প্রাক্তনের সামনে নতুন খেলা

রোদে পোড়া শহরটার একটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ক্যাফেতে বসে নীরা যখন নিজের কফির কাপে চামচ নাড়ছিল, তখন তার হাত সামান্য কাঁপছিল। কাঁচের দেয়ালের ওপাশে, মাত্র কয়েক হাত দূরে হাঁটাচলা করছে রাইয়ান—তার প্রাক্তন। যাকে একসময় নীরা নিজের জীবন ভেবেছিল, সে আজ অন্য এক নারীর হাত ধরে শহরের সবচেয়ে নামীদামী রেস্তোরাঁর দিকে হেঁটে যাচ্ছে। রাইয়ানের মুখে সেই পরিচিত আত্মঅহংকারের হাসি, যা নীরাকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দিত সে কতটা তুচ্ছ ছিল তার কাছে। বিচ্ছেদের পর রাইয়ান বলেছিল, "তুমি আমাকে ছাড়া কখনো সুখী হতে পারবে না।"

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

আজ সেই কথাটাকেই মিথ্যে প্রমাণ করার এক তীব্র, ব্যাকুল উন্মাদনা চেপে বসলো নীরার মাথায়। সে যেকোনো মূল্যে দেখাতে চায়, সে রাইয়ানের চেয়ে বহু গুণে ভালো আছে, অনেক বেশি সুখী।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

ঠিক সেই মুহূর্তে ক্যাফের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো আদ্রিয়ান। লম্বা, সুঠাম দেহের এক যুবক, যার পরনে সাধারণ কালো শার্ট হলেও চোখের মধ্যে এমন এক তীক্ষ্ণতা আর ব্যক্তিত্ব আছে যা যেকোনো নারীকে থমকে দিতে বাধ্য। আদ্রিয়ান নীরার এক দূরসম্পর্কের পরিচিত এবং পেশায় স্থপতি। কিছুটা গম্ভীর, শান্ত স্বভাবের মানুষ।

 

নীরা এক মুহূর্তও ভাবলো না। এক অদম্য একগুয়েমি থেকে সে সোজা উঠে গিয়ে আদ্রিয়ানের সামনাসামনি দাঁড়ালো। আদ্রিয়ান কিছু বুঝে ওঠার আগেই নীরা তার এক হাত আদ্রিয়ানের চওড়া বুকের ওপর রাখলো এবং অন্য হাতে তার গাল ছুঁয়ে একদম কাছে ঘেঁষে দাঁড়ালো।

 

"প্লিজ, আদ্রিয়ান... শুধু পাঁচটা মিনিট। আমার সাথে একটু অভিনয় করো," ফিসফিস করে অত্যন্ত আকুল গলায় বলল নীরা।

 

আদ্রিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকালো, তার চোখে বিরক্তি ও বিস্ময়। "কী আজেবাজে বকছো নীরা? ছাড়ো আমাকে।"

 

"দয়া করে না কোরো না! ওই যে দেখো, বাইরে রাইয়ান দাঁড়িয়ে আছে। আমি চাই না সে ভাবুক আমি ওর জন্য একা, বিষণ্ণ হয়ে আছি। প্লিজ, আমার প্রেমিক হিসেবে একটু অভিনয় করো!" নীরার চোখের মধ্যে অনুনয় আর এক ধরনের তীব্র জেদ স্পষ্ট ছিল।

 

আদ্রিয়ান গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেললো। সে এসব সস্তা নাটক পছন্দ করে না, কিন্তু নীরার চোখের জলভেজা আকুতি আর তার শরীরের কাঁপুনি দেখে সে নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। আদ্রিয়ানের গম্ভীর মুখটা সামান্য নরম হলো।

 

"ঠিক আছে। কিন্তু এটা শুধু আজকের জন্য," আদ্রিয়ান নিচু স্বরে বলল।

 

কিন্তু নাটকের তো সবে শুরু। রাইয়ান যখন ক্যাফের কাঁচের দেয়াল দিয়ে ভেতরে তাকালো, নীরা আদ্রিয়ানকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। তারা ক্যাফের এক কোণের তুলনামূলক অন্ধকার আর নির্জন টেবিলটাতে গিয়ে বসলো।

 

রাইয়ান ভেতর ঢুকছে দেখে নীরা আদ্রিয়ানের একদম কাছাকাছি সরে এলো। নীরা নিজের এক হাত আদ্রিয়ানের উরু ও হাঁটু ছুঁয়ে ওপরের দিকে চেপে ধরলো, যেন বাহির থেকে তাদের সম্পর্কটা চরম ঘনিষ্ঠ ও গভীর মনে হয়। আদ্রিয়ান নীরার এই আচমকা স্পর্শে চমকে উঠলো। নীরার নরম, উত্তপ্ত হাতের স্পর্শ তার উরুর ওপর এক অদ্ভুত বিদ্যুতের মতো খেলে গেল।

 

আদ্রিয়ান এবার নিজে উদ্যোগী হলো। অভিনয়টা যদি করতেই হয়, তবে তা নিখুঁত হওয়া চাই। সে হঠাৎ নীরার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে একদম নিজের বুকের সাথে পিষে ধরলো। নীরার থমকে যাওয়া নিঃশ্বাস আদ্রিয়ানের গলায় গিয়ে লাগলো।

 

"যদি অভিনয়ই করতে হয় নীরা, তবে তা যেন সত্যি মনে হয়," আদ্রিয়ানের ভেজা গাঢ় কণ্ঠস্বর নীরার কানের লতিতে কাঁপন ধরালো।

 

আদ্রিয়ান নিজের দীর্ঘ আঙুলগুলো দিয়ে নীরার ঘাাড়ের চুলগুলো সরিয়ে দিল। তার ঠোঁট দুটো নীরার খোলা ঘাাড় আর কানের পেছনের সংবেদনশীল ত্বকে হালকা ছুঁয়ে গেল। নীরা নিজেকে সামলাতে পারছিল না। রাইয়ানকে দেখানোর জন্য যে অভিনয় সে শুরু করেছিল, আদ্রিয়ানের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও গভীর স্পর্শে তা মুহূর্তেই কামনার এক চরম উত্তাপে রূপ নিল।

 

আদ্রিয়ানের এক হাত নীরার উন্মুক্ত পিঠের ওপর ধীরে ধীরে নেমে এলো, শাড়ির আঁচলের আড়ালে থাকা নরম ত্বকে তার উষ্ণ আঙুলের চাপ নীরাকে ভেতরে ভেতরে শিউরে তুললো। নীরার বুক দ্রুত ওঠানামা করছিল। আদ্রিয়ান নীরার খুব কাছে এসে তার নিচের ঠোঁটটা নিজের ঠোঁটের মাঝে চেপে ধরলো। সেটা কোনো সাধারণ অভিনয় ছিল না; আদ্রিয়ানের স্পর্শের গভীরতা আর উষ্ণতা নীরার ভেতরের সমস্ত চেতনাকে অচল করে দিচ্ছিল।

 

বাইরে থেকে রাইয়ান পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। নীরার চোখে মুখে ভেসে ওঠা অনাবিল তৃপ্তি আর আদ্রিয়ানের উন্মত্ত ঘনিষ্ঠতা দেখে রাইয়ানের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। যে নীরাকে সে অবহেলা করে ছেড়ে গিয়েছিল, আজ সে অন্য এক পুরুষের বাহুডোরে হারিয়ে গেছে—এই দৃশ্য রাইয়ানের অহংকারকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিল। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে রাইয়ান দ্রুত পা চালিয়ে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে গেল।

 

রাইয়ান চলে যাওয়ার পরও আদ্রিয়ান কিন্তু নীরাকে ছাড়লো না। ঘরের সেই নির্জন কোণে আদ্রিয়ানের হাতের মুঠো নীরার কোমরে আরও শক্ত হলো। নীরার চোখের দিকে তাকিয়ে আদ্রিয়ান শান্ত অথচ এক গভীর আবেগী গলায় বলল, "খেলাটা কিন্তু তুমি শুরু করেছো নীরা। শেষটা আমার মতো হবে।"

 

নীরা আদ্রিয়ানের বুকের ওপর হাত রেখে কেবল হাঁপাচ্ছিল। প্রাক্তনের সামনে সুখী প্রমাণের জন্য শুরু হওয়া এই মিথ্যে অভিনয় যে তার জীবনের গতিপথ এভাবে বদলে দেবে, তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। কিন্তু আদ্রিয়ানের ওই চোখের চাহনি আর তার স্পর্শের উত্তাপ নীরাকে এক চরম অনিশ্চয়তা আর অচেনা এক কামনার সাগরে ভাসিয়ে দিল।

 

ক্যাফের সেই উত্তপ্ত আর অনাকাঙ্ক্ষিত মুহূর্তের পর দুটো দিন কেটে গেছে। কিন্তু নীরার ত্বক যেন এখনও আদ্রিয়ানের হাতের সেই গভীর স্পর্শ আর উষ্ণতার কথা ভুলতে পারছিল না। নীরা ভেবেছিল ব্যাপারটা সেখানেই শেষ। কিন্তু রাইয়ান এত সহজে দমবার পাত্র নয়। সে নীরার অফিসে ফোন করে নানাভাবে তাকে উত্যক্ত করতে শুরু করল এবং দাবী করল—আদ্রিয়ানের সাথে নীরার সম্পর্কটা কেবলই এক নাটক।

 

উপায় না পেয়ে নীরা আবার আদ্রিয়ানের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হলো। আদ্রিয়ানের অফিসে গিয়ে যখন সে সবটা খুলে বলল, আদ্রিয়ান তার চেয়ার থেকে উঠে এসে নীরার একদম মুখোমুখি দাঁড়াল।

 

"তুমি চাও আমি তোমার বয়ফ্রেন্ড সেজে এই সমাজের আর তোমার প্রাক্তনের সামনে যাই?" আদ্রিয়ানের গলার স্বর গম্ভীর, কিছুটা খাঁ খাঁ শোনালো।

 

"হ্যাঁ আদ্রিয়ান... অন্তত কয়েকটা সপ্তাহ। রাইয়ান যেন পুরোপুরি আমার জীবন থেকে দূরে সরে যায়," নীরা নিচু স্বরে বলল, তার চোখে অনুনয়।

 

আদ্রিয়ান এক মুহূর্ত নীরাকে আপাদমস্তক দেখল। নীরার ফর্সা গলার কলারবোন, তার কম্পমান ঠোঁট আর চোখের ব্যাকুলতা যেন আদ্রিয়ানের ভেতরের সংযমের বাঁধ ভেঙে দিচ্ছিল। সে এক ধাপ এগিয়ে এসে নীরার কোমর ধরে তাকে নিজের দিকে টেনে নিল। টেবিলের কাঁচের সাথে নীরা নিজেকে আটকে যেতে অনুভব করল।

 

"ঠিক আছে, চুক্তি মেনে নিলাম। কিন্তু অভিনয়টা আমার নিয়মে হবে," আদ্রিয়ান নীরার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, তার গলার কন্ঠ নেমে এসেছে ফিসফিসানিতে।

 

নীরার বুকে এক তীব্র তোলপাড় শুরু হলো। আদ্রিয়ানের শক্ত বুধ আর উরুর উত্তাপ নীরার শিহরণ জাগানো প্রতিটি স্নায়ুকে সজাগ করে তুলছিল। আদ্রিয়ান নীরার এক হাত ধরে নিজের বুকের বাম পাশে রাখল, যেখানে হৃদস্পন্দন দ্রুত গতিতে চলছিল।

 

"অনুভব করছো? এটা কিন্তু অভিনয়ের স্পন্দন নয়," আদ্রিয়ান বলল।

 

সেদিন বিকেলে একটা পারিবারিক অনুষ্ঠানে রাইয়ানের উপস্থিত থাকার কথা ছিল। নীরা আদ্রিয়ানকে সাথে নিয়ে সেখানে হাজির হলো। লাল রঙের শাড়িতে নীরাকে অচেনা রূপসী লাগছিল, আর আদ্রিয়ানের সুঠাম দেহে কালো পঞ্জাবি যেন তাকে আরও আবেদনময় করে তুলেছিল।

 

অনুষ্ঠানের এক কোণে আলো-আঁধারির মাঝে রাইয়ানকে দেখতে পেয়েই আদ্রিয়ান নীরাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। লোকচক্ষুর আড়ালে, বারান্দার এক নির্জন কোণে আদ্রিয়ান নীরাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। নীরার শাড়ির আঁচলটা আদ্রিয়ানের হাতে খসে পড়ল।

 

"আ... আদ্রিয়ান, কেউ দেখে ফেলবে," নীরা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, কিন্তু তার কণ্ঠে কোনো বাধা দেওয়ার চেষ্টা ছিল না, বরং ছিল এক অচেনা সমর্পণ।

 

"দেখুক। সবাই জানুক তুমি কেবলই আমার," আদ্রিয়ান নীরার কানে কাছে মাথা নামিয়ে আনল। তার উষ্ণ ঠোঁট নীরার খোলা ঘাড়ের সংবেদনশীল চামড়ায় গভীর স্পর্শ আঁকল। নীরা চোখ বন্ধ করে আদ্রিয়ানের চুলগুলোতে আঙুল চালিয়ে দিল।

 

আদ্রিয়ানের হাতের তালু নীরার উন্মুক্ত পিঠের ওপর থেকে নেমে এসে কোমরের কাছে শক্ত হলো। সে নীরার থুতনি ধরে তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। এবার আর কোনো দ্বিধা ছিল না। আদ্রিয়ানের চরম ব্যাকুল আর উত্তপ্ত স্পর্শে নীরার ভেতরে এক কামনার আগুন জ্বলে উঠলো। আদ্রিয়ান যেভাবে নীরার কোমর ধরে নিজের শরীরের সাথে পিষে ধরেছিল, তাতে মনে হচ্ছিল না যে এটা কোনো চুক্তি বা অভিনয়। আদ্রিয়ানের গভীর শ্বাস আর নগ্ন আবেগের ছোঁয়ায় নীরা নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলছিল।

 

দূর থেকে রাইয়ান পুরো দৃশ্যটা দেখল। আদ্রিয়ানের স্পর্শের দাবি আর নীরার প্রতিক্রিয়া দেখে সে বুঝতে পারল, এখানে কোনো অভিনয় নেই। রাইয়ানের মুখ অপমানে লাল হয়ে উঠল এবং সে নীরবে সেখান থেকে কেটে পড়ল।

 

কিন্তু নীরা ততক্ষণে এক চরম সত্যের মুখোমুখি। আদ্রিয়ান যখন ধীরগতিতে তার ঠোঁট সরিয়ে নিল, নীরার দিকে তাকালো—সেই চোখে কোনো মিথ্যে নাটকের ছায়া ছিল না। আদ্রিয়ানের চোখে জ্বলজ্বল করছিল খাঁটি, গভীর ভালোবাসা আর তীব্র আকুলতা।

 

আদ্রিয়ান নীরার গালে হাত রেখে আলতো করে বলল, "আমি আর অভিনয় করতে পারছি না নীরা। আমি তোমাকে সত্যি ভালোবেসে ফেলেছি।"

 

এই একটা বাক্য যেন নীরাকে এক চরম ধাক্কা দিল। বাস্তবতার চাবুকটা হঠাৎ করেই তার মাথায় এসে পড়ল। সম্পর্কটার ভিত্তি তো ছিল একটা মিথ্যে! রাইয়ানকে দেখানোর জন্য শুরু করা এই অভিনয়ে আদ্রিয়ান এভাবে জড়িয়ে যাবে, তা নীরা ভাবেনি। যে সম্পর্কের সূচনা মিথ্যে আর প্রতারণায়, তা কখনো সত্যি হতে পারে?

 

এক অজানা ভয় আর অপরাধবোধে নীরা শিউরে উঠল। আদ্রিয়ানকে কিছু না বলেই, তার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সে দ্রুত পায়ে সেখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে গেল। আদ্রিয়ান শুধু হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

 

সেই রাতের পর থেকে নীরা আদ্রিয়ানের সাথে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। সে আদ্রিয়ানের ফোন ধরা বন্ধ করল, মেসেজের জবাব দিল না, এমনকি অফিসে আসা-যাওয়া পর্যন্ত কমিয়ে দিল। নীরার মনে কেবল একটাই ভয় তাড়া করে বেড়াচ্ছিল—যে সম্পর্কের ভিত্তি শুরুই হয়েছিল প্রাক্তনকে দেখানোর একটা নোংরা মিথ্যে আর ছলাকলা দিয়ে, সেই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কখনো সুন্দর হতে পারে না। আদ্রিয়ানের মতো নিষ্পাপ আর খাঁটি ভালোবাসার মানুষকে সে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেছে—এই অপরাধবোধ তাকে প্রতিনিয়ত ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল।

 

কিন্তু আদ্রিয়ান অত সহজে হাল ছাড়ার পাত্র ছিল না। সে নীরার এই দূরত্বের কারণ খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিল।

 

সপ্তাহখানেক পর, এক বর্ষণমুখর রাতে নীরার ফ্ল্যাটের দরজায় প্রবল শব্দে কড়া নাড়লো কেউ। নীরা দরজা খুলতেই দেখতে পেল বাইরে দাঁড়িয়ে আছে একদম জলে ভেজা আদ্রিয়ান। বৃষ্টির জলে তার ভেজা চুল কপালে এসে পড়েছে, আর শার্টটা শরীরের সাথে জড়িয়ে আছে। কিন্তু তার চোখের দৃষ্টিতে ছিল এক অদম্য জেদ আর তীব্র ভালোবাসার আগুন।

 

"আদ্রিয়ান? তুমি এই বৃষ্টিতে...?" নীরা অবাক হয়ে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই আদ্রিয়ান ভেতরে ঢুকে দরজা সশব্দে বন্ধ করে দিল।

 

"কেন পালাচ্ছ নীরা? আমার ভালোবাসা থেকে, নাকি নিজের ভেতরের অনুভূতি থেকে?" আদ্রিয়ানের গলার স্বর ভারী আর নিচু।

 

"তুমি বুঝতে পারছো না আদ্রিয়ান! আমরা শুরুটাই করেছিলাম একটা মিথ্যে দিয়ে! আমি তোমাকে ব্যবহার করেছি রাইয়ানকে দেখানোর জন্য! এই পাপ, এই প্রতারণার ওপর কোনো সত্য সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে না!" নীরা চিৎকার করে উঠলো, তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল।

 

আদ্রিয়ান এক মুহূর্ত নীরাকে দেখল। তারপর দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে এক ঝটকায় নীরাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। আদ্রিয়ানের গায়ের ভেজা কাপড়ের শীতলতা আর তার উত্তপ্ত নিঃশ্বাস নীরার শরীরের সমস্ত বাঁধ ভেঙে দিল।

 

"শুরুটা কী ছিল, তা নিয়ে আমি ভাবি না নীরা। আমি শুধু জানি, তোমাকে স্পর্শ করার পর থেকে আমার জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত সত্যি হয়ে গেছে," আদ্রিয়ান ফিসফিস করে নীরার কানের কাছে বলল।

 

আদ্রিয়ান নীরার মুখটা দু'হাতে তুলে ধরল। তার চোখ নীরার ভেজা ঠোঁটে আটকে গেল। সে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে গভীর আর তীব্র অনুরাগে নীরার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। এটা কোনো অভিনয়ের স্পর্শ ছিল না; এতে ছিল অধিকার, আকুলতা আর এক অবাধ্য সমর্পণের গল্প।

 

নীরার হাত দুটো আদ্রিয়ানের ভেজা পিঠের ওপর গিয়ে চেপে বসল। আদ্রিয়ান নীরাকে কোলে তুলে নিয়ে সোজা শোবার ঘরের বিছানায় গিয়ে নামাল। ঘরে জ্বলছিল আবছা নরম আলো। বাইরের মুষলধারে বৃষ্টির শব্দের সাথে মিশে যাচ্ছিল দুজনের দ্রুততর হওয়া নিঃশ্বাসের শব্দ।

 

আদ্রিয়ান নীরার ওপর ঝুঁকে এসে তার ভেজা চুলগুলো সরিয়ে দিল। তার হাত নীরার কোমরের আঁচল ছাড়িয়ে উন্মুক্ত ত্বকে স্পর্শ করল। আদ্রিয়ানের উত্তপ্ত আঙুলের প্রতিটি ছোঁয়া নীরাকে শিউরে তুলছিল। সে নীরার গাল, গলা আর কলারবোনে তার ঠোঁটের গভীর ছাপ এঁকে দিতে লাগলো। নীরার বুক দ্রুত ওঠানামা করছিল, সে আদ্রিয়ানের চওড়া কাঁধ চেপে ধরে নিজের ভেতরের সব ভয়, সংকোচ আর অতীতের স্মৃতিকে বিসর্জন দিল।

 

"আজকে তোমার এই শরীর, তোমার এই মন আর তোমার এই নিঃশ্বাস—কোনোটাই মিথ্যে নয় নীরা। বলো, এটা কি মিথ্যে?" আদ্রিয়ান নীরার চোখে চোখ রেখে ভেজা গলায় বলল, তার হাতের বাঁধন তখন নীরার শরীরে আরও গভীর, আরও তীব্র।

 

নীরা আদ্রিয়ানের ব্যাকুলতা আর খাঁটি ভালোবাসার উত্তাপে একদম গলে গেল। সে বুঝতে পারল, প্রাক্তনের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার যে ভুল দিয়ে খেলাটা শুরু হয়েছিল, তা আজ তাকে জীবনের সবচেয়ে সত্যি এবং পরম সুন্দর উপহারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আদ্রিয়ানের ভালোবাসা কোনো অভিনয়ের খাঁচায় বন্দী নয়, তা এক অনন্ত মহাসমুদ্র।

 

"না আদ্রিয়ান... এটা মিথ্যে নয়। আমি তোমাকে ভালোবাসি," নীরা রুদ্ধশ্বাসে স্বীকার করল এবং আদ্রিয়ানকে আরও শক্ত করে নিজের বুকে টেনে নিল।

 

সেই বৃষ্টিভেজা রাতে, কামনার তীব্র উত্তাপ আর ব্যাকুল ভালোবাসার জোয়ারে ভেসে গিয়ে তাদের জীবনের সব মিথ্যে ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল। ভোরের আলো যখন জানালায় এসে পড়ল, নীরা নিজেকে আবিষ্কার করল আদ্রিয়ানের চওড়া বুকের ওপর নিরাপদ আশ্রয়। আদ্রিয়ানের হাতের শক্ত মুঠো তখনো নীরার কোমর জড়িয়ে ধরে আছে।

 

নীরা মুচকি হেসে আদ্রিয়ানের বুকে মাথা রাখল। অতীতের সব অন্ধকার আর ভয়কে পেছনে ফেলে, আদ্রিয়ানের হাত ধরে সে এক নতুন, সুন্দর ভালোবাসার জীবনের দিকে পা বাড়াল।

....
👁 15