রাতের ঢাকা শহর তখন কিছুটা শান্ত, কিন্তু আরিশার ভেতরের ঝড়টা একটুও কমেনি। ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে সে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে ছিল, যদিও পর্দায় ফুটে থাকা অক্ষরের দিকে তার কোনো খেয়াল ছিল না। ঘরের আবহাওয়াটা এক অদ্ভুত নীরবতায় ভারী হয়ে আছে। একটু আগেই রুহান এসেছে।
রুহান ঘরে ঢুকতেই ঘরের পরিবেশটা যেন এক নিমেষে বদলে গেল। তার উপস্থিতি সবসময়ই বেশ স্পষ্ট, কিন্তু আজকাল আরিশার কাছে সেটা এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে। রুহান কোটটা খুলে সোফার ওপর রাখল এবং সোজা আরিশার দিকে হেঁটে এলো। তার চোখে ছিল এক গভীর, প্রায় ব্যাকুল চাহনি। সে আরিশার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াল, তার দুই হাত আরিশার কাঁধে রাখল। রুহানের স্পর্শে কোনো হালকাভাব ছিল না; তাতে ছিল এক তীব্র, অধিকারবোধের স্পষ্ট ছাপ।
"তুমি আজও আমার কল ধরোনি, আরিশা," রুহানের গলা বেশ নিচু, কিন্তু তাতে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ ও তীব্র আকুলতা ছিল। সে আরিশার কানের কাছে ঝুঁকে এসে কথাগুলো বলল। রুহানের তপ্ত নিঃশ্বাস আরিশার ঘাড়ে এসে লাগতেই সে হালকা কেঁপে উঠল।
"আমি অফিসে একটা মিটিংয়ে ব্যস্ত ছিলাম, রুহান। তোমাকে তো মেসেজ পাঠিয়েছিলাম," আরিশা নিচু স্বরে উত্তর দিল, নিজের গলা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে।
রুহান তার কোনো কথা শুনল না। সে আরিশার চুলগুলো পেছনে সরিয়ে দিয়ে তার ঘাড়ে হালকাভাবে ঠোঁট ছুঁয়ে দিল। এই স্পর্শের মধ্যে ভালোবাসার চেয়ে বেশি ছিল অধিকার জাহিরের চেষ্টা। সে আরিশার শরীর নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে তাকে দু'হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। রুহানের এই তীব্র আবেগ আর স্পর্শে এক ধরনের উন্মাদনা ছিল, যা আরিশাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলে, কিন্তু একই সাথে তার মনে হতে থাকে যেন তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।
"তুমি ভালো করেই জানো, তোমার কোনো কিছু আমার অজান্তে থাকা আমি সহ্য করতে পারি না," রুহান কথাগুলো বলে আরিশার চিবুক চেপে ধরে তার চোখের দিকে তাকাল। রুহানের চোখ দুটো ছিল গভীর এবং গভীর এক নেশায় আচ্ছন্ন। সে আরিশার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মেলাল—এক তীব্র, বাঁধভাঙা আবেগে। রুহানের চুম্বনের মধ্যে এক ধরনের তীব্র রোমান্স ছিল, কিন্তু সেই সাথে ছিল আরিশাকে সম্পূর্ণ নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার এক অনমনীয় চাওয়া।
আরিশা কয়েক মুহূর্তের জন্য রুহানের এই ব্যাকুলতায় হারিয়ে গিয়েছিল। রুহানের শরীরের উত্তাপ, তার সুবাস এবং তার বাহুডোরের শক্তি আরিশার মনে এক অদ্ভুত উত্তেজনার সৃষ্টি করছিল। কিন্তু পরক্ষণেই সে অনুধাবন করল, সে যেন এই আবেগের ভিড়ে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলছে। সে রুহানের বুকে হাত দিয়ে হালকা ধাক্কা দিল।
"রুহান, ছাড়ো... আমার দমবন্ধ লাগছে," আরিশা কষ্টেসৃষ্টে বলল।
কিন্তু রুহান তাকে ছাড়ার বদলে আরও শক্ত করে বুকে চেপে ধরল। সে যেন আরিশার উক্তিটা শুনতেই পায়নি। রুহান আরিশার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, "তুমি শুধু আমার, আরিশা। তোমাকে অন্য কারো কথা ভাবতে দেওয়া বা আমার কাছ থেকে দূরে যেতে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না।"
রুহানের এই অতিরিক্ত আঁকড়ে ধরার প্রবণতা আজ নতুন নয়। সম্পর্কের শুরুতে রুহানের এই চরম আগ্রহ আর প্রেম আরিশাকে ভীষণ আকর্ষণ করত। একজন পুরুষ তাকে এতটা গভীরভাবে ভালোবাসে, তার প্রতিটি মুহূর্তের খবর রাখতে চায়—এটাকে সে একসময় পরম ভাগ্য মনে করত। কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে, এই ভালোবাসা এক কঠিন বন্দিদশায় রূপ নিয়েছে। রুহানের ভালোবাসা এখন আর সুরক্ষার ছায়া দেয় না, বরং তা এক অদৃশ্য খাঁচা তৈরি করেছে, যেখানে আরিশার স্বাধীনভাবে নিঃশ্বাস নেওয়ারও অধিকার নেই।
রুহান আরিশার কোমড়ে হাত রেখে তাকে আরও কাছে টেনে নিল। তাদের মাঝের দূরত্ব তখন শূন্যে এসে ঠেকেছে। রুহানের উত্তপ্ত স্পর্শ আরিশার শরীর জুড়ে এক ধরনের শিহরণ জাগিয়ে তুলছিল সত্যি, কিন্তু একই সাথে তার মন চিৎকার করে উঠছিল এই মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। রুহানের চোখের ভেতরের উত্তাপ আর তীব্র ভালোবাসা আরিশাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছিল।
"তুমি কি বোঝো না, আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি?" রুহান আবারও বলল, তার গলার স্বর কিছুটা আবেগে কেঁপে উঠল। সে আরিশার গাল দুটো দুই হাতে ধরে নিবিড়ভাবে চুম্বন করতে লাগল। তার প্রতিটি স্পর্শে ফুটে উঠছিল এক চরম আকুলতা, যেন এক মুহূর্তের জন্যও সে আরিশাকে আলগা করলে তাকে হারিয়ে ফেলবে।
আরিশা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে অনুভব করতে পারছে, এই সম্পর্ক আর এগোতে পারে না। রুহানের এই তীব্র আবেগ, এই অতিরিক্ত অধিকারবোধ তাকে একটু একটু করে শেষ করে দিচ্ছে। ভালোবেসে কেউ কাউকেও এভাবে শিকল পরাতে পারে না।
"রুহান, প্লিজ একটু থামো," আরিশা নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জোর চেষ্টা করল। "ভালোবাসা মানে কাউকে বন্দি করা নয়। তুমি যা করছ, তা ভালোবাসা নয়, তা এক ধরনের আধিপত্য।"
রুহানের মুখটা নিমেষে কঠিন হয়ে উঠল। সে আরিশার হাত দুটো ধরে নিজের বুকের ওপর চেপে ধরে বলল, "তুমি এটাকে যাই বলো না কেন, আমি তোমাকে ছাড়তে পারব না। তুমি আমার জীবন, আর আমি আমার জীবনকে কখনো দূরে যেতে দেব না।"
রুহানের কথার দৃঢ়তা আর তার স্পর্শের অতিরিক্ত তীব্রতা আরিশাকে ভেতরে ভেতরে আরও বেশি ক্লান্ত করে তুলল। সে স্পষ্ট বুঝতে পারল, রুহানের কাছে সে কোনো আলাদা মানুষ নয়, বরং এক ভালোবাসার নামে গড়ে ওঠা সম্পত্তি। এই দমবন্ধ করা উত্তাপ আর মানসিকভাবে পিষে ফেলা ভালোবাসার বাঁধন থেকে বেরিয়ে আসা ছাড়া তার কাছে আর কোনো পথ খোলা নেই। সম্পর্কের এই টানাপোড়েন আর রোমান্সের আড়ালে থাকা তীব্র বন্দিদশা এবার এক চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছে।
সেই রাতের টানাপোড়েনের পর ঘরের বাতাস আর আগের মতো হালকা হলো না। সম্পর্কের ভেতরের বিষাক্ত অধ্যায়টি যেন চূড়ান্ত রূপ পেয়েছিল। আরিশা আর সহ্য করতে পারছিল না। রুহানের এই অতিরিক্ত অধিকারবোধ, প্রতিটা পদক্ষেপে নজরদারি আর আবেগের নামে মানসিকভাবে বন্দি করে রাখা—সবকিছু তার সহনশীলতার সীমা পার করে দিয়েছিল।
সেদিন সকালে আরিশা তার ছোট ব্যাগটা গুছিয়ে নিচ্ছিল। রুহান ঘরে ঢুকে তাকে ব্যাক প্যাক করতে দেখে চমকে উঠল। তার চোখে মুহূর্তেই ভেসে উঠল এক অবিশ্বাস্য ভয় আর তীব্র ক্ষোভ। সে দ্রুত এগিয়ে এসে আরিশার কবজি শক্ত করে ধরে ফেলল।
"এসবের মানে কী, আরিশা? তুমি কোথায় যাচ্ছ?" রুহানের গলার স্বর কিছুটা কাঁপছিল, কিন্তু তাতে ছিল এক প্রচণ্ড কর্তৃত্বের সুর।
আরিশা শান্তভাবে রুহানের চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে আজ আর কোনো দ্বিধা বা ভয় ছিল না, ছিল কেবল এক কঠিন সিদ্ধান্ত। সে নিজের হাতটা রুহানের মুষ্টি থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলল, "আমি চলে যাচ্ছি, রুহান। এই সম্পর্কের মধ্যে থেকে আমি আর নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। আমরা এখানেই শেষ করছি।"
"শেষ করছি মানে? তুমি এভাবে চাইলেই চলে যেতে পারো না!" রুহান গর্জে উঠল। সে আরিশাকে সোফার ওপর ধাক্কা দিয়ে বসিয়ে দিল এবং নিজে তার ওপর ঝুঁকে এল। রুহানের মুখটা ছিল চরম উত্তেজনায় লাল হয়ে থাকা। সে আরিশার দুই গাল চেপে ধরে তার ঠোঁটে এক হিংস্র, নিয়ন্ত্রণহীন চুম্বন বসিয়ে দিল। সেই চুম্বনে কোনো রোমান্স ছিল না, ছিল কেবল আরিশাকে নিজের দখলে রাখার এক শেষ করুণ প্রচেষ্টা।
রুহানের গায়ের তীব্র উত্তাপ আর তার শরীরের ভার আরিশাকে আবার সেই পুরোনো দমবন্ধ অনুভূতির দিকে ঠেলে দিল। রুহান তার ঘাড়ে ও বুকে ক্ষিপ্রতায় ঠোঁট মেলাচ্ছিল, যেন শরীরের স্পর্শ দিয়ে সে আরিশার মন পরিবর্তন করে ফেলবে। কিন্তু আরিশা এবার আর নিজেকে সমর্পণ করল না। সে তার সমস্ত শক্তি একত্রিত করে রুহানের বুকে জোর ধাক্কা দিল।
"থামো, রুহান! অনেক হয়েছে!" আরিশা চিৎকার করে উঠল। তার চোখে জল, কিন্তু গলার স্বর শক্ত। "তুমি আমাকে ভালোবাসো না, তুমি কেবল তোমার এই অধিকারবোধকে ভালোবাসো। আমি তোমার কোনো সম্পত্তি নই যে তুমি আমাকে জোর করে আটকে রাখবে। আজ যদি আমি না যাই, তবে আমি নিজেকেই হারিয়ে ফেলব।"
আরিশার এই কথাগুলো রুহানের কানে চাবুকের মতো লাগল। রুহান এক পা পিছিয়ে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, আরিশার দিকে তাকিয়ে। আরিশা আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে তার ব্যাগ নিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। দরজার শব্দটা রুহানের খালি ঘরে এক বিকট শব্দে প্রতিধ্বনি তৈরি করল।
পরের কয়েকটি মাস ছিল রুহানের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়। প্রথম প্রথম সে আরিশাকে ফিরিয়ে আনার জন্য চরম উন্মাদের মতো আচরণ করেছিল। বার বার কল করা, আরিশার কর্মক্ষেত্রের সামনে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা, মেসেজের পর মেসেজ পাঠানো—সবই সে করেছিল। কিন্তু আরিশা নিজের সিদ্ধান্তে অনড় ছিল। সে রুহানের কোনো কল ধরে নি, তার সাথে দেখা করতে অস্বীকার করেছে।
ধীরে ধীরে যখন দিনের পর দিন পার হতে লাগল, রুহানের উন্মাদনা রূপ নিল এক গভীর শূন্যতায়। তার খালি ফ্ল্যাটটিতে শুয়ে শুয়ে সে রাতের পর রাত কাটাতে লাগল। প্রতিটা রাতে আরিশার অনুপস্থিতি তাকে এক অজানা তীব্র কষ্টে পুড়িয়ে মারছিল। ঘরের প্রতিটি কোণ, বিছানার চাদর, সোফার কোণ—সব জায়গায় যেন আরিশার গায়ের সুবাস আর তার স্পর্শের স্মৃতি জমে ছিল।
বিছানায় শুয়ে রুহান মনে করত সেইসব রাতের কথা, যখন আরিশা তার বাহুডোরে থাকত। তাদের সেই গভীর অনুভূতির মুহূর্তগুলো, রুহানের স্পর্শের চরম উত্তাপ—সবকিছুই তো সত্যি ছিল। কিন্তু কেন আরিশা পালিয়ে গেল? কেন সে এই উত্তেজনাময় ভালোবাসাকে দূরে ঠেলে দিল?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই রুহানের ভেতরে এক বড় পরিবর্তন আসতে শুরু করল। একা থাকা দিনগুলোতে সে প্রথমবার নিজের দিকে তাকাতে বাধ্য হলো। সে বুঝতে পারল, সে যখন আরিশাকে ভালোবাসত, তখন আসলে আরিশার ইচ্ছা, তার মন, তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে কোনো প্রাধান্য দেয়নি। তার কাছে ভালোবাসা মানেই ছিল আরিশাকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা, তাকে নিজের মতো করে গড়ে তোলা। সে ভালোবেসেছিল ঠিকই, কিন্তু সেই ভালোবাসায় কোনো সম্মান ছিল না, ছিল কেবল এক চরম স্বার্থপরতা।
রুহান অনুধাবন করল, কাউকে সত্যিকারে ভালোবাসার অর্থ তাকে এক সোনার খাঁচায় আটকে রাখা নয়, বরং তাকে নিজের মতো ডানা মেলতে দেওয়া। যদি সে খাঁচায় আটকে রেখে কাউকে পাওয়ার চেষ্টা করে, তবে সে কেবল শরীরটাই পাবে, মানুষটার মনকে কখনোই পাওয়া যাবে না। কাউকে ভালোবাসার আর তাকে নিজের সম্পত্তি ভাবার পার্থক্যটা সে জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়ে শিখল।
অন্যদিকে, আরিশা নিজের মতো করে জীবন গুছিয়ে নিতে শুরু করেছিল। রুহানের সেই মানসিক নির্যাতন আর অতিরিক্ত আকুলতা থেকে দূরে এসে সে যেন নতুন করে নিঃশ্বাস নিতে শিখল। সে তার চাকরিতে মন দিল, নতুন নতুন বন্ধু তৈরি করল, এবং নিজের ভেতরের শান্তি খুঁজে পেতে শুরু করল। তবে, রুহানের প্রতি তার মনের এক কোণে থাকা ভালোবাসাটা পুরোপুরি মুছে যায়নি। কারণ রুহান কেবল একজন আধিপত্য বিস্তারকারী প্রেমাজ ছিল না, তাদের মধ্যে ছিল এক গভীর আবেগময় সংযোগ, যার উত্তাপ আরিশা এখনো মাঝে মাঝে মিস করত। কিন্তু সে আর কখনো সেই পুরোনো বিষাক্ত বৃত্তে ফিরে যেতে চাইত না।
প্রায় এক বছর পার হয়ে গেল। রুহান নিজেকে পুরোপুরি বদলে ফেলেছে। সে আরিশাকে আর কোনো মেসেজ বা কল দিয়ে বিরক্ত করে না। সে নিজেকে কাজ এবং নিজের মানসিক পরিপক্কতা বাড়াতে ব্যস্ত করে তুলেছে। সে জেনেছে, আরিশা যদি কখনো তার কাছে ফিরে আসে, তবে তা আসবে আরিশার নিজের ইচ্ছায়, কোনো জোরজবরদস্তিতে নয়।
একদিন সন্ধ্যায়, ধানমন্ডির এক নিরিবিলি ক্যাফেতে আরিশা বসে ছিল। জানালার বাইরে বর্ষার ঝুম বৃষ্টি পড়ছিল। সে তার কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল, ঠিক তখনই ক্যাফের দরজায় থাকা ঘণ্টাটা বেজে উঠল। আরিশা অনিচ্ছাসত্ত্বেও দরজার দিকে তাকাল এবং তার হাত থেকে কফির কাপটা প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।
দরজায় দাঁড়িয়ে আছে রুহান। কিন্তু এই রুহান যেন আগের সেই উন্মাদ, অধৈর্য যুবক নয়। তার চেহারায় এক অদ্ভুত শান্তভাব, চোখে কোনো দখলদারিত্বের আগুন নেই, বরং আছে এক গভীর পরিপক্কতা আর নম্রতা। রুহানের চোখ আরিশার চোখের সাথে মিলল। রুহান ধীরে ধীরে আরিশার টেবিলের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
ক্যাফের এক কোণে বর্ষার আবছায়া আলোয় রুহান এসে দাঁড়াল আরিশার মুখোমুখি। রুহানের পরনে সাদা শার্ট, চুলগুলো পরিপাটি—তার চেহারায় পুরোনো সেই অস্থিরতার বদলে এক শান্ত, স্থিতধি গাম্ভীর্য।
"আমি কি কিছুক্ষণ বসতে পারি, আরিশা?" রুহানের গলায় কোনো আদেশ ছিল না, ছিল কেবল অনুমতি চাওয়ার এক বিনীত আবেদন।
আরিশা কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রটে রইল। সে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতেই রুহান তার সামনের চেয়ারটায় বসল। টেবিলে তাদের মাঝের এই সামান্য দূরত্বটুকু যেন এক বিশাল পথ অতিক্রম করে এসেছে।
"কেমন আছ?" রুহান নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল।
"ভালো। তুমি?" আরিশা নিজের ভেতরের তোলপাড় চেপে উত্তর দিল।
"আমিও... ভালো থাকার চেষ্টা করছি," রুহান হালকা একটু হাসল, যা আরিশাকে এক অদ্ভুত অচেনা অনুভূতির মুখোমুখি দাঁড় করাল। পুরোনো রুহানের হাসিতে একধরনের দখলদারিত্ব থাকত, কিন্তু এই হাসিতে কেবল এক গভীর অনুশোচনা আর সরলতা।
"আমি জানি, তোমার সামনে আসার অধিকার হয়তো আমি হারিয়েছি," রুহান চোখের দিকে তাকাল, "তবে আজ আমি তোমাকে কোনো অনুযোগ করতে বা ধরে রাখতে আসিনি। শুধু একটা কথা বলতে এসেছি, যা অনেক আগে আমার বোঝা উচিত ছিল।"
আরিশা চুপ করে শুনছিল। রুহান তার এক হাত টেবিলের ওপর রাখল—আগের মতো চেপে ধরার জন্য নয়, বরং শান্ত ভঙ্গিতে।
"আমি তখন ভালোবাসা আর নিজের অধিকারবোধকে গুলিয়ে ফেলেছিলাম, আরিশা। তোমাকে ভালোবাসতে গিয়ে আমি এতটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম যে তোমার নিজস্ব মন, তোমার স্বাধীনতাকে আমি চূর্ণ করে দিচ্ছিলাম। আমি তোমাকে নিজের সম্পত্তি ভেবেছিলাম, যা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। এতদিন তোমার থেকে দূরে থেকে আমি বুঝেছি—কাউকে ভালোবাসার মানে তাকে আঁকড়ে ধরে দমবন্ধ করে ফেলা নয়, বরং তার ভালো থাকায় নিজেকে যুক্ত রাখা।"
রুহানের গলার স্বর আবেগে ভারী হয়ে এল। সে আরিশার দিকে তাকিয়ে রইল, তার চোখে ছিল এক নিঃশ্বার্থ, গভীর সত্যের প্রতিফলন।
"আমি আজও তোমাকে আগের মতোই ভালোবাসি, হয়তো তারচেয়েও বেশি। কিন্তু এই ভালোবাসায় আর কোনো দাবি নেই, কোনো খাঁচা নেই। তুমি যদি কখনো আমার জীবনে ফিরে না-ও আসো, আমি দূর থেকেই তোমাকে ভালোবেসে যাব। আজ আমি তোমাকে মুক্ত করে দিতে এসেছি, আরিশা।"
কথাগুলো শেষ করে রুহান ধীরেসুস্থে উঠে দাঁড়াল। সে আর কোনো উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে ক্যাফের দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করল।
আরিশার বুকের ভেতরে তখন এক অদ্ভুত আলোড়ন। রুহানের মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিটা শব্দ তার ভেতরের জমে থাকা ভয় আর অভিমানগুলোকে এক নিমেষে গলিয়ে দিচ্ছিল। যে রুহানকে সে এতদিন ভয় পেত, যে উত্তাপ তাকে তাড়া করত, সেই রুহানের আজ এই নিঃস্বার্থ সমর্পণ আরিশাকে গভীরভাবে স্পর্শ করল। সে স্পষ্ট অনুধাবন করল, রুহান সত্যিই বদলে গেছে—তার উন্মাদনা রূপ নিয়েছে খাঁটি ভালোবাসায়।
আরিশার মন আর সায় দিল না তাকে চলে যেতে দিতে। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল এবং দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে ক্যাফের দরজার ঠিক বাইরে বৃষ্টিভেজা ফুটপাতে রুহানের হাত ধরে ফেলল।
রুহান চমকে পেছনে তাকাল।
বর্ষার জলে দুজনই মুহূর্তে ভিজে যেতে লাগল। আরিশা রুহানের চোখে চোখ রেখে দাঁড়াল। রুহানের গায়ের পরিচিত সুবাস আর তার চোখের ভেতরের তীব্র আকুলতা আজ আর তাকে ভয় দেখাচ্ছিল না, বরং এক গভীর আকর্ষণে টানছিল।
"তুমি সত্যি বদলে গেছ, তাই না?" আরিশা ভিজে যাওয়া স্বরে বলল।
"তোমার জন্য হাজারবার বদলাতে রাজি আছি," রুহান আবেগে আপ্লুত হয়ে জবাব দিল।
আরিশা আর কোনো দূরত্ব রাখল না। সে নিজেই এগিয়ে গিয়ে রুহানের বুকে মাথা রাখল এবং তাকে দু'হাতে জড়িয়ে ধরল। বৃষ্টির ধারার মাঝেই রুহান তাকে নিজের বাহুডোরে তুলে নিল। কিন্তু এবারের সেই আঁকড়ে ধরায় কোনো দখলদারিত্ব ছিল না, ছিল এক পরম আশ্রয় আর শ্রদ্ধার স্পর্শ।
রুহান আরিশার ভেজা মুখটা দু'হাতে তুলে ধরে তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট রাখল। বৃষ্টির ফোঁটার সাথে মিশে গেল তাদের ঠোঁটের তীব্র, উত্তপ্ত স্পর্শ। এটি কেবল একটি চুম্বন ছিল না; এতে ছিল পুরোনো সব জখম মুছে ফেলার এক গভীর ব্যাকুলতা, এক বাঁধভাঙা রোমান্স যা দুজনের শরীর ও মনে এক নতুন শিহরণ তুলে দিল। রুহানের উত্তপ্ত স্পর্শ আরিশার শরীরে এক অপূর্ব কামনাময় আকুলতা ছড়িয়ে দিল, কিন্তু এবার তাতে কোনো ভয় ছিল না—ছিল কেবল সমর্পণ।
রুহান আরিশার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, "তুমি কি সত্যি আমাকে আর একটা সুযোগ দেবে?"
আরিশা রুহানের চোখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। তার হাত রুহানের ঘাড়ে পেঁচিয়ে সে আরিশার শরীর আরও নিবিড়ভাবে রুহানের সাথে মিলিয়ে দিল।
"নতুন করে শুরু করতে হলে, দুজনকেই ভালোবাসতে হয়, রুহান। আর আমি আজও তোমাকেই ভালোবাসি।"
বৃষ্টির সেই ভেজা সন্ধ্যায়, পুরোনো সব তিক্ততা ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেল। বন্দিদশার অবসান ঘটিয়ে, পারস্পরিক সম্মান আর অকৃত্রিম ভালোবাসার ওপর ভর করে তারা পা বাড়াল এক নতুন অধ্যায়ের দিকে।
....