একাত্তরের এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে ইশার রুমের স্লাইডিং উইন্ডো ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকাটা নতুন কিছু নয়। তবে আজকের মেঘলা আকাশটা যেন তার ভেতরের তোলপাড়কে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। আর মাত্র সাতটা দিন। আগামী শুক্রবারে তার আরমানের সাথে আকদ। ড্রয়িংরুমে মেহমানদের আনাগোনা, মিষ্টির বাক্স আর বিয়ের শাড়ির ঘ্রাণে পুরো বাড়ি গমগম করছে। আম্মা দরজার কাছে এসে শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে বললেন, "ইশা, তোর খালামনিরা এসেছে। নিচে আয় মা, আরমানও ফোন করেছিল—তোর সাথে নাকি শাড়ির ম্যাচিং শেরওয়ানি নিয়ে কথা বলবে।"
ইশা ঠোঁটে এক চিলতে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে মাথা নাড়ল। "আসছি আম্মা।"
আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই ইশার বুকটা খাঁ খাঁ করে উঠল। লাল বেনারসির ভাজে ভাজে তার ভবিষ্যত সাজানো, কিন্তু তার মন পড়ে আছে আজ থেকে তিন বছর আগের এক ধূসর অতীতে। রিদওয়ান—তার জীবনের প্রথম আর একমাত্র পুরুষ, যাকে সে নিজের সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে ভালোবেসেছিল। কিন্তু এক রাতে, কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই রিদওয়ান সব সম্পর্ক ভেঙে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল। সেদিন ইশার মনে হয়েছিল, তার বুকের ভেতর থেকে কেউ বুঝি আত্মাটা খুবলে নিয়ে গেছে। এরপর দীর্ঘ তিন বছরের নীরবতা, আর পরিবারের চাপে আরমানের হাত ধরা। আরমান ভালো ছেলে, বিনয়ী, সচ্ছল এবং ইশাকে ভালোবাসে। অন্তত ইশা এতদিন সেটাই জেনে এসেছে।
কিন্তু গত রাতে আসা অচেনা নম্বরের একটা মেসেজ ইশার পুরো পৃথিবী উল্টেপাল্টে দিয়েছে। মেসেজে লেখা ছিল—‘আজ রাত আটটায় ধানমন্ডি লেকের সেই পুরনো বকুলতলাটায় আসবি। তোকে বলতেই হবে কেন আমি চলে গিয়েছিলাম। আর এটাও জানতে হবে, যাকে তুই বিয়ে করতে যাচ্ছিস, সে আসলেও কে।’
মেসেজটা রিদওয়ানের। ওই লেখার ধরন, ওই আবেগ ইশার ভুল হওয়ার কথা নয়।
রাত আটটা। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির সাথে বইছে ঠান্ডা বাতাস। ধানমন্ডি লেকের নির্জন বকুলতলায় একটা দীর্ঘদেহী ছায়া দাঁড়িয়ে আছে। কালো শার্টের হাতা গোটানো, হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। ইশা রিকশা থেকে নেমে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। ছায়াটা পেছনে ফিরতেই ইশার নিঃশ্বাস আটকে এল।
তিন বছরে রিদওয়ান একটুও বদলায়নি, শুধু তার চোখে ঘন হয়েছে এক গভীর গভীর বিষাদ আর চোয়ালের রেখাগুলো আরও শক্ত হয়েছে।
"এসেছিস?" রিদওয়ানের কণ্ঠস্বরটা যেন কোনো গভীর খাদ থেকে ভেসে এল।
ইশা নিজের ক্ষোভ চেপে রেখে বলল, "কেন ডেকেছিস রিদওয়ান? এখন কেন? আমার বিয়ের আর এক সপ্তাহ বাকি। সব শেষ করে দিয়ে এখন এসে আবার কী তামাশা শুরু করতে চাস?"
রিদওয়ান এক পদক্ষেপে ইশার কাছে চলে এল। তাদের মাঝের দূরত্ব নিমেষে শূন্য হয়ে গেল। ইশা পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু রিদওয়ান ঝটকা টানে তাকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরল। রিদওয়ানের গায়ে জড়িয়ে থাকা চেনা পারফিউম, তামাকের ঘ্রাণ আর বৃষ্টির আর্দ্রতা এক মুহূর্তে ইশার সব প্রতিরোধ ভেঙে দিল।
"সব শেষ হয়ে যায়নি ইশা," রিদওয়ান তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলল ইশার কানের কাছে। তার শক্ত দুটো হাত ইশার কোমর শক্ত করে চেপে ধরল। "তোর কি মনে হয় আমি তোকে ভুলে গেছি? এই তিনটা বছর আমি প্রতিটা সেকেন্ড তোর স্পর্শের জন্য ছটফট করেছি।"
"মিথ্যা বলবি না!" ইশা কেঁদে ফেলল, রিদওয়ানের বুকে নিজের দু-হাত দিয়ে ধাক্কা দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে বলল, "তুই আমাকে ফেলে চলে গিয়েছিলি! কোনো কারণ বলিসনি!"
"কারণ আমি জানতাম না রে পাগল!" রিদওয়ান ইশার মুখটা নিজের দুই হাতের তালুতে তুলে নিল। তার বুড়ো আঙুল ইশার ভেজা ঠোঁটে আলতো করে ঘষে দিল। মুহূর্তের মধ্যে ইশার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা তীব্র উত্তাপের ঢেউ খেলে গেল। রিদওয়ানের চোখের তীব্র চাওয়া আর তার হাতের উত্তাপ ইশাকে অবশ করে দিচ্ছিল। রিদওয়ান আরও ঝুকে এল, ইশার ঠোঁটের ঠিক এক ইঞ্চি দূরে এসে ফিসফিস করে বলল, "আমাকে বাধ্য করা হয়েছিল তোর জীবন থেকে সরে যেতে। আর যে আমাকে বাধ্য করেছিল, সে আজ তোর হবু স্বামী—আরমান।"
ইশার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। "কী বলছিস তুই? আরমান? অসম্ভব!"
"সত্যিটা ঢাকা পড়ে গেছে ইশা," রিদওয়ান উন্মাদের মতো ইশার ঘাড়ে মুখ গুজল। তার উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শ ইশার উন্মুক্ত কাঁধে আর গলার খাঁজে গভীর থেকে গভীরতর হতে লাগল। ইশা চোখ বন্ধ করে ফেলল, তার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে। এত বছর পর রিদওয়ানের এই অনিয়ন্ত্রিত, তীব্র ভালোবাসা আর রোমান্স ইশার ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা সব অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলল। তার হাত দুটি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই জড়িয়ে ধরল রিদওয়ানের পিঠ।
রিদওয়ান ইশার নিচের ঠোঁটটা নিজের ঠোঁটে পুরে নিল—এক তীব্র, ক্ষুধাতুর এবং তৃষ্ণার্ত চুম্বনে। ইশা নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রিদওয়ানের চুলে হাত চালিয়ে দিল। বৃষ্টির ফোঁটা তাদের শরীর ভিজিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু তাদের ভেতরে জ্বলছে ভালোবাসার আর বাসনার এক তীব্র দাবানল। রিদওয়ান ইশাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিয়ে তার পিঠের শাড়ির ওপর দিয়ে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, "আরমান তোকে ভালোবাসে না ইশা, সে তোকে একটা ট্রফি মনে করে। আমার সব কিছু কেড়ে নেওয়ার জন্য সে এই খেলা খেলেছে। ৩ বছর আগের সেই রাতের এক্সিডেন্ট, আমার পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত হওয়া, আর তোকে লেখা আমার চিঠিগুলো গায়েব করা—সব আরমানের কাজ।"
ইশা কাঁপতে কাঁপতে রিদওয়ানের বুক থেকে একটু পিছিয়ে এল। তার ঠোঁট দুটো রিদওয়ানের চুম্বনে লাল হয়ে উঠেছে, চোখে বিভ্রান্তি আর তীব্র অনলের ছাপ। "তুই কী বলছিস রিদওয়ান? আরমান কেন এমন করবে?"
"কারণ আরমান আমার সৎ ভাই," রিদওয়ান ইশার চোখে চোখ রেখে এক বিস্ফোরণ ঘটাল। "আর এই সত্যটা সে তোর কাছে এতদিন গোপন করে এসেছে।"
ইশার মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। ধানমন্ডি লেকের ওপর তখন মুষলধারে বৃষ্টি নামছে, আর ইশা দাঁড়িয়ে আছে দুই পুরুষের এক ভয়ানক, গোপন আর কামনাময় এক সত্যের মুখোমুখি হয়ে।
ধানমন্ডি লেকের বৃষ্টিভেজা রাতে রিদওয়ানের মুখে "সৎ ভাই" শব্দটা শুনে ইশার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। বৃষ্টির ঝাপটায় চারপাশ ঝাপসা হয়ে আসছে, কিন্তু ইশার চোখের সামনে সবচেয়ে ঝাপসা এখন তার জীবনের বাস্তবতা।
"সৎ ভাই?" ইশার কাঁপানো কণ্ঠস্বর বৃষ্টির শব্দে প্রায় মিলিয়ে যাচ্ছিল। "আরমান... তোমার ভাই? কিন্তু সে তো কখনো তোর কথা বলেনি! ও তো বলেছে ও পরিবারের একমাত্র ছেলে!"
রিদওয়ান ইশার ভেজা গালটা নিজের হাতের তালুতে চেপে ধরল। তার চোখ দুটি ক্রোধ আর তীব্র কামনায় জ্বলছিল। "কারণ ও তোর সামনে নিজের নিষ্পাপ মুখোশটা বজায় রাখতে চায়, ইশা। আমার বাবা যখন দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তখন আরমান আর তার মা আমাদের পরিবারে আসে। সম্পত্তির ভাগ থেকে শুরু করে আমার বাবার ভালোবাসা—সবকিছুর ওপর ওর নজর ছিল। কিন্তু যখন ও দেখল আমি তোকে পেয়েছি, তোর মতো একটা মেয়েকে ভালোবাসতে পেরেছি, তখন ওর হিংসে দাবানল হয়ে জ্বলে উঠল।"
ইশা মাথা নাড়ল, "না, রিদওয়ান... আরমান এতটাও খারাপ হতে পারে না। ও আমার প্রতি কতটা যত্নশীল, তুই জানিস না—"
কথাটা শেষ করতে পারল না ইশা। রিদওয়ান তাকে এক ঝটকায় লেকের ধারের একটা বড় বটগাছের গুঁড়ির সাথে চেপে ধরল। গাছটির আড়ালে অন্ধকারের তীব্রতা বেশি। রিদওয়ানের এক হাত ইশার কোমরে শক্ত হয়ে বসল, অন্য হাতটা তার ভিজা চুল সরিয়ে গলার উন্মুক্ত জায়গায় গিয়ে থামল।
"ও তোকে যত্ন করে?" রিদওয়ানের বিষাদগ্রস্ত কণ্ঠস্বরে একধরণের ভয়াল অধিকারবোধ ফুটে উঠল। সে ইশার খুব কাছে ঝুঁকে এসে তার ভেজা ঘাড়ে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। ইশার শরীর শিউরে উঠল, এক অজানা রোমাঞ্চ তার মেদহীন শরীরে বিদ্যুতের মতো খেলে গেল। "বল, ইশা... ও কি তোকে এভাবে স্পর্শ করতে পেরেছে? ও কি তোর নিঃশ্বাসের উত্তাপ এভাবে নিজের বুকেই অনুভব করতে পেরেছে?"
রিদওয়ানের উত্তপ্ত ঠোঁটের ছোঁয়া ইশার গলার চামড়ায় এক অদ্ভুত উন্মাদনা তৈরি করল। ইশা তাকে ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইল, কিন্তু তার নিজের শরীরই যেন বিদ্রোহ করে বসল। রিদওয়ানের গায়ের ঘ্রাণ, তার হাতের শক্ত বাঁধন—তিন বছর ধরে এই স্পর্শেরই তো কাঙাল ছিল সে। ইশার মুখ দিয়ে এক হালকা কোঁকানি শব্দ বের হতেই রিদওয়ান তার ঠোঁট দুটো আবার নিজের দখলে নিল।
এবারের চুম্বন শান্ত ছিল না; এতে ছিল এতদিন আটকে রাখা তীব্র ক্ষুধা, রাগ আর ভালোবাসার মিশেল। রিদওয়ানের হাত ইশার ভেজা শাড়ির আঁচল সরিয়ে তার উন্মুক্ত পিঠে উঠে এল। ইশার মেরুদণ্ড বেয়ে এক তপ্ত শিহরণ নেমে গেল। ইশা নিজের চোখ বন্ধ করে রিদওয়ানের শার্টের কলার আঁকড়ে ধরে রইল। ধানমন্ডি লেকের নিঝুম রাতে তাদের দুজনের ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ আর বৃষ্টির ঝমঝম আওয়াজ একাকার হয়ে গেল।
কয়েক মিনিট পর, রিদওয়ান ধীরে ধীরে ইশার ঠোঁট ছেড়ে দিল, কিন্তু তাদের কপাল তখনও একে অপরের সাথে ঠেকে ছিল। দুজনেরই বুক দ্রুত ওঠানামা করছে।
"তিন বছর আগে," রিদওয়ান ফিসফিস করে বলল, "আমার বাবা যখন হঠাৎ মারা যান, তখন আরমান আমার নামে মিথ্যে চুরির অপবাদ দেয়। পুলিশ দিয়ে আমাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। শুধু তাই নয়, ও আমাকে হুমকি দিয়েছিল—আমি যদি দেশ ছেড়ে না যাই, তবে তোকে আর তোর পরিবারকে ও শেষ করে দেবে। আমি তোকে বাঁচানোর জন্যই দেশ ছেড়েছিলাম, ইশা। কিন্তু যাওয়ার আগে তোকে চিঠি লিখেছিলাম, তোর জন্য বার্তা রেখে গিয়েছিলাম... ও সব গায়েব করে দিয়েছে।"
ইশার চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল, যা বৃষ্টির পানির সাথে মিশে এক হয়ে গেল। "তুই আমাকে একবারও বলিসনি... একটা মেসেজ, একটা ফোনও তো করতে পারতিস!"
"আমার ফোন, পাসপোর্ট সব বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল," রিদওয়ান ইশার চোখের পানি নিজের ঠোঁট দিয়ে মুছে দিল। স্পর্শটা এতই কোমল ছিল যে ইশার বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল। "আমি দুবাইয়ে গিয়ে দিনমজুরের কাজ শুরু করেছিলাম। দিন-রাত খেটে আবার নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছি, শুধু তোর কাছে ফিরে আসার জন্য। তিন দিন আগে আমি ঢাকায় পা দিয়েছি। আর এসেই শুনলাম, ও তোকে বিয়ে করছে!"
ইশার মনটা দ্বিধাদ্বন্দ্বের এক চরম সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছিল। একপাশে আরমান—যে গত দুই বছর ধরে তার এবং তার পরিবারের ছায়া হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে, তাকে সম্মান দিয়েছে, ভালোবাসা দিয়েছে। আর অন্যপাশে রিদওয়ান—তার হৃদয়ের স্পন্দন, যার একটা ছোঁয়ায় ইশা নিজের অস্তিত্ব ভুলে যায়, কিন্তু যার অতীত গল্পটা বিশ্বাস করাও কঠিন।
"আমি কীভাবে বিশ্বাস করব রিদওয়ান?" ইশা কাঁপা কণ্ঠে বলল। "আরমান যদি তোর সৎ ভাই-ই হয়, তবে আমার বাবা-মা তো ওর পরিবারকে চেনে। তারা তো কখনো তোর কথা বলেনি!"
রিদওয়ান রহস্যজনকভাবে হাসল। "কারণ আরমান ওর মায়ের আগের পক্ষের সন্তান, আমার বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী ওকে সঙ্গে করে এনেছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর ও নিজের নাম-পরিচয় বদলে ফেলে নতুন ব্যবসায়ী হিসেবে সমাজে দাঁড়িয়েছে। তোর বাবা-মা শুধু ওর বর্তমান পরিচয়টা চেনে, ওর পেছনের অন্ধকারটা নয়।"
রিদওয়ান নিজের পকেট থেকে একটা পুরনো, জলছাপ পড়া ড্রাইভ বের করে ইশার হাতে গুঁজে দিল। "এটাতে সব প্রমাণ আছে। তিন বছর আগের সেই রাতের পুলিশি রিপোর্ট, আরমানের চক্রান্তের অডিও রেকর্ড, আর আমার বাবার আসল ওসিয়তনামা—যেখানে আরমানকে ত্যাজ্য করা হয়েছিল। তুই নিজে দেখবি, তারপর সিদ্ধান্ত নিবি।"
ইশা পেনড্রাইভটা শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরল।
রিদওয়ান এগিয়ে এসে ইশার কপালে এক দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিল। তারপর ইশার কানের কাছে গিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলল, "আজ রাতে বাড়ি ফিরে যাবি। কিন্তু মনে রাখবি ইশা, তোর এই শরীর, তোর এই মন—সবকিছু শুধু আমার। ওই জালিয়াত আরমানকে তোর ধারেকাছেও ভিড়তে দিবি না। যদি ও তোকে স্পর্শ করার চেষ্টা করে, আমি ওকে শেষ করে দেব।"
রিদওয়ান অন্ধকার বৃষ্টিতে মিলিয়ে গেল। ইশা দাঁড়িয়ে রইল একা, ধানমন্ডি লেকের ঘাটে।
রাত সাড়ে দশটা।
ইশা ভেজা কাপড়ে বাড়ি ফিরল। পুরো বাড়ি আলোয় ঝলমল করছে। বসার ঘরে আরমান বসে আছে ইশার বাবার সাথে চা খেতে খেতে হাসিমুখে কথা বলছে। ইশাকে ঢুকতে দেখে আরমান দাঁড়িয়ে গেল। তার পরনে দামী নীল রঙের কুর্তা, মুখে সেই পরিচিত, মার্জিত মিষ্টি হাসি।
"কোথায় গিয়েছিলে ইশা?" আরমান উদ্বিগ্ন গলায় এগিয়ে এল। "বাইরে এত বৃষ্টি, পুরো ভিজে গেছ তো! তোমার ফোনটাও বন্ধ ছিল।"
আরমান ইশার ভিজা হাতটা ধরতে যেতেই ইশা এক অদ্ভুত আতঙ্কে হাতটা পিছিয়ে নিল।
আরমানের হাসিখুশি মুখটাতে মুহূর্তের জন্য এক ছায়া নেমে এল। তার চোখ দুটো সরু হয়ে গেল। সে ইশার দিকে এক পা এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বলল, "কী হয়েছে ইশা? তোমাকে এত অস্থির দেখাচ্ছে কেন? আর তোমার গলায়... ওটা কিসের দাগ?"
ইশা চমকে উঠে হাত দিয়ে নিজের গলা চেপে ধরল। রিদওয়ানের কামড় আর চুম্বনের লাল দাগটা শাড়ির আঁচল সরে গিয়ে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে! আরমানের চোখ তখন হিংস্রতায় চকচক করে উঠছে।
আরমানের সরু হয়ে আসা চোখ আর হিংস্র দৃষ্টি দেখে ইশার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। গলায় রিদওয়ানের রেখে যাওয়া তপ্ত ভালোবাসার চিহ্নটা হাত দিয়ে আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করল সে। ইশার হৃৎপিণ্ড যেন বুকের খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
"কীসের দাগ ইশা?" আরমান আরও এক পা এগিয়ে এল। তার গলা থেকে সব মার্জিত ভাব উবে গিয়ে এক অদ্ভুত শীতলতা নেমে এসেছে। "তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে? আর তোমার শাড়ির আঁচল এভাবে অগোছালো কেন?"
ঠিক তখনই বসার ঘর থেকে ইশার বাবা বেরিয়ে এলেন। "কী হলো আরমান, দাঁড়িয়ে রইলে কেন? ওরে ইশা, তুই এত ভিজেছিস কেন রে মা? তাড়াতাড়ি গিয়ে কাপড় বদলে নে, ঠান্ডা লেগে যাবে।"
বাবার উপস্থিতি যেন ইশাকে এক বিশাল রক্ষা কবচ এনে দিল। ইশা মুহূর্তের সুযোগ পেয়ে দ্রুত বলল, "আমি... আমি ঘরে যাচ্ছি বাবা।"
আরমানকে অতিক্রম করার সময় ইশা অনুভব করল আরমানের চোখ দুটো তার ওপর তপ্ত ছাইয়ের মতো বিঁধছে। আরমান নিচু স্বরে, শুধু ইশা শুনতে পায় এমনভাবে বলল, "সত্যিটা কিন্তু আমি জেনেই ছাড়ব, ইশা।"
ইশা নিজের ঘরে ঢুকে দরজায় খিল তুলে দিল। তার বুক তখনো ধড়ফড় করছে। শাড়ির ভেজা কাপড় শরীর থেকে খসে পড়তেই সে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। গলার বাঁ পাশে আর কাঁধের কাছে রিদওয়ানের ঠোঁটের দেওয়া গাঢ় লাল দাগগুলো স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে। আঙুল দিয়ে স্পর্শ করতেই ইশার গায়ের ভেতর এক অনির্বচনীয় উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ল। ওই দাগগুলো শুধু স্পর্শ নয়, ওগুলো ছিল রিদওয়ানের অগাধ অধিকার আর কামনার সিলমোহর।
ইশা দ্রুত তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছে একটা তোয়ালে জড়িয়ে তার ল্যাপটপটা অন করল। রিদওয়ানের দেওয়া সেই পেনড্রাইভটা ল্যাপটপে প্লাগ করতেই বেশ কিছু ফোল্ডার ভেসে উঠল।
প্রথম ফোল্ডারটিতে ছিল তিন বছর আগের আইনি কাগজপত্র আর পুলিশি রিপোর্টের স্ক্যান কপি। ইশার চোখ কপালে উঠল—রিদওয়ান যা বলেছিল, তা এক বর্ণও মিথ্যে নয়! আরমানের মা যখন রিদওয়ানের বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী হয়ে এই পরিবারে আসেন, তখন আরমানের আসল নাম ছিল 'আশফাক আরমান'। আরমানের বাবা ছিলেন অন্য একজন। রিদওয়ানের বাবা মারা যাওয়ার পর সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার জন্য আরমান রিদওয়ানের বিরুদ্ধে এক বিশাল জালিয়াতির মামলা ঠুকে দেয়।
অন্য একটি অডিও ফাইলে ক্লিক করতেই বাজতে শুরু করল আরমানের গলার আওয়াজ। একজন ভাড়াটে গুন্ডাকে নির্দেশ দিচ্ছে আরমান—"রিদওয়ান যেন কোনোভাবেই ঢাকা ছাড়তে না পারে। ওর পাসপোর্ট আটকে রাখ, আর ইশার বাড়ি যেন ও যেতে না পারে। ইশাকে আমার চাই-ই চাই। রিদওয়ানের সব কিছু কেড়ে নেওয়ার পর ইশাকে নিজের করে পাওয়াটাই হবে ওর ওপর আমার সেরা প্রতিশোধ।"
অডিওটা শুনে ইশার শরীর ঘামে ভিজে গেল। যে আরমানকে সে এতদিন শান্ত, আদর্শ পুরুষ বলে জেনে এসেছে, সে আসলে এক বিষধর সাপের চেয়েও ভয়ঙ্কর! ইশার মনটা ভয়ে আর ঘৃণায় রি রি করে উঠল, কিন্তু একই সাথে রিদওয়ানের প্রতি গভীর ভালোবাসায় আর অনুশোচনায় তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। রিদওয়ান তার জন্য কতটা অত্যাচার সহ্য করেছে!
হঠাৎ দরজায় সশব্দে টোকা পড়ল।
ইশা চমকে উঠে ল্যাপটপটা বন্ধ করল। "কে?"
"ইশা, আমি আরমান।" বাইরে থেকে ভেসে এল আরমানের শান্ত কিন্তু ধারালো কণ্ঠ। "তোমার সাথে একটা জরুরি কথা আছে। দরজাটা খোলো।"
"আমি এখন পোশাক পাল্টাচ্ছি আরমান, কাল সকালে কথা হবে।" ইশা নিজের কণ্ঠ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল।
"আমি জানি তুমি ভেতরে একা আছ ইশা। দরজাটা খোলো, নয়তো আমি বাবার কাছ থেকে মাস্টার কি নিয়ে আসছি।" আরমানের গলায় এবার এক প্রচ্ছন্ন হুমকি।
ইশা না পেরে দরজা একটুখানি খুলল। আরমান নিমেষে ভেতরে ঢুকে দরজায় খিল তুলে দিল। ইশার পরনে তখনো কেবল তোয়ালে জড়ানো, ভেজা চুল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে তার উন্মুক্ত পিঠে। আরমানের চোখ ইশার নগ্ন কাঁধ আর গলার লাল দাগটার ওপর গিয়ে আটকালো। তার চোখে লালসার সাথে যুক্ত হলো চরম হিংসা।
"কে ওটা?" আরমান ইশার দু-হাত শক্ত করে চেপে ধরে তাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। "কে তোকে এভাবে স্পর্শ করার সাহস পেয়েছে? রিদওয়ান এসেছে, তাই না? ওই কুকুরটা ফিরে এসেছে?"
ইশা ব্যথায় কোঁকড়ে উঠল, কিন্তু তার চোখের ভয় নিমেষে বদলে গেল ঘৃণায়। "হাত ছাড়ো আরমান! তোমার আসল চেহারা আমি জেনে গেছি। তুমি কত বড় প্রতারক, কত বড় শয়তান!"
আরমান অট্টহাসি হেসে উঠল। "ওহ, তাহলে ওই হারামি তোকে সব বলে দিয়েছে? তাতে কী আসে যায় ইশা? আর মাত্র চারদিন পর তুই আমার হবি। তোর বাবা-মা আমার ভক্ত। তুই ওদের গিয়ে কী বলবি? কেউ তোর কথা বিশ্বাস করবে না!"
আরমান ইশার খুব কাছাকাছি চলে এল। তার হাত ইশার কোমরের তোয়ালের ওপর চেপে বসল। "রিদওয়ান তোকে ভালোবেসেছে, তাই না? কিন্তু তুই তো এখন আমার। তোর এই শরীর আমি আজই আমার করে নেব, দেখি ওই রিদওয়ান তোকে কীভাবে বাঁচায়!"
আরমানের কুৎসিত স্পর্শে ইশার গা গুলিয়ে উঠল। সে নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে আরমানকে এক ধাক্কা মারল। আরমান অসামাল হয়ে খাটের কোণে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল। ইশা দ্রুত ড্রয়ার থেকে নিজের ফোনটা তুলে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে ভেতর থেকে লক করে দিল।
কাঁপতে কাাঁপতে ইশা রিদওয়ানের নম্বরে ডায়াল করল।
দ্বিতীয় রিং হতেই রিদওয়ান ফোন ধরল। "ইশা?"
"রিদওয়ান... ও আমাকে মেরে ফেলবে! ও জেনে গেছে! ও আমার ঘরে ঢুকেছিল—" ইশা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল।
ফোনের ওপাশ থেকে রিদওয়ানের এক ভয়ঙ্কর গর্জন ভেসে এল। তার পাশে বাতাসের গর্জন শোনা যাচ্ছে, বোঝা যাচ্ছে সে বাইক চালাচ্ছে। "ইশা, শোন আমার কথা! তুই বাথরুমের ভেতরেই থাকবি। বাথরুমের গ্লাস উইন্ডোটা দিয়ে পেছনের বাগানে নামার পাইপ আছে, তুই ওখান দিয়ে নামতে পারবি?"
"আমি... আমি জানি না রিদওয়ান, আমার খুব ভয় করছে!"
"ভয় পাবি না ইশা! তুই আমার বাঘিনী। নিজের মনকে শক্ত কর। তোর তোয়ালে ছেড়ে একটা ড্রাই ড্রেস পর। আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে তোর বাড়ির নিচে আসছি। আজ আরমানকে শেষ না করা পর্যন্ত আমার শান্তি নেই!"
বাথরুমের দরজায় তখন আরমান সশব্দে লাথি মারতে শুরু করেছে। "ইশা! দরজা খোলো! নয়তো আমি দরজা ভেঙে ফেলব!"
ইশার সামনে এখন দুটো পথ। হয় আরমানের মতো শয়তানের কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়া, নয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি নিয়ে ভালোবাসার মানুষের কাছে পালিয়ে যাওয়া। ইশা তার চোখের পানি মুছে দ্রুত বাথরুমের সেলফ থেকে শালোয়ার-কামিজ পরে নিল। বাথরুমের কাঁচের স্লাইডিং জানালাটা খুলতেই রাতের ঠান্ডা বাতাস তার মুখে এসে লাগল।
নিচে তাকাতেই ইশা দেখল, পেছনের বাগানের এক কোণে কালো বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রিদওয়ান। বৃষ্টি থেমেছে, চাঁদের আলোয় রিদওয়ানের মুখটা দেখা যাচ্ছে—যেখানে ফুটে আছে ইশাকে ছিনিয়ে নেওয়ার এক আদিম উন্মাদনা।
রিদওয়ান ওপরের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়াল, "নেমে আয় ইশা! আমার বুকে চলে আয়!"
বাথরুমের সরু জানালার কাঁচের ভেতর দিয়ে রাতের ঠান্ডা হাওয়া ইশার মুখ স্পর্শ করল। দরজায় আরমানের লাথির আওয়াজ ক্রমশ তীব্র হচ্ছে, সাথে গালিগালাজ। ইশার আর দ্বিধা করার সময় ছিল না। বাথরুমের জানালা দিয়ে গলে ড্রেনেজ পাইপটা দু-হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল সে। বৃষ্টিতে পাইপটা কিছুটা পিচ্ছিল, কিন্তু নিচে দাঁড়িয়ে থাকা রিদওয়ানের চোখ দুটো ইশাকে যে সাহস দিচ্ছিল, তা সব ভয়কে উবিয়ে দিল।
এক পা এক পা করে নামতে গিয়ে ইশার পায়ের পাতা ছিলে গেল, কিন্তু সে তোয়াক্কা করল না। চার-পাঁচ ফুট বাকি থাকতেই রিদওয়ান দু-হাত বাড়িয়ে ইশার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিচে নামিয়ে আনল। মাটি ছোঁয়ামাত্রই ইশা রিদওয়ানের বুকের ভেতর আছড়ে পড়ল।
রিদওয়ানের তপ্ত বুকের স্পন্দন ইশার কানের কাছে ড্রাম বাজানোর মতো বাজছিল। রিদওয়ান ইশার ভেজা মুখটা দু-হাতে তুলে ধরে উন্মাদের মতো তার কপাল, চোখ আর গালে চুমু আঁকতে লাগল। "তোর কিছু হয়নি তো ইশা? ও তোকে হাত দেয়নি তো?" রিদওয়ানের কণ্ঠস্বরে উদ্বেগের পাশাপাশি ফুঁসে ওঠা আগ্নেয়গিরির মতো রাগ।
"আমি ঠিক আছি রিদওয়ান," ইশা কাঁপতে কাাঁপতে বলল। "চল এখান থেকে, ও যেকোনো মুহূর্তে নেমে আসবে।"
রিদওয়ান ইশাকে নিজের পেছনে বাইকে বসিয়ে হেলমেট পরিয়ে দিল। ইশা শক্ত করে রিদওয়ানের চওড়া কোমর জড়িয়ে ধরে তার পিঠে মুখ লুকাল। ঝড়ের বেগে বাইক ছুটে চলল ঢাকার জনশূন্য রাস্তা ধরে। বাতাসের ঝাপটায় ইশার চুল উড়ছিল, আর ভেতরে জ্বলছিল এক অদ্ভুত উন্মাদনা। তিন বছর পর সে আবার তার ভালোবাসার মানুষের ছোঁয়ায় সুরক্ষিত।
বাইক এসে থামল উত্তরা সেক্টর চারের এক নির্জন তিনতলা বাড়ির সামনে। এটি রিদওয়ানের নিজস্ব ফ্ল্যাট—যা সে গোপনে কিনে রেখেছিল, আরমান বা অন্য কারও ধারণার বাইরে।
ঘরের ভেতরে ঢুকেই রিদওয়ান দরজায় ভারী লক লাগিয়ে দিল। ঘরের ভেতরে হালকা নীল আলো জ্বলছে। রিদওয়ান ইশার দিকে ফিরল। তার চোখের দৃষ্টিতে এখন আর কোনো তাড়া নেই, আছে শুধু এক গভীর, আদিম আর অনিয়ন্ত্রিত বাসনা।
"অবশেষে তুই আমার কাছে ইশা," রিদওয়ান নিচু ও গম্ভীর গলায় বলল। সে ধীর পায়ে ইশার দিকে এগিয়ে এল।
ইশার পরনের জামা তখনও ভেজা, শরীর ঠান্ডায় কাঁপছিল। কিন্তু রিদওয়ান যখন ইশার কাছাকাছি এসে দাঁড়াল, সেই ঠান্ডা নিমেষে উত্তাপে বদলে গেল। রিদওয়ান ইশার ওড়নাটা ধরে এক টানে মেঝেতে ফেলে দিল। তারপর সে ইশার ভিজা চুলগুলো একপাশে সরিয়ে দিয়ে গলার সেই লাল দাগটার ওপর নিজের গরম ঠোঁট চেপে ধরল।
ইশার মুখ দিয়ে এক হালকা সিৎকার বেরিয়ে এল। তার দু-হাত স্বয়ংক্রিয়ভাবেই রিদওয়ানের শার্ট আঁকড়ে ধরল। রিদওয়ানের এক হাত ইশার পিঠের ওপর দিয়ে নেমে গিয়ে তার কোমর শক্ত করে নিজের শরীরের সাথে চেপে ধরল। তাদের অন্তর্বাসের আড়াল পেরিয়ে দু-জনের উষ্ণ শরীর যেন এক হয়ে যেতে চাইল।
"রিদওয়ান..." ইশা বিড়বিড় করে উঠল, তার চোখ বন্ধ।
"বল আমার জান," রিদওয়ান ইশার নিচের ঠোঁটটা নিজের দাঁত দিয়ে আলতো করে চেপে ধরে ফিসফিস করল। "বল তুই শু
ধু আমার। ওই শয়তানটা তোকে ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখেছিল, কিন্তু তোর এই সুবাস, তোর এই শরীর—সবকিছুতে শুধু আমার নাম লেখা।"
রিদওয়ান ইশাকে কোলে তুলে নিয়ে বেডরুমে গিয়ে নামাল। নরম তোশকের ওপর ইশাকে শুইয়ে দিয়ে সে নিজে ইশার ওপর ঝুঁকিয়ে পড়ল। তার শার্টের বোতামগুলো একে একে খুলে যাওয়ার পর রিদওয়ানের সুগঠিত, উষ্ণ বুক ইশার উন্মুক্ত ত্বকে গিয়ে ঠেকলো। রিদওয়ানের হাত ইশার কামিজের স্লাইড কেটে ভেতরে প্রবেশ করল, স্পর্শ করল ইশার উরু আর পেটের নরম চামড়া।
ইশার শিরদাঁড়া বেয়ে শিহরণের তীব্র তরঙ্গ খেলে গেল। সে নিজের দু-পা দিয়ে রিদওয়ানের কোমর পেঁচিয়ে ধরল। দীর্ঘ তিন বছরের বিরহ, যন্ত্রণা আর আকাঙ্ক্ষা এক মুহূর্তে গভীর রোমান্স আর কামনার দাবানলে রূপ নিল। রিদওয়ানের ঠোঁট ইশার গাল, গলা পেরিয়ে বুকের দিকে নেমে যেতেই ইশা তার চুল আঁকড়ে ধরে তাকে আরও কাছে টেনে নিল। তাদের শ্বাসের উত্তাপ ঘরের নীল আলোকেও যেন উষ্ণ করে তুলছিল।
ঠিক এমন এক মহূর্তে—যখন ইশা আর রিদওয়ান নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়ে ভালোবাসার সাগরে ডুবে যাচ্ছিল—হঠাৎ পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ চলে গেল।
অন্ধকারের মাঝে ড্রয়িংরুমের কাঁচের ব্যালকনির দরজা সশব্দে ভেঙে পড়ার বিকট আওয়াজ হলো!
রিদওয়ান এক মুহূর্তে ইশার ওপর থেকে সরে গিয়ে সতর্ক হয়ে উঠল। সে ইশার ঠোঁটে চটজলদি একটা শান্ত করার চুমু দিয়ে বলল, "তুই বিছানা থেকে উঠবি না ইশা।"
অন্ধকার ঘরে এক শীতল কণ্ঠস্বর ভেসে এল—"কী ভেবেছিলি রিদওয়ান? তুই আমার হাত থেকে ইশাকে লুকিয়ে রাখবি? তোকে আমি তিন বছর আগে জ্যান্ত কবর দিতে চেয়েছিলাম, আজ সেই কাজটা শেষ করব!"
কাঁচের ভাঙা টুকরোর ওপর দিয়ে ভারী বুটের শব্দ ছড়িয়ে পড়তে লাগল। আরমান এসে গেছে, আর তার হাতে রিভলভারের ধাতব ফ্রেমটা চাঁদের হালকা আলোয় চকচক করে উঠল।
অন্ধকার বেডরুমে চাঁদের ফ্যাকাশে আলো এসে পড়েছে। ঘরের দরজায় রিভলভার হাতে দাঁড়িয়ে থাকা আরমানের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে কোনো ক্ষুধার্ত হিংস্র পশুর ছায়া। তার চোখে উন্মাদনা, মুখে এক বিষাক্ত হাসি।
রিদওয়ান ইশাকে নিজের পেছনে ঠেলে দিল। ইশা ভয়ে কাঁপতে কাাঁপতে রিদওয়ানের খালি পিঠটা শক্ত করে চেপে ধরল। রিদওয়ানের শরীরের পেশিগুলো শক্ত হয়ে উঠেছে, সে যেন যেকোনো মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য তৈরি।
"তুই কতটা নিচ আরমান, তা আমি জানতাম," রিদওয়ান ভারী ও দাপুটে গলায় বলল। "কিন্তু তুই যে নিজের কপাল নিজে পোড়াতে এখানে চলে আসবি, তা ভাবিনি।"
"কপাল আমার নয়, তোর পুড়ছে রিদওয়ান!" আরমান পিস্তলটা সোজা রিদওয়ানের বুক বরাবর তাক করল। "তিন বছর আগে তোকে জ্যান্ত মেরে ফেললে আজ এই দিন দেখতে হতো না। ইশা আমার! ওর সাথে আমার আকদের সব আয়োজন শেষ। তুই মাঝখান থেকে এসে আমার সাজানো খেলা নষ্ট করবি, আর আমি চেয়ে চেয়ে দেখব?"
আরমান এক পা এগিয়ে এসে ইশার দিকে তাকাল। "ইশা, তুই ভাবলি ওই ড্রেনেজ পাইপ দিয়ে নেমে পালিয়ে যাবি আর আমি টের পাব না? তোর ফোনে আমি ট্র্যাকার বসিয়ে রেখেছিলাম অনেক আগে থেকেই। তুই কোথায় যাস, কার সাথে কথা বলিস—সব আমার নজরে ছিল। আয়, চলে আয় আমার কাছে। ও তোকে কী দিতে পারবে? ওর তো নিজেরই কোনো পরিচয় নেই!"
ইশা রিদওয়ানের পেছন থেকে বেরিয়ে এসে ঘৃণাভরে তাকাল। "চুপ করো আরমান! তোমার সত্যি রূপ আমি দেখে ফেলেছি। তোমার রক্তে শুধু জালিয়াতি আর হিংসা ভরা। আমি কোনোদিন তোমার হব না, মরে গেলেও না!"
"তাহলে তোকে মেরেই আমি আমার করব!" আরমানের কণ্ঠস্বরে উম্মাদনা ফেটে পড়ল। সে ট্রিগারে আঙুল চেপে ধরতেই রিদওয়ান চিতার মতো এক লাফ দিল।
'ডিসুম'—শব্দে পুরো ঘর কেঁপে উঠল। গুলিটি রিদওয়ানের কাঁধের একপাশ ঘেঁষে গিয়ে পেছনের দেয়ালে লাগল।
রিদওয়ান এক ঝটকায় আরমানের রিভলভার ধরা হাতটা পেঁচিয়ে ধরে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। দু-জন চেনা শত্রুর মধ্যে শুরু হলো এক জীবন-মরণ মারামারি। আরমান হিংস্রভাবে রিদওয়ানের পেটে লাথি মারল, রিদওয়ান ব্যথায় একটু পিছিয়ে গেলেও পরক্ষণেই আরমানের চোয়ালে এক কড়া ঘুষি বসাল। রক্ত ছড়িয়ে পড়ল আরমানের মুখ থেকে।
মেঝেতে পড়ে যাওয়া রিভলভারটার দিকে আরমান হামাগুড়ি দিয়ে যেতেই ইশা দৌড়ে গিয়ে পিস্তলটা এক লাথি মেরে খাটের নিচে পাঠিয়ে দিল।
"ইশা, তুই...!" আরমান গর্জে উঠে ইশার দিকে তেড়ে আসতে চাইল, কিন্তু রিদওয়ান পেছন থেকে আরমানের গলার নালী চেপে ধরল।
রিদওয়ানের চোখে তখন নিজের ভালোবাসাকে রক্ষা করার তীব্র ক্ষোভ আর কামনার মেলবন্ধন। সে আরমানকে মেঝেতে আছড়ে ফেলে একের পর এক ঘুষি মারতে লাগল। "আমার ইশার দিকে চোখ তোলার শাস্তি কী জানিস? তোকে আমি আজ শেষ করে দেব!"
আরমান নিস্তেজ হয়ে মেঝেতে পড়ে গেল, তার মুখ রক্তে ভেসে যাচ্ছে। কিন্তু সে হাসছিল, এক বিকৃত হাসি। "তুই আমাকে মারবি রিদওয়ান? মার... কিন্তু মনে রাখিস, বাইরে পুলিশ আসছে। আমি আসার আগেই তোকে আবার কিডন্যাপার বানিয়ে পুলিশে খবর দিয়ে এসেছি। তোর কপালে আবার জেল লেখা আছে!"
ঠিক তখনই ঘরের বাইরে পুলিশের সাইরেনের বিকট শব্দ বেজে উঠল। লাল-নীল আলো জানালার কাঁচ দিয়ে ঘরের ভেতরে এসে পড়তে লাগল।
ইশার বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। "রিদওয়ান! পুলিশ...!"
রিদওয়ান আরমানকে ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার কাঁধের কাটা অংশ দিয়ে রক্ত ঝরছে, বুক দ্রুত ওঠানামা করছে। সাইরেনের আলোয় রিদওয়ানের তামাটে শরীর, তার চোখের অকুতোভয় দৃষ্টি ইশার মনে এক তীব্র আবেগের সৃষ্টি করল।
রিদওয়ান ইশার কাছে এগিয়ে এসে তার ভেজা গাল দুটি নিজের রক্তমাখা হাতের তালুতে নিল। "ইশা, ওরা আমাকে আবার আটকাতে চাইছে। কিন্তু এবার আমি তোকে ছেড়ে কোথাও যাব না।"
রিদওয়ান ইশার ঠোঁটে এক অতল, তৃষ্ণার্ত আর গভীর চুম্বন এঁকে দিল। রক্তের স্বাদ আর ভালোবাসার উত্তাপ এক হয়ে তাদের ঠোঁটে মিশে গেল। ইশা উন্মাদের মতো রিদওয়ানের চুলে হাত চালিয়ে সেই ভালোবাসায় সাড়া দিল। বাইরের সাইরেন আর বিপদের তোয়াক্কা না করে তারা যেন নিজেদের এক অন্য জগতে হারিয়ে ফেলল—যেখানে কেবল অধিকার, তীব্র আকর্ষণ আর ভালোবাসার রোমাঞ্চ।
দরজা ভেঙে পুলিশ আর ইশার বাবা ভেতরে ঢোকার ঠিক আগের মুহূর্তে রিদওয়ান ইশার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, "শেষ পর্বটা এখনও বাকি ইশা... আজ রাতে হয় সব শেষ হবে, নয়তো তুই চিরদিনের জন্য আমার হবি।"
ধামাধাম শব্দে দরজার খিল ভেঙে ভেতরের দিকে আসতেই পুলিশের কড়া টর্চের আলো এসে পড়ল রুমের ভেতরে। পেছনে ইশার বাবা, তার চোখে-মুখে চরম হতাশা আর ক্ষোভ। কিন্তু পুলিশের টিম যখন ঘরে ঢুকল, তখন দৃশ্যটা আরমানের সাজানো নাটকের মতো ছিল না।
মেঝেতে রক্তভেজা অবস্থায় আরমান পড়ে আছে, আর খাটের নিচে থেকে ইশা বের করে এনেছে আরমানের সেই রিভলভারটি।
"থামুন অফিসার!" ইশা চিৎকার করে উঠল। তার কণ্ঠস্বরে কোনো কাঁপুনি ছিল না, ছিল এক অপ্রতিরোধ্য দৃঢ়তা। ইশা দ্রুত তার ল্যাপটপটা অন করে টেবিলের ওপর ঘুরিয়ে দিল। "কোনো কিছু স্পর্শ করার আগে আপনারা এই অডিও রেকর্ড আর তিন বছর আগের পুলিশি জালিয়াতির ফাইলগুলো দেখুন। যে আরমানকে আপনারা ভিকটিম ভাবছেন, সে ভিকটিম নয়—সে একজন ব্ল্যাকমেইলার, একজন খুনি!"
পুলিশ অফিসার এগিয়ে এসে ল্যাপটপের অডিওটা প্লে করলেন। পুরো ঘরে আরমানের নিজের মুখেই স্বীকার করা সেই জঘন্য চক্রান্তের কথা গমগম করে বেজে উঠল—কীভাবে সে রিদওয়ানকে ফাঁসিয়েছিল, কীভাবে সে ইশাকে জোর করে পাওয়ার জন্য গুন্ডা লাগিয়েছিল।
ইশার বাবা বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। যে ছেলেকে তিনি নিজের জামাই করতে যাচ্ছিলেন, সে এত বড় প্রতারক?
অফিসার দ্রুত নির্দেশ দিলেন, "আরমানকে অ্যারেস্ট করো! অ্যাম্বুলেন্স ডাকো, আর ওর সব আইনি কাগজ বাজেয়াপ্ত করো।"
আরমানকে যখন পুলিশ হাতকড়া পরিয়ে টেনে বের করে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন তার চোখে ছিল পরাজয়ের চরম অপমান। ইশার বাবা অপরাধীর মতো রিদওয়ানের সামনে এসে দাঁড়ালেন। রিদওয়ানের রক্তঝরা কাঁধের দিকে তাকিয়ে তার চোখ ভিজে এল। "আমাকে ক্ষমা করে দিস বাবা... আমি চেনা মানুষকে চিনতে ভুল করেছিলাম। তুই আমার মেয়ের জীবন বাঁচিয়ে দিলি।"
রিদওয়ান ইশার বাবার হাত দুটি ধরে বলল, "কাকাবাবু, ইশাকে আমি আমার নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। আজ আর কোনো লুকোচুরি নয়, আমি ইশাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে আমার ঘরে নিয়ে যেতে চাই।"
ইশার বাবা রিদওয়ানের মাথায় হাত রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "যে ভালোবাসা এত ঝড়ঝাপটা সয়ে টিকে থাকে, তাকে আটকানোর ক্ষমতা কারও নেই। তোদের আকদ আজই হবে।"
পরদিন ভোর।
বাইরে হালকা কুয়াশা আর নতুন সূর্যের নরম আলো। সব ঝড়ঝাপটা থামার পর ইশা আর রিদওয়ানের আকদ সম্পন্ন হয়েছে অত্যন্ত সাদামাটাভাবে, কিন্তু পরম ভালোবাসায়।
রিদওয়ানের সেই উত্তরা ফ্ল্যাটের বেডরুমটা আজ নতুন করে সেজেছে। সাদা গোলােপর ঘ্রাণে পুরো ঘর মৌ মৌ করছে। ইশা লাল বেনারসি পিয়াজ রঙা শাড়িতে নিজেকে মুড়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে-মুখে এক অদ্ভুত লাজুক আলো।
পেছন থেকে দুটি শক্ত চওড়া হাত এসে ইশার কোমর জড়িয়ে ধরল। রিদওয়ান তার বুকটা ইশার পিঠের সাথে লেপটে দিল। রিদওয়ানের পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি, কাঁধে ব্যান্ডেজ কিন্তু চোখে গভীর কামনার অনল।
"অবশেষে তুই শুধুই আমার, ইশা," রিদওয়ান ফিসফিস করে ইশার খোলা ঘাড়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলল। তার ঠোঁটের ছোঁয়া ইশার কানে গিয়ে লাগতেই ইশা শিউরে উঠে রিদওয়ানের বুকে নিজের মাথা হেলিয়ে দিল।
"তুই আমাকে আর কখনো ছেড়ে যাবি না তো রিদওয়ান?" ইশা আয়নায় রিদওয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।
রিদওয়ান কোনো কথা বলল না। সে ইশাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে এক টানে তার আরও কাছে নিয়ে এল। রিদওয়ানের এক হাত ইশার পিঠের ব্লাউজের ফিতা খুলে দিল, অন্য হাত ইশার ভেজা ঠোঁটের ওপর মেখে দিল অধীর উন্মাদনা।
"ছেড়ে যাওয়ার জন্য তোকে ফিরে পাইনি ইশা," রিদওয়ান ইশার লাল বেনারসির আঁচলটা মেঝের ওপর খসিয়ে দিল। তার তপ্ত ঠোঁট ইশার গাল, চিবুক পেরিয়ে গলার সেই পুরনো ভালোবাসার দাগটার ওপর গভীর থেকে গভীরতর এক কামড় বসাল।
ইশা নিজের সবটুকু আবেগ দিয়ে রিদওয়ানের ঘাড় পেঁচিয়ে ধরল। দীর্ঘ তিন বছরের হাহাকার, যাতনা আর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তারা হারিয়ে গেল এক পরম তৃপ্তির সাগরে। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা ভোরের প্রথম আলো এসে পড়ল দুটি এক হয়ে যাওয়া ভালোবাসার শরীরের ওপর—যেখা
নে আর কোনো রহস্য নেই, নেই কোনো বাধা, কেবল জমে রইল আদিম আর গাঢ় ভালোবাসার এক অমর কাব্য।
....