ঢাকা শহরের জ্যামে আটকে থাকা লাল রঙের প্রাইভেট কারটার ভেতরে তখন বেশ এক চিলতে অস্বস্তিকর নীরবতা জমে ছিল। এসির মৃদু গুঞ্জনের মাঝে সামির তার হাতঘড়ির দিকে তাকাল। বিকেল সাড়ে পাঁচটা। রামপুরা থেকে ধানমন্ডি পৌঁছাতে আজও যে কত সময় লাগবে, তা আল্লাহই ভালো জানেন। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে আঙুল দিয়ে হালকা ড্রাম বাজাতে বাজাতে সামির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মাথার ভেতরে তখন পরিবারের লোকজনের অযাচিত কথার গুঞ্জন ঘুরপাক খাচ্ছে।
আম্মা গত তিনদিন ধরে একটাই জপমালা জপে যাচ্ছেন—"সামির, তোমার বয়স ত্রিশ পেরিয়ে তিরিশের ঘরে গড়াল। আর কতদিন একা থাকবে? আমাদের তো একটা শখ-আহ্লাদ আছে! আগামী শুক্রবার আমেনা খাতুনের মেয়েকে দেখতে যেতেই হবে। মেয়ে মাশাআল্লাহ্ যেমন সুশ্রী, তেমনই দ্বীনদার।"
সামির নিজের স্বাধীন জীবনটাকে এত দ্রুত কোনো বাঁধনে বাঁধতে প্রস্তুত ছিল না। কেবল স্টার্টআপের ব্যবসাটা দাঁড় করাচ্ছে, দিনরাত খেটেখাটনি চলছে, এর মধ্যে বিয়ের পিঁড়িতে বসা মানে নিজের গলায় নিজে দড়ি দেওয়া। কিন্তু পরিবারকে কী করে বোঝাবে? প্রতিটা খাবারের টেবিলে এখন একটাই আলোচনা, তার বিয়ে।
ঠিক একই মুহূর্তে ধানমন্ডির এক শান্ত ক্যাফেতে বসে কফির কাপে চামচ নাড়ছিল মায়রা। লালচে আলোর রোশনাই তার সতেজ চেহারায় এক অন্যরকম মায়াবী দীপ্তি ছড়িয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু মায়রার চেহারায় উপচে পড়ছে বিরক্তি। মায়রার খালার তোড়জোড়ের শেষ নেই। আব্বা-আম্মাও খালার কথায় একপায়ে দাঁড়িয়ে। ছেলে নাকি বিসিএস ক্যাডার, বংশমর্যাদা নাকি আকাশে ছোঁয়া। মায়রা সবেমাত্র একটা আর্কিটেকচারাল ফার্মে ঢুকাল, নিজের স্বপ্নগুলোকে মেলে ধরার এখনই তো সময়! অথচ তাকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে এক অপরিচিত পুরুষের হাতে।
"আল্লাহ্, এই ঝামেলা থেকে কীভাবে যে বাঁচি!" মায়রা বিড়বিড় করে উঠল।
তাদের এই যৌথ দূরবস্থার একমাত্র কাণ্ডারি হিসেবে উপস্থিত হলো রায়হান। রায়হান সামিরের শৈশবের বন্ধু, আবার মায়রার ইউনিভার্সিটির সিনিয়র। দুই পক্ষের কান্নাকাটি শুনে রায়হানই প্রস্তাবটা দিয়েছিল—"তোরা দুজন একবার দেখা কর। বিশ্বাস কর, দুজনেই একই নৌকার যাত্রী। হয়তো কোনো উপায় বের হতেও পারে।"
সন্ধ্যা পৌনে সাতটায় যখন সামির ধানমন্ডির ক্যাফেটার কোণের টেবিলটিতে গিয়ে দাঁড়াল, মায়রা তখন কেবলই কফির কাপটা ঠোঁটে ছোঁয়াচ্ছিল।
"মায়রা?" সামির নিচু গলায় ডাকল।
মায়রা চোখ তুলে তাকাল। ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি পরা, হাত গুটানো, চোখে হালকা ফ্রেমের চশমা আর গোছানো দাড়ি—সামিরকে একঝলকে দেখে যে কোনো মেয়েরই চোখ থমকে যাওয়ার কথা। মায়রা দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে একটু হালকা হেসে বলল, "হ্যাঁ, সামির ভাই? বসুন।"
সামির মুখোমুখি চেয়ার টেনে বসল। শুরুর পাঁচ মিনিট কেটে গেল ফরমাল কিছু কুশল বিনিময়ে। খাবারের অর্ডার দেওয়ার পর সামির সরাসরি মূল প্রসঙ্গে চলে এল।
"রায়হান আমাকে আপনার সিচুয়েশন বলেছে। সত্যি বলতে, আমার আম্মা-আব্বাও নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন আমার বিয়ের পেছনে। আমি এখনই কোনো অচেনা মেয়েকে বিয়ে করে ঘর সংসার পাততে পারব না।"
মায়রা ঠোঁট উল্টে বলল, "আমার অবস্থাও এক। বাসায় একদম বিয়ের প্রেসার কুকার বানিয়ে ফেলেছে। খালি অমুকের ছেলে, তুমুকের বিসিএস জামাই! আমি এত সহজে নিজের ফ্রিডম দিতে রাজি নই।"
সামির কফির কাপে চুমুক দিয়ে গভীরভাবে কী যেন ভাবল। তার তীক্ষ্ণ চোখ দুটো মায়রার দিকে নিবদ্ধ হলো। মায়রার চোখের কাজল, কপালে থাকা ছোট্ট টিপ আর তার কথা বলার মধ্যে একটা অদ্ভুত চঞ্চলতা আছে।
সামির হঠাৎ ঝুঁকে এল টেবিলের দিকে। কণ্ঠস্বর একটু নিচু করে বলল, "আমার মাথায় একটা প্ল্যান আসছে, মায়রা। কাজ হবে কি না জানি না, তবে চেষ্টা করতে তো ক্ষতি নেই।"
"কী প্ল্যান?" মায়রা উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
"আমরা পরিবারকে বলব যে, আমরা একে অপরকে চিনি। ভালোবাসি। প্রায় ছ'মাস ধরে রিলেশনে আছি," সামির ধীরে ধীরে বলল।
মায়রা চোখ বড় বড় করে তাকাল, "মানে? ভুয়া প্রেম?"
"একদমই তাই। একটা নিখুঁত নাটক," সামির হাসল, "আমাদের পরিবার যখন দেখবে আমরা অলরেডি অন্য কাউকে পছন্দ করে ফেলেছি, তখন তারা জোর করে অচেনা মানুষের সাথে বিয়ে দিতে পারবে না। তারা সময় দেবে। আর আমরা এই সময়ের মধ্যে নিজেদের ক্যারিয়ার গুছিয়ে নেব। তারপর কয়েক মাস পর স্বাভাবিকভাবেই পরিবারকে বলব যে আমাদের বনিবনা হচ্ছে না, ব্রেকআপ হয়ে গেছে! ব্যাস, কেস ডিসমিসড। ততদিনে আレンジ ম্যারেজের ধাক্কাটাও কেটে যাবে।"
মায়রা বেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। আইডিয়াটা বেশ বিপজ্জনক, কিন্তু এই মুহূর্তে এর চেয়ে ভালো কোনো পথ তার সামনে খোলা নেই। মায়রা একগাল হেসে বলল, "আইডিয়াটা বেশ শয়তানি ভরা! তবে আই লাইক ইট। কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য তো আমাদের একসাথে দেখা যেতে হবে, ছবি তুলতে হবে, ফ্যামিলিকেও চেনাতে হবে।"
"হুম, পুরো পারফেক্ট অ্যাক্টিং হতে হবে," সামিরের চোখ জোড়ায় একধরণের কৌতুক মেখে বলল, "কোনো ভুল করা যাবে না।"
পরের সপ্তাহ থেকেই শুরু হলো তাদের সাজানো প্রেমের মিশন।
প্রথম দিন তারা দেখা করল ধানমন্ডি লেকের পাড়ে। বসন্তের মিষ্টি বাতাস বইছিল। মায়রা পরেছিল একটা নীল রঙের সুতির শাড়ি, চুলে আলতো করে ধরা বেলী ফুলের গজরা। সামির ক্যাজুয়াল টি-শার্ট আর জিন্স পরে এসেছে। পারফেক্ট কাপল হিসেবে পরিবারের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ছবি পাঠাতে হবে, তাই ছবি তোলার পর্ব শুরু হলো।
"সামির ভাই, একটু কাছে আসেন। ছবিটা তো একদম ফরমাল অফিসের বসের সাথে ছবি তোলার মতো লাগছে!" মায়রা হেসে উঠে বলল।
সামির একটু ইতস্তত করে মায়রার কাছে এগিয়ে এল। মায়রা তার হাতটা টেনে নিয়ে নিজের কাঁধের ওপর রাখল। সামির চমকে উঠেছিল একটু। মায়রার ফর্সা ত্বকের ছোঁয়া, তার চুল থেকে ভেসে আসা বেলী ফুলের সুবাস আর হালকা পারফিউমের গন্ধ এক নিমিষে সামিরের রক্তের গতি বাড়িয়ে দিল।
"হেই, এত শক্ত হয়ে আছেন কেন? স্বাভাবিক হন," মায়রা নিজের ফোনটা উঁচিয়ে ধরে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল।
সামির নিজের সামলে নিল। সে মায়রার কোমর ধরে একটু নিজের দিকে টেনে আনল। মায়রা মোটেও প্রস্তুত ছিল না এই আকস্মিক টানের জন্য। সে সামিরের শক্ত ছাতির ওপর এসে পড়ল। দুজনের চোখাচোখি হলো। মায়রার চোখের মণি দুটো কাঁপছিল, ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক হয়ে আসছিল। সামিরের গায়ের পুরুষালী সুবাস আর তার বুক থেকে আসা ধুকপুক শব্দটা মায়রার পেটের ভেতরে এক অচেনা আলোড়ন সৃষ্টি করল।
'ক্লিক' করে ছবি উঠে গেল। কিন্তু ছবি তোলার পরও তারা দুজন বেশ কয়েক মুহূর্ত একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। বাতাস তাদের স্পর্শ করে চলে যাচ্ছিল, আর সেই প্রথমবার তাদের সাজানো প্রেমের নাটকে কেমন যেন একটা আসল অনুভূতির উষ্ণতা জড়িয়ে গেল।
পরদিন সন্ধ্যায় সামির মায়রাকে নিয়ে এল তার পরিবারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে। সামিরের আম্মা, আব্বা আর ছোট বোন আগে থেকেই ড্রয়িংরুমে অপেক্ষা করছিলেন। সামির আর মায়রা একসাথে ঘরে ঢুকতেই সামিরের আম্মার মুখটা থমথমে থেকে একটু হালকা হলো।
"আসসালামু আলাইকুম, আন্টি," মায়রা অত্যন্ত নিচু আর মিষ্টি স্বরে সালাম দিয়ে এগিয়ে গিয়ে সামিরের আম্মার পা ছুঁয়ে কদমবুসি করল।
সামিরের আম্মা আমেনা বেগম যেন এক নিমেষেই গলে জল হয়ে গেলেন। তিনি মায়রাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, "ওয়ালাইকুম আসসালাম, মা। বোসো, বোসো।"
ড্রয়িংরুমে কথাবার্তা বেশ জমজমাট হয়ে উঠল। মায়রা এত সুন্দর করে সামিরের সাথে তার 'প্রেমের গল্প' বানিয়ে বলতে লাগল যে সামির নিজেই অবাক হয়ে দেখছিল। মায়রা বলছিল, কীভাবে সামির বৃষ্টিতে ছাতা নিয়ে তার অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকত, কীভাবে সে মায়রার ছোটখাটো পছন্দের যত্ন নেয়। সামির মনে মনে ভাবল, মেয়েটার ভেতরের অভিনয়দক্ষতা তো অসাধারণ!
রাত নয়টার দিকে যখন খাবারের টেবিলে সবাই বসল, সামিরের আম্মা নিজেই মায়রার থালায় বড় মাছের পেটি তুলে দিলেন।
"সামির তো আমাদের একদমই কিছু বলেনি মা। এত সুন্দর একটা মেয়েকে পছন্দ করে রেখেছে, তাও চেপে গেছে," আমেনা বেগম মিষ্টি হেসে বললেন।
মায়রা লজ্জিত হাসিতে সামিরের দিকে তাকাল। টেবিলের নিচে সামির আলতো করে মায়রার হাঁটুতে নিজের হাঁটু ছোঁয়াল। একটা হালকা বার্তা—'তুমি দারুণ করছ!'
কিন্তু মায়রা সেই ছোঁয়ায় হঠাৎ কেঁপে উঠল। তার গায়ের সমস্ত পশম দাঁড়িয়ে গেল। টেবিলের নিচে সামিরের হাতটা ধীরে ধীরে মায়রার উরুর ওপর উঠে এল, একটা আলতো চাপ দিল। মায়রা শ্বাস আটকে সামিরের দিকে তাকাল। সামিরের মুখে তখন এক নিষ্পাপ হাসি, সে আম্মার সাথে কথা বলছে, কিন্তু তার বড়, উষ্ণ হাতটা মায়রার সুতির শাড়ির ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে উরুর দিকে ঘেঁষে আসছে।
মায়রার হৃদস্পন্দন দ্রুত হতে শুরু করল। সে খাবারের দিকে তাকিয়ে রইল, কিন্তু তার সমস্ত মনোযোগ আটকে ছিল সামিরের সেই উষ্ণ হাতের ছোঁয়ায়। সামিরের আঙুলগুলো মায়রার শাড়ির খাঁজ বেয়ে একটু একটু করে ওপরে উঠছিল। মায়রা নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে রইল, যাতে মুখ থেকে কোনো শব্দ বের না হয়ে যায়।
সামির খুব নিচু গলায়, কেবল মায়রা শুনতে পায় এমন স্বরে বলল, "পারফেক্ট কাপল হতে হলে হাত ধরাধরিটা জরুরি, তাই না ম্যাডাম?"
মায়রা আড়ালে টেবিলের নিচে সামিরের হাতের ওপর নিজের হাতটা রাখল। তারা দুজনে কেবল অভিনয় করছিল না, বরং এই গোপন স্পর্শের খেলায় দুজনের ভেতরেই একটা সুপ্ত কামনার দাবানল জ্বলতে শুরু করেছিল।
খাওয়া শেষ করে সামির যখন মায়রাকে নিচে তাদের গাড়িতে পৌঁছে দিতে এল, বাইরের আবহাওয়া তখন একদম বদলে গেছে। আকস্মিক বৈশাখী ঝড় শুরু হয়েছে। প্রচণ্ড বাতাস আর সাথে ঝুম বৃষ্টি।
সামির মায়রাকে অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের নিচতলার গ্যারেজের এক কোণে নিয়ে দাঁড় করাল, যেখানে বৃষ্টির ছাট আসছিল না। আলো আঁধারিতে ঘেরা গ্যারেজের পরিবেশটা হঠাৎ করেই খুব নিবিড় হয়ে উঠল।
"আজকে তো হেভি পারফরম্যান্স দিলেন," সামির একটু ঠাট্টার সুরে বলল, তবে তার গলাটা আগের চেয়ে একটু ভারী শোনালো।
মায়রা দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল। সে সামিরের দিকে তাকিয়ে এক পা এগিয়ে এল, "আর আপনি যে টেবিলের নিচে অত সাহসী কাজ করলেন? ওটাও কি পারফরম্যান্সের পার্ট ছিল?"
সামির মায়রার একদম কাছাকাছি চলে এল। বাতাসে মায়রার ভেজা চুল উড়ে এসে সামিরের গালে লাগছিল। সামির নিজের একটা হাত বাড়িয়ে দিল মায়রার গালের পাশে থাকা দেওয়ালে। অন্য হাত দিয়ে সে মায়রার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল।
"যদি বলি... ওটা অভিনয় ছিল না?" সামিরের কণ্ঠস্বর একদম গম্ভীর আর গভীর শোনালো।
মায়রার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে উঠল। সে সামিরের চোখের দিকে তাকাল। সামিরের চোখের মনি দুটোতে এক অদ্ভুত তীব্র তৃষ্ণা।
সামির মায়রার গালের ওপর নামিয়ে আনল তার উষ্ণ ঠোঁট। প্রথম স্পর্শটা ছিল খুব হালকা, কেবল একটা মিষ্টি অনুভূতির মতো। কিন্তু মায়রা যখন কোনো বাধা দিল না, বরং চোখ দুটো বুজে ফেলে এক গভীর শ্বাস নিল, সামির আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
সে মায়রার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের সাথে শক্ত করে পিষে ধরল। তার ঠোঁট দুটো স্থানান্তরিত হলো মায়রার তপ্ত ঘাড়ে। ঝুম বৃষ্টির শব্দের মাঝে মায়রার মুখ থেকে এক নিঃশব্দ কান্নার মতো চাপা আক্ষেপ বের হয়ে এল। সামিরের গরম নিঃশ্বাস মায়রার ত্বকে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছিল। সে মায়রার শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে একটু সরিয়ে দিয়ে নগ্ন ঘাড়ে তীব্রভাবে নিজের ঠোঁট আর কামড় বসিয়ে দিল।
"সামির..." মায়রা কোনোমতে সামিরের চুলগুলো মুঠো করে ধরে ফিসফিস করে উঠল। তার কন্ঠস্বরে বাসনার স্পষ্ট ছাপ।
সামির মায়রার ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। এক দীর্ঘ, তীব্র আর গভীর চুম্বন। কেবল অভিনয়ের গণ্ডি পার হয়ে তারা দুজনেই সেই মুহূর্তের নেশায় তলিয়ে যাচ্ছিল। মায়রার হাতের আঙুলগুলো সামিরের পিঠের সুতির শার্ট খামচে ধরছিল, যেন সে ভেসে যাচ্ছে আর সামিরই তার একমাত্র আশ্রয়।
বাইরে বৃষ্টির বেগ বাড়ছিল, আর গ্যারেজের অন্ধকার কোণে দুজন মানুষ একটা মিথ্যে সম্পর্ক বাঁচাতে গিয়ে নিজেদের খাঁটি ভালোবাসার দাবানলে পুড়তে শুরু করেছিল।
বৃষ্টিভেজা সেই রাতের পর থেকে সামির আর মায়রার মধ্যকার সমীকরণটা আর আগের মতো রইল না। তারা দুজনই মনে মনে জানত, গ্যারেজের সেই আঁধার কোণে যে উষ্ণতা বিনিময় হয়েছিল, তা কেবল কোনো চিত্রনাট্যের অংশ ছিল না। কিন্তু নিজেদের অহংকার আর অনিশ্চয়তার কারণে কেউই মুখ ফুটে সেই সত্যিটা স্বীকার করতে পারছিল না।
দুই দিন কেটে গেল কোনো যোগাযোগ ছাড়াই। সামির অফিসে বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু চোখের সামনে কেবল ভেসে ওঠে মায়রার কামড় খাওয়া ঠোঁট আর কাজল লেপা চোখের সজল চাহনি। অন্যদিকে মায়রা তার আর্কিটেকচারাল নকশা আঁকতে বসে বারবার স্কেল ফেলে দেয়, তার মনে পড়ে সামিরের সেই শক্ত বুক আর কোমরে চেপে বসা দগ্ধ হাতের স্পর্শ।
তৃতীয় দিন সন্ধ্যায় সামির আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। সে মায়রার অফিসের সামনে গাড়ি নিয়ে গিয়ে দাঁড়াল। মায়রা যখন বিল্ডিং থেকে বের হলো, সামির গাড়ি থেকে নেমে তার পথ আগলে দাঁড়াল।
"আমার সাথে চলো," সামিরের কণ্ঠস্বরে একধরনের অধিকারবোধের স্পষ্ট সুর।
মায়রা একটু অবাক হলেও কোনো প্রতিবাদ করল না। সে নিঃশব্দে গাড়ির প্যাসেঞ্জার সিটে গিয়ে বসল। গাড়ি চলতে শুরু করল গুলশানের এক শান্ত, অভিজাত রেস্টুরেন্টের দিকে। সারাটা পথ কেউ কোনো কথা বলল না, কিন্তু গাড়ির ভেতরের নীরবতায় এক অদ্ভুত টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছিল।
রেস্টুরেন্টের এক কোণের নির্জন টেবিলে বসার পর সামির মায়রার দিকে তাকাল। মায়রা আজ একটা হালকা বেগুনি রঙের সুতির সালোয়ার কামিজ পরেছে, চুলগুলো বাঁধেনি, ছড়িয়ে আছে পিঠজুড়ে।
"তুমিও কি একই কথা ভাবছ, যা আমি ভাবছি?" সামির নিচু গলায় প্রশ্ন করল।
মায়রা কফির কাপে আঙুল ঘষতে ঘষতে চোখ তুলে তাকাল, "তুমি কী ভাবছ, সামির?"
"যে আমরা আগুন নিয়ে খেলছি। আর এই খেলায় আমরা দুজনই পুড়ছি," সামির ঝুকে এল মায়রার দিকে, "সেই রাতের পর থেকে আমি এক মুহূর্তের জন্যও কাজে মনোযোগ দিতে পারছি না, মায়রা। তোমার স্পর্শ আমার সমস্ত শরীরে এখনও লেগে আছে।"
মায়রার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে নিজের চোখ দুটো নামিয়ে নিয়ে বলল, "আমাদের তো কথা ছিল এটা শুধু অভিনয় হবে। পরিবারকে ঠকানোর একটা প্ল্যান।"
"হ্যাঁ, কথা সেটাই ছিল," সামির মায়রার নরম হাতটা নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় পুরে নিল, "কিন্তু আমার হৃদয় আর শরীর যে সেই কথা শুনছে না, মায়রা। আমি যখন তোমাকে ছুঁই, তখন মনে হয় না এটা কোনো অভিনয়।"
মায়রা কোনো উত্তর দিল না, কিন্তু সে নিজের হাতটা সামিরের হাত থেকে সরিয়েও নিল না। সামিরের হাতের আঙুলগুলো মায়রার হাতের তালুতে আলতো করে ঘষতে লাগল, যা মায়রার শিরদাঁড়া দিয়ে এক ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দিল।
পরের সপ্তাহে এলো আসল পরীক্ষা। মায়রার পরিবার সামিরকে তাদের বাসায় দাওয়াত করল। মায়রার বাবা একজন গাম্ভীর্যপূর্ণ মানুষ, যিনি হুট করে কাউকে পছন্দ করেন না। কিন্তু সামিরের মার্জিত ব্যবহার, কথা বলার ধরন আর ব্যক্তিত্বে তিনি বেশ মুগ্ধ হলেন।
রাতের খাবারের পর মায়রার আম্মা সামির আর মায়রাকে দুতলার ব্যালকনিতে একটু একা কথা বলার সুযোগ করে দিলেন।
ধানমন্ডির বাসার দোতলার ব্যালকনিটা গাছে গাছে ঘেরা। রাতের ফুরফুরে হাওয়া এসে মায়রার ওড়না উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। সামির মায়রার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। মায়রার ঘাড়ের কাছে নিজের মুখটা এনে সে ফিসফিস করে বলল, "তোমার বাবা আমাকে বেশ পছন্দ করেছেন মনে হয়। আমাদের তো নাটক হিট!"
মায়রা ঘাড় ঘুরিয়ে সামিরের দিকে তাকাল। দুজনের মধ্যে দূরত্ব মাত্র কয়েক ইঞ্চির। মায়রা দুষ্টুমি ভরা গলায় বলল, "তাই? কিন্তু আমার বাবা কিন্তু ভীষণ কড়া মানুষ। বুঝতে পারলে হাড়গোড় একটাও আস্ত রাখবে না!"
"রাখুক," সামির এক হাত দিয়ে মায়রার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে একদম নিজের সাথে লেপটে নিল, "তোমার মতো এক রূপসীকে পাওয়ার জন্য যদি হাড়গোড় ভাঙতেও হয়, সে ঝুঁকি আমি শতবার নিতে রাজি।"
মায়রার নিশ্বাস দ্রুত হতে শুরু করল। ব্যালকনির অন্ধকার কোণে সামিরের এই বেপরোয়া রূপ মায়রাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। সামির নিজের অন্য হাতের আঙুলগুলো মায়রার ওড়নার ভেতর দিয়ে তার উন্মুক্ত পেটের ওপর রাখল। গরম চামড়ার ছোঁয়ায় মায়রা চোখ বন্ধ করে এক আকুল শব্দ করে উঠল।
"সামির... না, এখানে কেউ চলে আসবে..." মায়রা কোনোমতে বলতে চাইল।
কিন্তু সামির থামল না। সে মায়রার পেটের চামড়ায় আলতো করে নিজের আঙুল বুলিয়ে ওপরে উঠতে লাগল। মায়রার কামিজের তলা দিয়ে সামিরের উষ্ণ হাতটা যখন তার নাভির ওপর এসে থামল, মায়রার পা দুটো যেন অবশ হয়ে এল। সে সামিরের শার্টের কলারটা শক্ত করে চেপে ধরল নিজেকে ধরে রাখার জন্য।
সামির মায়রার কানের লতিতে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল, তারপর ধীরে ধীরে তার ঠোঁট নেমে এল মায়রার সুডৌল ঘাড়ে। সেখানে তপ্ত চুমুর ছাপ এঁকে দিতে দিতে সামির ফিসফিস করল, "বলুক কেউ আসুক... আমি সবাইকে বলে দেব যে তুমি শুধু আমার। আর কারো নও।"
মায়রার ভেতরের সমস্ত প্রতিরোধ এক নিমিষে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। সে নিজের মাথাটা সামিরের কাঁধে ফেলে দিল। সামিরের হাতের স্পর্শ এখন আরও বেশি তীব্র, আরও বেশি দাবিদার। সে মায়রার কামিজের ওপর দিয়েই তার সুগঠিত শরীরের খাঁজগুলোকে মেপে নিচ্ছিল। মায়রার বুকের তোলপাড় সামিরের ছাতিতে আঘাত করছিল।
ঝুম বৈশাখী হাওয়ায় গাছের পাতাগুলোর শব্দ আর মায়রার সুপ্ত কামনার উসখুস শব্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। সামির মায়রার মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে গভীর থেকে গভীরতর এক চুম্বনে লিপ্ত হলো। মায়রাও এবার আর পিছিয়ে রইল না, সেও নিজের সমস্ত আবেগ দিয়ে সামিরকে ফিরিয়ে দিল সেই চুম্বন। তাদের জিবের তীব্র স্পর্শে জমে থাকা সমস্ত অভিমান আর ভয়ের বরফ গলে জল হয়ে গেল।
কয়েক মিনিট পর যখন তারা নিজেদের সামলে নিল, মায়রার গাল দুটো তখন লজ্জায় লাল হয়ে আছে। তার লিপস্টিক একটু মুছে গেছে, আর চোখের কাজল সামান্য ছড়িয়ে পড়েছে।
সামির মায়রার চুলে হাত বুলে দিয়ে এক গাল হেসে বলল, "এবার বলো, এই ভালোবাসাটাও কি অভিনয়?"
মায়রা সামিরের বুকে হালকা একটা কিল মেরে বলল, "তুমি ভীষণ শয়তান, সামির! তুমি আমাকে একদম শেষ করে দিচ্ছ।"
কিন্তু সুখের এই মুহূর্ত বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। তিন দিন পর সামিরের ফোনে একটা কল এল। তার আম্মা অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানালেন, "সামির, মায়রার বাবার সাথে কথা হয়ে গেছে। তিনি তো তোদের বিয়েতে এক পায়ে রাজি! আমরা আর দেরি করতে চাই না। আগামী মাসের ১৫ তারিখই তোদের আকদ আর ওয়ালিমা!"
ফোনটা রাখার পর সামিরের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তারা তো চেয়েছিল শুধু পরিবারকে সাময়িকভাবে শান্ত রাখতে, কিন্তু ব্যাপারটা এখন বিয়ের পিঁড়ি পর্যন্ত গড়িয়ে গেছে!
সামির তৎক্ষণাৎ মায়রাকে ফোন করে ক্যাফেতে ডাকল।
ক্যাফেতে বসে মায়রার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে সেও খবরটা পেয়ে গেছে। তার চোখেমুখে সুস্পষ্ট ভীতি।
"এখন আমরা কী করব, সামির?" মায়রা কাঁপানো গলায় বলল, "আমরা তো প্ল্যান করেছিলাম কিছুদিন পর ব্রেকআপের নাটক করব। কিন্তু ফ্যামিলি তো এক মাসের মধ্যে বিয়ের ডেট ফিক্স করে ফেলল!"
সামির মাথায় হাত দিয়ে বসল। সে মায়রার দিকে তাকাল, "আমরা কি সত্যি সত্যিই ব্রেকআপের নাটকটা করব? মানে... তুমি কি এই বিয়েটা চাও না?"
মায়রা স্তব্ধ হয়ে গেল। সামিরের চোখের দিকে তাকিয়ে সে নিজের ভেতরের অনুভূতির তলা খুঁজে পেল না। সে কি সত্যি সামিরকে ছেড়ে যেতে চায়? নাকি এই সাজানো নাটকের আড়ালে সে সামিরকে তার সমস্ত সত্ত্বা দিয়ে ভালোবেসে ফেলেছে?
মায়রা কোনো কথা বলল না, কেবল চোখের কোণে একফোঁটা জল জমে উঠল।
সামির মায়রার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, "ব্রেকআপ করাটা আমাদের প্ল্যান ছিল, মায়রা। কিন্তু আমি... আমি তোমাকে হারাতে চাই না। কিন্তু তুমি যদি প্রস্তুত না থাকো, তবে আমি সব দোষ নিজের ঘাড়ে নিয়ে পিছু হটব।"
মায়রা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখের জল মুছে বলল, "আমাদের হাতে আর মাত্র এক মাস সময় আছে, সামির। এই এক মাসে আমাদের ঠিক করতে হবে, আমরা কি এই বিয়েকে বাস্তবে রূপ দেব, নাকি নিজেদের রাস্তা আলাদা করে নেব।"
বিয়ে আর ব্রেকআপের এই দোলাচলে দাঁড়িয়ে তাদের সাজানো প্রেম এখন এক চরম অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি। আর সময়ের কাটা দ্রুত গড়িয়ে চলল সেই কাঙ্ক্ষিত ১৫ই তারিখের দিকে।
বিয়ের আর মাত্র তিন দিন বাকি। ঢাকা শহর জুড়ে তখন বর্ষার ঘনঘটা। আকাশ ভেঙে নামা বৃষ্টির জল জমে রাস্তাগুলো যেন একেকটা ছোট্ট নদী হয়ে উঠেছে। সামিরদের বেইলি রোডের ফ্ল্যাট আর মায়রাদের ধানমন্ডির বাসা—দুই পরিবারেই উৎসবের আমেজ। গায়ে হলুদের কাপড়, মেহেন্দির ঘ্রাণ আর ডালা সাজানোর ধুম পড়েছে। কিন্তু এই এত সব আয়োজনের মাঝে দুই মূল চরিত্র—সামির আর মায়রা যেন এক অদ্ভুত টানাপোড়েনের জালে বন্দি।
তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। তারা কি সত্যিই আজীবন একে অপরের হাত ধরে বেঁচে থাকার জন্য প্রস্তুত, নাকি কেবল পরিস্থিতির চাপে পড়ে এক গভীর ফাঁদে পা দিতে যাচ্ছে?
গায়ে হলুদের আগের রাতে সামির আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। বৃষ্টিভেজা রাতে সব আয়োজন এড়িয়ে সে এসে দাঁড়াল মায়রাদের বাসার নিচে। ফোন করতেই মায়রা নেমে এলো গ্যারেজে। নীল রঙের এক সুতির শাড়ি পরা মায়রাকে দেখে সামিরের বুকের ভেতরটা হু-হু করে উঠল।
মায়রা সামিরের সামনে এসে দাঁড়াতেই সামির কোনো কথা না বলে তাকে নিজের দিকে টেনে নিল। অন্ধকারের আড়ালে মায়রাকে একদম দেয়ালের সাথে চেপে ধরে সামির নিচু আর গভীর গলায় বলল, "আর মাত্র কিছু ঘণ্টার অপেক্ষা, মায়রা। এরপর আর কোনো পিছু হটার পথ থাকবে না। তুমি কি সত্যিই এই বন্ধনে জড়াতে চাও? নাকি কাল সকালেই আমি আম্মাকে সব সত্যি বলে দেব?"
মায়রা সামিরের চশমাটা খুলে পাশে রেখে দিল। তার নরম আঙুলগুলো সামিরের গালে ফুটে থাকা দাড়ির ওপর বুলিয়ে দিতে দিতে আলতো করে বলল, "তুমি কি সত্যি চাও আমি অন্য কারো হয়ে যাই, সামির?"
সামিরের চোখ দুটো যেন হিংস্র হয়ে উঠল। সে মায়রার কোমর আঁকড়ে ধরে তাকে নিজের শরীরের সাথে একদম মিশিয়ে নিল। তার তপ্ত নিঃশ্বাস মায়রার গলায় আঁচড় কাটছিল। সামির মায়রার চিবুকটা উঁচিয়ে ধরে একদম কড়া গলায় বলল, "তোমাকে অন্য কারো হতে দেওয়ার চেয়ে আমি নিজে মরে যাওয়া ভালো মনে করব, মায়রা।"
সামিরের মুখ থেকে এই ভালোবাসার আর কামনার উগ্র প্রকাশ শুনে মায়রার সমস্ত শরীর শিউরে উঠল। সে সামিরের শার্টের কলার আঁকড়ে ধরে নিজেকে সামিরের ঠোঁটের ওপর সঁপে দিল।
গ্যারেজের আলো-আঁধারিতে সেই বৃষ্টিভেজা রাতে তাদের চুম্বন রূপ নিল এক গভীর আকুলতায়। সামিরের হাতের ছোঁয়া এবার আর কেবল নরম স্পর্শে আটকে রইল না। তার গরম হাতটা মায়রার সুতির শাড়ির আঁচল সরিয়ে উন্মুক্ত পিঠের ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে নেমে এল কোমরের ভাঁজে। মায়রা এক তীব্র তৃষ্ণায় চোখ বুজে সামিরের চুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরল। সামির মায়রার ব্লাউজের ভেতরের উন্মুক্ত ত্বকে নিজের তপ্ত ঠোঁটের দাগ এঁকে দিতে লাগল।
"তুমি শুধুই আমার, মায়রা... শুধুই আমার," সামিরের ফিসফিস করে বলা কথাগুলো গ্যারেজের নিস্তব্ধতায় আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ছিল।
মায়রাও তার শরীরের সমস্ত উত্তাপ দিয়ে সামিরকে জড়িয়ে ধরেছিল। সামিরের শক্ত ছাতির সাথে নিজের বুকটা লেপটে দিয়ে সে বলে উঠল, "আমি তোমারই, সামির... প্রথম দিন থেকেই হয়তো তোমারই ছিলাম।"
সেই রাতের তীব্র কামনার ছোঁয়া আর মনের গভীর গোপন স্বীকারোক্তি দুজনের ভেতরের সব ইতস্তত ভাব ধুলোবালি করে উধাও করে দিল। নাটক আর বাস্তবের মধ্যকার সূক্ষ্ম দেয়ালটা সে রাতেই ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল।
অবশেষে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত বিয়ের দিন। মিরপুরের এক মনোরম কমিউনিটি সেন্টারে জাকজমকপূর্ণ বিয়ের আয়োজন। ধবধবে সাদা শেরওয়ানি আর মাথায় পাগড়ি পরে সামির যখন কাজির মুখোমুখি বসল, তার বুকে তখন হাজারটা ঢাক বাজছিল। সে বারবার স্টেজের দিকে তাকাচ্ছিল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই লাল বেনারসি শাড়িতে মুড়ি দিয়ে স্টেজ আলো করে এসে বসল মায়রা। সোনার গয়নার ঝলকানি আর মুখের হালকা ওড়নার আড়ালে মায়রাকে একদম স্বর্গের পরীর মতো লাগছিল। সামিরের চোখ যেন আর সরছিলই না।
কাজিসাহেব যখন মায়রাকে কবুল বলতে বললেন, মায়রার কণ্ঠ সামান্য কেঁপে উঠেছিল। কিন্তু সামিরের দিকে একনজর তাকাতেই তার চোখে ফুটে উঠল অদ্ভুত এক বিশ্বাস। স্পষ্ট আর মিষ্টি গলায় মায়রা তিনবার বলল, "কবুল।"
এরপর সামিরের পালা। সামির এক মুহূর্তও দেরি না করে দৃঢ় গলায় উচ্চারণ করল, "কবুল।"
আইনি আর ধর্মীয় সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতেই দুই পরিবারে আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল। আত্মীয়স্বজনের কোলাহল, মিষ্টি বিতরণ আর ক্যামেরার ফ্লাশের আলোর ভিড়ে সামির আর মায়রা একে অপরের পাশে বসে রইল।
সন্ধ্যায় যখন ফটোশুট চলছিল, মায়রা সামিরের একদম কাছাকাছি সরে এসে বসাল। চারপাশের শোরগোলের মাঝেও মায়রার হৃদয়টা এক অদ্ভুত শঙ্কায় দুলছিল।
ফটোশুটের এক ফাঁকে, যখন ফটোগ্রাফার একটু দূরে সরলেন, মায়রা আলতো করে সামিরের হাতটা চেপে ধরল। তার চোখের কোণে একফোঁটা জল জমে ছিল, যা বেনারসির লাল আভায় মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করছিল।
মায়রা খুব নিচু গলায়, একদম সামিরের কানের কাছে মুখ এনে জিজ্ঞেস করল, "সামির... একটা কথা সত্যি করে বলবে? এই এত আয়োজন, এত কিছু... এই বিয়েটা কি সত্যিই শুধু একটা অভিনয়ের ফল ছিল? শুধু পরিবারকে শান্ত করার একটা সাজানো নাটক?"
সামির থমকে গেল। সে মায়রার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। মায়রার চোখে তখন উপচে পড়া ভালোবাসা আর এক চিলতে সংশয়ের ছায়া।
সামির মায়রার লাল শাড়িতে ঢাকা হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় পুরে নিল। তারপর তার মুখে ফুটে উঠল এক অপরূপ আর মায়াবী মুচকি হাসি। সামির একটু ঝুঁকে মায়রার কপালে নিজের ঠোঁট দুটো আলতো করে ছোঁয়াাল। মায়রা চোখ বন্ধ করে সেই স্নিগ্ধ স্পর্শটুকু অনুভব করল।
সামির মায়রার চোখের দিকে তাকিয়ে নিচু, ভারী কিন্তু সুদৃঢ় গলায় উত্তর দিল, "অভিনয়টা ছিল শুরুতে, মায়রা... কিন্তু তোমাকে ভালোবাসা আর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজের করে চাওয়াটা কখনোই অভিনয় ছিল না।"
সামিরের কথাগুলো মায়রার কাঁচের মতো সংশয়গুলোকে মুহূর্তে গুঁড়িয়ে দিল। মায়রার চোখের কোণ বেয়ে একফোঁটা আনন্দের জল গড়িয়ে পড়ল তার লাল গালে। সে সামিরের কাঁধে নিজের মাথাটা নামিয়ে দিল।
সামির মায়রার কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তাকে আরও কাছে টেনে নিল। সে জানত, মিথ্যে আর অভিনয়ের ওপর ভর করে শুরু হওয়া তাদের এই যাত্রাটা আজ এক চিরন্তন ভালোবাসার বাঁধনে রূপ নিয়েছে। ঢাকার জ্যাম, ক্যাফের ভুয়া প্রেম, গ্যারেজের সেই কামনাময় বৃষ্টিভেজা রাত আর ব্যালকনির গোপন ছোঁয়া—সবকিছুর সমীকরণ মিলে আজ এক সুন্দর, সুগঠিত আর নিখাদ সংসারে পরিণত হতে যাচ্ছে।
বাইরে তখনও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল, আর স্টেজে বসে থাকা নতুন দম্পতি একে অপরের ভালোবাসার উষ্ণতায় নতুন এক জীবনের গল্প আঁকছিল।
....