শিকল খুলে মুক্ত আকাশ

পুরান ঢাকার মঝার আর প্রাচীন অলিগলির মধ্য দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় আরহানের মাথায় হাজারটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল। তবে সব চিন্তা এক নিমেষে উবে গেল, যখন সে রাজউকের সেই পুরনো লালইটের দালানটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে দেখল। নাম—ইরা। কপালে ছোট একটি কালো টিপ, সুতির একটা কফি রঙের শাড়ি গায়ে জড়ানো, আর এলোমেলো চুলগুলো হাওয়ায় উড়ছে। প্রথম দর্শনেই আরহানের বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করে উঠল। কোনো যুক্তি বা বিচার-বুদ্ধি ছাড়াই সে মনে মনে নিশ্চিত হয়ে গেল—এই মেয়েটিই তার জীবনের সব। এই মেয়েটিকে ছাড়া তার অস্তিত্ব অসম্পূর্ণ।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

ইরা ছিল আরহানের দূরসম্পর্কের এক আত্নীয়ের খালার মেয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য ভর্তি হয়েছে। প্রথম দিনের পরিচয়ের পর থেকেই আরহান ইরার মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। আরহান দেখতে মাশাল্লাহ দারুণ—উঁচু-লম্বা, ধারালো চোয়াল, আর চোখের দৃষ্টিতে এক ধরনের তীব্র আকর্ষণের টান। ইরাও আরহানের এই ব্যক্তিত্ব এবং গভীর ভালোবাসার টানে নিজেকে আটকে ফেলা থেকে রক্ষা করতে পারেনি। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তাদের ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

শুরুর দিনগুলো ছিল যেন রূপকথার মতো। ধানমন্ডি লেকের পাড়ে বসে শেষ বিকেলের আড্ডা, কিংবা রাতের ঢাকায় বাইকে করে ঘুরে বেড়ানো—সবকিছুতেই ছিল নিখাদ প্রেম। তবে সেই প্রেমে খুব দ্রুতই যুক্ত হতে শুরু করে এক অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তাপ। তাদের প্রথম বারান্তের নিঃসঙ্গ মুহূর্তে, আরহানের ফ্লাটে যখন তারা একা ছিল, তখন ভালোবাসার সেই গভীরতা অন্য রূপ নেয়।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

সেদিন বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। ঘরে হালকা মোমের আলো। আরহান ইরাকে টেনে নিয়েছিল নিজের বুকের খুব কাছে। ইরার নরম ঠোঁটে আরহানের ঠোঁটের স্পর্শে এক মাতাল করা আবেশ তৈরি হয়। ইরা কিছুটা লজ্জা আর ইতস্তত বোধ করলেও আরহানের কামনাময় আর তীব্র প্রেমময় চোখের দিকে তাকিয়ে নিজেকে সঁপে দেয়। আরহানের হাতের স্পর্শ যখন ইরার পিঠের খোলা অংশে আর কোমরের বাঁকে লেপ্টে যাচ্ছিল, ইরার মেদে এক অদ্ভুত শিউরানি খেলে যায়। আরহানের প্রতিটি চুমু ছিল গভীর, কামনাময় এবং তীব্রভাবে ভালোবাসায় ভরা। সে ইরাকে নিজের বাহুডোরে এমনভাবে পিষে ধরেছিল যেন সে তাকে নিজের শরীরের সঙ্গে চিরতরে মিলিয়ে নিতে চায়। ইরার তপ্ত নিঃশ্বাস আরহানের ঘাড়ে এসে পড়ছিল, আর আরহানের স্পর্শে ইরার শরীর যেন মোমের মতো গলে যাচ্ছিল। সেই রাতে তাদের প্রেম কেবল আবেগে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা রূপ নিয়েছিল এক গভীর, তীব্র শারীরিক ভালোবাসায়।

কিন্তু এই গভীর ভালোবাসার আড়ালেই ধীরে ধীরে ডালপালা মেলতে শুরু করে এক বিষাক্ত লতা—আরহানের প্রচণ্ড অধিকারবোধ।

আরহান ইরাকে ভালোবাসত সত্য, কিন্তু সে ইরাকে নিজের একটা সম্পত্তি মনে করতে শুরু করেছিল। ইরার স্বাধীনতার প্রতিটি জায়গায় সে নিজের নিয়ন্ত্রণ বসাতে চাইল। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্বাভাবিক বন্ধু-বান্ধব, ক্লাসের সহপাঠী—কারো সঙ্গেই ইরার কথা বলা আরহান সহ্য করতে পারত না।

একদিন বিকেলে টিএসসির মোড়ে ইরা তার এক বিভাগীয় ছেলে বন্ধুর সাথে দাঁড়িয়ে ক্লাস নোট নিয়ে কথা বলছিল। দূর থেকে দেখে আরহানের রক্ত টগবগ করে ফুটে ওঠে। সে সোজাসুজি সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়। ইরার সেই বন্ধুটিকে কোনো কিছু না বলেই সেখান থেকে একপ্রকার টেনে নিয়ে যায় ইরাকে।

"তুমি ওই ছেলের সাথে অত হেসে হেসে কী কথা বলছিলে, ইরা?" বাইকে ওঠার পর গম্ভীর আর থমথমে গলায় জিজ্ঞেস করে আরহান।

ইরা একটু অবাক হয়ে বলে, "ও তো আমার ক্লাসমেইট, আরহান! জাস্ট নোটস নিচ্ছিলাম। এতে অত রাগ করার কী আছে?"

"আমার ভালো লাগে না!" বাইকের গতি এক ধাক্কায় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়ে গর্জে ওঠে আরহান। "তুমি শুধু আমার দিকে তাকাবে, শুধু আমার সাথে কথা বলবে! অন্য কোনো পুরুষ তোমাকে দেখবে বা তোমার সাথে কথা বলবে—এ আমি বরদাশত করব না।"

"এটা তো চরম বাড়াবাড়ি, আরহান! আমার একটা নিজস্ব জীবন আছে, পড়ালেখা আছে, বন্ধু আছে," ইরা বোঝানোর চেষ্টা করে।

"তোমার জীবনের একমাত্র নাম আরহান! বুঝেছ তুমি?" বাইক ব্রেক কষে থামিয়ে ইরার মুখোমুখি হয় সে। তার চোখের দৃষ্টিতে তখন ভালোবাসার চেয়েও বেশি ছিল দখলের তীব্র লালসা আর রাগ।

ইরা চুপ হয়ে যায়। প্রথম প্রথম সে এটাকে আরহানের অতিরিক্ত ভালোবাসা ভেবে ভুল করেছিল। মনে করেছিল, যে মানুষটা তাকে এতটা ভালোবাসে, তার একটু ক্ষোভ বা অভিমান থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু দিন যত যেতে লাগল, আরহানের এই অধিকারবোধ এক ধরনের মানসিক অত্যাচারে রূপ নিতে শুরু করল।

সামান্য কারণে আরহানের মেজাজ বিগড়ে যেত। ইরা যদি ফোন ধরতে পাঁচ মিনিট দেরি করত, তবেই শুরু হতো সন্দেহের জাঁতাকল। "কার সাথে কথা বলছিলে?", "কাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে আমার চেয়ে?", "তুমি কি আমাকে আর আগের মতো ভালোবাসো না?"—এই ধরনের একের পর এক প্রশ্নে ইরাকে জর্জরিত করে তুলত আরহান।

এক রাতে আরহানের ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে আবার দেখা হয় দুজনের। রাগ ভাঙানোর জন্য আরহান সেদিন ইরাকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু সেই জড়ানোয় আগের মতো শুধু ভালোবাসা ছিল না, সেখানে ছিল এক ধরনের জোরজবরদস্তি দখলদারিত্ব। আরহান ইরার ঘাড়ে আর ঠোঁটে তীব্র কামনায় চুমু খেতে থাকে। তার হাতের চাপ ছিল প্রচণ্ড—যেন সে ইরাকে ব্যথার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিতে চায় যে ইরা শুধু তারই।

"তুমি শুধুই আমার, ইরা... শুধু আমার," আরহান বিড়বিড় করে বলছিল আর ইরার ভেজা ঠোঁট দুটোকে নিজের কামনার আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছিল। ইরার বন্ধ চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে একফোটা জল। শারীরিক সেই চরম উত্তেজনার মাঝেও ইরার মন কেঁদে উঠছিল। আরহানের শাড়ির আঁচল সরিয়ে দেওয়া হাতগুলোর স্পর্শে ভালোবাসা ছিল, কিন্তু সেই স্পর্শে যেন একটা অদৃশ্য শেকলও জড়িয়ে যাচ্ছিল ইরার শরীরে।

ইরার মনে হতে লাগল, আরহানের এই ভালোবাসা কোনো নিরাপদ আশ্রয় নয়, বরং এটা একটা কয়েদখানা। যে ঘরে প্রেম আছে, কিন্তু শ্বাস নেওয়ার মতো কোনো মুক্ত বাতাস নেই। আরহানের প্রতিটি তীব্র চুমু, প্রতিটি শারীরিক ঘনিষ্ঠতা এবং তার পর মুহূর্তেরই অমূলক সন্দেহ আর চিৎকার—সবকিছু মিলিয়ে ইরা ভেতরে ভেতরে একেবারে ভেঙে পড়তে শুরু করল।

প্রেমের নামে এই মানসিক শেকল ইরা আর কতদিন বয়ে বেড়াবে, তা সে বুঝতে পারছিল না। আরহানের এই চরম অধিকারবোধ আর অন্ধ ভালোবাসা তাদের সুন্দর সম্পর্কটাকে কোন অতল খাদে নিয়ে ফেলবে, তা ভেবেই শিউরে উঠল ইরা।

সময় যত গড়াচ্ছিল, আরহানের অহেতুক সন্দেহ আর অধিকারবোধের মাত্রা যেন সব সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। সম্পর্কটার বয়স এখন প্রায় এক বছর, কিন্তু এই এক বছরে ইরা নিজেকে একটি ভালোবাসার সুতা দিয়ে বাঁধা পাখি নয়, বরং শিকলে বন্দি এক কয়েদি মনে করতে শুরু করেছে। আরহানের এই অতিরিক্ত ভালোবাসা এখন আর তাকে আনন্দ দেয় না, বরং এক অদৃশ্য ভীতি ও শ্বাসরুদ্ধকর অনুভূতির জন্ম দেয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষ করে ইরা যখন বান্ধবীদের সাথে ক্যাম্পাসে একটু বসে গল্প করত, তখনও আরহানের প্রতিনিয়ত ফোন আসতে থাকত। ফোন না ধরলে বা দেরিতে উত্তর দিলে শুরু হতো তীব্র মানসিক অত্যাচার। আরহান কখনো কখনো সারারাত জেগে ইরাকে অপবাদ দিত, আবার কখনো নিজের ভুল বুঝতে পেরে বাচ্চাদের মতো কেঁদে কেটে মাফ চাইত।

এক ছুটির দিনে আরহান ইরাকে নিয়ে যায় মেঘনার পাড়ে একটা নির্জন রিসোর্টে। নদীর শান্ত পরিবেশ, মৃদু বাতাস—সবকিছুই খুব সুন্দর ছিল। কিন্তু আরহানের মনে তখনো জ্বলছিল এক অমূল্যায়ন আর সন্দেহের আগুন। রিসোর্টের সুসজ্জিত ঘরের দরজা বন্ধ হতেই আরহান ইরাকে টান মেরে নিজের কাছে নিয়ে আসে।

"তুমি ইদানীং আমার থেকে দূরে দূরে থাকার চেষ্টা করছ, তাই না ইরা?" আরহানের গলায় রাগের সাথে মেশানো ছিল তীব্র এক শারীরিক আকর্ষণের টান।

"আমি কোনো দূরে সরছি না, আরহান। তুমি অহেতুক সবকিছু নিয়ে সন্দেহ করো," ইরা ক্ষোভ আর ক্লান্তি মেশানো গলায় বলে।

"আমি সন্দেহ করি না, আমি তোমাকে নিজের অস্তিত্বের চেয়েও বেশি ভালোবাসি!" বলেই আরহান ইরার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে।

সেদিনের স্পর্শে নরম কোনো সোহাগ ছিল না, ছিল এক উদ্দাম আর অনিয়ন্ত্রিত কামনার ঝড়। আরহান তার শক্তিশালী দুহাতে ইরাকে নিজের বুকের সাথে পিষে ধরে। ইরার গায়ে থাকা পাতলা কামিজের ওপর দিয়ে আরহানের তপ্ত স্পর্শ ছড়িয়ে পড়তে থাকে। সে একের পর এক উগ্র চুমুতে ভরিয়ে দেয় ইরার গাল, ঘাড় আর বুকের উপরিভাগ। আরহানের হাতের কামনাময় কামড় আর স্পর্শে ইরার শরীর শিউরে উঠলেও ভেতরে ভেতরে তার আত্মসম্মান চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছিল। আরহান ইরার ভেজা কচি ঠোঁট দুটোকে নিজের দাঁতের ফাঁকে শক্ত করে চেপে ধরে গভীর আবেগে মত্ত হয়ে পড়ে। ইরার মনে হচ্ছিল, আরহান যেন তার শরীরটাকে তীব্র ভালোবাসায় জয় করতে চাইছে, কিন্তু তার মনটাকে বোঝার কোনো চেষ্টাই করছে না। চরম উত্তেজনার সেই নিঃসঙ্গ মুহূর্তে আরহানের শারীরিক ছোঁয়া ইরাকে এক মাতাল করা উত্তাপের সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে গেলেও, সে উত্তাপের পর থেকে গেল শুধুই এক শূন্যতা।

সেই ঘটনার পর দিনগুলো আরও বিষিয়ে উঠতে থাকে। এক দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সেমিনারে ব্যাচের অন্য এক সহপাঠী ইরার পাশে বসেছিল। সেখান থেকে কোনোভাবে তোলা একটা ছবি আরহানের হাতে পৌঁছায়। ব্যস, অমনি আরহানের ভেতরের বিষাক্ত রূপটি আবার জেগে ওঠে।

সেদিন সন্ধ্যায় সে সোজা চলে আসে ইরার বাসার নিচে। ফোন করে ইরাকে নিচে ডেকে পাঠায়। ইরা নিচে নামতেই আরহান কোনো কথা না শুনে তার হাত শক্ত করে চেপে ধরে একপাশে নিয়ে যায়।

"এই ছেলে তোমার পাশে কী করছিল? ওর হাত কেন তোমার অত কাছাকাছি ছিল?" আরহানের গলার আওয়াজ কাঁপছিল অনিয়ন্ত্রিত রাগে।

"ও আমার সহপাঠী, আরহান! সেমিনারে বসার জায়গা ছিল না বলে ও পাশে বসেছে। তুমি কি পাগল হয়ে গেলে?" ইরা নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলে।

"পাগল তো আমি তোমার জন্যই হয়েছি! কিন্তু তুমি আমার এই পাগলপারা ভালোবাসার সুযোগ নিচ্ছ, ইরা! তুমি চাও আমি ধুঁকে ধুঁকে মরি?" আরহান ইরার কাঁধ দুটো শক্ত করে ঝাঁকিয়ে ওঠে। তার চোখ দুটি তখন লাল হয়ে উঠেছিল।

"ছাড়ো আমাকে! তোমার এই ভালোবাসার নাম ভালোবাসা নয়, আরহান। এটা একটা অসুখ! তুমি আমাকে ভালোবাসো না, তুমি আমাকে নিজের একটা খেলনা মনে করো," ইরা চিৎকার করে কেঁদে ফেলে।

আরহান নিজেকে সামলাতে পারে না। রাগের মাথায় সে হাত উঠিয়ে ফেলে এবং ইরার সজোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেয়।

চারপাশ হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার সেই শান্ত সন্ধ্যায় থাপ্পড়ের শব্দটা ইরার কাানের পর্দায় হাহাকার তৈরি করে। ইরা তার গালে হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আরহানের নিজের হাতটাও কাঁপতে শুরু করে। সে কী করে ফেলল, তা যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না।

"ইরা... আমি... আমি ভুল করে..." আরহান তোতলাতে তোতলাতে ইরার দিকে হাত বাড়ায়।

"আর কখনো আমার গায়ে হাত দেবে না, আরহান!" ইরার গলা থেকে তখন আর কান্না বের হচ্ছিল না, বের হচ্ছিল এক তীব্র ঘৃণা আর জমে থাকা ক্ষোভ। সে আরহানের দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলে, "আজ আমাদের এই বিষাক্ত সম্পর্কের শেষ। আমি তোমাকে ছেড়ে দিচ্ছি। তুমি তোমার এই অন্ধকার অধিকারবোধ নিয়ে একাই থেকো।"

ইরা আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে হনহন করে হেঁটে ভেতরের দিকে চলে যায়। আরহান রাস্তায় একা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। তার মনে হচ্ছিল যেন বুকের ভেতরের সবকিছু শূন্য হয়ে গেছে।

পরের কয়েকদিন আরহান শত শত বার ফোন করে, মেসেজ পাঠায়, ইরার বাসার সামনে দিনরাত দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু ইরা ছিল অটল। সে বুঝে গিয়েছিল, এই মানুষটার সাথে থাকলে সে মানসিকভাবে পুরো ধ্বংস হয়ে যাবে। ইরা তার মোবাইল নম্বর পরিবর্তন করে ফেলে, এমনকি কিছুদিন ক্লাস থেকেও ছুটি নিয়ে নিজের গ্রামের বাড়ি সিলেটে চলে যায়, যাতে আরহানের কোনো ছায়াও তার ওপর না পড়ে।

ইরার এই হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাওয়া আরহানকে এক অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দেয়। ঢাকার নির্জন ফ্লাটে একা একা বসে মদ আর সিগারেটের ধোঁয়ায় নিজেকে ডুবিয়ে দেয় সে। কিন্তু বিছানায় ইরার ব্যবহৃত ফেলে যাওয়া শাড়ির সুবাস কিংবা ঘরের কোণে জমে থাকা ইরার স্মৃতির ছোঁয়া তাকে তাড়া করে বেড়ায়।

সেদিন রাতে আরহান যখন একাকী খাটে শুয়ে ইরার একটা ওড়না বুকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল, তখন সে প্রথমবার নিজের ভেতরে তাকায়। সে মনে করতে চেষ্টা করে সেই দিনগুলোর কথা, যখন ইরা তার ছোঁয়ায় শিউরে উঠত, যখন তারা একসাথে হাসত। কিন্তু শেষ কয়েক মাসে সে ইরাকে শুধু ভয়, কষ্ট আর চোখের জল ছাড়া আর কিছুই দিতে পারেনি।

আরহান বুঝতে পারে, যে মেয়েটিকে সে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি চেয়েছিল, তাকে সে ভালোবাসার নামে একটা খাঁচায় বন্দি করতে চেয়েছিল। তার অতিরিক্ত কামনার উত্তাপ আর অদম্য অধিকারবোধ ইরাকে কোনো সুখ দেয়নি, বরং দগ্ধ করেছে। ভালোবাসা মানে কাউকে নিজের ছাঁচে গড়ে তোলা নয়, কিংবা শিকলে বেঁধে রাখা নয়—ভালোবাসা মানে তো তাকে মুক্ত আকাশে উড়তে দেওয়া এবং তার বিশ্বাসের সম্মান করা।

নিজের ভুলটা যখন সম্পূর্ণ প্রকাশ পেল, তখন আরহানের পায়ের তলার মাটি সরে গেল। সে অনুশোচনার আগুনে পুড়তে শুরু করল। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ইরা তার জীবন থেকে বহুদূরে চলে গেছে, আর তার ফেলে যাওয়া একাকীত্ব আর অপরাধবোধ নিয়ে আরহান একা এক অন্ধকারে বন্দি হয়ে গেছে।

সিলেটের চা বাগানের সবুজ মেঠো পথ ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় ইরার মনে হচ্ছিল, শহরের সেই দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে সে অনেক দূরে চলে এসেছে। কিন্তু মন থেকে কি সত্যিই আরহানকে মুছে ফেলা সম্ভব হয়েছিল? গভীর রাতে যখন পুরো পৃথিবী ঘুমে আচ্ছন্ন থাকত, তখন ইরার মনে ভেসে উঠত আরহানের সেই তীব্র প্রেমে ভরা চোখ দুটো, প্রথম দিকের সেই মাতাল করা গভীর স্পর্শ আর উগ্র কামনার উষ্ণতা। তবুও, পুরনো ক্ষতের ব্যথা তাকে বারবার সতর্ক করে দিত—সেই বিষাক্ত আবেগে আর ফেরা যাবে না।

এদিকে ঢাকায় আরহান নিজেকে এক নতুন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার কঠিন লড়াই শুরু করেছিল। সে বুঝে গিয়েছিল, শুধু মুখের কথায় কিংবা চোখের জলে ইরাকে ফিরে পাওয়া যাবে না; ইরাকে ফেরাতে হলে আগে নিজের ভেতরে জেঁকে বসা সেই অন্ধকার রূপটাকে উপড়ে ফেলতে হবে। আরহান এক মানসিক চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া শুরু করল। ধীরে ধীরে সে শিখল কীভাবে নিজের অনিয়ন্ত্রিত রাগ, অতিরিক্ত অধিকারবোধ আর অমূলক সন্দেহকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। সে বুঝতে পারল, ভালোবাসার আসল অর্থ অধিকার প্রতিষ্ঠা করা নয়, বরং অপর মানুষটিকে নিজের স্বাধীনতায় বাঁচতে দেওয়া।

দীর্ঘ আটটি মাস কেটে গেল। আরহান কোনোদিন জোর করে ইরার সামনে দাঁড়ায়নি, কোনো বিরক্তিকর ফোন বা মেসেজ দেয়নি। সে দূর থেকে নিঃশব্দে খবর রাখত শুধু এইটুকু নিশ্চিত হতে—ইরা ভালো আছে তো?

অবশেষে একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির ক্যাফেটেরিয়ায় আরহান দূর থেকে ইরাকে দেখতে পায়। ইরা বান্ধবীদের সাথে বসে হাসছিল। আরহান শান্ত পায়ে তার দিকে হেঁটে গেল। ইরা আরহানকে দেখে মুহূর্তের জন্য চমকে উঠল, তার চোখে ভেসে উঠল পুরনো ভীতি আর সংকোচ।

কিন্তু আরহানের চেহারায় আজ সেই পুরানো উগ্রতা বা হিংস্রতা ছিল না। সেখানে ছিল এক অপরিসীম শান্ত ভাব আর বিষাদের ছায়া।

"ভয় পেয়ো না, ইরা," মৃদু কণ্ঠে বলল আরহান। "আমি তোমাকে বিরক্ত করতে আসিনি। শুধু কয়েকটা মিনিট সময় চেয়ে নিচ্ছি—একদম শেষবারের মতো। তুমি যদি না চাও, আমি আর কখনো তোমার সীমানায় পা রাখব না।"

ইরার বুকটা কেঁপে উঠল। আরহানের এই শান্ত আর বিনীত রূপ সে আগে কখনো দেখেনি। তারা দুজন ক্যাম্পাসের নির্জন বকুলতলায় গিয়ে বসল।

আরহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "আমি জানি আমি তোমার সাথে যা করেছি, তার কোনো ক্ষমা হয় না। ভালোবাসার দোহাই দিয়ে আমি তোমার ওপর যে অত্যাচার করেছি, তা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাপ। আমি ভেবেছিলাম তোমাকে আটকে রাখাই ভালোবাসা। কিন্তু তুমি চলে যাওয়ার পর অনুশোচনার আগুনে পুড়ে আমি বুঝেছি—ভালোবাসা মানে কাউকে মুক্তি দেওয়া, তার ওপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়া নয়। আমি নিজেকে বদলে ফেলেছি, ইরা। কিন্তু তোমাকে পাওয়ার লোভে নয়, শুধু নিজের ভুলটার প্রাশ্চিত্ত করতে।"

কথাগুলো বলতে বলতে আরহানের চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল জল। সেই জলে কোনো চালাকি ছিল না, ছিল নিখাদ অনুশোচনা।

ইরা স্থির দৃষ্টিতে আরহানের দিকে তাকিয়ে রইল। তার হৃদয়ের জমে থাকা বরফ যেন গলতে শুরু করল। মানুষটা সত্যি পাল্টে গেছে। যে আরহান আগে তাকে কারো দিকে তাকাতেও দিত না, সেই আরহান আজ তার সিদ্ধান্তের সামনে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে। ভালোবাসা যার এত গভীর, সে যদি সত্যি ভুল শুধরে নিতে পারে, তবে তাকে কি আরেকটি সুযোগ দেওয়া যায় না?

ইরা ধীর পায়ে আরহানের দিকে একধাপ এগিয়ে গেল। আরহানের কম্পিত হাত দুটি নিজের দুই হাতের মুঠোয় চেপে ধরল।

"তুমি সত্যি বদলে গেছ তো, আরহান?" নরম গলায় শুধাল ইরা।

আরহান কথা বলতে পারল না, শুধু আকুল চোখে ইরার দিকে তাকাল। সেই চোখে ছিল হারানোর ভয় আর ফিরে পাওয়ার তীব্র ব্যাকুলতা। ইরা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে সোজা গিয়ে আরহানের বুকে মাথা রাখল।

দীর্ঘ আট মাস পর ইরাকে নিজের বুকের ভেতর ফিরে পেয়ে আরহানের ভেতরটা যেন এক অগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। সে জড়িয়ে ধরল ইরাকে। সেদিন সন্ধ্যায় আরহানের গুলশানের নিরিবিলি অ্যাপার্টমেন্টে নতুন করে সূচনা হলো তাদের ভালোবাসার।

সেদিনের ঘনিষ্ঠতা ছিল আগের সব মুহূর্ত থেকে একেবারে আলাদা। ঘরে কোনো অমূল্যায়ন বা জোরজবরদস্তি ছিল না, ছিল ভালোবাসার এক নতুন সুবাস। আরহান খুব আলতো করে ইরার শাড়ির আঁচল সরিয়ে দিল। তার প্রতিটি স্পর্শে আজ ছিল সীমাহীন শ্রদ্ধা আর গভীর আদর। সে ইরার কপালে, গালে এবং নরম ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াল।

ইরার তপ্ত নিঃশ্বাস আরহানের বুকে আছড়ে পড়ছিল। আরহানের শক্তিশালী হাত দুটো এবার ইরার উন্মুক্ত কোমরের ভাঁজে আর পিঠে এক অপার্থিব ভালোবাসার ছোঁয়া দিতে লাগল। সেদিনের উদ্দাম প্রেম আর কামনার সাগরে দুজনই ডুবে গিয়েছিল, কিন্তু সেই কামনায় কোনো শিকল ছিল না, ছিল না কোনো ভয়। আরহানের প্রতিটি কামনাময় চুমু ইরার মনে সৃষ্টি করছিল মাতাল করা এক অনুভূতি। ইরার বাঁকানো শরীর আরহানের বাহুডোরে গলে এক হয়ে গেল। তাদের শরীরের এই চরম মিলন কেবল দুটি দেহের আকর্ষণে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ছিল দুটি বদলে যাওয়া আত্মার পূর্ণাঙ্গ এক হয়ে যাওয়া।

পরদিন সকালে জানালার ফাঁক গলে আসা ভোরের আলো যখন ইরার মুখে পড়ল, তখন সে দেখল আরহান তার পাশে শুয়ে এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই চোখে আর কোনো সন্দেহ বা রাগের কালো ছায়া নেই, সেখানে শুধুই এক প্রশান্ত ভালোবাসার দীপ্তি।

ভুল বোঝাবুঝি আর কষ্টের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে, তারা অবশেষে ভালোবাসার আসল রূপটিকে খুঁজে পেয়েছিল। আর সেই নতুন সূর্যে লেখা হলো তাদের এক চিরন্তন ও পরিণত প্রেমের গল্প।

....
👁 14