রাত সাড়ে এগারোটা। ধানমন্ডির লেকের পাড়ে রাতের হাওয়া যখন মেহগনি গাছের পাতায় মড়মড় শব্দ তুলে ভেসে যাচ্ছিল, তাসনিম তখন তার ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে ছিল। আর্কিটেকচার ফার্মের টানা তেরো ঘণ্টার ক্লান্তি তার দুই চোখের নিচে কালি ফেলে দিয়েছে। কাজের বাইরে তাসনিমের নিজস্ব একটা শান্ত পৃথিবী ছিল, যা সে কাউকে সহজে ছুঁতে দিত না। পুরান ঢাকার সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে হলেও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর অদম্য ইচ্ছে তাকে আজকের এই স্বাধীন জীবনে নিয়ে এসেছে।
"এত রাতে একা বসে কাজ করা কি খুব জরুরি?"
একটি গভীর, খাদে নামা কণ্ঠস্বর তাসনিমের ভাবনার রেশ কেটে দিল। তাসনিম চমকে উঠে মুখ তুলতেই তার দৃষ্টি গিয়ে আটকালো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটির ওপর। দীর্ঘকায়, সুগঠিত দেহ, পরনে গাঢ় নীল রঙের একটি হালকা শার্ট আর কালো ট্রাউজার্স। শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, আর সেখান থেকে তার হাতের পেশির সুঠাম গঠন স্পষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছিল। লোকটির মুখে এক ধরনের রহস্যময় স্থিরতা, যা তাসনিম আগে কখনো কোনো পুরুষের চেহারায় দেখেনি।
"আপনি কে? আর এভাবে হুট করে সামনে এসে কথা বলছেন কেন?" তাসনিম নিজের কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব শক্ত করার চেষ্টা করে বলল, যদিও তার বুকের ভেতর অকারণ এক ধুকপুকানি শুরু হয়ে গিয়েছিল।
লোকটি মৃদু হাসল। সেই হাসিতে কোনো চঞ্চলতা ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত আকর্ষণ। সে কয়েক ধাপ এগিয়ে এসে তাসনিমের বেঞ্চের পাশে দাঁড়াল। রাতের আবছা আলোতেও তাসনিম দেখতে পেল লোকটির চোখে তীক্ষ্ণ এক গভীরতা, যেন সে নিমেষেই মানুষের মনের সব চিন্তা পড়ে ফেলতে পারে।
"আমি রাফসান। আর আপনাকে এই কয়েক দিন ধরে এই একই সময়ে এখানে কাজ করতে দেখছি। একা একটা মেয়ের পক্ষে এত রাতে এই জায়গাটা খুব একটা নিরাপদ নয়, তাই ভাবলাম এসে একটু দেখা করি।"
রাফসানের কণ্ঠের ভরাট সুর তাসনিমের কানে যেন এক অদ্ভুত আবেশ তৈরি করল। সাধারণত অচেনা পুরুষদের তাসনিম কঠোর ভাষায় ফিরিয়ে দেয়, কিন্তু এই লোকটির কণ্ঠের জাদু আর তার চেহারার গাম্ভীর্য তাসনিমকে কেমন যেন শক্ত করে ফেলল।
"আমার নিরাপত্তার চিন্তা আপনাকে করতে হবে না," তাসনিম ল্যাপটপ বন্ধ করতে করতে বলল। "আমি নিজেকে সামলাতে পারি।"
"আমি জানি আপনি পারেন," রাফসান নিচু গলায় বলল। সে একটু ঝুঁকে তাসনিমের টেবিলের ওপর নিজের এক হাত রাখল। তার শরীরের সুবাস—কাঠ ও হালকা তামাকের সুগন্ধ মিশ্রিত এক বুনো আবেশ—তাসনিমের নাকে এসে ধাক্কা দিল। "কিন্তু মাঝেমধ্যে অন্য কাউকে আগলে রাখতে দিলে ক্ষতি কী?"
তাসনিম উঠে দাঁড়াল। রাফসান তার এত কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছিল যে তাদের দুজনের মধ্যবর্তী দূরত্ব ছিল নামমাত্র। তাসনিমের নিঃশ্বাস আটকে আসার উপক্রম হলো। রাফসানের গাঢ় চোখের দৃষ্টি তাসনিমের ঠোঁটে গিয়ে থমকে দাঁড়াল, তারপর ধীরে ধীরে তার চোখের দিকে তাকাল। সেই চাহনিতে এত তীব্র এক তৃষ্ণা আর উষ্ণতা ছিল যে তাসনিমের শরীরের প্রতিটি রোমকূপ শিউরে উঠল।
"আপনি বড্ড বেশি কথা বলেন," তাসনিম কাঁপাকাঁপা গলায় বলল।
"আর আপনি বড্ড বেশি নিজেকে গুটিয়ে রাখেন," রাফসান ফিসফিস করে বলল। তার হাতের একটি আঙুল আলতো করে তাসনিমের গালের ওপর থেকে উড়ে আসা চুলগুলোকে সরাতে সরাতে গিয়ে ঠেকলো তার কানের লতিতে। রাফসানের আঙুলের স্পর্শ ছিল তীব্র উষ্ণ। সেই ছোঁয়ায় তাসনিমের মেরুদণ্ড বেয়ে যেন বিদ্যুতের তরঙ্গ খেলে গেল। সে পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু তার পা দুটো যেন মাটিতে আটকে গেছে।
রাফসান তার কাছাকাছি সরে এলো আরও একধাপ। তাসনিমের বুকের ওঠানামা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। রাফসান তার এক হাত তাসনিমের কোমরের পেছনের নরম বাঁকে রাখল। কাপড়ের ওপর দিয়েই সেই স্পর্শের তাপ তাসনিমের রক্তে আগুন জ্বালিয়ে দিল। তাসনিম নিজের অজান্তেই রাফসানের শার্টের কলারটা শক্ত করে চেপে ধরল।
"রাফসান..." তাসনিমের গলা দিয়ে কেবল একটা মৃদু নিঃশ্বাসের শব্দ বের হলো।
"জি, তাসনিম?" রাফসানের ঠোঁট তখন তাসনিমের কানের কাছে। তার তপ্ত নিঃশ্বাস তাসনিমের ঘাড়ের ত্বকে আছড়ে পড়ছিল। "তুমি কি ভয় পাচ্ছ?"
"না..." তাসনিম মিথ্যা বলল। সে ভয় পাচ্ছিল না, বরং নিজের ভেতরের এক অজানা কামনার উন্মেষ দেখে শংকিত হচ্ছিল।
রাফসান তার অন্য হাত দিয়ে তাসনিমের থুতনিটা সামান্য উঁচিয়ে ধরল। রাতের অন্ধকারে তাদের দুজনের ছায়া এক হয়ে গেল। রাফসানের ঠোঁট এসে স্পর্শ করল তাসনিমের ঠোঁটের ঠিক কোণে—অত্যন্ত আলতো, অথচ তীব্র গভীর সেই স্পর্শ। তাসনিম চোখ বন্ধ করে ফেলল। এক নিমেষে যেন চারপাশের পৃথিবীর শব্দ বিলীন হয়ে গেল, রয়ে গেল শুধু রাফসানের বুকের ঢিপঢিপ শব্দ আর তাসনিমের হৃদস্পন্দন।
রাফসান কিন্তু সীমান্ত অতিক্রম করল না। সে ঠোঁট সরিয়ে নিয়ে তাসনিমের কপালে নিজের মাথা ঠেকালো। তার গভীর চোখের আলোয় তাসনিম পুরোপুরি হারিয়ে গেল।
"আজ বাড়ি যাও," রাফসান নিচু, ভারী গলায় বলল। "অনেক রাত হয়েছে।"
তাসনিম যেন স্বপ্নের ঘোর থেকে জেগে উঠল। সে নিজের ব্যাগটা গুছিয়ে নিয়ে এক মুহূর্ত রাফসানের দিকে তাকাল। রাফসানের চোখে এখনো সেই নেশা ধরানো দৃষ্টি, যা যেকোনো নারীকে পুরোপুরি নিঃশেষ করে দিতে পারে। তাসনিম আর কোনো কথা না বলে নিজের গাড়ির দিকে হেঁটে গেল। গাড়িতে উঠে সে আয়নায় নিজের ফ্যাকাশে আর রসে ভরা ঠোঁট দুটো দেখল—যেখানে রাফসানের স্পর্শ এখনো জ্বালাময় অনুভূতির মতো লেগে আছে।
কিন্তু তাসনিম জানত না, এই মোহময় অভিজ্ঞতার আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে অন্ধকার এক সত্য। গাড়িটা স্টার্ট নিয়ে দূরে চলে যেতেই, ধানমন্ডির লেকের সেই অন্ধকার মেহগনি গাছের আড়াল থেকে রাফসান একটা ফোন বের করল। তার চোখের সেই মিষ্টি উষ্ণতা নিমেষেই মিলিয়ে গিয়ে সেখানে ভেসে উঠল হিমশীতল কঠোরতা।
"কাজ শুরু হয়ে গেছে," ফোনে শান্ত গলায় বলল রাফসান। "ও আমাকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। মূল পরিকল্পনার প্রথম ধাপ সফল।"
ওপাশ থেকে কোনো এক ভারী কণ্ঠস্বর কী যেন বলল, রাফসান নিঃশব্দে হাসল। সেই হাসিতে কোনো প্রেম ছিল না, ছিল এক কঠিন জয়ের গন্ধ। তাসনিমকে ঘিরে যে জাল সে বুনতে শুরু করেছে, তার শেষ কোথায়, তা রাফসান নিজেও জানে না—বা হয়তো জানে, আর সেটাই এই নীরব রাতের সবচেয়ে বড় রহস্য।
তাসনিম যখন নিজের ঘরে ফিরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে রাফসানের স্পর্শের উষ্ণতা মনে করে ছটফট করছিল, তখন সে ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি—তার জীবনের ধ্বংস বা নতুন অধ্যায়ের সূচনা, দুটোই এই রহস্যময় পুরুষটির হাতে লেখা হতে চলেছে।
ধানমন্ডির রাতের সেই ঘোরের পর থেকে তাসনিমের মনে কোনো কাজের মনযোগ ছিল না। ল্যাপটপের ড্রয়িং বোর্ডে একের পর এক স্কেচ মুছে যাচ্ছিল, কিন্তু চোখের সামনে ভাসছিল কেবল রাফসানের সেই গাঢ় চোখের দৃষ্টি আর ত্বকে লেগে থাকা তার হাত ও ঠোঁটের তীব্র উত্তাপ। তাসনিম নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল—ওটা ছিল স্রেফ একটা সাময়িক আবেগ, এক অচেনা পুরুষের মোহাচ্ছন্ন করার ক্ষমতা। কিন্তু হৃদয়ের গভীরে সে খুব ভালো করেই জানত, রাফসান তার রক্তে এমন এক তৃষ্ণা জাগিয়ে দিয়েছে, যা আগে কেউ পারেনি।
পরদিন সন্ধ্যায় অফিসে কাজের চাপ কম ছিল। তাসনিম নিজের অজান্তেই আবার সেই লেকের পাড়ে গিয়ে বসল। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। শ্রাবণের এই ছাদখোলা বর্ষায় চারপাশ এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ডুবে গেছে। তাসনিম ছাতা না খুলে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করছিল। কার জন্য? তা সে মুখে স্বীকার না করলেও বুক চাপা উত্তেজনায় স্পষ্ট হচ্ছিল।
"বৃষ্টিতে ভিজলে ঠান্ডা লেগে যাবে তো, সুন্দরী।"
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই একটা শক্ত, চওড়া ছাতা তাসনিমের মাথার ওপর মেলে ধরা হলো। সঙ্গে সঙ্গে সেই চেনা বুনো সুবাস—কাঠ আর হালকা তামাকের সুগন্ধ। তাসনিম মুখ তুলতেই দেখল রাফসানকে। আজ তার পরনে কালো কালারের টি-শার্ট, বৃষ্টির পানিতে ভিজে টি-শার্টটি তার বুক ও চওড়া কাঁধের সাথে চিপকে লেগে আছে। গায়ের সুগঠিত পেশির প্রতিটি ভাঁজ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
"আপনি আবার এলেন?" তাসনিম নিজের চোখ দুটোকে রাফসানের শরীর থেকে সরিয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল।
"তোমার কাছে আসার আকর্ষণ আমি এড়াতে পারি না, তাসনিম," রাফসান একদম গা ঘেঁষে বেঞ্চে বসে পড়ল।
ছাতার নিচে জায়গাটা খুব ছোট ছিল। দুজনের শরীর প্রায় একে অপরের ওপর আছড়ে পড়ছিল। রাফসানের শরীরের প্রবল উষ্ণতা বৃষ্টির আর্দ্রতাকে হটিয়ে তাসনিমের শরীরে এক অদ্ভুত আগুন জ্বেলে দিল।
"আপনি আমার নাম জানলেন কীভাবে?" তাসনিম চমকে উঠে জিজ্ঞেস করল। প্রথম দিন তো সে নিজের নাম বলেনি!
রাফসান এক পশলা রহস্যময় হাসি হাসল। সে তাসনিমের কানের কাছে মাথা নামিয়ে আনল। তার আর্দ্র ঠোঁটের স্পর্শ কানের লতিতে পেতেই তাসনিম শিউরে উঠল, তার হাত থেকে ছাতার বাঁটটা শিথিল হয়ে যেতে চাইল।
"তোমার মতো রূপসী আর ধারালো মেধার আর্কিটেক্টকে চেনা কি খুব কঠিন?" রাফসান ফিসফিস করে বলল। "আমি তোমার ব্যাপারে সব জানতে চাই, তাসনিম। তোমার প্রতিটা নিঃশ্বাস, তোমার স্পর্শের প্রতিটা তৃষ্ণা—সব আমার জানা চাই।"
"আপনি... আপনি বড্ড বিপজ্জনক," তাসনিম বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল, কিন্তু রাফসানের হাত ইতিমধ্যেই তাসনিমের খোলা ভেজা পিঠে উঠে এসেছে।
সুতির কামিজটা বৃষ্টির পানিতে ভিজে তাসনিমের পিঠের সাথে লেপ্টে ছিল। রাফসানের গরম হাতের তালু যখনই সেই ভেজা কাপড়ের ওপর দিয়ে তাসনিমের মেরুদণ্ড ছুঁয়ে নিচে নেমে গেল, তাসনিমের মুখ দিয়ে একটা হালকা গোঙানির শব্দ বের হয়ে এলো।
"বিপজ্জনক?" রাফসান তার অন্য হাত দিয়ে তাসনিমের কোমর চেপে ধরে তাকে একদম নিজের বুকের সাথে পিষে ফেলল। "ভয় পাচ্ছ আমাকে?"
"না..." তাসনিম রাফসানের টি-শার্ট শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরল। তার বুকের তীব্র ধুকপুকানি রাফসানের শক্ত ছাতি স্পর্শ করছিল। "আমি আপনাকে জানতে চাই, রাফসান। আপনার অতীত, আপনার পরিবার, আপনার কাজ... কিছুই তো জানি না।"
রাফসানের চোখে এক মুহূর্তের জন্য যেন হিমশীতল একটা ছায়া নেমে এলো। কিন্তু পরক্ষণেই সেই ছায়া ঢেকে গেল এক অবিশ্বাস্য যৌন আকর্ষণ আর কামনার আগুনে।
"আমার অতীত বলে কিছু নেই, তাসনিম। আমার বর্তমান আর ভবিষ্যৎ—সবই এখন তোমার ঠোঁটের স্পর্শে আটকে আছে," এই বলেই রাফসান আর কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না।
সে পরম আবেশে তাসনিমের ঠোঁট জোড়া নিজের ঠোঁটের বন্ধনে কষে পিষে ধরল। ভেজা বৃষ্টির মধ্যে সেই চুম্বন ছিল তীব্র, অনিয়ন্ত্রিত এবং বিধ্বংসী গভীর। তাসনিম নিজের সমস্ত প্রতিরোধ হারিয়ে রাফসানের গলায় হাত পেঁচিয়ে তাকে আরও কাছে টেনে নিল। রাফসানের এক হাত তাসনিমের চুলের শক্ত খোঁপাটা খুলে দিল, লম্বা ঘন চুলগুলো বৃষ্টির সাথে তাসনিমের কাঁধে আর পিঠে ছড়িয়ে পড়ল।
রাফসানের ঠোঁট তাসনিমের ঠোঁট থেকে নেমে এলো তার চিবুকে, তারপর ভেজা ঘাড় আর গলার ওপর জমে থাকা বৃষ্টির ফোঁটাগুলোকে চুমুতে চুমুতে চুষে নিতে লাগল। তাসনিম উন্মাদ হয়ে উঠছিল। এই পুরুষটি তাকে কোনো এক অজানা জগতে নিয়ে যাচ্ছিল, যেখানে ভয় বা সতর্কতার কোনো স্থান নেই—আছে শুধু অনাবিল শারীরিক আর মানসিক আত্মসমর্পণ।
"রাফসান..." তাসনিম কাঁপতে কাঁপতে তার বুকে মাথা রাখল।
"হুম?" রাফসান তার চুলে মুখ গুঁজে গভীরভাবে শ্বাস নিল।
"আপনি কখনো আমাকে ছেড়ে যাবেন না তো?"
রাফসান কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। তারপর সে অতি মৃদু গলায় বলল, "যে উদ্দেশ্যে তোমার কাছে এসেছি, তা পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তোমাকে ছাড়ার ক্ষমতা আমার নেই।"
কথাটার অর্থ তাসনিম তখন বুঝতে পারেনি। ভালোবাসার এক চরম ঘোরে সে শব্দগুলোকে আটকে রেখেছিল নিজের মনে। সে ভাবছিল রাফসানের উদ্দেশ্য বুঝি তাকে নিজের করে পাওয়া।
পরের কয়েক দিন কেটে গেল এক তীব্র ঘোরের মধ্যে। রাফসান প্রায় প্রতিদিনই তাসনিমের ফ্ল্যাটে আসত। রাতের পর রাত তারা দুজন এক হয়ে যেত এক অদম্য কামনার সাগরে। রাফসান তাকে অসম্ভব যত্ন করত। তাসনিম ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লে নিজের হাতে কফি বানিয়ে রাখত, তার প্রিয় ফুল দিয়ে ঘর সাজিয়ে রাখত, মাঝরাতে তাসনিমকে নিজের বাহুডোরে জড়িয়ে ধরে রূপকথার মতো গল্প শোনাত।
রাফসানের ভালোবাসায় কোনো কমতি ছিল না। সে যেন তাসনিমের শরীর ও মনের প্রতিটি কোণকে নিজের করে চিনে নিয়েছিল। তাসনিম তার প্রেমে অন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। সে ভুলেই গিয়েছিল যে এই মানুষটি নিজের পরিবার, নিজের চাকরি বা নিজের অতীত সম্পর্কে একটি শব্দও কোনো দিন প্রকাশ করেনি। যখনই তাসনিম রাফসানের অতীত নিয়ে প্রশ্ন করত, রাফসান তাকে এক তীব্র ভালোবাসার চুমুতে ডুবিয়ে দিয়ে বিষয়টা ঘুরিয়ে দিত।
একদিন মাঝরাতে, যখন তাসনিম রাফসানের বুকে মাথা রেখে তার শরীরের উত্তাপ অনুভব করছিল, রাফসান ঘুমন্ত তাসনিমের কপালে হাত বুলাতে বুলাতে নিচু গলায় বলল, "তুমি আমাকে ভালোবাসো, তাই না তাসনিম?"
"আমার নিজের চেয়েও বেশি," তাসনিম আধোঘুমে উত্তর দিল।
রাফসান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখে সেই রাতে আবার ফুটে উঠেছিল এক হিংস্র আর নি سنگ রহস্যের আলো। সে মনে মনে বলল, 'তোমার এই ভালোবাসাই হবে আমার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার, তাসনিম। তোমার পরিবারের সেই অন্ধকার ইতিহাস আমাকে বের করতেই হবে, যার জন্য আমি আজ তোমার এত কাছাকাছি...'
তাসনিম ঘুমে ঢলে পড়ল, টের পেল না—যে মানুষটির গভীর প্রেমে সে নিজেকে সঁপে দিয়েছে, সে আসলে এক বিশাল ধ্বংসাত্মক ঝড়ের পূর্বসংকেত।
ভালোবাসার এই মায়াজাল যত ঘন হচ্ছিল, তাসনিমের জীবনের চারপাশ ততই যেন এক অচেনা আলোয় রঙিন হয়ে উঠছিল। রাফসানের যত্ন, তার প্রতিটা সূক্ষ্ম খেয়াল তাসনিমকে এক অদ্ভুত নিরাপত্তাবোধ দিত। আবার একই সঙ্গে রাফসানের তীব্র শারীরিক সান্নিধ্য তাকে এক মাতাল করা ঘোরের মধ্যে রাখত। প্রতিটা রাতে যখন রাফসান তাকে নিজের শক্ত বাহুডোরে পিষে ধরত, তাসনিমের মনে হতো এই লোকটির স্পর্শ ছাড়া তার জীবনের আর কোনো অস্তিত্ব নেই।
কিন্তু মেঘহীন আকাশে ঝড় যেমন হঠাৎই নেমে আসে, তাসনিমের জীবনেও সেই ঝড় নেমে এলো এক মেঘলা দুপুরে।
আর্কিটেকচার ফার্মের একটি নতুন প্রজেক্টের কাজে তাসনিমকে পুরান ঢাকার এক ঐতিহাসিক রাজবাড়ির সংস্কার কাজের তদারকি করতে পাঠানো হয়। অবিশ্বাস্যভাবে, সেই রাজবাড়িটি ছিল তাসনিমের নিজেরই পূর্বপুরুষদের—অর্থাৎ তার দাদা এবং বাবার রেখে যাওয়া পুরোনো পারিবারিক সম্পত্তি, যা বহু বছর ধরে আইনি জটিলতায় বন্ধ হয়ে পড়ে ছিল। তাসনিমের বাবা জহিরুল ইসলাম এই সম্পত্তি বা তাদের অতীতের ব্যবসা নিয়ে কখনোই পরিবারের কারো সামনে মুখ খুলতেন না। তাসনিম কেবল জানত, তাদের পরিবার পুরান ঢাকা ছেড়ে ধানমন্ডিতে আসার পেছনে কোনো এক পুরনো শত্রুতা বা অশান্তি ছিল।
প্রজেক্টের কাজের সুবিধার্থে তাসনিম সেই ধুলোবালি জমে থাকা বিশাল দালানের একটা পুরোনো স্টোররুম খুলল। সেখানে শত বছরের পুরোনো ফাইল, নকশা আর নথিপত্র এলোমেলো হয়ে পড়ে ছিল।
হঠাৎই ঘরের এক কোণে একটা মেঝের কাঠ সামান্য উঁচু হয়ে থাকতে দেখে তাসনিমের কৌতূহল হলো। সে কাঠটা সরাতেই নিচে একটা লোহার ছোট্ট ট্রাঙ্ক দেখতে পেল। পুরোনো মরচে ধরা তালাটা একটু চাপ দিতেই ভেঙে গেল। ভেতরে কয়েকটি পুরোনো খাতা, কিছু বন্ড পেপার আর একটা মাঝারি আকারের ডায়েরি।
ডায়েরিটার পাতা উল্টাতে গিয়ে তাসনিমের চোখ আটকে গেল একটা পরিচিত চেহারার পুরোনো ছবিতে। সাদা-কালো ছবিতে একজন যুবকের ছবি, যার মুখের আদল, তীক্ষ্ণ চোখ আর চোয়ালের গঠন হুবহু... রাফসানের মতো!
তাসনিমের বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে হিম হয়ে গেল। সে ডায়েরির পাতাগুলো দ্রুত উল্টাতে লাগল। সেখানে তার দাদা আর বাবার হাতে লেখা কিছু গোপন হিসাবের খাতা ছিল, আর তার পাশেই লেখা ছিল একটি পরিবারের ধ্বংসের ইতিহাস। বহু বছর আগে তাসনিমের পরিবার জালিয়াতি আর চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে তাদের তৎকালীন মূল ব্যবসায়িক অংশীদার 'কাজী পরিবারের' সমস্ত সম্পত্তি আর নাম রাতারাতি নিজেদের নামে লিখে নিয়েছিল। সেই চরম প্রতারণার শিকার হয়ে কাজী পরিবারের কর্তা আত্মহত্যা করেছিলেন এবং তাদের পুরো পরিবারটি রাস্তায় বসে গিয়ে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
সেই কাজী পরিবারের একমাত্র ছোট ছেলেটির নাম ছিল—রাফসান কাজী।
তাসনিমের হাত থেকে ডায়েরিটা মাটিতে পড়ে গেল। তার মাথার ভেতরটা রিমঝিম করে ঘুরতে লাগল। সে ফ্লোরে বসে পড়ল, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।
"রাফসান... কাজী?" সে বিড়বিড় করে বলল।
তাহলে কি রাফসানের তার জীবনে আসা, সেই লেকের পাড়ে দেখা হওয়া, তার প্রতি অমন উম্মাদ করা যত্ন, মাঝরাতের চরম কামনাময় ভালোবাসা—সবই ছিল সুপরিকল্পিত? রাফসান কি তবে কেবল প্রতিশোধ নিতেই তার জীবনে এসেছিল?
ঠিক সেই মুহূর্তে স্টোররুমের দরজায় একটা পরিচিত ছায়া এসে দাঁড়াল।
তাসনিম চমকে উঠে দরজার দিকে তাকাল। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে রাফসান। কিন্তু আজকের রাফসানের পরনে কোনো ক্যাজুয়াল পোশাক নেই—পরনে একটি কালো স্যুট, মুখমণ্ডল বরফের মতোই ঠান্ডা ও হিংস্র। তার চোখে সেই ভালোবাসা বা কামনার বিন্দুমাত্র ছায়াও নেই, যা গত রাতেও তাসনিমকে ছারখার করে দিয়েছিল।
"তুমি... তুমি এখানে?" তাসনিম কাঁপা গলায় উঠে দাঁড়িয়ে বলল।
রাফসান ধীরে ধীরে ভেতরে হেঁটে এলো। তার বুটের শব্দে ফাঁকা স্টোররুমটা প্রতিধ্বনি তৈরি করছিল। সে নিচু হয়ে ফ্লোরে পড়ে থাকা ডায়েরিটা তুলে নিল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক নির্মম, হিংসাত্মক হাসি।
"সবটা জেনে গেলে তাহলে, তাসনিম?" রাফসানের ভরাট কণ্ঠস্বর আজ কোনো মধুর সুর তুলল না, বরং তা থেকে বিষাক্ত বিষ ঝরে পড়ছিল।
"এসব কী, রাফসান? তুমি আমাকে বলো... এসব মিথ্যে, তাই না?" তাসনিম চিৎকার করে উঠে রাফসানের স্যুট চেপে ধরল। "তুমি আমাকে ভালোবাসো না? সেই রাতে, তার আগের রাতে... আমাদের চরম মুহূর্তগুলো... তোমার সেই যত্ন, আমার ঠোঁটে তোমার ঠোঁটের স্পর্শ—সবই কি অভিনয় ছিল?"
রাফসান এক চরম তাচ্ছিল্যের সাথে তাসনিমের হাত দুটি নিজের জামা থেকে সরিয়ে দিল। সে তাসনিমের গালটা চেপে ধরল তার শক্ত আঙুল দিয়ে। কিন্তু সেই স্পর্শে আজ কোনো উষ্ণতা ছিল না, ছিল পশতু ধাতুর মতো কঠিন শীতলতা।
"অভিনয়?" রাফসান তাসনিমের কানের কাছে ঝুঁকে নিচু স্বরে বলল, "আমি তোমাকে স্পর্শ করেছি, কারণ তোমার শরীর আর মনের প্রতিটা ভাঁজ আমাকে সেই তথ্যগুলোর কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে, যা তোমার বাবা আর দাদা পরম গোপনে লুকিয়ে রেখেছিল। তোমার মতো একজন বোকা মেয়েকে ভালোবাসার জালে জড়ানো কত সহজ ছিল, তা তুমি নিজেও জানো না।"
তাসনিমের চোখের কোণ দিয়ে অশ্রুর ধারা নেমে এলো। যে মানুষটির বুকে মাথা রেখে সে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী নারী মনে করত, সেই মানুষটি এত নগ্নভাবে তার আবেগকে মারিয়ে দিচ্ছে!
"তুমি এত নিচু?" তাসনিম ফুঁপিয়ে উঠে বলল। "আমার শরীরকে তুমি তোমার প্রতিশোধের হাতিয়ার বানালে?"
"তোমার পরিবার আমার বাবার জীবন কেড়ে নিয়েছিল, তাসনিম! আমাদের রাস্তায় বসিয়ে দিয়েছিল!" রাফসান হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, তার চোখে রক্তের মতো লাল হিংসা ফুটে উঠল। "তোমার বাবা জহিরুল ইসলাম যে জাল দলিল দিয়ে আমার পরিবারের সবকিছু কেড়ে নিয়েছিল, সেই দলিলের আসল কপিগুলো কোথায় ছিল, তা বের করার জন্যই আমি তোমার এত কাছে এসেছি। তোমার শরীরের প্রতিটা ইঞ্চি আমি চিনেছি শুধু তোমার বিশ্বাস অর্জন করতে। আর আজ... আজ আমি তা পেয়ে গেছি।"
রাফসান ট্রাঙ্কের তলদেশ থেকে একটা পুরনো হলুদ রঙের ফাইলের বান্ডিল তুলে নিল—যা ছিল তাদের বাবার জালিয়াতির মূল দলিল।
"আমার উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে, তাসনিম," রাফসান হিমশীতল গলায় বলল। "আজ থেকে তোমার আর আমার অধ্যায় শেষ।"
তাসনিম যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তীব্র অপমান, প্রতারণা আর নিজের ভালোবাসাকে এভাবে মাড়িয়ে যেতে দেখে তার ভেতরের সমস্ত দুর্বলতা নিমেষেই মরে জমে পাথর হয়ে গেল। যে হৃদয়ে এক মুহূর্ত আগেও রাফসানের জন্য উন্মাদের মতো প্রেম ছিল, সেখানে জন্ম নিল এক মহাসমুদ্রের মতো ঘৃণা।
"তুমি একটা জানোয়ার, রাফসান," তাসনিম নিজের চোখের পানি মুছে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার গলার স্বর হঠাৎ করেই ভীষণ শান্ত আর শক্ত হয়ে গেল। "তুমি ভেবেছ আমার শরীর আর মন নিয়ে খেলা করে তুমি জিতে গেলে? তুমি চরম ভুল করছ।"
রাফসান ফাইলটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে এক পা বাড়িয়ে থমকে দাঁড়াল। সে ঘুরে তাসনিমের দিকে তাকাল।
"আমার কাছে তোমার ভালোবাসার চেয়ে বেশি দাম ছিল আমার আত্মসম্মানের," তাসনিম কঠিন চোখে রাফসানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল। "তুমি আমাকে ব্যবহার করেছ। কিন্তু মনে রেখো, আজ এই মুহূর্ত থেকে রাফসান নামের কোনো পুরুষ আমার জীবনে আর অস্তিত্ব রাখে না। আমার শরীর ও মনের ওপর তোমার যে অধিকার তুমি ভেবেছিলে, তা আজ থেকে আমার সবচেয়ে বড় ঘেন্না।"
তাসনিম নিজের হাতের বাগদানের আংটিটি (যা রাফসান তাকে কিছুদিন আগে দিয়েছিল) খুলে সশব্দে রাফসানের মুখে ছুড়ে মারল। আংটিটা রাফসানের গালে লেগে ফ্লোরে গড়িয়ে পড়ল।
"চলে যাও আমার সামনে থেকে। আর কখনো যদি আমার সামনে আসার চেষ্টা করো, আমি নিজের হাতে তোমাকে শেষ করব," তাসনিমের কণ্ঠের দৃঢ়তা রাফসানকে এক মুহূর্তের জন্য চমকে দিল।
রাফসান কিছুক্ষণ নীরব দৃষ্টিতে তাসনিমের দিকে চেয়ে রইল। তার চোখে এক পলকের জন্য যেন অজানা এক অনুশোচনার ছায়া ফুটে উঠেই আবার মিলিয়ে গেল। সে আর একটা কথাও না বলে, ফাইলটা বগলে চেপে ধীর পায়ে স্টোররুম থেকে বের হয়ে গেল।
তাসনিম একা দাঁড়িয়ে রইল সেই নির্জন ধুলোমাখা ঘরে। চারপাশটা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। সে কান্নায় ভেঙে পড়ল না, ফ্লোরে হাঁটুরে ভেঙে বসে সে শুধু একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।
সম্পর্কটা শেষ হয়ে গেল। কিন্তু তাসনিম তখনও জানত না, এই ভালোবাসার প্রতারণা আর পারিবারিক গোপন রহস্যের শেষ খেলাটা এখানেই থেমে নেই—এর পেছনে লুকিয়ে আছে এমন এক চূড়ান্ত সত্য, যা রাফসান বা তাসনিম, কারো কল্পনার মধ্যেও ছিল না।
রাফসান চলে যাওয়ার পর কয়েকটা দিন তাসনিমের জন্য ছিল একেকটা নরকবাসের মতো। তবে এই কষ্টের মাঝেও তাসনিম ভেঙে পড়েনি, বরং এক কঠিন ও পাথুরে গাম্ভীর্য তাকে ঘিরে ধরেছিল। ভালোবাসার যে তীব্র শিখায় সে একসময় নিজেকে সমর্পণ করেছিল, আজ সেই বিষাক্ত আগুনের ছাই দিয়ে সে নিজের হৃদয়কে শক্ত বর্ম বানিয়ে ফেলেছে।
সে পুরান ঢাকার সেই শত বছরের পুরোনো জীর্ণ দালানে আবার ফিরে গেল। রাফসান যা নিয়ে গেছে, তা তো কেবল একটা ফাইল। কিন্তু তাসনিমের সুতীক্ষ্ণ আর্কিটেক্টের চোখ আর অনুসন্ধিৎসু মন তাকে বলছিল—গল্পের এখানেই শেষ হতে পারে না।
তাসনিম আবার সেই ট্রাঙ্কটির কাছে গিয়ে বসল। পুরো কাঠ ভেঙে ফেলে নিচে গভীরভাবে খুঁজতে গিয়ে সে আরেকটি গোপন ড্রয়ার দেখতে পেল। যার ভেতরে ছিল কিছু পুরনো চিঠিপত্র, মেডিকেল রিপোর্ট এবং কয়েকটি আইনি স্টেটমেন্ট।
চিঠিগুলোর ধুলো ঝেড়ে পড়তেই তাসনিমের চোখের মনি স্থির হয়ে গেল। তার শরীরের রক্ত যেন এক নিমেষে হিম হয়ে জমে গেল।
চিঠিতে লেখা প্রতিটি লাইন রাফসানের আনা অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ধোঁকাবাজি হিসেবে প্রমাণ করছিল!
চিঠি ও দলিলের কাগজপত্র অনুযায়ী—কাজী পরিবার (রাফসানের পরিবার) মূলত কোনো সততার প্রতীক ছিল না। বরং রাফসানের বাবা, কাজী মোশতাক ছিলেন একজন কুখ্যাত চোরাচালানি ও চরম মিথ্যাচারী। তাসনিমের বাবা জহিরুল ইসলাম তাকে নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধু মনে করে যৌথ ব্যবসা শুরু করেছিলেন। কিন্তু মোশতাক মিয়া জহিরুল ইসলামের সই জাল করে পুরো ব্যবসায়িক মূলধন আত্মসাৎ করতে গিয়েছিলেন এবং পুরান ঢাকার এক নিষিদ্ধ চক্রের কাছে সেই বাড়ি ও সম্পত্তি বন্ধক রেখে বিশাল টাকা ঋণ নিয়েছিলেন।
যখন মোশতাক মিয়া ধরা পড়ে যান এবং পাওনাদারদের তাড়া খায়, তখন নিজের অপরাধ ঢাকতে ও আইনি শাস্তি থেকে বাঁচতে তিনি আত্মহত্যা করেন। আর তাসনিমের বাবা জহিরুল ইসলাম কেবল নিজের বন্ধুকে ভালোবেসে এবং সেই পরিবারের সম্মান বাঁচাতে নিজের সমস্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিক্রি করে কাজী মোশতাকের বিশাল সব দেনা শোধ করেছিলেন! কিন্তু মোশতাক মিয়ার পরিবারকে বাঁচানোর জন্য এবং ছোট ছেলে রাফসানকে কলঙ্ক থেকে দূরে রাখতে জহিরুল ইসলাম আসল সত্যটা কখনোই কাউকে জানাননি। তিনি নীরবে সমস্ত অপবাদ নিজের মাথায় নিয়ে ধানমন্ডিতে চলে এসেছিলেন!
"ইয়াল্লাহ..." তাসনিম নিজের বুকে হাত রাখল।
তাহলে রাফসান যা জেনে বড় হয়েছে, তা ছিল সম্পূর্ণ একটা সাজানো মিথ্যা! তার মা বা তার পরিবারের বাকি সদস্যরা কাজী মোশতাকের এই ভয়াবহ অপকর্ম ঢাকতে রাফসানের মনে তাসনিমের পরিবারের বিরুদ্ধে বিষ ঢুকিয়ে দিয়েছিল। রাফসান যাকে 'প্রতিশোধ' বলে মনে করছে, তা আসলে একটা নির্মম ও সাজানো ষড়যন্ত্রের ওপর দাঁড়িয়ে আছে!
ঠিক তখনই তাসনিমের ফোনের স্ক্রিন ভেসে উঠল তার বাবার কোম্পানির পুরোনো এক সিনিয়র আইনি উপদেষ্টার ফোনে।
"হ্যালো, তাসনিম?" ওপাশ থেকে বয়স্ক আইনজীবীর আতঙ্কিত কণ্ঠ ভেসে এলো। "মা, তুমি কোথায়? একটা চরম বিপদ ঘটেছে!"
"কী হয়েছে, আঙ্কেল?" তাসনিম সোজা হয়ে দাঁড়াল।
কাজী পরিবারের ছেলে রাফসান কাজী আমাদের ধানমন্ডির বাড়ি আর মূল প্রপার্টির বিরুদ্ধে জালিয়াতির মামলা ঠুকে দিয়েছে। আর শুধু তাই নয়... ও যেসব ফাইল কোর্টে পেশ করেছে, তা যদি জেনুইন প্রমাণিত হয়, তবে তোমার বাবাকে পুলিশ যেকোনো মুহূর্তে গ্রেফতার করবে! তোমার বাবা এমনিতেই অসুস্থ, এই ধাক্কা উনি সামলাতে পারবেন না!"
তাসনিমের চোখের সামনে যেন আগুন জ্বলে উঠল। রাফসান শুধু তাকে ব্যবহার করেই ক্ষান্ত হয়নি, তার অসুস্থ বাবাকেও জেলখানায় পাঠানোর ব্যবস্থা করছে!
"আপনি একদম চিন্তা করবেন না, আঙ্কেল। আসল সত্য এখন আমার কাছে," তাসনিম কঠিন স্বরে বলল। "আজ রাতে আমি নিজে এই খেলার শেষ করব।"
রাত দশটা।
গুলশানের এক বিলাসবহুল হাইরাইজ অ্যাপার্টমেন্টের পেন্টহাউসে একা বসে ছিল রাফসান। পুরো ঘরে কোনো আলো ছিল না, কেবল শহরের দূরের আলো কাচের জানালা দিয়ে এসে তার মুখে পড়ছিল। তার হাতে ছিল দামি হুইস্কির গ্লাস।
বিজয়ী হওয়ার কথা ছিল তার। যে প্রতিশোধের জন্য সে গত তিন বছর ধরে অপেক্ষা করেছে, সেই প্রতিশোধ আজ তার হাতের মুঠোয়। তাসনিমের বাবার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু তাও... রাফসানের বুকের ভেতর এক অদম্য শূন্যতা আর দাহ জ্বালা করছিল।
তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল তাসনিমের সেই অশ্রুসজল, অথচ ঘৃণায় ভরা চোখ দুটো। ভেসে উঠছিল তাদের সেই মাতাল করা রাতগুলোর কথা, যখন তাসনিম সম্পূর্ণ নিঃসংকোচে নিজেকে তার বুকে সঁপে দিত। রাফসান গ্লাসের পানীয় এক চুমুকে শেষ করে গ্লাসটা সশব্দে মেঝেতে আছড়ে ভাঙল।
"কেন? কেন ও আমার মন থেকে যাচ্ছে না?" রাফসান নিজের চুলে হাত দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল।
ঠিক তখনই অ্যাপার্টমেন্টের মূল দরজা খোলার শব্দ হলো। রাফসান সচকিত হয়ে উঠে দাঁড়াল। অন্ধকারে দরজার গোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে একটি ছায়ামূর্তি।
আলো জ্বালানোর সুইচটা টিপতেই পুরো ঘর উজ্জ্বল আলোয় ভেসে উঠল। সামনে দাঁড়িয়ে তাসনিম। পরনে কালো শাড়ি, চোখে আগ্নেয়গিরির মতো বিধ্বংসী তেজ, আর হাতে একটি চামড়ার পুরোনো ফাইল।
"তুমি এখানে?" রাফসানের স্বর গম্ভীর হলেও তার গভীরে এক অদ্ভুত আলোড়ন সৃষ্টি হলো। "নিরাপত্তারক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে এলে? আর কী চাও তুমি?"
তাসনিম ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। তার প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল অদম্য সাহস। সে রাফসানের খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়াল—যে দূরত্বে দাঁড়িয়ে তারা একসময় একে অপরের ঠোঁটে ঠোঁট মেলাত, একে অপরের নিঃশ্বাস পান করত।
"তোমার জয়ের উল্লাস দেখতে এলাম, রাফসান কাজী," তাসনিম তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল। "কিন্তু তোমাকে দেখে তো বিজয়ী মনে হচ্ছে না? মনে হচ্ছে কোনো পরাজিত, অনুতপ্ত পশুর মতো অন্ধকারে বসে আছ।"
রাফসানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে তাসনিমের বাহু শক্ত করে চেপে ধরল। "তোমার সীমা অতিক্রম কোরো না, তাসনিম। আমি তোমার পরিবারকে ধ্বংস করে দিয়েছি। তোমার ভালোবাসা, তোমার বিশ্বাস—সব ধূলিসাৎ করে দিয়েছি।"
"তুমি কিছুই ধ্বংস করতে পারোনি, রাফসান," তাসনিম একবিন্দু বিচলিত না হয়ে রাফসানের চোখের দিকে সোজা তাকাল। সে তার হাত থেকে ফাইলটা সশব্দে রাফসানের বুকে ছুড়ে মারল। "বরঞ্চ তুমি নিজে একটা বিরাট মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে এতদিন বেঁচে ছিলে।"
"কীসের ফাইল এটা?" রাফসান ভ্রূ কুঁচকে তাকাল।
"পড়ে দেখো," তাসনিম শান্ত অথচ বরফের মতো কঠিন গলায় বলল। "যে বাবাকে তুমি দেবতা মনে করে এসেছ, যে বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে তুমি আমার শরীর আর মনকে খেলনা বানালে—পড়ে দেখো তোমার সেই বাবার আসল কীর্তিকলাপ!"
রাফসান ফাইলটা খুলল। প্রথম কয়েকটা পাতা উল্টাতেই তার মুখের সমস্ত রঙ উবে গেল। আইনি দলিল, ব্যাংক স্টেটমেন্ট আর কাজী মোশতাকের নিজের হাতে লেখা স্বীকারোক্তি—প্রতিটা কাগজ চিৎকার করে বলছিল যে তার বাবা ছিলেন এক লম্পট, প্রতারক ও অপরাধী। আর তাসনিমের বাবা জহিরুল ইসলাম ছিলেন সেই মানুষ, যিনি কাজী পরিবারকে রাজপথে আসা থেকে বাঁচিয়েছিলেন।
"না... এ হতে পারে না! এটা মিথ্যা! তুমি এসব বানিয়ে এনেছ!" রাফসানের কণ্ঠ কেঁপে উঠল। তার হাত থেকে কাগজগুলো ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ল।
"এগুলো একশ ভাগ সত্যি, রাফসান," তাসনিম এক ধাপ এগিয়ে এলো। সে রাফসানের টি-শার্টের কলার চেপে ধরল, ঠিক যেমনটা সে প্রথম দিন লেকের পাড়ে করেছিল। কিন্তু আজকের সেই ছোঁয়ায় কোনো প্রেম ছিল না, ছিল চরম ঘৃণা।
"তোমার পরিবার তোমাকে এক মিথ্যা গল্পের ওপর বড় করেছে। আর তুমি সেই অন্ধ ঘৃণায় অন্ধ হয়ে আমাকে আঘাত করতে এলে? আমার শরীর ছুঁয়ে তুমি ভেবেছিলে আমাকে জয় করে ফেলেছ?" তাসনিম রাফসানের ঠোঁটের একদম কাছাকাছি নিজের মুখ নিয়ে এলো। তাসনিমের সুবাস আবার রাফসানের চেনা অনুভূতিগুলোকে জাগিয়ে তুলতে চাইল, কিন্তু তাসনিমের কথাগুলো বিষের মতো তার কানে বিধল।
"তুমি ভেবেছিলে তোমার ঠোঁটের স্পর্শ, তোমার মাঝরাতের ভালোবাসা আমাকে দুর্বল করে দেবে?" তাসনিম ফিসফিস করে বলল, তার চোখ থেকে এক ফোঁটা আগুন ঝরছিল। "আজ শুনে রাখো রাফসান... যে শরীরকে তুমি স্পর্শ করেছ, সেই শরীর আজ তোমাকে ঘেন্না করে। যে অনুভূতি তুমি আমার মধ্যে জাগিয়েছিলে, তা আজ থেকে আমার কাছে একটা চরম অভিশাপ!"
রাফসান স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। সমস্ত সত্যিটা তার মাথার ওপর যেন এক বিশাল পাহাড়ের মতো ভেঙে পড়েছে। সে যে কেবল এক নির্দোষ মেয়েকে আঘাত করেছে তা-ই নয়, বরং যে মানুষকে সে চিরকাল শত্রু ভেবে এসেছে, সেই মানুষটাই ছিল তার পরিবারের আসল রক্ষাকর্তা!
"তাসনিম..." রাফসান ভেঙে পড়ে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল। সে হাত বাড়িয়ে তাসনিমকে ছুঁতে চাইল।
"আমাকে স্পর্শ করার ভুল আর কখনো করবে না!" তাসনিম কড়া গলায় রাফসানের হাত সরিয়ে দিল। "তোমার এই নোংরা হাত দিয়ে আমার অতীত, আমার বর্তমান বা আমার শরীর—কোনো কিছুতেই আর তোমার অধিকার নেই।"
তাসনিম ঘুরে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে হেঁটে যেতে লাগল।
"তাসনিম, শোনো! আমাকে ক্ষমা করো... আমি জানতাম না!" রাফসান আর্তনাদ করে উঠে তার পেছনে ছুটল। সে তাসনিমের সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। যে অহংকারী, শক্তিশালী পুরুষটি এতদিন তাসনিমের ওপর রাজত্ব করেছিল, সে আজ এক ধূলিমলিন ভিক্ষুকের মতো ফ্লোরে পড়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছে।
"আমি সত্যিটা জানতাম না তাসনিম... কিন্তু তোমার প্রতি আমার যে অনুভূতি, তা কি পুরোটাই মিথ্যে ছিল? আমি কি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসিনি?" রাফসান ফুপিয়ে উঠে বলল।
তাসনিম দরজার হ্যান্ডেলে হাত রেখে থামল। সে পেছন ফিরে তাকাল না। তার কন্ঠস্বর শোনালো একদম নিস্পৃহ, নির্মম।
"তুমি ভালোবাসোনি, রাফসান। তুমি কেবল নিজের বিষাক্ত অতীতকে লালন করেছ। আর তার মাশুল তোমাকে সারাজীবন একা একা গুনতে হবে।"
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো। তাসনিম বের হয়ে গেল। আর অন্ধকার পেন্টহাউসে হাঁটু গেড়ে বসে রইল এক নিঃস্ব, চুরমার হয়ে যাওয়া পুরুষ—যে নিজের প্রতিশোধের আগুনে নিজেই চিরতরে ছারখার হয়ে গেছে।
পেন্টহাউসের অন্ধকার ঘরের মেঝেতে রাফসান দীর্ঘক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। চারপাশের নীরবতা যেন তাকে চাবুকের মতো আঘাত করছিল। ছড়ানো-ছিটানো আইনি দলিল আর বাবার লেখা গোপন চিঠিগুলোর প্রতিটি বর্ণ তার এতদিনের সাজানো অস্তিত্বকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছে। সে ভেবেছিল সে এক অসম লড়াইয়ের বীর, যে নিজের পরিবারের অন্যায়ের বিচার করতে এসেছে। কিন্তু আসল সত্য হলো, সে এক মিথ্যা আর প্রতারণার জালে বন্দী হয়ে এক নিষ্পাপ মেয়েকে ছারখার করে দিয়েছে।
সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক ছিল তাসনিমের সেই শেষ চাহনি—যেখানে কোনো ক্ষোভ ছিল না, ছিল কেবল চরম অবহেলা আর ঘৃণা। তাসনিমের সেই বরফের মতো ঠান্ডা স্বর রাফসানের কানে বারবার বাজছিল—'যে অনুভূতি তুমি আমার মধ্যে জাগিয়েছিলে, তা আজ থেকে আমার কাছে একটা চরম অভিশাপ!'
পরদিন সকালেই রাফসান কোর্টে গিয়ে জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দায়ের করা সমস্ত মিথ্যা মামলা ও অভিযোগ বিনা শর্তে প্রত্যাহার করে নিল। আইনি নথিপত্রে সই করার সময় তার হাত কাঁপছিল। তাসনিমের বাবার সমস্ত রাজকীয় সম্মান ও সম্পত্তি সে আইনিভাবে চিরতরে সুরক্ষিত করে দিল। কিন্তু এতেও তার বুকের ভেতরের আগুন শান্ত হলো না।
রাফসান বুঝতে পারছিল, সে তাসনিমকে কেবল ব্যবহার করতে চায়নি; প্রতিশোধের সেই বিষাক্ত ছকের আড়ালেও সে তাসনিমকে সত্যি সত্যি নিজের অজান্তে গভীর ভালোবাসায় ভালোবেসে ফেলেছিল। প্রতিটা রাতে যখন সে তাসনিমকে কাছে পেত, তাসনিমের প্রতিটা উন্মাদের মতো স্পর্শ, তার চোখের মোহ আর উষ্ণ নিঃশ্বাস রাফসানের পাথরের মতো শক্ত মনকে গলিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু নিজের অহংকার আর মিথ্যা প্রতিশোধের মোহে অন্ধ হয়ে সে সেই সত্যকে অস্বীকার করেছিল। আর আজ যখন সত্যের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে, তখন সে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে তার জীবনের একমাত্র আলো—তাসনিমকে।
পরের কয়েক সপ্তাহে রাফসান উন্মাদের মতো হয়ে উঠল। সে খাওয়া-দাওয়া প্রায় ছেড়ে দিল, দিন-রাত কেবল তাসনিমের স্মৃতিতে ডুবে থাকত। তাসনিমের ধানমন্ডির ফ্ল্যাটের সামনে, তার অফিসের নিচে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকত সে। তাসনিমকে দূর থেকে একপলক দেখার জন্য সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৃষ্টিতে ভিজত, চড়া রোদে পুড়ত।
কিন্তু তাসনিম ছিল একদম অটল। সে রাফসানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিজের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। অফিসে সে আরও বেশি মনযোগী হয়ে উঠল, নিজের প্রজেক্টগুলো শেষ করতে দিন-রাত কাজ করতে লাগল। রাফসান যদি কখনো তার সামনে এসে দাঁড়াত, তাসনিম এমনভাবে পাশ কাটিয়ে চলে যেত যেন সামনে কোনো জীবন্ত মানুষ নেই, কেবল শূন্য হাওয়া।
একদিন রাতে বৃষ্টি হচ্ছিল ভীষণ জোরে। ধানমন্ডির সেই পুরোনো লেকের পাড়ে—যেখানে প্রথম তাদের দেখা হয়েছিল—তাসনিম তার কাজ শেষে একাই হেঁটে আসছিল। হুট করেই তার ছাতার ওপর একটা ছায়া এসে পড়ল।
তাসনিম থামল। সামনে দাঁড়িয়ে রাফসান। মাত্র কয়েক সপ্তাহে লোকটা অর্ধেকেরও বেশি শুকিয়ে গেছে। চোখের নিচে গভীর কালচে দাগ, দাড়ি-গোঁফ উস্কোখুস্কো, পরনের জামাকাপড় বৃষ্টিতে ভিজে একাকার। সেই একসময়ের গর্বিত, সুগঠিত সুপুরুষের এখন কেবল এক ধ্বংসস্তূপ অবশিষ্ট আছে।
"তাসনিম..." রাফসানের গলা থেকে করুণ এক আকুতি বের হয়ে এলো। "একটা মিনিট... প্লিজ। শুধু একটা মিনিট আমার কথা শোনো।"
তাসনিম কোনো কথা বলল না। তার মুখে কোনো আবেগের প্রকাশ ঘটল না। সে কেবল শান্ত চোখে রাফসানের দিকে তাকাল।
রাফসান হাঁটুরে ভেঙে কাঁদার মতো করে তাসনিমের সামনে বসে পড়ল। সে তাসনিমের সুতির শাড়ির আঁচলটা ধরে নিজের ফ্যাকাশে ঠোঁটে ছোঁয়ালো।
"আমি জানি আমি ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য নই," রাফসান ফুঁপিয়ে উঠে বলল, বৃষ্টির পানি আর চোখের জল তার গালে এক হয়ে মিশে যাচ্ছিল। "আমি তোমার জীবনটা বিষিয়ে দিয়েছি। কিন্তু খোদার কসম তাসনিম, আমার সেই রাতগুলোর অনুভূতি মিথ্যা ছিল না! তোমাকে যখন আমি স্পর্শ করেছি, তোমাকে যখন বাহুডোরে ধরে রেখেছি—তাতে একবিন্দু অভিনয় ছিল না! আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম, তাসনিম... আমি নিজের সাথেই প্রতারণা করেছি!"
তাসনিম ধীরে ধীরে তার শাড়ির আঁচলটা রাফসানের হাত থেকে টেনে ছাড়িয়ে নিল।
"তোমার স্পর্শ, তোমার ভালোবাসা... এসব এখন আমার কাছে কাদা আর ময়লার মতো, রাফসান," তাসনিম অত্যন্ত নিচু কিন্তু ধারালো গলায় বলল। "তুমি আমাকে শারীরিক আর মানসিকভাবে ব্যবহার করেছ। তুমি ভেবেছ ভালোবাসা এতই সস্তা যে একটা ভুল স্বীকার আর কিছু চোখের জল ফেললেই সব মুছে যাবে?"
"আমি নিজেকে শেষ করে দেব, তাসনিম! তুমি বললে আমি এখনই নিজের জীবন শেষ করে দেব," রাফসান ব্যাকুল হয়ে চিৎকার করে উঠল।
"নিজের জীবন শেষ করা তো খুব সহজ, রাফসান," তাসনিম এক ধাপ এগিয়ে এসে রাফসানের কানের কাছে মুখ নামালো। তার গলার তপ্ত নিঃশ্বাস রাফসানের ত্বকে গিয়ে লাগল, কিন্তু সেই স্পর্শে আজ শুধু ধ্বংসের প্রতিশ্রুতি ছিল। "আসল শাস্তি হলো বেঁচে থাকা। তুমি বেঁচে থাকবে—প্রতিদিন, প্রতিটা মুহূর্তে আমার স্মৃতির আগুনে পুড়ে পুড়ে বেঁচে থাকবে। তুমি যখনই কোনো নারীকে স্পর্শ করার চেষ্টা করবে, তোমার মনে পড়বে আমার এই ঘৃণার কথা। তুমি যখনই রাতে ঘুমাতে যাবে, তোমার কানে বাজবে আমার কান্নার শব্দ।"
তাসনিম সোজা হয়ে দাঁড়াল। "এটাই তোমার শাস্তি, রাফসান কাজী। আমার জীবন থেকে চিরতরে মুছে যাওয়া।"
তাসনিম আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে ধীর পায়ে হেঁটে চলে গেল। রাফসান বৃষ্টির মধ্যে কাদামাটিতে পড়ে রৈল। সে চিৎকার করে তাসনিমের নাম ধরে ডাকতে লাগল, কিন্তু তাসনিম একবারের জন্যও পেছনে ফিরে তাকাল না।
কিন্তু গল্পের মোড় সেখানেই থামল না। তাসনিম যখন নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে এলো, তখন তার শরীরের ভেতরেও এক অদ্ভুত তোলপাড় শুরু হয়েছে। গত কয়েক দিন ধরে চলা মানসিক চাপ, খাওয়া-দাওয়ার অনিয়ম আর হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা চাপা কষ্ট তাকে কাবু করে ফেলেছিল।
রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই তাসনিমের মাথা ঘুরে উঠল। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে এলো। সে বেডরুমের ফ্লোরে ঢলে পড়ল।
পরদিন সকালে তাসনিমের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী আর অফিসের সহকর্মী সায়মা ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে ভেতরে ঢুকে তাসনিমকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখল। দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কয়েক ঘণ্টা পরীক্ষার পর ডাক্তার বাইরে এলেন। সায়মা উৎকণ্ঠা নিয়ে এগিয়ে গেল, "ডাক্তার সাহেব, তাসনিম কেমন আছে? ওর কী হয়েছে?"
ডাক্তার গম্ভীর মুখে ফাইলটি দেখলেন, তারপর সায়মার দিকে তাকিয়ে বললেন, "মানসিক অবসাদ আর অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কারণে ও সেন্সলেস হয়ে পড়েছিল। তবে ওর শরীরের ওপর এখন অনেক বেশি যত্ন নিতে হবে।"
"কেন ডাক্তার সাহেব? অন্য কোনো সমস্যা?"
ডাক্তার মৃদু হেসে বললেন, "উনি সন্তানসম্ভবা। তাসনিম চার সপ্তাহের গর্ভবতী।"
সায়মা স্তব্ধ হয়ে গেল। আর দূর থেকে, হাসপাতালের করিডোরের কোণে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রাফসান—যে তাসনিমকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে আসতে দেখে গোপনে পিছু নিয়েছিল—কথাটা শুনতে পেল।
ডাক্তারের শেষ কথাটা শুনতেই রাফসানের পায়ের নিচের মাটি যেন পুরোপুরি সরে গেল। তাসনিমের গর্ভে তার সন্তান... যে সন্তানকে সে চরম ঘৃণায় আর প্রতারণার জালে ফেলে জন্ম দিয়েছে!
এক চরম ধর্মসংকট আর আলোড়নে কেঁপে উঠল পুরো প্রেক্ষাপট। তাসনিম যখন চোখ মেলবে, আর যখন জানতে পারবে তার শরীরের ভেতরে বেড়ে উঠছে তার সবচেয়ে প্রিয় অথচ সবচেয়ে ঘৃণিত মানুষটির রক্ত—তখন কী করবে সে?
হাসপাতালের কেবিনের সাদা সিলিংয়ের দিকে চেয়ে নিঃশব্দে শুয়ে ছিল তাসনিম। স্যালাইনের বোতল থেকে ফোঁটা ফোঁটা ওষুধ তার রক্তে মিশছিল, কিন্তু তার মনের ভেতরে চলছিল এক প্রলয়ংকরী ঝড়। সায়মা যখন তাকে ডাক্তারদের দেওয়া খবরটা জানাল, এক মুহূর্তের জন্য তাসনিমের মনে হয়েছিল তার চারপাশের বাতাস বুঝি শূন্য হয়ে গেছে।
চার সপ্তাহ।
তার গর্ভে বেড়ে উঠছে এক নতুন প্রাণ। যে প্রাণের বাবা আর কেউ নয়—রাফসান কাজী। যে মানুষটি তাকে ভালোবেসে আগলে রাখার নাটক করে তার জীবনকে নরক বানিয়ে দিয়েছিল, তারই রক্তের এক কণা এখন তাসনিমের নিজের শরীরের অংশ।
"তাসনিম..." পাশে বসে সায়মা আলতো করে তার হাত চেপে ধরল। "তুই কী ভাবছিস? যদি তুই এই সন্তানকে না চাস, তবে ডাক্তারদের সাথে কথা বলা যায়। তুই যা সিদ্ধান্ত নিবি, আমি তোর পাশে আছি।"
তাসনিম কোনো কথা বলল না। সে ধীরে ধীরে নিজের ডান হাতটি টেনে এনে পেটের ওপর রাখল। এক অদ্ভুত অনুভূতি তার পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। এই নিষ্পাপ শিশুটির তো কোনো দোষ নেই। রাফসানের প্রতারণা, প্রতারকের বিষাক্ত অতীত—এর কোনোটার সাথেই তো এই অবোধ প্রাণটির কোনো সম্পর্ক নেই। এটি কেবল রাফসানের সন্তান নয়, এটি তাসনিমের নিজেরও তো রক্ত-মাংসের অংশ!
তাসনিমের শক্ত চোয়াল আরও কঠিন হয়ে উঠল। তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া এক ফোঁটা লোনা জল সে নিজের হাতে মুছে ফেলল।
"না, সায়মা," তাসনিম শান্ত অথচ গভীর এক দৃঢ়তায় বলল। "আমি এই সন্তানকে দুনিয়ায় আনব। এই সন্তান শুধু আমার। এতে রাফসান বা অন্য কারো কোনো অধিকার থাকবে না। আমি তাকে এমনভাবে গড়ে তুলব, যেন সে সত্যের পথে চলে, কোনো বিষাক্ত মিথ্যার ছায়াও যেন তাকে ছুঁতে না পারে।"
ঠিক তখনই কেবিনের বাইরে হালকা খসখস শব্দ হলো।
সায়মা উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখল, কেবিনের বাইরে করিডোরের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ফ্লোরে বসে আছে রাফসান। তার চেহারা এখন চেনার উপায় নেই। চোখ দুটো লাল, গাল দুটো বসে গেছে, শার্টের হাতা ছেঁড়া। সে যেন এক মৃতপ্রায় পথিকের মতো দরজার দিকে চেয়ে ছিল।
সায়মাকে দেখে রাফসান ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়াল। সে আকুল চোখে ভেতরে তাকানোর চেষ্টা করল।
"সায়মা... তাসনিম কেমন আছে? ও কি চোখ মেলেছে?" রাফসানের কণ্ঠস্বর ভেঙে আসছিল। "আমি সব শুনেছি... ডাক্তারের কথা আমি শুনেছি। প্লিজ, আমাকে একবার ওর কাছে যেতে দাও।"
তাসনিম কেবিনের ভেতর থেকে রাফসানের জরাজীর্ণ কণ্ঠ শুনতে পেল। সে সায়মাকে উদ্দেশ্য করে বলল, "ওকে ভেতরে আসতে দাও।"
সায়মা এক মুহূর্ত দ্বিধা করল, তারপর রাফসানকে ভেতরে আসার পথ ছেড়ে দিয়ে নিজে কেবিন থেকে বের হয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।
রাফসান অতি ধীর পায়ে কেবিনের ভেতরে হেঁটে এলো। তাসনিমের বিছানার থেকে কিছুটা দূরে এসে সে থেমে গেল, যেন তাসনিমের অনুমতি ছাড়া আরেক ধাপ এগোতেও তার ভয় হচ্ছে।
"তাসনিম..." রাফসান হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল কেবিনের মেঝেতে। তার দুচোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। "আমাকে ক্ষমা করে দাও... আমি জানি আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপরাধী। কিন্তু আমাদের এই সন্তান... প্লিজ তাসনিম, এই নিষ্পাপ প্রাণটাকে শাস্তি দিও না। তুমি আমাকে যা শাস্তি দিতে চাও দাও, কিন্তু সন্তানটাকে নষ্ট কোরো না।"
তাসনিম বিছানায় সোজা হয়ে বসল। তার চোখে কোনো কান্না ছিল না, ছিল এক পাহাড়প্রমাণ গাম্ভীর্য ও তেজ।
"আমি কোনো অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার কেউ নই, রাফসান," তাসনিম নিচু কিন্তু বরফের মতো শীতল স্বরে বলল। "আর এই সন্তানকে নষ্ট করার কথা আমি এক মুহূর্তের জন্যও ভাবিনি। এটি আমার সন্তান। আমার শরীরের ভেতর এর জন্ম।"
রাফসানের চোখে এক আশার আলো চমকে উঠল। সে হাঁটু হেঁটে তাসনিমের বেডের আরও কাছে এলো। "সত্যি? তুমি সন্তানকে জন্ম দেবে? তাসনিম, আমি বদলে যাব... আমি আমার জীবনের সব সম্পত্তি, সব অহংকার তোমার পায়ে সমর্পণ করব। আমাকে শুধু একটা সুযোগ দাও। আমি তোদের দুজনকে আগলে রাখব... সারাজীবন অনুশোচনার আগুনে পুড়ে হলেও তোদের দাস হয়ে থাকব।"
তাসনিম এক তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
"তুমি আবার ভুল বুঝছ, রাফসান," তাসনিম রাফসানের দিকে সোজা তাকাল। "এই সন্তান আমার। এতে তোমার কোনো নাম, কোনো অধিকার, বা কোনো পরিচয় থাকবে না। বাপের জালিয়াতি আর প্রতারণার কলঙ্ক নিয়ে এই শিশু বড় হবে না। সে জানবে তার কেবল একজনই অভিভাবক—তার মা।"
"না, তাসনিম! প্লিজ এমন কোরো না!" রাফসান কান্নায় ভেঙে পড়ে তাসনিমের বেডের চাদর শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরল। "ওর ধমকে আমারও রক্ত বইছে! আমাকে একদম পর করে দিও না..."
"যে রক্তে প্রতারণা আর ছলনা ভরা, সেই রক্তের পরিচয় আমি আমার সন্তানকে দেব না," তাসনিম অত্যন্ত কঠোরভাবে বলল। "তুমি ভেবেছিলে তোমার এই বিষাক্ত অতীত আর সন্তান দিয়ে তুমি আমাকে আবার তোমার মায়াজালে বাঁধবে? না রাফসান। আজ এই মুহূর্ত থেকে আমাদের সব হিসাব পাকাপাকিভাবে চুকে গেল।"
তাসনিম কলিং বেল চেপে নার্সকে ডাকল। কিছুক্ষণের মধ্যেই নার্স ভেতরে এলো।
"নার্স, এই লোকটিকে বাইরে যেতে বলুন। উনার উপস্থিতিতে আমার শারীরিক সমস্যা হচ্ছে," তাসনিম নার্সের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বলল।
নার্স রাফসানের দিকে তাকিয়ে কড়া স্বরে বলল, "স্যার, আপনি দয়া করে বাইরে যান। পেশেন্টের রেস্ট দরকার।"
রাফসান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, তাসনিমের ভেতরের যে রূপটি সে আজ দেখছে, তা এক অপরাজিতা নারীর রূপ। ভালোবাসার নামে তাকে যে আঘাত সে দিয়েছিল, তাসনিম সেই আঘাতকে নিজের সবচেয়ে বড় শক্তি বানিয়ে ফেলেছে। সেখানে রাফসানের চোখের জল বা অনুশোচনার কোনো স্থান নেই।
রাফসান ধীর পায়ে উল্টো ঘুরে দরজার দিকে হেঁটে গেল। দরজায় হাত রেখে সে শেষবারের মতো পেছনে ফিরে তাকাল। তাসনিম তখন জানালার বাইরের নীল আকাশের দিকে চেয়ে আছে। তার মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
"আমি দূরে থাকব, তাসনিম..." রাফসান ভাঙা গলায় বলল। "কিন্তু দূর থেকেই আমি তোদের রক্ষা করব। কোনো দিন যদি আমাকে প্রয়োজন হয়... আমি ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকব।"
তাসনিম কোনো উত্তর দিল না। দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
ছয় মাস পর—
ধানমন্ডির নতুন আর্কিটেকচারাল সাইটে দাঁড়িয়ে তাসনিম প্রজেক্টের নকশা তদারকি করছিল। তার গর্ভ এখন বেশ বড় ও স্পষ্ট। সুতির হালকা শাড়িতে তাকে দেখাচ্ছে এক অপার্থিব দেবীর মতো। তার চেহারায় কোনো বিষাদ নেই, আছে এক অদম্য আত্মবিশ্বাস আর নতুন জীবনের অপেক্ষা।
দূরে, রাস্তার ওপারে মেহগনি গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল একটি কালো গাড়ি। গাড়ির কাচ সামান্য নামানো। ভেতরে বসে থাকা পুরুষটি দূরবীনের মতো চোখে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল তাসনিমের হাসোজ্জ্বল মুখের দিকে।
রাফসান প্রতিদিন আসে। প্রতিদিন দূর থেকে তাসনিমকে একপলক দেখে যায়। তাসনিম তা জানে, কিন্তু সে কখনো ওদিকে ফিরেও তাকায় না।
তাসনিম তার পেটে হাত রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শরতের মৃদু হাওয়া তার চু
লগুলোকে উড়িয়ে নিয়ে গেল। জীবনের অন্ধকার অধ্যায় পার হয়ে সে আজ এক নতুন ভোরের মুখোমুখি। যে ভোরে কোনো বিষাক্ত ছায়া নেই, আছে কেবল এক মায়ের বেঁচে থাকার অদম্য লড়াই আর ভালোবাসার নতুন সূর্যোদয়।
....