দরজার বাইরে সারারাত

বিয়ের পর ছয় মাস কেটে গেছে। রাহাদ আর রিয়ার সংসারটা বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় একদম সুখের। দুপুরের রোদে তাদের ফ্ল্যাটের বারান্দায় ছোট্ট টবে লাগানো গোলাপ ফুটে আছে, রান্নাঘরে রিয়ার হাতের রান্না ভাজা মসলার গন্ধ ভাসে, আর রাতের বেলা দুজনের একই কম্বলের নিচে শুয়ে থাকার অভ্যাসটাও এখনো আছে। কিন্তু গভীরে কোথাও একটা ফাটল ধরেছে। সেই ফাটলটা কেউ দেখে না, শুধু দুজনেই টের পায়।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

রাহাদ অফিস থেকে ফিরত সন্ধ্যা সাতটার দিকে। আজ একটু দেরি হয়ে গেছে। প্রজেক্টের মিটিং টেনেছে। সে চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলতেই রিয়াকে দেখতে পেল সোফায় বসে। টিভি চালু আছে কিন্তু সে তাকিয়ে নেই। হাতে ফোন, চোখ নিচু।

“কেমন আছো?” রাহাদ জিজ্ঞেস করল, জুতা খুলতে খুলতে।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

রিয়া মাথা তুলল না। “খাবার রেডি আছে। টেবিলে।”

কণ্ঠস্বরটা শুকনো। রাহাদ একটু থমকে গেল। সে জানে এই সুর মানে কিছু একটা হয়েছে। সে বাথরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে এল। টেবিলে দুজনের জন্য থালা সাজানো। রিয়া তার অংশ নিয়ে সোফায় বসে খেতে শুরু করেছে। রাহাদ চেয়ারে বসল।

কিছুক্ষণ চুপচাপ খেল। তারপর রাহাদ বলল, “আজকের মিটিংটা অনেকক্ষণ ধরে চলছিল। ক্লায়েন্ট শেষ মুহূর্তে চেঞ্জ চেয়েছে।”

রিয়া চামচটা নামিয়ে রাখল। “তোমার মোবাইলটা কি অফিসে রেখে এসেছো?”

রাহাদ চমকে তাকাল। “না। কেন?”

“কারণ আমি দুপুরে তিনবার ফোন করেছিলাম। একবারও ধরোনি। মেসেজও দেখোনি।”

রাহাদের কপালে ভাঁজ পড়ল। সে ফোনটা বের করে দেখল। নোটিফিকেশন অনেক। রিয়ার কল মিসড। আরও কিছু অফিসের মেইল। “সরি। মিটিংয়ে ফোন সাইলেন্ট করে রেখেছিলাম। পরে দেখতে ভুলে গেছি।”

রিয়া হালকা হাসল। সেই হাসিটা রাহাদের বুকের ভিতরটা চিরে দিল। “ভুলে গেছো। ঠিক আছে। আমিও ভুলে যাব।”

রাহাদ থালা ছেড়ে উঠে এসে রিয়ার পাশে বসল। “রিয়া, এমন করে কথা বলো না। আমি সত্যিই ব্যস্ত ছিলাম।”

রিয়া তার দিকে তাকাল। চোখে অভিমান। “তুমি সবসময় ব্যস্ত। বিয়ের আগে বলতে তোমাকে সময় দেবো। এখন দেখো, আমি একা একা দিন কাটাই। দুপুরে যখন তোমার খবর নেওয়ার জন্য ফোন করি, তখন তোমার ফোন সাইলেন্ট। রাতে যখন তুমি ফিরো, তখন ক্লান্ত। আমি কি শুধু রান্না করে, ঘর পরিষ্কার করে, তোমার জন্য অপেক্ষা করে থাকার জন্যই বিয়ে করেছি?”

রাহাদের ভিতরে একটা রেগে ওঠার অনুভূতি জেগে উঠল। সে চেষ্টা করল শান্ত থাকতে। “তুমি জানো আমি প্রমোশনের জন্য কাজ করছি। এই প্রজেক্টটা যদি ভালো হয় তাহলে আমাদের অবস্থা পালটে যাবে। তুমিও তো চাও না আমি চিরকাল জুনিয়র থাকি।”

“আমি চাই তুমি আমার সাথে থাকো।” রিয়ার গলা কেঁপে উঠল। “গতদিন তোমার সাথে একটু সময় কাটিয়েছি? গত সপ্তাহে তুমি শনিবারও অফিস গিয়েছিলে। রবিবার ঘুমিয়ে কাটালে। আমি একা সিনেমা দেখলাম। একা বাজার করলাম। একা রাতের খাবার খেলাম।”

রাহাদ উঠে দাঁড়াল। হাতের চামচটা টেবিলে রেখে দিল। “তুমি যেন সব দোষ আমার উপর চাপাচ্ছো। আমি কি ইচ্ছে করে ব্যস্ত হয়ে আছি? তুমিও তো জানো অফিসের চাপ কেমন।”

রিয়াও উঠে দাঁড়াল। “জানি। কিন্তু অফিসের চাপ মানে কি আমাকে ভুলে যাওয়া? বিয়ের পর থেকে তুমি বদলে গেছো রাহাদ। আগে তুমি রাত জেগে আমাকে কল করতে। এখন আমি ডাকলেও তুমি উত্তর দাও না।”

রাহাদের চোখ লাল হয়ে উঠল। “আমি বদলাইনি। তুমিই সবকিছুকে বড় করে দেখছো। একদিন ফোন না ধরতে পারলেই আমি খারাপ হয়ে গেলাম?”

“একদিন না। অনেকদিন।” রিয়ার চোখে জল এসে গেল কিন্তু সে মুছে ফেলল। “তুমি আর আমাকে ছুঁতেও চাও না। রাতে শুয়ে থাকো, কিন্তু তোমার মন অন্য জায়গায়। আমি যখন কাছে যাই, তুমি বলো ক্লান্ত। আমি কি শুধু তোমার ঘরের লোক? নাকি তোমার স্ত্রী?”

রাহাদ মুখ ঘুরিয়ে নিল। সে জানে রিয়া ঠিক কথাই বলছে। কিন্তু স্বীকার করতে তার অহংকার বাধা দিচ্ছে। “তুমি অতিরঞ্জিত করছো। আমি ভালোবাসি তোমাকে। কিন্তু প্রতিনিয়ত প্রমাণ দিতে হবে নাকি?”

রিয়া হাসল। কান্না মেশানো হাসি। “ভালোবাসা শুধু কথায় হয় না রাহাদ। কাজ দিয়ে দেখাতে হয়। তুমি শুধু কথা দিয়েছো। কাজ দিয়েছো না।”

সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল শোবার ঘরে। দরজা বন্ধ করে দিল। রাহাদ একা দাঁড়িয়ে রইল। খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। সে চেয়ারে বসে মাথায় হাত দিল।

রাত গভীর হয়ে এল। রাহাদ সোফায় শুয়ে পড়ল। শোবার ঘরের দরজা বন্ধ। ভিতর থেকে কোনো আওয়াজ নেই। সে রিয়ার কথাগুলো মনে মনে ঘুরিয়ে ফিরে ভাবল। সত্যিই কি সে এতটা দূরে সরে গেছে? বিয়ের আগে তারা কত রাত জেগে কথা বলত। রিয়ার চোখে জল দেখলে রাহাদের বুক ফেটে যেত। এখন সেই রিয়া তার সামনে কাঁদছে আর সে শুধু রেগে যাচ্ছে।

সে উঠে গিয়ে শোবার ঘরের দরজায় হাত রাখল। “রিয়া… দরজা খোলো।”

কোনো সাড়া নেই।

“আমি সরি। ফোনটা সাইলেন্ট রেখেছিলাম সত্যিই। কিন্তু তুমি ঠিক বলেছো। আমি সময় দিইনি।”

ভিতর থেকে রিয়ার কণ্ঠস্বর ভেসে এল। ভাঙা ভাঙা। “যাও রাহাদ। আজ রাতটা আমাকে একা থাকতে দাও। আমি চাই না তোমার সামনে আর কাঁদি।”

রাহাদের গলা শুকিয়ে গেল। সে দরজার সামনে বসে পড়ল। পিঠ দেয়ালে লাগিয়ে। “আমি যাব না। তুমি যতক্ষণ না দরজা খুলছো, আমি এখানেই থাকব।”

ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল। রাহাদের পা অবশ হয়ে এল। শোবার ঘর থেকে কোনো শব্দ নেই। সে মনে মনে রিয়ার মুখটা দেখতে পেল। বিয়ের দিন রিয়া যখন হলুদ শাড়ি পরে হাসছিল, তখন রাহাদের মনে হয়েছিল পৃথিবীর সব সুখ তার হাতে। এখন সেই সুখটা কোথায় হারিয়ে গেছে?

ভোরের দিকে দরজা খুলল। রিয়া দাঁড়িয়ে। চোখ ফোলা। চুল এলোমেলো। সে রাহাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি সারা রাত এখানে বসেছিলে?”

রাহাদ উঠে দাঁড়াল। পা ব্যথা করছে। “হ্যাঁ।”

রিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, “চলো ভিতরে এসো। ঠান্ডা লাগবে।”

রাহাদ ঘরে ঢুকল। রিয়া বিছানায় বসল। রাহাদ তার পাশে। দুজনের মধ্যে একটু ফাঁক। কেউ কাউকে ছুঁল না।

রিয়া আস্তে বলল, “আমি রাগ করেছিলাম। কিন্তু অভিমানটা আরও বেশি। তুমি যখন আমাকে একা ফেলে যাও, তখন মনে হয় আমি গুরুত্বপূর্ণ নই। তোমার জীবনে আমি শুধু একটা অংশ, পুরোটা নই।”

রাহাদ তার হাতটা ধরতে গেল। রিয়া সরিয়ে নিল না। “তুমি আমার পুরোটা রিয়া। আমি শুধু… ভুলে গেছি কিভাবে দেখাতে হয়। অফিসের চাপ আমাকে গ্রাস করে ফেলেছে। কিন্তু তার মানে এই না যে আমি তোমাকে কম ভালোবাসি।”

রিয়া তার দিকে তাকাল। “তাহলে প্রমাণ করো। শুধু কথায় নয়। আজ রাত থেকে শুরু করো। আমাকে অনুভব করাও যে আমি তোমার স্ত্রী। শুধু ঘরের লোক নই।”

রাহাদ রিয়ার হাত দুটো নিজের হাতে নিল। আঙুলে বিয়ের আংটি জ্বলজ্বল করছে। সে আস্তে আস্তে রিয়ার কপালে চুমু দিল। “আজ থেকে চেষ্টা করব। প্রতিদিন।”

রিয়া চোখ বন্ধ করে রাখল। রাহাদের চুমুতে তার শরীরের রোয়া ভেঙে উঠল। কিন্তু ভিতরের অভিমানটা এখনো পুরোপুরি যায়নি। সে রাহাদের বুকে মাথা রাখল। “আমি ভয় পাই রাহাদ। ভয় পাই যে একদিন তুমি এত ব্যস্ত হয়ে যাবে যে আমাকে আর মনেই রাখবে না।”

রাহাদ তার চুল আলতো করে আঁচড়ে দিল। “সেই ভয়টা দূর করে দেবো। কথা দিচ্ছি।”

বাইরে আলো ফুটতে শুরু করেছে। দুজন শুয়ে রইল একে অপরের কাছে। কিন্তু ঘুম এল না কারোরই। রাহাদের মনে হচ্ছিল সে কিছু একটা হারিয়ে ফেলার পথে ছিল। রিয়ার মনে হচ্ছিল সে এখনো পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না।

সকাল হয়ে এল। রাহাদ উঠে চা বানাতে গেল। রিয়া বিছানায় শুয়ে রইল। জানালার বাইরে পাখি ডাকছে। সে মনে মনে ভাবল, আজ রাতের কথাগুলো কি সত্যিই পরিবর্তন আনবে? নাকি আবার সব আগের মতো হয়ে যাবে?

রাহাদ চা নিয়ে এল। দুজন চুপচাপ খেল। কথা কম। কিন্তু চোখে চোখ পড়লে একটা নরম অনুভূতি কাজ করে। রাহাদ অফিসে যাওয়ার আগে রিয়াকে জড়িয়ে ধরল। লম্বা করে। “আজ দুপুরে ফোন করব। সাইলেন্ট রাখব না।”

রিয়া মাথা নেড়ে বলল, “ঠিক আছে।”

রাহাদ চলে গেল। রিয়া দরজা বন্ধ করে একা দাঁড়িয়ে রইল। তার বুকে এখনো অভিমানের ছাপ আছে। কিন্তু তার সাথে মিশে আছে একটা আশাও। রাহাদ যদি সত্যিই চেষ্টা করে, তাহলে হয়তো তাদের ভালোবাসা আবার আগের মতো গভীর হয়ে উঠবে।

সে রান্নাঘরে গিয়ে রাহাদের প্রিয় ডিম ভাজি বানাতে শুরু করল। হঠাৎ তার মনে পড়ল বিয়ের পর প্রথম সপ্তাহের কথা। তখন তারা কতটা কাছাকাছি ছিল। রাতে ঘুমোতে যেত না। কথা বলত, হাঁসত, একে অপরকে চুমু দিত। এখন সেই সব স্মৃতি যেন অনেক দূরের।

রিয়ার চোখে আবার জল এসে গেল। সে মুছে ফেলল। আজকে সে রাহাদের জন্য বিশেষ কিছু রান্না করবে। হয়তো এভাবেই অভিমানটা কমবে। হয়তো রাহাদও বুঝবে যে তাকে কতটা দরকার।

সারাদিন রিয়া অপেক্ষা করল। দুপুরে রাহাদের ফোন এল। “কেমন আছো? খাবার খেয়েছো?”

রিয়ার মুখে হাসি ফুটল। “হ্যাঁ। তুমি?”

“মিটিংয়ে আছি। কিন্তু তোমার কথা মনে পড়ছিল। তাই ডাকলাম।”

রিয়ার গলা ভারী হয়ে এল। “ধন্যবাদ।”

ফোন কেটে গেল। রিয়া ফোনটা বুকে চেপে ধরল। ছোট্ট একটা শুরু। কিন্তু শুরু তো হয়েছে।

বিকেলে রিয়া বাজার করে এল। রাহাদের প্রিয় মাছ কিনল। রান্না করল যত্ন করে। সন্ধ্যায় রাহাদ ফিরল সময়মতো। দরজা খুলেই রিয়ার দিকে তাকিয়ে হাসল। “কী রান্না করেছো? গন্ধ পাচ্ছি।”

রিয়া হাসল। “খেয়ে দেখো।”

তারা একসাথে খেল। কথা হল অনেকক্ষণ। রাহাদ অফিসের গল্প বলল। রিয়া তার দিনের কথা বলল। রাতে তারা একসাথে বারান্দায় দাঁড়িয়ে চা দেখল। রাহাদ রিয়ার কোমরে হাত রাখল। রিয়া তার কাঁধে মাথা রাখল।

কিন্তু গভীরে এখনো একটা অমীমাংসিত অনুভূতি রয়ে গেছে। রিয়ার অভিমান পুরোপুরি যায়নি। রাহাদের মনে এখনো একটা দোষবোধ কাজ করছে। তারা দুজনেই জানে যে এই রাতটা শুধু একটা শুরু। আসল পরীক্ষা এখনো বাকি।

রাত গভীর হলে তারা বিছানায় এল। রাহাদ রিয়াকে জড়িয়ে ধরল। রিয়া তার বুকে শুয়ে রইল। কেউ কিছু বলল না। শুধু একে অপরের শ্বাস-প্রশ্বাস শুনল। বাইরে শহরের আওয়াজ। ভিতরে দুজনের নীরবতা।

রিয়া চোখ বুজে ভাবল, আগামীকাল কী হবে। রাহাদ কি তার কথা রাখবে? নাকি আবার ব্যস্ততার অজুহাতে দূরে সরে যাবে? সে রাহাদের বুকের উপর হাত রাখল। হৃদয়ের স্পন্দন অনুভব করল। এই স্পন্দনটাই তার একমাত্র ভরসা।

রাহাদও ঘুমাতে পারছিল না। সে রিয়ার চুলের গন্ধ নিল। মনে মনে বলল, আমি হারাতে চাই না তোমাকে। কখনো না।

এভাবেই কেটে গেল তাদের বিয়ের পরের এক রাত। রেগে, অভিমানে, আর গভীর ভালোবাসার এক অদ্ভুত মিশেলে। সকাল আসবে। নতুন দিন আসবে। আর তাদের গল্পও চলতে থাকবে।

সকালের আলো জানালা দিয়ে ঢুকে পড়ছিল। রিয়া এখনো রাহাদের বুকে শুয়ে। রাতভর ঘুম কম হয়েছে দুজনেরই। রাহাদের এক হাত রিয়ার কোমরে জড়ানো, অন্য হাতটা তার চুল আলতো করে আঁচড়াচ্ছে। কেউ কথা বলছে না। শুধু একে অপরের শরীরের উষ্ণতা অনুভব করছে।

রিয়া আস্তে বলল, “তুমি সত্যিই সারা রাত দরজার বাইরে বসেছিলে?”

রাহাদ তার কপালে চুমু দিয়ে উত্তর দিল, “হ্যাঁ। তোমার কান্না শুনে আমার ভিতরটা কেঁপে উঠেছিল। আমি জানতাম আমি ভুল করেছি।”

রিয়া মুখ তুলে তার চোখের দিকে তাকাল। “আমিও রেগে গিয়েছিলাম। কিন্তু রাগের চেয়ে অভিমানটা বেশি ছিল। মনে হচ্ছিল আমি তোমার জীবনে গৌণ হয়ে যাচ্ছি।”

রাহাদ তার হাত দুটো নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে চাপ দিল। “তুমি কখনো গৌণ নও। আমি শুধু হারিয়ে ফেলেছিলাম নিজেকে। অফিসের চাপ আমাকে এমন করে ফেলেছিল যে আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। আজ থেকে সেই ভুল আর হবে না।”

রিয়া হাসি দিল। ছোট্ট, একটু ভয় মেশানো হাসি। “দেখি তুমি কতদিন রাখতে পারো এই কথা।”

রাহাদ উঠে বসল। রিয়াকেও তুলে নিজের কোলে টেনে নিল। “দেখাবো। শুধু কথায় নয়। কাজ দিয়ে।”

সেই সকালটা অন্যরকম কেটেছিল। রাহাদ অফিসে যাওয়ার আগে নিজে চা বানিয়ে রিয়াকে এগিয়ে দিল। বিদায় নেওয়ার সময় তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “দুপুরে ফোন করব। আর আজ তাড়াতাড়ি ফিরব।”

রিয়া দরজায় দাঁড়িয়ে তাকে যেতে দেখল। বুকে একটা হালকা আশা জেগেছিল। কিন্তু অভিমানের ছাপ এখনো পুরোপুরি যায়নি। সে জানত, এক রাতের কথাতেই সব ঠিক হয়ে যায় না। সময় লাগে। বিশ্বাস ফিরে আসতেও সময় লাগে।

দুপুরে রাহাদের ফোন এল। ঠিক সময়ে। “খাবার খেয়েছো? কী করছো?”

রিয়ার মুখে হাসি ফুটল। “তোমার জন্য বিশেষ কিছু রান্না করছি। রাতে বলব।”

“আমি অপেক্ষা করছি।” রাহাদের গলায় একটা নরম অনুভূতি ছিল। “আজকে মিটিং শেষ করে সোজা বাড়ি ফিরছি। আর কোনো দেরি নয়।”

বিকেলের দিকে রিয়া রান্না শেষ করে গোসল সেরে নিল। হালকা গোলাপি শাড়ি পরল। চুলে হালকা তেল দিয়ে বাঁধল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখল। বিয়ের পর এই প্রথম সে নিজের জন্য এত যত্ন করছে। মনে হচ্ছিল আজ রাতটা গুরুত্বপূর্ণ।

সন্ধ্যা ছয়টার সময় দরজার ঘণ্টা বাজল। রাহাদ। হাতে একটা ছোট প্যাকেট। রিয়া দরজা খুলতেই সে হেসে বলল, “তোমার জন্য।”

প্যাকেট খুলে দেখে রিয়ার চোখ ছলছল করে উঠল। তার প্রিয় চকলেট আর একটা ছোট নোট। নোটে লেখা— “আমি জানি কথা দিয়ে সব হয় না। তাই আজ থেকে প্রতিদিন কিছু একটা করে দেখাবো যে তুমি আমার সব।”

রিয়া নোটটা বুকে চেপে ধরল। “তুমি…”

রাহাদ এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। “বলো না কিছু। শুধু অনুভব করো।”

তারা একসাথে রাতের খাবার খেল। আলো মৃদু করে রাখা। কথা হচ্ছিল অনেক। রাহাদ অফিসের গল্প বলছিল না আজ। বলছিল তাদের বিয়ের আগের দিনগুলোর কথা। যে রাতে প্রথম হাত ধরেছিল, যেদিন প্রথম চুমু দিয়েছিল, যেদিন রিয়া বলেছিল “আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই”।

রিয়া শুনছিল চোখ বড় করে। “তুমি এসব মনে রেখেছো?”

“সব। প্রতিটা মুহূর্ত।” রাহাদ তার হাত ধরে বলল, “শুধু ব্যস্ততার মধ্যে হারিয়ে ফেলেছিলাম। এখন ফিরে পেয়েছি।”

খাবার শেষে তারা বারান্দায় এল। রাতের বাতাস নরম। দূরে শহরের আলো জ্বলছে। রাহাদ রিয়ার পিছনে দাঁড়িয়ে দু হাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। ঠোঁট লাগাল তার ঘাড়ে।

রিয়ার শরীর কেঁপে উঠল। “রাহাদ…”

“বলো।”

“আমি এখনো একটু ভয় পাই। যদি আবার সব আগের মতো হয়ে যায়?”

রাহাদ তাকে ঘুরিয়ে নিজের দিকে তাক করল। দু হাত দিয়ে তার মুখ ধরে বলল, “হবে না। আমি প্রতিজ্ঞা করছি। তুমি যদি কোনোদিন মনে করো আমি দূরে সরে যাচ্ছি, সোজা বলে দিয়ো। আমি শুনব। আর ঠিক করব।”

রিয়ার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। এবার সে জল মুছে ফেলল না। রাহাদ আঙুল দিয়ে মুছে দিল। তারপর আস্তে আস্তে ঠোঁট ছুঁয়ে দিল রিয়ার ঠোঁটে।

চুমুটা গভীর ছিল। অনেক দিনের অভিমান, রাগ, একাকীত্ব সব যেন গলে গেল সেই চুমুর মধ্যে। রিয়া দু হাত তুলে রাহাদের গলা জড়িয়ে ধরল। রাহাদ তাকে আরও কাছে টেনে নিল। শরীরের সাথে শরীর। নিঃশ্বাসের সাথে নিঃশ্বাস।

বারান্দা থেকে তারা শোবার ঘরে এল। আলো নিভিয়ে দিল রাহাদ। শুধু জানালার বাইরের আলো আসছিল। রিয়া শাড়ির আঁচল খুলে ফেলল। রাহাদ তার কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসল। রিয়ার হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে চুমু দিল।

“আমি তোমাকে ভালোবাসি রিয়া। শুধু শরীর দিয়ে নয়। প্রাণ দিয়ে।”

রিয়া তার চুলের ভিতর আঙুল বুলিয়ে বলল, “আমিও। খুব।”

সেই রাতটা ছিল তাদের বিয়ের পরের সবচেয়ে গভীর রাত। তাড়াহুড়ো ছিল না। শুধু একে অপরকে অনুভব করার চেষ্টা। রাহাদ রিয়ার প্রতিটা অঙ্গে চুমু রাখল যেন ক্ষমা চাইছে। রিয়া তার বুকে মাথা রেখে শুনল হৃদয়ের স্পন্দন। যখন তারা এক হয়ে গেল, তখন শুধু দেহের মিলন ছিল না। ছিল দুটো ভাঙা অংশের জোড়া লাগানো।

পরে তারা একে অপরের বুকে শুয়ে রইল। ঘামে ভেজা শরীর। নিঃশ্বাস এখনো দ্রুত। রাহাদ রিয়ার পিঠে আলতো করে হাত বুলোচ্ছিল।

রিয়া ফিসফিসিয়ে বলল, “আজকের রাতটা আমি কখনো ভুলব না।”

রাহাদ তার কানে চুমু দিয়ে বলল, “আরও অনেক রাত আসবে এমন। আমি প্রতিদিন তোমাকে মনে করাব যে তুমি আমার সবচেয়ে প্রিয়।”

রিয়া হাসি দিল। এবার হাসিটা সম্পূর্ণ। অভিমানের ছায়া আর নেই। “তাহলে কাল থেকে শুরু হোক নতুন করে আমাদের সংসার।”

রাহাদ তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “শুরু হয়ে গেছে। আজ রাত থেকেই।”

ভোরের দিকে রিয়া ঘুমিয়ে পড়ল রাহাদের বুকে। রাহাদ জেগে রইল কিছুক্ষণ। জানালার বাইরে আলো ফুটছে। সে রিয়ার ঘুমন্ত মুখ দেখল। শান্ত, সুখী। মনে হল, এই মুখটা দেখার জন্যই সে বাঁচে। অফিসের প্রমোশন, টাকা, সাফল্য— সবকিছুর চেয়ে বড় এই মানুষটা।

সে মনে মনে বলল, আর কখনো তোমাকে একা ফেলব না। কখনো না।

সকাল হলে রাহাদ দেরি করে অফিসে গেল। যাওয়ার আগে রিয়াকে বিছানায় চুমু দিয়ে বলল, “আজ দুপুরে আমি এসে তোমাকে নিয়ে যাব। কোথাও ঘুরতে। ছুটি নিয়েছি।”

রিয়া ঘুমন্ত চোখে তাকিয়ে হাসল। “সত্যি?”

“সত্যি। আজ থেকে আমাদের সময় শুরু।”

রাহাদ চলে গেল। রিয়া বিছানায় শুয়ে রইল। শরীরে এখনো রাহাদের স্পর্শের অনুভূতি। বুকে একটা অদ্ভুত শান্তি। অভিমান গলে গেছে। রাগ মিটে গেছে। থেকে গেছে শুধু গভীর ভালোবাসা।

দুপুরে রাহাদ এসে হাজির। রিয়াকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। নদীপাড়ে বসে বিকেলে চা খেল তারা। কথা বলল অনেক। হাঁসল। হাত ধরে হাঁটল। সূর্য ডোবার সময় রাহাদ রিয়ার কোমরে হাত রেখে বলল, “এভাবেই চলবে আমাদের জীবন। তুমি আর আমি। পাশাপাশি।”

রিয়া তার কাঁধে মাথা রেখে বলল, “হ্যাঁ। পাশাপাশি।”

রাত্রিবেলা বাড়ি ফিরে তারা আবার একে অপরের কাছে এল। এবার কোনো কথা লাগল না। শুধু চোখের ভাষায় সব বলা হয়ে গেল। রাহাদ রিয়াকে তুলে বিছানায় শোয়াল। আস্তে আস্তে তার শাড়ি খুলল। রিয়াও তার জামা খুলে দিল। দুজন নগ্ন হয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরল।

সেই রাতটা ছিল আরও গভীর। আরও নরম। রাহাদ রিয়ার প্রতিটা অংশকে ভালোবাসল যেন নতুন করে চিনছে। রিয়া তার নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাস মিলিয়ে দিল। যখন তারা চূড়ান্ত সুখে পৌঁছল, তখন রিয়ার চোখ দিয়ে আনন্দের জল গড়িয়ে পড়ল। রাহাদ সেই জল মুছে দিয়ে চুমু দিল।

পরে তারা একে অপরের বুকে শুয়ে কথা বলল। ভবিষ্যতের কথা। সন্তানের কথা। একসাথে বয়স হওয়ার কথা। রাহাদ বলল, “আমি চাই আমাদের বুড়ো বয়সেও তুমি আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমাও।”

রিয়া হেসে বলল, “আর আমি চাই তুমি তখনো আমাকে এভাবে জড়িয়ে ধরো।”

রাত গভীর হল। দুজন ঘুমিয়ে পড়ল একে অপরের বাহুতে। বাইরে শহর জেগে রইল। ভিতরে তাদের সংসারে নেমে এল এক গভীর শান্তি।

বিয়ের পরের সেই কঠিন সময়টা শেষ হয়ে গেল। রেগে, অভিমানে ভরা দিনগুলো পেছনে ফেলে তারা এগিয়ে গেল নতুন এক অধ্যায়ে। যেখানে ভালোবাসা শুধু কথায় নয়, প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজে প্রমাণিত হয়। যেখানে দুজন একে অপরকে হারাতে দেয় না কখনো।

সকালের আলো আবার এল। রাহাদ আর রিয়া একসাথে উঠল। চা বানাল একসঙ্গে। হাসল একসঙ্গে। আর জানল, তাদের গল্প এখনো শেষ হয়নি। বরং সবে শুরু।

....
👁 15