শরতের মেঘলা দুপুরগুলো এই শহরে বড় বিষণ্ণ মনে হয়। জানালার কাচে জমে থাকা হালকা বৃষ্টির ফোঁটাগুলোর দিকে তাকিয়ে মায়া বহুবার নিজের জীবনটাকে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছে। তিন বছর হয়ে গেল সে এই নতুন শহরে এসেছে, নিজের একটা গুছানো জগত তৈরি করেছে। কিন্তু বুকের ভেতরে কোথাও একফালি অন্ধকার ঘর এখনো সেই পুরোনো স্মৃতিগুলোর দখলে।
শাওন আর মায়ার ভালোবাসা কোনো সাধারণ গল্প ছিল না। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ পাহাড় আর ক্যাফেটেরিয়ার চেনা গলিগুলোতে তাদের ভালোবাসার গল্প একসময় সবার মুখে মুখে ফিরত। শাওন ছিল মায়ার জীবনের সেই আলো, যাকে ঘিরে মায়া তার সম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ সাজিয়েছিল। শাওনের হাতের স্পর্শে মায়াবন্দি হতো মায়ার দিনরাত। তাদের ভালোবাসা ছিল গভীর, উন্মাদনাময় এবং এক পরম নির্ভরতার জায়গা।
কিন্তু আজ থেকে তিন বছর আগের সেই অমাবস্যার মতো রাতটি মায়ার জীবনের সবকিছু ওলটপালট করে দেয়। কোনো আগাম সংকেত ছাড়াই শাওন তাকে ডেকে পাঠিয়েছিল বলধা গার্ডেনের নিরিবিলি এক কোণে।
মায়াকে দেখে সেদিন শাওনের চোখে কোনো আবেগ ছিল না। যে চোখে একসময় মায়ার জন্য ভালোবাসার নদী বয়ে যেত, সে চোখ দুটো সেদিন ছিল চরম ঠান্ডা ও পাথরের মতো শক্ত। শাওন খুব পকেট থেকে হাত দুটো বের না করেই সোজা মায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, "মায়া, আমি আর এই সম্পর্কটা টেনে নিয়ে যেতে পারছি না। সত্যি বলতে, তোমাকে আর আমি ভালোবাসি না। এতদিনের ভালোবাসাটা হয়তো কেবলই একটা অভ্যাস ছিল।"
কথাগুলো মায়ার কানে পৌঁছানোর পর কয়েক মুহূর্তের জন্য চারপাশের সবকিছু স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। মায়া ভেবেছিল শাওন হয়তো ঠাট্টা করছে। সে শাওনের হাত দুটো চেপে ধরেছিল, কেঁদে কেঁদে বলেছিল, "শাওন, কী বলছ এসব? ভুল তো মানুষেরই হয়, আমার কী ভুল হয়েছে বলো? আমি নিজেকে বদলে নেব।"
কিন্তু শাওন নির্দয়ভাবে মায়ার হাত দুটো ঝেড়ে ফেলে দিয়েছিল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছিল এক অদ্ভুত তাচ্ছিল্যের হাসি। সে বলেছিল, "আমাকে আর বিরক্ত কোরো না মায়া। আমার জীবনে এখন অন্য হিসাব আছে। তুমি এখন যেতে পারো।"
সেই এক রাতে মায়ার বিশ্বাস, ভালোবাসা এবং আত্মসম্মান ধূলোয় মিশে গিয়েছিল। যে মানুষটাকে সে নিজের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করত, সে এত সহজে তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিল? অপমানে, কষ্টে আর গভীর ঘৃণায় মায়া ভেঙে পড়েছিল। সে আর ওই শহরে এক মুহূর্তও থাকেনি। পরের দিনই নিজের ব্যাগ গুছিয়ে, পরিবারকে বুঝিয়ে নতুন এক শহরে চলে এসেছিল। সে প্রতিজ্ঞা করেছিল, শাওন নামের সেই চেনা বিশ্বাসঘাতক পুরুষটাকে সে চিরতরে নিজের হৃদয় থেকে মুছে ফেলবে। ভালোবাসা রূপ নিয়েছিল তীব্র ঘৃণায়।
তিনটি বছর মায়া একাই কেটেছে। করপোরেট লাইফের ইঁদুর দৌড়ে নিজেকে ব্যস্ত রেখে সে চেয়েছিল পুরোনো ক্ষতগুলো ভুলতে। সাফল্য এসেছে, পরিচিতি বেড়েছে, কিন্তু রাতে একা শুতে গেলে শাওনের সেই নির্মম কণ্ঠস্বর আর তার চোখের ঠান্ডা দৃষ্টি মায়াকে তাড়া করে বেড়াত।
আজ তাদের অফিসের নতুন এক মেগা প্রজেক্টের মিটিং। মায়া এখন একটা শীর্ষস্থানীয় আর্কিটেকচারাল ফার্মের প্রজেক্ট হেড। ক্লায়েন্টের সাথে মিটিংয়ের জন্য সে মিটিং রুমে অপেক্ষা করছিল। পরনে তার নেভি ব্লু রঙের একটা শাড়ি, চুলগুলো পরিপাটি করে খোঁপা করা, ঠোঁটে হালকা লাল লিপস্টিক—সব মিলিয়ে এক দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী নারী।
মিটিং রুমের ভারী কাঠের দরজাটা হঠাৎ খুলে গেল। কোম্পানির এমডি ঢুকলেন, আর তার পেছনে যে পুরুষটি হেঁটে এল, তাকে দেখে মায়ার হাতের কলমটা হাত থেকে টেবিলের ওপর খসে পড়ল। বুকের ভেতরে যেন হাজারটা ডেসিবেলে বাজের শব্দ হলো।
উঁচু-লম্বা গঠন, পরিপাটি করে আঁচড়ানো কালো চুল, পরনে পারফেক্ট ফিটেড ডার্ক গ্রে স্যুট। চোখের দৃষ্টিতে সেই আগের মতোই গভীরতা, কিন্তু চেহারায় ক্লান্তির এক স্পষ্ট ছাপ। শাওন!
শাওন রুমে ঢুকেই মায়ার মুখোমুখি হলো। তিন বছর পর আবার সেই চোখ দুটো এক হলো। মায়ার হৃৎস্পন্দন থমকে গেল কয়েক মুহূর্তের জন্য। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে পড়ে গেল সেই নির্মম প্রত্যাখ্যানের কথা। মায়ার চোখে ফুটে উঠল বরফশীতল ঘৃণা ও তাচ্ছিল্য।
এমডি তাদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, "মায়া, মিট আমাদের নতুন প্রাইম প্রজেক্ট পার্টনার, ইঞ্জিনিয়ার শাওন আহমেদ। আগামী ছয় মাস তোমাদের দুজনকে একসাথে এই রিসোর্ট প্রজেক্টে কাজ করতে হবে।"
শাওন এগোলো মায়ার দিকে। তার দিকে নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে এক অদ্ভুত নিচু গলায় বলল, "হ্যালো, মায়া। কেমন আছ?"
মায়া হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়াল না। তার চোখ দুটো দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বের হচ্ছিল। সে শাওনের প্রসারিত হাতের দিকে এক নজর তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, "আই অ্যাম এক্সট্রিমলি প্রফেশনাল, স্যার। কাজের খাতিরে যতটুকু কথা বলা দরকার, ততটুকুই বলব। কেমন আছি না আছি, তা জানার এখতিয়ার আপনার নেই।"
শাওনের হাতটা শূন্যে ক্ষণিকের জন্য থমকে গেল। তার চোখে এক পলকের জন্য তীব্র কষ্ট ও আকুতি ফুটে উঠলেও সে নিজেকে সামলে নিল। হাতটা নামিয়ে এনে পকেটে পুরে সে আলতো করে হাসল, "বেশ। কাজের কথাই হবে।"
মিটিং শুরু হলো। কিন্তু পুরো মিটিং জুড়ে মায়া অনুভব করছিল শাওনের জ্বলজ্বলে দৃষ্টি তাকে সর্বক্ষণ অনুসরণ করছে। সেই দৃষ্টিতে তীব্র তৃষ্ণা ছিল, ছিল এক অপূর্ণ কামনার আঁচ।
মিটিং শেষ হতেই সবাই একে একে বেরিয়ে গেল। মায়া দ্রুত নিজের ফাইলগুলো গুছিয়ে নিয়ে বের হতে চাইল, কিন্তু শাওন দরজার সামনে এসে নিজের দীর্ঘ দেহ দিয়ে রাস্তা আটকে দাঁড়াল।
"আমার রাস্তা ছাড়ুন, মি. শাওন।" মায়া গলার স্বর যতটা সম্ভব শক্ত রেখে বলল।
"এত তাড়া কিসের মায়া? তিন বছর পর দেখা... আমরা কি দুটো স্বাভাবিক কথা বলতে পারি না?" শাওনের গলা সামান্য কেঁপে উঠল, তার পা দুটো আরেকটু এগিয়ে এল মায়ার কাছাকাছি।
"স্বাভাবিক কথা?" মায়া এক পা পিছিয়ে গেল, কিন্তু তার চোখে তখন আগ্নেয়গিরির ক্ষোভ। "যে মানুষটা আমার জীবনটাকে এক মুহূর্তে ছাই করে দিয়েছিল, তার সাথে আমার কোনো কথা নেই। আপনার প্রতি আমার এখন শুধু ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।"
শাওন আর মায়ার মাঝের দূরত্ব তখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির। শাওনের নিঃশ্বাসের উষ্ণতা মায়ার গালে এসে পড়ছিল। শাওন হঠাৎ হাত বাড়িয়ে মায়ার এক হাত ধরে ফেলল। তার হাতের আঙুলগুলো মায়ার নরম কবজিতে চেপে বসল।
"ঘৃণাই করো মায়া," শাওনের চোখ দুটো মায়ার ঠোঁটের দিকে নেমে এল, তার কণ্ঠস্বর নেমে এল গভীর এক ফিসফিসে আওয়াজে, "কিন্তু তোমার এই ঘৃণা আমাকে দূর ঠেলে দিতে পারবে না। তোমার শরীরের প্রতিটি কণা এখনো আমার ছোঁয়া চেনে।"
"ছাড়ুন আমাকে!" মায়া নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু শাওনের শক্ত বাঁধন তাকে দেয়ালের সাথে প্রায় সেঁটে দিল।
শাওন মায়ার আরও কাছে ঘুঁষে এল। তার বুকের সাথে মায়ার উথাল-পাথাল বুক মিশে গেল। মায়া শাওনের গায়ের চেনা সেই পারফিউমের কড়া সুবাস পেল—যে সুবাসে একসময় সে নিজেকে হারিয়ে ফেলত। শাওনের অন্য হাতটা মায়ার কোমর চেপে ধরল। কাপড়ের ওপর দিয়েই মায়া অনুভব করল শাওনের হাতের উত্তাপ।
"এত ঘৃণা নিয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছ মায়া," শাওন তার মুখটা মায়ার কানের কাছে নিয়ে এল। শাওনের গরম নিঃশ্বাস মায়ার ঘাড়ের স্পর্শকাতর জায়গায় লাগতেই মায়ার শরীরে একটা বিদ্যুতের ঝলক খেলে গেল। মায়া শিউরে উঠল, তার চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসতে চাইল অবচেতনেই।
শাওনের ঠোঁট দুটো হালকা করে মায়ার কানের লতিতে স্পর্শ করল। আলতো এক কামড় দিয়ে সে নিচু গলায় বলল, "যদি এতটাই ঘৃণা করো, তবে তোমার হৃদয় আর এই উত্তপ্ত নিঃশ্বাস এত দ্রুত চলছে কেন? কেন আমার ছোঁয়ায় তোমার শরীর কেঁপে উঠছে?"
মায়া নিজের ভেতরের দুর্বলতাকে ঢাকতে সর্বশক্তি দিয়ে শাওনের বুকে ধাক্কা দিল। এবার শাওন সামান্য পিছিয়ে গেল। মায়ার বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছিল, তার ঠোঁট দুটো কাঁপছিল—কখনও ক্ষোভে, কখনও বা শাওনের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘনিষ্ঠতার কামনায়।
"আপনি একটা চরিত্রহীন, ভন্ড মানুষ!" মায়া হঁপাচ্ছিল। সে নিজের শাড়িটা দ্রুত ঠিক করে নিয়ে রাগে গজরাতে গজরাতে বলল, "অফিসিয়াল কাজের বাইরে আমার কাছে আসার চেষ্টা করবেন না। এবার যদি সীমা লঙ্ঘন করেন, আমি আইনি ব্যবস্থা নেব।"
মায়া ঝড়ের বেগে মিটিং রুম থেকে বেরিয়ে গেল। শাওন দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে মায়ার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দুটোতে তখন শুধুই জল আর তীব্র ভালোবাসা।
শাওন নিজের পকেটে হাত দিল। সেখান থেকে বের করল একটা পুরোনো, চামড়ায় বাঁধানো ডায়েরি। ডায়েরির পাতাগুলো মায়ার স্পর্শহীনতায় মলিন হয়ে গেছে।
শাওন বিড়বিড় করে বলল, "তুমি আমাকে যতই ঘৃণা করো মায়া, আমার কোনো আফসোস নেই। তোমাকে বাঁচানোর জন্য যদি আমাকে চিরকাল এই নরকযন্ত্রণা সহ্য করতে হয়, আমি সেটাও হেসে হেসে করব। কিন্তু তোমার শরীরের এই উম্মাদনা, এই অধিকার... আমি তা অন্য কাউকে নিতে দেব না।"
বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মায়া গাড়িতে বসে স্টিয়ারিং হুইলটা শক্ত করে চেপে ধরে কাঁদছিল। কিন্তু সেই কান্নার পেছনে শুধুই রাগ ছিল না, ছিল শাওনের সেই ক্ষণিকের উগ্র, কামনাময় স্পর্শের আগুন, যা তিন বছর পর আবার তার পুরো শরীরে দাবানল জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে।
বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে শহরের রাত নেমে এসেছে। মায়ার ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে এসে পড়া জলের ছাট তার পরনের নরম সুতির নাইটগাউন ভিজিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। মিটিং রুমের সেই কয়েক মিনিটের স্মৃতি মায়ার মগজে উথাল-পাথাল তৈরি করছে। শাওনের হাতের সেই উগ্র স্পর্শ, তার ঠোঁটের উষ্ণতা, আর কানের কাছে ফিসফিস করে বলা সেই দম্ভোক্তি—সবকিছু মায়াকে পাগল করে দিচ্ছে। সে শাওনকে ঘৃণা করে, চরম ঘৃণা করে। কিন্তু কেন তবে শাওনের ছোঁয়ায় তার শরীর অমন অবশ হয়ে গিয়েছিল? কেন তার হৃদস্পন্দন থমকে গিয়েছিল? মায়া নিজের ওপর চরম বিরক্ত হয়ে এক চুমুকে গ্লাসের পুরো ওয়াইনটুকু গিলে ফেলল।
পরদিন সকালে অফিসে পৌঁছাতেই মায়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট এসে জানাল, রিসোর্ট প্রজেক্টের সাইট ভিজিটের জন্য কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হবে। পুরো প্রজেক্ট টিম একসাথেই যাচ্ছে। মায়া কিছুটা স্বস্তি পেল এই ভেবে যে প্রজেক্ট টিমে আরও পাঁচ-ছয়জন ইঞ্জিনিয়ার আর আর্কিটেক্ট থাকবে। অন্তত শাওনের সাথে একা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
কিন্তু বিকেলে যখন ফ্লাইট ল্যান্ড করল এবং তারা সমুদ্র সৈকতের কাছের সেই বিলাসবহুল রিসোর্টে পৌঁছাল, তখন মায়ার সেই স্বস্তি মূহূর্তেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। অ্যাসিস্ট্যান্ট অপরাধীর মতো মুখ করে বলল, "ম্যাম, বুকিংয়ে একটু ভুল হয়ে গেছে। আমাদের সব টিমের বুকিং পাশের থ্রি-স্টার হোটেলে হয়েছে, আর প্রজেক্ট হেড হিসেবে আপনার আর মি. শাওনের সুইট বুক করা হয়েছে এই ফাইভ-স্টার রিসোর্টের প্রাইভেট ভিলায়।"
"হোয়াট?" মায়া চিৎকার করে উঠল। "আমি ওর সাথে একই ভিলায় থাকব মানে? কোনোভাবেই না! এখনই রুম চেঞ্জ করো।"
"ম্যাম, এই মুহূর্তে কক্সবাজারে ট্যুরিস্ট সিজন চলছে। কোনো ভালো হোটেলে রুম খালি নেই। আর ভিলায় দুটো আলাদা মাস্টার বেডরুম আছে, মাঝখানে শুধু একটা কমন লিভিং এরিয়া," অ্যাসিস্ট্যান্ট মিনতি করার ভঙ্গিতে বলল।
মায়া রাগে গজগজ করতে করতে ভিলার ভেতরে ঢুকল। লিভিং রুমে ঢুকেই দেখল শাওন আগেই পৌঁছে গেছে। সোফায় হেলান দিয়ে বসে ল্যাপটপে কাজ করছে সে। গায়ে শুধু একটা সাদা হাফ-হাতা টি-শার্ট আর ট্রাউজার। টি-শার্টের টাইট কাপড়ের ভেতর থেকে শাওনের চওড়া বুক আর সুগঠিত হাতের পেশি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। মায়াকে দেখে সে ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত, প্রলোভনময় হাসিটা ফুটিয়ে তুলল।
"ওয়েলকাম মায়া। আশা করি রুমটা তোমার পছন্দ হয়েছে," শাওন শান্ত গলায় বলল।
"আমাকে প্রফেশনাল এথিক্স শেখাতে আসবেন না, মি. শাওন। আপনার সাথে এক ছাদের নিচে থাকাও আমার জন্য বিষ পানের সমান," মায়া নিজের ট্রলি ব্যাগটা টেনে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল।
এত ভয় পাচ্ছ কেন মায়া? নিজেকে সামলাতে পারবে না বলে কি এত দ্বিধা?" শাওনের গলার স্বরে স্পষ্ট উসকানি।
মায়া থমকে দাঁড়াল। পেছনে ফিরে শাওনের চোখের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বলল, "আপনাকে ভয় পাওয়ার মতো ভুল আমি তিন বছর আগেই করা ছেড়ে দিয়েছি।"
রাতের খাবার মায়া নিজের রুমেই আনিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু রাত যত গভীর হতে লাগল, সমুদ্রের গর্জনের সাথে সাথে মায়ার ভেতরের অস্থিরতাও তত বাড়তে লাগল। রাত বারোটা নাগাদ চরম তৃষ্ণা পাওয়ায় সে রুমের দরজা খুলে কিচেন কাউন্টারের দিকে গেল পানি খেতে।
পুরো ভিলায় হালকা আবছা আলো। মায়া জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢালছিল, এমন সময় হঠাৎ পেছন থেকে একটা উষ্ণ ছায়া তার ওপর এসে পড়ল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একজোড়া শক্ত হাত পেছন থেকে মায়ার কোমর জড়িয়ে ধরল। মায়া চমকে উঠে চিৎকার করতে যেতেই শাওনের চওড়া এক হাত এসে মায়ার মুখ চেপে ধরল।
"চুপ... একদম চিৎকার করবে না," শাওন মায়াকে এক টানে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নিল।
শাওনের শরীর থেকে তখন কড়া মদের আর তার চেনা পারফিউমের এক মাখোমাখো সুবাস বের হচ্ছে। তার বুকটা খালি, পরনে শুধু একটা সুতির ট্রাউজার। খালি বুকের উষ্ণতা মায়ার পাতলা নাইটগাউনের মধ্য দিয়ে সরাসরি মায়ার পিঠে গিয়ে বিধল।
"ছেড়ে দিন আমাকে! শাওন, হাত সরান বলছি!" মায়া শাওনের হাত সরানোর জন্য ছটফট করতে লাগল, তার নখ দিয়ে শাওনের হাতে আঁচড় কেটে দিল।
কিন্তু শাওন আজ যেন অন্য এক নেশায় মত্ত। সে মায়ার কোনো আকুতি শুনল না। উল্টো সে মায়াকে ঘুরিয়ে কিচেন কাউন্টারের মার্বেল টপের ওপর বসিয়ে দিল। মায়া কাউন্টারে আটকে গেল, আর শাওন মায়ার দুই পায়ের মাঝে নিজেকে সেঁটে দিল।
"তিন বছর... তিনটে বছর আমি এই ছোঁয়াটার জন্য তিল তিল করে মরেছি মায়া," শাওনের গলা জড়িয়ে আসছিল। তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ, কিন্তু সেই চোখে উথলে উঠছে তীব্র কামাকুল ব্যাকুলতা।
"আপনি নেশা করেছেন শাওন! সরুন আমার ওপর থেকে!" মায়া শাওনের বুকে দু-হাত দিয়ে ঠেলতে চাইল, কিন্তু শাওনের বিন্দুমাত্র নড়নচড়ন হলো না।
"হ্যাঁ, আমি নেশা করেছি। তোমার নেশা... এই রূপের নেশা, তোমার শরীরের এই চেনা সুবাসের নেশা," বলতে বলতেই শাওন মায়ার ঘাড়ের ওপর নিজের মুখটা নামিয়ে আনল।
শাওনের উত্তপ্ত ঠোঁট মায়ার উন্মুক্ত ঘাড়ে ও কলারবোনে নির্মম ভালোবাসায় চেপে বসল। মায়া কেঁপে উঠল। তার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় যেন আগুনের স্রোত বয়ে গেল। মায়া বাধা দিতে চাইল, মুখ ফুটে বলল, "না... শাওন, না..." কিন্তু তার নিজের গলার স্বরই যেন বিশ্বাসঘাতকতা করল। তা কোনো জোরালো প্রতিবাদ নয়, বরং এক আদিম আকুতির মতো শোনাল।
শাওনের হাত দুটো মায়ার কোমর থেকে উঠে এল তার পিঠের ওপর। মায়ার সুতির নাইটগাউনের জিপারটা এক টানে নিচে নামিয়ে দিল শাওন। জামাটা মায়ার কাঁধ থেকে খসে পড়তেই শাওনের তৃষ্ণার্ত ঠোঁট নেমে এল মায়ার খোলা কাঁধে। শাওন তার দাঁত দিয়ে হালকা করে মায়ার নরম চামড়ায় কামড় বসাল, আবার পর মুহূর্তেই সেখানে আলতো করে নিজের জিভ দিয়ে চেটে শুষে নিল সেই উত্তাপ।
"শাওন... উফ..." মায়ার মুখ দিয়ে একটা অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এল। মায়ার হাত দুটো, যা এতক্ষণ শাওনকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিল, তা অবচেতনেই শাওনের চওড়া পিঠে চেপে বসল। মায়ার আঙুলগুলো শাওনের পিঠের চামড়ায় গেঁথে গেল।
শাওন মায়ার চেহারায় ফুটে ওঠা এই আদিম উন্মাদনা দেখে যেন আরও হিংস্র হয়ে উঠল। সে মায়ার মুখটা দু-হাতে উঁচিয়ে ধরে সরাসরি মায়ার ভেজা ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। সে এক নিষ্ঠুর, দখলদারী চুমু! শাওন যেন তিন বছরের সব বঞ্চনা, সব খিদে এক মুহূর্তে নিংড়ে নিতে চায়। মায়াও যেন নিজের সব প্রতিরোধ হারিয়ে সেই গভীর চুমুতে তলিয়ে যেতে লাগল। তাদের নিঃশ্বাস এক হয়ে গেল, কিচেনের আবছা আলোয় দুটো তৃষ্ণার্ত শরীর একে অপরের কামনায় পুড়তে লাগল।
শাওনের হাত মায়ার উন্মুক্ত পিঠ ঘেঁষে তার নাভির কাছাকাছি নেমে আসতেই মায়ার মগজে হঠাৎ বাজ পড়ল। ৩ বছর আগের সেই অন্ধকার রাত, বলধা গার্ডেনের সেই নির্মম তাচ্ছিল্যের শব্দগুলো তার কানে বেজে উঠল—"তোমাকে আর আমি ভালোবাসি না... তুমি এখন যেতে পারো।"
এক লহমায় মায়ার সুপ্ত চেতনা ফিরে এল। নিজেকে এই বিশ্বাসঘাতকের হাতে এভাবে সঁপে দেওয়ার ভাবনায় নিজের প্রতিই এক চরম ঘৃণা জন্মাল।
মায়া সর্বশক্তি দিয়ে শাওনের ঠোঁটে নিজের দাঁত বসিয়ে দিল।
"আঃ!" শাওন যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠে এক পা পিছিয়ে গেল। তার ঠোঁটের কোণ কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
মায়া কাউন্টার থেকে নেমে দাঁড়িয়ে দ্রুত নিজের নাইটগাউনটা টেনে কাঁধে তুলল। তার বুক হাঁপানির মতো ওঠানামা করছে, চোখের কোণে জমেছে জল আর ঘৃণা।
"আপনি একটা জানোয়ার, শাওন!" মায়া থরথর করে কাঁপছিল। "নেশার ঘোরে আমাকে নিজের সম্পত্তি ভাববেন না। কাল সকালেই আমি প্রজেক্ট থেকে রিজাইন দেব আর এই মুহূর্তেই আমি এই ভিলা ছেড়ে চলে যাচ্ছি।"
শাওন ঠোঁটের রক্তটুকু হাত দিয়ে মুছে মায়ার দিকে তাকাল। তার চোখে তখন নেশার কামনার বদলে ফুটে উঠেছে এক গভীর, অসীম বেদনা।
"মায়া, শোনো..." শাওন হাত বাড়াল।
"খবরদার আমাকে ছুঁবেন না!" মায়া চোখ দিয়ে জল মুছে গজগজ করে নিজের রুমের দিকে হনহন করে হেঁটে গেল এবং সশব্দে দরজাটা বন্ধ করে লক করে দিল।
শাওন কিচেন কাউন্টারে মাথা নিচু করে বসে পড়ল। হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে সে ফুঁকিয়ে কেঁদে উঠল। তারপর পকেট থেকে বের করল সেই মলীন ডায়েরিটা।
ডায়েরির নতুন একটা পাতা খুলে রক্তাক্ত ঠোঁট নিয়ে সে লিখতে শুরু করল:
"আজ আবারও তোমাকে ছুঁয়েছিলাম মায়া। তোমার শরীরের উত্তাপ আমাকে আজও পাগল করে দেয়। কিন্তু তোমার চোখের ওই ঘৃণা আমাকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। আর মাত্র কটা দিন... তারপর হয়তো তুমি সত্যটা জানবে। কিন্তু সত্য জানার পর কি তুমি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে? নাকি এই ভালোবাসার আগুন আমাদের দুজনকেই ছাই করে দেবে?"
সারারাত মায়ার চোখে ঘুম আসেনি। ঠোঁটে শাওনের উগ্র চুমুর কামড় আর ঘাড়ে তার তৃষ্ণার্ত স্পর্শের দাগ যেন এখনো জ্বলজ্বল করছে। মায়া বারবার আয়নায় নিজের গলা আর কাঁধের সেই লালচে দাগগুলোর দিকে তাকিয়েছে আর নিজের ওপর চরম রাগ হয়েছে। কেন সে নিজেকে ধরে রাখতে পারল না? কেন শাওনের সামান্য স্পর্শেই তার তিন বছরের শক্ত করে গড়া প্রতিজ্ঞার প্রাচীর ধসে গেল?
সকাল হতেই মায়া সিদ্ধান্ত নিল সে প্রজেক্ট ছেড়ে ঢাকায় ফিরে যাবে। ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে সে ভিলার বাইরে পা রাখতেই দেখল সাইটের প্রজেক্ট ম্যানেজার সুজন গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
"ম্যাম, মি. শাওন সকালে জরুরি কাজে সাইটে গেছেন। উনি বলে গেছেন আপনাকে যেন সাইটে নিয়ে যাওয়া হয়। আজ ল্যান্ড সার্ভের ফাইনাল দিন," সুজন বলল।
মায়া দাঁতে দাঁত চেপে ভাবল, পালিয়ে যাওয়া মানেই শাওনের কাছে হেরে যাওয়া। সে প্রজেক্ট ছাড়বে না, বরং পেশাদারত্বের শক্ত বর্ম দিয়ে নিজেকে মুড়ে শাওনের মুখোমুখি হবে। সে গাড়িতে উঠে বসল।
কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ ঘেঁষে পাহাড়ি এলাকার এক নির্জন জায়গায় রিসোর্টের কাজ শুরু হওয়ার কথা। সেখানে পৌঁছে মায়া দেখল শাওন হেলমেট মাথায় দিয়ে ব্লু-প্রিন্ট হাতে দাঁড়িয়ে ইঞ্জিনিয়ারদের নির্দেশ দিচ্ছে। রোদের আলোয় তার ফর্সা চেহারায় ঘামের ফোঁটা চকচক করছে। কাল রাতের কোনো অপরাধবোধ তার চেহারায় নেই—সে যেন এক সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ, অত্যন্ত গম্ভীর ও পেশাদার।
মায়াকে দেখে শাওন স্বাভাবিক গলায় বলল, "গুড মর্নিং ম্যাম। আসুন, পাহাড়ের ওপরের ভিউ পয়েন্টটা একটু দেখে নিন। ওখানেই মূল রেস্তোরাঁটা হবে।"
মায়া কোনো উত্তর না দিয়ে শাওনের সাথে পাহাড়ের উঁচু ঢালের দিকে হাঁটতে লাগল। সমুদ্রের হাওয়া আর রোদের উত্তাপ মিলে এক দমবন্ধ পরিবেশ। কিন্তু যতই তারা ওপরের দিকে উঠছিল, নির্জনতা তত বাড়ছিল। প্রজেক্টের বাকি কর্মীরা নিচে কাজ করছিল।
উঁচু টিলাটার ওপর পৌঁছাতেই মায়া খাদের কিনারায় গিয়ে দাঁড়াল। সেখান থেকে বিশাল সমুদ্র দেখা যাচ্ছে। কিন্তু বাতাসটা হঠাৎ বড্ড তীব্র হয়ে উঠল। মায়ার শাড়ির আঁচল বাতাসের তোড়ে উড়তে লাগল।
হঠাৎ করেই পাহাড়ের উপরের ঢালু মাটির অংশ ঝুরঝুর করে ধসে যেতে লাগল। মায়ার পায়ের নিচের মাটি সরে যেতেই সে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল।
"শাওন!" মায়া আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল।
ঠিক শেষ মুহূর্তে শাওন বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে মায়ার কোমর জড়িয়ে ধরল। কিন্তু চড়াক গতিতে দুজনেই নিচে পাহাড়ের আড়ালে থাকা এক পরিত্যক্ত কাঠের গুদামের মতো ছোট্ট শেডের ওপর গিয়ে পড়ল। ঝোপঝাড় আর মাটির ধস কাটিয়ে তারা শেডের পেছনের নির্জন ফাঁকা জায়গায় ছিটকে পড়ল।
শাওন মায়াকে সম্পূর্ণ নিজের বুকের মধ্যে আগলে রেখেছিল, যাতে মায়ার গায়ে বিন্দুমাত্র আঁচ না লাগে। পড়ার তীব্র ধাক্কায় শাওন পিঠে প্রচণ্ড আঘাত পেল এবং তার মুখ দিয়ে একটা যন্ত্রণার শব্দ বের হলো।
"মায়া... তুমি ঠিক আছ?" শাওনের গলা দিয়ে হাঁপানির মতো শব্দ বের হচ্ছিল। সে মায়ার মুখটা দু-হাতে চেপে ধরে সারা শরীর পরীক্ষা করতে লাগল। "কোথাও লেগেছে তোমার? মায়া, কথা বলো!"
মায়া তখনও শাওনের বুকের ওপর চেপে বসে আছে। শাওনের এই অন্ধ ব্যাকুলতা, তার চোখের ভেতরের চরম ভয় মায়াকে স্তব্ধ করে দিল। যে মানুষটা তাকে হিংস্রভাবে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল, সে কেন নিজের জীবন বাজি রেখে তাকে বাঁচাতে গেল?
"আমি... আমি ঠিক আছি," মায়া তোতলাচ্ছিল।
তারা দুজন এখন পাহাড়ের আড়ালে থাকা এক সম্পূর্ণ নির্জন জায়গায়। চারপাশে ঘন ঝোপঝাড়, দূরে সমুদ্রের গর্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।
মায়াকে নিরাপদ দেখে শাওন এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপরই তার চোখ দুটো আবার বদলে গেল। মায়াকে নিজের গায়ের ওপর থেকে না সরিয়ে শাওন তার কোমর আরও শক্ত করে চেপে ধরল।
"তুমি সত্যি একটা পাগল মায়া," শাওনের নিশ্বাস মায়ার ঠোঁটে এসে ধাক্কা খেল। "একটু সাবধানে চলতে পারো না? যদি কিছু হয়ে যেত তোমার?"
"সরুন আমার ওপর থেকে," মায়া আবার নিজের খোলসে ঢোকার চেষ্টা করল, কিন্তু শাওনের শরীরের তীব্র উত্তাপ আর পেশির টান মায়াকে অবশ করে দিচ্ছিল।
"সরব না," শাওন এবার বেশ রাগী গলায় বলল। সে মায়ার পিঠের ওপর হাত বুলিয়ে মায়াকে নিজের আরও কাছাকাছি টেনে আনল। "তুমি আমাকে যত দূরে ঠেলবে, নিয়তি তত তোমাকে আমার কাছে এনে ফেলবে মায়া।"
"এটা নিয়তি নয়, আপনার নোংরা খেলা!" মায়া গজরে উঠল।
"নোংরা খেলা?" শাওনের চোখ দুটো কামনায় আর রাগে জ্বলতে লাগল। সে এক হাত দিয়ে মায়ার মাথার পেছনের চুল মুঠো করে ধরল, ফলে মায়ার মুখটা ওপরের দিকে উঠে গেল। শাওন নিজের ভারী শরীরটা মায়ার ওপর চেপে দিয়ে বলল, "এই নোংরা খেলাটাই তো তুমি চাও মায়া। তোমার শরীর কাল রাতেও এই ছোঁয়ার জন্য ব্যাকুল ছিল, আজও আছে।"
"কখনই না!" মায়া মিথ্যা বলার চেষ্টা করল।
কিন্তু শাওন তার কথা শোনার পাত্র নয়। সে মায়ার ব্লাউজের খোলা পিঠে নিজের হাত গলিয়ে দিল। শাওনের গরম হাতের তালু মায়ার মসৃণ পিঠের চামড়ায় ঘষা খেতেই মায়ার বুকটা উঁচিয়ে উঠল। সে এক তীব্র শিহরণ! শাওন তার ঠোঁট দুটো এনে মায়ার হাঁ করা ঠোঁটে চেপে ধরল।
এবার চুমুটা কাল রাতের চেয়েও তীব্র, গভীর এবং বেদনাময়। শাওন মায়ার নিচের ঠোঁটটা নিজের ঠোঁটের মাঝে নিয়ে শুষে নিতে লাগল। মায়ার সব শক্তি যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেল। শাওনের উন্মাদ ভালোবাসার কাছে মায়াও নিজের রাগ ভুলে সাড়া দিতে শুরু করল। মায়া নিজের দু-হাত দিয়ে শাওনের ঘাড় পেঁচিয়ে ধরল, তার আঙুলগুলো শাওনের চুলে ঢুকে গেল।
পাহাড়ের ওপর রোদ আর সমুদ্রের হাওয়ার মাঝে দুই তৃষ্ণার্ত শরীর এক চরম কামনার দাবানলে জ্বলতে লাগল। শাওনের হাত মায়ার কোমর থেকে শাড়ির ভাজ সরিয়ে নাভির কাছাকাছি পৌঁছে গেল। মায়াও এক অদম্য তৃষ্ণায় শাওনের বুকে নিজের মুখ ঘষতে লাগল। তাদের শরীরী উত্তেজনা তখন চরম সীমায়।
ঠিক তখনই শাওনের পকেটের ফোনটা বিকট শব্দে বেজে উঠল।
ফোন রিং হওয়ার সাথে সাথেই যেন দুজনের ওপর ঠান্ডা পানি ঢেলে দেওয়া হলো। শাওন থামল, তবে মায়াকে ছাড়ল না। সে হাঁপাতে হাঁপাতে পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
স্ক্রিনে একটা অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এসেছে। শাওন মেসেজটা খুলতেই তার মুখটা মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে আর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল। তার চোখের উন্মাদনা নিভে গিয়ে সেখানে নেমে এল এক চরম আতঙ্ক।
মেসেজে লেখা ছিল: "ইঞ্জিনিয়ার শাওন, তুমি কাজের জায়গায় বেশি ব্যস্ত হয়ে উঠছ। মায়াকে এখনো ভালোবাসো দেখছি? মনে রেখো, মায়াকে বাঁচানোর জন্য ৩ বছর আগে তুমি কী চুক্তি করেছিলে। বেশি বাড়াবাড়ি করলে মায়ার লাশটাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।"
মেসেজটা পড়েই শাওন মায়াকে প্রায় এক ঝটকায় নিজের ওপর থেকে ঠেলে সরিয়ে দিল। সে হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে দাঁড়াল।
মায়া বিস্ময়ে ও অপমানে হতবাক হয়ে গেল। কিছুক্ষণ আগেই যে মানুষটা তাকে গভীর অনুরাগে জড়িয়ে ধরেছিল, সে এত নির্দয়ভাবে তাকে ঠেলে দিল?
"শাওন... কী হলো আপনার?" মায়া নিজের শাড়ি সামলাতে সামলাতে বলল।
শাওন মায়ার দিকে ফিরেও তাকাল না। তার পিঠ মায়ার দিকে। শাওনের হাত দুটো থরথর করে কাঁপছিল, কিন্তু তার গলার স্বর সে কঠোর করে ফেলল, "নিজের জামাকাপড় ঠিক করো মায়া। একটু আগের ঘটনাটা একটা ভুল ছিল। আমার দুর্বল মুহূর্তের সুযোগ নিও না।"
"কী বললেন?" মায়ায় কান বিশ্বাস হচ্ছিল না। "আমি সুযোগ নিয়েছি? আপনি আমাকে জবরদস্তি..."
"যাই করে থাকি, তা কেবলই একটা শারীরিক আকর্ষণ," শাওন ঘুরে দাঁড়াল, তার চোখে এখন আবার সেই পাথর মার্কা ঠান্ডা দৃষ্টি, যা দেখে মায়া ৩ বছর আগে ভয় পেয়েছিল। শাওন চরম তাচ্ছিল্য নিয়ে বলল, "তুমি ভেবেছিলে আমি আবার তোমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছি? ভুল মায়া! তোমার মতো একটা সস্তা মেয়েকে শুধু ভোগ করার জন্যই আমার শরীরটা সাড়া দেয়, আমার মন নয়। এখন ওঠো, নিচে সবাই অপেক্ষা করছে।"
কথাগুলো মায়ার বুকে বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধল। মায়ার চোখে জলের জায়গায় আবার এক চূড়ান্ত আগ্নেয়গিরির ঘৃণা জমে উঠল।
শাওন হনহন করে পাহাড়ি পথ ধরে নিচে নেমে গেল। মায়া পেছনে থেকে গেল। তার মনে হচ্ছিল শাওনকে সে নিজ হাতে খুন করে ফেলবে।
কিন্তু শাওন যখন পাহাড়ি ঝোপের আড়ালে গেল, তখন সে দেয়াল ধরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার চোখের জল গাল বেয়ে ঝরছিল। সে নিজের হাতে কামড় দিয়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করছিল।
শাওন বিড়বিড় করে বলল, "আমাকে ক্ষমা করে দাও মায়া... আমাকে এতটাই ঘৃণা করো যাতে আমি মরে গেলেও তোমার চোখে একফোঁটা জল না আসে। তোমাকে বাঁচাতেই হবে আমাকে... ওদের হাত থেকে তোমাকে বাঁচাতেই হবে।"
শাওন পকেট থেকে তার পুরোনো ডায়েরিটা বের করল। হাত কাঁপতে কাঁপতে ডায়েরির পাতায় রক্ত আর চোখের জলে মিলিয়ে সে এক নতুন পৃষ্ঠা লিখতে শুরু করল—যেখানে লুকিয়ে আছে ৩ বছর আগের সেই ভয়ঙ্কর সত্যিটা।
কক্সবাজার থেকে ঢাকায় ফেরার পর মায়ার মন আর মস্তিষ্কে তীব্র ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। শাওনের বিষাক্ত অপমানজনক কথাগুলো তার কান দুটোকে বারবার বধির করে দিচ্ছিল। কিন্তু মায়ার ভেতরের একটা অংশ কোনোভাবেই মেলাতে পারছিল না—যে মানুষটি নিজের জীবন বাজি রেখে পাহাড় থেকে তাকে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচাল, সে-ই আবার কয়েক মিনিটের ব্যবধানে এতটা নির্মম, এতটা অমানুষ হয়ে যায় কীভাবে?
ঢাকা অফিসে ফিরে আসার পর থেকে মায়া শাওনকে এড়িয়ে চলতে শুরু করল। প্রজেক্টের যাবতীয় ফাইল সে অ্যাসিস্ট্যান্টের মাধ্যমে পাঠাত। কিন্তু শাওনের চেহারায় এক চরম ক্লান্তি আর ফ্যাকাশে ভাব ফুটে উঠছিল দিনে দিনে, যা মায়ার তীক্ষ্ণ নজর এড়ায়নি।
একদিন বিকেলে মায়া অফিসের প্রজেক্ট ডিরেক্টরের রুমে যাচ্ছিল একটা ফাইলে সই নেওয়ার জন্য। করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় সে দেখল শাওনের কেবিনের দরজা কিছুটা ফাঁক হয়ে আছে। রুমের ভেতর থেকে শাওনের উগ্র ও ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বর ভেসে আসছিল।
মায়া পা থামিয়ে দিল। কৌতুহল আর এক অজানা আশঙ্কায় সে দেয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনল।
"আমি তোমাদের সব কথা শুনেছি, চৌধুরী সাহেব!" শাওনের গলায় চরম চিৎকার আর চাপা ভয়, "তিন বছর আগে আপনারা আমার বাবাকে ব্ল্যাকমেইল করে দেউলিয়া করেছিলেন, আমার কোম্পানি ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন। আমি আপনাদের শর্ত মেনে নিয়ে মায়াকে চিরতরে নিজের জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছিলাম! ও তো এখন নিরাপদে আছে, আমার থেকে অনেক দূরে! এখন আবার কেন আপনারা ওর ক্ষতি করার হুমকি দিচ্ছেন?"
ওপাশ থেকে ফোনেই হয়তো কোনো হুমকি দেওয়া হলো, শাওন টেবিলে ঘুষি মেরে গর্জে উঠল, "যদি মায়ার গায়ে একটা আঁচড়ও লাগে, আমি পুলিশের কাছে সব নথি জমা দেব! আমার জীবন তো শেষ করেছেনই, মায়াকে ছুঁলে আমি আপনাদের জীবন্ত কবর দেব!"
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ার পায়ের নিচের মাটি যেন এক নিমেষে সরে গেল। তার বুকের ভেতরে হাজারটা বাজের বিকট শব্দ হলো।
৩ বছর আগের শর্ত? ব্ল্যাকমেইল? শাওন তাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল তাকে বাঁচানোর জন্য?
মায়ার মাথা ঘুরতে লাগল। সে দেয়ালে ভর দিয়ে কোনোমতে নিজেকে সামলাল। এতদিনের সব হিসেব, শাওনের ওপর জমানো পাহাড়সম ঘৃণা এক মুহূর্তে চুরমার হয়ে গেল। যে শাওনকে সে বিশ্বাসঘাতক, পশু ভেবে এতদিন অভিশাপ দিয়েছে—সে নিজের বাবাকে আর মায়াকে বাঁচানোর জন্য ৩ বছর ধরে এই নরকযন্ত্রণা একা বয়ে বেড়াচ্ছে?
শাওন ফোনটা রেখে দিয়ে চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ল। তার দু-হাতে মুখ ঢাকা, শরীরটা কান্নায় কাঁপছে।
মায়া নিজের কান্না ধরে রাখতে পারল না। সে দরজায় নাড়া না দিয়েই ঝড়ের বেগে কেবিনে ঢুকে পড়ে ভেতর থেকে সশব্দে দরজাটা লক করে দিল।
শাওন চমকে উঠে মুখ তুলল। মায়াকে ওভাবে কাঁদতে দেখে সে দ্রুত সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল। চেহারায় আবার সেই পাথুরে ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল, "তুমি? পারমিশন ছাড়া রুমে ঢুকছ কেন? আমার প্রাইভেসি..."
"চুপ করুন শাওন! একদম চুপ!" মায়া চিৎকার করে উঠল। সে হেঁটে শাওনের টেবিলের সামনে এল। মায়ার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় জল ঝরছিল।
"তুমি কী বলছ..."
"আমি সব শুনেছি শাওন! চৌধুরী সাহেবের নাম, ৩ বছর আগের সেই অন্ধকার চুক্তি, আমাকে বাঁচানোর নাটক... সব!" মায়ার গলা কান্নায় জড়িয়ে আসছিল।
শাওনের মুখটা এক লহমায় রক্তশূন্য হয়ে গেল। সে তোতলাতে লাগল, "তুমি... তুমি ভুল শুনছ মায়া। এসব কিছু না, তুমি যাও এখান থেকে।"
"আর কত মিথ্যে বলবেন?" মায়া সোজা টেবিলের ওপাশে গিয়ে শাওনের স্যুটের কলার শক্ত করে চেপে ধরল। সে শাওনের চোখের দিকে তাকিয়ে ফুঁকিয়ে কেঁদে উঠল, "কেন করলেন এমন? কেন আমাকে এক পশুর মতো তাড়াল ৩ বছর আগে? আমি কি আপনার সহধর্মিণী হওয়ার যোগ্য ছিলাম না? একসাথে লড়াই করতে পারতাম না আমরা?"
শাওন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। মায়ার করুণ আকুতি আর চোখের জল তার বাঁধ ভেঙে দিল। ৩ বছরের জমানো কষ্ট, যন্ত্রণা আর একাকীত্ব তাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল।
শাওন হঠাৎ মায়ার কোমর চেপে ধরে তাকে নিজের কোলে টেনে বসাল। মায়ার কলার ধরে থাকা হাত দুটো শাওনের ঘাড় পেঁচিয়ে ধরল।
"আমি উপায়হীন ছিলাম মায়া... চৌধুরী সাহেবরা আমার বাবার পুরো ফার্ম দখল করে নিয়েছিল। ওরা আমাকে হুমকি দিয়েছিল, আমি যদি তোমাকে ছেড়ে না দিই, তবে ওরা তোমাকে আর তোমার পরিবারকে চিরতরে শেষ করে দেবে," শাওন মায়ার পেটে নিজের মুখ গুঁজে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। "আমার তো কিছু ছিল না মায়া... তোমাকে বাঁচানোর জন্য আমাকে শয়তানের সাথে হাত মেলাতে হয়েছিল। তোমার ঘৃণা সহ্য করা আমার জন্য সহজ ছিল, কিন্তু তোমাকে হারিয়ে ফেলা নয়!"
মায়ার হৃদয় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। সে শাওনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল, তার গালে, কপালে অঝোরে চুমু খেতে লাগল।
"বোকা পুরুষ একটা! চরম বোকা!" মায়া কঁদতে কাঁদতে বলল।
শাওন মুখ তুলে মায়ার দিকে তাকাল। দুজনের চোখেই তখন অশ্রুর সাগরে ভালোবাসার প্লাবন। ৩ বছরের বঞ্চনা, অভিমান আর লুকানো ভালোবাসা এক আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল।
শাওন আর কোনো কথা না বলে মায়ার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। তবে এবার সে চুমুতে কোনো হিংস্রতা বা তাচ্ছিল্য ছিল না—সেখানে ছিল পরম ব্যাকুলতা, অসীম ভালোবাসা আর ক্ষমা চাওয়ার এক চরম আকুতি।
মায়াও তার পুরো অস্তিত্ব দিয়ে শাওনের চুমুর জবাব দিল। সে নিজের শরীরটাকে শাওনের চওড়া বুকের সাথে সম্পূর্ণ মিশিয়ে দিল। শাওনের হাত মায়ার পিঠের ওপর দিয়ে নেমে এসে তার শাড়ির আঁচল সরিয়ে দিল।
শাওনের তৃষ্ণার্ত ঠোঁট মায়ার ঠোঁট থেকে নেমে এল তার গালে, থুতনিতে এবং উন্মুক্ত গলায়। শাওন মায়ার গলার স্পর্শকাতর জায়গায় আলতো করে চুমু দিয়ে ফিসফিস করে বলল, "আমাকে ক্ষমা করে দাও মায়া... আমাকে এই ৩ বছরের সাজা থেকে মুক্তি দাও।"
"আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যাব না শাওন... কখনো না," মায়া শিউরে উঠে শাওনের চুল শক্ত করে চেপে ধরল।
শাওন মায়াকে কোল থেকে তুলে নিয়ে কেবিনের ভেতরে থাকা ছোট্ট প্রাইভেট রেস্টরুমের সোফায় শুইয়ে দিল। কেবিনের মৃদু আলোয় দুই তৃষ্ণার্ত প্রেমিক-প্রেমিকা তাদের সব বাধা ভেঙে এক হয়ে যেতে লাগল। শাওনের হাত মায়ার সুতির ব্লাউজের হুকগুলো একে একে খুলে ফেলল। মায়ার খোলা বুকের ওপর শাওনের হাতের গরম স্পর্শ আর তৃষ্ণার্ত ঠোঁটের উষ্ণতা এক আদিম কামনার আগুন জ্বেলে দিল।
মায়াও নিজের সব সংকোচ ভুলে শাওনের টি-শার্টটা টেনে খুলে ফেলল। শাওনের চওড়া, সুগঠিত বুকে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল সে। ৩ বছরের দূরত্ব যেন এক ঘণ্টার ঝোড়ো কামনায় ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাচ্ছিল। সোফার ওপর দুই বিবস্ত্রপ্রায় শরীর একে অপরের প্রেমে, কামনায় আর আকুতিতে একাকার হয়ে গেল। তাদের ঘন নিশ্বাস আর তৃপ্তির অস্ফুট শব্দে বন্ধ ঘরটা এক অন্যরকম নেশায় ভরে উঠল।
কয়েক ঘণ্টা পর...
মায়া শাওনের খালি বুকের ওপর মাথা রেখে শুয়ে ছিল। শাওন তার আঙুল দিয়ে মায়ার শাড়িমুক্ত পিঠে আঁকিবুঁকি কাটছিল। পরিবেশটা ছিল পরম শান্ত ও তৃপ্তিময়।
মায়া শাওনের বুকের লোমে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, "এখন আমরা কী করব শাওন? চৌধুরী সাহেবরা তো আবার হুমকি দিচ্ছে।"
শাওন মায়ার কপালে এক দীর্ঘ চুমু একে দিল। তার চোখে তখন ভালোবাসার পাশাপাশি এক কঠিন প্রতিজ্ঞার ছাপ।
সে ঘরের কোণে রাখা নিজের ব্যাগ থেকে সেই পুরোনো, মলিন ডায়েরিটা বের করল। ডায়েরির ভেতরের কিছু পাতার মাঝে লুকিয়ে রাখা একটা ছোট পেনড্রাইভ মায়ার হাতে দিয়ে বলল:
"৩ বছর ধরে আমি শুধু কষ্টই পাইনি মায়া, আমি ওদের ধ্বংসের প্রমাণও জোগাড় করেছি। এই ডায়েরিতে আর পেনড্রাইভে চৌধুরী সাহেবের সব অবৈধ ব্যবসা, ব্ল্যাকমেইল আর বাবাকে ধ্বংস করার যাবতীয় নথিপত্র আছে। আমি এতদিন সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম।"
মায়া পেনড্রাইভটার দিকে তাকাল। শাওন মায়ার চিবুকটা উঁচিয়ে ধরে গভীর ভালোবাসায় বলল, "কাল সকালে এই ফাইলগুলো র্যাব আর দুদকের কাছে জমা হবে। কিন্তু তার আগে আমাদের কাল রাতের মধ্যে এই শহর ছাড়তে হবে, যতক্ষণ না পুলিশ ওদের গ্রেপ্তার করে।"
মায়া শাওনের ঠোঁটে আলতো একটা চুমু দিয়ে বলল, "আমি তোমার সাথে পৃথিবীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত যেতে রাজি আছি শাওন।"
কিন্তু তারা জানত না, কেবিনের বাইরে ততক্ষণে চৌধুরীর লোকজনের কালো ছায়া ঘনীভূত হতে শুরু করেছে।
ঢাকার আকাশে তখন কালবৈশাখীর ঘন মেঘ জমেছে। বিকেল হতেই চারপাশ অন্ধকারে ঢেকে গেল। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির সাথে তীব্র হাওয়া বইছে। শাওনের কেবিন থেকে বের হয়ে তারা দুজনে সোজা শাওনের ধানমন্ডির ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। পরিকল্পনা স্পষ্ট—অফিসের গোপনীয় নথি ও পেনড্রাইভের ক্লাউড ব্যাকআপ নিয়ে তারা আজ রাতেই চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হবে এবং সেখান থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সব প্রমাণ জমা দেবে।
গাড়িতে বসে মায়া শাওনের হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেছিল। ৩ বছরের সব ভুল বোঝাবুঝি দূর হওয়ার পর তাদের সম্পর্কের উত্তাপ আর গভীরতা যেন হাজার গুণ বেড়ে গেছে। শাওন এক হাতে ড্রাইভিং করছিল, আর অন্য হাত দিয়ে মায়ার আঙুলগুলো নিজের হাতের শক্ত বাঁধনে আটকে রেখেছিল।
"ভয় পাচ্ছ মায়া?" শাওন হালকা হেসে মায়ার দিকে তাকাল।
"তোমার পাশে থাকলে আমার কোনো ভয় নেই শাওন," মায়া শাওনের কাঁধে মাথা রাখল। "শুধু ভাবছি, এই ৩টে বছর আমরা কতটা সময় নষ্ট করেছি।"
"আর কোনো সময় নষ্ট হবে না," শাওন মায়ার কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল, "কালকের পর থেকে আমাদের জীবনে শুধুই শান্তি থাকবে।"
রাত আটটা নাগাদ তারা শাওনের ফ্ল্যাটে পৌঁছাল। সাততলার এই ফ্ল্যাটটিতে শাওন একা থাকে। তিন বছর ধরে ঘরের প্রতিটি কোণ মায়ার স্মৃতির অলঙ্করণে সাজানো। ঘরে ঢুকেই মায়া দেখল—দেওয়ালে ঝুলছে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের হাসিমুখের ছবিগুলো। শাওন কোনোদিন সেই ছবিগুলো সরায়নি।
মায়ার চোখ দিয়ে আবার জল গড়িয়ে পড়ল। সে শাওনের দিকে ফিরতেই শাওন তাকে এক টানে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল।
ঝড়ের রাতে ঘরের জানালার কাচে বৃষ্টির তুমুল শব্দ। ড্রয়িংরুমের আবছা আলোয় দুজনের চোখ আবার একে অপরের গভীরে হারিয়ে গেল। শাওন মায়ার ঠোঁটে নিজের তৃষ্ণার্ত ঠোঁট চেপে ধরল। এবার সেই চুমুতে ছিল এক পরম প্রাপ্তির আনন্দ, এক তীব্র শিহরণ।
শাওন মায়াকে কোল পাঁজা করে তুলে নিয়ে সোজা বেডরুমে নিয়ে গেল। মায়াকে নরম তোষকের ওপর শুইয়ে দিয়ে সে নিজেও মায়ার ওপর নেমে এল। শাওনের ওজন, তার খালি বুকের উত্তাপ আর ভারী নিঃশ্বাস মায়াকে নেশাগ্রস্ত করে তুলল। মায়া নিজের দু-হাত দিয়ে শাওনের পিঠ জড়িয়ে ধরে তাকে আরও কাছে টেনে নিল।
শাওনের হাত মায়ার শাড়ির ভাজ খুলে একে একে তার শাড়ি, ব্লাউজ সরাতে লাগল। অন্ধকারে তাদের উন্মুক্ত শরীর দুটো এক আদিম অগ্নিশিখায় পুড়তে লাগল। শাওন মায়ার নাভিতে, পেটে আর উরুতে নিজের তৃষ্ণার্ত ঠোঁটের ছাপ রেখে যেতে লাগল। মায়ার অস্ফুট কোঁকানি আর কামনার আকুতি ঘরের নীরবতাকে চুরমার করে দিল। তারা দুজনে একে অপরের উত্তাপে গলে গিয়ে ৩ বছরের সব বঞ্চনার হিসাব এক চূড়ান্ত, উগ্র মিলন দিয়ে চুকিয়ে দিতে লাগল।
ঠিক যখন তারা পরম তৃপ্তির চূড়ায় পৌঁছে একে অপরকে জড়িয়ে শুয়ে শান্ত হচ্ছিল, হঠাৎ করেই ড্রয়িং রুমের দিক থেকে কাচ ভাঙার বিকট শব্দ হলো!
শাওন এক মুহূর্তে সতর্ক হয়ে উঠল। মায়াও আতঙ্কে শিউরে উঠে বিছানার চাদরটা বুক পর্যন্ত টেনে নিল।
"শাওন... কিসের শব্দ এটা?" মায়া ফিসফিস করে বলল।
"তুমি এখানে চুপচাপ থাকো মায়া, একদম বের হবে না," শাওন দ্রুত ট্রাউজার আর টি-শার্টটা গায়ে চড়িয়ে নিল। তার চোখ দুটো আবার হিংস্র হয়ে উঠল।
শাওন ঘর থেকে বের হয়ে ড্রয়িং রুমে যেতেই দেখল, বারান্দার কাচের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকেছে তিনজন সশস্ত্র লোক। পরনে কালো পোশাক, হাতে দেশীয় পিস্তল আর ধারালো রামদা। তাদের পেছনে হেঁটে এল এক মাঝবয়সী লোক—চৌধুরী সাহেবের একমাত্র ছেলে আর তার ডানহাত, আরমান।
"অনেক বড় খেলা খেলে ফেলেছ, ইঞ্জিনিয়ার শাওন," আরমান কুৎসিত হেসে বলল। "ভেবেছিলে প্রমাণ নিয়ে পালাবে? চৌধুরী সাহেবের হাত এত ছোট নয়।"
"আরমান!" শাওন দাঁতে দাঁত চেপে গজরে উঠল। "আমার ঘরে ঢোকার সাহস কী করে হলো তোর? পুলিশকে জানানোর আগেই এখান থেকে কেটে পড়!"
"পুলিশ?" আরমান তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। "পুলিশ আসার আগেই তোদের লাশ বুড়িগঙ্গায় ভেসে যাবে। দে, ডায়েরি আর পেনড্রাইভটা সোজা আমার হাতে দে।"
ঠিক তখনই মায়া অস্থির হয়ে বেডরুম থেকে বাইরে বেরিয়ে এল। তাকে দেখেই আরমানের চোখে এক হিংস্র কামনার নজর ভেসে উঠল।
"বাহ্! মায়া ম্যাডামও আছেন দেখছি!" আরমান মায়ার দিকে এগোতে চাইল, "এক ঢিলে দুই পাখি। পেনড্রাইভও পাব, আর ম্যাডামকেও আজকে রাতে একটু ভোগ করা যাবে..."
"তোর এত বড় সাহস!" শাওন বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল আরমানের ওপর।
শাওনের সজোড়ে এক ঘুুষিতে আরমানের নাক ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ল। আরমানের সাথে থাকা গুন্ডারা সাথে সাথে শাওনের ওপর চড়াও হলো। শুরু হলো এক অসম, ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ।
শাওন একাই তিনজনের সাথে লড়াই করছিল। তার চওড়া শরীরের শক্তিতে সে দুজনকে একাই ছুড়ে ফেলে দিল। কিন্তু একজন গুন্ডা পেছন থেকে শাওনের পিঠে চেয়ার দিয়ে সজোড়ে আঘাত করল। শাওন মাটিতে হাঁটু গেড়ে পড়ে গেল।
"শাওন!" মায়া চিৎকার করে উঠে এগিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু আরমান চুল ধরে মায়াকে চেপে ধরল।
"ছাড়ুন আমাকে! জানোয়ারের দল!" মায়া ছটফট করতে লাগল।
আরমান মায়ার গালে এক চড় মারল। মায়ার ঠোঁটের কোণ কেটে রক্ত বের হয়ে এল।
নিজের চোখের সামনে মায়াকে আঘাত পেতে দেখে শাওন যেন মানুষ থেকে পশুরে রূপ নিল। যন্ত্রণাকে উবে দিয়ে সে হিংস্র গর্জন করে উঠে দাঁড়াল। টেবিলের ওপর থাকা ভারী কাচের শোপিসটা তুলে নিয়ে সে এক গুন্ডার মাথায় বসিয়ে দিল। লোকটা রক্তভেজা অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। অন্য গুন্ডার হাত থেকে রড কেড়ে নিয়ে সে তার পায়ে সজোড়ে আঘাত করল।
শাওন রক্তাক্ত অবস্থায় আরমানের দিকে এগোতে লাগল। তার চোখে তখন শুধুই মৃত্যুর পরোয়ানা।
আরমান ভয় পেয়ে মায়াকে নিজের সামনে ঢাল বানিয়ে পকেট থেকে পিস্তল বের করল। "এক পা এগোলে মায়াকে এখানেই শেষ করে দেব শাওন!"
শাওন থমকে দাঁড়াল। তার পিঠ দিয়ে, কপাল দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু তার দৃষ্টি মায়ার দিকে।
মায়া আরমানের হাতের নখ দিয়ে আঁচড় কেটে দিল এবং পিছন থেকে আরমানের পায়ে সজোড়ে এক লাথি মারল। আরমান ভারসাম্য হারিয়ে মায়াকে ছেড়ে দিল।
সেই সুযোগে শাওন ঝাঁপিয়ে পড়ল আরমানের ওপর। দুজনে মাটিতে গড়াি দিতে লাগল। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে রিভলভার থেকে বিকট শব্দে গুলি ফুটল—
ঠাঁই!
পুরো ঘর এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
মায়া আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল, "শাওন!"
বারান্দা দিয়ে ঝোড়ো বাতাস আর বৃষ্টির ছাট ভেতরে আসছে। ঘরের মাঝখানে রক্তের দাগ। গুলিটা কার গায়ে লেগেছে? শাওন নাকি আরমান?
রক্তাক্ত মেঝের ওপর বিকট গুলির শব্দটা যেন এক অনন্তকালের মতো স্তব্ধ করে দিল পুরো ঘরকে। মায়ার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল, কণ্ঠনালী শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। মায়া চিৎকার করে উঠতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।
ধোঁয়ার হালকা আস্তরণ কাটতেই দেখা গেল, রিভলভারটি তখনও আরমানের হাতে শক্ত করে ধরা, কিন্তু তার চোখ দুটো স্থির ও ভয়ার্ত। পিস্তলের নলটা কোনোমতে দিক হারিয়ে ঘরের ছাদের কাচ ফুড়ে গেছে। কিন্তু শাওনের চেহারায় চরম হিংস্রতা—সে আরমানকে নড়াচড়া করার কোনো সুযোগ না দিয়ে সোজা তার বুকের ওপর চেপে বসল। শাওনের রক্তাক্ত ডান হাতের এক মারাত্মক কনুইয়ের আঘাতে আরমানের চিবুক ভেঙে গেল। পিস্তলটা ছিটকে চলে গেল অনেক দূরে।
"আমার মায়াকে ছোঁয়ার খেসারত তোকে দিতেই হতো," শাওন হঁপাচ্ছিল। সে আরমানের পেটে ও মুখে একের পর এক ঘুষি মেরে তাকে সম্পূর্ণ অচেতন করে দিল।
অন্য গুন্ডারা ততক্ষণে যন্ত্রণায় কোঁকাতে কোঁকাতে ঘর ছেড়ে পালানোর পথ খুঁজছিল। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
বাইরে থেকে ভারী বুটের শব্দ আর সাইরেনের আওয়াজ ভেসে এল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ও র্যাবের একটি স্পেশাল টিম ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল। মায়া আর শাওন যখন ঘর থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন মায়া আগেই নিজের মোবাইল থেকে জরুরি ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে লাইভ ট্র্যাকিং মেসেজ পাঠিয়ে দিয়েছিল।
পুলিশ অফিসার আরমান আর তার সাঙ্গোপাঙ্গদের গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেলেন। শাওন তার পকেট থেকে ডায়েরি আর সেই বহু প্রতীক্ষিত পেনড্রাইভটি অফিসারের হাতে তুলে দিল।
"ইঞ্জিনিয়ার শাওন, এই তথ্যগুলোর জন্য ধন্যবাদ। চৌধুরী গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের অবৈধ সাম্রাজ্য আর ব্ল্যাকমেইলিংয়ের বিরুদ্ধে এটিই হবে সবচেয়ে বড় অস্ত্র। কাল সকালেই চৌধুরী সাহেবকে গ্রেপ্তার করা হবে," পুলিশ অফিসার শাওনের হাত শক্ত করে চেপে ধরে আশ্বাস দিলেন।
পুলিশ চলে যাওয়ার পর ঘর জুড়ে এক গভীর নীরবতা নেমে এল। ঝোড়ো হাওয়া থেমে গিয়ে বাইরে তখন মিষ্টি বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ।
মায়া আর সহ্য করতে পারল না। সে দৌড়ে গিয়ে শাওনের রক্তাক্ত শরীরটাকে নিজের বাহুডোরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। শাওনের কপাল, পিঠ আর কানের পাশ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। মায়া নিজের পরনের ওড়না ছিঁড়ে তা দিয়ে শাওনের ক্ষতে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করতে করতে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
"কেন এত ঝুঁকি নাও শাওন? যদি আজ তোমার কিছু হয়ে যেত? আমি কী নিয়ে বাঁচতাম বলো?" মায়ার চোখের জলে শাওনের বুকের রক্ত ধুয়ে যাচ্ছিল।
শাওন মায়ার থরথর করে কাঁপা মুখটা দু-হাতে তুলে ধরল। তার চোখের গহীনে এতদিনের জমে থাকা সব ভয় আর ক্লান্তি দূর হয়ে নেমে এসেছিল এক পরম শান্তির দীপ্তি। শাওন মায়ার ঠোঁটের কাটাদাগে আলতো করে নিজের অঙ্গুলি স্পর্শ করল।
"আমার কিছু হতে পারে না মায়া," শাওন নিচু, ভালোবাসায় ভরা গলায় বলল। "যে মানুষের প্রতি মুহূর্তে মায়ার মতো একটা আগলে রাখা ভালোবাসা থাকে, তাকে মৃত্যুও ছুঁতে পারে না। ৩ বছর ধরে আমি তো মৃতই ছিলাম... আজ তোমার বুকে ফিরে এসে আমি আবার নতুন করে জীবন পেলাম।"
মায়া আর কোনো কথা বলল না। সে নিজের ঠোঁট দুটো শাওনের ঠোঁটের ওপর সঁপে দিল। এবারের চুম্বন কোনো তাচ্ছিল্য বা প্রতিশোধের ছিল না; সে এক চিরন্তন অঙ্গীকার, যেখানে দুটি হৃদয় এক হয়ে গেছে সব বাধার দেয়াল টপকে।
শাওন মায়াকে কোলে তুলে নিয়ে বাথরুমের শাওয়ারের নিচে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাল। ঠান্ডা জলের ধারা তাদের দুজনকেই ভিজিয়ে দিতে লাগল। জলের ছাঁটে রক্ত আর কষ্টের সব চিহ্ন ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল।
শাওনের তৃষ্ণার্ত হাত মায়ার ভেজা সুতির জামা সরাতে লাগল। শাওয়ারের নিচে দুই ভেজা শরীর এক পরম কামনায় ও উষ্ণতায় আবার একে অপরের ভেতরে হারিয়ে গেল। শাওন মায়ার ঘাড়, পিঠ ও উন্মুক্ত বুকে নিজের ঠোঁটের গভীর কামড় আর চুমু দিয়ে তার ভালোবাসার পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত করল। মায়াও নিজের দু-হাত দিয়ে শাওনের চওড়া পিঠ আঁকড়ে ধরে তার পুরুষালি উত্তাপ নিংড়ে নিল। পানির ঝরঝর শব্দের সাথে মিশে গেল দুজন তৃপ্ত প্রেমিকের গভীর নিঃশ্বাসের শব্দ।
ছয় মাস পর...
কক্সবাজারের সেই প্রাইভেট ভিলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে মায়া। পরনে তার হালকা গোলাপি রঙের জামদানি শাড়ি, চুলে তাজা বকুল ফুলের মালা। সূর্যাস্তের লালচে আলো এসে পড়েছে তার স্নিগ্ধ চেহারায়।
চৌধুরী সাহেব আর তার ছেলে আরমানের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। তাদের অবৈধ সাম্রাজ্য পুরো গুঁড়িয়ে গেছে। শাওনের বাবা তার সম্মান আর হারানো ফার্ম ফেরত পেয়েছেন। কিন্তু সবকিছুর চেয়ে বড় কথা—শাওন আর মায়া আজ এক সূত্রে বাঁধা।
পেছন থেকে এসে দুটি শক্ত হাত মায়ার কোমর জড়িয়ে ধরল। শাওন নিজের থুতনিটা মায়ার কাঁধে রাখল। তার পরনে সাদা কুর্তা। শাওনের মুখের গরম নিঃশ্বাস মায়ার ঘাড়ে লাগতেই মায়া মিষ্টি করে হেসে পেছনে তাকাল।
"কী দেখছ মায়া?" শাওন মায়ার কানের লতিতে আলতো কামড় দিয়ে ফিসফিস করে বলল।
"দেখছি কীভাবে একটা মিথ্যা আমার জীবনকে নরক বানিয়েছিল, আর সেই মিথ্যার পেছনের সত্যটা আমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী নারী বানিয়ে দিল," মায়া ঘুরে দাঁড়িয়ে শাওনের গলায় নিজের হাত দুটো জড়িয়ে দিল।
শাওন মায়ার নাভিতে এক হাত চেপে ধরে তাকে নিজের শরীরের সাথে আরও শক্ত করে সেঁটে নিল। তার চোখে এক চঞ্চল, প্রলোভনময় হাসি ফুটে উঠল।
"তবে এবার কিন্তু আর কোনো মিথ্যে নয়, মায়া। বাকিটা জীবন শুধু সত্য ভালোবাসাই থাকবে... আর প্রতিদিনের এই মধুর উম্মাদনা," শাওন গভীর দৃষ্টিতে মায়ার ঠোঁটের দিকে তাকাল।
"আমি চিরকাল তোমার এই উন্মাদনার বন্দি হয়ে থাকতে চাই শাওন," মায়া চোখ বন্ধ
করে বলল।
সমুদ্রের ঢেউগুলো পাড়ে আছড়ে পড়ছিল, আর ব্যালকনির কোণে সূর্যাস্তের রঙিন আলোয় শাওন ও মায়া ডুবে গেল এক চিরন্তন, গভীর ও পরম ভালোবাসার চুমুতে। ভালোবাসা জয়ী হলো, মিটে গেল সব দূরত্বের হিসাব।
....