ঈর্ষার শিকলে বন্দি জীবন

রাতের ঢাকা শহরটা তখন আস্তে আস্তে নিঝুম হয়ে আসছে। গুলশানের ফ্ল্যাটের ছাদঘেঁষা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ছিল তাসনিম। বসন্তের হালকা হাওয়ায় তার খোলা চুলগুলো বারবার গাল স্পর্শ করে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই পেছন থেকে এক জোড়া শক্ত, উষ্ণ হাত এসে জড়িয় ধরল তার কোমর। ঘাড়ের কাছে আরিয়ানের উষ্ণ নিঃশ্বাস পড়তেই তাসনিমের শরীরে একটা মিহি শিহরণ খেলে গেল।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

"এত রাতে একা একা কী ভাবছো, তাসনু?" আরিয়ানের গলায় এক অদ্ভুত মাদকতা, যার মধ্যে ভালোবাসা আর অধিকারবোধ দুটোই এক তীব্র সুবাসের মতো মিশে আছে।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

তাসনিম একটু হেসে পেছনে ফিরে আরিয়ানের বুক জুড়ে মাথা রাখল। আরিয়ানের শরীরের সুবাস, সুতির শার্টের ভেতর থেকে আসা তার চেনা উষ্ণতা তাসনিমকে সবসময় এক অন্যরকম নিরাপত্তাবোধ দিত। তাসনিম আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে নরম সুরে বলল, "কিছু না আরিয়ান, বলছিলাম আকাশটা আজ কত সুন্দর, তাই না?"

 

আরিয়ান তার এক হাত তাসনিমের চিবুকে রেখে মুখটা কিছুটা ওপরে তুলল। তারপর তার অতল গভীর চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "আমার কাছে এই পৃথিবীর কোনো সৌন্দর্যই তোমার ওই চোখের চেয়ে বড় নয়।"

 

আরিয়ানের ঠোঁট দুটি নেমে এলো তাসনিমের ঠোঁটে। সেই স্পর্শে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, ছিল গভীর ভালোবাসার এক অপরিসীম তৃষ্ণা। ধীর, কিন্তু তীব্র সে চুম্বনে তাসনিম নিজেকে হারিয়ে ফেলছিল। আরিয়ানের হাতের আঙুলগুলো তাসনিমের চুলের ভেতর ঢুকে গেল, তাকে আরও শক্ত করে নিজের শরীরের সাথে চেপে ধরল। তাসনিমের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছিল, তার হৃদস্পন্দনের প্রতিটি ধাক্কা আরিয়ান নিজের বুকের ভেতর স্পষ্ট অনুভব করতে পারছিল। ভালোবাসা যখন এমন নিবিড় হয়, তখন পৃথিবীর সব নিয়ম যেন ফিকে হয়ে যায়। ওদের সেই একান্ত মুহূর্তে শুধুই ছিল অনুরাগের ছোঁয়া, একে অপরকে পুরোপুরি নিজের মধ্যে গলিয়ে নেওয়ার এক উন্মাদনা।

 

কিন্তু এই গভীর অনুরাগের ঠিক আড়ালেই যেন লুকিয়ে ছিল এক ভয়ঙ্কর কালবোশেখী। আরিয়ানের ভালোবাসা যেমন ছিল সাগরের মতো গভীর, তেমনি ছিল তপ্ত মরুর মতো ঈর্ষাপরায়ণ। তাসনিমকে সে এতটা ভালোবাসত যে, তাসনিমের জীবনের ওপর অন্য কারো সামান্যতম ছায়াও সে সহ্য করতে পারত না। আর এই অতি-অধিকারবোধই তাদের সুখে ভরা ভালোবাসার ঘরে ছোট ছোট ফাটল ধরাতে শুরু করেছিল।

 

সমস্যাটার নাম ছিল জাবেদ। জাবেদ তাসনিমের বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো বন্ধু। দুজনে একইসাথে পড়াশোনা করেছে, ক্যারিয়ারের শুরুর দিনগুলোতে একসাথে লড়াই করেছে। তাদের সম্পর্কের মধ্যে কোনোদিন প্রেমানুভূতির লেশমাত্র ছিল না, ছিল শুধুই নির্মল বন্ধুত্ব আর বোঝাপড়া। কিন্তু আরিয়ানের চোখে জাবেদ ছিল এক অদৃশ্য শত্রু, যে যেকোনো মুহূর্তে তাসনিমকে তার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারে।

 

পরদিন সন্ধ্যায় ধানমণ্ডির এক অভিজাত রেস্তোরাঁয় আরিয়ান আর তাসনিম বসে ছিল। একটা প্রজেক্টের কাজের সুবাদে জাবেদ তখন তাসনিমকে ফোন দিয়েছিল।

 

"হ্যাঁ জাবেদ, আমি প্রজেক্ট ফাইলটা রাতে পাঠিয়ে দেব... না না, কোনো সমস্যা নেই," খুব স্বাভাবিকভাবেই কথা বলছিল তাসনিম।

 

কিন্তু তাসনিম যখন ফোনটা টেবিলের ওপর রাখল, তখন দেখল আরিয়ানের মুখের মানচিত্র এক মুহূর্তে বদলে গেছে। আরিয়ানের উজ্জ্বল চোখ দুটো রাগে ও এক অজানা ভয়ে লাল হয়ে উঠেছে। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে তার।

 

"আবার ওই জাবেদ?" আরিয়ানের গলাটা অস্বাভাবিক রকমের নিচু কিন্তু ধারালো শোনালো।

 

তাসনিম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত সুরে বোঝানোর চেষ্টা করল, "আরিয়ান, প্লিজ! ও আমার প্রফেশনাল সহকর্মী আর পুরানো বন্ধু। একটা কাজের ব্যাপারে ফোন দিয়েছিল। তুমি সব কিছুকে এত জটিল করে ভাবো কেন?"

 

"আমি জটিল করে ভাবি?" আরিয়ানের গলার স্বর কিছুটা চড়ে গেল। সে সামনের দিকে ঝুঁকে তাসনিমের হাতটা চেপে ধরল—তবে এবার ভালোবাসায় নয়, এক তীব্র আক্ষেপে। "আমি দেখি যেভাবে ও তোমার দিকে তাকায়, আমি বুঝি যেভাবে সে তোমার সাথে কথা বলে! তুমি কেন বুঝতে পারছ না তাসনিম, ও তোমার অতটা কাছে আসার চেষ্টা করছে যা শুধুমাত্র আমার প্রাপ্য? তোমার হাসিতে, তোমার সময় কাটানোতে শুধু আমার অধিকার!"

 

"আরিয়ান, হাতটা ছাড়ো, সবাই দেখছে," তাসনিম অস্বস্তি আর বেদনায় নিচু গলায় বলল। "তুমি আমাকে অবিশ্বাস করছ? আমাদের পাঁচ বছরের ভালোবাসার মূল্য কি এইটুকু যে একটা সাধারণ ফোনের কারণে তুমি আমাকে সন্দেহ করবে?"

 

"এটা সন্দেহ নয় তাসনিম, এটা তোমাকে হারানোর ভয়!" আরিয়ানের গলায় ফুটে উঠল এক উন্মাদ জটলা। "আমি সহ্য করতে পারি না অন্য কেউ তোমার চিন্তায় স্থান পাবে। তুমি শুধুই আমার, কেবলই আমার!"

 

রেস্তোরাঁর বাতাসে তখন এক দমবন্ধ করা নীরবতা। তাসনিম আরিয়ানের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে যে ভালোবাসার আলো সে এতদিন দেখে এসেছে, সেখানে আজ স্পষ্ট দেখতে পেল এক বিষাক্ত ঈর্ষার ছায়া। আরিয়ানের ভালোবাসা তাকে আগলে রাখার বদলে যেন দিন দিন একটা শক্ত শিকল হয়ে উঠছিল, যা তার শ্বাস আটকে দিচ্ছে।

 

সে রাতে বাসায় ফেরার পরও তাদের মধ্যে ঝগড়া থামল না। আরিয়ানের মধ্যকার ঈর্ষার দানবটি যেন পুরো ঘরটা দখল করে নিয়েছিল।

 

"তুমি আজ আবার ওর সাথে প্রজেক্ট নিয়ে এতক্ষণ কথা বললে কেন?" আরিয়ান তাসনিমের হাত ধরে নিজের দিকে টানল। তার চোখ দুটি উত্তেজনায় কাঁপছিল।

 

"আরিয়ান, তুমি আমাকে মানসিক নির্যাতন করছ! আমার নিজস্ব একটা জীবন আছে, বন্ধুবান্ধব আছে, কাজ আছে। তুমি ভালোবাসা আর বন্দিদশার তফাত ভুলে যাচ্ছ!" তাসনিমের চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

 

আরিয়ান হঠাৎ তাসনিমকে বুকের সাথে চেপে ধরে তার গালে ব্যাকুলভাবে চুমু খেতে লাগল। "না না তাসনু, এমন বলো না! আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না। প্লিজ, জাবেদের সাথে আর কথা বলো না, আমার সহ্য হয় না!"

 

আরিয়ানের এই রূপ তাসনিমকে ভীষণ বিভ্রান্ত করে তুলছিল। এক মুহূর্তে সে প্রচণ্ড হিংস্র ও সন্দেহপ্রবণ, আর পর মুহূর্তেই আবার সে এক অবুঝ বাচ্চার মতো তাসনিমের কাছে ভালোবাসার ভিক্ষা চাইছে। সেই গভীর রাতে আরিয়ান যখন তাসনিমকে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের মধ্যে পিষে নিচ্ছিল, তাসনিম অনুভব করল—এই আদরে আর সেই আগের মতো শান্তি নেই। এই আলিঙ্গনে লেগে আছে বিষাক্ত সন্দেহের তীব্র গন্ধ।

 

আরিয়ানের উত্তপ্ত ঠোঁট তাসনিমের ঘাড় আর কাঁধে ছড়িয়ে পড়লেও, তাসনিমের মনটা তখন ভেতরে ভেতরে বরফ হয়ে যাচ্ছিল। সে বুঝতে পারছিল, যে ভালোবাসায় বিশ্বাস আর স্বাধীনতা থাকে না, সেই ভালোবাসা আদতে এক মস্ত বড় খাঁচা। আর এই খাঁচায় বন্দি হয়ে তারা দুজনই ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

 

নিঝুম রাতে আরিয়ান যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তাসনিম বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল—তাদের এই রঙিন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ আসলে কোথায়? ভালোবাসা কি সত্যিই মানুষকে এত অন্ধ, এত হিংস্র করে তুলতে পারে? উত্তর জানা ছিল না তাসনিমের, শুধু বুকের ভেতর এক অদ্ভুত কষ্ট দানা বাঁধছিল।

 

প্রথম পর্বের ঘটনার পর কয়েকটা সপ্তাহ যেন এক অশান্ত ঝড়ের মতো কেটে গেল। আরিয়ানের ঈর্ষা কমলো তো নাই, বরং দিন দিন তা যেন এক মারাত্মক ব্যাধিতে রূপ নিতে লাগল। তাসনিম কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে কথা বলছে, এমন কি সোশ্যাল মিডিয়ায় কার পোস্টে রিয়েক্ট করছে—সবকিছুতেই আরিয়ানের নজরদারি শুরু হলো। ভালোবাসা যেখানে মুক্ত বাতাসের মতো হওয়ার কথা ছিল, সেখানে তা রূপ নিল এক দমবন্ধ করা অন্ধকার ঘরে।

 

সেদিন ছিল শুক্রবার। বৃষ্টিভেজা এক অলস দুপুর। আরিয়ান তাসনিমের ধানমণ্ডির ফ্ল্যাটে এসেছিল। সারাদিন দুজনে একসাথে সময় কাটাবে, নিজেদের ভেতরের জমে থাকা মান-অভিমানগুলো ধুয়ে ফেলবে—এমনটাই কথা ছিল।

 

দুপুরের দিকে তারা একসাথে রান্না করছিল। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে তাসনিম যখন সালাদ কাটছিল, আরিয়ান পেছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরল তাকে। তাসনিমের পিঠের সাথে নিজের বুক মিলিয়ে, তার ঘাড়ে ও চিবুকে উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শ দিতে লাগল আরিয়ান। সেই স্পর্শে ছিল এক গভীর ব্যাকুলতা, এক ধরনের আদিম আকর্ষণ।

 

"তুমি শুধুই আমার, তাই না তাসনু?" আরিয়ানের নিচু ও গম্ভীর কণ্ঠস্বর তাসনিমের কানের কাছে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করল।

 

তাসনিম চোখ বন্ধ করে সেই স্পর্শ অনুভব করছিল। সে তো আরিয়ানকেই ভালোবাসে, তার এই উন্মাদের মতো ভালোবাসার তীব্রতাকেই সে একসময় নিজের ভাগ্য বলে মনে করত। তাসনিম আরিয়ানের দিকে ঘুরে দাঁড়াল, তার গলা জড়িয়ে ধরে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল আরিয়ানের ঠোঁটে। নিবিড় সে চুম্বনে দুজন দুজনকে যেন নতুন করে খুঁজে পাচ্ছিল। আরিয়ানের হাত ধীরে ধীরে তাসনিমের কোমর পেরিয়ে পিঠের খাঁজে নেমে গেল, তাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের কাছে টেনে নিল।

 

কিন্তু সেই মধুর ও গভীর ভালোবাসার মায়াজাল ভাঙতে সময় লাগল মাত্র কয়েক মুহূর্ত। তাসনিমের টেবিলের ওপর রাখা মোবাইল ফোনটি কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল জাবেদের নাম।

 

ফোন বাজার সাথে সাথে আরিয়ানের স্পর্শ মুহূর্তেই বদলে গেল। উষ্ণতা উবে গিয়ে সেখানে চলে এলো এক বরফশীতল হিংস্রতা। আরিয়ান এক ঝটকায় তাসনিমকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিল। টেবিল থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে জাবেদের নামটা দেখেই তার ফর্সা মুখটা রাগে লাল হয়ে উঠল।

 

"তুমি ওকে নিষেধ করোনি ফোন দিতে? আজও কেন সে তোমাকে ফোন দেবে?" আরিয়ানের গর্জন পুরো ফ্ল্যাটে ছড়িয়ে পড়ল।

 

তাসনিম শান্ত থাকার চেষ্টা করে বলল, "আরিয়ান, শান্ত হও! কাল প্রজেক্টের সাবমিশন আছে। অহেতুক চিল্লাচিল্লি করো না।"

 

"অহেতুক?" আরিয়ান হিংস্র হেসে উঠল। সে ফোনটা রিসিভ করে লাউডস্পিকার অন করল।

 

ফোন রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে জাবেদ খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, "হ্যালো তাসনিম, কালকের প্রেজেন্টেশনের স্লাইডগুলো কি রেডি? একটু কনফার্ম করলেই হতো।"

 

কিন্তু আরিয়ান কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে চিৎকার করে উঠল, "শোনো জাবেদ, শেষবারের মতো বলছি, তাসনিমের জীবন থেকে দূরে থাকো! এরপর যদি তোমাকে ওর আশপাশে দেখি, আমি কিন্তু ভালো হব না!"

 

ওপাশ থেকে জাবেদ কিছু বোঝার আগেই আরিয়ান ফোনটা দেয়ালের দিকে ছুড়ে মারল। সশব্দে ফোনটা ভেঙে চুরমার হয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল।

 

তাসনিম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছিল, কিন্তু সেই চোখে আজ আর কোনো ভয় ছিল না, ছিল এক চরম বিষাদ আর ঘেন্না।

 

"তোমার সাহস হয় কী করে আমার ফোন এভাবে ভাঙার? আরিয়ানের রূপটা আজ আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। তুমি আমাকে ভালোবাসো না আরিয়ান, তুমি শুধু আমাকে নিজের একটা সম্পত্তি মনে করো!" তাসনিমের গলা কাঁপছিল।

 

আরিয়ান কাছে এগিয়ে এসে তাসনিমের দুটো হাত শক্ত করে চেপে ধরল। "আমি তোমাকে ভালোবাসি তাসনিম! আমি তোমাকে কারো সাথে ভাগ করে নিতে পারব না! তুমি কেন বুঝতে পারছ না, আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না?"

 

"না আরিয়ান, এটা ভালোবাসা নয়। এটা তোমার অসুস্থ এক মানসিকতা," তাসনিম নিজের হাত দুটো ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলল। "ভালোবাসা মানুষকে স্বাধীনতা দেয়, তাকে নিরাপত্তা দেয়। কিন্তু তোমার এই বিষাক্ত ভালোবাসা আমাকে প্রতিদিন তিল তিল করে মেরে ফেলছে।"

 

"আমি শুধুই তোমাকে আগলে রাখতে চাই তাসনু!" আরিয়ান আবার তাকে বুকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করল, তার ঠোঁট তাসনিমের কপালে ও গালে স্পর্শ করাতে চাইল এক মাতাল আবেগে। কিন্তু তাসনিম এবার সজোরে তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।

 

"আর না আরিয়ান! অনেক হয়েছে। আমি আর এই সম্পর্কের দমবন্ধ করা পরিবেশে থাকতে পারছি না। আমরা শেষ।" তাসনিমের কণ্ঠে ছিল এক কঠিন সিদ্ধান্ত।

 

"কী বললে তুমি?" আরিয়ানের চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে তাসনিম এমন কিছু বলতে পারে।

 

"হ্যাঁ, আমি এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি। আজকের পর থেকে তুমি আর কখনো আমার সামনে আসবে না। আমার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করবে না।"

 

"তুমি সত্যি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে? সামান্য একটা ছেলের জন্য তুমি আমাদের এতদিনের প্রেম বিসর্জন দেবে?" আরিয়ানের গলায় এখন রাগ আর আকুতি একসাথে মিশে গেছে।

 

"কোনো ছেলের জন্য নয় আরিয়ান, আমি চলে যাচ্ছি তোমার ওই অন্ধ ঈর্ষা আর বিশ্বাসের অভাবের কারণে। তুমি নিজেই আমাদের ভালোবাসাটাকে ধ্বংস করেছ।"

 

তাসনিম আলমারি থেকে তার ব্যাগটা তুলে নিল। কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। আরিয়ান হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসে পড়ল। তার চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। যে আরিয়ান কখনো কারো সামনে মাথা নোয়ায়নি, সে আজ তাসনিমের পায়ের কাছে এসে হাত দুটো জড়িয়ে ধরল।

 

"আমাকে ছেড়ে যেও না তাসনু... প্লিজ! আমি আর কখনো এমন করব না। তুমি যা বলবে আমি তাই শুনব। কিন্তু আমাকে ছেড়ে যেও না, আমি মরে যাব!" আরিয়ানের গলার ভেজা ব্যাকুলতা পুরো ঘরে প্রতিধ্বনি তুলল।

 

তাসনিম এক মুহূর্তের জন্য থামল। আরিয়ানের এই কান্না তার বুকটা টেনে ছিঁড়ে ফেলছিল। ইচ্ছা করছিল আরিয়ানকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে সব ঝগড়া ভুলে যেতে, আগের মতো তার ঠোঁটে ঠোঁট রেখে সব কষ্ট দূর করে দিতে। কিন্তু সে জানত, আজ যদি সে দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে এই নরকযন্ত্রণা সারাজীবন তাদের তাড়া করে বেড়াবে।

 

তাসনিম আস্তে করে নিজের পা দুটি ছাড়িয়ে নিল। "তুমি নিজেকে বদলাতে পারবে না আরিয়ান, কারণ তুমি ভুলটাই স্বীকার করো না। ভালো থেকো।"

 

দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল সশব্দে।

 

আরিয়ান একা বসে রইল নিঝুম খালি ঘরটায়। ঘরের বাতাসে তখনও তাসনিমের শরীরের সুবাস ঘুরে বেড়াচ্ছে, বিছানার চাদরে তখনও রয়ে গেছে তাদের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের স্মৃতি। কিন্তু তাসনিম নেই।

 

পরের কয়েকটা দিন আরিয়ানের জীবন থেকে দিন-রাতের পার্থক্য মুছে গেল। সে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিল, অফিস যাওয়া বন্ধ করে দিল। মদ আর সিগারেটের ধোঁয়ায় নিজের কামরাটাকে অন্ধকার করে রাখল। প্রতি রাতে সে বিছানায় তাসনিমের বালিশটা বুকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠত। সে অনুভব করত, তাসনিমের স্পর্শ না পেলে তার শরীর ও মন কীভাবে হাহাকার করে। সে বুঝতে পারছিল, নিজের যে ভয় আর ঈর্ষাকে সে ভালোবাসা বলে চালিয়ে এসছিল, সেই ভয়ই আসলে তার জীবনের সবচেয়ে বড় রত্নটাকে কেড়ে নিয়ে গেছে।

 

তাসনিমকে পাওয়ার জন্য সে এত উগ্র হয়ে উঠেছিল যে, সেই উগ্রতাই তাসনিমকে তার থেকে বহুদূরে ঠেলে দিল। এক গভীর নীল শূন্যতা আরিয়ানকে চারপাশ থেকে গিলে খেতে লাগল।

দিন, সপ্তাহ গড়িয়ে মাস পার হয়ে গেল। তাসনিম চলে যাওয়ার পর আরিয়ানের জগতটা যেন হঠাৎ করেই থমকে গিয়েছিল। প্রথম প্রথম যে রাগ আর অভিমান তার ভেতরে জ্বলছিল, আস্তে আস্তে তা রূপ নিল এক গভীর আত্মউপলব্ধিতে। বিষাদের সেই অন্ধকার দিনগুলোতে একা থাকতে থাকতে আরিয়ান নিজের ভেতরের আলো-আঁধারকে চিনতে শুরু করল।

 

সে বুঝতে পারল, তাসনিমের প্রতি তার যে ভালোবাসা ছিল, তা আসলে ভালোবাসা ছিল না—তা ছিল এক ধরনের অন্ধকার মালিকানাবোধ। নিজের ভেতরের আত্মবিশ্বাসের অভাব আর হারানোর ভয়কে সে তাসনিমের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল। তাসনিম তাকে বিশ্বাস করত, মন থেকে ভালোবাসত, কিন্তু আরিয়ান নিজের অন্ধ ঈর্ষা দিয়ে সেই পবিত্র সম্পর্ককে প্রতিদিন বিষাক্ত করে তুলেছিল। সে অনুতপ্ত হলো, নিজের ভুলগুলোকে মেনে নিল। এবার সে নিজেকে বদলাতে চাইল—তাসনিমকে ফিরিয়ে আনার জন্য নয়, বরং একজন ভালো মানুষ হওয়ার জন্য, যে সত্যিই ভালোবাসতে শেখে।

 

আরিয়ান আবার কাজে ফিরল, নিজেকে ব্যস্ত করে তুলল। সে শিখল কীভাবে মানুষকে তার নিজস্ব স্বাধীনতা দিয়ে সম্মান করতে হয়। তাসনিমের স্মৃতিগুলো এখনও তার বুকে একইভাবে তাজা, কিন্তু সেখানে আর কোনো উগ্রতা ছিল না, ছিল এক নির্মল ব্যাকুলতা আর ভালোবাসা। সে মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে নিয়েছিল—তাসনিম যদি কখনো আর ফিরে না আসে, তবুও সে সারাজীবন দূর থেকেই তাসনিমকে ভালোবেসে যাবে, তার সুখে সুখী হবে।

 

প্রায় এক বছর পরের কথা।

 

সেদিন বিকেলে আকাশ মেঘলা ছিল। হালকা বাতাস বয়ে যাচ্ছিল ধানমণ্ডি লেকের পাড়ে। আরিয়ান একটা বেঞ্চে বসে হ্রদের পানির দিকে তাকিয়ে ছিল। হাতে একটা বই, কিন্তু মনটা উড়ুউড়ু। ঠিক তখনই পাশ থেকে এক চেনা সুবাস আরিয়ানের নাকে এসে ধাক্কা দিল। সেই সুবাস—যা সে এক মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারেনি।

 

আরিয়ান চমকে উঠে পাশে তাকাল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে তাসনিম।

 

হালকা নীল রঙের শাড়িতে তাসনিমকে দেখতে এক অপ্সরীর মতো লাগছিল। কিন্তু তার চোখে ছিল এক গভীর কৌতূহল আর সংশয়।

 

আরিয়ান উঠে দাঁড়াল। দুজনের চোখাচোখি হলো। দীর্ঘ এক বছরের দূরত্ব যেন এক মুহূর্তে বাষ্প হয়ে উবে গেল। কিন্তু আরিয়ান আগের মতো উগ্র হয়ে ছুটে গেল না, কিংবা আকুতি জানিয়ে তাসনিমের হাত চেপে ধরল না। সে শুধু শান্ত চোখে তাসনিমের দিকে তাকিয়ে এক টুকরো বিষাদমাখা হাসি উপহার দিল।

 

"কেমন আছো, তাসনু?" আরিয়ানের গলার স্বর আজ ভীষণ শান্ত, নম্র ও পরিপক্ক।

 

তাসনিম একটু অবাক হলো। সে ভেবেছিল আরিয়ান হয়তো তাকে দেখে আবার ব্যাকুল হয়ে উঠবে, জড়াজড়ি করবে। কিন্তু আরিয়ানের এই শান্ত রূপ সে আগে কখনো দেখেনি।

 

"আমি ভালো আছি। তুমি কেমন আছো আরিয়ান?" তাসনিম মৃদু কণ্ঠে শুধাল।

 

"আমিও ভালো আছি," আরিয়ান লেকের দিকে তাকিয়ে বলল। "তোমার খবর আমি রাখতাম না বললেই চলে, তবে জেনেছিলাম তুমি নতুন একটা ফার্মে জয়েন করেছো। শুনে খুব ভালো লেগেছিল।"

 

দুজনে লেকের পাড় ধরে হাঁটতে শুরু করল। মাঝখানে খানিকটা দূরত্ব রেখে হাঁটছিল আরিয়ান, যেন তাসনিমের ব্যক্তিগত সীমানাকে সে কোনোভাবেই আঘাত না করে।

 

তাসনিম নীরবতা ভেঙে বলল, "তুমি আমাকে খুঁজতে যাওনি কেন? কিংবা ফোন করে কান্নাকাটি করোনি কেন?"

 

আরিয়ান একটু থমকে দাঁড়িয়ে তাসনিমের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন ভালোবাসার গভীর সাগরের সাথে মিশে আছে অগাধ শ্রদ্ধা।

 

"কারণ আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমার সেই উগ্রতা তোমাকে কষ্ট দিত," আরিয়ান ধীরে ধীরে বলল। "আমি তোমাকে এতটাই ভালোবাসতাম যে তোমাকে নিজের খাঁচায় বন্দি করে রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ভালোবাসা তো মুক্ত আকাশের মতো হওয়া উচিত। আমি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি তাসনু। আমি বুঝেছি, কাউকে ভালোবাসার অর্থ তাকে নিজের করে পাওয়া নয়, বরং তার সিদ্ধান্তকে সম্মান করা। তোমার চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিল, কারণ আমি তখন ভালোবাসার যোগ্য ছিলাম না।"

 

আরিয়ানের কথাগুলো শুনে তাসনিমের বুকের ভেতরটা এক অজানা আবেশে মুচড়ে উঠল। যে আরিয়ান ছিল প্রচণ্ড জেদী, অহংকারী আর ঈর্ষাপরায়ণ—সেই আরিয়ানের মুখে এমন আত্মোপলব্ধির কথা শুনে তাসনিমের চোখে জল এসে গেল। সে দেখতে পেল, আরিয়ান সত্যিই বদলে গেছে। তার ভেতরের সেই বিষাক্ত ঈর্ষার স্থান দখল করেছে অপরিসীম পরিপক্কতা।

 

"তাহলে এখন তুমি কী চাও আরিয়ান?" তাসনিম কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল।

 

আরিয়ান তাসনিমের আরও একটু কাছে এলো, তবে তার স্পর্শ এড়িয়ে খুব সাবধানে দাঁড়িয়ে বলল, "আমি এখন আর তোমাকে আমার নিজের করে পেতে চাই না তাসনু। আমি শুধুই তোমার পাশে থাকতে চাই। তুমি যদি অন্য কাউকে নিয়ে সুখী হতে চাও, আমি দূর থেকেই তোমার জন্য প্রার্থনা করব। আর যদি তুমি কখনো বন্ধু হিসেবেও আমার পাশে একটুখানি আশ্রয় খোঁজো, আমি আমার সবটুকু দিয়ে তোমার খেয়াল রাখব। কোনো অধিকারবোধ থেকে নয়, শুধু ভালোবাসার টানে।"

 

আরিয়ানের এই নিঃস্বার্থ আত্মসমর্পণ তাসনিমের ভেতরের শেষ বরফটুকুও গলিয়ে দিল। তাসনিম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে এক পদ এগোতেই আরিয়ানের বুকের ওপর আছড়ে পড়ল।

 

দীর্ঘ এক বছর পর আবার সেই চেনা বুক, সেই চেনা উষ্ণতা। আরিয়ান প্রথমে একটু থমকে গেলেও, পরের মুহূর্তেই তাসনিমকে নিজের বাহুদোরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। এবার সেই আলিঙ্গনে কোনো সংকোচ ছিল না, কোনো সন্দেহ ছিল না, ছিল শুধুই নিখাদ ভালোবাসার এক স্বর্গীয় শান্তি।

 

আরিয়ান ঝুঁকে তাসনিমের কপালে একটা দীর্ঘ, গভীর স্পর্শ দিল। তাসনিম তার মুখটা আরিয়ানের ঘাড়ে লুকিয়ে এক বুক শ্বাস নিল। আরিয়ানের ঠোঁট তাসনিমের গালে, চিবুকে আর শেষে তার ঠোঁটের ওপর নেমে এলো—এক অধীর, ব্যাকুল কিন্তু গভীর শ্রদ্ধাপূর্ণ ভালোবাসার ছোঁয়ায়। সেই নিবিড় চুম্বনে যেন তাদের সমস্ত বিষাদ, সমস্ত অনুযোগ ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল।

 

বৃষ্টির প্রথম ফোটাগুলো তখন ধানমণ্ডি লেকের পানিতে পড়তে শুরু করেছে। বৃষ্টির অঝোর ধারায় ভিজতে ভিজতে আরিয়ান আর তাসনিম একে অপরকে আঁকড়ে ধরে রাখল। তারা জানে, ঝড় থেমে গেছে। সম্পর্কের আকাশে আজ নতুন এক ভোরের আলো ফুটেছে—যেখানে আর কোনো সন্দেহ বা শৃঙ্খল নেই, আছে শুধু বিশ্বাস, সম্মান আর এক অসীম ভালোবাসার গল্প।

....
👁 11