচীর যা দিনে দিনে কেবল উঁচুই হয়েছে। কিন্তু আজ, এই থমথমে ঘরে, কোনো তর্ক বা অভিমান টিকতে পারছিল না। শারীরিক আকুলতা আর হৃদয়ের না-বলা তীব্র তৃষ্ণা হঠাৎ যেন সব যুক্তি ভুলিয়ে দিল।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

নাভিদ আস্তে আস্তে এগিয়ে এলো খাটের দিকে। রাইসা মুখ তুলে তাকাল না, কিন্তু তার শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি হালকা দ্রুত হতে শুরু করল। নাভিদ হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল রাইসার ঠিক সামনে। লম্বা আঙুল দিয়ে রাইসার চিবুকটা সামান্য উঁচিয়ে ধরতেই দুজনের চোখ এক হলো। রাইসার কালো চোখের তারায় একদিকে যেমন তীব্র রাগ, অন্যদিকে যেন প্রচ্ছন্ন সমর্পণ।

 

"এখনো রেগে আছ?" নাভিডের গলাটা ভারী ও গ গম্ভীর শোনালো।

 

রাইসা কোনো উত্তর দিল না। ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে অন্যপাশে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই নাভিদ বাঁ হাত দিয়ে ওর কোমর পেঁচিয়ে ধরল। পাতলা শাড়ির ওপর দিয়েও রাইসার শরীরের প্রদীপ্ত উত্তাপ নাভিদের হাতের তালুতে এসে লাগল। মুহূর্তেই রাইসার সারা শরীরে একটা শিহরণ খেলে গেল। সে নাভিদের বুক চেপে ধরে তাকে দূরে ঠেলতে চাইল, কিন্তু সে ঠেলার মধ্যে জোর ছিল না বিন্দুমাত্র; বরং তা ছিল শুধুই এক ধরনের আকুল আত্মসমর্পণ।

 

"আমাকে ছোঁবে না নাভিদ," রাইসা ফিসফিস করে বলল, যদিও তার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠছিল। "তুমি তো সব সময়ই মনে করো ভুলটা শুধু আমার। তবে আজ কেন এলে?"

 

"কারণ আমি আর সহ্য করতে পারছি না, রাইসা," নাভিদ আরও ঝুঁকে এলো। ওর উত্তপ্ত শ্বাস রাইসার খোলা ঘাড়ে, কানের লতিতে এসে আছড়ে পড়তে লাগল। "তোমার এই জেদ, তোমার এই অহংকার... আর এই দূরত্ব। সব কিছু আমাকে পাগল করে দিচ্ছে।"

 

নাভিদ ওর ঠোঁট দুটো দিয়ে স্পর্শ করল রাইসার কানের নিচের নরম ত্বক। সেখানে দীর্ঘ এক চুম্বন এঁকে দিতেই রাইসার চোখ দুটো আপনা থেকেই বুজে এলো। এক হাতের আঙুলগুলো সে নাভিদের চুলের মধ্যে গলিয়ে দিয়ে নাভিদকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। তাদের মধ্যে জমে থাকা সব অভিমান, প্রতিদিনের কলহ এক নিমেষে এক প্রবল শারীরিক কামনায় রূপান্তরিত হলো।

 

নাভিদের ডান হাতটা ধীরে ধীরে রাইসার শাড়ির আঁচল সরিয়ে দিল। ঘরের কম আলোয় রাইসার সুগঠিত শরীরের বাঁধন যেন এক মায়াবী রূপ ধারণ করল। নাভিদ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে ঝোঁকের মাথায় রাইসাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। রাইসার উন্মাদের মতো নিঃশ্বাস আর নাভিদের প্রতিটি স্পর্শে ছিল তীব্র অধিকারের ছাপ।

 

রাইসার খোলা নাভি আর পেটের উষ্ণতায় নাভিদ নিজের মুখ গুঁজে দিল। রাইসা মৃদু আর্তনাদ করে উঠে নাভিদের পিঠ আঁকড়ে ধরল। হাতের নখগুলো নাভিদের শার্টের ওপর দিয়ে তার চামড়ায় দেবে গেল। এ যেন কেবল ভালোবাসার প্রকাশ নয়, এক ধরনের মধুর যন্ত্রণা দেওয়া আর নেওয়ার প্রতিযোগিতা। সম্পর্কের প্রতিটা ভাঙন, প্রতিটা অমীমাংসিত ঝগড়া যেন এই উদাম কামনার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যেতে চাইছিল।

 

"তুমি শুধুই আমার, রাইসা," নাভিদ রাইসার দুই হাতের কবজি ধরে বিছানার সাথে চেপে ধরল। ওর চোখ দুটো তখন নেশাতুর। "আমি যতই তোমার ওপর রাগ করি না কেন, তুমি আমার থেকে দূরে যেতে পারো না।"

 

রাইসা বুক উঁচিয়ে নিঃশ্বাস নিতে নিতে নাভিদের চোখে চোখ রাখল। "তবে মানো, তুমিও ভুল করেছিলে... তুমিও আমাকে বুঝতে চাওনি।"

 

নাভিদ জবাব না দিয়ে সরাসরি রাইসার আর্দ্র ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। গভীর, দীর্ঘ এবং তীব্র এক চুম্বনে সে রাইসার সমস্ত প্রতিবাদ বন্ধ করে দিল। রাইসাও আর নিজেকে গুটিয়ে রাখল না। সে তার দুই পা দিয়ে নাভিডের কোমর পেঁচিয়ে ধরল, নিজের পুরো শরীরটাকে নাভিডের সাথে লেপ্টে নিল।

 

বৃষ্টির শব্দ যেন আরও দ্বিগুণ হয়ে উঠল বাইরে। ঘরের আবহে তখন শুধুই দুটো শরীরের ঘাম, ভারী শ্বাস-প্রশ্বাস আর চাদরের খসখস শব্দ। তাদের পোশাকের প্রতিটি বাঁধন আলগা হতে লাগল। নাভিদের হাতের প্রতিটি চাপ রাইসার শরীরে এক একটি তীব্র স্পন্দন তৈরি করছিল। রাইসার গলা দিয়ে বেরিয়ে আসা নাম না জানা শব্দগুলো নাভিদ নিজের ঠোঁট দিয়ে গিলে নিচ্ছিল।

 

সম্পর্কের টানাপোড়েন যেখানে ভাষা হারিয়ে ফেলে, সেখানে শরীর যেন নিজের ভাষায় কথা বলতে শুরু করে। নাভিদ আর রাইসা একে অপরের ওপর ভেঙে পড়ছিল তীব্র আবেগে। প্রতিটি স্পর্শে ছিল হারিয়ে ফেলার ভয়, আবার একই সাথে পূর্ণাঙ্গভাবে পাওয়ার এক উন্মাদের মতো আকাঙ্ক্ষা। একে অপরকে ভালোবাসার চরম সীমায় নিয়ে যাওয়ার এই খেলায় তারা দুজনেই যেন নিজেদের হারিয়ে ফেলছিল।

 

অনেকটা সময় পর, যখন কামনার ঝড় কিছুটা থিতিয়ে এলো, তখন দুজনই ঘামে ভেজা শরীরে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইল। নাভিদের বুকের ওপর রাইসার মাথা, আর নাভিদের হাত জড়ানো রাইসার খোলা পিঠে। ঘরের ভেতর আবার ফিরে এলো নিস্তব্ধতা, শুধু এসি আর বৃষ্টির শব্দ ছাড়া।

 

কিন্তু এই শারীরিক একাত্মতা কি তাদের মনের গভীরে জমে থাকা বিষ বা ভাঙনটাকে দূর করতে পেরেছিল?

 

রাইসা নাভিদের বুকের ওপর কান রেখে শুনছিল তার হৃদস্পন্দন। খুব কাছে থেকেও কেমন যেন একটা অদৃশ্য দেয়াল অনুভব করছিল সে। সে জানত, এই চরম মুহূর্তের উত্তেজনা পার হয়ে গেলেই আবার সেই পুরনো প্রশ্নগুলো উঠে আসবে, আবার সেই ভুল বোঝাবুঝির কালো মেঘ জমা হবে। নাভিদও রাইসার চুলে হাত বোলাতে বোলাতে ছাদের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল—ভালোবাসা কি কেবল এই তীব্র কামনায় বেঁধে রাখা যায়? ভুল স্বীকার না করার যে পাহাড় তারা দুজন তৈরি করেছে, তা কি এক রাতের গভীর স্পর্শে গলে জল হয়ে যাবে?

 

উষ্ণতার রেশ তখনও মেলেনি, কিন্তু ঘরের বাতাসে আবার যেন এক না-বলা বিষাদের ছায়া নেমে এলো। এক বিশাল ভুল বোঝাবুঝি যে খুব কাছেই অপেক্ষা করছিল, তা হয়তো তখন তারা কেউই বুঝতে পারেনি।

পরবর্তী কয়েকটা মাস নাভিদ আর রাইসার সম্পর্কের টানাপোড়েন কোনো সমাধান তো পেলই না, বরং এক অদৃশ্য বিষে বিষাক্ত হয়ে উঠতে লাগল। সেদিনের সেই শ্রাবণের রাতের অতল কামনার উত্তাপ ঢাকা পড়ে গেল নিত্যদিনের সন্দেহ আর চরম অহংকারের বরফে। শারীরিক близоতা বা সাময়িক স্পর্শ কখনো কখনো মনের জটিল ক্ষতগুলোকে ঢাকতে পারে, কিন্তু মূল সমস্যা ভুলিয়ে দিতে পারে না।

 

যে ভুল বোঝাবুঝি তাদের বিচ্ছেদের চূড়ান্ত বীজ বুনে দিয়েছিল, তার শুরুটা হয়েছিল খুব সাধারণ একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে। নাভিদের এক সহকর্মী তানিয়া, যার সাথে অফিসের কাজ সূত্রে নাভিদকে প্রায়ই গভীর রাত পর্যন্ত কথা বলতে হতো। রাইসা প্রথম দিকে বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নিলেও ধীরে ধীরে নাভিদের আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করে। ঘরের কোণে ফোন নিয়ে নাভিদের দীর্ঘ কথোপকথন, রাইসা সামনে এলে হঠাৎ কল কেটে দেওয়া—এসব রাইসার মনের ভেতর এক গভীর সন্দেহের জন্ম দেয়। অন্যদিকে, রাইসার ভার্সিটির পুরনো বন্ধু আয়ানের সাথে রাইসার নিয়মিত যোগাযোগ নাভিদ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না। দুজনেই নিজেদের মনের ক্ষোভ চেপে রাখত, আর সেই ক্ষোভ জমতে জমতে বিস্ফোরিত হলো এক বিষণ্ণ সন্ধ্যায়।

 

সেদিন ছিল রাইসার জন্মদিনের আগের রাত। নাভিদ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সে সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে বাড়ি ফিরে রাইসাকে নিয়ে কোথাও বের হবে। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা যখন রাত দশটা ছুঁইছুঁই, নাভিদের দেখা নেই। ফোন করলেও সে ধরছিল না। রাইসা ধীর পায়ে ড্রয়িংরুমে গিয়ে সোফায় বসে রইল। পরনে তার কালো রঙের একটা জমকালো জামা, চোখে হালকা কাজল, ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক। নাভিদ আসবে বলে সে নিজেকে সাজিয়েছিল চরম আকুলতায়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তার সব সাজ, সব প্রত্যাশা যেন অপমানের তপ্ত তীরে পরিণত হচ্ছিল।

 

রাত সোয়া এগারোটায় যখন নাভিদ দরজার লক খুলে ভেতরে ঢুকলো, তার চেহারায় ক্লান্তির ছাপ। কিন্তু রাইসাকে সোফায় ওভাবে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে সে কোনো অপরাধবোধ অনুভব করার বদলে বিরক্ত হলো।

 

"তুমি এখনো এভাবে বসে আছ?" নাভিদ টাইয়ের নট আলগা করতে করতে বলল। "অফিসে একটা জরুরি মিটিং ছিল, তানিয়ার প্রেজেন্টেশনে কিছু সমস্যা হওয়ায় দেরি হয়ে গেল।"

 

রাইসা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না, শুধু চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে কঠিন গলায় বলল, "তানিয়া... সব সময়ই তানিয়া। আজ আমার জন্য তোমার একটুও সময় হলো না, নাভিদ? তুমি ভুলে গিয়েছ আজ কী দিন?"

 

নাভিদ এক মুহূর্ত থমকে গেল। সে সত্যিই ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু নিজের ভুল স্বীকার করার মতো মানসিকতা তখন তার ছিল না। নিজের অপরাধ ঢাকতে সে উল্টো রাইসার ওপর চড়াও হলো। "সব কিছুতে তোমার নাটক! আমি কি বাইরে আড্ডা দিচ্ছিলাম? কাজ করছিলাম। তোমার মতো সারাদিন আয়ানের সাথে ফালতু আড্ডায় সময় নষ্ট করি না আমি।"

 

"মুখ সামলে কথা বলো নাভিদ!" রাইসা গর্জে উঠল। "আয়ান আমার বন্ধু, আর তোমার সাথে তার কোনো তুলনা হয় না। তুমি আমার ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্যই নও। তুমি এক স্বার্থপর, অহংকারী মানুষ!"

 

"আমি স্বার্থপর?" নাভিদ বিকট শব্দে টেবিলে হাত চাপড়ে উঠল। "তাহলে তুমি কেন আছ আমার সাথে? আমি তো তোমাকে জোর করে ধরে রাখিনি! তোমার এই বিষাক্ত সন্দেহ আর প্রতিদিনের ঘ্যানঘ্যান আমি আর নিতে পারছি না।"

 

কথাগুলো যেন সোজা গিয়ে রাইসার কলিজায় বিঁধলো। সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছু মুহূর্ত। মনের ভেতরের জমে থাকা ভালোবাসার শেষ ফোঁটাটুকুও যেন সেই মুহূর্তে বাষ্প হয়ে উড়ে গেল।

 

নাভিদ গটগট করে শোবার ঘরে চলে গেল এবং শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বারান্দার দরজা খুলে দিল। কিন্তু তার মাথার ভেতরে তখন তীব্র অস্থিরতা। সে জানত সে ভুল করেছে, রাইসার জন্মদিনের কথা তার মনে রাখা উচিত ছিল, তানিয়াকে নিয়ে রাইসার ভীতিটা দূর করা তার দায়িত্ব ছিল। কিন্তু তার অহংকার তাকে রাইসার কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইতে দিল না।

 

কিছুক্ষণ পর নাভিদ শোবার ঘরে ফিরে এসে দেখল রাইসা ড্রয়িংরুমের লাইট নিভিয়ে তাদের ঘরের দিকে আসছে। রাইসার চোখে তখন আর জল নেই, সেখানে এক অদ্ভুত শীতলতা। সে নাভিদের দিকে না তাকিয়েই ড্রেসিংটেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। চুলগুলো আলগা করে ছেড়ে দিয়ে সে তার গহনাগুলো একে একে খুলতে লাগল।

 

নাভিদ পেছন থেকে এসে রাইসার কাঁধে হাত রাখল। শরীরের পুরোনো অভ্যাসে নাভিদ তাকে নিজের দিকে ঘোরাতে চাইল। নাভিদের তপ্ত শ্বাস রাইসার ঘাড়ে গিয়ে লাগতেই রাইসা শিউরে উঠল, তবে তা কামনায় নয়, এক তীব্র ঘৃণায়।

 

"আমাকে স্পর্শ করবে না," রাইসা শান্ত কিন্তু বরফের মতো ঠান্ডা গলায় বলল।

 

নাভিদ শুনল না। সে জোর করে রাইসার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে কাছে টানল। "রাইসা, প্লিজ... অতো রাগ করো না। আমি দুঃখিত, কিন্তু তুমিও তো আমাকে বোঝো না..." নাভিদ রাইসার খোলা ঘাড়ে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল, চেষ্টা করল শারীরিক উত্তাপ দিয়ে ঝগড়াটা মিটিয়ে ফেলতে। তার হাত রাইসার পোশাকের বাঁধন আলগা করতে চাইল, যেন কামনার আগুনে সব ভুল পুড়িয়ে ফেলা যায়।

 

কিন্তু আজ রাইসা আলাদা। সে সজোরে নাভিদকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। "তুমি কী ভাবো, নাভিদ? প্রতিবার ঝগড়া করবে, আমাকে অপমান করবে, আর তারপর বিছানায় এসে সব মিটিয়ে নেবে? শরীরটাই কি সব? মনের কোনো দাম নেই তোমার কাছে?"

 

নাভিদ ধাক্কা খেয়ে পিছিয়ে গেল। তার পুরুষালী অহংকারে চরম আঘাত লাগলো। "রাইসা! সীমানা পার কোরো না।"

 

"সীমানা তো তুমি অনেক আগেই পার করেছ," রাইসা তার ট্রাভেল ব্যাগটা আলমারি থেকে বের করতে করতে বলল। "আমি আর এক মুহূর্তও এই ছাদের নিচে থাকব না। যেখানে সম্মান নেই, যেখানে বিশ্বাস নেই, সেখানে শুধু শরীরের টানে পড়ে থাকা যায় না।"

 

রাইসা ঝটপট তার প্রয়োজনীয় কিছু জামাকাপড় ব্যাগে ভরতে শুরু করল। নাভিদ দরজায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে ভাবছিল রাইসা হয়তো ভয় দেখাচ্ছে, হয়তো একটু পর শান্ত হয়ে যাবে। তাই সে বাধা দিল না, নিজের জেদ ধরে রেখে বলল, "আজ যদি তুমি এই দরজা দিয়ে বের হয়ে যাও, তবে মনে রেখো রাইসা, ফিরে আসার সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে।"

 

রাইসা ব্যাগের চেইন টেনে শক্ত হাতে ব্যাগটা তুলল। সে নাভিদের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে ছিল এক অপূরণীয় শূন্যতা। "ফিরে আসার জন্য তো আমি যাচ্ছি না, নাভিদ। আমরা দুজনেই এই সম্পর্কটাকে মেরে ফেলেছি।"

 

রাইসা নাভিদকে পাশ কাটিয়ে দরজার দিকে হেঁটে গেল। নাভিদ একবারও তার হাতটা ধরল না, একবারও বলল না—'যেও না, আমি তোমাকে ভালোবাসি'। শুধু নিজের অহংকার আর ভুল জেদের বশে সে শক্ত পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল।

 

দরজাটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিকট শব্দে পুরো বাড়িটা কেঁপে উঠল। সেই শব্দের সাথে সাথেই যেন নাভিদের জীবনের এক বিশাল অংশ চিরতরে ছিন্ন হয়ে গেল।

 

রাইসা যখন রাতের বৃষ্টিভেজা রাস্তায় নেমে এলো, তার চোখে তখন আর কোনো জল ছিল না। কিন্তু হৃদয়ের গভীরে ছিল রক্তক্ষরণ। তারা দুজনেই ভালোবাসত, কিন্তু সেই ভালোবাসা রক্ষা করার মতো নমনীয়তা কারো ছিল না। এক চরম ভুল বোঝাবুঝি, অহেতুক সন্দেহ আর দুজনের জেদের পাহাড় তাদের কয়েক বছরের গোছানো সংসার আর সম্পর্ককে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল।

 

সেই রাতের পর থেকে কেটে গেল তিন-তিনটি দীর্ঘ বছর। নাভিদ রয়ে গেল তার একাকীত্বের অন্ধকারে, আর রাইসা হারিয়ে গেল তার নিজের জগতে। মাঝখানের এই বছরগুলোতে তারা একে অপরের কোনো খবর রাখেনি, কিন্তু তাদের মনের এক কোণে রয়ে গিয়েছিল সেই অপূর্ণতার দাহ। সময় কি পারল তাদের এই গভীর ক্ষত শুকাতে? নাকি বিধাতা তাদের জন্য লিখে রেখেছিল অন্য কোনো পরিণতি?

বিচ্ছেদের পর কেটে যাওয়া তিন-তিনটি বছর কোনো জাদুমন্ত্রের মতো নাভিদ আর রাইসার জীবনকে বদলে দেয়নি, তবে তাদের ভেতরে এক গভীর রূপান্তর এনেছিল। একসময়ের উত্তাল, জিদ্দি আর অহংকারী নাভিদ এখন অনেক বেশি শান্ত, সংযমী। সে বুঝতে পেরেছে, নিজের ভুল স্বীকার করতে না পারাটা কোনো বীরত্ব নয়, বরং ভালোবাসার মানুষকে হারানোর সবচেয়ে সহজ উপায়। অন্যদিকে রাইসাও উপলব্ধি করেছে, ক্ষোভ আর সন্দেহ দিয়ে কখনো বিশ্বাসের ঘর বাঁধা যায় না। দুজন মানুষের মধ্যে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে ভালোবাসার চেয়েও বেশি প্রয়োজন পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা আর নমনীয়তা।

 

তিন বছর পর, এক মেঘলা বিকেলে ধানমন্ডির এক নিরিবিলি ক্যাফেতে আচমকাই দেখা হয়ে গেল দুজনের। বৃষ্টি নামবে নামবে করছে, ক্যাফের এক কোণে বসে কফি খাচ্ছিল রাইসা। পরনে এক সাধারণ হালকা হলুদ রঙের সালোয়ার কামিজ, চুলগুলো পরিপাটি করে পেছনে বাঁধা। নাভিদ যখন ভেতরে ঢুকলো, তার চোখেমুখে ক্লান্তি, কিন্তু ব্যক্তিত্বে এক পরিপক্কতার ছাপ।

 

চোখাচ্ছোখি হতেই দুজনের হৃদয় যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। পুরনো স্মৃতিগুলো ঝড়ের বেগে ধেয়ে এলো মস্তিষ্কে। কিন্তু সেই আগের মতো কোনো উত্তেজনা বা চিৎকার ছিল না। নাভিদ ধীর পায়ে এগিয়ে এসে রাইসার টেবিলের সামনে দাঁড়াল।

 

"বসতে পারি?" নাভিডের কণ্ঠস্বরে একধরণের নম্রতা।

 

রাইসা একটু ইতস্তত করে মাথা নাড়ল। নাভিদ মুখোমুখি বসল। কিছুক্ষণ দুজনেই নীরব। বাইরে তখন টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। কফির কাপে চুমুক দিয়ে নীরবতা ভাঙল নাভিদই।

 

"কেমন আছ, রাইসা?"

 

"ভালো। তুমি?"

 

"চলছে একরকম," নাভিদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "আজকের দিনটার কথা মনে আছে? ঠিক তিন বছর আগে এমনই এক বৃষ্টির দিনে আমরা আলাদা হয়ে গিয়েছিলাম।"

 

রাইসা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। "মনে রাখতে চাই না নাভিদ। সেই রাতটা আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল।"

 

"না, ভুল রাতটা ছিল না," নাভিদ রাইসার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল। "ভুল ছিলাম আমরা। আমাদের অহংকার, আমাদের জেদ আর অপটু ভালোবাসা। আমি তানিয়ার বিষয়টায় চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছিলাম, তোমার অভিমানকে তোয়াক্কা করিনি। আমার উচিত ছিল তোমাকে জড়িয়ে ধরে আটকানো, নিজের ভুল মেনে নেওয়া। কিন্তু আমি আমার অহংকারকে জিতিয়ে দিয়েছিলাম।"

 

রাইসা অবাক হয়ে নাভিদের দিকে তাকাল। সেই পুরনো নাভিদ, যে কখনোই নিজের ভুল মানত না, সে আজ এতটা সহজভাবে নিজের অপরাধ স্বীকার করছে! রাইসার ভেতরের জমাবদ্ধ বরফটা যেন গলতে শুরু করল। সে চোখ নামিয়ে বলল, "ভুল আমারও কম ছিল না নাভিদ। আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে পারিনি। সামান্য সন্দেহ আর রাগ দিয়ে তোমাকে বিচার করেছি, আয়ানকে নিয়ে তোমার অস্বস্তিকে গুরুত্ব দিইনি। আমরা দুজনেই সম্পর্কটাকে শেষ করে দিয়েছিলাম।"

 

দুই প্রাক্তন প্রেমিকের চোখের কোণে তখন হালকা আর্দ্রতা। সময়ের প্রবাহে তাদের ক্ষতগুলো শুকায়নি ঠিকই, তবে পেকে উঠে শক্ত হয়েছিল। আর আজ, নিজেদের ভুলগুলো নির্দ্বিধায় মেনে নেওয়ার মাধ্যমে সেই ক্ষতের ওপর যেন এক পশলা স্বস্তির বৃষ্টি নেমে এলো।

 

"এখনো কি আমাকে ঘৃণা করো?" নাভিদ মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল।

 

"ঘৃণা কখনোই করতাম না," রাইসা সত্যি কথাটা বলল। "ভালোবাসতাম বলেই অতো অভিমান ছিল। তবে এই তিন বছরে আমি বুঝেছি, ভালোবাসলেই একসাথে থাকা যায় না, যদি না দুজন মানুষকে বোঝা যায়।"

 

ক্যাফে থেকে বের হওয়ার সময় বৃষ্টি অনেকটাই কমে এসেছে। আকাশ জুড়ে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধ আলো। নাভিদ আর রাইসা হাঁটতে হাঁটতে লেকের পাড়ে এলো। ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ চারপাশে।

 

নাভিদ পকেট থেকে হাত বের করে রাইসার মুখোমুখি দাঁড়াল। সে রাইসার দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল। রাইসা এবার হাত সরিয়ে নিল না। নাভিডের হাতের উষ্ণতা তার সুপ্ত আবেগগুলোকে আবার জাগিয়ে তুলছিল, তবে এবার তাতে কোনো বিষাক্ত জেদ ছিল না, ছিল এক পরম নির্ভরতা।

 

"রাইসা," নাভিদের গলার আওয়াজ গভীর ও আকুল শোনালো। "আমরা আমাদের পুরনো ভাঙা ঘরটাকে আর মেরামত করতে পারব না। সেটার ভিটেমাটিই ধসে গেছে। কিন্তু আমরা কি নতুন করে একটা নতুন ভিত্তি তৈরি করতে পারি না? যেখানে কোনো অতীত থাকবে না, কোনো অহেতুক সন্দেহ থাকবে না, থাকবে শুধুই নতুন আমি আর নতুন তুমি?"

 

রাইসা নাভিদের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে আজ কোনো ছলনা নেই, নেই কোনো পুরুষালী অহংকার। সেখানে রয়েছে কেবল এক পরিণত ভালোবাসার আকুতি। রাইসার বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো। সে জানত, নাভিদকে ছাড়া সে অন্য কাউকে কখনো হৃদয় দিতে পারেনি।

 

"তুমি কি সত্যিই বদলেছ নাভিদ?" রাইসা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।

 

উত্তর না দিয়ে নাভিদ রাইসাকে এক টানে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। লেকের ধারের নির্জন অশ্বত্থ গাছের ছায়ায়, গোধূলির আলো-আঁধারিতে নাভিদ ঝুকে এলো রাইসার ঠোঁটের কাছে। এবার তাদের ঠোঁটের মিলন কোনো ঝগড়ার পরের উন্মাদের মতো দখল নেওয়ার চেষ্টা ছিল না। এ ছিল পরম শ্রদ্ধায়, গভীর ভালোবাসায় একে অপরকে সঁপে দেওয়ার এক বিশুদ্ধ আবেগ।

 

নাভিদের তপ্ত ঠোঁট যখন রাইসার ঠোঁট দুটোকে আলতো করে চেপে ধরল, রাইসা নিজের অজান্তেই শিউরে উঠল। নাভিদের এক হাত রাইসার পিঠ পেঁচিয়ে তাকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল, অন্য হাতটা রাইসার গালে আলতো স্পর্শ বুলিয়ে দিল। রাইসাও তার দুই হাত নাভিদের ঘাড়ে পেঁচিয়ে নিজেকে সঁপে দিল সেই নিবিড় গভীরতায়। তাদের এই গভীর রোমান্সের মাঝে আর কোনো অতীত বা ভবিষ্যতের ভয় ছিল না, ছিল কেবল বর্তমানের এক অপরূপ একাত্মতা।

 

অনেকক্ষণ পর চুম্বনের বাঁধন আলগা হলে নাভিদ রাইসার কপালে নিজের কপাল ঠেকাল। দুজনের শ্বাস-প্রশ্বাস তখনো দ্রুত।

 

"আমরা নতুন করে শুরু করব রাইসা," নাভিদ অনুচ্চ স্বরে বলল। "পুরনো সম্পর্কটাকে সেখানেই শেষ করে দিয়ে, নতুন এক সম্পর্কের সূচনা করব। কোনো তাড়াহুড়ো নয়, একে অপরকে আবার নতুন করে জানার পথ ধরে।"

 

রাইসা নাভিদের বুকের ওপর নিজের মাথাটা রাখল। নাভিদের হৃদস্পন্দন শুনতে শুনতে সে এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব করল। যে বিচ্ছেদ তাদের কয়েক বছর আগে দূরে ঠেলে দিয়েছিল, সময় সেই বিচ্ছেদকেই তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষায় পরিণত করেছে।

 

তারা হাত ধরে হাঁটতে শুরু করল। সন্ধের মিষ্টি আলোয় তাদের ছায়া দুটো পাশাপাশি পথ চলছিল—পুরনো ভুলের ছাই থেকে জন্ম নেওয়া এক নতুন, পরিপক্ক ভালোবাসার গল্পের দিকে।

....
👁 13