রাতের ঢাকা শহরের বুক চিরে ছুটে চলা শীতল হাওয়া সামিরের ঘরের খোলা জানালায় এসে আছড়ে পড়ছিল। ঘরে মৃদু আলো, এক কোণে রাখা টেবিল ল্যাম্পটির ধূসর আলোয় সামিরের মুখচ্ছবি অত্যন্ত স্পষ্ট কিন্তু রহস্যময় দেখাচ্ছে। তার গভীর, তীক্ষ্ণ চোখের ভেতরে এক অধরা আগুনের শিখা জ্বলছিল—যে আগুন গত কয়েক বছর ধরে তাকে ভেতর থেকে তিলে তিলে জ্বালিয়ে নিঃশেষ করছে। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু পুরনো নথি, কয়েকটি ঝাপসা ছবি আর একটি খাম। সেগুলোর দিকে তাকিয়ে সামিরের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক নির্মম, চতুর হাসির রেখা।
সামিরের মনে ছোটবেলা থেকেই একটা সত্য পাথরের মতো গেঁথে গেছে। তার পরিবার, তার বাবার সাজানো ব্যবসা, সবকিছু হঠাৎ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পেছনে একটি নামই দায়ী—রহমান সাহেব। আর এলিনা হলো সেই রহমান সাহেবের একমাত্র আদরের মেয়ে। সামির বিশ্বাস করে, তার পরিবারের সমস্ত দুঃখ, অভাব এবং বাবার নিঃশব্দে চলে যাওয়ার একমাত্র মাস্টারমাইন্ড এলিনার বাবা। বহু বছরের জমে থাকা ক্ষোভ, কষ্ট আর অপমান সামিরকে এক নিখুঁত প্রতিশোধের পরিকল্পনার দিকে ঠেলে দিয়েছে। সে পণ করেছিল, রহমান সাহেবের সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ, তার মেয়ে এলিনাকে এমন এক ধ্বংসের মুখে দাঁড় করাবে, যেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো পথ থাকবে না।
কিন্তু সরাসরি আঘাত হানলে সেই কষ্টের গভীরতা উপলব্ধি করা যায় না। হৃদয় ভাঙার যন্ত্রণা সবচেয়ে তীব্র হয় তখন, যখন মানুষ ভালোবাসার সর্বোচ্চ শিখরে উঠে হঠাৎ নিচে আছড়ে পড়ে। আর তাই, সামির বেছে নিয়েছে এলিনার হৃদয় জয় করার পথ। সে এলিনার জীবনে একটি আকস্মিক ঝড়ের মতো আসবে, তাকে নিজের ভালোবাসার মায়াজালে বাঁধবে, আর তারপর তাকে নিঃস্ব করে ছুড়ে ফেলে দেবে।
পরিকল্পনামতো সামির এলিনার বর্তমান কর্মক্ষেত্র—একটি স্বনামধন্য আর্ট গ্যালারির যৌথ প্রদর্শনীতে নিজেকে শামিল করে। সামির আর্ট বা শিল্পকলার প্রতি খুব একটা আগ্রহী ছিল না কোনোদিন, কিন্তু এলিনার কাছে পৌঁছাতে হলে তাকে শিল্পের ভাষায় কথা বলতে হবে, তা সে খুব ভালো করেই জানত।
প্রথম দেখার দিনটির কথা সামিরের স্পষ্ট মনে আছে। ধানমন্ডির সেই সুসজ্জিত গ্যালারির এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল এলিনা। পরনে একটি সাধারণ কিন্তু মার্জিত জামদানি শাড়ি, চুলগুলো আলগা করে পিঠে ফেলা। তার চোখে ছিল এক অদ্ভুত ধরনের সরলতা ও আলো, যা গ্যালারির যেকোনো মূল্যবান চিত্রকর্মের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয়। এলিনা একটি বিশাল ক্যানভাসের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। সামির ধীরে ধীরে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়।
"ক্যানভাসের এই গাঢ় নীল রঙটা দুঃখের প্রতীক, তাই না?" সামিরের নিচু, গম্ভীর কণ্ঠস্বর এলিনার কান স্পর্শ করল।
এলিনা চমকে উঠে পেছন ফিরে তাকাল। সামিরের সুগঠিত চেহারা, তীক্ষ্ণ চোখ আর আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তিত্ব দেখে মুহূর্তের জন্য এলিনার শ্বাস আটকে এসেছিল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে মিষ্টি হেসে বলেছিল, "দুঃখ তো বটেই, তবে খেয়াল করে দেখুন, নীলের একদম গভীরে ছোট্ট একটা আলোর বিন্দু আছে। ওটা আশা। দুঃখের ভেতরেও আলো খুঁজে পাওয়াই তো শিল্পের সৌন্দর্য।"
সেদিনই সামির বুঝেছিল, এলিনাকে জয় করা কঠিন হবে না, কারণ তার মন কাঁচের মতো স্বচ্ছ।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে সামির অত্যন্ত চতুরতার সাথে এলিনার জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে নিজের উপস্থিতি অনিবার্য করে তোলে। কাকতালীয় সাক্ষাতের বাহানায় বৃষ্টিভেজা বিকেলে কফি শপে দেখা হওয়া, কাজের শেষে একসঙ্গে দীর্ঘ পথ হেঁটে যাওয়া, আর এলিনার প্রিয় বই বা শিল্পকলা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা—সামির এমনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেছিল যে এলিনা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে বিশ্বাস করতে শুরু করল।
এলিনার সরলতা সত্যি অবাক করার মতো ছিল। পৃথিবীর কোনো কলুষতা যেন তাকে স্পর্শ করেনি। সে সামিরকে তার জীবনের সেরা উপহার মনে করতে শুরু করেছিল। সামিরও তার এই চতুর খেলায় একবিন্দু আলগা দেয়নি। এলিনাকে নিজের প্রতি সম্পূর্ণ দুর্বল করে তোলার জন্য সে তার সমস্ত আকর্ষণ ও ব্যক্তিত্ব ব্যবহার করছিল।
আজ রাতে এলিনার জন্মদিনের অনুষ্ঠান শেষে সামির তাকে ধানমন্ডির লেকের ধারের একটি নির্জন স্থানে নিয়ে এসেছিল। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। লেকের পানির ওপর বৃষ্টির ফোঁটাগুলো পড়ে ছোট ছোট তরঙ্গ তৈরি করছিল। চারপাশে কৃত্রিম আলোর মৃদু প্রতিফলন।
এলিনা গাড়ির দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল, তার মুখে এক স্বর্গীয় তৃপ্তির হাসি। সামির তার খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দুজনের মাঝখানের দূরত্বটুকু যেন বাষ্প হয়ে উবে গেল। সামিরের চোখে কেবল প্রতিশোধের আগুন ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত মোহ—যা সে নিজেও স্বীকার করতে ভয় পাচ্ছিল।
"সামির, আজ আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর জন্মদিন," এলিনা নিচু স্বরে বলল। তার গলার আওয়াজ বৃষ্টির শব্দের সাথে মিলেমিশে এক অদ্ভুত সুর তৈরি করছিল।
সামির কোনো কথা বলল না। সে ধীরে ধীরে এলিনার কপালে হাত রাখল, তারপর তার ভেজা চুলগুলো আলতো করে কানের পেছনে সরিয়ে দিল। তার আঙুলের উষ্ণ স্পর্শ এলিনার শরীরে এক বিদ্যুৎ তরঙ্গ খেলিয়ে দিল। এলিনা চোখ বুজে ফেলল, তার শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হতে শুরু করল।
সামির এলিনার থুতনি ধরে তার মুখটি একটু ওপরে তুলল। এলিনার ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠছিল। সামির নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। প্রতিশোধের তীব্রতা নাকি এক আদিম আকর্ষণ—কোনটা তাকে চালিত করছিল, তা বলা কঠিন। সে অতি শক্তভাবে এলিনাকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল।
এলিনার কোমরে সামিরের শক্ত হাতের বাঁধন আর তাদের শরীরের মধ্যকার কোনো ব্যবধান রইল না। সামিরের ঠোঁট এসে নেমে এলো এলিনার উষ্ণ, আর্দ্র ঠোঁটে। সেই চুম্বন কেবল নম্র বা মৃদু ছিল না; তাতে ছিল এক গভীর উন্মাদের মতো তীব্রতা, এক ধরনের অধিকারবোধ। এলিনা প্রথমে কিছুটা চমকে উঠলেও মুহূর্তের মধ্যেই সে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিল সামিরের বাহুডোরে। সে তার দু'হাত সামিরের গলায় পেঁচিয়ে ধরে সেই গভীর আকর্ষণে সাড়া দিল।
লেকের ধারের বৃষ্টি, অন্ধকার আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের মাঝে তাদের শরীরের উষ্ণতা এক তীব্র গভীর ভালোবাসার পরিবেশ তৈরি করল। সামির এলিনার ঘাড়ে, গলায় তার ঠোঁটের স্পর্শ ছড়িয়ে দিচ্ছিল, আর এলিনা উত্তেজনায় সামিরের শার্টের কাপড় খামচে ধরেছিল। প্রতিটি স্পর্শে সামির তাকে নিজের মায়াজালে আরো শক্ত করে বাঁধছিল। এলিনা জানত না, এই পরম সুখের পেছনে লুকিয়ে আছে এক মারাত্মক বিষের থাবা।
গভীর রাতে যখন সামির এলিনাকে তার বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে এলো, তখনো তার শার্টে এলিনার পারফিউমের সুবাস আর ঠোঁটে তার উত্তাপ লেগে ছিল।
সামির আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের চোখের দিকে তাকাল। সেখানে তো প্রতিশোধের বিজয়োচ্ছ্বাস থাকার কথা ছিল, তবে কেন এক অজানা অসস্তি তার বুক চেপে ধরছে?
সে মনে মনে নিজেকে বারবার সতর্ক করল—"না, সামির! দুর্বল হলে চলবে না। ও রহমান সাহেবের মেয়ে। ওর সরলতা একটা অভিনয় ছাড়া আর কিছু নয়। তোকে তোর পরিবারকে ধ্বংস করার প্রতিশোধ নিতেই হবে। এলিনার এই সরল মন ভেঙে চুরমার করতেই হবে।"
কিন্তু ঘরে ছড়ানো সেই পুরনো খাম আর ছবির দিকে তাকিয়ে আজ আর আগের মতো তীব্র ক্ষোভ অনুভব করতে পারল না সে। এলিনার সেই নিষ্পাপ চোখ আর তার উষ্ণ স্পর্শ সামিরের পাথরের মতো শক্ত মনে কোথাও যেন একটা সূক্ষ্ম ফাটল ধরিয়ে দিয়েছিল।
প্রথম পর্বের ঘটনার পর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। সামির ও এলিনার সম্পর্ক এখন আরও অনেক বেশি নিবিড়, আরও বেশি গভীর। সামিরের তৈরি করা সেই মায়াজালে এলিনা নিজেকে শতভাগ সঁপে দিয়েছে। সামির যা ভেবেছিল, পরিস্থিতি ঠিক সেদিকেই যাচ্ছিল—এলিনা এখন সামিরকে ছাড়া নিজের জীবনের অস্তিত্ব কল্পনাও করতে পারে না। কিন্তু সামিরের নিজের মনের ভেতর এক চরম তোলপাড় শুরু হয়েছে।
প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্ত যখন সে এলিনার কাছাকাছি আসে, এলিনার অপরিসীম ভালোবাসা আর বিশ্বাস তাকে দংশন করে। এলিনা অত্যন্ত সহজ-সরল একটা মেয়ে। সে তার বাবার ব্যবসার গভীর কূটচাল কিংবা পরিবারের পুরনো ইতিহাস সম্পর্কে কিছুই জানে না। তার পৃথিবীটা কেবলই শিল্পকলা, ক্যানভাস, আর সামিরকে ঘিরে রচিত। সামির যতই নিজেকে বোঝাতে চায় যে এলিনা তার শত্রুর মেয়ে, ততই এলিনার নিষ্পাপ হাসি তার সব যুক্তি চুরমার করে দেয়।
একদিন রাতে সামির এলিনাকে নিয়ে তার নিজস্ব ফ্ল্যাটে আসে। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে, আর আকাশে মেঘের গর্জন। ঘরের ভেতরে আবছা আলো, এক কোণে সুবাসিত মোমবাতি জ্বলছে। বারান্দার কাঁচের দরজা বেয়ে বৃষ্টির জলধারা নেমে আসছে।
এলিনা সোফায় বসে এক কাপ গরম কফি উপভোগ করছিল। সামির তার পাশে গিয়ে বসল। এলিনা মৃদু হেসে সামিরের কাঁধে মাথা রাখল। সামির তার এক হাত এলিনার কাঁধের ওপর দিয়ে জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল।
"সামির, তোমার কাছে এলে আমার মনে হয় পুরো পৃথিবীটা স্থির হয়ে গেছে। মনে হয়, তোমার এই বুকে আমার চিরকালের আশ্রয়," এলিনা নিচু স্বরে বলল, তার কণ্ঠস্বরে গভীর আবেগ ও ভালোবাসা ছড়ানো।
সামিরের ভেতরে কোথাও একটা অপরাধবোধ মোচড় দিয়ে উঠল। সে এলিনার চোখের দিকে তাকাল। এলিনার চোখ দুটো ভালোবাসার আলোয় জ্বলজ্বল করছে। সামির তার আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে এলিনার চিবুক তুলে ধরে তার ঠোঁটে ঠোঁট মেলাল।
সেই চুম্বন ছিল অত্যন্ত কামনাময় এবং গভীর। বৃষ্টির শব্দের মাঝে তাদের দীর্ঘশ্বাস আর হৃদস্পন্দন যেন একাকার হয়ে যাচ্ছিল। সামির এলিনাকে সোফা থেকে তুলে ধীরে ধীরে বিছানার দিকে নিয়ে গেল। এলিনা কোনো বাধা দিল না, কারণ সে সামিরকে তার অস্তিত্বের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করে।
সে রাতে তাদের মধ্যকার দূরত্ব একেবারে বিলীন হয়ে গেল। ঘরের ভেতরের মোমবাতির আলোয় সামিরের প্রতিটি উন্মাদ স্পর্শ এলিনার শরীরে এক তীব্র শিহরণ ও শিহরিত উত্তাপ সৃষ্টি করল। সামিরের হাতের ছোঁয়া, তার তপ্ত নিঃশ্বাস এলিনার গলায়, বুকে ও শরীরে এক গভীর অধিকারবোধের ছাপ রেখে গেল। সামিরও সেই মুহূর্তগুলোর তীব্র আবেগে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল—সেখানে কোনো প্রতিশোধের হিসাব ছিল না, ছিল কেবল দুজন মানুষের এক আদিম ও গভীর ভালোবাসার মিলন।
কিন্তু সেই উত্তপ্ত ও মাতাল করা রাতের পরই এলো সবচেয়ে অন্ধকার সকাল।
পরদিন সকালে সামির যখন বাথরুমে ছিল, এলিনা ঘুম থেকে উঠে সামিরের পড়ার টেবিলটা গুছিয়ে দেয়ার কথা ভাবল। টেবিলের ওপর কিছু ড্রয়িং ও স্কেচ এলোমেলো হয়ে পড়ে ছিল। এলিনা হাসিমুখে সেগুলো গুছাতে গিয়ে একটি গোপন ফাইল আর মোটা খাম দেখতে পায়। খামের ওপর বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল তার বাবার নাম—"রহমান চৌধুরী"।
কৌতূহল বশত এলিনা খামটি খোলে। ভেতরে কী আছে দেখতে গিয়ে তার মুখের হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। সেখানে রয়েছে তার বাবার ব্যবসা সংক্রান্ত বহু পুরনো নথিপত্র, কিছু গোপন চুক্তিপত্র, আর সামিরের বাবার ছবি। শুধু তাই নয়, ডায়েরির একটি পাতায় সামিরের নিজের হাতের লেখায় স্পষ্ট লেখা আছে এক নির্মম পরিকল্পনার বিবরণ:
"রহমান চৌধুরীর মেয়েকে ব্যবহার করে তার হৃদয় ভাঙতে হবে। ওকে আমার প্রেমে অন্ধ করে এমন এক জায়গায় দাঁড় করাব, যেন ও সারা জীবন অনুশোচনায় বাঁধে। রহমান চৌধুরীকে নিঃস্ব করার এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রতিশোধ।"
কাগজগুলো এলিনার হাত থেকে মেঝেতে পড়ে গেল। তার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল এক মুহূর্তে। বুক চিরে এক অসহ্য কষ্ট দলা পাকিয়ে ওপরে উঠে এলো। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না যে মানুষটিকে সে নিজের জীবন সঁপে দিয়েছে, যে স্পর্শগুলো কাল রাতেও তাকে ভালোবাসার স্বর্গে নিয়ে গিয়েছিল—তার পুরোটাই ছিল একটা সাজানো নাটক, এক নির্মম চক্রান্ত!
ঠিক তখনই সামির তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে ঘর থেকে বের হলো। এলিনাকে টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এবং মেঝেতে ছড়ানো কাগজপত্র দেখে সামিরের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।
"এলিনা... তুমি এগুলো..." সামির এগোতে চাইল।
"আমার দিকে এক পা-ও এগোবে না সামির!" এলিনার চিৎকার যেন ঘরের নীরবতা চুরমার করে দিল। তার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়ছিল, কিন্তু সেই জলধারায় ভালোবাসার বদলে ছিল তীব্র ঘৃণা ও প্রতারিত হওয়ার কষ্ট।
"এলিনা, তুমি যা ভাবছ..." সামির তোতলাতে লাগল।
"আমি যা ভাবছি? না সামির, আমি যা দেখছি আর পড়ছি, সেটাই সত্যি!" এলিনা ভাঙা কণ্ঠে বলে উঠল। "তুমি আমাকে ভালোবাসোনি? তোমার এই স্পর্শ, কাল রাতের ওই ভালোবাসা, তোমার এতদিনের মিষ্টি কথা... সব নাটক ছিল? শুধুমাত্র আমার বাবার ওপর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তুমি আমার জীবনটা নিয়ে খেললে?"
"শোনো এলিনা, প্রথমে আমার উদ্দেশ্য ওটাই ছিল, আমি অস্বীকার করছি না। কিন্তু সত্যি বলছি, তোমার কাছে আসার পর আমি বদলে গেছি! আমি তোমাকে সত্যি ভালোবেসে ফেলেছি!" সামির ব্যাকুল হয়ে এলিনার হাত ধরতে গেল।
এলিনা ঝটকা মেরে সামিরের হাত সরিয়ে দিল। "চুপ করো! একদম চুপ করো! ভালোবাসার মতো পবিত্র শব্দটা তোমার মুখে শোভা পায় না। তুমি আমাকে ব্যবহার করেছ সামির। আমার সরলতাকে, আমার বিশ্বাসকে তুমি নিজের স্বার্থে পিষে ফেলেছ।"
এলিনা নিজের চোখের জল মুছে সামিরের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে আর কোনো দুর্বলতা ছিল না, ছিল কেবল এক কঠিন দেয়াল।
"আজকে আমাদের যা কিছু ছিল, সবকিছু এখানেই শেষ। আর কোনোদিন আমার সামনে আসার চেষ্টা করবে না," কঠিন গলায় বলল এলিনা।
কথাগুলো বলেই এলিনা আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। সামির স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে তার তৈরি করা ফাঁদেই আজ নিজে আটকা পড়ে গেছে। সে প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নিজের আসল ভালোবাসাটাকেই চিরতরে হারিয়ে ফেলল।
এলিনা চলে যাওয়ার পর সামিরের জগতটা যেন এক নিমেষে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। যে ফ্ল্যাটে কিছুদিন আগেও এলিনার উপস্থিতি, তার হাসির শব্দ আর তাদের ভালোবাসার উষ্ণতা বিরাজ করত, সেই ফ্ল্যাটটি এখন এক নিঃসঙ্গ গোরস্থানে পরিণত হয়েছে। সামির তার ঘরের টেবিলে ছড়ানো প্রতিশোধের সেই পুরনো নথিপত্রগুলো নিজের হাতে একে একে ছিঁড়ে আগুনে জ্বালিয়ে দিল। তার ভেতরের অন্ধ ক্ষোভের আগুন নিভে গিয়ে সেখানে জমেছে তীব্র অপরাধবোধ ও অনুশোচনার ছাই। সে বুঝতে পারল, রহমান চৌধুরীর প্রতি তার যে ক্ষোভ ছিল, তার চেয়ে শতগুণ বেশি অপরাধ সে করেছে এক নিষ্পাপ মেয়ের অনুভূতি নিয়ে খেলে।
সামির সত্যটা অনুসন্ধানের জন্য গভীরভাবে নামল। নিজের বাবার পুরনো কিছু সহকর্মীর সাথে যোগাযোগ করে সে জানতে পারল এক করুণ সত্য—তার বাবার ব্যবসার পতন বা দেউলিয়া হওয়ার পেছনে রহমান চৌধুরীর কোনো চক্রান্ত ছিল না। বরং সামিরের বাবাই ভুল বিনিয়োগ করে দেউলিয়া হয়েছিলেন, আর রহমান চৌধুরী শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু লোকলজ্জার ভয়ে সামিরের বাবা কাউকে কিছু না জানিয়ে নিখোঁজ হয়ে যান।
এই সত্য জানার পর সামিরের পায়ের তলার মাটি যেন আরেকবার কেঁপে উঠল। সে এতদিন যে ভুল ধারণার ওপর ভিত্তি করে এক নিষ্পাপ মেয়েকে কষ্ট দিয়েছে, তার কোনো ক্ষমা হয় না। কিন্তু সামির হার মানতে রাজি ছিল না। এলিনার ভালোবাসা যদি সত্য হয়, তবে তার প্রায়শ্চিত্তও হবে খাঁটি।
পরবর্তী এক বছর সামির এক অন্য মানুষে পরিণত হলো। সে আর এলিনার সামনে সরাসরি গিয়ে আকুতি-মিনতি করেনি, কিংবা জোর করে নিজের উপস্থিতি চাপিয়ে দেয়নি। বরং সে দূর থেকে নিঃশব্দে এলিনার ছায়া হয়ে রইল। এলিনার আর্ট গ্যালারির যেকোনো সমস্যায় সামির অচেনা কোনো সুহৃদ হয়ে সাহায্য পাঠাত। বৃষ্টিভেজা রাতে এলিনা যখন একা কাজ শেষে ফিরত, সামিরের গাড়ি কয়েক শ গজ পেছন থেকে নিশ্চিত করত যেন সে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছায়। এলিনা অসুস্থ হলে তার দরজায় গোপনে পৌঁছে যেত তার প্রিয় ফুল আর প্রয়োজনীয় ওষুধ।
এলিনা জানত এসব কে করছে। সে সামিরের এই নীরব উপস্থিতি অনুভব করতে পারত। কিন্তু তার আহত হৃদয় সহজে গলে যাওয়ার মতো ছিল না। প্রতারণার ক্ষত তখনও রিমরিম করে জ্বলছিল।
....