শত্রুতা ভেঙে গড়া সম্পর্ক

বিশ্ববিদ্যালয়ের খবরের কাগজের অফিস কক্ষটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হওয়া সত্ত্বেও ঘরের ভেতরের পরিবেশ ছিল প্রচণ্ড উত্তপ্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের চারতলার এই ছোট ঘরটিতে বাতাস যেন জমাট বেঁধে ছিল। মায়রা তার ল্যাপটপের কিবোর্ডে খটখট শব্দে টাইপ করে যাচ্ছিল, আর প্রতিটি ক্লিকের সাথে উপচে পড়ছিল তার রাগ। ঘরের অন্য কোণায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল জিয়ান। কাচের জানালার ওপারে বিকেলের থমথমে বৃষ্টি ঝরছিল, আর ঘরের ভেতরে জিয়ানের হাতে থাকা কফির কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছিল।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

"তোমার কি মনে হয় না জিয়ান, তোমার এই অহেতুক মাতব্বরিটা এই পুরো ইভেন্টের ১২ প্রজেক্টকে ডুবিয়ে দেবে?" মায়রা চোখ না তুলেই তীব্র গলায় বলল।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

জিয়ান কফিতে এক চুমুক দিয়ে ধীরপায়ে এগিয়ে এলো। ছাদ ঘেঁষা আলোটা তার তীক্ষ্ণ চোয়াল আর চওড়া কাঁধে এসে পড়েছে। জিয়ান দেখতে অসম্ভব সুপুরুষ, কিন্তু তার ভেতরের অহংকার আর বেপরোয়া ভাবটা মায়রার সহ্য হতো না। তাদের দুজনের পরিচয় শুরু থেকেই একধরনের অলিখিত যুদ্ধ দিয়ে। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এই ছেলেটা নিজেকে কী মনে করে, তা মায়রার আজ অবধি মাথায় আসেনি।

 

"অহেতুক মাতব্বরি?" জিয়ান মায়রার টেবিলের ঠিক সামনে এসে ঝুঁকে দাঁড়াল। তার গায়ের তীব্র পারফিউমের গন্ধ আর কফির সুবাস মিলিয়ে মায়রার শ্বাসনালীতে গিয়ে ধাক্কা দিল। জিয়ান নিচু গলায় বলল, "যে আইডিিয়াটা নিয়ে তুমি লাফাচ্ছ মায়রা, ওটা একটা তামাদি হয়ে যাওয়া ভাবনা। স্পন্সররা টাকা ঢালবে আমাদের আইডিিয়ায়, তোমার আদ্যিকালের কোনো সাহিত্যিক ধারণায় নয়।"

 

মায়রা ল্যাপটপের পর্দা এক ধাক্কায় নামিয়ে দিল। তার চোখের চাহনিতে যেন আগুন ফুটছিল। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সে জিয়ানের চোখের দিকে চাইল। জিয়ান তার চেয়ে পুরো এক মাথা উঁচু, কিন্তু মায়রা দমার পাত্রী নয়।

 

"আমার আইডিয়া আদ্যিকালের হতে পারে, কিন্তু অন্তত তাতে মানুষের মন ছোঁয়ার ক্ষমতা আছে। তোমার মতো ব্যবসায়ী চিন্তা আর যান্ত্রিক মাথায় ভালোবাসা বা সম্পর্কের সত্যি মূল্যটা ঢোকে না।" মায়রা আঙুল উঁচিয়ে বলল।

 

জিয়ানের ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে এক পা এগিয়ে এসে মায়রাকে টেবিলের সাথে প্রায় চেপে ধরল। ঘরের বাতিটা হঠাৎ করে হালকা কেঁপে উঠল বাইরে মেঘের ডাকের সাথে সাথে।

 

"ভালোবাসার মূল্য?" জিয়ান ফিসফিস করে বলল, তার নিঃশ্বাস মায়রার কানের কাছে এসে পড়ছিল, "যে মেয়েটা সারাদিন মেজাজ দেখিয়ে পুরো ডিপার্টমেন্ট মাথায় তুলে রাখে, সে ভালোবাসার কথা বলছে? বেশ হাস্যকর।"

 

মায়রার বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছিল। রাগ আর বিরক্তি তার রক্তে ফুটন্ত পানির মতো ফুটছিল, কিন্তু জিয়ানের এই হঠাৎ কাছে চলে আসাটা তার ভেতরে এক অদ্ভুত, অনাকাঙ্ক্ষিত কাঁপুনি তৈরি করছিল। দুজন মানুষের মধ্যে ব্যবধান তখন কয়েক ইঞ্চিরও কম। মায়রা জিয়ানের বুকের ওপর দুহাত দিয়ে ধাক্কা দিতে গেল, কিন্তু জিয়ান তার এক হাত দ্রুত ধরে ফেলল।

 

জিয়ানের হাতের তালুর উত্তাপ মায়রার ঠান্ডা কব্জিতে ছড়িয়ে পড়তেই মায়রা থমকে গেল। দুজন দুজনের চোখের দিকে তাকাল—সেখানে ঘৃণার চেয়েও বেশি কিছু একটা ধিকধিক করে জ্বলছিল। এক তীব্র, অবাধ্য আকর্ষণ, যা তারা দুজনই এতদিন অস্বীকার করার আপ্রাণ চেষ্টা করে এসেছে।

 

"হাত ছাড়ো জিয়ান," মায়রা স্বর সামলে নিয়ে বলল, যদিও তার কণ্ঠস্বর সামান্য কেঁপে উঠেছিল।

 

"নাহলে কী করবে?" জিয়ানের চোখ দুটো অন্ধকার হয়ে এলো। সে মায়রার হাতের কব্জি না ছেড়ে আরও একটু কাছে টেনে নিল। তাদের শ্বাসের আদান-প্রদান হচ্ছিল এক অবিশ্বাস্য গতিতে।

 

"আমি তোমাকে সহ্য করতে পারি না, জিয়ান। তুমি আমার দেখা সবচেয়ে অহংকারী লোক," মায়রা তার মুখটা জিয়ানের ঠিক সামনে এনে তীব্রভাবে বলল।

 

"প্রমাণ করো," জিয়ান চাপা কণ্ঠে গর্জে উঠল, "প্রমাণ করো যে তুমি আমাকে সহ্য করতে পারো না, মায়রা। কারণ তোমার এই কাঁপতে থাকা ঠোঁট আর আমার দিকে চেয়ে থাকা চোখ অন্য কথা বলছে।"

 

পরের মুহূর্তেই জিয়ান মায়রাকে কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না। এক অভূতপূর্ব আবেশে সে মায়রার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের দিকে টেনে আনল। মায়রা প্রতিবাদ করার জন্য মুখ খুলতেই জিয়ান অত্যন্ত তৃষ্ণার্ত ভঙ্গিতে তাকে নিজের ঠোঁটের মধ্যে টেনে নিল।

 

সেটা কোনো শান্ত চুম্বন ছিল না। ওটা ছিল দুটো অশান্ত ঝড়ের মুখোমুখি ধাক্কা। মায়রার ভেতরের সমস্ত রাগ যেন এক মুহূর্তেই অন্য এক তীব্র আকাঙ্ক্ষায় রূপ নিল। সে জিয়ানের চুলে হাত গলিয়ে দিল, নিজের শরীরকে জিয়ানের শক্তিশালী বুকের সাথে মিশিয়ে দিল। মায়রা জিয়ানের পিঠের গেঞ্জি আঁকড়ে ধরল, তাদের ঠোঁটের টানাটানিতে কামনার এক মারাত্মক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ল পুরো নিস্তব্ধ ঘরটাতে।

 

জিয়ান মায়রাকে টেবিলের ওপর বসিয়ে দিয়ে তার দুপাশে হাত রেখে আরও গভীর করে নিতে লাগল সেই স্বাদ। মায়রার শ్వাসনালী প্রায় অবরুদ্ধ হয়ে আসছিল উত্তেজনায়। জিয়ানের হাতের স্পর্শ মায়রার শাড়ির কুঁচি পেরিয়ে পিঠের খোলা চামড়ায় গিয়ে ঠেকাতেই মায়রার মুখ দিয়ে একটা মৃদু গোঙানি বের হয়ে এলো। জিয়ান তার ঠোঁট মায়রার ঠোঁট থেকে সরিয়ে এনে গলায়, থুতনিতে তীব্রভাবে কামড়ে দিতে লাগল।

 

বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি নামার শব্দ। ঘরের ভেতরে শুধু দুটো মানুষের দ্রুত নিঃশ্বাসের শব্দ আর বাতাসের আর্দ্রতা। জিয়ানের হাত মায়রার ঘাড় বেয়ে নেমে তার পুরো অবয়বকে নিজের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। মায়রাও যেন তার সমস্ত প্রতিরোধ ভুলে গিয়ে জিয়ানের বুকে মাথা গুঁজে তার সুবাস টেনে নিচ্ছিল। এই তীব্র ঘৃণা, এই অপছন্দ কীভাবে এত দ্রুত কামনার আগুনে বদলে গেল, তা তারা কারও জানা ছিল না।

 

কয়েক মিনিট পর, যখন দুজনেরই শ্বাস নেওয়া কঠিন হয়ে উঠল, জিয়ান ধীরে ধীরে নিজের ঠোঁট মায়রার গলা থেকে সরিয়ে আনল। তার চোখ দুটি তখনও ধোঁয়াটে, ভালোবাসার তীব্রতায় আচ্ছন্ন। মায়রা তার কাঁপতে থাকা হাত দুটো জিয়ানের বুক থেকে সরিয়ে নিল, তার বুক তখনও ওঠানামা করছিল।

 

মায়রা দ্রুত টেবিল থেকে নেমে নিজের পোশাক আর শাড়ি গুছিয়ে নিল। তার নিজের ওপরই প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল। কীভাবে সে এই অহংকারী লোকটার ফাঁদে নিজেকে সঁপে দিল?

 

"এটা একটা ভুল ছিল," মায়রা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, তার গাল দুটো তখনও লাল হয়ে ছিল।

 

জিয়ান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের চুলগুলো হাত দিয়ে পেছনে ঠেলল। তার মুখের সেই বিষাক্ত হাসিটা আবার ফিরে এসেছিল, কিন্তু তার চোখের কোণে একধরনের প্রাপ্তির ছাপ ছিল স্পষ্ট।

 

"ভুল?" জিয়ান গম্ভীর গলায় বলল, "যে ভুলটা তুমি আমার সাথে করতে চাইছিলে বহুদিন ধরে, সেটাকে ভুল বলছ মায়রা? স্বীকার করো, তুমি আমাকে যতটা ঘৃণা করো, তার চেয়েও বেশি চাও।"

 

"চুপ করো তুমি!" মায়রা চিল চিৎকার করে উঠল। সে তার ব্যাগটা টেবিল থেকে তুলে নিয়ে দ্রুত দরজার দিকে হেঁটে গেল। কিন্তু দরজার হ্যান্ডেল ঘোরানোর আগে থমকে দাঁড়াল। পিছন ফিরে জিয়ানের দিকে তাকাল, যার চোখে তখনও সেই অনির্বাণ আগুন জ্বলছিল।

 

"আমাদের প্রজেক্টের কাজ শেষ হলে তোমার মুখ আর আমি দেখতে চাই না," মায়রা কঠিন গলায় বলল এবং দরজাটা সশব্দে বন্ধ করে বেরিয়ে গেল।

 

বৃষ্টির রাতে ঢাবি ক্যাম্পাসের ভেজা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মায়রার ঠোঁটে জিয়ানের সেই কামনাময় উত্তাপ তখনও জ্বলজ্বল করছিল। সে বুঝতে পারছিল, জিয়ান তার জীবনের এমন এক কালবৈশাখী ঝড়, যা সে সহ্য করতে পারে না, আবার যার থেকে সে নিজেকে বাঁচাতেও পারছে না। অন্যদিকে, ঘরের ভেতরে একা দাঁড়িয়ে থাকা জিয়ান জানালার কাচে হাত রেখে মুচকি হাসল। সে জানত, এই খেলার শুরু মাত্র, আর মায়রা চাইলেও তার এই তীব্র আকর্ষণের বলয় থেকে বের হতে পারবে না। কিন্তু জিয়ান নিজেই জানত না, তার অতীত থেকে এমন এক অন্ধকার সত্য তাড়া করে আসছে, যা মায়রার এই সদ্য জাগা অনুভূতিকে এক মুহূর্তেই চুরমার করে দেবে।

প্রথম পর্বের সেই কালবৈশাখী রাতের পর থেকে মায়রা আর জিয়ানের সম্পর্কের রসায়নটা পুরো বদলে গিয়েছিল। বাহ্যিক ঝগড়া আর তর্কের আড়ালে ঢুকে পড়েছিল এক মারাত্মক উন্মাদনা, এক গোপন টান। বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্জন লাইব্রেরির কোণে, ফ্যাকাল্টির পেছনের ছায়াঘেরা বাগানে কিংবা জিয়ানের ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে—তাদের দেখা হওয়া মানেই ছিল তীব্র, অবাধ্য কামনার বিস্ফোরণ। মায়রা নিজেকে প্রতিনিয়ত বোঝাতে চাইত যে এটা শুধু শারীরিক এক আকর্ষণের খেলা, কিন্তু জিয়ানের বুকের উত্তাপে মুখ গুঁজে যখন সে রাতের পর রাত পার করত, তখন তার মন গভীরে একধরনের অনুভূতির জন্ম নিচ্ছিল।

 

ক্যাম্পাসের প্রজেক্ট প্রায় শেষের দিকে। জিয়ান ইদানীং মায়রাকে নিয়ে অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়েছিল। মায়রার ছোটখাটো আবদার, তার রাগ কিংবা আলতো ছোঁয়া—সবকিছুতেই জিয়ান নিজেকে সঁপে দিত।

 

এক বিকেলে জিয়ানের ফ্ল্যাটে দুজনে একসাথে প্রজেক্টের ফাইল গুছাচ্ছিল। ঘর জুড়ে এসি-র ঠাণ্ডা বাতাস, আর বাতাসে হালকা পারফিউম ও কফির সুবাস। কাজ শেষ করে মায়রা যখন সোফায় এসে বসল, জিয়ান তার ল্যাপটপ সরিয়ে রেখে সোজা মায়রার কোলজুড়ে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল।

 

"তুমি দিন দিন ভীষণ অলস হয়ে যাচ্ছ, জিয়ান," মায়রা তার আঙুলগুলো জিয়ানের উস্কোখুস্কো চুলে গলিয়ে দিয়ে মৃদু হেসে বলল।

 

জিয়ান চোখ বন্ধ করে মায়রার একটা হাত টেনে নিয়ে নিজের ঠোঁটের ওপর রাখল। তারপর মায়রার হাতের তালুতে আলতো করে চুমু খেয়ে বলল, "তোমার কাছে এলে আমার পুরো পৃথিবী অলস হয়ে যায়, মায়রা। এই যে তুমি আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছ, এই অনুভূতিটার সামনে আর কোনো কাজ গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না।"

 

মায়রা তার দিকে ঝুঁকে পড়ল। জিয়ানের মুখে নেমে আসা এই কোমলতা তাকে বারবার মুগ্ধ করত। জিয়ান হঠাৎ করে সোজা হয়ে বসে মায়রার কোমর জড়িয়ে তাকে নিজের আরো কাছে টেনে নিল।

 

"তুমি আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছ, মায়রা," জিয়ান ফিসফিস করে বলল। তার ঠোঁট নেমে এলো মায়রার ঘাড়ের উন্মুক্ত অংশে।

 

মায়রার শরীর জুড়ে বিদ্যুতের মতো এক তীব্র শিহরণ খেলে গেল। সে জিয়ানের কাঁধ শক্ত করে ধরে মাথাটা পেছনে হেলে দিল। জিয়ানের তৃষ্ণার্ত ঠোঁট তার গলার ভাঁজে, থুতনিতে এবং ধীরে ধীরে নিচে নেমে এসে শাড়ির আঁচল সরিয়ে উন্মুক্ত বুকে ঠাঁই নিল। জিয়ানের প্রতিটি কামড়, প্রতিটি গভীর স্পর্শ মায়রাকে ভালোবাসার এমন এক তীব্র সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল যেখানে কোনো যুক্তি বা দ্বিমত টিঁকে থাকতে পারে না।

 

"জিয়ান..." মায়রা মৃদু গোঙানি দিয়ে জিয়ানের চুল আঁকড়ে ধরল।

 

জিয়ান মায়রাকে বাহুডোরে তুলে নিয়ে বিছানার দিকে হেঁটে গেল। নরম তোশকে মায়রাকে শুইয়ে দিয়ে সে তার ওপর নেমে এলো। দুজনের শরীরের উত্তাপে ঘরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণও যেন হার মানছিল। ঘামের সূক্ষ্ম বিন্দুতে ভেসে যাচ্ছিল দুজনের চামড়া। কামনার সেই চূড়ান্ত মুহূর্তে মায়রা জিয়ানের চোখে যে গভীরতা দেখেছিল, তা স্রেফ কামনার ছিল না—সেখানে ছিল একপ্রকার নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। মায়রাও তার সমস্ত আভিজাত্য ও অহংকার ভুলে জিয়ানের শরীরের গভীরে নিজেকে বিলীন করে দিল।

 

কিন্তু সেই উত্তপ্ত অনুভূতির রেশ বেশিক্ষণ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই কালবৈশাখীর থাবা নেমে এলো।

 

পরদিন সকালে জিয়ান বাথরুমে গিয়েছিল। মায়রা জিয়ানের টিশার্টটা গায়ে চাপিয়ে বিছানায় বসে কফি খাচ্ছিল। এমন সময় জিয়ানের ড্রয়ারের ভেতর রাখা একটা পুরোনো ল্যাপটপ থেকে মেসেজের শব্দ হতে লাগল। প্রজেক্টের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ফাইল থাকতে পারে ভেবে মায়রা ড্রয়ারটি খুলতেই একটি ডায়েরি আর কিছু নথিপত্র দেখতে পেল।

 

কৌতূহলবশত মায়রা নথিগুলো হাতে নিল। আর তাতেই তার পায়ের তলার মাটি সরে গেল।

 

ওগুলো ছিল মায়রার বাবার ছোট ভাইয়ের—অর্থাৎ মায়রার মরহুম চাচার ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের গোপন আর্থিক গরমিলের নথি এবং পুলিশের একটি ফাইল। মায়রার পরিবার কয়েক বছর আগে এক মারাত্মক আর্থিক কেলেঙ্কারিতে পড়ে সর্বস্ব হারিয়েছিল। যার পেছনে ছিল এক বিষাক্ত বিশ্বাসঘাতকতা। আর সেই ফাইলের প্রতিটি পাতায় সই ছিল জিয়ানের বাবার, এমনকি তাতে জিয়ানের নিজেরও একটা পুরোনো ক্ষমতার স্বাক্ষর ছিল!

 

শুধু তাই নয়, ডায়েরির একটা পাতায় জিয়ানের নিজের হাতের লেখায় স্পষ্ট লেখা ছিল—"মায়রাকে নিজের জালে ফেলা খুব কঠিন হবে না। ওকে প্রজেক্টের বাহানায় কাছাকাছি আনলেই ওর পরিবারের ফাইলগুলো গোপন রাখা যাবে এবং ওদের কোম্পানি পুরোপুরি দেউলিয়া বানানো সহজ হবে।"

 

মায়রার হাত থেকে ফাইলগুলো মেঝেতে পড়ে গেল। তার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। তার মানে? এতদিনের প্রেম, এতদিনের শারীরিক আর মানসিক আত্মসমর্পণ, সেই তীব্র রাতের ভালোবাসা—সবকিছুই কি ছিল একটা সাজানো নাটক? জিয়ান তাকে শুধু তাদের পরিবারের ক্ষতি ঢেকে রাখার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছিল?

 

বাথরুমের দরজা খুলে জিয়ান বের হতেই দেখল মায়রা মেঝের নথিপত্রগুলোর দিকে বাকরুদ্ধ হয়ে চেয়ে আছে।

 

"মায়রা... তুমি এগুলো..." জিয়ানের গলার স্বর আটকে গেল। তার মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে উঠল।

 

মায়রা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার চোখের সেই মিষ্টি আলো এক মুহূর্তে উধাও হয়ে সেখানে জমেছিল এক হিমশীতল ঘৃণা। তার চোখ থেকে এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু কণ্ঠস্বরে ছিল তীব্র বিষ।

 

"তুমি আমাকে স্পর্শ করেছিলে কীভাবে, জিয়ান?" মায়রা আর্তনাদ করে উঠল, "তোমার মতো এক বিষাক্ত, নোংরা জালিয়াতকে আমি নিজের শরীর আর মন সঁপে দিয়েছিলাম? তুমি আমাকে খেলাচ্ছ এত দিন ধরে?"

 

"মায়রা, শোনো! তুমি যা ভাবছ তা নয়! ডায়েরির ওই লেখাটা অনেক পুরোনো! আমি যখন তোমাকে চিনতাম না, তখন বাবা আমাকে..." জিয়ান মায়রার দিকে এগোতে চাইল, মায়রাকে ছোঁয়ার জন্য হাত বাড়াল।

 

"খবৰদার!" মায়রা গর্জে উঠল, "আমাকে একটা ছোঁয়াও দেবে না! তোমার স্পর্শে আজ আমার ঘৃণা হচ্ছে, জিয়ান। আমি নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছি যে আমি তোমার এই মিথ্যা ভালোবাসার অভিনয়ে ভেসে গিয়েছিলাম!"

 

"মায়রা, খোদার কসম, বিশ্বাস করো! শুরুটা যা-ই হোক না কেন, তোমাকে আমি সত্যি ভালোবেসে ফেলেছি! ওই নথিগুলো আমি ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিলাম!" জিয়ানের চোখে রক্তভেজা জল জমে উঠেছিল, তার অহংকারী কন্ঠস্বরে তখন আকুতি।

 

"মিথ্যা! সব মিথ্যা!" মায়রা জিয়ানের বুকে এক তীব্র ধাক্কা দিল, "তোমাদের লোভ আর নোংরা খেলার শিকার আমার পরিবার হয়েছে। আর আমি তোমার কামনার শিকার হয়েছি। আমাদের মধ্যে যা কিছু ছিল, সব এখানেই শেষ।"

 

মায়রা এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে সেখান থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। জিয়ান হাঁটু গেড়ে মেঝের ওপর বসে পড়ল, তার হাত দুটো গিয়ে ঠেকলো ছড়ানো কাগজগুলোর ওপর। মায়রার তীব্র ঘৃণাময় চাহনি তার বুকে তীরের মতো বিদ্ধ হয়েছিল।

 

পরের কয়েক সপ্তাহে মায়রা নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নিল। প্রজেক্ট জমা দেওয়ার পর সে জিয়ানের কোনো ফোন ধরে নি, তার সামনাসামনি হয়নি। ডিপার্টমেন্টে জিয়ানকে দেখলে সে এমনভাবে পাশ কাটিয়ে যেত যেন জিয়ান কোনো অদৃশ্য প্রেতাত্মা। মায়রার হৃদয়ে ভালোবাসার জায়গাটা এক মুহূর্তে এক বিষাক্ত মরুভূমিতে পরিণত হয়েছিল। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল, এই প্রতারককে সে আর কোনোদিন তার জীবনে ফিরতে দেবে না।

 

কিন্তু অন্যদিকে, জিয়ান তখন ভালোবাসার প্রকৃত আগুনে পুড়ছিল। সে বুঝতে পেরেছিল, মায়রাকে হারানোর যন্ত্রণা তার বেঁচে থাকার সমস্ত ইচ্ছেকে গ্রাস করে ফেলছে। আর সেই ভুল শুধরাতে জিয়ান যেকোনো ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্ত নিতেও পিছপা হবে না।

 

মায়রা চলে যাওয়ার পর জিয়ানের জীবন এক নিথর, স্তব্ধ মরুভূমিতে পরিণত হয়েছিল। এতদিন যে অহংকার আর বেপরোয়া ভাব নিয়ে সে চলত, তা মায়রার এক ফোঁটা চোখের জলের সামনে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। মায়রা তাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছিল। ফোন নম্বর পরিবর্তন, বাসা বদল আর ডিপার্টমেন্টে একপ্রকার অদৃশ্য প্রাচীর তুলে দিয়ে সে জিয়ানকে নিজের জীবন থেকে মুছে ফেলেছিল। কিন্তু জিয়ান জানত, এই ভাঙন তার নিজের সৃষ্টি, আর এর প্রায়শ্চিত্ত তাকেই করতে হবে—নিজের অস্তিত্ব বাজি রেখে হলেও।

 

বিগত তিন মাসে জিয়ান নিজেকে তিল তিল করে শেষ করে দিচ্ছিল। সে তার বাবার অন্যায় সাম্রাজ্যের মুখোমুখি দাঁড়াল। পরিবার আর নিজের ভবিষ্যৎ বাজি রেখে জিয়ান সেই গোপন ফাইলগুলো আদালতের সামনে তুলে দিল। মায়রার পরিবারের ওপর হওয়া অন্যায়ের ক্ষতিপূরণ দিতে এবং নিজের বাবার বেআইনি আর্থিক কারসাজি ফাঁস করতে জিয়ান বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি। যার ফলে তার নিজের বাবাকে আইনি সাজা ভোগ করতে হয় এবং জিয়ান তার নিজের সমস্ত পারিবারিক সম্পত্তি ত্যাগ করে এক শূন্য ভিটেয় এসে দাঁড়ায়।

 

সবকিছু উদ্ধার করে মায়রার বাবার হারিয়ে যাওয়া সমস্ত সম্পত্তি আর সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার পর, জিয়ান শুধু একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল—মায়রাকে শেষবারের মতো নিজের সত্যটা দেখানোর।

 

শ্রাবণের এক বিষণ্ণ বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে বৃষ্টি নামছিল মুষলধারে। মায়রা ছাতা মাথায় একা দাঁড়িয়ে ছিল বাস স্ট্যান্ডের নিচে। হঠাৎ তার সামনে এসে দাঁড়াল এক ছায়া।

 

মায়রা চোখ তুলে তাকাতেই স্তব্ধ হয়ে গেল। সামনের লোকটাকে চেনা দায়। তিন মাস আগের সেই দাম্ভিক, সুপুরুষ জিয়ান যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। জিয়ানের চেহারা শুকিয়ে গেছে, চোখের নিচে গভীর কালো দাগ, আর পরনের জামাকাপড় বৃষ্টিতে ভিজে একাকার। কিন্তু তার চোখের সেই আগুনে আর কোনো ছলনা ছিল না, ছিল স্রেফ এক অবিশ্বাস্য আত্মত্যাগ আর ভালোবাসা।

 

"এখানে কেন এসেছ জিয়ান?" মায়রা বরফশীতল কণ্ঠে বলল, যদিও তার বুকের ভেতরটা অচেনা এক যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠল, "তোমাকে আমি আগেই বলেছি, তোমার মুখ দেখতেও আমার ঘৃণা হয়।"

 

জিয়ান কোনো কথা না বলে নিজের পকেট থেকে একটা মোটা খাম বের করে মায়রার দিকে বাড়িয়ে দিল।

 

"এটা তোমার বাবার কোম্পানির সমস্ত আইনি নথিপত্র," জিয়ান ভাঙা গলায় বলল, বৃষ্টির জলের সাথে তার চোখের জল মিশে যাচ্ছিল, "তোমার পরিবারের ওপর যা অন্যায় হয়েছিল, তার সবটুকু শোধ করা হয়েছে। আমার বাবা এখন জেলে, আর আমি এখন নিঃস্ব। আমার কাছে আর কোনো ছলনা করার মতো অস্ত্র নেই, মায়রা।"

 

মায়রা থমকে গেল। খামটা হাতে নিয়ে ফাইলগুলো খুলতেই সে দেখতে পেল—তার বাবার নাম পুনরায় সসম্মানে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। জিয়ান তার নিজের পরিবারকে বিসর্জন দিয়ে মায়রার সম্মান ফিরিয়ে দিয়েছে।

 

"তুমি... তুমি এটা কেন করলে?" মায়রার গলা ধরে এলো।

 

"কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি," জিয়ান এক পা এগিয়ে এলো। তার শরীরটা বৃষ্টিতে কাঁপছিল, "প্রথম যখন তোমাকে জালে ফেলার পরিকল্পনা করেছিলাম, তখন আমি এক পাষাণ ছিলাম। কিন্তু তোমার সংস্পর্শে এসে আমি মানুষ হয়েছি। তোমার ভালোবাসার যে স্বাদ তুমি আমাকে দিয়েছিলে, তার সামনে আমার অহংকার, সম্পদ—সব ছাই হয়ে গেছে। আমি তোমাকে প্রতারণা করেছি, তাই শাস্তি আমারই প্রাপ্য ছিল।"

 

জিয়ান হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল ভেজা পিচঢালা রাস্তার ওপর। মায়রার হাতের ওপর নিজের মাথাটা রেখে এক শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে উঠল, "আমাকে তাড়িয়ে দাও মায়রা, মেরে ফেলো। কিন্তু এই ঘৃণা নিয়ে আমাকে বাঁচিয়ে রেখো না। আমি মরে যাচ্ছি প্রতিদিন।"

 

মায়রা আর নিজের বাঁধ ধরে রাখতে পারল না। হাতের ছাতাটা নিচে পড়ে গেল। বৃষ্টিতে ভিজে যেতে লাগল সে-ও। সে হাঁটু গেড়ে জিয়ানের মুখোমুখি বসল। মায়রার হাত দুটো গিয়ে ঠেকলো জিয়ানের ভেজা গালে। যে লোকটা তার জীবনের সবটুকু হারিয়ে আজ তার পায়ে লুটিয়ে পড়েছে, তাকে আর ঘৃণা করা যায় না। অনুশোচনার এই আগুনে জিয়ানের সমস্ত পাপ ধোয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেছে।

 

"উঠো জিয়ান..." মায়রা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, "তুমি নিজেকে এভাবে শেষ করে দিচ্ছ কেন?"

 

জিয়ান চোখ তুলে তাকাল। মায়রার চোখে আর সেই বিষাক্ত ঘৃণা নেই, সেখানে উপচে পড়ছে এক অপরিসীম আবেগ আর ভালোবাসা।

 

জিয়ান এক মুহূর্তও দেরি না করে মায়রাকে নিজের বুকে শক্ত করে টেনে নিল। সেই ভেজা রাস্তার মাঝখানেই, বৃষ্টির শব্দকে ছাপিয়ে দুটো হৃত্পিণ্ড একসাথে স্পন্দিত হতে লাগল। মায়রা জিয়ানের পিঠ আঁকড়ে ধরে নিজেকে সঁপে দিল জিয়ানের বুকে।

 

ঝড় থামার পর জিয়ান মায়রাকে নিয়ে এলো তার ছোট, নতুন ভাড়া করা ফ্ল্যাটটিতে। সেখানে কোনো আভিজাত্য ছিল না, কিন্তু ছিল এক পরম শান্তি।

 

ঘরের ভেতরে আবছা আলো। ভিজা জামাকাপড় বদলে মায়রা যখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, জিয়ান পিছন থেকে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। তার বুকের উত্তাপ মায়রার ঠান্ডা পিঠে গিয়ে ধাক্কা মারল।

 

"আমাকে ক্ষমা করেছ মায়রা?" জিয়ান ফিসফিস করে বলল, তার ঠোঁট মায়রার ঘাড়ে আলতো করে ছোঁয়াল।

 

মায়রা পিছন ফিরে জিয়ানের গলায় দুহাত পেঁচিয়ে ধরল। তার চোখে তখন ভালোবাসার এক নতুন আলো, "তোমাকে ক্ষমা না করলে যে আমি নিজেকেই ক্ষমা করতে পারতাম না, জিয়ান।"

 

পরের মুহূর্তে তাদের ঠোঁট দুটো আবার এক হয়ে গেল। কিন্তু এই চুম্বন আগের মতো কোনো ঝড়ের আক্রমণ ছিল না, এটা ছিল দুটো ক্ষতবিক্ষত আত্মার পুনর্মিলন। জিয়ান মায়রার শাড়ির আঁচল সরিয়ে তার উন্মুক্ত কোমরে হাত রাখল। জিয়ানের তৃষ্ণার্ত স্পর্শ মায়রার গলায়, বুকে, পেটে ছড়িয়ে পড়তে লাগল তীব্র কামনার এক দাবানল হয়ে।

 

জিয়ান মায়রাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। তাদের প্রতিটি আদান-প্রদান, প্রতিটি কামড় আর গভীর ছোঁয়ায় ফুটে উঠছিল তিন মাসের জমে থাকা হাহাকার। মায়রা জিয়ানের চুলে হাত গলিয়ে তাকে নিজের আরও গভীরে টেনে নিল। জিয়ানের শরীরের প্রতিটি পেশী যেন মায়রার ভালোবাসার স্পর্শে শিহরিত হচ্ছিল। কামনার সেই উত্তপ্ত রাতে তারা দুজনে ভেসে গেল এক অচেনা স্বর্গে, যেখানে অতীতের কোনো বিষাক্ত স্মৃতি আর তাদের স্পর্শ করতে পারছিল না।

 

ভোরের প্রথম আলো যখন জানালার পর্দা গলে ঘরের ভেতর এসে পড়ল, তখন জিয়ানের চওড়া বুকের ওপর মাথা রেখে শান্তিতে ঘুমিয়ে ছিল মায়রা। জিয়ান মায়রার কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

 

তীব্র অপছন্দ আর ঘৃণার যে বিষাক্ত বীজ দিয়ে তাদের গল্পের শুরু হয়েছিল, অনুশোচনার আগুন আর ভালোবাসার বৃষ্টিতে তা আজ এক চিরন্তন, গভীর প্রেমে রূপ নিয়েছে।

....
👁 15