পলিমাটির ঘ্রাণে ভেজা কালিয়াগ্রামের বাতাসটা যেন আজ একটু বেশিই ভারী। মেহজাবিনের চলে যাওয়ার পর থেকে এই গ্রাম, এই বিল, আর পদ্মাপাড়ের বটতলা রিদওয়ানের কাছে এক একটা জীবন্ত হাহাকার।
পাঁচটা দীর্ঘ বছর কেটে গেছে। কিন্তু রিদওয়ানের মন এখনো আটকে আছে সেই কুয়াশাচ্ছন্ন এক অগ্রহায়ণের সকালে। যে সকালে ঘুম থেকে উঠে সে শুনেছিল মেহজাবিন আর তাদের বাড়িতে নেই। মেহজাবিনের বাবার কাঠের বাক্সের ওপর রাখা ছিল একটা লাল খাম। কাঁপা কাঁপা হাতের অক্ষরে মেহজাবিন লিখেছিল—‘রিদওয়ান, আমাকে খোঁজার চেষ্টা কোরো না। যদি পারো, ভুলে যেও। আমার এই অন্তর্ধানের পেছনে কাউকে দায়ী কোরো না। এটাই আমাদের ভাগ্য।’
রিদওয়ান সেই চিঠি ভুলতে পারেনি, মেহজাবিনকেও না। তার বুকে যে আগুন মেহজাবিন জ্বেলে দিয়েছিল, তা বছরের পর বছর ধরে তুষের আগুনের মতো তলে তলে জ্বলেছে। মেহজাবিন ছিল গ্রামের মাতব্বরের ছোট মেয়ে—একদলা কাঁচা সোনার মতো তার গায়ের রং, আর চোখ দুটো যেন রাতের অথৈ বিলের কাজল কালো পানি।
আজ বিকেলে আবার সেই চিঠি এসেছে। ডাকপিয়ন রহমত মিয়া যখন পিঠের বস্তা থেকে খামটা বের করে রিদওয়ানের হাতে দিল, রিদওয়ানের হাতের রগগুলো টান টান হয়ে উঠল। হাতের লেখাটা হুবহু এক। একই রকম বাঁকা অক্ষরে লেখা—‘রিদওয়ান, কালিয়াগ্রামের দক্ষিণের হিজল বাগানের পুরোনো নীলকুঠিতে এসো। যদি এখনো তোমার বুকে সেই পুরোনো রোদের উত্তাপ বেঁচে থাকে, তবেই এসো। ইতি—তোমার মেহজাবিন।’
চিঠিটা হাতে নিয়ে রিদওয়ানের সারা শরীরে যেন এক বিদ্যুৎ তরঙ্গ খেলে গেল। রক্তে শোরগোল পড়ে গেল তার। সে আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। পড়ন্ত বিকেলে যখন সূর্যটা পদ্মার ওপারে ঢলে পড়ছে, পুরো গ্রামজুড়ে গোধূলির রক্তিম আলো ছড়ানো, রিদওয়ান দ্রুত পায়ে হেঁটে চলল দক্ষিণের নীলকুঠির দিকে।
পুরোনো নীলকুঠিটা গ্রামের একবারে শেষ মাথায়, হিজল আর ছাতিম গাছের ঘন জঙ্গল যেখানে শুরু হয়েছে। কত বছর ধরে এটা পরিত্যক্ত। লোকমুখে নানা গল্প ছড়িয়ে আছে এই কুঠিকে ঘিরে, তাই সন্ধের পর সচরাচর কেউ এদিকে পা বাড়ায় না। কিন্তু আজ রিদওয়ানের বুকে কোনো ভয় নেই, আছে কেবল এক উন্মাদ নেশা—মেহজাবিনকে দেখার নেশা, তাকে ছোঁয়ার নেশা।
কুঠির মেঝেবোঝাই ঝরা পাতা। ভাঙা জানলা দিয়ে বাইরের গোধূলির লাল আলো এসে পড়েছে ঘরে। ঘরে ঢুকতেই রিদওয়ানের নাকে এল একটা খুব চেনা সুবাস—কাঁচা বেলি ফুল আর ভেজা মাটির এক তীব্র মিশেল। এই গন্ধটা শুধুই মেহজাবিনের।
"মেহজাবিন?" রিদওয়ানের কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল।
পরিত্যক্ত ঘরের এক কোণে থাকা বিশাল কাঠের খুঁটির আড়াল থেকে একটা ছায়া ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এল। আলো-আঁধারির মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তিটাকে দেখে রিদওয়ানের নিঃশ্বাস আটকে গেল।
মেহজাবিন দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক আগের মতোই রূপসী, কিন্তু তার চেহারায় এখন এক রহস্যময় আবছায়া। গায়ে পরা একখানা গাঢ় লাল রঙের সুতি শাড়ি, যা তার প্রতিটা বাঁককে আঁকড়ে ধরে আছে। আঁচলটা একপাশে খসে পড়ে উন্মুক্ত করে রেখেছে তার অনাবৃত কাঁধ আর অনবদ্য গ্রীবা।
রিদওয়ান থমকে দাঁড়াল। তার চোখের সামনে পাঁচ বছরের প্রতীক্ষা, হাজারটা না-বলা প্রশ্ন আর অবরুদ্ধ তপ্ত আবেগ যেন আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ার জন্য তৈরি হলো।
"তুমি সত্যি এসছ, রিদওয়ান?" মেহজাবিনের কণ্ঠস্বর নীলকুঠির নীরবতা চিরে ঝরে পড়ল। সেই গলায় যেমন বিষাদ, তেমনই এক মাতাল করা আহ্বান।
রিদওয়ান এক পা দুই পা করে এগোতে লাগল। তার বুকের ভেতরের ধুকপুকানি তখন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সে যখন মেহজাবিনের একদম মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল, তখন দুজনের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস একে অপরের গালে গিয়ে আঁচড় কাটছে।
"কেন করলে এমন? কেন চলে গিয়েছিলে আমাকে এই নরকে ফেলে?" রিদওয়ানের গলা ধরে এল, তাতে রাগ আর গভীর অনুরাগের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ।
মেহজাবিন কোনো জবাব দিল না। সে শুধু তার জলভরা কাজলকালো চোখ দুটো তুলে রিদওয়ানের দিকে তাকাল। তার ফোলা ফোলা ঠোঁট দুটো সামান্য কেঁপে উঠল। মেহজাবিন তার নরম, তুলতুলে দুটি হাত আলতো করে তুলে দিল রিদওয়ানের চওড়া বুকে। শক্ত বুকের ওপর নিজের হাতের তালু রেখে সে অনুভব করতে চাইল রিদওয়ানের হৃদস্পন্দন।
"আমাকে ক্ষমা কোরো, রিদওয়ান..." মেহজাবিন ফুঁপিয়ে উঠল, "আমার যে আর কোনো উপায় ছিল না।"
সেই এক স্পর্শেই রিদওয়ানের সমস্ত রাগ, মান-অভিমান বাঁধ ভাঙা প্লাবনের মতো ভেসে গেল। চরাচর ভুলিয়ে দেওয়া এক তীব্র তৃষ্ণা চেপে ধরল তাকে। রিদওয়ান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। শক্ত দুটি বাহু দিয়ে মেহজাবিনের সরু কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে একদম নিজের বুকের সাথে পিষে পিষে লেপটে নিল।
"তোমাকে আমি আর কোথাও যেতে দেব না, মেহজাবিন। আর কখনো না," রিদওয়ানের গলার স্বর ভারী আর রুদ্ধশ্বাস শোনালো।
রিদওয়ানের উত্তপ্ত ঠোঁট এসে নেমে এল মেহজাবিনের কাঁপা কাঁপা গালের ওপর, তারপর আস্তে আস্তে নেমে গেল তার উন্মুক্ত নগ্ন গ্রীবায়। রিদওয়ানের তপ্ত নিঃশ্বাসের স্পর্শে মেহজাবিনের গা শিউরে উঠল, সে দু-হাতে রিদওয়ানের চুল শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। তার বুকের উঠানামা দ্রুত থেকে দ্রুততর হতে লাগল। নীলকুঠির আঁধার ঘনিয়ে আসছে, আর তার সাথে সাথে বাড়ছে দুটি তৃষ্ণার্ত আত্মার উত্তাপ।
রিদওয়ানের অধরের তৃষ্ণা যখন মেহজাবিনের ঠোঁটের ওপর এসে থামল, মেহজাবিন এক গভীর সুখে চোখ বুজল। সে নিজের সমস্ত শরীর সমর্পণ করে দিল রিদওয়ানের কাছে। রিদওয়ানের হাত মেহজাবিনের শাড়ির ভাঁজ ভেদ করে নেমে এল তার কোমরের নমনীয় বাঁকে। প্রতিটি স্পর্শে মিশে ছিল বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা তীব্র হাহাকার আর গভীর রোমান্স।
মেহজাবিন রিদওয়ানের কানে কানে ফিসফিস করে বলল, "রিদওয়ান... আমাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরো। আমি পাঁচ বছর ধরে এই আগুনের জন্য অপেক্ষা করে আছি।"
রিদওয়ান মেহজাবিনকে কোলে তুলে নিল। মেঝের এক কোণে রাখা পুরোনো একটা মখমলের তোষকের ওপর সে মেহজাবিনকে আলতো করে শুইয়ে দিল। আধো আলো আধো ছায়ায় দুজনের শরীর মিলেমিশে এক হয়ে যেতে লাগল। ভালোবাসার প্রতিটি আদিম আর গভীর আবেশে তারা যেন হারিয়ে যেতে লাগল গ্রামের সমস্ত বাস্তবতার বাইরে। মেহজাবিনের শরীরের প্রতিটা ইঞ্চি থেকে রিদওয়ান মুছে নিতে চাইল বিরহের প্রতিটি কালির দাগ।
কিন্তু, সেই চরম উন্মাদনা আর মাতাল করা মিলনের মধ্যেও মেহজাবিনের চোখে এক ফোঁটা জল চকচক করছিল। রিদওয়ান যখন পরম আবেগে তার কপালে চুমু খেয়ে তার চোখের দিকে তাকাল, তখন মেহজাবিনের চোখের সেই ভয়টা রিদওয়ানের নজরে এড়ালো না।
"মেহজাবিন, কী হয়েছে? তুমি কাঁন্দছ কেন?" রিদওয়ান মেহজাবিনের গাল ধরে শুধালো।
মেহজাবিন রিদওয়ানের হাতটা চেপে ধরে বুকের মধ্যে চেপে ধরল। ভারী নিঃশ্বাস ফেলে বলল, "রিদওয়ান, আমাদের ভালোবাসাটা আজ রাতের জন্যই। কাল সূর্য উঠলেই সব বদলে যাবে। তুমি যা ভাবছ, সত্যিটা ততটা সহজ নয়। আমি এতদিন তোমার খুব কাছেই ছিলাম... অথচ আমি তোমার হতে পারিনি।"
রিদওয়ানের মাথায় যেন বাজ পড়ল। সে মেহজাবিনের মুখোমুখি বসে এক অচেনা আতঙ্কে শিউরে উঠল। "কী বলছ তুমি? কাছেই ছিলে মানে? কোথায় ছিলে তুমি এতদিন?"
মেহজাবিন রুদ্ধশ্বাসে রিদওয়ানের দিকে তাকাল। তার ঠোঁট দুটো কাঁপছে। বাইরে ততক্ষণে ঘোর অন্ধকার নেমে এসেছে, আর রাতের বাতাস হিজল গাছের পাতায় একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ তুলে বইতে শুরু করেছে।
হিজল বাগানের পুরোনো নীলকুঠিতে রাতের অন্ধকার তখন আরও ঘনীভূত হয়েছে। বাইরের ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক আর বাতাসে ছাতিম ফুলের তীব্র গন্ধ ঘরটাকে এক পরাবাস্তব আবহ দান করেছে। মেহজাবিনের ভেজা শরীরটা তখনও রিদওয়ানের বাহুডোরে শায়িত, কিন্তু তার চোখ দুটোতে এক গভীর আতঙ্ক আর অপরাধবোধের ছায়া।
রিদওয়ানের মাথায় মেহজাবিনের শেষ কথাগুলো বারবার হাতুড়ির মতো আঘাত করছিল—‘আমি এতদিন তোমার খুব কাছেই ছিলাম... অথচ আমি তোমার হতে পারিনি।’
রিদওয়ান মেহজাবিনের চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে তার চোখের দিকে তাকাল। তার চোখের তারায় ভালোবাসার পাশাপাশি এখন জমে উঠেছে অজস্র প্রশ্ন। "মেহজাবিন, আমাকে খোলামেলা বলো। পাঁচ বছর আগে তুমি হঠাৎ উধাও হয়ে গেলে কেন? আর কাছে বলতে তুমি কোথায় ছিলে? কার কাছে ছিলে?"
মেহজাবিন এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার বুকে যেন এক বিশাল পাথর চেপে বসে আছে। সে রিদওয়ানের বুকের ওপরে নিজের তপ্ত গালটা রেখে মৃদু স্বরে বলতে শুরু করল, "রিদওয়ান, তুমি তো জানতে আমাদের ভালোবাসার কথা আমার পরিবার কখনোই মেনে নিত না। আমার আব্বা ছিলেন গ্রামের সবচেয়ে প্রভাবশালী মাতব্বর, আর তুমি ছিলে এক সাধারণ জোতদারের ছেলে। কিন্তু তুমি যা জানতে না, তা হলো—আমার আব্বা বহু আগে থেকেই দেনায় ডুবে ছিলেন।"
"দেনা?" রিদওয়ান চমকে উঠল।
"হ্যাঁ," মেহজাবিন ফিসফিস করে বলল, "পাশের গ্রামের বড় তালুকদার ইসমাইল চৌধুরীর কাছে আব্বার অনেক টাকা দেনা ছিল। দেনা শুধতে না পেরে আব্বা সিদ্ধান্ত নেন আমাকে ইসমাইল চৌধুরীর হাতে তুলে দেবেন। কিন্তু আমি তো কেবল তোমাকেই আমার মন-প্রাণ সঁপে দিয়েছিলাম। আমি যখন তোমাকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলাম, ঠিক তখনই আব্বা সব জেনে যান।"
রিদওয়ানের হাত দুটো অজান্তেই শক্ত হয়ে এল। সে মেহজাবিনের উন্মুক্ত পিঠে হাত বুলিয়ে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। "তারপর? আব্বা তোমাকে আটকে রেখেছিল?"
"আটকে রাখা?" মেহজাবিন একটা তেতো হাসি হাসল। "না রিদওয়ান, বিষয়টা তার চেয়েও ভয়াবহ ছিল। আব্বা আমাকে হুমকি দেন, আমি যদি গোপনে তোমাকেই বেছে নিই, তবে তারা তোমার পুরো পরিবারকে জ্বালিয়ে শেষ করে দেবে। তোমার প্রাণ রক্ষার্থেই আমাকে সেই রাতে বাড়ি ছাড়তে হয়েছিল। কিন্তু আমি কোথাও দূর দেশে পালিয়ে যাইনি।"
রিদওয়ানের বুকের স্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য যেন থেমে গেল। সে রুদ্ধশ্বাসে শুধাল, "তবে কোথায় গিয়েছিলে তুমি?"
মেহজাবিন রিদওয়ানের চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিল। তার গালে এক ফোটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল রিদওয়ানের নগ্ন বুকে। "আমাদের কালিয়াগ্রামের ঠিক ওপারে, নদী পার হয়ে যে চরাঞ্চল... ওখানকার এক নিঃসঙ্গ হাভেলিতে আমাকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। ইসমাইল চৌধুরী আমাকে বিয়ে করে তার দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে ওই হাভেলিতে রেখে দিয়েছিল। কিন্তু সে সমাজকে জানাতে চায়নি আমার আসল পরিচয়। আমি প্রতিদিন, প্রতি রাতে ওই নদীর এপারে তোমার বাড়ির দিকে তাকিয়ে কাঁদতাম। বর্ষাকালে যখন নদীর জল বাড়ত, আমার মনে হতো সাঁতরে তোমার কাছে চলে আসি।"
এই কঠিন সত্যটা রিদওয়ানের মাথায় বজ্রপাতের মতো আঘাত করল। যে মেহজাবিনকে সে ভেবেছিল হয়তো কোনো দূর শহরে চলে গেছে, সে আসলে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে নদীর ওপারেই এতগুলো বছর এক নরকযন্ত্রণা সহ্য করছিল!
তীব্র রাগ আর ভালোবাসার আগুনে রিদওয়ানের শরীর রি-রি করে উঠল। সে মেহজাবিনকে জড়িয়ে ধরে তার গলায় আর ঠোঁটে ব্যাকুলভাবে চুমু খেতে লাগল। প্রতিটি চুমুতে ছিল গভীর দুঃখ আর মাতাল করা অনুরাগের স্পর্শ।
"ইসমাইল চৌধুরী!" রিদওয়ান দাঁতে দাঁত চেপে বলল, "ওই লোকটা তোমার সাথে...?"
মেহজাবিন রিদওয়ানের মুখটা নিজের দু-হাতে চেপে ধরে তার চোখে চোখ রাখল। "রিদওয়ান, লোকটা পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল এক বছরের মাথায়। সে আমাকে তার রূপের বন্দি করে রেখেছিল ঠিকই, কিন্তু আমার শরীর আর মন—সবসময় কেবল তোমারই ছিল। আজ সে বেঁচে নেই। তিন দিন আগে ইসমাইল চৌধুরী মারা গেছে।"
কথাটা শুনে রিদওয়ানের বুকের ভেতরটা হঠাৎ হালকা হয়ে গেল, কিন্তু একই সাথে এক অচেনা শঙ্কা চেপে বসল। "যদি সে মারা গিয়ে থাকে, তবে এখন তো তুমি মুক্ত, মেহজাবিন! এখন আর আমাদের মাঝে কোনো বাধা নেই। আমরা কালই গ্রাম ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাব!"
মেহজাবিন মাথা নাড়ল। তার চোখে গভীর হতাশা। "না রিদওয়ান, বিষয়টা অত সহজ নয়। ইসমাইল চৌধুরী মারা যাওয়ার পর তার বিপুল সম্পত্তি আর হাভেলির একমাত্র ওয়ারিশ হিসেবে আমাকেই দেখানো হয়েছে। কিন্তু আসল সত্যটা অন্য জায়গায়..."
মেহজাবিন এক মুহূর্ত থামল। সে রিদওয়ানের শার্টের বোতামগুলো আলতো করে খুলতে খুলতে তার খোলা বুকে নিজের আঙুল বোলাতে লাগল। তার আঙুলের নরম স্পর্শে রিদওয়ানের সমস্ত শরীরে আবার এক গোপন কামনার রোমাঞ্চ খেলে গেল। মেহজাবিনের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছিল।
"কী সত্য, মেহজাবিন?" রিদওয়ান তার কোমরে হাত রেখে শাড়ির আঁচলটা সরিয়ে তার অনাবৃত মেদহীন পেটে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। মেহজাবিন এক তীব্র সুখে কেঁপে উঠল, তার দু-হাত রিদওয়ানের চওড়া পিঠ আঁকড়ে ধরল।
"ইসমাইল চৌধুরীর এক গোপন উইল আছে," মেহজাবিন রুদ্ধশ্বাসে ফিসফিস করে বলল, রিদওয়ানের অধরের উষ্ণতায় সে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছিল, "যে উইলে লেখা আছে... যদি আমি আবার বিয়ে করি বা কালিয়াগ্রামের কারও সাথে সম্পর্ক রাখি, তবে সমস্ত সম্পত্তি চলে যাবে তার হিংস্র ছোট ভাই জব্বার চৌধুরীর হাতে। আর জব্বার লোকটা দানব! সে ইতিমধ্যে সন্দেহ করছে আমি কাউকে ভালোবাসি। সে লোক পাঠিয়েছে আমার ওপর নজর রাখতে।"
রিদওয়ান মেহজাবিনের চোখের দিকে তাকাল। তার ভালোবাসার মানুষটি আজ এক বিশাল বিপজ্জনক জালে আটকা পড়েছে।
"আমার সম্পত্তির কোনো দরকার নেই, মেহজাবিন!" রিদওয়ান মেহজাবিনের উরু চেপে ধরে তাকে নিজের ওপর তুলে নিল। তাদের দুজনের শরীর আবার এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে বাঁধা পড়ল। "আমার শুধু তোমাকে চাই। আমরা সব ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাব।"
মেহজাবিন রিদওয়ানের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। এক গভীর, তীব্র স্পর্শে সে স্তব্ধ করে দিল রিদওয়ানের সমস্ত তর্ক। ঘরে কেবল দুটি তৃষ্ণার্ত মানুষের ঘন ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ আর দেওয়াল ঘেঁষে লেগে থাকা গোপন ভালোবাসার শিহরণ।
কিন্তু ঠিক তখনই, নীলকুঠির বাইর থেকে শুকনো পাতায় ভারী বুটের মচমচ শব্দ ভেসে এল।
মেহজাবিন এক ঝটকায় থমকে গেল। তার চোখে চরম আতঙ্ক। "রিদওয়ান! জব্বারের লোকেরা চলে এসেছে..."
বাইরে শুকনো পাতার ওপর ভারী বুটের খসখস শব্দটা আরও স্পষ্ট হতেই নীলকুঠির ঘরের ভেতরের উষ্ণ বাতাস যেন এক নিমিষে হিম হয়ে গেল। একটু আগেই যেখানে দুই তৃষ্ণার্ত শরীরের মিলন আর মাতাল করা উত্তাপ ছেয়ে ছিল, সেখানে এখন চেপে বসেছে এক পরম থমথমে আতঙ্ক।
মেহজাবিন দ্রুত নিজের শাড়ি সামলে নিয়ে বুক চেপে ধরল। তার চোখের কোণে ফোঁটা ফোঁটা জল তখনও লেগে আছে, কিন্তু গাল দুটো ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। রিদওয়ান এক ঝটকায় তোষক থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের শার্টের বোতামগুলো লাগাতে লাগাতে ফিসফিস করে উঠল, "মেহজাবিন, শান্ত হও। আমি দেখছি—"
"না, রিদওয়ান! ভুলও বাইরে যেও না!" মেহজাবিন রিদওয়ানের এক হাত ধরে আঁকড়ে ধরল, তার আঙুলগুলো ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছিল। "জব্বার চৌধুরীর লাঠিয়ালরা বড় নিষ্ঠুর। ওরা যদি জানে তুমি আমার সাথে এই আঁধার ঘরে ছিলে, তবে তারা আজ রাতেই তোমাকে শেষ করে দেবে। তোমার গায়ে একটা আঁচড় লাগলে আমি মরে যাব, রিদওয়ান!"
রিদওয়ান মেহজাবিনকে টেনে নিজের বুকের গভীর ছায়ায় লুকিয়ে ফেলল। মেহজাবিনের ভেজা উন্মুক্ত পিঠে হাত বুলিয়ে তার ঘাড়ে এক পরম আবেশে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল, "ভয় পেয়ো না সোনা, তোমাকে রক্ষা করার জন্য আমার রক্তে এখনও ঝড় বইছে। কিন্তু ওরা জানল কীভাবে?"
মেহজাবিন রিদওয়ানের গলায় মুখ গুঁজে দিয়ে ফুঁপিয়ে উঠল, "জব্বারের লোক রশিদ সকাল থেকেই কালিয়াগ্রামে ঘুরঘুর করছিল। আমাকে চিঠি পাঠাতে দেখেই বোধহয় নজর রেখেছিল। ইসমাইল চৌধুরীর সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার জন্য জব্বার যেকোনো হীন কাজ করতে পারে। সে শুধু প্রমাণ চায় যে আমি অন্য কারও সাথে সম্পৃক্ত।"
কুঠির বাইরে থেকে ঠিক তখনই খাঁখাঁ ভেসে এল একটা কর্কশ গলা, "ভেতরে কে রে? দরজার শিকল খোলা কেন? এই রশিদ, হারিকেনটা ভালো করে তোল তো! ঘরের ভেতরে কেউ আছে মনে হয়।"
শব্দটা একদম দরজার কাছে। আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লাল আলোয় পুরো পরিত্যক্ত ঘর ভেসে যাবে।
রিদওয়ান আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। কুঠির পেছনের ভাঙা জানলার কাঠের শিকের ফাঁক দিয়ে একটা পুরোনো ঢালু ছাদের পথ ছিল। সে মেহজাবিনের কোমর জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল, "আমার সাথে এসো, চুপচাপ।"
মেহজাবিনকে নিজের সাথে লেপটে ধরে রিদওয়ান খুব সাবধানে পেছনের অন্ধকারের দিকে গড়িয়ে গেল। ঘন অন্ধকার আর হিজল গাছের ডালপালার আড়ালে তারা কোনোমতে আত্মগোপন করল।
বাইরে রশিদের ভারী গলার আওয়াজ পাওয়া গেল, "কই, কেউ তো নাই সরদার! খালি ভাঙা তোষকটা পইড়া আছে। কিন্তু... ঘরে বেলি ফুলের সুবাস ছড়ানো কেন?"
"হুম, ওই হারামজাদী মেহজাবিনই এইদিকে আসছিল নিশ্চিত," জব্বারের অনুচর উত্তর দিল। "চল, ওরে হাভেলির দিকেই খুঁজি। যদি কোনো পুরুষের সাথে ওরে পাই, চৌধুরী সাহেব হুকুম দিছে ওরে হাত-পা বাইন্ধা পদ্মায় ভাসায় দিতে।"
ওদের পায়ের শব্দ যখন ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল, তখন মেহজাবিন রিদওয়ানের বুকের ওপর ভেঙে পড়ল। আতঙ্কে তার পুরো শরীর রেশমি কাপড়ের মতো কাপছিল। রিদওয়ান অন্ধকারেই মেহজাবিনের গালে নিজের মুখ ঘষে তার ভয় দূর করার চেষ্টা করল। তার গরম নিঃশ্বাস মেহজাবিনের গলায় পড়তে মেহজাবিন আবেগে রিদওয়ানের শার্ট আঁকড়ে ধরল।
"রিদওয়ান... আমাকে বাঁচাও। এই অন্ধকার, এই ভয় আর এই একাকীত্ব থেকে আমাকে মুক্তি দাও," মেহজাবিনের গলা বুজে এল।
রিদওয়ান মেহজাবিনের ভেজা ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। ভয়ের তীব্রতার মাঝে সেই চুম্বন যেন আরও বেশি উদগ্র, আরও গভীর হয়ে উঠল। বাঁচার আকুতি আর ভালোবাসার নেশা দুটো মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল নীলকুঠির পেছনের ঘন গাছগাছালির আড়ালে। রিদওয়ানের হাত মেহজাবিনের উরু বেয়ে ওপরে উঠে এসে তার সম্পূর্ণ শরীরকে এক চরম আকুলতায় নিজের ভেতরে টেনে নিল।
কিছুক্ষণ পর যখন দুজনের শ্বাসপ্রশ্বাস কিছুটা স্বাভাবিক হলো, রিদওয়ান মেহজাবিনের হাত দুটো চেপে ধরে শক্ত গলায় বলল, "শোনো মেহজাবিন, এইভাবে লুকিয়ে থেকে সমাধান হবে না। কাল বিকেলে আমি নদীর ওপারের হাভেলিতে আসব।"
"না! তুমি ওই মৃত্যুপুরীতে এসো না!" মেহজাবিন আঁতকে উঠল।
"আমাকে আসতেই হবে," রিদওয়ানের চোখে তখন জিদ্। "ইসমাইল চৌধুরীর সেই গোপন উইলটা আমাকে দেখতেই হবে। যে উইলের জন্য তোমার জীবনে এই নরকযন্ত্রণা, সেই উইলের কোনো ফাঁক গলিয়ে আমাদের বের হতে হবে। সত্যিটা কী, আমাকে জানতেই হবে।"
মেহজাবিন স্তব্ধ হয়ে রিদওয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। সে জানত রিদওয়ানকে আটকানো অসম্ভব।
রাতের শেষ প্রহরে মেহজাবিন গোপনে কুঠি ছেড়ে বেরিয়ে গেল হাভেলির উদ্দেশ্যে। আর রিদওয়ান একা দাঁড়িয়ে রইল পদ্মার তীরের কুয়াশায়। তার হৃদয়ে ভালোবাসা আর মাথায় প্রতিশোধের আগুন।
পরদিন গোধূলি লগ্নে, রিদওয়ান এক ছদ্মবেশে নদীর ওপারে চৌধুরী হাভেলিতে পা দিল। হাভেলিটা যেন এক বিশাল অন্ধকার দুর্গ। রিদওয়ান পেছনের বাগান দিয়ে অতি সাবধানে মেহজাবিনের ঘরে গিয়ে পৌঁছাল।
মেহজাবিন ঘরের দরজা বন্ধ করে রিদওয়ানকে দেখে চমকে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই এক তীব্র আবেগে রিদওয়ানের বুকে আছড়ে পড়ল। তারা দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরল যেন শেষবার দেখছে।
"উইলটা কোথায় মেহজাবিন?" রিদওয়ান মেহজাবিনের ভেজা চুলে চুমু খেয়ে জিজ্ঞেস করল।
মেহজাবিন থরথর করে কাঁপা হাতে মেঝের একটা পুরোনো সিন্দুক খুলে একখানা পুরোনো দলিল বের করল। রিদওয়ান তা হাতে নিয়ে দ্রুত পড়তে শুরু করল।
পড়তে পড়তে রিদওয়ানের চোখের মনি স্থির হয়ে গেল। তার কপালে ভাঁজ পড়ল, গালের রগগুলো ফুলে উঠল।
"এ কী লেখা আছে এতে, মেহজাবিন?" রিদওয়ান অবাক হয়ে তাকাল।
মেহজাবিন কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল, "তুমি যা দেখছ, সেটাই সত্যি রিদওয়ান..."
উইলে স্পষ্ট লেখা—ইসমাইল চৌধুরী কোনো সন্তান রেখে যাননি, কিন্তু তার সমস্ত সম্পত্তির স্বত্বাধিকারী হবেন মেহজাবিনের গর্ভজাত প্রথম সন্তান, আর যদি মেহজাবিনের কোনো সন্তান না থাকে তবে সম্পত্তি পাবে জব্বার চৌধুরী। কিন্তু এর চেয়েও ভয়ঙ্কর শর্ত ছিল দলিলের শেষ পাতায়...
রিদওয়ান দলিলটা পড়তেই তার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল।
দলিলের শেষ পাতার কালি যেন রিদওয়ানের চোখের সামনে বিষাক্ত সাপের মতো নাচতে শুরু করল। পুরোনো স্ট্যাম্প পেপারে ইসমাইল চৌধুরীর রক্তলাল সিলমোহরের নিচে আঁকাবাঁকা অক্ষরে স্পষ্ট লেখা—‘মেহজাবিন বেগম যদি দ্বিতীয় কোনো পুরুষের সান্নিধ্যে যান, তবে তাকে সম্পূর্ণ সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হবে। কিন্তু যদি আমার মৃত্যুর পূর্বেই তিনি অন্তর্বাসিনী হয়ে থাকেন, তবে সেই সন্তানের উত্তরাধিকার সুনিশ্চিত করতে মেহজাবিনকে চৌধুরী হাভেলির ভেতরেই অবস্থান করতে হবে—এবং তার সেই সন্তানের পিতৃপরিচয় হিসেবে কেবল ইসমাইল চৌধুরীর নামই স্বীকৃত হবে।’
কিন্তু তার চেয়েও নৃশংস শর্তটি ছিল ঠিক তার পরেই লেখা—‘যদি মেহজাবিনের সন্তান অন্য কোনো পুরুষের ঔরসজাত হয় এবং তা প্রমাণিত হয়, তবে চৌধুরী বংশের অপমান রুখতে মেহজাবিন এবং সেই পুরুষ—উভয়কেই কালিয়াগ্রামের পঞ্চায়েতের সামনে জীবিত কবর দেওয়া হবে।’
রিদওয়ানের হাতের তালু ঘেমে পিচ্ছিল হয়ে গেল। তার বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় দুমড়ে-মুচড়ে উঠল। সে মুখ তুলে মেহজাবিনের দিকে তাকাল। মেহজাবিনের মুখটা সম্পূর্ণ ধোয়াসার মতো সাদা হয়ে গেছে, সে দরজার কাঠ ধরে কোনোমতে নিজের শরীরের ভার সামলে দাঁড়িয়ে আছে।
"মেহজাবিন..." রিদওয়ানের গলা দিয়ে যেন কোনো শব্দ বেরোতে চাইছিল না। সে হেঁটে এসে মেহজাবিনের মুখোমুখি দাঁড়াল। "ইসমাইল চৌধুরী মারা গেছে তিন দিন আগে। আর সে তো বিগত চার বছর ধরে পঙ্গু অবস্থায় বিছানায় বন্দি ছিল... তবে এই উইলের এমন বিশ্রী শর্তের মানে কী? জব্বার চৌধুরী কি এই শর্ত ব্যবহার করেই তোমাকে চিরকালের জন্য কোনো ফাঁদে ফেলতে চায়?"
মেহজাবিন কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু ব্যাকুল চোখে রিদওয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ সে রিদওয়ানের বুকে দুই হাত রেখে নিজেকে সঁপে দিল। তার ফোলা ফোলা ঠোঁট দুটো রিদওয়ানের গলায়, চিবুকে ব্যাকুলভাবে আঁচড় কাটতে লাগল। তার এই ভালোবাসায় যেন কোনো সান্ত্বনা ছিল না, ছিল এক চরম আকুলতা আর মৃত্যুর ভয়।
"রিদওয়ান..." মেহজাবিন রুদ্ধশ্বাসে ফিসফিস করে উঠল, তার গরম নিঃশ্বাস রিদওয়ানের বুকে আছড়ে পড়ছিল, "আমাকে আর কোনো প্রশ্ন কোরো না। তুমি আমাকে এখন নাও... আজ রাতের মতো আমাকে তোমার বুকের ভেতর এমনভাবে পিষে ফেলো, যেন পৃথিবীর কোনো শক্তিয় আমাদের আলাদা করতে না পারে।"
রিদওয়ান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। মেহজাবিনের কটিদেশ ধরে এক নিমেষে তাকে উঁচু করে তুলে নিল। হাভেলির বিশাল খাটের ভারী রেশমি তোষকের ওপর মেহজাবিনকে শুইয়ে দিয়ে সে তার ওপর ঝুকে পড়ল। কামনার তপ্ত বাতাস ঘরের ভেতর আছড়ে পড়ল। মেহজাবিন নিজের দুই হাত দিয়ে রিদওয়ানের চওড়া পিঠ আঁকড়ে ধরল, তার প্রতিটা স্পর্শে ছিল তৃষ্ণা আর হাহাকার।
রিদওয়ানের উন্মুক্ত ঠোঁট মেহজাবিনের উন্মুক্ত বক্ষদেশ আর মেদহীন পেটে উষ্ণতার ঝড় তুলল। মেহজাবিন এক গভীর আবেশে চোখ বুজে রিদওয়ানের চুলে হাত চালিয়ে দিল। বিরহ আর মৃত্যুর শঙ্কা তাদের রোমান্সকে যেন আরও বেশি আদিম আর তীব্র করে তুলল। ঘরের প্রদীপের আলো-ছায়ায় দুটি তৃষ্ণার্ত শরীর মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতে লাগল।
কিন্তু, পরম মিলনের সেই মাতাল মুহূর্তে, রিদওয়ানের আঙুল যখন মেহজাবিনের তলপেটের কোমল ত্বকে আলতো করে চেপে বসল, রিদওয়ান থমকে গেল।
সে এক অদ্ভুত অনুভূতি পেল। মেহজাবিনের শরীর, তার পেটের সামান্য ফোলা অংশ আর উষ্ণতা...
রিদওয়ান এক ঝটকায় মেহজাবিনের থেকে সামান্য আলাদা হয়ে বসল। তার চোখ দুটো আশ্চর্যে আর ভয়ে ছানাবড়া হয়ে গেল।
"মেহজাবিন!" রিদওয়ানের কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল। "তুমি... তোমার শরীরে...?"
মেহজাবিন দুই হাতে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়ল। তার কান্নার শব্দে বিশাল হাভেলির নীরবতা চুরমার হয়ে গেল।
"হ্যাঁ রিদওয়ান..." মেহজাবিন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে লাগল, "আমি গর্ভবতী। বিগত তিন মাস ধরে আমি তোমার সন্তানকে আমার গর্ভে ধারণ করে আছি!"
রিদওয়ানের মাথায় যেন একশোটা বাজ একসাথে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তিন মাস আগে—যখন ইসমাইল চৌধুরী পঙ্গু হয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিল, তখন মেহজাবিন গোপনে একদিন কালিয়াগ্রামের ঘাটে এসে রিদওয়ানের সাথে দেখা করেছিল। সেই এক রাতের গোপন মিলনের ফসল আজ মেহজাবিনের গর্ভে বেড়ে উঠছে!
"তুমি আমার সন্তানকে গর্ভে নিয়ে এই মরণকূপে একা আছ?" রিদওয়ান মেহজাবিনের হাত দুটো চেপে ধরে গর্জে উঠল।
"আমি বাধ্য ছিলাম রিদওয়ান!" মেহজাবিন রিদওয়ানের বুকে মাথা কুটে কাঁদতে কাঁদতে বলল, "জব্বার চৌধুরী ইতিমধ্যেই সন্দেহ করেছে। সে কালিয়াগ্রাম থেকে এক দাই-মাকে এনেছে আমাকে পরীক্ষা করানোর জন্য। কাল সকালে যদি দাই-মা নিশ্চিত করে যে আমি তিন মাসের গর্ভবতী, তবে জব্বার প্রমাণ করে দেবে এই সন্তান পঙ্গু ইসমাইল চৌধুরীর নয়! আর উইলের শর্ত অনুযায়ী, কাল বিকেলেই ওরা আমাদের দুজনকে খুঁজে বের করে সেই ভয়ঙ্কর শাস্তি দেবে!"
রিদওয়ানের গায়ের রগগুলো টান টান হয়ে উঠল। তার ভালোবাসার মানুষটি আর তার নিজের রক্তের সন্তান—দুজনই এখন এক ভয়াবহ মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে।
ঠিক তখনই, হাভেলির নিচে বিশাল কাঠের দরজায় প্রচণ্ড শব্দে ধাক্কা পড়ার আওয়াজ এল।
"বৌঠান! দরজা খোলো!" বাইরে থেকে জব্বার চৌধুরীর পৈশাচিক চিৎকার ভেসে এল। "আমি জানি ভেতরে কেউ আছে! আজ রাতে তোরে আর তোর গোপন পুরুষরে হাতেনাতে ধরুম!"
মেহজাবিন ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। রিদওয়ান মেহজাবিনকে নিজের পেছনে আড়াল করে শক্ত মুখে দরজার দিকে তাকাল। তার চোখে এখন কেবলই নিজের পরিবার আর সন্তানকে বাঁচানোর এক ভয়ংকর হিংস্র রূপ।
হাভেলির বিশাল কাঠের দরজায় জব্বার চৌধুরীর বিশ্রী চিৎকার আর লাঠির ধুপধাপ আঘাত বাইরে জমে থাকা রাতটাকে যেন আরও বেশি খুনে করে তুলল।
"বৌঠান! দরজা খোলো! মিছামিছি পিয়ার প্রীতি আর লুকোচুরি খেলা বন্ধ করো! ভেতরে কোন নাগ ঢুকছে আমি সব জানি!" বাইরে জব্বারের কর্কশ গলার পাশেই আরও গোটা সাতেক লাঠিয়ালের হাসির শব্দ ভেসে এল।
ঘরের ভেতরে মেহজাবিনের শরীর ভয়ে কাঁচের মতো থরথর করে কাঁপছিল। সে রিদওয়ানের বুকে হাত রেখে অস্ফুটে বলে উঠল, "রিদওয়ান... ওরা জেনে ফেলেছে। তুমি পেছনের জানলা দিয়ে নেমে পদ্মার জলে ঝাঁপ দাও। তুমি বাঁচলে অন্তত আমাদের ভালোবাসার একটা চিহ্ন পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে। আমাকে ওরা মেরে ফেলুক, তাও ভালো!"
রিদওয়ানের চোখ দুটো তখন আঙ্গার হয়ে জ্বলছে। পরম অনুরাগে সে মেহজাবিনের কপালে রক্ত গরম করা একটা গভীর চুমু আঁকল। তারপর তার কোমরের ভাজঁ ঘেঁষে হাত নামিয়ে টেনে আনল মেহজাবিনের সুতি শাড়ির আঁচলটা, আলতো করে মুছে দিল তার চোখের জল।
"চুপ করো মেহজাবিন!" রিদওয়ানের গলার স্বর নিচু কিন্তু ইস্পাতের মতো শক্ত। "আমার রক্ত তোমার পেটে বাড়ছে, আর আমি নিজের বউ-বাচ্চাকে পশুর মুখে ফেলে রেখে কাপুরুষের মতো পালিয়ে যাব? এই কালিয়াগ্রামের রিদওয়ান মরে গেলেও তা করবে না। আজ রাতে হয় আমরা একসাথে বাঁচব, না হয় এই হাভেলি আমাদের ভালোবাসার সমাধি হবে।"
মেহজাবিনের চোখে এক অদ্ভুত আবেশ খেলে গেল। সে বুঝতে পারল, এই পুরুষের ভালোবাসায় কোনো ফাঁকি নেই—এখানে আছে জীবন বাজি রাখার মাতাল উন্মাদনা। সে রিদওয়ানের চওড়া বুক শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শেষবারের মতো তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট পিষে দিল। এক তীব্র, উদগ্র আর অন্তিম আকুলতায় দুজন দুজনের উগ্র উষ্ণতা টেনে নিল নিজের ভেতর।
পড়ন্ত ঘরের এক কোণে রাখা ছিল ইসমাইল চৌধুরীর শিকারি ভারী কাঠের লাঠি আর পিতলের একখান প্রদীপদান। রিদওয়ান প্রদীপদানটা হাতে তুলে নিল।
ঠিক তখনই মড়মড় শব্দে ঘরের পচা কাঠের দরজার খিল ভেঙে একপাশে হেলে পড়ল। ভেতরে ঢুকে এল জব্বার চৌধুরী, সাথে তার তিনজন বলবান লাঠিয়াল। হাতে তেলের মশাল আর ধারালো রামদা।
"বাহ্! বাহ্! বলি এ তো কালিয়াগ্রামের সেই জোতদারের বেটা!" জব্বার এক পৈশাচিক হাসি হেসে রামদাটা শূন্যে ঘোরাল। "বৌঠান তো বেশ তলে তলে জল খাইতাছে! মরার ইসমাইলের পঙ্গু শরীরের সুযোগ নিয়া এই ছোকরারে ঘরে তুলছো? আজ পঞ্চায়েত ডাকা লাগব না, তোদের দুইটারে এই ঘরেই হাত-পা কাইটা পদ্মার বিলে ভাসায় দিমু!"
জব্বারের ইশারায় দুজন লাঠিয়াল রিদওয়ানের দিকে তেড়ে এল। কিন্তু প্রেমের উত্তাপে অন্ধ হয়ে থাকা রিদওয়ান তখন এক অন্য মানুষ। সে এক লাফে সামনে গিয়ে প্রথম লাঠিয়ালের মুখে ভারী প্রদীপদান দিয়ে সজোরে আঘাত করল। রক্ত ছিটকে পড়ল দেওয়ালে, লোকটা গ্যাঁক করে আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়ল মেঝের ওপর।
দ্বিতীয় লাঠিয়াল রামদা উঁচিয়ে আসতেই মেহজাবিন পেছন থেকে একটা ভারী কাঁচের ফুলদানি দিয়ে তার মাথায় মারল। লোকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়তেই রিদওয়ান তার হাতের রামদাটা এক ঝটকায় কেড়ে নিয়ে সজোরে তার পায়ে কোপ বসাল।
ঘরের ভেতর রক্ত আর আতঙ্কের তাণ্ডব শুরু হয়ে গেল। জব্বার চৌধুরী তা দেখে ভয়ে দুই ধাপ পিছিয়ে গেল। "তুই... তুই আমার লোক মারলি? তোরে আমি—"
রিদওয়ান রক্তমাখা রামদা হাতে এক পা এক পা করে জব্বারের দিকে এগোতে লাগল। তার চোখে হিংস্র রূপ। "জব্বার! তুই ভেবেছিলি তোর ভয়ে মেহজাবিন তোকে হাভেলি ছেড়ে দেবে? যে ভালোবাসাকে পাঁচ বছর বন্দি করে রাখা হয়েছে, সেই আগুন নেভানোর ক্ষমতা তোর এই পচা চামড়ার নেই!"
জব্বার প্রাণভয়ে চিৎকার করে পেছনের বারান্দার দিকে দৌড় দিল। রিদওয়ান আর মেহজাবিন এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে হাভেলির ভেতরের গোপন সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল।
বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। পদ্মার তীরের চরাঞ্চলে মেঘের গর্জন। বৃষ্টিতে ভিজে মেহজাবিনের লাল শাড়ি তার গায়ের সাথে লেপটে গেছে, ভিজে একাকার তার রূপ আর উদাম শরীর। রিদওয়ান মেহজাবিনের হাত শক্ত করে ধরে ছাতিমের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ছুটতে লাগল।
পিছনে জব্বারের আরও কয়েকজন লাঠিয়ালের মশালের আলো আর চিল চিৎকার শোনা যাচ্ছে।
ছুটতে ছুটতে তারা একদম পদ্মার ভাঙন নদীর পাড়ে গিয়ে পৌঁছাল। নিচে উত্তাল পদ্মার খরস্রোতা জল ফুঁসে উঠছে। সামনে আর যাওয়ার পথ নেই, পেছনে মৃত্যুর থাবা।
মেহজাবিন রুদ্ধশ্বাসে রিদওয়ানের বুকের সাথে লেপটে গিয়ে বলল, "রিদওয়ান... সামনে তো মরণ নদী!"
রিদওয়ান মেহজাবিনের ভেজা মুখটা দু-হাতে তুলে ধরে তার ঠোঁটে এক পরম আবেশে চুমু খেল। বৃষ্টির জলের সাথে মিশে গেল তাদের ঠোঁটের তপ্ত প্রেম।
"মেহজাবিন, এই জল আমাদের মারবে না, এই জল আমাদের কালিয়াগ্রামের বাইরে নতুন জীবনে নিয়ে যাবে। আমাকে বিশ্বাস করো!"
পেছন থেকে জব্বারের গলা ভেসে এল, "ঐ তোরা ধরা পইড়া গেছিস! আর পলাইবি কই?"
রিদওয়ান এক মুহূর্তও ভাবল না। সে মেহজাবিনকে নিজের বাহুডোরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, তার গর্ভের সন্তানকে নিজের বুকের আড়ালে রেখে উত্তাল পদ্মার কালো জলে ঝাঁপ দিল।
জল ছিটে উঠল চারদিকে। অন্ধকারের বুক চিরে দুজন প্রেমিকের শরীর বিলীন হয়ে গেল পদ্মার অতল তলদেশে...
উত্তাল পদ্মার প্রবল স্রোত আর কালবৈশাখীর মাতাল অন্ধকার যেন দুই তৃষ্ণার্ত প্রাণকে গিলে খেতে চেয়েছিল। নদীর হিংস্র ঢেউ তাদের বারবার তলিয়ে দিতে চেয়েছে, কিন্তু রিদওয়ানের এক হাত মেহজাবিনের কোমরকে অক্টোপাসের মতো পেঁচিয়ে ধরেছিল, আর অন্য হাত লড়ছিল জীবনের তাগিদে। মেহজাবিন পরম বিশ্বাসে রিদওয়ানের বুকে মুখ গুঁজে রেখেছিল—কারণ সে জানত, এই চওড়া বুকের ভেতর কেবল তার আর তাদের অনাগত সন্তানের জন্যই স্পন্দন চলে।
স্রোতের টানে ভাসতে ভাসতে, ভোর রাতের দিকে যখন ঝড়ের তাণ্ডব শান্ত হলো, নদী তাদের উগরে দিল কালিয়াগ্রাম থেকে অনেক দূরে—এক নাম না জানা নিঝুম চর এলাকার বালুচরে।
গোধূলির লাল আলো যখন ভোরের স্নিগ্ধ সোনালি রোদ হয়ে ফুটল, রিদওয়ানের চেতনা ধীরে ধীরে ফিরে এল। তার সারা শরীরে কাঁপন, নোনা জলের ক্লান্তি। কিন্তু চোখ খুলেই সে পাশে তাকাল।
মেহজাবিন পড়ে আছে ভেজা বালুর ওপর। তার পরনের রক্তলাল শাড়ি ছিঁড়েখুঁড়ে একাকার, ভিজে শরীরে লেপটে থাকা রূপ যেন এক অনবদ্য ভাস্কর্য। রিদওয়ান হাঁটু গেড়ে বসে মেহজাবিনকে জড়িয়ে ধরল।
"মেহজাবিন! মেহজাবিন, চোখ খোলো!" রিদওয়ানের গলায় এক আকুল হাহাকার।
মেহজাবিন আস্তে আস্তে পাপড়ি দুটো মেলল। কাঁপতে থাকা ঠোঁটে একফালি স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল তার। সে দুর্বল হাতটা তুলে রিদওয়ানের গালে রাখল। "রিদওয়ান... আমরা কি বেঁচে আছি? আমাদের বাচ্চা...?"
রিদওয়ান আলতো করে হাত রাখল মেহজাবিনের তলপেটে। সেই ভেজা উত্তাপে অনুধাবন করল প্রাণের ধুকপুকানি। রিদওয়ান ঝুঁকে পড়ে মেহজাবিনের পেটে পরম আবেগে ঠোঁট ছোঁয়াল, তারপর নেমে এল তার ভেজা গোলাপি ঠোঁটে। এক দীর্ঘ, তৃষ্ণার্ত আর পরম মিলনের চুম্বনে তারা ধুয়ে মুছে দিল পাঁচ বছরের বিরহ আর গত রাতের মৃত্যুর বিভীষিকা।
"আমরা বেঁচে আছি সোনা," রিদওয়ান রুদ্ধশ্বাসে ফিসফিস করে বলল, "আর কেউ আমাদের আলাদা করতে পারবে না। কোনো সমাজ না, কোনো চৌধুরী বংশের ভয় না।"
কয়েক সপ্তাহ পর—
নদীর তীরঘেঁষা এক দূরবর্তী গ্রামীণ জনপদে ছোট একটা টিনের চালা ঘর। সামনে সারি সারি সুপারি গাছ আর উঠোনজুড়ে সবুজ ঘাস।
বিকাল নামতেই আকাশে মেঘের ঘনঘটা। ঘরের ভেতর প্রদীপের নরম হলুদ আলো। রিদওয়ান কাজ সেরে ঘরে ফিরতেই মেহজাবিন পেছন থেকে এসে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। মেহজাবিনের খালি গায়ে এখন আর কোনো ভয় নেই, আছে কেবল ভালোবাসার গভীর আত্মতৃপ্তি। তার গর্ভ এখন আরও কিছুটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
রিদওয়ান ঘুরে দাঁড়িয়ে মেহজাবিনের রেশমি চুলগুলো সরিয়ে তার নগ্ন পিঠে গভীর উন্মাদনায় ঠোঁট ছোঁয়াল। মেহজাবিন এক তীব্র সুখে চোখ বুজে রিদওয়ানের শার্টের বোতামগুলো খুলতে শুরু করল।
"রিদওয়ান..." মেহজাবিন তার ভারী নিঃশ্বাস রিদওয়ানের গলায় ঢেলে বলল, "কালিয়াগ্রাম থেকে খবর এসেছে। জব্বার চৌধুরী নাকি পঞ্চায়েত আর পুলিশ নিয়ে হাভেলি দখল করতে গিয়ে নিজেরই এক শত্রুর গুলিতে মারা গেছে। ইসমাইল চৌধুরীর বংশের আর কেউ বেঁচে নেই।"
রিদওয়ান মেহজাবিনের কোমর ধরে তাকে আলতো করে খাটটিতে শুইয়ে দিল। মেহজাবিনের উন্মুক্ত শাড়ির নিচে ফুটে ওঠা নমনীয় বাঁকে নিজের হাত বুলিয়ে সে বলল, "ওসব চৌধুরী আর গ্রামের খবর এখন আমাদের কাছে অতীত, মেহজাবিন। এই ছোট ঘর, এই পদ্মা নদীর হাওয়া আর তুমি—এটাই এখন আমার পৃথিবী।"
মেহজাবিন রিদওয়ানকে নিজের ওপর টেনে নিল। দুজনের শরীর আবার এক হয়ে গেল এক গভীর, আদিম আর তীব্র রোমান্সের বাঁধনে। প্রদীপের আলো-ছায়ায় মেহজাবিনের সোহাগী আর্তনাদ আর রিদওয়ানের তৃষ্ণার্ত স্পর্শ মিশে গেল বৃষ্টির মিষ্টি শব্দে।
যে সত্য প্রকাশ পেলে দুজনের জীবন ছাই হয়ে যেতে পারত, সেই সত্যই আজ তাদের এক নতুন ভোরের সন্ধান দিয়েছে। পাঁচ বছরের বিরহ শেষে, সমাজের সব শিকল ভেঙে রিদওয়ান আর মেহজাবিন এখন একে অপরের সম্পূর্ণ নিজস্ব—যেখানে তাদের ভালোবাসার নতুন বীজ দিনে দিনে বড় হয়ে উঠছে এক মুক্ত ভালোবাসার নীড়ে।
....