বসার ঘরের সোফায় বসে মেহরিন নিজের হাতদুটো শক্ত করে চেপে ধরে ছিল। তার সামনে রাখা হালকা গোলাপি রঙের দামি শাড়িটা যেন তাকে গিলতে আসছিল। মা পাশে বসে অনবরত পাত্রের বংশমর্যাদা, তার চাকরি আর ব্যাংকে জমা টাকার হিসেব শুনিয়ে যাচ্ছেন। গত তিন মাসে এই নিয়ে চার নম্বর পাত্র দেখতে আসার তারিখ ঠিক হয়েছে। প্রতিবারই মেহরিন কোনো না কোনো অজুহাত দেখিয়ে পালিয়েছে, কিন্তু এবার আর রেহাই পাওয়ার পথ ছিল না। আব্বা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সামনের মাসের মধ্যেই বিয়ে সম্পন্ন করতে হবে।
নিজের ঘরে গিয়ে দরজা আটকে মেহরিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আর কোনো উপায় না পেয়ে সে ড্রয়ার থেকে ফোনটা বের করল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল ‘আরিয়ান’ নামটা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস ক্লাবের বড় ভাই আরিয়ান—দেখতে যেমন লম্বা, ফর্সা আর গম্ভীর, তেমনি তার ব্যক্তিত্বেও একটা আলাদা ব্যক্তিত্বের স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। মেয়েদের কাছে সে ছিল স্বপ্নের মতো, কিন্তু মেহরিনের সাথে তার সম্পর্কটা ছিল নিখাদ বন্ধুত্বের, কিংবা তারচেয়ে একটু বেশি কৌতুকপূর্ণ।
মেহরিন কোনো ভূমিকা ছাড়াই ফোন করে বলল, "আরিয়ান ভাই, আমাকে বাঁচাও। তা না হলে সামনের সপ্তাহে আমার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।"
ওপাশ থেকে শান্ত, মেজাজি অথচ গভীর এক কণ্ঠ ভেসে এল, "কী করতে হবে বলো?"
"তোমাকে আমার বয়ফ্রেন্ড সাজতে হবে। আমাদের আব্বা-আম্মার সামনে এসে দাঁড়াতে হবে।"
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থাকল। তারপর একটা অদ্ভুত শব্দ করে হাসল। "বিনিময়ে আমি কী পাব, মেহরিন? তুমি তো জানো, আমি ফ্রিতে কাজ করি না।"
"তোমার কী চাই?" মেহরিন মরিয়া হয়ে বলল।
"আমার পরিবারের লোকও আমার ওপর বিয়ের চাপ দিচ্ছে। তোমার বাসায় গিয়ে আমি তোমার প্রেমিক সাজব, আর আমার বাসায় গিয়ে তুমি আমার প্রেমিকা সাজার ভান করবে। ডিল?"
এক মুহূর্তের জন্য মেহরিন থমকে গেল। কিন্তু আর কোনো দ্বিতীয় রাস্তা না থাকায় সে রাজি হয়ে গেল। সে জানত না, এই একটা ভুল বা সঠিক সিদ্ধান্ত তার জীবনের সমস্ত হিসেবওলটপালট করে দেবে।
পরদিন বিকেলে ধানমন্ডির এক শান্ত ক্যাফেতে দেখা করল দুজনে। মেহরিন সাদা রঙের একটা সালোয়ার কামিজ পরে এসেছিল, হালকা চুলগুলো পিঠে ছড়ানো। আরিয়ান পরনে ছিল কালো রঙের শার্ট, যার ওপরের দুটো বোতাম খোলা। তার চোখে-মুখে এক ধরনের চতুর আর মোহনীয় হাসি।
মেহরিন টেবিলে গিয়ে বসতেই আরিয়ান তার দিকে ঝুঁকে এল। হালকা আতরের সুবাস আরিয়ানকে ঘিরে রেখেছিল, যা মেহরিনের নাকে আসতেই তার বুকের ভেতরটা অচেনা এক আবেশে কেঁপে উঠল।
"নাটক যদি করতেই হয়, মেহরিন, তবে তা নিখুঁত হতে হবে," আরিয়ান খুব নিচু স্বরে বলল। তার গলার স্বর এতটাই গভীর ছিল যে মেহরিনের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।
"মানে?" মেহরিন একটু পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল।
আরিয়ান ঝটকা মেরে টেবিলে রাখা মেহরিনের নরম হাতটা নিজের শক্ত, উত্তপ্ত হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল। মেহরিনের হাতের আঙুলগুলোর ভাঁজে নিজের আঙুল ঢুকিয়ে দিয়ে কিছুটা চেপে ধরল।
"মানে হলো, আমাদের স্পর্শে যেন কেউ ভুল না ধরে। হাত ধরা, চোখ মেলানো, কিংবা শরীরের এই দূরত্ব..." আরিয়ান মেহরিনের আরও কাছাকাছি সরে এল। তার উষ্ণ শ্বাস মেহরিনের ঘাড়ে আর কানে এসে লাগছিল। মেহরিন অবশ হয়ে বসে রইল। এই তো কিছুক্ষণ আগেও আরিয়ান তার শুধুই পরিচিত এক জ্যেষ্ঠ ভাই ছিল, অথচ তার স্পর্শে কেন এত আগুন?
মেহরিন তোতলাতে তোতলাতে বলল, "আরিয়ান... সবাই দেখছে।"
"দেখুক," আরিয়ান মেহরিনের চোখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সে তার বুড়ো আঙুল দিয়ে মেহরিনের হাতের তালুতে ধীরগতিতে ঘষতে লাগল। সেই স্পর্শ এতটাই তোলপাড় করা ছিল যে মেহরিনের বুকের স্পন্দন কয়েকগুণ বেড়ে গেল। মেহরিনের মনে হলো, ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা মুহূর্তের মধ্যে অনেকটা বেড়ে গেছে।
কয়েকদিনের মধ্যেই আরিয়ানের মেহরিনদের বাসায় আসা শুরু হলো। মেহরিনের পরিবারকে বোঝানোর জন্য আরিয়ান এমন এক নাটক সাজাল, যা ছিল এক কথায় অবিশ্বাস্য। আব্বার সামনে দাঁড়িয়ে আরিয়ান এত শান্ত আর দৃঢ় কণ্ঠে কথা বলত যে মেহরিনের মা প্রথম দিনেই মুগ্ধ হয়ে যান।
কিন্তু সমস্যাটা হতো যখন তারা মেহরিনের ঘরের ভেতরে একা থাকত।
একদিন বিকেলে মেহরিনের ঘরে দুজন বসে ছিল। হঠাৎ মেহরিনের মা চা নিয়ে ঢোকার শব্দ হতেই আরিয়ান মেহরিনকে এক টানে নিজের দিকে টেনে নিল। মেহরিন ছিটকে গিয়ে পড়ল আরিয়ানের চওড়া বুকের ওপর। আরিয়ানের এক হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরল মেহরিনের পাতলা কোমর, আর অন্য হাতটা উঠে এল তার চিবুকে।
দরজা খুলে মা দৃশ্যটা দেখেই লজ্জিত হেসে চা রেখে চটজলদি চলে গেলেন।
দরজা বন্ধ হওয়ার পরও আরিয়ান মেহরিনকে ছাড়ল না। মেহরিনের বুক তখন উঠানামা করছে। আরিয়ানের চোখের আলো বদলে গেছে, সেখানে আর কোনো নাটকের ছোঁয়া ছিল না; ছিল এক গভীর, উন্মাদ তৃষ্ণা।
"তুমি খুব বেশি কাঁপছ, মেহরিন," আরিয়ানের গম্ভীর কণ্ঠটা মেহরিনের ঠোঁটের খুব কাছে ফিসফিসিয়ে উঠল।
"আম্মা... আম্মা চলে গেছেন, আরিয়ান। ছেড়ে দাও," মেহরিন কোনোমতে বলল, কিন্তু তার নিজের কণ্ঠই যেন তার বিশ্বাসঘাতকতা করছিল। সে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার কোনো শক্ত চেষ্টা করল না।
আরিয়ান ছাড়ল না। তার শক্ত হাতটা মেহরিনের কোমরের ভাঁজে আরেকটু চেপে বসল। সে তার মুখটা মেহরিনের ঘাড়ের ভাজে নামিয়ে আনল। আরিয়ানের উত্তপ্ত ঠোঁটের ছোঁয়া মেহরিনের খোলা ঘাড়ে লাগতেই মেহরিনের মুখ দিয়ে এক হালকা কোঁকানি বের হয়ে এল। মেহরিন দুহাতে আরিয়ানের শার্টের কলার আঁকড়ে ধরল।
"যদি বলি এখন আর এটা অভিনয় লাগছে না?" আরিয়ান মেহরিনের কানের লতিতে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। মেহরিনের সমস্ত শরীরে এক তীব্র শিহরণ খেলে গেল। তার মনে হলো, পা দুটো যেন মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে, সে মাথা ঘুরে পড়ে যাবে।
আরিয়ান মেহরিনকে আরও কাছে টেনে নিল। তাদের শরীরের মাঝে বিন্দুমাত্র ফাঁক ছিল না। মেহরিন আরিয়ানের বুকের ধুকপুকানি স্পষ্টভাবে শুনতে পাচ্ছিল, যা ঠিক তার নিজের হৃদস্পন্দনের মতোই দ্রুত আর তীব্র ছিল।
মেহরিন চোখ বন্ধ করে ফেলল। আরিয়ানের একটা হাত তার পিঠ বেয়ে ওপরে উঠে এসে চুলের মুঠিটা হালকা করে টেনে ধরল, যাতে মেহরিনের মুখটা সামান্য ওপরের দিকে উঠে আসে। আরিয়ান গভীর দৃষ্টিতে মেহরিনের কাঁপা ঠোঁট দুটোর দিকে তাকাল। তার চোখের সেই চাহনিতে এমন এক অধিকারবোধ ছিল, যা মেহরিনকে ভেতর থেকে ভেঙে চুরে এক নতুন অনুভূতির জন্ম দিচ্ছিল।
"আরিয়ান... প্লিজ," মেহরিন কিসের মিনতি করছিল, সে নিজেও জানত না। সে কি আরিয়ানকে থামতে বলছিল, নাকি আরও কাছে আসতে বলছিল?
আরিয়ান থমকাল, কিন্তু মেহরিনকে পুরোপুরি ছাড়ল না। মেহরিনের কপালে আলতো করে নিজের কপাল ঠেকিয়ে শ্বাস নিল সে।
"মেহরিন, মনে রেখো, তুমি শুধু আমার সামনে হাসবে, আমার সাথেই ঘুরবে। অন্য কোনো পুরুষের নামও যেন তোমার মুখে না শুনি। এটা শুধুই নাটক হতে পারে, কিন্তু তুমি এখন আমার।"
কথাগুলো কি শুধুই নাটকের অংশ ছিল? নাকি আরিয়ানের মনের ভেতরের সুপ্ত লালসা আর সত্যি অনুভূতি বেরিয়ে আসছিল? মেহরিন তার বুকের ওপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইল। সে বুঝতে পারছিল, আগুনের সাথে খেলতে গিয়ে সে নিজেই তাতে পুড়ে ছাই হতে চলেছে। আরিয়ান নামের এই শক্ত, দাম্ভিক লোকটা ধীরে ধীরে তার শিরায় শিরায় রক্তের মতো মিশে যাচ্ছে। মিথ্যা দিয়ে শুরু হওয়া এই অভিনয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভয়ানক আকর্ষণ আর গভীর আবেগ মেহরিনকে এক অচেনা গন্তব্যের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, যেখান থেকে ফিরে আসার আর কোনো পথ নেই।
দিন যত গড়াচ্ছিল, অভিনয় আর সত্যের মধ্যকার সীমানাটা ততই অস্পষ্ট হয়ে আসছিল। আরিয়ানের উপস্থিতি মেহরিনের মনে এক উত্তাল ঝড়ের সৃষ্টি করেছিল। সে বুঝতে পারছিল, আরিয়ানের এই ঘন ঘন আসা-যাওয়া, তার দিকে গভীর চোখে তাকানো কিংবা সবার আড়ালে তাকে আগলে রাখা—কোনোটাই আর স্রেফ অভিনয়ের গণ্ডিতে আটকে নেই।
একদিন সন্ধ্যায় আরিয়ানের পরিবারের সাথে মেহরিনের দেখা করার কথা। আরিয়ান নিজে গাড়ি চালিয়ে মেহরিনকে নিতে এলো। মেহরিনকে দেখে আরিয়ানের চোখ এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। গাঢ় লাল রঙের একটি সুতি শাড়িতে মেহরিনকে চমৎকার দেখাচ্ছিল। পিঠের অনেকটা অংশ খোলা, চুলগুলো মাথার ওপরে আলগা করে খোঁপা করা।
গাড়িতে ওঠার পর আরিয়ান গাড়ি স্টার্ট না দিয়ে একদৃষ্টে মেহরিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
"এভাবে কী দেখছ?" মেহরিন কিছুটা অস্বস্তি ও লজ্জা নিয়ে শুধাল।
আরিয়ান কোনো কথা না বলে মেহরিনের দিকে ঝুঁকে এল। সে মেহরিনের সিটবেল্টটা টেনে আনতে গিয়ে তার শরীরকে মেহরিনের সাথে প্রায় মিশিয়ে ফেলল। আরিয়ানের বুকের উত্তাপ আর শক্ত ছাতি মেহরিনের নরম স্পর্শে আসতেই মেহরিনের নিঃশ্বাস আটকে এল।
আরিয়ান এক হাতে মেহরিনের খোলা পিঠে নিজের আঙুল স্পর্শ করল। সেই স্পর্শে মেহরিনের শিরদাঁড়া বেয়ে যেন বিদ্যুতের তরঙ্গ খেলে গেল। সে সিটের সাথে নিজেকে আরও চেপে ধরল।
"তুমি কি জানো, মেহরিন... এই পোশাকে তোমাকে কতটা মারাত্মক দেখাচ্ছে?" আরিয়ানের গভীর, ঘামে ভেজা কণ্ঠস্বর মেহরিনের কাঁধে গিয়ে লাগল। সে তার ঠোঁট মেহরিনের নগ্ন কাঁধে আলতো করে ছুঁইয়ে দিল।
মেহরিন চোখ বন্ধ করে আরিয়ানের চুল মুঠো করে ধরল। তার মুখ দিয়ে হালকা একটা গোঙানি বেরিয়ে এলো, "আরিয়ান... আমরা দেরি করে ফেলব..."
"পড়ুক দেরি," আরিয়ান তোয়াক্কা করল না। সে মেহরিনের চিবুক ধরে নিজের দিকে ফেরাল। তারপর কোনো বাধা না মেনে মেহরিনের নরম, কাঁপা ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট চেপে ধরল।
সেই চুমুতে কোনো দ্বিধা ছিল না, ছিল না কোনো কৃত্রিমতা। এক উন্মাদের মতো ব্যাকুলতা আর দীর্ঘদিনের লালিত তৃষ্ণা ফুটে উঠছিল প্রতিটি ছোঁয়ায়। মেহরিন প্রথমে স্তব্ধ হয়ে গেলেও মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সমর্পণ করল। সে দুহাতে আরিয়ানের গলার চারপাশ পেঁচিয়ে ধরে তাকে আরও কাছে টেনে নিল। আরিয়ানের শক্ত হাত মেহরিনের কোমরে চেপে বসে তাকে আরও নিজের দিকে আঁকড়ে ধরছিল। ভালোবাসার এমন গভীর স্পর্শ মেহরিন জীবনে কখনো অনুভব করেনি। অভিনয় যে কখন আবেগের চরম শিখরে পৌঁছে গেছে, তা দুজনের কেউই টের পায়নি।
রেস্তোরাঁয় আরিয়ানের পরিবারের সাথে রাতের খাবার শেষ হতে হতে বেশ রাত হয়ে গেল। মেহরিনের ব্যবহারে আরিয়ানের মা-বাবা অত্যন্ত সন্তুষ্ট। কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে মেহরিনের মনটা ভার হয়ে এল।
মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই সম্পর্কটা তাকে ভেতরে ভেতরে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছিল। সে আরিয়ানকে ভালোবাসে—এটাই এখন তার জীবনের একমাত্র সত্য। কিন্তু আরিয়ান কি তাকে সত্যিই ভালোবাসে, নাকি শুধুই নিজের স্বার্থের জন্য এই নাটক চালিয়ে যাচ্ছে?
মেহরিনদের বাড়ির সামনে গাড়ি থামাল আরিয়ান। গাড়ি থেকে নামার আগে মেহরিন আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল, "আরিয়ান, আমাদের আর এই নাটক করা উচিত নয়। আমি আব্বাকে সব সত্যি বলে দেব। এভাবে মিথ্যা ভালোবাসার অভিনয় আমি আর নিতে পারছি না।"
আরিয়ানের হাত গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে শক্ত হয়ে জমে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। "তুমি কী বলছ, মেহরিন?"
"যা বলছি সত্যি বলছি," মেহরিন চোখ ঘুরিয়ে নিল, যাতে চোখে জমে থাকা পানি আরিয়ান দেখতে না পায়। "তুমি তো শুধু তোমার স্বার্থের জন্য এসেছিলে। এবার নাটকটা শেষ করা যাক।"
মেহরিন দরজার হাতল ধরে নামতে গেল, কিন্তু আরিয়ান ঝটকা মেরে তার হাত ধরে তাকে নিজের কোলে টেনে আনল। গাড়ি ভেতরের আলোটা নেভানো ছিল। আঁধারের মাঝে আরিয়ানের চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছিল।
"তোমার কি মনে হয় এই সব কিছু অভিনয় ছিল?" আরিয়ান মেহরিনের দুটো হাত তার মাথার ওপর সিটের সাথে চেপে ধরে গর্জনে ভরা নিচু গলায় বলল। "আমার স্পর্শ, তোমাকে আগলে রাখা, অন্য পুরুষের নাম শুনলে আমার ভেতরের জ্বালা—এসবই তোমার কাছে অভিনয় মনে হয়েছে?"
মেহরিন স্তব্ধ হয়ে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল।
"আমি প্রথম দিন থেকেই তোমাকে চাই, মেহরিন," আরিয়ান তার কপাল মেহরিনের কপালে ঠেকিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল। "বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ভিড়ে তুমি যখন প্রথম আমার দিকে তাকিয়েছিলে, তখন থেকেই তুমি আমার। বিয়ের নাটকের অজুহাত তো আমি শুধু তোমাকে কাছে পাওয়ার জন্য ধরেছিলাম। আমি তোমাকে ভালোবাসি, মেহরিন। মরিয়া হয়ে ভালোবাসি।"
কথাগুলো শুনে মেহরিনের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু এ জল কষ্টের নয়, পরম শান্তির। সে আরিয়ানের বাঁধন থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে আরিয়ানের মুখটা নিজের দুহাতে তুলে নিল।
"তুমি সত্যি বলছ, আরিয়ান?" মেহরিন ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
"আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসের মতো সত্যি," আরিয়ান মেহরিনের চোখের জল নিজের ঠোঁট দিয়ে মুছে দিল। তারপর এক চরম আকুলতায় মেহরিনের ঠোঁটে আবার নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। এই চুমুতে আর কোনো গোপনীয়তা ছিল না, ছিল শুধুই পূর্ণতার অঙ্গীকার। মেহরিনও নিজের সমস্ত সত্তা দিয়ে আরিয়ানকে জড়িয়ে ধরল।
পরদিন সকালে মেহরিন আর আরিয়ান একসঙ্গে গিয়ে মেহরিনের আব্বা-আম্মার সামনে দাঁড়াল।
আব্বা চশমার ওপর দিয়ে দুজনের দিকে তাকালেন। আরিয়ান মেহরিনের হাত নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রাখল। কোনো ভীতি নয়, বরং এক অপরিসীম সাহসে তার বুক ফুলে উঠেছিল।
"আঙ্কেল," আরিয়ান সোজা আব্বার চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত ও দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "আমি জানি আপনি আপনার মেয়ের জন্য সেরা পাত্র খুঁজছিলেন। কিন্তু আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, মেহরিনকে আমার চেয়ে বেশি সুখী কেউ রাখতে পারবে না। আমরা শুরুতে একটা নাটকের মাধ্যমে আপনাদের সামনে এসেছিলাম, কারণ আমরা ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু আজ যা বলছি, তা কোনো নাটক নয়। আমি মেহরিনকে ভালোবাসি এবং ওকে বিয়ে করতে চাই।"
মেহরিনের আব্বা কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইলেন। ঘরের পরিবেশ থমথমে হয়ে উঠল। মেহরিন ভয়ে আরিয়ানের হাত আরও শক্ত করে চেপে ধরল। আরিয়ান হাত বাড়িয়ে মেহরিনের কাঁধে হাত রেখে তাকে নিজের দিকে একটু টেনে এনে এক ভরসার ছোঁয়া দিল।
অবশেষে মেহরিনের আব্বার মুখে এক হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠল। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "আমি তো প্রথম দিনই আরিয়ানের চোখে মেহরিনের জন্য সেই অধিকারবোধ দেখেছিলাম, যা কোনো অভিনেতার পক্ষে দেখানো সম্ভব নয়। তোমরা ভেবেছিলে আমাকে বোকা বানাচ্ছ?"
আম্মা হেসে উঠে বললেন, "বিয়ের সব তোড়জোড় তো করাই আছে। এবার শুধু পাত্রের নামটা আনুষ্ঠানিকভাবে বদলে দিলেই হলো।"
মেহরিন অবিশ্বাস্য চোখে মায়ের দিকে তাকাল, তারপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরিয়ানের দিকে তাকাল। আরিয়ানের ঠোঁটে তখন বিজয়ীর হাসি। সে মেহরিনের দিকে তাকিয়ে আড়ালে চোখ টিপল। মিথ্যা আর অভিনয়ের অন্ধকার পেরিয়ে আজ তারা ভালোবাসার সেই আলোকিত সত্যে পৌঁছে গেছে, যেখান থেকে তাদের আর কখনোই আলাদা করা যাবে না।
....