রাতের অন্ধকারে শর্তের খেলা

পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী জমিদারী ধাঁচের দালানটার প্রতিটি কোণ এখন গমগম করছে লোকজনের আনাগোনায়। উঠোনে টাঙানো সাদা আর সোনালি রঙের শামিয়ানা, বাতাসে ভেসে আসছে আতর আর তাজা গোলাপের সুবাস। কিন্তু বাড়ির দোতলার কোণের ঘরটায় আবহাওয়া একেবারেই ভিন্ন। লাল টুকটুকে বেনারসি শাড়িটা বিছানার ওপর ছড়িয়ে আছে, যার সোনালি জড়িগুলো রাতের আলোয় ঝিলমিল করছে। কিন্তু সেই শাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকা আরিশার চোখ দুটো থেকে যেন ক্ষোভ আর আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

আরিশার বয়স তেইশ। চঞ্চল, জেদী আর স্বাধীনচেতা এক মেয়ে। কিন্তু তার বাবা, যিনি এই পরিবারের প্রধান কর্তাব্যক্তি, হুট করেই তার বিয়ের তারিখ ঠিক করে ফেলেছেন। পাত্র—জমিদার বংশের দূরসম্পর্কের কোনো এক রাশভারী ছেলে, যাকে আরিশা কোনোদিন চোখেও দেখেনি, যার স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই। বিয়ের প্রস্তাবে তার মতামত নেওয়ার তো দূরের কথা, তাকে কোনো পছন্দ-অপশনের সুযোগই দেওয়া হয়নি।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

"আমি এই বিয়ে করব না! একদম না!"

 

হাতে থাকা মেহেন্দির কোণটা ধপাস করে ড্রেসিং টেবিলের ওপর ফেলে দিয়ে গর্জে উঠেছিল আরিশা। ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা চাচাতো বোন মেহজাবিন আঁতকে উঠে ঘর বন্ধ করতে দৌড়ে গেল।

 

"তুই কি ক্ষ্যাপা হয়েছিস আরিশা? বড় কাকা শুনলে পিঠের চামড়া তুলে ফেলবে! পাত্রপক্ষ তো কালকেই আংটি পরাতে আসছে। তুই হঠাৎ না করার কে?"

 

"যে কেউ হুকুম করলেই আমাকে পুতুল হয়ে বসে থাকতে হবে? এই যুগের মেয়ে আমি! আমি সাফ জানিয়ে দিয়েছি, আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি।" আরিশা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, তার বুকটা রাগে ও উত্তেজনায় দ্রুত ওঠানামা করছিল।

 

মেহজাবিনের চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল। "কী বললি? তুই কাউকে ভালোবাসিস? কে সে? আমরা তো কোনোদিন কিছু শুনিনি!"

 

আরিশা চোখের কোণ দিয়ে একটু ইতস্তত করল। বান বানিয়ে মিথ্যা বলাটা তার অভ্যাস নয়, কিন্তু আজ পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। মাথা গরমের মাথায় সে নামটা বলেই ফেলল, "রুহান! রুহানকে ভালোবাসি আমি। যদি বিয়ে করতেই হয়, আমি ওকেই করব, অন্য কাউকে না।"

 

খবরটা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগল না। বড় কর্তা অর্থাৎ আরিশার বাবা ঘটনা শুনে রক্তচক্ষু নিয়ে থমথমে গলায় জানালেন, "যদি ছেলে তোর যোগ্য হয় আর কালকের মধ্যে এসে আমার সামনে দাঁড়াতে পারে, তবেই এই বিয়ে আটকাবে। নইলে কাল সন্ধ্যায় তোকে ওই জমিদার বাড়িতেই পাঠানো হবে।"

 

ঘর থেকে সবাই বেরিয়ে যেতেই আরিশার পায়ের নীচের মাটি সরে গেল। সে কী করে বসাল! নামটা মুখে তো এসে গেল, কিন্তু রুহান? রুহান চৌধুরী—তারই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র, যার সাথে তার প্রতিদিন বিড়াল-ইঁদুরের ঝগড়া হয়। ছেলেটা চড়া মেজাজের, গম্ভীর, দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, স্বভাবটা তেমনই কঠোর। লম্বা, চওড়া কাঁধ, শ ধারালো চোয়াল আর একজোড়া গভীর কালো চোখ, যার দিকে তাকালে যে কোনো মেয়ের বুকের ভেতর তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। আরিশার সাথে তার সম্পর্ক বলতে গেলে অহংকারের লড়াই।

 

আরিশা নিজের কপাল চেপে ধরল। কোনো উপায় না দেখে রাত বারোটার দিকে ফোনটা হাতে নিল সে। কাঁপা কাঁপা আঙুলে রুহানের নম্বর ডায়েল করল। তিনটে রিং হতেই ওপাশ থেকে ভারিক্কি, কিছুটা ঘুমজড়ানো কিন্তু গভীর এক কণ্ঠ ভেসে এল, "বলুন, আরিশা বেগম। এত রাতে আপনার হঠাৎ আমায় মনে পড়ল? আবার কোন নতুন ফন্দি?"

 

আরিশা এক মুহূর্তের জন্য গিলে খেল নিজের রাগ। গলার আওয়াজ নরম করে বলল, "রুহান... প্লিজ, ফোনটা কেটো না। আমার একটা বড় বিপদে তোমাকে লাগবে।"

 

"বিপদ? আর সেটা উদ্ধারের জন্য আমায় দরকার? নাটক বন্ধ করো।"

 

"নাটক নয়, রুহান! একদম সত্যি!" আরিশা এক নিঃশ্বাসে পুরো ঘটনাটা বলে দিল। সে কীভাবে নিজের বিয়ে আটকানোর জন্য রুহানের নাম ব্যবহার করেছে, আর কাল সকালে রুহানকে কীভাবে তাদের বাড়িতে এসে তার প্রেমিকের অভিনয় করতে হবে।

 

ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা। কয়েক সেকেন্ড পর রুহানের গভীর হাসির শব্দ ভেসে এল। সেই হাসিতে কোনো দয়া ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত মাদকতা আর বিজয়ীর দম্ভ।

 

"বাহ! আরিশা জাহান। নাম বেচলে আমার, বিপদে পড়লে আমার কাছেই এলে? আর ভাবলে আমি তোমার এই সাজানো নাটকের চরিত্র হতে অমনি রাজি হয়ে যাব?"

 

"রুহান, প্লিজ! তুমি তো জানো আমার বাবা কতটা কঠোর। তুমি না এলে কালই ওরা আমাকে এক অচেনা লোকের সাথে আটকে দেবে। একটুখানি সাহায্য করো, আমি তোমার এ ঋণ জীবনে ভুলব না।" আরিশার গলায় আকুতি ঝরে পড়ল।

 

রুহানের কন্ঠ হঠাৎ যেন বদলে গেল। আগের চেয়ে আরও নিচু, গম্ভীর আর রহস্যময় শোনালো তার সুর। "সাহায্য করতে পারি। কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে।"

 

"কী শর্ত?"

 

"অভিনয়টা যখন হবে, তখন সেটা পুরোপুরি আমার স্ক্রিপ্টেই হবে। এই ক'দিন আমি যা বলব, তোমাকে সেটাই শুনতে হবে। কোনো তর্ক নয়, কোনো আদেশ অমান্য করা চলবে না। আমার ছায়ায় থাকতে হলে আমার নিয়ম মেনে চলতে হবে। রাজি?"

 

আরিশার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। কিন্তু এই মুহূর্তে তার সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। দাঁতে দাঁত চেপে সে জবাব দিল, "ঠিক আছে। রাজি।"

 

"গুড। কাল সকাল দশটায় রেডি থেকো। তোমার পরম প্রেমিক আসছে।" কথাটি বলেই ফোনটা কেটে দিল রুহান।

 

পরদিন সকাল দশটা। আরিশার বাড়ির ড্রয়িং রুমে যেন থমথমে মেঘ জমে আছে। আরিশার বাবা গম্ভীর মুখে সোফায় বসে আছেন, পাশে তার স্বজনেরা। আরিশা একটা নীল রঙের সূতি সালোয়ার-কামিজে বারান্দায় দাঁড়িয়ে নখ কামড়াচ্ছিল। ঠিক তখনই গেইট দিয়ে ভেতরে ঢুকল একটা কালো রঙের ল্যান্ড ক্রুজার।

 

গাড়ি থেকে নেমে এল রুহান। পরনে গাঢ় ধূসর রঙের রাজকীয় কলারের পাঞ্জাবি, যা তার চওড়া বুক আর সুঠাম শরীরকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে। চোখ ঢেকে রাখা কালো চশমাটা খুলে হাতের ঘড়ির দিকে তাকাল সে। চুলে হালকা বাতাস খেলে যাচ্ছে। ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই পুরো ঘরের পরিবেশ হালকা থেকে ভারি হয়ে উঠল। তার হেঁটে আসার ধরণ, আত্মবিশ্বাসী চাউনি আর ব্যক্তিত্ব দেখে ঘরের বয়স্ক মানুষগুলোও এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল।

 

"আসসালামু আলাইকুম, স্যার," অত্যন্ত মার্জিত ও দৃঢ় কণ্ঠে অভিবাদন জানাল রুহান।

 

আরিশার বাবা সোজা হয়ে বসলেন। "তুমিই রুহান?"

 

"জী। আমি রুহান চৌধুরী। আরিশার মুখ থেকে শুনলাম আপনি ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে এক জায়গায় বিয়ে ঠিক করছেন। তাই বাধ্য হয়েই আসতে হলো।" রুহানের গলায় কোনো ভয় বা দ্বিধা ছিল না। সে সোজা আরিশার বাবার মুখোমুখি দাঁড়াল।

 

"মেয়ে আমার, সিদ্ধান্ত আমি নেব। তুমি ওকে ভালোবাসো বললেই তো আর আমি মেনে নেব না। তোমার যোগ্যতা কী?" বাবার গলায় স্পষ্ট চ্যালেঞ্জ।

 

রুহান ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অমায়িক কিন্তু শক্ত হাসি ফুটাল। "আমি চৌধুরী এস্টেটের একমাত্র ওয়ারিশ, আর নিজের যে আইটি ফার্মটা চালাই, সেটা এই বয়সে অনেকেই স্বপ্ন দেখে। তবে সবচেয়ে বড় যোগ্যতা—আমি আরিশাকে আগলে রাখতে পারি। যা আপনার ঠিক করা ওই পাত্র পারবে না।"

 

ঘরের বাতাসে যেন বিদ্যুতের তরঙ্গ বয়ে গেল। আরিশা এক কোণে দাঁড়িয়ে হাঁ করে তাকিয়ে ছিল রুহানের দিকে। এত নিখুঁত, এত প্রখর যার ব্যক্তিত্ব, সে যে অভিনয় করছে তা ঘুণাক্ষরেও বোঝার উপায় নেই!

 

আরিশার বাবা কিছু সময় চুপ থেকে রুহানের চোখের দিকে চাইলেন। তারপর ঠান্ডা গলায় বললেন, "বেশ। বিয়ে আমি এখনই ভেঙে দিচ্ছি না। তোমার পরিবারকে খবর দাও। আগামী চারদিন পর বিয়ের নতুন তারিখ হবে। এই চারদিন তুমি এই বাড়ির অতিথি হয়ে থাকবে। আমি দেখতে চাই, আমার মেয়ের প্রতি তোমার টান কতটা সত্যি। যদি আমার মনে হয় তুমি ঢং করছ, তবে আরিশাকে আমি ওই জমিদার বাড়িতেই দেব।"

 

রুহান এক মুহূর্ত সময় না নিয়ে বলল, "সম্মত। চারদিন কেন, সারাজীবন ওর খেয়াল রাখতে পারি।"

 

কথার মাঝেই রুহান আরিশার দিকে তাকাল। তার চোখ দুটোতে এক রহস্যময় দ্যুতি। সে আরিশার দিকে এগিয়ে গেল। আরিশার হৃদস্পন্দন তখন এত দ্রুত চলছিল যে, মনে হচ্ছিল বুক চিরে বেরিয়ে আসবে।

 

সবাইকে অবাক করে দিয়ে রুহান আরিশার একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তাদের মাঝের দূরত্ব তখন কয়েক ইঞ্চিরও কম। আরিশা পিছু হটতে চাইল, কিন্তু রুহান চট করে তার পাতলা কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের দিকে টেনে নিল।

 

"আহ্..." আরিশার মুখে হালকা আর্তনাদ ফুটে উঠলেও তা রুহানের শক্ত বুকের গভীরে বিলীন হয়ে গেল।

 

পারিবারিক আবহের মধ্যেই রুহানের এই বেপরোয়া আর চরম ঘনিষ্ঠ পদক্ষেপ সবাইকে স্তব্ধ করে দিল। কিন্তু রুহানের সেদিকে খেয়াল নেই। সে ঝুঁকে এল আরিশার কানের কাছে। তার তপ্ত ও ঘন শ্বাস আরিশার ঘাড় আর কানে এসে বিঁধল। আরিশার সারা শরীরে এক অদ্ভুত শিউরে ওঠার অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। সে অনুভব করতে পারছিল রুহানের শক্ত, উষ্ণ বুকের স্পন্দন, আর তার শক্তিশালী হাতের বাঁধন যা তার কোমর চেপে ধরেছিল।

 

কানের খুব কাছে রুহানের পুরুষালী নিচু কণ্ঠস্বর বেজে উঠল, "ভুলে যেও না আরিশা, চুক্তি শুরু হয়ে গেছে। আর তুমি আমার শর্তে রাজি হয়েছ। এখন থেকে প্রতিটা মুহূর্ত, প্রতিটা শ্বাসে তুমি শুধু আমার আদেশই মানবে।"

 

আরিশা চোখ তুলে রুহানের দিকে তাকাল। রুহানের গাঢ় চোখের দৃষ্টিতে ধরা পড়ল এক অগভীর তৃষ্ণা আর কামনার তীব্র ছায়া। আরিশা বুঝতেই পারল না, এই চারদিনের খেলায় সে কি বেঁচে গেল, নাকি এমন এক আগুনে পা দিল যা থেকে নিজেকে বাঁচানো আর কোনোভাবেই সম্ভব হবে না!

 

বাড়ির ছাদের ওপরের পিয়ানো রুমটাতে হালকা লালচে আলোর আভা। পুরান ঢাকার রাতের আকাশটা তারায় ঢাকা হলেও আরিশার মনের ভেতরের মেঘ কাটছিল না। বাবার দেওয়া চারদিনের শর্তের প্রথম দিনটাই যেন তার জন্য এক অনন্তকালের মতো দীর্ঘ মনে হচ্ছে। রুহান চৌধুরী এখন এই বাড়ির সম্মানিত অতিথি, আর তার ঘরের অবস্থান আরিশার ঘরের ঠিক পাশেই।

 

রাত তখন প্রায় একটা। আরিশা একটা হালকা বেগুনি রঙের সুতির স্লিপলেস কামিজ পরে ঘরে পায়চারি করছিল। মেহেন্দির হালকা সুবাস বাতাসে ভাসছে। হঠাৎ ঘরের দরজায় মৃদু করাঘাত। আরিশা চমকে উঠে দরজা কিছুটা খুলতেই দেখল—সামনে রুহান দাঁড়িয়ে।

 

পরনে সুতির কালো ফতোয়া আর তোয়ালে দিয়ে মোছা আধা-ভেজা চুল। গায়ের থেকে ভেসে আসছে এক তীব্র রাজকীয় পারফিউম আর পুরুষালী গায়ের গন্ধ, যা আরিশার স্নায়ুকে মুহূর্তেই অবশ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

 

"তুমি এত রাতে আমার দরজায় কী করছ? কেউ দেখে ফেললে কী ভাববে?" আরিশা ফিসফিস করে উঠে হাত দিয়ে নিজের বুকের ওড়নাটা শক্ত করে জড়াতে চাইল।

 

রুহান একধাপ এগিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল। আরিশা বাধ্য হয়ে পিছু হটল। রুহান পেছন ফিরে শব্দ না করে দরজাটা ভেজিয়ে দিল। তার চোখে কোনো দ্বিধা নেই, আছে এক বুকভরা অধিকারবোধ।

 

"কেউ দেখুক বা না দেখুক, তাতে আমার কিছু আসে যায় না। তবে তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছ, চুক্তির প্রথম শর্ত ছিল—আমার সব কথা তোমাকে মানতে হবে।" রুহান খুব ধীরে ধীরে আরিশার দিকে এগোতে লাগল।

 

আরিশার পিঠ গিয়ে ঠেকলো ঘরের শক্ত কাঠের আলমারিতে। রুহান তার দু'পাশে হাত রেখে আরিশাকে পুরোপুরি দেয়ালবন্দী করে ফেলল। তাদের দুজনের শারীরিক দূরত্ব এখন শূন্যের কোঠায়। আরিশা রুহানের বুকের উষ্ণতা স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে। রুহানের ভেজা চুল থেকে দু-এক ফোঁটা জল গড়িয়ে এসে পড়ল আরিশার খোলা গলায়, যা স্পর্শ করতেই আরিশা শিউরে উঠল।

 

"তুমি... তুমি কী করছ রুহান? এটা শুধুই একটা অভিনয়!" আরিশার কণ্ঠ কেঁপে উঠল, তার বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে।

 

"অভিনয়?" রুহানের এক হাত হালকা করে উঠে এলো আরিশার মুখে। তার লম্বা, শক্ত আঙুলগুলো আরিশার থুতনি স্পর্শ করল। বুড়ো আঙুল দিয়ে সে আরিশার নিচের ঠোঁটে আলতো করে চাপ দিল।

 

"যদি অভিনয়ই হয়, তবে এটাকে এত জীবন্ত হতে হবে যেন তোমার বাবার কেন, খোদ সৃষ্টিকর্তারও মনে সন্দেহ না জাগে। আরিশা, তুমি আমাকে এই খেলায় টেনে এনেছ। এখন এই খেলার গতিপথ আমি ঠিক করব।"

 

রুহানের কন্ঠের গভীরতা আর তার চোখের নেশাক্ত দৃষ্টি আরিশাকে মানসিকভাবে অবশ করে দিচ্ছিল। সে চোখ বন্ধ করে ফেলল। রুহান হাত নামিয়ে আনল আরিশার উন্মুক্ত কাঁধে। তার তপ্ত ঠোঁট জোড়া ভিড়ে গেল আরিশার কানের ঠিক নিচে, নরম চামড়ায়।

 

"আঃ... রুহান, ছাড়ো..." আরিশার মুখ থেকে একটা হালকা গোঙানির শব্দ বের হয়ে এলো, যা মোটেও বাধার ছিল না, বরং ছিল এক গভীর সমর্পণের সুর।

 

রুহান থামল না। তার ঠোঁট আরিশার ঘাড় বেয়ে গড়িয়ে নামল কলারবোনের দিকে। প্রতিটি স্পর্শে যেন এক ধরণের আগুন জ্বলে উঠছিল। আরিশার শরীরের প্রতিটি রোমকূপ খাঁড়া হয়ে উঠল। সে নিজের অজান্তেই রুহানের চওড়া কাঁধ দুটো আঁকড়ে ধরল। রুহানের শক্ত হাতের তালু আরিশার উন্মুক্ত কোমরে চেপে বসল, তাকে আরও গভীরে নিজের সাথে পিষে নেওয়ার জন্য।

 

"বলুন ম্যাডাম, আপনার সেই অহংকার এখন কোথায়?" রুহানের হাঁপাতে থাকা গরম নিঃশ্বাস আরিশার বুকে ধাক্কা মারল। "যে মেয়ে কাউকে পরোয়া করত না, সে এখন আমার বুকের ওপর হাত রেখে কাঁপছে কেন?"

 

আরিশা চোখ খুলল। রুহানের মুখটা তার থেকে মাত্র এক ইঞ্চি দূরে। সে দেখতে পেল রুহানের চোখে শুধুই খেলা নয়, এমন এক তীব্র কাম বাসনা আর ভালোবাসা জমা হয়ে আছে, যা রুহান এতদিন লুকিয়ে রেখেছিল।

 

"তুমি... তুমি খুব খারাপ রুহান..." আরিশা ফিসফিস করে বলল, কিন্তু তার কণ্ঠে কোনো রাগ ছিল না।

 

"আমি আরও খারাপ হতে পারি আরিশা, যদি তুমি আমার কথা না শোনো।" রুহান এক ঝটকায় আরিশার কোমর ধরে তাকে আলমারি থেকে তুলে সোজা বিছানায় শুইয়ে দিল।

 

আরিশার শাড়ি-কামিজের আঁচল একপাশে সরে গেল। রুহান তার ওপরে উঠে এলো, কিন্তু নিজের সমস্ত শরীরের ভার আরিশার ওপর না ফেলে দু কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে আটকে রইল। তার চোখ নামল আরিশার ঠোঁটের দিকে। আরিশার গোলাপী, রসে ভরা ঠোঁট দুটো ভয়ে আর উত্তেজনায় হালকা ফাঁক হয়ে ছিল।

 

রুহান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে ঝুঁকে পড়ে আরিশার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। এটা কোনো সাধারণ চুম্বন ছিল না; এতে ছিল এতদিন ধরে জমা হয়ে থাকা প্রচ্ছন্ন অধিকার, ভালোবাসা আর তীব্র কামনার বহিপ্রকাশ। আরিশা প্রথমে শক্ত হয়ে গেলেও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সে রুহানের এই উদাম ভালোবাসার সাগরে তলিয়ে গেল। সে রুহানের চুলে আঙুল চালিয়ে দিল, নিজেকে বিলিয়ে দিল এই কাল্পনিক অথচ চরম সত্যি প্রেমানুভূতির কাছে।

 

বেশ কিছুক্ষণ পর, যখন দুজনেরই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো, রুহান ধীরে ধীরে ঠোঁট সরিয়ে নিল। আরিশার ঠোঁট তখন রক্তিম, ভেজা আর ফোলা। আরিশা দ্রুত শ্বাস নিচ্ছিল, তার চোখ দুটো নেশাগ্রস্তের মতো আধা-বোজা।

 

রুহান তার চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে কপালে একটা মিষ্টি কিন্তু গাঢ় চুমু খেল। তারপর নিচু গলায় বলল, "আজকের মতো এইটুকুই। বাকি চারদিন আমি তোমাকে এমনভাবে নিজের করে নেব, যেন বিয়েটা নাটকের না হয়ে সত্যি হয়ে যায়।"

 

রুহান উঠে দাঁড়াল এবং ঘরের দরজা খুলে নিজের ঘরে চলে গেল। কিন্তু রেখে গেল এক উত্তপ্ত হাওয়া, যা পুরো ঘরে তখনও ভাসছিল।

 

বিছানায় শুয়ে শুয়ে আরিশা নিজের বুকের ওপর হাত রাখল। হৃদপিণ্ডটা এখনো পটাপট ভাঙছে। সে ছাদের দিকে তাকিয়ে ভাবল—যে লোকটাকে সে শুধু বাঁচায় সাহায্য করার জন্য ডেকে এনেছিল, তাকে ঘিরে কেন তার মনে এত গভীর অনুভূতির সৃষ্টি হচ্ছে? এই স্পর্শ, এই কামনার উষ্ণতা কি শুধুই শর্তের খাতিরে, নাকি রুহানের হৃদয়ের গভীরে অন্য কোনো সত্যি লুকিয়ে আছে? আরিশা বুঝতে পারল, সে এক এমন চোরাবালিতে পা দিয়েছে, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো রাস্তা আর নেই।

 

পরবর্তী দু’দিন কেটে গেল চরম এক উত্তেজনায়। পরিবারের সবার সামনে রুহান আর আরিশার নিখুঁত প্রেমের অভিনয় চললেও, আড়ালে তাদের প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে উঠছিল গভীর ও তীব্র। রুহানের চোখের এক একটি চাহনি, সুযোগ পেলেই আরিশাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে কানের কাছে ফিসফিস করে শর্ত মনে করিয়ে দেওয়া, আর তার উষ্ণ ছোঁয়া—সব মিলিয়ে আরিশা নিজেকে হারিয়ে ফেলছিল। যে রুহানকে সে চঞ্চল ও কঠোর জানত, সেই রুহানের ভেতরের এই উম্মাদ ভালোবাসা ও আগলে রাখার শক্তি আরিশার হৃদয়কে পুরোপুরি জয় করে নিয়েছিল। সে বুঝতে পারল, এটা আর কোনো নাটক নয়; রুহানকে সে সত্যিই নিজের অস্তিত্বের চেয়েও বেশি ভালোবেসে ফেলেছে।

 

অবশেষে এল সেই কাঙ্ক্ষিত চতুর্থ দিন—বিয়ের দিন।

 

পুরো বাড়ি সেজেছে লাল আর সোনালি আলোয়। উঠোনে সানাইয়ের করুণ সুর বাজছে। ড্রয়িং রুমে অতিথিদের কলকাকলি। বিয়ের সব আয়োজন প্রস্তুত। আরিশা তার ঘরে লাল টকটকে রাজকীয় বেনারসি পরে আয়নার সামনে বসে আছে। তার কপালে টিকলি, গলায় ভারী হার, আর হাতে কাঁচের লাল চুরি। কিন্তু তার চোখে আনন্দের কোনো ছাপ নেই, বরঞ্চ জমেছে একরাশ শঙ্কা আর আক্ষেপ।

 

সকাল থেকে রুহানের দেখা নেই। ফোনটাও বন্ধ।

 

আরিশার বুকটা অজানা ভয়ে কেঁপে উঠল। রুহান কি তাকে এভাবে ফেলে চলে গেল? সে কি সত্যিই শুধু একটা চুক্তি পূরণ করছিল? আরিশার চোখ বেয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল মেহেন্দির রঙে রাঙানো হাতে।

 

"কনেকে নিচে নিয়ে এসো, কাজী সাহেব চলে এসেছেন।" বাহির থেকে চাচার গলা ভেসে এলো।

 

মেহজাবিন আরিশার হাত ধরে নিচে নিয়ে এল। কাজী সাহেবের সামনে কাঠের বড় টেবিল। একদিকে আরিশার বাবা গম্ভীর মুখে বসে আছেন, আর অন্য পাশে দূরসম্পর্কের পাত্রপক্ষের লোকজন। কাজী সাহেব বিয়ের খাতা খুলে বসলেন।

 

"বলো মা, কবুল..."

 

আরিশা চুপ করে রইল। তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। চারপাশটা যেন থমথমে হয়ে গেল। তার বাবা একটু কড়া চোখে তাকালেন, "আরিশা, দেরি করছ কেন?"

 

আরিশা চোখ বন্ধ করে এক ফোঁটা জল ফেলল। সে কাজী সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলতে গেল, "আমি পারব না..."

 

ঠিক তখনই কাজী সাহেবের কথা মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে কাজী বাড়ির ভারি কাঠের দরজাটা সশব্দে খুলে গেল!

 

বাইরে থেকে আসা তীব্র আলোর মাঝে এসে দাঁড়াল এক দীর্ঘদেহী পুরুষ। পরনে কালো শেরওয়ানি, চুলে হালকা ছিটানো জল আর চোখে এক অপ্রতিরোধ্য তেজ। রুহান চৌধুরী!

 

পুরো ড্রয়িং রুম নীরবতায় ডুবে গেল। আরিশার বাবা বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন, "এসবের মানে কী রুহান? তুমি এত দেরি করে এলে কেন? আর এভাবে হুট করে ঢোকার অর্থ কী?"

 

রুহান ধীর পায়ে এগিয়ে এল। প্রতিটি পদক্ষেপে তার আত্মবিশ্বাস ঠিকরে বের হচ্ছে। সে সোজা আরিশার সামনে এসে দাঁড়াল। আরিশা চোখ তুলে তাকাল; তার চোখে জল, কিন্তু রুহানের চোখে কোনো অপরাধবোধ নেই, আছে এক বুকভরা অগাধ ভালোবাসা।

 

রুহান আরিশার কান্নাভেজা মুখের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল। তারপর আরিশার বাবাকে উদ্দেশ্য করে দৃঢ় গলায় বলল, "দেরি হওয়ার জন্য দুঃখিত, স্যার। তবে আমি কোনো নাটকের অংশ হয়ে সই করতে আসিনি। আমি এসেছি আমার নিজের অধিকার ছিনিয়ে নিতে।"

 

"মানে? কী বলছ তুমি?" আরিশার বাবা গর্জে উঠলেন।

 

রুহান একধাপ এগিয়ে আরিশার হাতটা নিজের শক্ত ও উষ্ণ হাতের তালুতে টেনে নিল। আঙুলে আঙুল পেঁচিয়ে ধরে আরিশার দিকে তাকিয়ে বলল, "আরিশা ভেবেছিল সে বাঁচাল নিজের পিঠ, আর আমায় ব্যবহার করল একটা সাময়িক প্রেমিক বানিয়ে। ও ভেবেছিল এটা শুধুই কয়েকদিনের এক নাটক। কিন্তু ও জানে না, এই নাটকটা শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই আমি ওকে ভালোবেসে এসেছি।"

 

আরিশার বুকটা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকাল রুহানের দিকে।

 

রুহান সবার সামনে নির্দ্বিধায় বলতে লাগল, "বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন যখন ও আমার সাথে ঝগড়া করেছিল, সেদিনই ও আমার হৃদয়ে জড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ও এতই জেদী যে সোজা পথে ভালোবাসার কথা বললে আমাকে তাড়িয়ে দিত। তাই যখন ও আমায় এই প্রেমিক সাজানোর প্রস্তাব দিল, আমি সুযোগটা হাতছাড়া করিনি। চারদিন ধরে আমি ওর খুব কাছে গিয়েছি, ওকে স্পর্শ করেছি, ওর চোখের গভীরে হারিয়ে গিয়েছি—তা কোনো শর্তের জন্য নয়, ওকে এটা বোঝাতে যে ও কেবলই আমার!"

 

কথাগুলো শেষ হতেই রুহান পকেট থেকে একটা সুদৃশ্য আংটি বের করল। তারপর সবাইকে অবাক করে দিয়ে আরিশার সামনে এক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

 

আরিশার দিকে অপলক তাকিয়ে রুহান নিচু ও আবেগঘন কণ্ঠে বলল, "আরিশা, তুমি আমায় বাঁচাল প্রেমিক বানিয়েছিলে। কিন্তু আমি তোমাকে সারাজীবনের জন্য আমার জীবনসঙ্গী করতে চাই। তুমি কি এই মিথ্যা অভিনয়টাকে আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যি বানিয়ে দেবে? তুমি কি আমায় বিয়ে করবে?"

 

আরিশার চোখে তখন আনন্দের অশ্রু গড়াচ্ছে। তার সমস্ত দ্বিধা, সমস্ত ভয় এক মুহূর্তে উবে গেল। যে মানুষটা তার জন্য এতদূর আসতে পারে, যে তাকে পাওয়ার জন্য পুরো দুনিয়ার সামনে নিজের অনুভূতি উজার করে দিতে পারে, সে ছাড়া আর কে হতে পারে তার যোগ্য জীবনসঙ্গী?

 

আরিশা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে কোনো কিছু না ভেবেই এক ঝটকায় হাঁটু গেড়ে বসে পড়া রুহানের গলায় জড়িয়ে ধরে তার বুকের সাথে মিশে গেল।

 

"আমিও তোমাকে চাই রুহান! আমি শুধু তোমাকেই ভালোবাসি!" আরিশা রুহানের কাঁধে মুখ লুকিয়ে কেঁদে ফেলল।

 

রুহান তার দু'হাতে আরিশার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল। তার ঠোঁট ভিড়ে গেল আরিশার কানের লতিতে, অত্যন্ত নিবিড় ও তীব্র অনুভূতির সাথে ফিসফিস করে বলল, "তুমি শুধু আমার, আরিশা। আজ থেকে, সারাজীবনের জন্য।"

 

উপস্থিত সবাই এক মুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেলেও, রুহানের এই অপ্রতিরোধ্য ভালোবাসা আর ব্যক্তিত্বের সামনে আরিশার বাবার মনের বরফও গলে গেল। তিনি হালকা হেসে মাথা নাড়লেন।

 

কাজী সাহেব হাসিমুখে বললেন, "তাহলে কি এখন আসল বর আর কনের নামটা খাতায় লিখে নেব?"

 

পুরো বাড়ি

জুড়ে তখন আনন্দের নতুন সুর বেজে উঠেছে। আরিশা রুহানের বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে অনুভব করল সেই চেনা উষ্ণতা আর ভালোবাসা—যার ছদ্মবেশে শুরু হলেও, পরিণতি হলো এক পরম ও পবিত্র প্রাপ্তিতে।

....
👁 14