অসমাপ্ত সম্পর্কের আগুন

কার্তিকের শেষ। ঢাকা শহরের উপর দিয়ে এক চিলতে হিমেল হাওয়া বইতে শুরু করেছে। রাতের গুলশান দুই নম্বরের এক নির্জন ক্যাফেতে বসে ছিল মাহির। হাতে ধরা কফির কাপটি ইতিমধ্যেই ঠান্ডা হয়ে এসেছে, কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। কাচের দেয়ালের ওপারে রাস্তায় নিয়ন আলোর খেলা। মাহির চোখের চশমাটা একটু ঠিক করে নিয়ে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকাল, কিন্তু সেখানে কোনো শব্দই তার মাথায় ঢুকছে না।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত অস্থিরতা মোচড় দিয়ে উঠছে। ঠিক আজ থেকে পাঁচ বছর আগের এক কাঁচাসুতোয় বোনা সম্পর্কের স্মৃতি তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। নুসরাত। নামটি মনে পড়তেই মাহিরের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে, বুকের বাম পাশে একটা তীব্র, পুরাতন ব্যথার অনুভূতি নতুন করে জেগে ওঠে।

নুসরাত আর মাহির—একসময় উত্তরার রাস্তার ধরে রিকশায় ঘুরে বেড়ানো একজোড়া পাগলপ্রেমিক ছিল। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে জীবনের সমস্ত সুখ খুঁজে পেত তারা। কিন্তু হঠাৎ কোনো এক ঝড়ের রাতে, কোনো একটা স্পষ্ট উত্তর না দিয়েই নুসরাত মাহিরের জীবন থেকে হাওয়া হয়ে যায়। কোনো চিঠির টুকরো ছিল না, কোনো বিদায়বেলার দীর্ঘশ্বাস ছিল না। খালি একটা এক লাইনের মেসেজ—"আমাকে আর খোঁজার চেষ্টা কোরো না, আমি যুক্তরাজ্যে চলে যাচ্ছি।"

¦Ëk¢x/춺'ƒú

মাহির ব্যাকুল হয়ে ছুটে গিয়েছিল নুসরাতের বাড়িতে, কিন্তু ততক্ষণে ফ্ল্যাটের দরজায় ঝুলছিল প্রকাণ্ড এক তালা। সেই থেকে মাহির নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। হৃদয়ের যে অংশে আবেগ ছিল, সেটাকে সে পাথর করে ফেলেছে। প্রেম, মায়া, ভালোবাসা—সবকিছুকে সে নিজের জীবন থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে এখন শুধুই এক সফল, কিন্তু যন্ত্রের মতো বাঁচতে থাকা স্থপতি।

ক্যাফের কাঠের ভারী দরজাটা খুলতেই ওপরের ছোট পিতলের ঘণ্টাটা বেজে উঠল। এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস ভেতরে ঢুকে পড়ার সাথে সাথেই এক পরিচিত, অত্যন্ত চেনা সুবাস মাহিরের নাকে ধাক্কা দিল। বেলি ফুল আর হালকা ভ্যানিলার মিশ্রণ। এই সুবাসটা মাহিরের স্মৃতিতে খোদাই করা ছিল।

মাহির আড়চোখে দরজার দিকে তাকাল। আর অমনি তার হাতের কফির কাপটা থরথর করে কেঁপে উঠল।

সামনে দাঁড়িয়ে আছে নুসরাত।

পাঁচটা বছর বদলে দিয়েছে তাকে, কিন্তু তার সেই গাঢ় কালো চোখের মায়া এতটুকু কমেনি। হালকা সুতি শাড়ির ওপর জড়ানো একখানা আলগা চাদর, উস্কোখুস্কো চুলগুলো ঘাড়ের ওপর এলিয়ে পড়েছে। নুসরাতের চোখ দুটো ক্যাফের চারপাশে ঘুরে অবশেষে এসে থামল মাহিরের টেবিলে।

মাহির পাথরের মতো বসে রইল। তার বুকের ভেতরের রক্ত যেন থমকে গিয়েছে। নুসরাত ধীর পায়ে এগিয়ে এলো তার দিকে। প্রতিটা পদক্ষেপে তার চোখের ভেতর স্পষ্ট ফুটে উঠছে এক ব্যাকুলতা, যা মাহির বহু বছর ধরে মিস করেছে।

"মাহির..."

নুসরাতের গলা দিয়ে খুব হালকা, কাঁপাকাঁপা একটা আওয়াজ বের হলো। যেন বহুকাল কোনো নাম উচ্চারণ না করা ঠোঁট দুটো হঠাৎ কথা বলতে গিয়ে ইতস্তত করছে।

মাহির কোনো উত্তর দিল না। সে ল্যাপটপের স্ক্রিনটা সশব্দে বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল। তার উচ্চতা আর শীতল ব্যক্তিত্বের সামনে নুসরাত যেন এক মুহূর্তে ছোট হয়ে গেল। মাহিরের চোখে তখন কোনো ভালোবাসা ছিল না, সেখানে জমাট বেঁধে ছিল তীব্র ঘৃণা আর অবহেলা।

"তুমি এখানে কী করছ, নুসরাত?" মাহিরের গলার আওয়াজ এতটাই নিচু আর ধারালো ছিল যে নুসরাত এক কদম পিছিয়ে গেল।

"আমি... আমি তোমার সাথে কথা বলতে এসেছি, মাহির। প্লিজ, পাঁচ মিনিট আমাকে শোনো," নুসরাতের চোখে পানি টলটল করে উঠল। সে এগিয়ে এসে মাহিরের একখানা হাত আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করল।

কিন্তু মাহির এক ঝটকায় তার হাত সরিয়ে দিল। "আমাকে ছোঁয়ার ধৃষ্টতা দেখাবে না! পাঁচ বছর আগে যখন কোনো কথা না বলে চলে গিয়েছিলে, তখন আমার কথা ভাবোনি? আজ হঠাৎ কী মনে করে এসেছ? নিজের অপরাধের ক্ষমা চাইতে? নাকি নতুন কোনো খেলা খেলতে?"

"না, মাহির! তুমি যেমন ভাবছ তেমনটা নয়! আমি বাধ্য ছিলাম..." নুসরাতের কণ্ঠ কেঁপে উঠল, সে মাহিরের চোখের দিকে তাকাল।

মাহির এক নির্দয় হাসি হাসল। "বাধ্য ছিলে? বাহ্! খুব সুন্দর অজুহাত। কিন্তু দুঃখের বিষয়, মাহির এখন আর সেই উনিশ বছরের বোকা ছেলেটা নেই যে তোমার এই সাজানো চোখের পানিতে গলে যাবে। আমার জীবন থেকে তুমি পাঁচ বছর আগেই মরে গিয়েছ। এখন এখান থেকে চলে যাও।"

কথাগুলো বলেই মাহির তার ব্যাগটা তুলে নিয়ে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। কিন্তু নুসরাত তার পথ আটকে দাঁড়াল। ক্যাফের মৃদু আলোয় নুসরাতের মুখটা ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল, কিন্তু তার চোখে ছিল এক একগুঁয়ে জেদ।

"তুমি আমাকে তাড়িয়ে দিতে পারো, মাহির। আমাকে ঘৃণা করতে পারো। কিন্তু আমি আজ রাতে তোমার কাছ থেকে সরব না। যতক্ষণ না তুমি আমার কথা শুনছ, আমি তোমার পিছ ছাড়ব না।"

মাহির থমকে দাঁড়াল। নুসরাতের এত কাছাকাছি আসার কারণে তার উড়তে থাকা চুলে মাহিরের গাল ছুঁয়ে গেল। এক অদ্ভুত বিদ্যুৎ খেলে গেল মাহিরের পুরো শরীরে। মাহিরের ভেতরের ঘুমন্ত পশুট যেন জেগে ওঠার উপক্রম হলো। কত রাত এই শরীরটাকে নিজের বুকে জড়িয়ে রাখার জন্য সে আকুল হয়ে কেঁদেছে, কত রাত সে নুসরাতের এই ঠোঁট দুটোর স্পর্শের জন্য পাগল হয়েছে!

রাগে, ক্ষোভে আর অবরুদ্ধ কামনায় মাহিরের চোখ লাল হয়ে উঠল। সে হুট করে নুসরাতের কবজি শক্ত করে ধরে তাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। ক্যাফের এক কোণে, অন্ধকারের মধ্যে নুসরাতের পিঠ ঠেকে গেল ঠান্ডা দেয়ালে, আর মাহিরের সুগঠিত শরীর এসে চেপে বসল তার ওপর।

"তুমি এখনো আমার ধৈর্য পরীক্ষা করছ, নুসরাত?" মাহির বিড়বিড় করে বলল, তার উত্তপ্ত নিঃশ্বাস নুসরাতের ঘাড়ে ও গালে গিয়ে পড়ছিল।

নুসরাত মাহিরের অত কাছাকাছি এসে বুক ভরে শ্বাস নিল। তার বুকের ওপর মাহিরের চওড়া ছাতি চেপে বসেছে। নুসরাতের হৃদস্পন্দন দ্রুত হতে শুরু করল। সে মাহিরের চোখ থেকে চোখ সরাতে পারছিল না। মাহিরের এই উগ্র, হিংস্র রূপ সে আগে কখনো দেখেনি, কিন্তু তবুও এই পুরুষটিকেই সে নিজের সমস্ত সত্তা দিয়ে ভালোবেসেছে।

"মাহির... আমায় শাস্তি দাও, কিন্তু আমাকে ছেড়ে যেও না," নুসরাত কাঁপা কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল।

মাহির আরও একধাপ কাছে সরে এলো। তাদের দুজনের ঠোঁটের মধ্যে তখন মাত্র কয়েক মিলিমিটারের দূরত্ব। মাহিরের হাতের মুঠো নুসরাতের কোমরে শক্ত হলো, কাপড়ের ওপর দিয়েই সে নুসরাতের শরীরের উত্তাপ অনুভব করতে পারছিল। নুসরাতের চোখ বন্ধ হয়ে এলো, তার ঠোঁট দুটো আলতো করে ফাঁক হয়ে গেল মাহিরের স্পর্শের আশায়।

মাহির তার ঠোঁটটা নুসরাতের গালে, ঘাড়ে ঘষে আনল। নুসরাতের শরীরটা শিহরিত হয়ে উঠল, সে মাহিরের শার্টের কলারটা দুহাতে খামচে ধরল। এক তীব্র ভালোবাসার উষ্ণতা আর নিষিদ্ধ আকর্ষণ মুহূর্তের মধ্যে তাদের গ্রাস করে ফেলল। নুসরাতের শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে উঠল, মাহিরের ঠোঁটের ছোঁয়া তার গলার ভাঁজে পৌঁছাতেই সে হালকা করে কোঁকায়া উঠল।

কিন্তু ঠিক যে মুহূর্তে নুসরাত নিজেকে সম্পূর্ণ মাহিরের কাছে সঁপে দিল, ঠিক তখনই মাহির নিজেকে এক ঝটকায় সরিয়ে নিল।

নুসরাত দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে চোখ খুলল। তার শ্বাস তখনও দ্রুত চলছে, ঠোঁট দুটো লাল হয়ে আছে স্পর্শের কামনায়। সে অবাক হয়ে তাকাল মাহিরের দিকে।

মাহির তার শার্টের হাতা ঠিক করতে করতে এক নিষ্ঠুর হাসি হাসল। "কী ভেবেছিলে, নুসরাত? একটু শারীরিক মেলামেশা, একটু ছোঁয়াছুঁয়ি আর আমি আবার তোমার গোলাম হয়ে যাব? তুমি ভুল ভাবছ। এই শরীর, এই রূপ—এগুলো দিয়ে তুমি পাঁচ বছর আগে আমাকে ভুলিয়ে রাখতে পেরেছিলে, আজ আর পারবে না।"

নুসরাতের বুকটা যেন হাজার টুকরো হয়ে গেল। "মাহির, প্লিজ..."

"কথা বাড়াবে না," মাহির পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে টেবিলের ওপর কিছু টাকা রেখে দিল। তারপর নুসরাতের দিকে এক নজরে তাকিয়ে বলল, "আজ রাতের পর আমার চোখের সামনে আর কখনো আসবে না। যদি আসো, তবে পরিণতি ভালো হবে না।"

মাহির ঝড়ের গতিতে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে গেল। বাইরের রাতের হিমেল হাওয়া তার মুখে এসে লাগল, কিন্তু তার ভেতরের আগুন শান্ত হলো না। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সে অনবরত স্টিয়ারিংয়ে আঘাত করতে লাগল। নুসরাতের শরীরের সেই চেনা গন্ধ, তার ঠোঁটের ফাঁকের আকুতি এখনও মাহিরের মনে তাণ্ডব চালাচ্ছে।

অন্যদিকে, ক্যাফের অন্ধকারের দেয়াল ধরে নুসরাত হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরতে লাগল।

"তুমি আমাকে ভুল বুঝছ মাহির..." নুসরাত নিজের বুকের ওপর হাত রেখে বিড়বিড় করল। "যদি তুমি জানতে, আমি কেন চলে গিয়েছিলাম... যদি জানতে, তোমাকে বাঁচাতে গিয়ে আমি কী হারিয়েছি..."

রাতের ঢাকা শহরের রাস্তা ধরে মাহিরের গাড়ি ছুটে চলল অজানার উদ্দেশ্যে। তাদের এই অসমাপ্ত ভালোবাসার রাত কেবল শুরু হলো, যার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর সত্য।

মাহির সারা রাত ঘুমাতে পারেনি। ধানমন্ডির নিজের ফ্ল্যাটের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে সে একের পর এক সিগারেট পুড়িয়ে ছাই করেছে। ভোরের আলো ফুটতেই ঢাকা শহর আবার কর্মব্যস্ত হয়ে উঠল, কিন্তু মাহিরের ভেতরের ঝড় থামেনি। নুসরাতের ওই ব্যাকুল চোখ, তার শরীরের উত্তাপ আর কান্না জমা কণ্ঠস্বর মাহিরকে প্রতি মুহূর্তে তাড়া করে ফিরছে।

সকাল দশটায় মাহির তার আর্কিটেকচার ফার্মের অফিসে পৌঁছাল। তার বিশাল কাচের কেবিনে বসে সে একমনে ড্রয়িং ব্লু-প্রিন্ট দেখছিল, কিন্তু তার মন পড়ে ছিল গতকাল রাতের সেই অন্ধকার ক্যাফেতে।

ঠিক দুপুর বারোটায় তার অ্যাসিস্ট্যান্ট সাজিদ কেবিনের দরজায় টোকা দিল।

"স্যার, একজন লেডি আপনার সাথে দেখা করতে এসেছেন। নাম বললেন নুসরাত পারভীন। কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেই, কিন্তু বললেন অত্যন্ত জরুরি।"

মাহিরের হাতের কলমটা থমকে গেল। সে চোখ তুলে তাকাল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, কিন্তু পর মুহূর্তেই নিজের ভেতরের অস্থিরতা সামলে নিয়ে শীতল কণ্ঠে বলল, "ভেতরে আসতে দাও।"

দরজা খুলে নুসরাত ভেতরে প্রবেশ করল। পরনে সাদা রঙের একটা সুতি সালোয়ার-কামিজ, চোখেমুখে সারারাত না ঘুমানোর ক্লান্তি স্পষ্ট। তার লালচে হয়ে থাকা চোখ দুটো মাহিরের দিকে স্থির হতেই সে থমকে দাঁড়াল।

মাহির চেয়ার থেকে উঠল না। হেলান দিয়ে বসে ঠান্ডা চোখে নুসরাতকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।

"আমি গতকাল রাতে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছিলাম, আমার চোখের সামনে আর আসবে না," মাহিরের গলায় কঠিন বরফের মতো শীতলতা। "তোমার আত্মসম্মানবোধ কি একেবারেই শেষ হয়ে গেছে, নুসরাত?"

নুসরাত ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে টেবিলের সামনে দাঁড়াল। সে মাহিরের এই কটু কথায় কান দিল না। তার দৃষ্টিতে ছিল এক গভীর মায়া আর করুণা।

"আমার আত্মসম্মান অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে মাহির, যেদিন আমি তোমাকে ছেড়ে বাধ্য হয়ে বিমানে উঠেছিলাম," নুসরাত নিচু কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল। "তুমি আমাকে যা খুশি বলতে পারো, যত ইচ্ছা অপমান করতে পারো। কিন্তু আজ আমি এখান থেকে এক পা-ও নড়ব না, যতক্ষণ না আমার শেষ কথাটা তোমাকে বলতে পারছি।"

মাহির এক উপহাসের হাসি হাসল। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে নুসরাতের দিকে এগিয়ে এলো। নুসরাতের ঠিক সামনে এসে দাঁাতেই তাদের দূরত্ব আবার শূন্যের কাছাকাছি চলে এলো। মাহির নুসরাতের থুতনিটা নিজের ডান হাতের দুই আঙুলে শক্ত করে চেপে ধরল।

"কী বলবে তুমি? কী বাহানা বানিয়েছ শুনি? পাঁচ বছর ধরে বিদেশে কোন ধনকুবেরের সাথে ফুর্তি করে এখন টাকা শেষ হয়ে গেছে? নাকি নতুন করে আমার ঘাড়ে চেপে বসার ধান্দা?"

মাহিরের প্রতিটি শব্দ বিষাক্ত তীর হয়ে নুসরাতের বুকে গিয়ে বিঁধল। নুসরাতের চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে মাহিরের আঙুলে পড়ল। কিন্তু সে এবার পিছু হটল না।

নুসরাত মাহিরের হাতের ওপর নিজের হাতটা রাখল। তার নরম, উষ্ণ হাতের ছোঁয়ায় মাহিরের শরীর আবার শিহরিত হয়ে উঠল। নুসরাত মাহিরের চোখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, "আমার দিকে তাকাও মাহির। সত্যিই কি বিশ্বাস করো আমি তোমাকে ছেড়ে ফুর্তি করতে গিয়েছিলাম? সত্যিই কি তোমার হৃদয়ে একবারও মনে হয় না, নুসরাত অন্য কোনো পুরুষের হতে পারে না?"

নুসরাতের এই প্রশ্নে মাহির থমকে গেল। তার আঙুলের মুঠো আলগা হয়ে এলো। নুসরাতের শরীরের চেনা সুবাস, তার এই অসীম আকুতি মাহিরের শক্ত বাঁধ ভেঙে ছারখার করে দিচ্ছে। মাহির তার হাত সরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু নুসরাত তার শক্ত হাত দুটো ধরে নিজের বুকের ওপর চেপে ধরল।

"হাত সরিও না মাহির," নুসরাত ফিসফিস করে বলল। "অনুভব করো আমার বুকের ভেতরের স্পন্দন। এই হৃদয়টা পাঁচ বছর আগে যেভাবে তোমার জন্য স্পন্দিত হতো, আজকেও ঠিক সেভাবেই হচ্ছে। এখানে তুমি ছাড়া অন্য কারও নাম লেখা নেই।"

মাহির অনুধাবন করতে পারল নুসরাতের হৃদয়ের দ্রুত গতি। কাপড়ের নিচ থেকে নুসরাতের উন্মুক্ত ত্বকের উত্তাপ মাহিরের হাতের তালুতে ছড়িয়ে পড়ল। এক তীব্র উন্মাদনা মাহিরের রগে রগে বইতে শুরু করল। সে নুসরাতের কোমর ধরে নিজের দিকে হ্যাঁচকা টানে টেনে আনল।

নুসরাত ছিটকে এসে মাহিরের চওড়া ছাতিতে আছড়ে পড়ল। মাহির নুসরাতের ঘাড়ের পেছনে হাত দিয়ে তার মুখটা ওপরের দিকে তুলে ধরল। নুসরাতের ঠোঁট দুটো কামনায় কাঁপছিল। মাহিরের চোখ নেমে এলো সেই ভেজা ঠোঁটে।

"তুমি আমার জীবন ধ্বংস করেছ নুসরাত," মাহির গজগজ করে উঠল, তার চোখ হিংস্র আর তীব্র বাসনায় ভরে উঠেছে। "তোমার ওপর আমার কোনো অধিকার নেই, তবুও কেন এই শরীরটা তোমাকে চেনে? কেন এখনো তোমাকে আমার বুকের ভেতর চূর্ণবিচূর্ণ করে দিতে ইচ্ছা করে?"

"করো মাহির... আমাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দাও," নুসরাত মাহিরের শার্টের কলার আঁকড়ে ধরে নিজের ঠোঁট দুটো মাহিরের গালের খুব কাছে নিয়ে এলো। "তোমার ঘৃণা, তোমার রাগ, তোমার সব যন্ত্রণা আমাকে দিয়ে দাও। আমি সব সইতে রাজি।"

মাহির আর নিজেকে সামলাতে পারল না। কেবিনের দরজায় লক লেগেছে কি না, সে পরোয়া করল না। সে নুসরাতকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে টেবিলের ওপর বসিয়ে দিল। ফাইলপত্র নিচে পড়ে গেল। মাহির নুসরাতের দুই পায়ের মাঝে এসে দাঁড়িয়ে তার গলার ভাঁজে মুখ গুঁজে দিল।

নুসরাত এক গভীর সুখে চোখ বন্ধ করে মাহিরের চুলে আঙুল চালিয়ে দিল। মাহিরের তপ্ত ঠোঁটের কামড় নুসরাতের গলায়, কাঁধে এক অচেনা আনন্দের অনুভূতি তৈরি করল। নুসরাতের মুখ থেকে হালকা এক কোঁকানোর শব্দ বের হয়ে এলো। মাহির নুসরাতের কামিজের ফিতা আলতো করে টেনে দিল, উন্মুক্ত হয়ে পড়ল তার ধপধপে সাদা কাঁধ আর বুকের উপরিভাগ। মাহির সেখানে নিজের ঠোঁট দিয়ে এক তীব্র ক্ষতের সৃষ্টি করল—যে ক্ষত কেবল কামনার নয়, তীব্র অনুরাগের।

নুসরাতের শরীর ধনুকের মতো বেঁকে উঠল। সে মাহিরের পিঠ নিজের নখ দিয়ে খামচে ধরল। দুজনে এক নিষিদ্ধ উত্তাপের সাগরে তলিয়ে যাচ্ছিল, যেখানে ঘৃণা আর ভালোবাসা একাকার হয়ে গিয়েছে।

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে, নুসরাতের সালোয়ারের পকেট থেকে ফোনটা ঘনঘন বেজে উঠল।

মাহির থমকে গেল। সে নুসরাতের ঘাড় থেকে মুখ তুলে তাকাল। মাহিরের চোখে তখনও কামনার লাল আভা, কিন্তু নুসরাতের চেহারায় হঠাৎ ফুটে উঠল এক আতঙ্কের ছায়া।

নুসরাত কাঁপতে কাঁপতে পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। কোনো এক অজ্ঞাত নম্বর। নুসরাতের মুখ এক মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল, গায়ের সমস্ত রক্ত যেন শুষে নেওয়া হয়েছে।

মাহির খেয়াল করল নুসরাতের এই আচমকা পরিবর্তন। সে সরে দাঁড়িয়ে নুসরাতের জামাটা ঠিক করে দিল।

"কার ফোন?" মাহিরের কণ্ঠ আবার বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে এলো। "কাকে ভয় পাচ্ছ তুমি নুসরাত?"

নুসরাত ফোনটা কেটে দিল। সে টেবিল থেকে নেমে কাঁপতে থাকা পায়ে দাঁড়াল। সে মাহিরের দিকে তাকাল, কিন্তু তার চোখে এখন ভালোবাসার জায়গায় খেলা করছে এক গভীর আতঙ্ক।

"মাহির... আমাকে যেতে হবে," নুসরাত হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।

"কোথাও যাবে না তুমি!" মাহির তার হাত চেপে ধরল। "গতকাল রাতেও তুমি নাটক করেছ, আজও করছ। আমাকে নিয়ে খেলছ কেন?"

"আমি খেলছি না মাহির!" নুসরাত হঠাৎ কেঁদে উঠল। "তুমি বুঝছ না, আমি এখানে বেশিক্ষণ থাকলে তোমার বিপদ হবে! ওরা... ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে!"

মাহির ভ্রু কুঁচকে তাকাল। "কারা মেরে ফেলবে? কিসের বিপদের কথা বলছ তুমি?"

নুসরাত নিজের ঠোঁট চেপে ধরে কান্নার বেগ সামলানোর চেষ্টা করল। তারপর গভীর এক শ্বাস নিয়ে বলল, "পাঁচ বছর আগে রায়হান চৌধুরীর নাম শুনেছিলে? উত্তরার প্রভাবশালী সেই শিল্পপতি, যার সাথে তোমার বাবার ব্যবসায়িক ঝামেলা হয়েছিল?"

মাহির স্তম্ভিত হয়ে গেল। "রায়হান চৌধুরী? সে তো পাঁচ বছর আগে খুন হয়েছিল। তার সাথে তোমার চলে যাওয়ার কী সম্পর্ক?"

নুসরাত মাহিরের দিকে এক পা এগিয়ে এলো। তার চোখে টলটল করছে জল।

"রায়হান চৌধুরীকে তুমি খুন করোনি মাহির," নুসরাত কেঁপে উঠে বলল। "কিন্তু পাঁচ বছর আগে সেই রাতে রায়হান চৌধুরীর রক্তাক্ত লাশের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পিস্তলটাতে তোমার আঙুলের ছাপ ছিল। তোমাকে ফাঁসি থেকে বাঁচাতে, তোমাকে জেলের হাত থেকে রক্ষা করতে আমাকে ওই খুনের দায় নিজের ঘাড়ে নিতে হয়েছিল... আর রায়হান চৌধুরীর লোকজনের কাছ থেকে তোমাকে বাঁচাতে গিয়ে আমাকে এই দেশ ছাড়তে হয়েছিল।"

মাহিরের মাথার ওপর যেন এক প্রকাণ্ড বাজ পড়ে ভেঙে পড়ল। তার হাত থেকে নুসরাতের কবজি আলগা হয়ে গেল। সে এক পা পিছিয়ে গেল, অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইল নুসরাতের দিকে।

বাইরে তখন ঢাকার আকাশে কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে, এক কালবৈশাখী ঝড়ের পূর্বাবাস নিয়ে।

মাহির স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অফিসের কেবিনের এয়ার কন্ডিশনারের ঠান্ডা হাওয়াতেও তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠেছে। ঘরের ভেতরের বাতাস যেন এক মুহূর্তে ভারী হয়ে গেল।

"তুমি... তুমি কী বলছ এসব নুসরাত?" মাহিরের গলায় অবিশ্বাসের সুর। "রায়হান চৌধুরী খুন হয়েছিল তার নিজের ফার্মহাউসে। পুলিশ রিপোর্টে এসেছিল ওটা ডাকাত দলের কাজ। আর সেখানে আমার নাম কীভাবে এলো?"

নুসরাত এক পা এগিয়ে এসে মাহিরের চোখের দিকে তাকাল। তার দুগাল বেয়ে তখনও অশ্রুধারা নেমে আসছে।

"পুলিশের রিপোর্ট সাজানো হয়েছিল মাহির," নুসরাত রুদ্ধশ্বাসে বলতে শুরু করল। "পাঁচ বছর আগের সেই অভিশপ্ত রাতের কথা তোমার মনে আছে? তোমার বাবা আর রায়হান চৌধুরীর মধ্যে জমির চুক্তি নিয়ে বড় ঝামেলা হয়েছিল। রায়হান চৌধুরী ছিল এক ধূর্ত শয়তান। সে তোমাকে ব্ল্যাকমেইল করার জন্য তার ফার্মহাউসে ডেকে পাঠিয়েছিল।"

মাহির তার কপাল চেপে ধরল। আবছা কিছু স্মৃতি তার মনে ভেসে উঠতে লাগল। সে রাতে রায়হান চৌধুরী তাকে ফোন করে ডেকেছিল, কিন্তু মাহির যখন সেখানে পৌঁছায়, তখন পুরো ফার্মহাউস অন্ধকারে ডুবে ছিল।

"তুমি যখন সেখানে পৌঁছাও, রায়হান চৌধুরী ইতিমধ্যেই খুন হয়ে পড়ে ছিল," নুসরাত বলতে লাগল, তার শরীরটা থরথর করে কাঁপছিল। "কেউ একজন তাকে খুব কাছ থেকে গুলি করেছিল। তুমি হতভম্ব হয়ে মেঝের ওপর পড়ে থাকা পিস্তলটা কুড়িয়ে নিয়েছিলে। ঠিক তখনই রায়হানের লোক আর দুর্নীতিবাজ কিছু পুলিশ সেখানে ঢোকার পরিকল্পনা করছিল—তোমাকে হাতে-নাতে খুনি হিসেবে পাকড়াও করার জন্য। তোমাকে ফাঁসানোটাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য, যাতে তোমার বাবার সব সম্পত্তি তারা গ্রাস করতে পারে।"

"তাহলে আমি সেখান থেকে বের হলাম কীভাবে? আর তুমি কীভাবে জানলে এসব?" মাহির ব্যাকুল হয়ে প্রশ্ন করল।

"কারণ সে রাতে আমি তোমার পিছু পিছু গিয়েছিলাম," নুসরাত এক তিক্ত হাসি হাসল। "আমি জানতাম রায়হান চৌধুরী কেমন লোক। তোমাকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে আমি আগেই ঢুকে পড়েছিলাম। তুমি যখন রক্ত আর পিস্তল দেখে ট্রমাটাইজড হয়ে পড়েছিলে, আমি তোমাকে পেছনের দরজা দিয়ে বের করে দিই। তোমার হাতের পিস্তলটা আমি নিজের হাতে নিই... তোমার আঙুলের ছাপ মোছার সময় পাইনি মাহির, তাই পিস্তলটা আমি নিজের কাছে রেখে দিই।"

মাহিরের বুকটা ধক করে উঠল। সে নুসরাতের দুটো বাহু শক্ত করে ধরে ঝাঁকুনি দিল। "তারপর? তারপর কী হয়েছিল?"

"তারপর রায়হান চৌধুরীর ছোট ভাই, পারভেজ চৌধুরী এসে হাজির হয়," নুসরাতের গলায় এক ভয়ংকর ক্ষোভ ফুটে উঠল। "সে আমাকে ধরে ফেলে। সে জানত খুনি তুমি নও, কিন্তু সে এই সুযোগটাকে কাজে লাগাতে চেয়েছিল। পারভেজ আমাকে দুটি পথ দিয়েছিল—হয় তোমাকে কালকে সকালে পুলিশ খুনের মামলায় গ্রেপ্তার করে ফাঁসির মঞ্চে পাঠাবে, না হয় আমাকে চিরতরে তোমার জীবন থেকে সরে যেতে হবে এবং রায়হান চৌধুরীর গোপন কিছু ডকুমেন্টস তার হাতে তুলে দিতে হবে।"

মাহির স্তব্ধ হয়ে গেল। তার পায়ের তলার মাটি যেন সরে যাচ্ছে। "তুমি... তুমি আমার জন্য এই নরক সহ্য করলে? আমাকে একটা বারও জানাওনি কেন?"

"তোমাকে জানালে কি তুমি আমাকে যেতে দিতে, মাহির?" নুসরাত কাঁদো কাঁদো গলায় বলল। "তুমি নিজের ঘাড়ে সব দোষ তুলে নিতে! জেলখানায় পচে মরতে! আমি তোমাকে ভালোবাসতাম মাহির... তোমার জীবনের বিনিময়ে আমি নিজের সব সুখ বিসর্জন দিতে এক পায়ে রাজি ছিলাম। পারভেজ চৌধুরী তার রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে মামলাটা ডাকাত দলের ওপর চালিয়ে দেয়, আর বিনিময়ে আমাকে রাতারাতি বিলেতে পাঠিয়ে দেয়। শর্ত ছিল, আমি কোনোদিন তোমার সামনে আসব না।"

মাহিরের মাথার রগগুলো ফুলে উঠল। সে তীব্র কষ্টে আর অনুশোচনায় চোখ বন্ধ করে ফেলল। পাঁচটা বছর সে যাকে ঘৃণা করেছে, যার নাম মনে পড়লে সে বিষাক্ত গালি দিয়েছে, সে নারীটি তাকে রক্ষা করার জন্য নিজের জীবনটাকে তছনছ করে দিয়েছে!

"তাহলে আজ? আজ কেন ফিরে এলে?" মাহির ফুঁপিয়ে উঠল।

নুসরাত মাহিরের খুব কাছে সরে এলো। সে তার আলতো হাত দুটো মাহিরের মুখে রাখল। মাহির আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, সে নুসরাতকে সজোরে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরল।

মাহিরের বুকের সাথে নুসরাতের পেষণ ঘটতেই নুসরাত এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মাহির নুসরাতের চুলে মুখ গুঁজে দিল। নুসরাতের গায়ের বেলি ফুলের চেনা গন্ধটা এখন আর কোনো যন্ত্রণার নয়, বরং এক গভীর অনুশোচনার ওষুধ হয়ে ধরা দিল।

"আজ কেন ফিরে এলাম জানো?" নুসরাত মাহিরের গলায় নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল। "কারণ পারভেজ চৌধুরী আবার জেগে উঠেছে। সে খবর পেয়েছে আমি বাংলাদেশে ফিরেছি। সে ভেবেছিল পাঁচ বছরে সব শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু তার কাছে সেই রাতের আসল সত্যের কোনো প্রমাণ রয়ে গেছে। সে এখন আমাকে হুমকি দিচ্ছে—যদি আমি আবার তার কাছে ধরা না দিই, তবে সে পাঁচ বছর আগের সেই পিস্তল আর তোমার আঙুলের ছাপের ফাইলটা সিআইডির কাছে জমা দেবে।"

মাহির নুসরাতের মুখটা উঁচু করে ধরল। তার চোখে তখন ভালোবাসার সাথে সাথে এক খুনে মেজাজ ফুটে উঠেছে।

"সে আমার ক্ষতি করবে? করতে দাও!" মাহির গর্জে উঠল। "আমি জেলে যাব, আমার ফাঁসি হবে—তাতেও আমার ভয় নেই! কিন্তু আমি আর এক মুহূর্তের জন্যও তোমাকে নিজের থেকে দূরে যেতে দেব না।"

"না মাহির, নো!" নুসরাত মাহিরের ঠোঁটে নিজের আঙুল চেপে ধরল। "আমি তোমাকে আবার কোনো বিপদে পড়তে দেব না। পাঁচ বছর তোমার বিরহ সহ্য করেছি, আর পারব না।"

মাহির এক তীব্র আবেগে নুসরাতের ঠোঁট দুটো নিজের ঠোঁট দিয়ে চেপে ধরল। এই চুম্বন আগের মতো হিংস্র ছিল না, এতে ছিল গভীর অনুশোচনা, ক্ষুধা আর বাঁধভাঙা ভালোবাসা। নুসরাত মাহিরের গলা জড়িয়ে ধরে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করল।

মাহির নুসরাতের ভেজা ঠোঁট চুষে নিতে লাগল, তার হাত পৌঁছে গেল নুসরাতের কোমরে। সালোয়ারের ফাঁক দিয়ে নুসরাতের নগ্ন ত্বকে মাহিরের গরম হাতের ছোঁয়া লাগতেই নুসরাত কেঁপে উঠল। মাহির নুসরাতকে আরও শক্ত করে টেনে নিল নিজের দিকে, যেন তাদের দুজনের মাঝে বাতাসও গলতে না পারে।

অফিসের কাচের দেয়ালে বাইরের বৃষ্টি আছড়ে পড়তে লাগল। ঘরের ভেতরে কেবল দুজন প্রেমিক-প্রেমিকার তপ্ত শ্বাস-প্রশ্বাস আর কামনার এক মাতাল সুর। মাহিরের ঠোঁট নুসরাতের মুখ থেকে নেমে তার চিবুক, গলা আর বুকের খাঁজে এসে পৌঁছাল। নুসরাত মাথা পেছন দিকে হেলিয়ে দিয়ে মাহিরের চুলে আঙুল চালিয়ে দিল, তার মুখ থেকে বের হলো এক তৃপ্তির গোঙানি।

"মাহির... আমি শুধু তোমার," নুসরাত হাঁপাতে হাঁপাতে বলল। "আমাকে নিজের করে নাও, সব ভুলিয়ে দাও..."

মাহির নুসরাতের কামিজের বোতামগুলো একে একে খুলে ফেলতে লাগল। উন্মুক্ত হতে লাগল তাদের দীর্ঘ পাঁচ বছরের তৃষ্ণার্ত শরীর। মাহির নুসরাতের উন্মুক্ত কাঁধে নিজের দাঁত বসিয়ে দিল, আর নুসরাত এক অস্ফুট আর্তনাদ করে মাহিরকে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে ধরল।

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে, অফিসের বাইরে হঠাৎ কিছু শোরগোল শোনা গেল। ভারী বুটের শব্দ আর দরজায় তীব্র ধাক্কা!

মাহির আর নুসরাত চমকে উঠে একে অপরের দিকে তাকাল। নুসরাতের চোখে আবার নেমে এলো ভয়াল অন্ধকার।

দরজার ওপার থেকে এক কর্কশ গলা ভেসে এলো, "ভেতরে কে আছিস? দরজা খোল! পারভেজ স্যারের লোক এসেছে!"

দরজায় প্রকাণ্ড ধাক্কা আর কর্কশ আওয়াজে থমকে গেল কেবিনের ভেতরের উত্তপ্ত মুহূর্ত। নুসরাতের চোখ দুটো ভয়ে বড় বড় হয়ে উঠল, সে কাঁপতে কাঁপতে নিজের উন্মুক্ত জামাটা টেনে টুনে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল।

মাহির এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। সে নুসরাতের পরনের কাপড় ঠিক করতে সাহায্য করে তাকে নিজের পেছনে টেনে নিল। তার নিজের শার্টের বোতামগুলো দ্রুত লাগিয়ে নিয়ে চোখে মুখে এনে ফেলল এক নিষ্ঠুর, তাচ্ছিল্যের ভাব।

"ভয় পাবে না নুসরাত," মাহির নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল, "পাঁচ বছর আগে আমি শক্ত ছিলাম না, কিন্তু আজ তোমাকে ছোঁয়ার সাহস আমি কাউকে দেব না।"

মাহির কেবিনের দরজার লক খুলে দিতেই চার-পাঁচজন সুঠাম দেহের লোক ভেতরে ঢুকে পড়ল। সবার পরনে কালো জ্যাকেট, আর তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে পারভেজ চৌধুরীর ডান হাত হিসেবে পরিচিত নামকরা গুন্ডা রানা।

রানা ঘরে ঢুকে এক কুৎসিত হাসি দিল। তার নজর গিয়ে পড়ল নুসরাতের লাল হয়ে থাকা চোখ আর এলোমেলো চুলের দিকে।

"বাহ্, মাহির সাহেব! পাঁচ বছর পর পুরোনো প্রেমিকার সাথে বেশ গরম কেমিস্ট্রি জমিয়েছেন দেখছি," রানা চিবুক উঁচিয়ে বলল। "তবে পারভেজ ভাই অপেক্ষা করতে পছন্দ করেন না। নুসরাত ম্যাডাম, আপনার সাথে পারভেজ ভাইয়ের কিছু হিসাব মেটানো বাকি আছে। চুপচাপ আমাদের সাথে চলুন, নইলে মাহির সাহেবের আর্কিটেকচার ক্যারিয়ার আর জীবন—দুটোই আজ রাতে শেষ হয়ে যাবে।"

মাহির এক পা এগিয়ে এসে সোজা রানার সামনে দাঁড়াল। মাহিরের চওড়া বুক আর শীতল চোখ দুটো দেখে রানা সামান্য ইতস্তত করল।

"আমার অফিস থেকে বের হও," মাহির শান্ত কিন্তু চাবুকের মতো গলায় বলল। "আর পারভেজকে গিয়ে বলো, নুসরাত এখন আমার ছায়ায় আছে। তাকে ছোঁয়ার ক্ষমতা পারভেজের বা তার পোষা কুকুরের নেই।"

রানা হসে উঠল। "খুব সাহস বেড়েছে, তাই না? পাঁচ বছর আগের খুনের দাগটা ধোয়ার ক্ষমতা আপনার বাবারও ছিল না। এখনো ওই এক নোটে আপনাকে জেলে পচানো যায়।"

কথাটা শেষ হতে পারল না। মাহির কোনো সতর্কবার্তা না দিয়েই রানার থুতনিতে সোজা এক প্রকাণ্ড ঘুসি বসিয়ে দিল। রানা ছিটকে গিয়ে কাচের টেবিলের ওপর পড়ল। টেবিলটা মড়মড় করে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল। অন্য লোকেরা পিস্তল বের করার আগেই মাহির কাছের এক কাঠের চেয়ার তুলে নিয়ে সজোরে আঘাত করল দ্বিতীয় লোকটির মাথায়।

"নুসরাত, ছোট দরজার দিকে চলো!" মাহির চিৎকার করে উঠল।

কেবিনের পেছনে সিক্রেট একজিট ছিল, যা সচরাচর ব্যবহৃত হতো না। নুসরাত আর মাহির দৌড়ে সেই দরজা দিয়ে পেছনের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো। বৃষ্টির তোড়ে বাইরের রাস্তা তখন প্রায় জনশূন্য। মাহির তার কালো এসইউভি গাড়ির লক খুলে নুসরাতকে দ্রুত ভেতরে বসিয়ে দিল, তারপর নিজেই স্টিয়ারিংয়ে বসে এক হেঁচকা টানে গাড়িটি রাজপথে নামিয়ে আনল।

পিছন থেকে তাদের ধাওয়া করছিল দুটো কালো মাইক্রোবাস। বাইরে তখন কালবৈশাখী ঝড়ের মাতম। মুষলধারে বৃষ্টিতে উইন্ডশিল্ডের কাচ ঘোলা হয়ে আসছে। মাহির চরম গতিতে গাড়ি ছুটিয়ে নিয়ে চলল ঢাকার উপকণ্ঠে, সাভারের দিকে—জহাজঘাটার কাছে তার এক নির্জন আউটহাউসের উদ্দেশ্যে।

প্রায় এক ঘণ্টার হাড্ডাহাড্ডি ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার পর মাহির বৃষ্টি আর অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে গাড়িটি এক পুরোনো বাঁশঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে ফেলে। সাভারের নির্জন, ঝোপঝাড়ে ঘেরা কাঠের দোতলা আউটহাউসটিতে যখন তারা পৌঁছাল, তখন নুসরাত ভয়ে আর ঠান্ডায় একদম জমে গিয়েছে।

আউটহাউসের ভেতরে ঢুকে মাহির দ্রুত দরজার খিল তুলে দিল। বিদ্যুৎ নেই, চারপাশ আঁধারে ঢাকা। মাহির একটা দিয়াশলাই জ্বালিয়ে কোণের পুরোনো হারিকেনটা জ্বালিয়ে দিল। হালকা হলুদ আলোয় পুরো ঘরটা এক মায়াবী রূপে সাজল।

নুসরাতের গায়ের সুতি শাড়ি আর কামিজ ভিজে একদম গায়ের সাথে লেপ্টে গিয়েছে। ঠান্ডায় তার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছিল, ঠোঁট দুটো নীল হয়ে এসেছে।

মাহির এগিয়ে এসে নুসরাতের আলগা ভিজে চাদরটা খুলে সরিয়ে দিল। "তোমার শরীর একদম ঠান্ডা হয়ে গেছে। জামা না পাল্টালে নিমোনিয়া হয়ে যাবে।"

"আমার কাছে তো আর কোনো জামা নেই মাহির..." নুসরাত কাঁপা গলায় বলল।

মাহির নিজের ড্রাইং র‍্যাক থেকে তার একখানা বড় সাইজের সুতি শার্ট আর তোয়ালে এনে নুসরাতের হাতে দিল। "এটা পরে নাও। আমি অন্য ঘরে আছি।"

মাহির ঘুরে যেতেই নুসরাত পিছন থেকে গিয়ে তার কোমর জড়িয়ে ধরল। ভিজে কাপড়ের ঠাণ্ডা ছোঁয়া মাহিরের পিঠে লাগলেও মাহির নড়ল না।

"আমাকে ছেড়ে যেও না মাহির... আমার খুব ভয় করছে," নুসরাত ফুঁপিয়ে উঠল। "যদি ওরা আমাদের খুঁজে পায়? যদি আমি তোমাকে আবার হারিয়ে ফেলি?"

মাহির নিজেকে ঘুরিয়ে নুসরাতের সামনাসামনি হলো। নুসরাতের ভেজা চুল থেকে পানির ফোঁটা টপটপ করে গড়িয়ে পড়ছিল তার বুক আর গলার খাঁজে। ভিজা কাপড়ের নিচ থেকে তার সুগঠিত শরীরের বাঁধন স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। মাহিরের ভেতরের অবরুদ্ধ কামনা আবার আগ্নেয়গিরির মতো জেগে উঠল।

"কারো সাধ্য নেই তোমাকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার," মাহির ভারী গলায় বলল।

সে নিজের হাতে নুসরাতের গায়ের ভেজা কাপড়গুলো একে একে আলগা করতে লাগল। নুসরাত এবার কোনো বাধা দিল না, বরং সে নিজের চোখ বন্ধ করে মাহিরের ওপর নিজেকে পুরোপুরি ছেড়ে দিল।

ভিজে পোশাক শরীর থেকে খসে মাটিতে পড়তেই নুসরাতের উন্মুক্ত, খাঁটি সোনার মতো ত্বক হারিকেনের মৃদু আলোয় চকচক করে উঠল। মাহির তোয়ালেটা নিয়ে আলতো করে নুসরাতের চুল, গলা আর বুক মুছে দিতে লাগল। তোয়ালের ঘষা আর মাহিরের উত্তপ্ত হাতের ছোঁয়ায় নুসরাতের শরীরে যেন বিদ্যুতের তরঙ্গ খেলে গেল।

মাহির নুসরাতকে আলতো করে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। তারপর সে নিজেই নুসরাতের ওপর নেমে এলো। মাহিরের খালি বুকের লোমে নুসরাতের বুক চেপে বসতেই নুসরাত এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাহিরের কাঁধে নিজের মুখ লুকাল।

"মাহির... আজ রাতে সব ভয় মুছে দাও," নুসরাত ফিসফিস করে বলল, তার হাত চলে গেল মাহিরের পিঠের সুগঠিত পেশীতে।

মাহির আর নিজের ক্ষোভ ও বাসনাকে আটকে রাখল না। সে নুসরাতের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। নুসরাতের উরু আর কোমর খামচে ধরে সে তার গভীর উষ্ণতায় মিশে যেতে লাগল। বাইরের বৃষ্টির শব্দ আর ঝড়ের গর্জনের সাথে ঘরের ভেতরের দুজন তৃষ্ণার্ত আত্মার শারীরিক মিলন এক রুদ্র রূপ নিল। নুসরাতের সুখ আর বেদনার মিশেলে বের হওয়া মৃদু চিৎকার আর মাহিরের দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস সাভারের সেই নির্জন ঘরটিকে এক অন্য জগতে নিয়ে গেল।

কতক্ষণ তারা একে অপরের উষ্ণতায় নিমজ্জিত ছিল, তার কোনো হিসেব ছিল না। যখন ঝড় কিছুটা শান্ত হলো, তখন নুসরাত মাহিরের চওড়া বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে। মাহির তার আঙুল দিয়ে নুসরাতের এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিচ্ছিল।

হঠাৎ করেই মাহিরের ফোনটা কেঁপে উঠল। এক অচেনা নম্বর থেকে একখানা ছবি ও মেসেজ এসেছে।

মাহির মেসেজটা খুলতেই তার চোখ কপালে উঠল। ছবিতে দেখা যাচ্ছে—পাঁচ বছর আগের সেই রক্তাক্ত ফার্নিচারের ছবি, একটি মারণাস্ত্র, আর তার নিচে লেখা:

"কাল সকাল ১০টার মধ্যে নুসরাতকে আমার হাতে তুলে না দিলে, এই পিস্তল আর তোর আঙুলের ছাপের আসল রিপোর্ট কাল সিআইডি হেডকোয়ার্টারে জমা পড়বে। তোর বাবাকেও বাঁচাবি কীভাবে, তা ভেবে রাখ।" — পারভেজ।

মাহিরের হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এলো। কিন্তু মেসেজটির নিচের দিকে একটি অতি ক্ষুদ্র ডিটেইলস মাহিরের নজর কাড়ল, যা সে আগে কখনো খেয়াল করেনি। পিস্তলের গায়ে একটি বিশেষ কোড নম্বর খোদাই করা ছিল, যা সরকারের বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার নির্দিষ্ট অস্ত্রের চিহ্ন!

মাহির এক চমকপ্রদ সত্য আবিষ্কার করল—রায়হান চৌধুরীকে কোনো সাধারণ লোক বা পারভেজ মারেনি, এর পেছনে রয়েছে দেশের এক ভয়ংকর রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র!

মাহিরের বুড়ো আঙুলটা ফোনের স্ক্রিনের ওপর থমকে রইল। পিস্তলের গায়ে খোদাই করা ‘BD-SEC-0994’ কোডটি দেখেই তার মাথায় বিজলির মতো সত্যটা খেলে গেল। এই কোড কোনো সাধারণ সন্ত্রাসী বা ক্যাডার বাহিনীর অস্ত্রের নয়; এটি সরাসরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ গোয়েন্দা উইংয়ের জন্য প্রস্তুতকৃত নিবন্ধিত অস্ত্র।

তার মানে, পাঁচ বছর আগে রায়হান চৌধুরী কোনো সাধারণ জমি সংক্রান্ত ঝামেলার কারণে খুন হননি। রায়হান চৌধুরী ছিলেন রাষ্ট্রীয় লেভেলের এক বিশাল পাচারকারী সিন্ডিকেটের অন্যতম রূপকার, আর পারভেজ চৌধুরী সেই সিন্ডিকেটের চাকা সচল রাখার জন্য তার নিজস্ব গোয়েন্দা কানেকশন ব্যবহার করেছিল। মাহিরকে সে রাতে ইচ্ছে করেই বলির পাঁঠা বানানো হয়েছিল, যাতে আসল গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও পারভেজের নাম আড়ালেই থেকে যায়!

মাহিরের বুকের গভীর থেকে এক দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো। সে পাশে তাকাল। হারিকেনের হলুদ আলোয় নুসরাতের ক্লান্ত, ঘুমন্ত মুখখানা ভারী মায়াবী লাগছে। দীর্ঘ ভালোবাসার গভীর আবেগে তার ফর্সা ত্বকে লালচে ছোপ পড়ে আছে, ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক হয়ে আছে পরম শান্তিতে। মাহির নিজের শার্টটা নুসরাতের গায়ে ভালো করে জড়িয়ে দিল, তারপর আলতো করে তার কপালে এক দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিল।

নুসরাত ঘুমের ঘোরেই হাত বাড়িয়ে মাহিরের কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। "আমাকে ছেড়ে যেও না মাহির..." ফিসফিস করে বলল সে।

"আমি কোথাও যাচ্ছি না নুসরাত। আর কাউকেও আমাদের মাঝে আসতে দেব না," মাহির নিচু গলায় অঙ্গীকার করল।

মাহির তার ল্যাপটপটা বের করল। পাঁচ বছর আগের এনক্রিপ্টেড কিছু ফাইল আর তার বাবার পুরানো ল ফার্মের সার্ভারের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে লাগল। মাহিরের বাবা ছিলেন নামকরা আইনি উপদেষ্টা, যিনি রায়হান চৌধুরীর কেসের পেছনের মূল নথি গোপনীয় ডায়েরিতে লিখে রেখে গিয়েছিলেন। ল্যাপটপের আলোয় মাহিরের মুখমণ্ডল শক্ত ও হিংস্র দেখাচ্ছিল। সে এক ঘণ্টার মধ্যে বের করে ফেলল পারভেজ চৌধুরীর আসল আস্তানা—ঢাকার অদূরে আশুলিয়ার এক পুরোনো টেক্সটাইল মিল, যেখানে পারভেজ তার অবৈধ নথিপত্র আর অস্ত্র সংরক্ষণ করে রাখে।

ঠিক সেই মুহূর্তে, বাইরে গাছের ডালপালা মড়মড় করে ভেঙে পড়ার শব্দ হলো।

বৃষ্টি ততক্ষণে থেমে গেছে, কিন্তু নিস্তব্ধ রাতের অন্ধকারে আউটহাউসের চারপাশের শুকানো পাতায় ভারী বুটের শব্দ স্পষ্ট হয়ে উঠল। মাহির এক পলকে চোখ তুলে তাকাল। সে ল্যাপটপ বন্ধ করে দ্রুত উঠে দাঁড়াল।

নুসরাত চমকে জেগে উঠল। "কী হয়েছে মাহির?"

"ওরা এসে গেছে," মাহির শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল।

নুসরাতের ফর্সা মুখ এক মুহূর্তে ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে মাহিরের হাত চেপে ধরল। "ওরা কীভাবে চিনল এই জায়গা? মাহির, তুমি পালাও! ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে!"

"আর পালানোর দিন শেষ নুসরাত," মাহির নুসরাতের দুগালে হাত রেখে তার চোখের দিকে তাকাল। সে নুসরাতের ঠোঁটে এক তীব্র, গভীর চুমু দিল, যা নুসরাতের ভেতরের সব ভয় এক লহমায় ভুলিয়ে দিল। "পাঁচ বছর ধরে আমি একটা লাশের মতো বেঁচে ছিলাম কারণ আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে ধোঁকা দিয়েছ। কিন্তু আজ আমি জানি, তুমি আমাকে ভালোবাসো। এই ভালোবাসার শক্তি দিয়ে আমি পুরো দুনিয়ার সাথে লড়তে পারি।"

হঠাৎ ঘরের কাঠের দরজা সশব্দে ভেঙে পড়ল! পারভেজের লোকজন ভেতরে ঢুকে পড়ে অন্ধকারের মধ্যেই এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করল।

মাহির এক নিমেষে নুসরাতকে সাথে নিয়ে সোফার পেছনে পজিশন নিল। মাহিরের কাছে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না, কিন্তু সে সাভারের এই আউটহাউসের প্রতিটা ইঞ্চি চেনে। সে দেয়ালের পাশে রাখা ভারী পিতলের শোপিস আর কাঠের প্রদীপদানি ছুড়ে মারল প্রথম আততায়ীর মুখে। লোকটি আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়তেই মাহির চিতার মতো লাফিয়ে পড়ে তার হাতের নাইন-এমএম পিস্তলটা কেড়ে নিল।

"নুসরাত, মেঝের ওপর শুয়ে থাকো!" মাহির গর্জে উঠল।

অন্ধকার ঘরে শুরু হলো জীবন-পণ লড়াই। মাহির পিস্তল দিয়ে দুজনকে কপালে লক্ষ্য করে নিখুঁত নিশানা করল। রক্তে ভেসে গেল কাঠের মেঝে। কিন্তু শত্রুর সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। পারভেজের ব্যক্তিগত বডিগার্ড, দীর্ঘদেহী এক পেশাদার খুনি মাহিরের পেছন থেকে এসে তার ঘাড় চেপে ধরল।

মাহিরকে মেঝের ওপর আছড়ে ফেলা হলো। লোকটির ভারী বুট এসে মাহিরের বুকে আঘাত করতেই মাহির মুখ দিয়ে রক্ত ছিটকে বের হলো।

"মাহির!" নুসরাত চিৎকার করে উঠল। সে ভয়-ডর ভুলে পাশ থেকে একটা ভাঙা কাচের বোতল তুলে নিয়ে সজোরে লোকটির পিঠে বসিয়ে দিল।

লোকটি যন্ত্রণায় কেঁপে উঠে নুসরাতের দিকে ঘুরতেই নুসরাতের জামার কলার ধরে তাকে এক ঝটকায় দেয়ালের সাথে ধাক্কা দিল। নুসরাতের পাতলা শার্টের বোতাম ছিঁড়ে গিয়ে তার সুগঠিত শরীরের উপরিভাগ আবার উন্মুক্ত হয়ে পড়ল, কিন্তু নুসরাত তার পরোয়া না করে মাহিরের দিকে হাত বাড়াল।

নিজের চোখের সামনে নুসরাতের ওপর আঘাত আর তাকে অপমানিত হতে দেখে মাহিরের ভেতরের পশুত্ব চরম মাত্রায় জেগে উঠল। রক্তে মাখামাখি শরীর নিয়ে মাহির এক পৈশাচিক হুঙ্কার দিয়ে উঠে দাঁড়াল। সে লোকটির চুল ধরে টেনে এনে নিজের হাঁটু দিয়ে তার নাকে সজোরে আঘাত করল। নাসারন্ধ্র ভেঙে রক্ত ভেসে আসতেই মাহির লোকটির হাত মচকে ধরে পিস্তলটা কেড়ে নিল এবং সোজা তার বুকে খালি করে দিল পুরো ম্যাগাজিন!

ঘরের ভেতরে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। লাশের গন্ধ আর বারুদের ধোঁয়ায় চারপাশ ভরে গেছে।

মাহির হাঁপাতে হাঁপাতে নুসরাতের কাছে ছুটে গেল। নুসরাত মেঝের কোণে কাঁপছিল, তার উন্মুক্ত বুকের ওপর চুলগুলো ছিটকে পড়েছিল। মাহির হাঁটুগুড়ে বসে নুসরাতকে সজোরে নিজের বুকে টেনে নিল।

"তুমি ঠিক আছ? তোমার কোথাও লাগেনি তো?" মাহির আকুল হয়ে নুসরাতের মুখ, গাল, ঘাড় পরীক্ষা করতে লাগল।

নুসরাত মাহিরের বুকে নিজের মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। সে মাহিরের ভিজে থাকা রক্তমাখা ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। ভয়, আতঙ্ক আর বেঁচে থাকার অদম্য আকুতিতে নুসরাত মাহিরের শরীর আঁকড়ে ধরল। মাহিরও ব্যাকুল হয়ে নুসরাতের উন্মুক্ত পিঠে হাত বুলিয়ে তাকে নিজের শরীরে বিলীন করে নিতে চাইল।

"পারভেজ চৌধুরী আজ রাতেই শেষ হবে নুসরাত," মাহির নুসরাতের কানে ফিসফিস করে বলল, তার গলায় তখন খুনের নেশা। "আমি নিজেই যাচ্ছি তার আস্তানায়। আজ রাতের পর হয় সে থাকবে, না হয় আমি।"

নুসরাত মাহিরের চোখ থেকে রক্ত আর ঘাম মুছে দিল। সে শক্ত হাতে মাহিরের হাত চেপে ধরে বলল, "তুমি একা যাবে না মাহির। পাঁচ বছর আগে আমি তোমাকে একা ফেলে যাওয়ার ভুল করেছিলাম। আজ তোমার সাথে নরকেও যেতে হয়, আমি যাব।"

মাহির নুসরাতের একগুঁয়ে চোখের দিকে তাকাল। তারপর নুসরাতের উন্মুক্ত কাঁধে নিজের ঠোঁট চিপে এক শেষ কামড় দিল—যা তাদের যৌথ লড়াইয়ের এক নীরব সম্মতি।

মাহির গাড়ি থেকে নিজের ব্যাকআপ ওয়েপন আর নথিগুলো তুলে নিল। বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। কালবৈশাখী ঝড়ের মেঘ কেটে গিয়ে লালচে সূর্য উঠছে, যেন এক ভয়ংকর রক্তাক্ত শেষ পর্বের আগমনী বার্তা নিয়ে!

ভোরের রক্তিম আলো আশুলিয়ার সেই জংধরা টেক্সটাইল মিলের ওপর এসে পড়েছে। চারপাশ নিঝুম, শুধু দূর থেকে ভেসে আসছে বুড়িগঙ্গার পানির ছলছল শব্দ।

কালো এসইউভি গাড়িটি মিলের কয়েকশ গজ দূরে একটি পরিত্যক্ত শেডের আড়ালে থামাল মাহির। তার পরনে কালো জ্যাকেট, চোখের কোণে জমাট বাঁধা রক্ত আর শক্ত হয়ে থাকা চোয়াল। পাশেই বসে আছে নুসরাত। তার সুতি সালোয়ার-কামিজের ওপর মাহিরের একখানা জ্যাকেট চাপানো, চোখে কোনো ভয়ের চিহ্ন নেই—সেখানে এখন কেবলই মাহিরকে আগলে রাখার চরম এক জেদ।

"তুমি ভেতরে যাবে না নুসরাত," মাহির গাড়ির ড্যাশবোর্ড থেকে পিস্তলটা বের করে লোড করতে করতে বলল। "বাইরে থেকে নজর রাখবে। যদি দশ মিনিটের মধ্যে আমি না বের হই—"

নুসরাত এক ঝটকায় মাহিরের হাত চেপে ধরল। সে মাহিরের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে তার কথা থামিয়ে দিল। এক তীব্র, তৃষ্ণার্ত চুনবনের মাধ্যমে তারা একে অপরের শরীরের শেষ উষ্ণতাটুকু শুষে নিল।

"আমি তোমাকে ছাড়া কোথাও যাব না মাহির," নুসরাত হাঁপাতে হাঁপাতে ফিসফিস করে বলল, তার চোখের দৃষ্টি মাহিরের ভেজা ঠোঁটে স্থির। "পাঁচ বছর বেঁচে ছিলাম মরার মতো। আজ যা হবে, একসাথেই হবে।"

মাহির নুসরাতের আলগা ঘাড় ধরে তাকে নিজের দিকে আরও একধাপ টেনে এনে তার গালে কামড় বসিয়ে দিল। "তবে চলো, আজ সব শয়তানের রক্ত দিয়ে আমাদের ভালোবাসা পবিত্র করব।"

টেক্সটাইল মিলের পেছনের জংধরা জানালা ভেঙে দুজন ভেতরে প্রবেশ করল। চারপাশ বিষাক্ত কেমিক্যালের গন্ধে ভরা, উঁচু উঁচু পুরোনো মেশিনের ছায়া অন্ধকার তৈরি করে রেখেছে।

ঘরের একেবারে মাঝে একখানা ভারী রাজকীয় চেয়ারে বসে ছিল পারভেজ চৌধুরী। হাতে তার দামী সিগার, আর সামনে কাঠের টেবিলে রাখা পাঁচ বছর আগের সেই অভিশপ্ত সিআইডি ফাইল ও একটি পুরোনো ব্ল্যাক উইডো পিস্তল। পারভেজের চারপাশে চারজন সশস্ত্র বডিগার্ড দাঁড়িয়ে।

"তোদের আসতে একটু দেরিই হয়ে গেল মাহির," পারভেজ ধোঁয়া ছেড়ে কুৎসিত হাসি দিল। "আমি ভাবছিলাম হয়তো কাল রাতের ধাক্কা সামলাতে পারিসনি। তা নুসরাতকে সাথে করে নিয়ে এসে ভালোই করেছিস। আমার সাথে যুক্তরাজ্যের হিসাবটাও আজ রাতে মিটে যাবে।"

মাহির নুসরাতকে নিজের পিঠের পেছনে ঠেলে দিয়ে সোজা সামনে এগিয়ে এলো। তার পিস্তল সোজাসুজি পারভেজের কপাল বরাবর নিশানা করা।

"পারভেজ, খেলা শেষ," মাহির বরফশীতল কণ্ঠে বলল। "তোমাদের বিশেষ গোয়েন্দা উইংয়ের ষড়যন্ত্রের কথা আমি জেনে গেছি। ‘BD-SEC-0994’ পিস্তলটা তোর নিজের আন্ডারে নিবন্ধিত ছিল। রায়হান চৌধুরীকে তুই নিজে মেরেছিস, কারণ সে সরকারের গোপন নথিপত্র পাচার করার হুমকি দিচ্ছিল।"

পারভেজের মুখের হাসি এক মুহূর্তে গায়েব হয়ে গেল। তার চোখ দুটো হিংস্র হয়ে উঠল। "খুব চালাক হয়ে গেছিস, তাই না? কিন্তু সত্য জেনে লাভ কী, যখন বেঁচে ফেরার কোনো পথ নেই?"

পারভেজ ইশারা করতেই তার বডিগার্ডরা গুলি চালাতে শুরু করল!

মাহির এক নিমেষে নুসরাতকে নিয়ে প্রকাণ্ড এক লোহার ড্রামের পেছনে ঝাঁপিয়ে পড়ল। অন্ধকারের মাঝে শুরু হলো তুমুল বন্দুকযুদ্ধ। প্রকাণ্ড মিলের ভেতর গুলির কানফাটা আওয়াজ প্রতিধ্বনি হতে লাগল। মাহির অত্যন্ত নিখুঁত নিশানায় একে একে তিন বডিগার্ডকে মাটিতে ফেলে দিল। কিন্তু শেষ বডিগার্ডের ছোঁড়া একখানা গুলি এসে মাহিরের ডান কাঁধ ঘেঁষে চলে গেল!

"মাহির!" নুসরাত চিৎকার করে উঠল।

মাহিরের কাঁধ কেটে রক্ত ছিটকে বের হলো। সে যন্ত্রণায় দাঁতে দাঁত চাপল। কিন্তু সেই রক্ত দেখে নুসরাতের ভেতর যেন আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণ ঘটল। নুসরাত মেঝের কোণে পড়ে থাকা লোহার ভারী রডটা তুলে নিয়ে অন্ধকারের সুযোগে পেছনের দিক দিয়ে গিয়ে সেই শেষ বডিগার্ডের মাথায় সজোরে আঘাত করল। লোকটি মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

পারভেজ ততক্ষণে ভয় পেয়ে টেবিল থেকে আসল ফাইল আর পিস্তলটা তুলে নিয়ে পেছনের সিক্রেট এক্সিট দিয়ে পালানোর চেষ্টা করছিল।

"পারভেজ!" মাহিরের সিংহবিক্রম হুঙ্কার পুরো মিলে গুঞ্জরিত হলো।

মাহির রক্তমাখা কাঁধ নিয়ে চিতার মতো ধেয়ে গিয়ে পারভেজের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। দুজনে আছড়ে পড়ল নোংরা মেঝের ওপর। পারভেজ মাহিরের ক্ষতবিক্ষত কাঁধে ঘুষি মারার চেষ্টা করল, কিন্তু মাহির যন্ত্রণাকে তোয়াক্কা না করে পারভেজের গলার নালী দুই হাতে শক্ত করে চেপে ধরল।

"আমার নুসরাতের পাঁচটা বছর তুই কুরে কুরে খেয়েছিস শয়তান!" মাহির গর্জে উঠল, তার গলার রগগুলো ফুলে উঠেছিল। "আমার জীবন ধ্বংস করেছিস!"

মাহির পারভেজের মাথা তুলে সজোরে সিমেন্টের মেঝের ওপর আছড়ে ফেলতে লাগল। পারভেজের মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এলো, সে হাঁপাতে হাঁপাতে পিস্তলটা মাহিরের পেটে ঠেকানোর চেষ্টা করল।

ঠিক সেই মুহূর্তে নুসরাত দৌড়ে এসে পারভেজের হাতের পিস্তলটাতে সজোরে লাথি মেরে সরিয়ে দিল। আর মাহির সুযোগ পেয়ে পারভেজের বুকে একের পর এক তীব্র কনুইয়ের আঘাত করতে লাগল। পারভেজের চোখ উল্টে গেল, সে জ্ঞান হারিয়ে নিথর হয়ে পড়ে রইল।

মাহির হাঁপাতে হাঁপাতে পারভেজের ওপর থেকে সরে এলো। তার পুরো শার্ট ভিজে গিয়েছে নিজের ও পারভেজের রক্তে।

নুসরাত হাঁটু মুড়ে মেঝের ওপর বসে পড়ল। সে মাহিরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। "শেষ মাহির... সব শেষ! আমরা জিতে গেছি!"

মাহির তার বাম হাত দিয়ে নুসরাতের কোমর আঁকড়ে ধরল। টেবিলের ওপর থেকে সে সিআইডির আসল ফাইল আর পিস্তলটা তুলে নিল—যেটা দিয়ে এবার পারভেজ চৌধুরীর চিরদিনের জন্য জেল হবে।

সকাল আটটা।

ঢাকার আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেছে। ভোরের মিষ্টি রোদ এসে পড়েছে সাভারের নদীর পাড়ে। মাহির ও নুসরাত নদীর ধারের এক নির্জন ঘাসের ওপর বসে ছিল। দূরত্বে পুলিশের সাইরেনের শব্দ মিলিয়ে যাচ্ছে—পারভেজ চৌধুরী ও তার পুরো সিন্ডিকেটকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, মাহিরের বাবার নাম চিরতরে দাগমুক্ত হয়েছে।

নুসরাত মাহিরের বুকে মাথা রেখে বসেছিল। মাহিরের কাঁধে ব্যান্ডেজ বাঁধা। নুসরাত তার নরম আঙুল দিয়ে মাহিরের খোলা বুকের লোমে আর বুকের ছোপ ছোপ ক্ষতগুলোতে আলতো করে স্পর্শ করছিল।

মাহির নুসরাতের মুখের দিকে তাকাল। রোদের আলোয় নুসরাতের মুখখানা এক দেবীপ্রতিমার মতো জ্বলজ্বল করছে। মাহির তার এক হাত নুসরাতের কোমরের ভেজা কাপড়ের ভেতর গলিয়ে দিয়ে তাকে নিজের গা ঘেঁষে টেনে নিল।

"এখন কোথায় যাবে নুসরাত?" মাহির ফিসফিস করে বলল, তার ঠোঁট নুসরাতের কানের লতিতে গিয়ে ঠেকলো।

নুসরাত এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাহিরের গলায় নিজের মুখ গুঁজে দিল। "যেখানে তুমি থাকবে। পাঁচ বছর অনেক দূরে ছিলাম মাহির, আর একটা সেকেন্ডও তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না।"

মাহির নুসরাতের মুখটা ওপরে তুলে ধরে তার লাল হয়ে থাকা তৃষ্ণার্ত ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। নুসরাত মাহিরের ঘাড় আঁকড়ে ধরে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিল সেই পরম চেনা ভালোবাসার কাছে। নদীর হিমেল হাওয়া আর মিষ্টি রোদের মাঝে তাদের দুজন তৃষ্ণার্ত শরীরের উত্তাপ এক হয়ে গেল।

পাঁচ বছরের অন্ধকার, ঘৃণা আর বিরহের ইতি টেনে তাদের জীবনে নেমে এলো এক নতুন, আলোকিত ভোর—যেখানে রয়ে গেল শুধু অবাধ ভালোবাসা, গভীর আবেগ আর চিরন্তন এক অনুভূতির বন্ধন।

....
👁 9