গভীর রাতে জানালার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আছড়ে পড়ছিল। ঘরের ভেতরে আবছা লালচে আলো, বাতাসে ছড়িয়ে থাকা দামি পারফিউমের সুবাস আর আবেশ তৈরি করা এক নিস্তব্ধতা। বিছানার একপাশে বসা তাসনিম, তার খোলা সোজা চুলগুলো ছড়িয়ে আছে পিঠজুড়ে। আরিয়ান তার খুব কাছে এগিয়ে এল। আরিয়ানের ঘন শ্বাস তাসনিমের ঘাড়ের তিলটার ওপর আছড়ে পড়ছে। সে আলতো করে আঙুলের ডগা দিয়ে তাসনিমের থুতনিটা ধরে মুখটা নিজের দিকে তুলল।
আরিয়ানের চোখের গভীরে ছিল এক অদ্ভুত তীব্রতা—সেখানে যেমন ভালোবাসার গভীর সমুদ্র ছিল, তেমনি ছিল হারানোর এক অদম্য ভয়। সে ফিসফিস করে বলল, "তুমি শুধু আমার, তাই না তাসনিম? অন্য কারও ছায়াও যেন তোমার ওপর না পড়ে।"
তাসনিম মৃদু হেসে আরিয়ানের ঠোঁটে নিজের আঙুল রাখল। সে আরিয়ানের চোখের এই তীব্র আকুলতা ভালোবাসত। কিন্তু সে জানত না, এই ভালোবাসার আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক ধ্বংসাত্মক ঈর্ষা।
তাদের ভালোবাসার দিনগুলো এমনিতেই ছিল উদ্দাম আর মায়াময়। আরিয়ানের ভালোবাসার প্রকাশ ছিল প্রচণ্ড রোমান্টিক এবং একই সাথে তীব্র একপ্রকার দখলাভিমান। তারা যখন একসাথে থাকত, তখন পুরো পৃথিবী যেন থেমে যেত। আরিয়ান তাসনিমকে বুকে জড়িয়ে ধরে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকত, তার চুলের সুবাস নিত, আর তাসনিমের প্রতিটা কোণকে নিজের স্পর্শে ভরিয়ে তুলত। তাসনিমও আরিয়ানের এই মাতাল করা প্রেমে ব্যাকুল হয়ে সাড়া দিত। ভালোবাসার সেই উষ্ণ রাতগুলোয় তাদের নিঃশ্বাসের ওঠা-পড়া আর ভালোবাসার ব্যাকুলতা এক হয়ে যেত। কিন্তু সেই মধুর মুহূর্তগুলোর ভেতরেই আস্তে আস্তে দানা বাঁধছিল এক বিষাক্ত কালো মেঘ।
সমস্যার শুরুটা হয় ফুয়াদকে ঘিরে। ফুয়াদ ছিল তাসনিমের শৈশবের বন্ধু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার দিনগুলো থেকেই ফুয়াদ আর তাসনিমের বন্ধুত্ব বেশ নিবিড়। তাদের মধ্যে কখনোই কোনো ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল না, কেবলই ছিল নিষ্পাপ এক বন্ধুত্ব আর পারস্পরিক শ্রদ্ধা। কিন্তু আরিয়ানের চোখে সেই সম্পর্কটা ছিল এক চরম হুমকি।
একদিন সন্ধ্যায় একটা ক্যাফেতে বসেছিল আরিয়ান আর তাসনিম। আবহাওয়াটা বেশ মনোরম ছিল। তাসনিমের ফোনে হঠাৎ ফুয়াদের একটা মেসেজ আসে—একটা পুরোনো স্মৃতি নিয়ে হাসিঠাট্টার মেসেজ। তাসনিম সেটা দেখে মৃদু হাসল। ঠিক সেই মুহূর্তে আরিয়ানের চোখ পড়ে তাসনিমের ফোনের স্ক্রিনে। আরিয়ানের চোখ দুটো মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল। এতক্ষণ যে চোখে ভালোবাসার নরম আলো ছিল, সেখানে এখন এক হিংস্র আগ্নেয়গিরি।
আরিয়ান ঠান্ডা গলায় বলল, "কে মেসেজ দিল?"
তাসনিম সহাস্যে বলল, "ফুয়াদ। ওই যে আমাদের কলেজের পুরোনো গল্পটা বলছিল..."
আরিয়ান তাসনিমের কথা শেষ হতে দিল না। সে টেবিল থেকে তাসনিমের ফোনটা সজোরে টান মেরে তুলে নিল। তাসনিম অবাক হয়ে তাকাল, "আরিয়ান, এটা কী ধরনের ব্যবহার?"
"কিসের এত কথা ফুয়াদের সাথে? প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে ও তোমাকে মেসেজ দেবে কেন?" আরিয়ানের গলার স্বর কাঁপছিল, তবে তা রাগে না, এক চরম ঈর্ষা ও অনিশ্চয়তায়।
"ও আমার বন্ধু আরিয়ান! তুমি অযথা সন্দেহ করছ," তাসনিম বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করল।
আরিয়ান শক্ত করে তাসনিমের হাত চেপে ধরল। ক্যাফের আবছা আলোতেও তার হাতের রক্তঘাম স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। সে তাসনিমের খুব কাছাকাছি মুখ এনে ক্ষোভের সাথে বলল, "আমি কোনো পুরুষকে তোমার এত কাছাকাছি সহ্য করতে পারি না তাসনিম! কোনো বন্ধুকে না, কাউকেই না! তুমি শুধু আমার শরীর, আমার আত্মা, আমার নিঃশ্বাস। অন্য কোনো পুরুষ কেন তোমার হাসির কারণ হবে?"
আরিয়ান তাকে টেনে নিজের গাড়িতে তুলল। গাড়ির ভেতরে পরিবেশ হয়ে উঠল তীব্র উত্তেজনাকর। আরিয়ান তাসনিমকে জড়িয়ে ধরে তার ঠোঁটে এক হিংস্র, মাতাল করা চুম্বন আঁকল—যাতে ভালোবাসার চেয়ে অধিকারবোধ বেশি ফুটে উঠছিল। সে যেন চুম্বনের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চাইছিল তাসনিম শুধুই তার। তাসনিম প্রথমদিকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলেও আরিয়ানের ভালোবাসার এই তীব্র আবেশে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। কিন্তু রোমান্সের এই উন্মাদনার পর মুহূর্তেই আবার নেমে এল সেই বিষাক্ত সন্দেহ।
দিন যত যেতে লাগল, আরিয়ানের এই ঈর্ষা স্বাভাবিক সীমা ছাড়িয়ে মানসিক অত্যাচারে রূপ নিল। তাসনিম কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে কথা বলছে, কেন কোনো পুরুষ সহকর্মীর সাথে হেসে কথা বলল—সবকিছু নিয়ে আরিয়ান তাকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করত। রাত ৩টার সময়ও আরিয়ান তাসনিমকে ফোন দিয়ে দেখতে চাইত সে ঘুমিয়ে পড়েছে নাকি অন্য কারও সাথে কথা বলছে।
ভালোবাসার নামে এই চরম মানসিক বন্দিদশা তাসনিমকে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দিচ্ছিল। যে আরিয়ানের স্পর্শে সে একসময় স্বর্গীয় সুখ খুঁজে পেত, সেই আরিয়ানের স্পর্শ এখন তার কাছে মনে হতো এক শিকল।
এক রাতে, বৃষ্টিভেজা আবহাওয়ায় আরিয়ান তাসনিমের ফ্ল্যাটে এল। তাসনিম তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। আরিয়ান পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে তার ঘাড়ে ও পিঠে উষ্ণ চুমু দিতে লাগল। তার হাত দুটো তাসনিমের কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের দিকে টেনে নিল। তাসনিমের সমস্ত শরীর শিউরে উঠল, কিন্তু তার মনে কোনো আনন্দ ছিল না।
আরিয়ান তাসনিমের কানে ফিসফিস করে বলল, "তুমি কি আজ সারাদিন আমার কথা ভেবেছ? নাকি ফুয়াদের সাথে আবার কথা হয়েছে?"
তাসনিম নিচু গলায় বলল, "আজকে ফুয়াদের বোন হাসপাতালে ভর্তি ছিল আরিয়ান, আমি শুধু খবর নেওয়ার জন্য ফোন দিয়েছিলাম।"
এই কথা শোনার সাথে সাথে আরিয়ানের ভেতরের বিষাক্ত ঈর্ষা আবার জেগে উঠল। সে তাসনিমকে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরল। তার চোখের দৃষ্টিতে তখন কোনো ভালোবাসা নেই, কেবল এক অন্ধ হিংসা।
"আবার ফুয়াদ! আমি তোমাকে হাজার বার বারণ করেছি না তার সাথে যোগাযোগ রাখতে? তুমি কেন আমাকে অমান্য করছ তাসনিম? তুমি কি ওকে ভালোবাসো?" আরিয়ান চিৎকার করে উঠল।
"তুমি পাগল হয়ে গেছ আরিয়ান!" তাসনিম চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। "প্রতিটা মুহূর্তে আমাকে এভাবে সন্দেহ করা বন্ধ করো! আমি তোমাকে ভালোবাসি, কিন্তু তোমার এই ঈর্ষা আমাকে প্রতিদিন একটু একটু করে মেরে ফেলছে!"
আরিয়ান তাসনিমের কাঁধ শক্ত করে ধরে ঝাঁকিয়ে বলল, "ভালোবাসা মানেই তো অধিকার! আমি তোমাকে অন্য কারও সাথে শেয়ার করতে পারব না, দরকার হলে আমি তোমাকে এই ঘরে বন্দি করে রাখব, তবুও অন্য কোনো পুরুষের নজর তোমার ওপর পড়তে দেব না!"
তাসনিম আরিয়ানের বুক ঠেলে তাকে দূরে সরিয়ে দিল। তার চোখে এখন আর ভালোবাসার আবেশ নেই, আছে এক চরম ক্লান্তি আর বিরক্তি।
"এটা অধিকার নয় আরিয়ান, এটা মানসিক অসুস্থতা। এটা ভালোবাসা হতে পারে না। তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না, তুমি শুধু নিজের অহংকার আর ঈর্ষাকে ভালোবাসো," তাসনিম শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল।
"তাসনিম, আমি তোমাকে ভালোবাসি! আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না!" আরিয়ান আবার তাকে জড়িয়ে ধরতে গেল, তার ঠোঁট তাসনিমের গালে আর ঠোঁটে ব্যাকুলভাবে ছুঁয়ে যেতে চাইল। কিন্তু এবার তাসনিম মুখ ফিরিয়ে নিল।
"না আরিয়ান, আর না।" তাসনিম পিছিয়ে গেল। সে দরজার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, "আজ তুমি চলে যাও। আমি আর পারছি না।"
আরিয়ান কিছুক্ষণ স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল সে তাসনিমকে নিজের ভালোবাসার চাদরে মুড়ে রাখছে, কিন্তু বাস্তবে সে যে তাসনিমকে শ্বাসরুদ্ধ করে মারছিল, তা বোঝার শক্তি তখন তার ছিল না। আরিয়ান রেগে গিয়ে ঘরের টেবিলের ওপর রাখা ফুলদানিটা ভেঙে চুরমার করে দিল এবং এক ধাক্কায় দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।
বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি। তাসনিম ভাঙা ফুলদানির টুকরোগুলোর পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। সে ভালোবাসত আরিয়ানকে, তার সেই মাতাল করা স্পর্শ, তার আকুলতা—সবকিছুই তাসনিমের খুব প্রিয় ছিল। কিন্তু একটি সম্পর্কের ভিত্তি যেখানে বিশ্বাস নয়, বরং চরম সন্দেহ আর বিষাক্ত ঈর্ষা, সেই সম্পর্কে থাকা মানে নিজের আত্মসম্মানকে বলি দেওয়া।
তাসনিম সিদ্ধান্ত নিল, এবার তাকে একটা চরম পদক্ষেপ নিতেই হবে। সে আর নিজের আত্মসম্মান আর মানসিক শান্তিকে এভাবে ধ্বংস হতে দিতে পারে না।
আরিয়ান যাওয়ার পর তাসনিমের ঘরজুড়ে নেমে এল এক শ্মশান নীরবতা। মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা ভাঙা ফুলদানির টুকরোগুলো যেন তাদের চূর্ণ-বিচূর্ণ সম্পর্কেরই প্রতিচ্ছবি। তাসনিম সারা রাত বারান্দায় বসে রইল। বৃষ্টির জল এসে তার পুরো শরীর ভিজিয়ে দিচ্ছিল, কিন্তু তার ভেতরের জ্বলতে থাকা ক্ষোভ আর কষ্টের আগুন নেভানোর শক্তি সেই বৃষ্টির ছিল না।
পরদিন সকালে আরিয়ান আবার এল। তার চোখ মুখ লাল, চুলগুলো উস্কোখুস্কো—সারারাত হয়তো সে একফোটা ঘুমায়নি। ঘরে ঢুকে সে সরাসরি তাসনিমের দিকে এগিয়ে এল। তার চোখে ব্যাকুলতা আর অনুশোচনার চাপ।
"তাসনিম, আমাকে মাফ করে দাও। কাল রাতে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি," আরিয়ান তাসনিমের দুটো হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে আকুল হয়ে বলল। সে তাসনিমের গালে নিজের মুখ ঘষে আবেগঘন গলায় বলতে লাগল, "তুমি জানো আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি। তোমাকে হারানোর ভয়ে আমি পাগল হয়ে যাই। আর কোনো দিন এমন হবে না, লক্ষ্মীটি, প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দাও।"
আরিয়ান তাসনিমকে বুকে জড়িয়ে ধরে তার কপালে, গালে নিবিড়ভাবে চুমু খেতে শুরু করল। তার স্পর্শে ছিল এক ব্যাকুল আকুতি, যেন সে তাসনিমকে হারিয়ে ফেলার ভয় থেকে বাঁচতে তাসনিমের শরীরের সাথে নিজেকে লীন করে দিতে চায়। তাসনিম চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। একসময় আরিয়ানের এই উষ্ণ স্পর্শ তার মনে ভালোবাসার প্রলয় তুলত, কিন্তু আজ সেই স্পর্শে কেবল এক তীব্র শূন্যতা আর আত্মপ্রবঞ্চনার গন্ধ।
তাসনিম ধীরেসুস্থে আরিয়ানের বুক থেকে নিজেকে সরিয়ে নিল। তার চোখের দৃষ্টিতে কোনো রাগ ছিল না, ছিল কেবল এক বরফশীতল স্থিরতা।
"আরিয়ান, ক্ষমা চাওয়ার এই নাটক আমরা বহুবার দেখেছি," তাসনিম শান্ত গলায় বলল। "প্রতিবার তুমি ভুল করো, তীব্র ভালোবাসার দোহাই দিয়ে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরো, আর পরদিনই আবার নতুন কোনো সন্দেহ নিয়ে আমার ওপর চড়াও হও। আমি আর এই বিষাক্ত চক্রের মধ্যে থাকতে চাই না।"
আরিয়ানের মুখের ভাব মুহূর্তে বদলে গেল। অনুশোচনার জায়গায় ফুটে উঠল এক হিংস্র আতঙ্ক। "তুমি কী বলতে চাইছো তাসনিম?"
"আমি এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসছি, আরিয়ান। আমরা আর একসাথে থাকতে পারি না।"
কথাটা শুনে আরিয়ানের মাথার ভেতর যেন আগুন জ্বলে উঠল। সে তাসনিমের দু হাত শক্ত করে চেপে ধরল, তার আঙুলগুলো তাসনিমের নরম চামড়ায় বসে যাচ্ছিল।
"তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে? ওই ফুয়াদের জন্য? আমি জানতাম! আমার সন্দেহই ঠিক ছিল!" আরিয়ান চিৎকার করে উঠল। তার চোখ দুটো হিংসায় অন্ধ হয়ে উঠেছিল। সে তাসনিমকে দেওয়ালের সাথে সেটে ধরে তার ঠোঁটে এক আক্রমণাত্মক, তীব্র এবং হিংস্র ব্যাকুলতায় চুম্বন করতে লাগল। এটা কোনো ভালোবাসার প্রলেপ ছিল না, এটা ছিল তাসনিমের ওপর নিজের মালিকানা জাহির করার এক শেষ ও মরিয়া চেষ্টা।
তাসনিম তার সমস্ত শক্তি দিয়ে আরিয়ানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। তার ঠোঁট কেটে রক্ত বেরিয়ে আসছিল। সে নিজের ঠোঁটের রক্ত মুছে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল, "তুমি আজও বুঝলে না আরিয়ান! সমস্যা ফুয়াদ নয়, সমস্যা তোমার ভেতরের ওই পচে যাওয়া ঈর্ষা আর অবিশ্বাস। তুমি ভালোবাসতে জানো না, তুমি কেবল দখল করতে জানো। আজ থেকে আমার জীবনে তোমার কোনো অধিকার রইল না।"
তাসনিম তার ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আরিয়ান কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তারপর ঘরের সমস্ত জিনিসপত্র ভাঙচুর করতে লাগল। তার চিৎকারে ঘরের চারদিকাল কেঁপে উঠছিল। কিন্তু তাসনিম আর ফিরে তাকায়নি। সে সোজা চলে গেল অন্য একটি শহরে, নিজের চাকরি ট্রান্সফার করে নিয়ে এক নতুন জীবনের সন্ধানে।
প্রথম কিছুদিন আরিয়ান ভাবছিল তাসনিম রাগ করে গেছে, দু-একদিন পর রাগ কমলে ঠিকই ফিরে আসবে। সে তাসনিমকে শত শত মেসেজ ও ফোন দিল। কিন্তু তাসনিম তার নম্বর ব্লক করে দিয়েছিল, সোশ্যাল মিডিয়ার সব অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছিল।
দিন পার হয়ে সপ্তাহে, আর সপ্তাহ পার হয়ে মাসে রূপ নিল। তাসনিম ফিরল না।
আস্তে আস্তে আরিয়ানের অহংকার আর রাগ ধসে পড়তে শুরু করল। সেই জায়গায় আসন পাতল এক নিঃসঙ্গ অন্ধকার। ফাঁকা ফ্ল্যাটে একা একা বসে থাকা আরিয়ানের জন্য দুঃসহ হয়ে উঠল। যে ঘরে তাসনিমের হাসির শব্দ ভেসে বেড়াত, যে বিছানায় তারা ভালোবাসার উষ্ণতায় একে অপরকে জড়িয়ে ধরে হাজারটা স্বপ্নের রাত কাটিয়েছে—সেই ঘর এখন আরিয়ানকে গিলে খেতে আসে।
রাত গভীর হলে আরিয়ান অ্যালকোহলে নিজেকে ডুবিয়ে রাখত। মদ খেয়ে সে তাসনিমের পুরোনো কাপড়গুলো বুকে জড়িয়ে ধরে বারান্দার মেঝেতে পড়ে থাকত। সে তাসনিমের কাপড়ে লেগে থাকা পারফিউমের সুবাস নিত আর শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে উঠত।
"তাসনিম... ফিরে এসো... আমি মরে যাচ্ছি তাসনিম..." আরিয়ান চিৎকার করে কাঁদত।
ভালোবাসার নামে সে যে তাসনিমকে প্রতিদিন একটা খাঁচায় বন্দি করে রেখেছিল, তা এবার সে নিজের হাড় দিয়ে টের পাচ্ছিল। সে বুঝতে পারল, তার এই ভালোবাসা ছিল আসলে চরম স্বার্থপরতা। সে তাসনিমকে ভালোবেসে নিজের করে পেতে চায়নি, সে তাসনিমকে নিজের সম্পত্তি মনে করে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল। আরিয়ানের মনের বিষাক্ত ভয়—'তাসনিম বুঝি অন্য কারও হয়ে গেল'—সেই ভয়টাই শেষ পর্যন্ত তার জীবন থেকে তাসনিমকে চিরতরে কেড়ে নিল।
আরিয়ানের এই মানসিক ও শারীরিক পতন দেখে তার একমাত্র ঘনিষ্ঠ বন্ধু তানভীর একদিন তার বাড়ি এল। ঘরের অবস্থা দেখে তানভীর শিউরে উঠল। চারদিকে মদের বোতল, ভাঙা কাঁচ আর আরিয়ান দাড়ি-গোঁফ নিয়ে এক জ্যান্ত লাশ হয়ে বসে আছে।
তানভীর আরিয়ানকে ধরে তুলে এক চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাল। "তুই তাসনিমকে ভালোবাসিসনি আরিয়ান, তুই ভালোবাসিস তোর নিজের অহংকারকে! তুই মেয়েটাকে মানসিকভাবে তিলে তিলে শেষ করে দিয়েছিলিস। কোনো আত্মসম্মান থাকা মেয়ে তোর এই বিষাক্ত মানসিকতার সাথে থাকতে পারে না। তুই ওকে হারিয়েছিস তোর নিজের দোষে!"
কথাগুলো আরিয়ানের বুকের ভেতর তীরের মতো বিঁধল। এতদিন সে নিজেকে একজন 'প্রেমিক' ভাবত যে কিনা ভালোবাসার টানে ঈর্ষান্বিত হতো। কিন্তু আজ তার চোখের সামনের পর্দাটা সরে গেল। সে বুঝতে পারল, সে তাসনিমের জন্য কোনো বরদান ছিল না, সে ছিল তাসনিমের জীবনের এক অভিশাপ।
আরিয়ান আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আয়নায় নিজের এই বীভৎস রূপ দেখে তার নিজের ওপরই চরম ঘৃণা জন্মাল। সে বুঝতে পারল, তাসনিমকে সত্যি ভালোবাসতে হলে আগে তাকে নিজেকে বদলাতে হবে। তার ভেতরের এই বিষাক্ত ঈর্ষা, এই রোগগ্রস্ত মালিকানাবোধকে চিরতরে হত্যা করতে হবে।
আরিয়ান সিদ্ধান্ত নিল, সে নিজেকে সংশোধন করবে। তাসনিম তার জীবনে আর কোনোদিন ফিরে আসুক বা না আসুক, সে নিজেকে এক নতুন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে—এমন একজন মানুষ, যে কাউকে নিজের খাঁচায় বন্দি না করে ডানা মেলে উড়তে দেওয়ার সাহস রাখে।
দীর্ঘ দুটো বছর কেটে গেছে। এই দুটি বছর আরিয়ানের জন্য ছিল নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়ার এক কঠিন সংগ্রাম। সে একজন খ্যাতনামা সাইকিয়াট্রিস্টের পরামর্শ নেওয়া শুরু করে। নিজের ভেতরের অবচেতনের ভয়, নিরাপত্তাহীনতা আর বিষাক্ত ঈর্ষার মূল উপড়ে ফেলতে তাকে তীব্র মানসিক লড়াই করতে হয়েছে। আরিয়ান এখন আর সেই পুরনো, নিয়ন্ত্রণকামী আরিয়ান নয়। সে এখন অনেক শান্ত, পরিপক্ক এবং মানসিকভাবে সুস্থ এক পুরুষ।
আরিয়ান এখন সিলেটের একটি শান্ত চা-বাগানের কোলঘেঁষা ছোট্ট এক রিসোর্টে ম্যানেজার হিসেবে কাজ করে। শহরের কোলাহল আর পুরনো স্মৃতির আঘাত থেকে দূরে এসে সে প্রকৃতি আর কাজের মাঝে নিজেকে সঁপে দিয়েছে। সে জেনে গেছে, তাসনিমকে তার জীবনে আর কোনোদিন ফেরত পাওয়ার অধিকার তার নেই। সে শুধু মনে মনে প্রতিদিন খোদার কাছে তাসনিমের মানসিক শান্তি ও খুশির জন্য দোয়া করত। তাসনিমকে কোনো শর্ত ছাড়া, কোনো মালিকানাবোধ ছাড়া দূর থেকে ভালোবেসে যাওয়াই হয়ে উঠেছিল আরিয়ানের জীবনের একমাত্র সততা।
এক মেঘলা সন্ধ্যায়, হঠাৎ করেই রিসোর্টের লবিতে এসে দাঁড়ায় এক নারী। গায়ে হালকা নীল রঙের শাড়ি, পিঠজুড়ে ছড়ানো খোলা চুল। আরিয়ান রেসপন্স কাউন্টারে বসে ফাইল দেখছিল, হঠাৎ চেনা পারফিউমের সেই মাতাল করা সুবাস বাতাসে ভেসে আসতেই তার হাত থমকে গেল।
আরিয়ান মুখ তুলে তাকাল। সামনের মানুষটাকে দেখে তার বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে গেল।
তাসনিম!
তাসনিম শান্ত চোখে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চেহারায় সেই পুরনো ক্লান্তির কোনো ছাপ নেই, বরং ফুটে উঠেছে এক আত্মবিশ্বাসী ও দীপ্তিময়ী রূপ।
আরিয়ান ধীরপায়ে কাউন্টার থেকে বেরিয়ে এল। তার চোখ দুটো জলে ভরে উঠেছিল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। তার মনে কোনো আকুলতা প্রকাশ করার তাগিদ ছিল না, ছিল কেবল এক গভীর শ্রদ্ধা।
"তুমি... এখানে?" আরিয়ানের গলা কেঁপে উঠল।
তাসনিম একটু হাসল। "হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম। কেমন আছো আরিয়ান?"
"ভালো। তুমি কেমন আছো তাসনিম?" আরিয়ান মাথা নিচু করে বলল। সে সচেতনভাবেই তাসনিমের থেকে বেশ খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়েছিল, যেন তার উপস্থিতি তাসনিমকে আবার কোনো অস্বস্তিতে না ফেলে।
সেদিন রাতে বৃষ্টি নামল চা-বাগানের বুকে। আরিয়ান তাসনিমের ঘরে এক কাপ গরম কফি পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করল। কিছুক্ষণের মধ্যে তাসনিম নিজেই আরিয়ানের কটেজের বারান্দায় এসে হাজির হলো। বারান্দায় আবছা লালচে আলো জ্বলছিল, বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি। পরিবেশটা হুবহু তাদের সেই পুরনো রাতগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল।
তাসনিম এসে আরিয়ানের পাশে দাঁড়াল। আরিয়ান তাসনিমের দিকে একপলক তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিল।
"তুমি আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছ কেন আরিয়ান? একসময় তো আমাকে নিজের বুকের ভেতর বন্দি করে রাখতে চাইতে," তাসনিম নরম গলায় বলল, তার চোখে এক রহস্যময় আলো।
আরিয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, "কারণ তখন আমি তোমাকে ভালোবাসতাম না তাসনিম, আমি ভালোবেসেছিলাম তোমার ওপর আমার অধিকারকে। আমি তোমাকে একটা খাঁচায় বন্ধ করে নিজের পুতুল বানিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এই দুটি বছরে আমি বুঝেছি, ভালোবাসার আসল অর্থ মানুষকে মুক্ত করে দেওয়া, তাকে নিজের মতো বাঁচতে দেওয়া।"
আরিয়ান তাসনিমের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। সে তাসনিমের হাত স্পর্শ করল না, কিন্তু তার চোখের গভীরে ফুটে উঠল এক স্বর্গের মতো পবিত্র ও তীব্র ভালোবাসা।
"আমি আজও তোমাকে ভালোবাসি তাসনিম, জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ভালোবাসব। তবে এবার আর তোমাকে আমার নিজের করে পাওয়ার কোনো লোভ নেই। তুমি যার সাথেই থাকো, যেখানেই থাকো—তুমি হাসিমুখে স্বাধীনভাবে বাঁচো, সেটাই আমার একমাত্র চাওয়া। যদি কখনো তোমার কোনো প্রয়োজন হয়, তবে আমাকে তোমার পাশে একটি ছায়ার মতো পাবে, কোনো শৃঙ্খল হিসেবে নয়।"
আরিয়ানের গলার সুরের গভীরতা আর তার চোখের এই অভাবনীয় পরিবর্তন তাসনিমের হৃদয়কে পুরোপুরি নাড়িয়ে দিল। যে পুরুষটি একসময় ঈর্ষার আগুনে অন্ধ হয়ে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নিষ্পেষিত করত, সেই পুরুষটি আজ তার স্বাধীনতার সুরক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাসনিম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে এক পা এগিয়ে এসে আরিয়ানের বুকের সাথে নিজেকে মিশিয়ে দিল।
আরিয়ান চমকে উঠে দু হাত তুলে রাখল, সে নিজে থেকে তাসনিমকে স্পর্শ করতে ইতস্তত করছিল।
"আরিয়ান... আমাকে জড়িয়ে ধরো," তাসনিম ফিসফিস করে বলল। "আমি কোনো শৃঙ্খলে বন্দি হতে আসিনি। আমি আমার সেই ভালোবাসার কাছে ফিরে এসেছি, যে নিজেকে বদলে আমার ভালোবাসার যোগ্য করে তুলেছে।"
আরিয়ানের চোখের কোণ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। সে ধীরেসুস্থে তাসনিমকে নিজের বাহুডোরে টেনে নিল। এই জড়িয়ে ধরায় কোনো হিংস্রতা ছিল না, ছিল না কোনো অন্ধ অধিকারবোধ—ছিল কেবল পরম শান্তি আর ভালোবাসার এক অনুভূতির মহাসমুদ্র।
আরিয়ান মুখ নিচু করে তাসনিমের কপালে তার ঠোঁট ছোঁয়ালা। তাসনিম তার চোখ দুটো বুজে ফেলে আরিয়ানের শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরল। তাদের ঠোঁট দুটো যখন একে অপরের উষ্ণতায় মিলে গেল, তখন বৃষ্টির শব্দ যেন এক ঐশ্বরিক সুরের মতো বাজতে লাগল। আরিয়ানের হাতের আঙুলগুলো তাসনিমের চুলের ভেতরে মিশে গেল, তার স্পর্শে ফুটে উঠছিল এক মাতাল করা প্রচ্ছন্ন রোমান্স—যার প্রতিটা ছোঁয়ায় ছিল ব্যাকুলতা, কিন্তু কোনো বিষাক্ততার স্থান ছিল না।
তাসনিম আরিয়ানের ঘাড়ে নিজের মুখ লুকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "তানভীরের কাছ থেকে আমি তোমার খবর পেতাম আরিয়ান। আমি দেখতে চেয়েছিলাম তুমি সত্যি বদলাও নাকি এটা তোমার সাময়িক নাটক। আজ আমি বুঝতে পেরেছি, তুমি শুধু নিজেকে বদলাওনি, তুমি আমাদের ভালোবাসাকে এক নতুন জন্ম দিয়েছো।"
আরিয়ান তাসনিমের চিবুক ধরে মুখটা ওপরে তুলল। বারান্দার আবছা লালচে আলোয় তাসনিমের ভিজে যাওয়া ঠোঁট দুটো প্রলুব্ধকর লাগছিল। আরিয়ান পরম ভালোবাসায় তাসনিমের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডোবাল—সে এক দীর্ঘ, গাঢ় এবং তীব্র অনুভূতির স্পর্শ, যা তাদের দুজনের আত্মাকে একসূত্রে বেঁধে ফেলল।
পরদিন সকালে চা-বাগানের ওপর সোনালী রোদ ফুটল। আরিয়ান আর তাসনিম পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছিল বাগানের সরু পথ ধরে। তারা আর একে অপরের হাত আঁকড়ে ধরে নেই, কিন্তু তাদের ছায়া দুটো পাশাপাশি হাঁটছিল এক অপরূপ স্থিরতায়।
তাদের ভালোবাসা অবশেষে তার গন্তব্য খুঁজে পেয়েছিল। যে ভালোবাসা একদিন ঈর্ষার বিষে দগ্ধ হয়ে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, সেই ভালোবাসাই আজ আত্মত্যাগ, বিশ্বাস আর শ্রদ্ধার আগুনে পুড়ে খাঁটি সোনা হয়ে নতুন করে ফুটে উঠল।
....