অন্ধকার রাতের উষ্ণ স্পর্শ

ঢাকা শহরের ব্যস্ততম সড়কগুলোর একটির পাশে গড়ে ওঠা ছোট কিন্তু রুচিশীল ‘ক্যাফে ব্ল্যাক’—যেখানে কফির কড়া সুবাস আর নরম কাঁচের মধ্য দিয়ে ভেতরে আসা সন্ধ্যার মায়াবী আলো মিলেমিশে এক অন্যরকম পরিবেশ তৈরি করে। আরিয়ান এই ক্যাফেতে আসে নিয়মিত, বিশেষ কোনো কাজ ছাড়াই। শুধু কাঁচের সামনের সেই কোণের টেবিলটায় বসে ধোঁয়া ওঠা আমেরিকানোর কাপে চুমুক দেওয়া আর জানালার ওপাশের শহরটাকে দেখা তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

তবে গত কয়েক মাস ধরে আরিয়ানের ক্যাফেতে আসার মূল আকর্ষণ পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন তার চোখ আটকে থাকে ক্যাফের ঠিক মধ্যখানের ছোট টেবিলটায়। প্রতিদিন নিয়ম করে ঠিক বিকেল পাঁচটায় সেখানে এসে বসে একটি শান্ত মেয়ে। পরনে সাদামাটা শালীন পোশাক, খোলা চুলগুলো কাঁধ গড়িয়ে পিঠে ছড়িয়ে থাকে। মেয়েটির চোখের চাহনিতে গভীর এক বিষাদময় নীরবতা আছে, যা প্রথম দিনই আরিয়ানের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক দোলা দিয়েছিল। মেয়েটার নাম সারা। আরিয়ান আড়ালে বসে ওর প্রতিদিনের অভ্যাসগুলো লক্ষ্য করে—কীভাবে সে আস্তে করে কফির কাপটা ঠোঁটে ছোঁয়ায়, কীভাবে ধোঁয়া ওঠা তরলের দিকে তাকিয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে যায়, আর মাঝেমধ্যে আনমনে চোখের ওপর এসে পড়া একগুচ্ছ চুল কানে গুজে দেয়।

একদিন ক্যাফেতে প্রচণ্ড ভিড় ছিল। সারা নিজের নিয়মিত টেবিলটা খালি না পেয়ে ইতস্তত করছিল। আরিয়ান সুযোগটা হাতছাড়া করেনি। হালকা হেসে নিজের টেবিল দেখিয়ে বলেছিল, "আপনি চাইলে এখানে বসতে পারেন। জায়গা খালি আছে।"

¦Ëk¢x/춺'ƒú

সারা কিছুটা লজ্জিত হেসেছিল। মিষ্টি, মৃদু স্বরে উত্তর দিয়েছিল, "ধন্যবাদ।"

সেই শুরু। প্রথম দিনের কুণ্ঠা কাটিয়ে দুজনের মধ্যে সামান্য কথা বিনিময় হয়। নাম জানা হয়, ভালো লাগা-মন্দ লাগা জানা হয়। দিন যত যেতে থাকে, তাদের দেখার সময়টা কেবল ক্যাফের চার দেয়ালের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না। কথা বাড়ে, বাড়ে নীরবতার সুগভীর ভাষা। সারা খুব একটা নিজের অতীত বা পরিবার নিয়ে কথা বলতে চাইত না, আর আরিয়ানও কখনো জোর করেনি। সারার প্রতি আরিয়ানের এই নিখাদ সম্মান সারাক আরো বেশি আকর্ষিত করে।

এক রাতে, তখন প্রায় রাত দশটা। ক্যাফে থেকে বের হয়ে তারা দুজন হাঁটছিল ধানমন্ডি লেকের পাশের নির্জন ফুটপাত ধরে। হালকা বৃষ্টি হয়েছিল একটু আগে, ভেজা মাটির এক সিক্ত সুবাস বাতাসে ভাসছিল। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো সারার ভেজা মুখে পড়ে এক অলৌকিক সৌন্দর্য তৈরি করেছিল।

আরিয়ান হঠাৎ সারার হাত ধরে পথ চলা থামিয়ে দেয়। সারার হাতের নরম ছোঁয়া পেতেই আরিয়ানের বুকে একটা উত্তাল তরঙ্গ খেলে যায়। সারা চমকে উঠে আরিয়ানের চোখের দিকে তাকায়। সেই চোখে তখন কোনো দ্বিধা ছিল না, ছিল এক আদিম এবং তীব্র আকর্ষণ।

"সারা..." আরিয়ানের কণ্ঠস্বর হঠাৎ গভীর এবং গম্ভীর হয়ে আসে।

সারা কিছু বলতে চাইল, কিন্তু কথাগুলো তার গলায় আটকে গেল। আরিয়ান আরো এক ধাপ এগিয়ে এসে সারার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নেয়। সারার বুক তখন দ্রুত ওঠানামা করছে। আরিয়ানের উষ্ণ নিঃশ্বাস সারার ঠোঁটের ওপর এসে পড়তেই সারার চোখ দুটো একা একাই বন্ধ হয়ে আসে।

আরিয়ান সারার থুতনিটা একটু উঁচিয়ে ধরে নিজের ঠোঁট নামিয়ে আনে সারার কোমল ঠোঁটে। প্রথম স্পর্শটা ছিল স্নিগ্ধ, কিন্তু পর মুহূর্তেই তা এক গভীর ও তৃষ্ণার্ত অনুভূতির রূপ নেয়। আরিয়ানের এক হাত সারার চুলের ভেতর জড়িয়ে যায়, অন্য হাত তার পিঠের ওপর দিয়ে নেমে এসে আরও শক্ত করে ধরে ওকে। সারার শরীরের উষ্ণতা, তার নিঃশ্বাসের তীব্রতা আরিয়ানের সমস্ত অস্তিত্বকে এক ব্যাকুল কামনায় ভরিয়ে দেয়। সারাও যেন নিজের ভেзора সমস্ত দ্বিধা ভুলে গিয়ে আরিয়ানের বুকে হাত রেখে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দেয় সেই আলিঙ্গনে। বৃষ্টির ফোটা ল্যাম্পপোস্টের আলো ভেদ করে তাদের ভেজা শরীরে পড়তে থাকে, কিন্তু সেই শীতকে হার মানায় তাদের ভেতরের প্রজ্জ্বলিত উষ্ণতা।

সেই রাতের পর তাদের সম্পর্কটা আর কেবল বন্ধুত্বের জায়গায় আটকে থাকেনি। তা পরিণত হয় এক নিবিড়, গভীর এবং অনুভূতির সর্বোচ্চ চূড়ায় থাকা ভালোবাসায়। আরিয়ান সারার প্রতিটা ছোঁয়া, সারার ভেজা নিঃশ্বাস আর তার গায়ের নিজস্ব সুবাসে মাতাল হয়ে থাকত। আরিয়ান সত্যি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে সারা তার জীবনের শেষ পরিণতি।

কিন্তু এই গভীর অনুভূতির সাগরে যখন তারা ভাসছিল, ঠিক তখনই আকাশে কালো মেঘ জমে উঠতে শুরু করে।

হঠাৎ করেই সারার ব্যবহারে পরিবর্তন আসতে থাকে। সে আর আগের মতো আরিয়ানের চোখের দিকে সরাসরি তাকায় না। ক্যাফেতে এলে বসে থাকে আড়ষ্ট হয়ে। ফোন করলে ধরতেও যেন অনিচ্ছা প্রকাশ পায়। আরিয়ান ভেবেছিল সারার হয়তো শারীরিক অসুস্থতা বা কাজের কোনো চাপ যাচ্ছে। কিন্তু ব্যাপারটা যখন দিনের পর দিন বাড়তে থাকে, তখন আরিয়ানের ভেতরে শঙ্কা জাগে।

একদিন সন্ধ্যায়, ক্যাফেতে দুজন মুখোমুখি বসার পর আরিয়ান সারার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিতে যায়। কিন্তু সারা এবার বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো তার হাতটা টেনে সরিয়ে নেয়।

"কী হয়েছে সারা? তুমি গত কিছু দিন ধরে আমাকে এভাবে এড়িয়ে চলছ কেন? আমার কোনো ভুলে তুমি কি কষ্ট পেয়েছ?" আরিয়ানের কণ্ঠে ব্যাকুলতা আর স্পষ্ট উদ্বেগ ফুট উঠে।

সারা মাথা নিচু করে বসে থাকে। তার চোখের কোণে জল জমে উঠেছে। কিছুটা সময় পর সে মুখ তুলে তাকায়, কিন্তু সেই চোখে আরিয়ানের জন্য ভালোবাসা সত্ত্বেও এক অজানা ভয় এবং আতঙ্কের ছাপ সুস্পষ্ট।

"আরিয়ান, আমাদের আর দেখা করা উচিত নয়," সারার গলা কেঁপে ওঠে।

"মানে কী? কী বলছ তুমি এসব!" আরিয়ান হতবাক হয়ে যায়।

"আমি তোমাকে আর দেখতে চাই না। প্লিজ, আমার জীবনের থেকে দূরে চলে যাও," কথাগুলো বলতে বলতে সারার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। সে টেবিল ছেড়ে দ্রুত উঠে দাঁড়ায় এবং ক্যাফে থেকে এক প্রকার দৌড়ে বের হয়ে যায়।

আরিয়ান স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে তার আসনে। সে বুঝতে পারে না, যে মেয়েটি মাত্র কিছুদিন আগে তার বুকে মাথা রেখে ভালোবাসার চরমতম গভীরতায় হারিয়ে গিয়েছিল, সে আজ তাকে এভাবে পর করে দিল কেন? কোনো একটা বিশাল অন্ধকার রহস্য লুকিয়ে আছে সারার এই পালিয়ে যাওয়ার পেছনে। আরিয়ান সিদ্ধান্ত নেয়, সে যেভাবেই হোক এই রহস্যের শেষ দেখে ছাড়বে। সে জানত না, সারার অতীত আর তার পরিাবারের ভেতরের এক বহু পুরোনো কালো ছায়া তাদের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে—যে ছায়ার আসল সত্যটা খোদ আরিয়ানের নিজের ইতিহাসকেও এক ভয়ানক ঝড়ের মুখে ফেলে দেবে।

সারার হঠাৎ এমন পরিবর্তন আর দূরত্ব বজায় রাখা আরিয়ানকে এক তীব্র মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে দেয়। প্রতিটি রাত তার কাটে নির্ঘুম, আরিয়ানের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ধানমন্ডি লেকের সেই বৃষ্টির রাত—সারার ভেজা ঠোঁটের উষ্ণ ছোঁয়া, তার শরীরের সুবাস আর নিঃশ্বাসের আকুলতা। যে মেয়েটি তাকে অত গভীরভাবে ভালোবেসেছিল, সে কীভাবে রাতারাতি সব মুছে ফেলে দূরে সরে যেতে পারে?

আরিয়ান সারার সাথে যোগাযোগের আপ্রাণ চেষ্টা করে। তার ফোনে শতবার কল দেওয়া সত্ত্বেও ওপাশ থেকে কেবল রিং হয়ে কেটে যায়, মেসেজের কোনো উত্তর আসে না। বাধ্য হয়ে আরিয়ান সারার ক্যাফেতে আসার সময়গুলোতে অপেক্ষা করে, কিন্তু সারা আর সেখানে আসে না। শেষমেশ আরিয়ান সিদ্ধান্ত নেয়, সে সারার বাসার ঠিকানায় যাবে। সারা একবার তার এক ফাঁকে নিজের এলাকার কথা বলেছিল—ধানমন্ডি ৮ নম্বরের একটি পুরোনো তিনতলা বাড়ির কথা।

পরদিন বিকেলে আরিয়ান হাজির হয় সেই বাড়ির সামনে। পুরোনো আমলের তৈরি বাড়ি, চারপাশে বড় বড় গাছগাছালি ঘেরা এক নীরব পরিবেশ। গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আরিয়ান কিছুক্ষণ ইতস্তত করে, তারপর সাহস সঞ্চয় করে ভেতরে পা বাড়ায়।

বাড়ির উঠোনে পা দিতেই ভেতর থেকে এক মাঝবয়সী নারীর করুণ ও ক্ষুব্ধ কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। আরিয়ান দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখতে পায় সারা দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ ফ্যাকাশে, চোখের নিচে কালো দাগ, আর তার সামনে দাঁড়িয়ে এক নারী—যাকে দেখে সারার মা বলে মনে হয়।

"তুমি আবার ওই ছেলের সাথে দেখা করতে গিয়েছ?" সারার মা গর্জে উঠছিলেন। "তুমি জানো ওই পরিবারের রক্তে কী আছে? ওদের বংশের এক পিশাচের কারণে আমাদের জীবন তছনছ হয়ে গিয়েছিল! তুমি কীভাবে সেই রক্তের মানুষের প্রেমে পড়তে পারলে?"

সারা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে, "মা, আরিয়ানের এতে কোনো দোষ নেই! সে কিছুই জানে না। সে খুব ভালো মানুষ..."

"চুপ করো!" সারার মা চিৎকার করে ওঠেন। "যে রক্তে অন্যায় আর বিশ্বাসঘাতকতা বইছে, সে কখনো ভালো হতে পারে না। আমি বেঁচে থাকতে ওই পরিবারের কারো সাথে তোমার কোনো সম্পর্ক হতে দেব না।"

বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা আরিয়ানের পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে যায়। সারার মা কীসের কথা বলছেন? কোন পরিবারের কথা বলছেন? আরিয়ানের পরিবার বলতে তো কেবল তার বাবা, যিনি বহু বছর আগে এক রহস্যজনক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন, আর তার মা। সারার মা যে অন্যায়ের কথা বলছেন, তার সাথে আরিয়ানের পরিবারের কী সম্পর্ক?

আরিয়ান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে সোজা ভেতরে ঢুকে পড়ে। তাকে দেখে সারা আতঙ্কে শিউরে ওঠে, "আরিয়ান! তুমি এখানে কেন এলে? প্লিজ চলে যাও!"

সারার মা আরিয়ানের দিকে ঘুরে তাকান। আরিয়ানের মুখাবয়ব দেখে তার চোখে ফুটে ওঠে এক তীব্র ঘৃণা ও হিংসা। "তুমিও এসেছ? তোমার বাবার চেহারাটা হুবহু তোমার মুখে বসানো! বের হয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে! তোমার বাবার পাপের প্রায়শ্চিত্ত এই পরিবার বহু বছর ধরে করেছে, আর কোনো সম্পর্ক আমি সহ্য করব না!"

"অনুগাত করে আমাকে সত্যটা বলুন," আরিয়ানের গলা ধরে আসে। "আমার বাবা কী করেছিলেন? সারার সাথে আমার ভালোবাসার অপরাধটা কোথায়?"

"তোমার বাবা আমাদের ধ্বংস করে দিয়েছিল!" সারার মা কাঁপতে কাঁপতে বলে ওঠেন। "বিশ বছর আগে এক রাতে তোমার বাবা আমার স্বামীকে ব্যবসায়িক প্রতারণা করে নিঃস্ব করে দিয়েছিল, আর শুধু তা-ই নয়... আমার ছোট বোনকে ভালোবাসার ফাঁদে ফেলে তার জীবনটা তছনছ করে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য করেছিল! সেই অভিশপ্ত রাতের পর আমাদের পরিবার আর কখনো দাঁড়াতে পারেনি। আর তুমি এসেছ আমার মেয়ের জীবন কেড়ে নিতে?"

কথাগুলো আরিয়ানের কানে বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধে। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার বাবা—যাকে সে সবসময় এক আদর্শ মানুষ হিসেবে জেনে এসেছে, সে এত বড় অপরাধী?

সারা কেঁদে কেঁদে আরিয়ানের সামনে এসে দাঁড়ায়। সে আরিয়ানের বুকে হাত রাখে, কিন্তু সেই ছোঁয়ায় আগের মতো উষ্ণতা ছিল না, ছিল এক বুক ভাঙা হাহাকার। "আরিয়ান... মা ভুল বলছে না। আমি যখন জানলাম তোমার বাবার নাম আর পরিচয়, তখন আমার পায়ের তলার মাটি হারিয়ে গিয়েছিল। আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমার সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে ভালোবাসি... কিন্তু আমার পরিবারের এই রক্তভেজা অতীতের ওপর দাঁড়িয়ে আমি তোমার হতে পারব না।"

আরিয়ান সারার হাত দুটো আঁকড়ে ধরে। সারার ভেজা চোখ আর গাল বেয়ে পড়া জলের ফোঁটা আরিয়ানকে পাগল করে তোলে। সে সারাকে এক ধাক্কায় নিজের বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে।

"সারা, অতীত আমাদের অতীত নয়! আমার বাবার পাপে আমি কেন দণ্ড পাব? আর তোমার পরিবারের কষ্টের ভার আমি নিজের কাঁধে নেব। কিন্তু তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না," আরিয়ানের ঠোঁট সারার কপালে, গালে তীব্র আকুলতায় চেপে বসে।

সারা প্রথমে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আরিয়ানের এই মাতাল করা ভালোবাসা আর আকুলতার সামনে তার সব প্রতিরোধ ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়। সেও আরিয়ানের কোমর জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। বাড়ির উঠোনের এক নির্জন কোণে, সারার মায়ের ঘৃণাপূর্ণ দৃষ্টির অগোচরে তাদের ঠোঁট আবার এক হয়ে যায়। সেই চুম্বনে ছিল ভালোবাসার অপ্রতিরোধ্য তৃষ্ণা, সাথে ছিল এক তীব্র বেদনার স্বাদ। আরিয়ানের হাতের আঙুল সারার পিঠ বেয়ে নেমে এসে তাকে আরও কাছে টেনে নেয়, তাদের শরীরি উষ্ণতা এক মুহূর্তে সমস্ত অতীত আর পারিবারিক শত্রুতাকে ভুলিয়ে দিতে চায়।

কিন্তু সেই মিলন দীর্ঘস্থায়ী হলো না। সারার মা ঘর থেকে বের হয়ে তাদের টেনে আলাদা করে দেন এবং আরিয়ানকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দেন।

সারাকে চোখের জলে রেখে আরিয়ান সেই বাড়ি থেকে বের হয়ে আসে। তার মাথায় তখন ঝড়ের মতো ঘুরছে একটাই প্রশ্ন—তার বাবা কি সত্যিই এত বড় অপরাধী ছিলেন? নাকি এই বিশ বছর পুরোনো ঘটনার পেছনে অন্য কোনো সত্যি লুকিয়ে আছে, যা সারার পরিবারও জানে না? আরিয়ান প্রতিজ্ঞা করে, সে তার বাবার অতীতের সেই অন্ধকার রাতটির আসল সত্য উদঘাটন করবেই, তা যা-ই হোক না কেন।

সারার বাড়ি থেকে এক বুক হতাশা আর মাথার ভেতর হাজারো প্রশ্ন নিয়ে বের হয়ে আসে আরিয়ান। সন্ধ্যার পর শহরের আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢেকে যায়, আর অঝোর ধারায় নামতে শুরু করে বৃষ্টি। আরিয়ানের চোখ দুটি তখন লাল, মনের ভেতরে এক তাণ্ডব চলছে। সে সোজা নিজের ধানমন্ডির বাসায় ফিরে আসে।

পুরোনো দোতলা বাড়িটার পরিবেশ আজ যেন অতিরিক্ত নীরব। ড্রয়িংরুমে অল্প আলোয় বসে ছিলেন আরিয়ানের মা। আরিয়ানকে এমন ভেজা আর বিধ্বস্ত অবস্থায় ঘরে ঢুকতে দেখে মা ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ান।

"কী হয়েছে আরিয়ান? এত রাতে এভাবে ভিজছিস কেন? শরীর খারাপ করবে তো!" মা তোয়ালে নিয়ে আরিয়ানের দিকে এগিয়ে আসেন।

আরিয়ান মায়ের তোয়ালে ধরার হাতটা আস্তে করে সরিয়ে দেয়। সে মায়ের চোখের দিকে সরাসরি তাকায়, যে চোখে এতদিন শুধু শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা ছিল, আজ সেখানে শুধুই অবিশ্বাস আর প্রশ্ন।

"মা... বাবা কেমন মানুষ ছিলেন?" আরিয়ানের কণ্ঠ মারাত্মক গম্ভীর ও ঠাণ্ডা।

মায়ের মুখ থেকে এক মুহূর্তে সব আলো নিভে যায়। তিনি চোখ নামিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন, "হঠাৎ এ কথা কেন জিজ্ঞেস করছিস? তোর বাবা এক খুব ভালো মানুষ ছিলেন, অত্যন্ত সফল ব্যবসায়ী—"

"মিথ্যা বোলো না, মা!" আরিয়ান চিৎকার করে ওঠে। তার গলার আওয়াজ পুরো খালি ঘরে প্রতিধ্বনি তোলে। "বিশ বছর আগে বাবা কার সাথে প্রতারণা করেছিলেন? কার জীবন তছনছ করে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য করেছিলেন? সারার পরিবারের সাথে বাবার সম্পর্ক কী ছিল?"

'সারা' নামটা শুনতেই মায়ের মুখ ফ্যাকাশে সাদা হয়ে যায়। থরথর করে কাঁপতে থাকে তাঁর হাত-পা। সোফায় ধপ করে বসে পড়েন তিনি।

"তুই... তুই কীভাবে জানলি এসব? তুই ওই বাড়ির মেয়েটার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলি?" মায়ের কণ্ঠে চরম আতঙ্ক।

"হ্যাঁ, গিয়েছিলাম! আর সেখানে গিয়ে জেনে এলাম যে আমার বাবা একজন পিশাচ ছিলেন! একজন প্রতারক!" আরিয়ান হাঁপাচ্ছিল।

"না! তোর বাবা অপরাধী ছিলেন না!" মা এবার কেঁদে ওঠেন। "তুই যা শুনছিস তা পুরো সত্য নয়! তোর বাবা ওই ব্যবসা বাঁচাতে নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন। সারার পরিবার যে অভিযোগ করছে, তার নেপথ্যে ছিল অন্য এক চাল!"

আরিয়ান ধীর পায়ে মায়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে। মায়ের দুটো হাত চেপে ধরে সে আকুল গলায় বলে, "তাহলে আমাকে সত্যিটা বলো, মা। প্লিজ! আমি সারাকে ভালোবাসি। ও আমার জীবনের সবটুকু জুড়ে আছে। ওই অন্ধকার অতীত যদি আমাদের মাঝে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়, তবে আমি মরে যাব। সত্যিটা কী ছিল?"

মা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। তাঁর চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। তিনি বলতে শুরু করেন সেই বিশ বছর আগের করুণ ইতিহাস।

"তোর বাবা আর সারার বাবা একসাথে একটা বড় টেক্সটাইল ব্যবসা শুরু করেছিলেন। ব্যবসা খুব ভালো চলছিল। কিন্তু মাঝখান থেকে তোর বাবার এক আপন ঘনিষ্ঠ বন্ধু—রাশেদ চৌধুরী—তাদের মাঝে বিষ ঢালতে শুরু করে। রাশেদ ছিল এক চরম চতুর আর লোভী মানুষ। সে গোপনে তোর বাবার সই জাল করে কোম্পানির সমস্ত টাকা আত্মসাৎ করে এবং সারার বাবার নামে সব অপবাদ চাপিয়ে দেয়। সারার বাবা নিঃস্ব হয়ে যান। আর সারার যে ছোট খালা... তিনি রাশেদকে ভালোবাসতেন। রাশেদ তাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ব্যবহার করেছিল এবং যখন কোম্পানির টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়, তখন তাকেও নিঃসঙ্গ ফেলে রেখে যায়। সেই অপমান সহ্য করতে না পেরে মেয়েটি আত্মহত্যা করেছিল। কিন্তু রাশেদ এমনভাবে চাল চেলেছিল যাতে সব দোষ তোর বাবার ওপর পড়ে!"

আরিয়ান স্তব্ধ হয়ে যায়। "তাহলে বাবা কেন নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করলেন না?"

"তোর বাবা চেষ্টা করেছিলেন রে!" মা আকুল হয়ে কাঁদতে থাকেন। "সেই রাতের আসল নথি আর রাশেদের জালিয়াতির প্রমাণ সংগ্রহ করে তোর বাবা যখন পুলিশে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই রাশেদের লোকজনের গাড়ি এসে তোর বাবার গাড়িকে সামনা সামনি ধাক্কা দেয়। সেই দুর্ঘটনায় তোর বাবা ঘটনাস্থলেই মারা যান! আর সেই সাথে সব প্রমাণও চিরতরে হারিয়ে যায়। সারা আর তার মা কোনোদিন জানতেই পারল না যে আসল অপরাধী তোর বাবা নন, আসল কালপ্রিট ছিল রাশেদ চৌধুরী!"

মায়ের মুখ থেকে সত্যিটা শুনে আরিয়ানের বুকের ভেতর জমাট বেঁধে থাকা পাথরটা এক মুহূর্তে হালকা হয়ে যায়, কিন্তু পর মুহূর্তেই এক নতুন অগ্নিশিখা জ্বলে ওঠে। তার বাবা নির্দোষ ছিলেন! তার বাবা কোনো অপরাধী নন, বরং তিনিও ছিলেন সেই চক্রান্তের শিকার।

আরিয়ান আর এক মুহূর্তও দেরি করে না। সে তার ঘরের চাবি আর কফির কাপ পাশে রেখে ফোনটা হাতে নেয়। তার সারাকে এই সত্যিটা জানাতেই হবে। তার সারাকে বলতে হবে যে তাদের ভালোবাসার পথ কোনো রক্তভেজা পাপে আবৃত নয়।

বাইরে বৃষ্টির বেগ আরও বেড়েছে। আরিয়ান বাইক নিয়ে সোজা চলে যায় সারার বাড়ির উদ্দেশ্যে। মধ্যরাতে সারার ঘরের জানালার পাশে গিয়ে সে দাঁড়ায়। সারার ঘরের আলো তখনো জ্বলছিল। আরিয়ান ফোনের মেসেজে লেখে, "একবার জানালার কাছে এসো সারা, নতুবা আমি আজ রাতে এই বৃষ্টির মাঝেই শেষ হয়ে যাব।"

কিছুক্ষণের মধ্যেই জানালা খোলে। সারা জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল, তার চোখ দুটো ফোলা, কান্নায় ভেজা। আরিয়ানকে নিচে বৃষ্টিতে ভিজতে দেখে সে চমকে ওঠে।

আরিয়ান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। সে বাড়ির পাশের মেহগনি গাছের ডাল ধরে বেয়ে উঠে যায় সারার দোতলার বারান্দায়। গ্রিল টপকে বারান্দায় পা রাখতেই সারা শিউরে উঠে তার মুখ চেপে ধরে, "তুমি পাগল হয়ে গিয়েছো আরিয়ান? মা টের পেলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে! চলে যাও প্লিজ!"

আরিয়ান কোনো কথা না শুনে এক টান মেরে সারাকে ভেজা বারান্দা থেকে টেনে এনে ঘরের ভেতরে নিয়ে যায় এবং দরজা বন্ধ করে দেয়। সারার সমস্ত শরীর কাঁপছিল। আরিয়ান সারার মুখটা নিজের দুই হাতের তালুতে নিয়ে তার ঠোঁটে তীব্র এক গভীর চুমু বসিয়ে দেয়।

সে চুম্বনে কোনো দ্বিধা ছিল না, ছিল এক পরম সত্যের অধিকার। সারার ঠোঁটের নোনতা জলের সাথে আরিয়ানের গায়ের বৃষ্টির জল মিশে এক হয়ে যায়। আরিয়ানের উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শে সারা শিউরে ওঠে, তার ভেতরের জমে থাকা সব কষ্ট এক মুহূর্তে গলে জল হয়ে যায়। সারা আরিয়ানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, তার হাতের আঙুল আরিয়ানের ভেজা চুলের ভেতরে চেপে বসে।

আরিয়ান সারার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলে, "আমার বাবা নির্দোষ ছিলেন, সারা। আসল অপরাধী অন্য কেউ। আমাদের ভালোবাসাকে নিঃশেষ হতে দেব না আমি।"

সারা চোখ বড় বড় করে আরিয়ানের দিকে তাকায়। তার বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘদিনের ভয় আর সংশয় কি তবে আজ সত্যি কেটে যাবে? কিন্তু তারা জানত না, এই চক্রান্তের পেছনে যে মূল সত্য বা রহস্যটা এখনও বাকি আছে, তা তাদের দুজনের কল্পনারও বাইরে।

ঘরের মৃদু আলোয় সারার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে আরিয়ান। সারার শিউরে ওঠা ঠোঁট আর কামনায় ব্যাকুল দুটি চোখ যেন এক তীব্র আবেশের সৃষ্টি করেছিল। আরিয়ান তার মুখটা সারার ঘাড়ের কাছে নামিয়ে আনে। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস সারার সংবেদনশীল ত্বকে লাগতেই সারা মৃদু আর্তনাদ করে ওঠে। আরিয়ানের ঠোঁট সারার ঘাড় থেকে নেমে এসে তার কাঁধের জামাটা খানিকটা সরিয়ে খালি ত্বকে গভীর ছোঁয়া এঁকে দেয়। সারা আরিয়ানের চুলের মধ্যে হাত গলিয়ে দিয়ে তাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের সাথে পিষে নেয়।

"আরিয়ান... তুমি কী বলছ এসব? সত্যিই তোমার বাবা... নির্দোষ ছিলেন?" সারার গলার আওয়াজ কাঁপছিল, তার শরীর আরিয়ানের বাহুডোরে থরথর করে কাঁপছিল।

আরিয়ান সারার কোমরে তার শক্ত হাত দুটো দিয়ে জড়িয়ে ধরে তাকে পুরোপুরি নিজের শরীরের সাথে লেপটে নেয়। সারার বুক তখন দ্রুত উঠানামা করছে। আরিয়ানের ঠোঁট আবার সারার নরম ঠোঁট দুটোকে নিজের তৃষ্ণার্ত ছোঁয়ায় বন্দি করে ফেলে। এই গভীর শারীরিক আকুলতায় ছিল দীর্ঘদিনের বিরহ আর এক সত্য পাওয়ার তীব্র ব্যাকুলতা। তারা দুজন যেন সময়ের সীমানা পেরিয়ে এক অদ্ভুত উন্মাদনায় মেতে ওঠে।

আরিয়ান আস্তে আস্তে সারার কানে ফিসফিস করে বলে, "আমার বাবা কোনো অন্যায় করেননি সারা। আসল অপরাধী রাশেদ চৌধুরী নামে এক লোক, যে আমার বাবার সই জাল করে কোম্পানির সব টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল। এমনকি সে তোমার খালার জীবনটাও তছনছ করেছিল। আর আমার বাবাকে প্রমাণসহ মেরে ফেলা হয়েছিল।"

সারার চোখের কোণ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে, কিন্তু এই পানির স্বাদে আজ কোনো সংশয় ছিল না, ছিল এক অজানা স্বস্তি। সে আরিয়ানের মুখে হাত রেখে আবেগপ্লুত স্বরে বলে, "আমার মা... মা তো পুরো জীবনটা এই ভুল ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে পার করে দিলেন! আমরা কীভাবে মাকে বোঝাব আরিয়ান?"

"আমরা প্রমাণ নিয়ে যাব," আরিয়ান সারার ঠোঁটে শেষ এক হালকা চুমু দিয়ে নিজেকে কিছুটা সামলে নেয়। "আমার মা বলেছেন, রাশেদ চৌধুরী এখনো বেঁচে আছে। হয়তো সে কোনো ছদ্মবেশে বা বড় কোনো ব্যবসায়ী সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি সেই পুরোনো ফাইলগুলো খুঁজব, যা আমার বাবা সেই রাতে সাথে রেখেছিলেন।"

সারার বুক আবার এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে। "কিন্তু আরিয়ান, রাশেদ চৌধুরী যদি এত বড় অপরাধী হয়, তবে তার কাছে যাওয়াটা কি বিপজ্জনক নয়? তুমি একা কীভাবে লড়াই করবে?"

"তোমার এই ভালোবাসা আমার সাথে থাকলে কোনো বিপদই আমাকে থামাতে পারবে না," আরিয়ান সারার হাত দুটো নিজের বুকের ওপর চেপে ধরে বলে।

ঠিক তখনই ঘরের বাইরের করিডোরে সারার মায়ের জুতো বা পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। তিনি হয়তো ঘুম ভেঙে পানি খেতে উঠেছেন। সারার মুখ মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে যায়।

"আরিয়ান, মা আসছে! তুমি এখনই যাও, প্লিজ!" সারা ব্যাকুল হয়ে আরিয়ানকে ধাক্কা দিয়ে বারান্দার দিকে নিয়ে যায়।

আরিয়ান সারার গালে শেষবারের মতো হাত বুলিয়ে বারান্দার গ্রিল গলে আবার বৃষ্টির রাতে মেহগনি গাছের ডাল ধরে নিচে নেমে আসে। অন্ধকারে আরিয়ানের মিলিয়ে যাওয়া দৃশ্য দেখে সারা বারান্দার দরজা বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তার মনে তখন একদিকে যেমন আরিয়ানের সত্যির জন্য স্বস্তি, অন্যদিকে তার মায়ের এত বছরের ভুল ভাঙানোর এক কঠিন লড়াইয়ের শঙ্কা।

পরদিন সকালে আরিয়ান তার বাবার পুরোনো ডায়েরি এবং আলমারির ভেতরের কিছু পুরোনো নথিপত্র খুঁজতে শুরু করে। তার মায়ের দেওয়া নির্দেশ মতো এক স্টিলের বাক্সে রাখা ছিল বাবার কিছু ব্যক্তিগত কাগজপত্র। ধুলো জমে থাকা সেই পুরোনো কাগজগুলো ঘাটতে ঘাটতে আরিয়ান একটি পুরোনো ডায়েরির পাতায় রাশেদ চৌধুরীর একটি পুরোনো ছবি আর তার জাতীয় পরিচয়পত্রের এক কপি খুঁজে পায়।

ছবিটার দিকে তাকাতেই আরিয়ানের রক্ত যেন মুহূর্তের মধ্যে হিম হয়ে যায়। তার চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসে।

ছবিতে থাকা লোকটির মুখটি আরিয়ানের ভীষণ পরিচিত! এ তো সেই মানুষটা, যাকে আরিয়ান প্রতিদিন দেখে আসছে অন্য এক পরিচয়ে!

যে মানুষটিকে আরিয়ান নিজের জীবনে একজন অভিভাবক, একজন বড় শুভাকাঙ্ক্ষী মনে করে এসেছে এতদিন—যে লোকটি আরিয়ানের বাবার মৃত্যুর পর তাদের পরিবারকে গোপনে আর্থিক সাহায্য করে এসেছে এবং আরিয়ানের ব্যবসার বড় বিনিয়োগকারী—সেই 'খালেক সাহেব'-ই আসলে রাশেদ চৌধুরী!

আরিয়ানের মাথায় এক লহমায় হাজারটা বাজ পড়ে। তার মানে, যে লোকটি তার বাবার জীবন কেড়ে নিয়েছিল, যে লোকটি সারার পরিবারকে ধ্বংস করেছিল, সেই লোকটাই বিগত বিশ বছর ধরে আরিয়ান আর তার মায়ের খুব কাছে অবস্থান করছে?

আরিয়ান ডায়েরির পাতাটি শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে। তার চোখের ভেতরের ভালোবাসা আর ব্যাকুলতা এক মুহূর্তে চরম হিংস্র প্রতিশোধের আগুনে রূপান্তরিত হয়। সে বুঝতে পারে, এই সত্য কেবল একটি পারিবারিক প্রতারণার গল্প নয়—এর পেছনে লুকিয়ে আছে এমন এক ঘৃণ্য খেলা, যা রাশেদ চৌধুরী এতদিন ধরে খেলে এসেছে। আরিয়ান নিজের অজান্তেই সেই সাপের গর্তে এতদিন বাস করে এসেছে।

পকেটে বাবার পুরোনো ছবি আর নথিপত্র নিয়ে আরিয়ান সোজা খালেক সাহেবের—অর্থাৎ রাশেদ চৌধুরীর—ধানমন্ডির অভিজাত বাংলোর দিকে রওনা হয়। আজ তাকে এই সব মিথ্যার চাদর ছিঁড়ে বের করতে হবে, তা সেটার মাশুল যত বড়ই হোক না কেন।

বৃষ্টি থামলেও ঢাকার পথঘাট ভেজা, আরিয়ানের বাইকের চাকার নিচে ভেজা পিচ পিচ্ছিল হয়ে আছে। কিন্তু তার ভেতরের জ্বলতে থাকা ক্ষোভের আগুনের কাছে বাইরের কোনো শীতলতাই প্রভাব ফেলতে পারছিল না। সে বাইক চালিয়ে সোজা এসে দাঁড়ায় ধানমন্ডি ৭ নম্বরের এক বিশাল রাজকীয় বাড়ির সামনে—'খালেক ম্যানশন'।

যে মানুষটিকে আরিয়ান এতদিন 'খালেক চাচা' বলে ডেকে এসেছে, বিপদে-আপদে অভিভাবক মেনে এসেছে, সে-ই আসলে রাশেদ চৌধুরী—তার বাবার হত্যাকারী, সারার পরিবারের ধ্বংসের মূল কারিগর!

আরিয়ান দীর্ঘ পদক্ষেপ ফেলে বিশাল দোতলা বাড়িটার ড্রয়িংরুমে ঢুকে পড়ে। সেখানে নরম চামড়ার সোফায় বসে কফিতে চুমুক দিচ্ছিলেন শুভ্র চুলের মার্জিত চেহারার খালেক সাহেব, যার আসলে নাম রাশেদ চৌধুরী। আরিয়ানকে এভাবে হুট করে ধেয়ে আসতে দেখে তিনি চশমার উপর দিয়ে তাকালেন, ঠোঁটে এক চিরাচরিত রূপালী হাসি ফুটিয়ে বললেন, "কী ব্যাপার আরিয়ান? সকালে না জানিয়েই চলে এলে? কোনো জরুরি কথা আছে?"

আরিয়ান কোনো কথা না বলে সোজা তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। পকেট থেকে বাবার সেই পুরোনো ডায়েরি থেকে বের করা ছবি আর নথিপত্রগুলো ধপ করে টেবিলের ওপর ছুঁড়ে মারে।

"শুভ সকাল, রাশেদ চৌধুরী সাহেব!" আরিয়ানের কণ্ঠে জমে থাকা ক্ষোভ আর ঘৃণা বরফের মতো ঠান্ডা।

নামটা শুনতেই খালেক সাহেবের মুখের সেই কৃত্রিম হাসির প্রলেপ এক মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল। তাঁর হাত থেকে কফির কাপটা সামান্য কেঁপে উঠল, চোখের মনি দুটো সংকুচিত হয়ে এল। তিনি কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখটা মুছলেন। তারপর চশমাটা খুলে টেবিলে রেখে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন।

"তুমি... তুমি এত দূর পৌঁছে গেছ তাহলে?" রাশেদ চৌধুরীর গলায় আর সেই স্নেহের পরশ নেই, সেখানে ফুটে উঠল এক কঠিন, ধূর্ত রূপ।

"আমার বাবাকে মারার পর, সারার পরিবারকে পথে বসানোর পর তোমার পাপের ক্ষুধা মেটেনি?" আরিয়ান গর্জনে ফেটে পড়ে। "তুমি আমাদের পাশে ভালো মানুষের মুখোশ পরে ঘুরে বেড়াচ্ছিলে? আমাদের সাহায্য করার ভান করছিলে? এত বড় অপরাধী তুমি!"

রাশেদ চৌধুরী হালকা হাসলেন, যে হাসিতে কোনো অপরাধবোধ ছিল না, ছিল এক ঠান্ডা চক্রান্তের দাপট। "সাহায্য নয় আরিয়ান, ওটা ছিল প্রায়শ্চিত্ত... কিংবা বলতে পারো এক ধরনের বিনোদন। তোমার বাবা বোকামি করেছিল। সে ভেবেছিল সত্য প্রকাশ করে আমাকে শেষ করে দেবে। কিন্তু ব্যবসায় কোনো সত্য-মিথ্যা থাকে না, থাকে কেবল জয় আর পরাজয়। আমি জয়ী হয়েছিলাম। আর তোমার বাবা? সে মাটির নিচে শান্তিতে ঘুমাচ্ছে।"

কথাটা শেষ হতেই আরিয়ান নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে এক ঝটকায় রাশেদ চৌধুরীর শার্টের কলার চেপে ধরে তাঁকে সোফা থেকে দাঁড় করিয়ে ফেলে।

"তুমি আমার বাবাকে খুন করেছ! আমি তোমাকে আজই পুলিশের হাতে তুলে দেব, তোমার আসল চেহারা পুরো দুনিয়ার সামনে ফাঁস করব!" আরিয়ানের চোখ দিয়ে তখন আগুনের স্ফুলিঙ্গ বের হচ্ছে।

রাশেদ চৌধুরী বিন্দুমাত্র ভীত না হয়ে উল্টো এক অদ্ভুত বিকৃত হেসে উঠলেন। "পুলিশ? প্রমাণ কোথায় আরিয়ান? এই বিশ বছর পুরোনো একটা ছবি আর দুটো ছেঁড়া কাগজ দিয়ে তুমি আমাকে রাশেদ চৌধুরী প্রমাণ করবে? এই শহরের আইনশৃঙ্খলা থেকে শুরু করে আদালতের বিচারক—সবাই চেনে আমাকে একজন নামজাদা শিল্পপতি খালেক চৌধুরী হিসেবে। আর তুমি যদি বেশি বাড়াবাড়ি করো, তবে মনে রেখো..."

রাশেদ চৌধুরী আরিয়ানের হাতের বাঁধন থেকে এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নেন। তারপর আরিয়ানের খুব কাছে এসে ফিসফিস করে বললেন, "তোমার মা একা থাকেন ধানমন্ডির সেই পুরোনো বাড়িতে। আর সেই মেয়েটা... সারা? ওর পরিবারের বাকিটুকু ধ্বংস করতে আমার এক ঘণ্টার বেশি সময় লাগবে না।"

এই হুমকিতে আরিয়ানের শরীরের প্রতিটা রগ টানটান হয়ে ওঠে। কিন্তু সে বুঝতে পারে, রাগ দিয়ে এই শয়তানকে হারানো যাবে না। বুদ্ধির চালে একে মাত করতে হবে।

আরিয়ান এক পা পিছিয়ে আসে। মুখ থেকে সব রাগ মুছে ফেলে সে এক অবিশ্বাস্য ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে রাশেদ চৌধুরীর দিকে তাকায়। "তুমি ভুল করছ রাশেদ চৌধুরী। তুমি ভেবেছ আমি একা এসেছি?"

ঠিক তখনই আরিয়ানের পকেটের ফোনটা বেজে ওঠে। আরিয়ান স্পিকার অন করে ফোনটা সামনে ধরে। ওপাশ থেকে ভেসে আসে সারার কণ্ঠ—যার সাথে কথা বলছে থানার এক উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা!

আরিয়ান খালেক ম্যানশনে ঢোকার আগেই সারার সাথে যোগাযোগ করে সব নথিপত্র সারার হাতে তুলে দিয়েছিল। সারা সেই ফাইল নিয়ে সোজা চলে গিয়েছিল ধানমন্ডি থানার ওসির কাছে, যিনি সারার বাবার এক পুরোনো পরিচিত ছিলেন। উপরন্তু, আরিয়ান যখন রাশেদ চৌধুরীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল, তখন তার পকেটের ফোনে কল রেকর্ড চালু করা ছিল—যেখানে রাশেদ চৌধুরী নিজের মুখে বিশ বছর আগের অপরাধ ও হুমকির কথা স্বীকার করেছে!

ফোন থেকে নিজের রেকর্ড করা অডিও বার্তাটি বাজতেই রাশেদ চৌধুরীর মুখটা ফ্যাকাশে সাদা হয়ে যায়। তার হাত-পা কাঁপতে শুরু করে।

"তুমি... তুমি আমাকে ফাদে ফেললে?" রাশেদ চিৎকার করে ওঠে।

"তোমার পাপের ঘট পূরণ হয়ে গেছে রাশেদ চৌধুরী," আরিয়ান শীতল কণ্ঠে বলে। "আমার বাবা জীবন দিয়ে সত্য রক্ষা করেছিলেন, আর আমি আজ সেই সত্য দিয়ে তোমাকে নিঃশেষ করব।"

বাইরে তখন পুলিশের সাইরেনের বিকট শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। লাল-নীল আলো খালেক ম্যানশনের বিশাল কাঁচের দেয়ালে এসে পড়ে। বিশ বছর আগে যে চক্রান্তের অন্ধকার শুরু হয়েছিল, আজ যেন তা এক নতুন আলোর মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়।

বিকেলে ধানমন্ডি থানায় সারার মা, আরিয়ানের মা আর সারা মুখোমুখি দাঁড়ায়। বিশ বছরের জমানো ভুল বোঝাবুঝি, ঘৃণা আর কান্না একাকার হয়ে যায় সেই মুহূর্তে। সারার মা আরিয়ানের মায়ের হাত ধরে কেঁদে ফেলেন, নিজের অতীতের ভুলের জন্য ক্ষমা চান।

সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ হতে হতে রাত নেমে আসে। থানা থেকে বের হয়ে আরিয়ান আর সারা নির্জন ধানমন্ডি লেকের সেই পুরোনো জায়গাটিতে এসে দাঁড়ায়। আকাশে আজ মেঘ নেই, আছে এক ফালি রুপালী চাঁদ আর শান্ত হাওয়া।

সারা ধীর পায়ে আরিয়ানের সামনে এসে দাঁড়ায়। তার চোখে অশ্রু, কিন্তু সেই অশ্রুতে আর কোনো ভয় বা বাধা ছিল না।

"আরিয়ান..." সারা আলতো করে ডাক দেয়।

আরিয়ান কোনো কথা না বলে সারাকে টেনে নিয়ে নিজের বুকের ভেতরে জড়িয়ে ধরে। সারার কোমল শরীর আরিয়ানের বুকের সাথে মিশে যায়। সারার হাতের আঙুলগুলো আরিয়ানের পিঠে শক্ত করে বসে। এতদিনের মানসিক ঝড়, যন্ত্রণা আর লড়াইয়ের পর এই মিলন ছিল তাদের ভালোবাসার সবচেয়ে পরম এবং গভীর মুহূর্ত।

আরিয়ান সারার থুতনিটা ধরে মুখটা উঁচিয়ে ধরে। চাঁদনী রাতে সারার ঠোঁট দুটো প্রদীপের মতো জ্বলছিল। আরিয়ান আস্তে করে নিজের ঠোঁট নামিয়ে আনে সারার ঠোঁটে। প্রথম স্পর্শটা ছিল পরম স্নিগ্ধতায় ভরা, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই তা পরিণত হয় এক অগ্নিকুণ্ডের মাতাল করা আবেশে। সারার উষ্ণ নিঃশ্বাস আরিয়ানের মুখে আছড়ে পড়ে, সে আরিয়ানের ঘাড় জড়িয়ে ধরে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দেয়। আরিয়ানের এক হাত সারার খোলা চুলগুলোর ভেতর খেলা করছিল, আর অন্য হাত সারার কোমর পেঁচিয়ে ধরে তাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের সাথে পিষে নিচ্ছিল। তাদের শরীরের এই কামনাময় উষ্ণতা আর হৃদয়ের ব্যাকুলতা রাতের বাতাসকেও যেন মাতাল করে তোলে।

কিন্তু সেই মধুর ও গভীর ছোঁয়ার মাঝেও সারার হৃদয়ে এক শেষ প্রশ্ন মোচড় দিয়ে ওঠে, যা সে এখনও আরিয়ানকে বলতে পারেনি। আরিয়ান যখন সারার ঠোঁট থেকে নিজের ঠোঁট সরিয়ে নিয়ে তার কপালে চুমু খাচ্ছিল, সারা আরিয়ানের চোখের দিকে তাকায়।

"আরিয়ান... সব সত্য তো প্রকাশ পেল। কিন্তু আমার মনে একটা খটকা এখনও থেকে গেছে," সারা ফিসফিস করে বলে।

"কী খটকা, সারা?" আরিয়ান সারার গালে হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করে।

"যে রাতে তোমার বাবা মারা যান... সেই রাতে রাশেদ চৌধুরীর গাড়ির সাথে তোমার বাবার গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছিল। কিন্তু পুলিশের সেই পুরোনো ডায়েরিতে লেখা ছিল, তোমার বাবার গাড়িতে আরও একজন তৃতীয় ব্যক্তি ছিলেন, যিনি সেই আসল ফাইলের মূল কপিটি নিয়ে পালিয়ে যান এবং আজও নিখোঁজ। যদি রাশেদ চৌধুরী পুরো চক্রান্ত করে থাকে, তবে সেই তৃতীয় ব্যক্তিটি কে ছিল? আর সেই আসল ফাইলটিই বা কোথায় গেল?"

সারার এই কথাটি শুনতেই আরিয়ানের সমস্ত শরীর আবার শক্ত হয়ে যায়। তার মনে পড়ে যায়, ছোটবেলায় বাবার মৃত্যুর পর তার মা তাকে এক গোপন বাক্সের চাবি দিয়ে বলেছিলেন, "যখন সঠিক সময় আসবে, তখন এই চাবি দিয়ে গোপন আলমারিটা খুলবি।"

তবে কি চক্রান্তের মূল সত্যটা এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি? সবচেয়ে বড় টুইস্ট—যে ঘটনার মূল সত্যটা আরিয়ান নিজেই জানত না, তা কি তবে তাদের ঘরের ভেতরেই লুকিয়ে আছে?

ধানমন্ডি লেকের শান্ত বাতাসে এক অজানা আশঙ্কার হিমেল ছোঁয়া খেলে যায়। সারার তুলে ধরা সেই প্রশ্নটা আরিয়ানের মাথার ভেতরে প্রকাণ্ড এক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তৃতীয় ব্যক্তি? আসল ফাইলের মূল কপি? তবে কি রাশেদ চৌধুরীও এই চক্রান্তের একমাত্র ঘুঁটি ছিল না?

আরিয়ান আর এক মুহূর্তও লেকের পাড়ে দাঁড়ায় না। সারার হাত শক্ত করে ধরে সে সোজা নিজের ধানমন্ডির সেই পুরোনো দোতলা বাড়ির দিকে রওনা দেয়। সারাও আরিয়ানের পাশে ছায়ার মতো লেগে থাকে। ঘরের ভেতর ঢোকার পর চারপাশ অতিরিক্ত নিঝুম মনে হচ্ছিল। ড্রয়িংরুমে আলো জ্বলছিল না, কেবল দোতলার ঘরের হালকা আলো নেমে আসছিল সিঁড়ি বেয়ে।

আরিয়ান সোজা চলে যায় মায়ের ঘরে। মা তখন খাটে বসে পুরোনো একটি ছবির অ্যালবাম উল্টে দেখছিলেন। আরিয়ান আর সারাকে একসাথে ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি মৃদু হাসেন, কিন্তু আরিয়ানের গম্ভীর মুখ দেখে সেই হাসি মিলিয়ে যায়।

"কী হয়েছে আরিয়ান? তোদের মুখ এমন থমথমে কেন?" মা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে শুধালেন।

আরিয়ান ধীর পায়ে মায়ের সামনে গিয়ে বসে। সে সারার দিকে একবার তাকায়, তারপর মায়ের চোখের দিকে দৃষ্টি রেখে বলে, "মা... বিশ বছর আগের সেই অভিশপ্ত রাতে বাবার গাড়িতে আরেকজন মানুষ ছিল। পুলিশের পুরোনো নথিতে সেই তৃতীয় ব্যক্তির কথা লেখা আছে, যে মূল ফাইলটা নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। আমাকে বলো মা, সেই চাবিটা কোথায় যা তুমি আমাকে ছোটবেলায় সামলে রাখতে বলেছিলে? সেই গোপন আলমারির পেছনে কী লুকিয়ে আছে?"

কথাটা শোোনামাত্র মায়ের হাত থেকে ছবির অ্যালবামটি ধপ করে কোলে পড়ে যায়। মায়ের মুখের সমস্ত রঙ এক লহমায় মুছে গিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে যায়। তাঁর চোখ দুটো আতঙ্কে বড় বড় হয়ে ওঠে।

"তুই... তুই এসব কী বলছিস আরিয়ান? ওইসব পুরোনো কথা এখন কেন তুলছিস?" মায়ের গলা কাঁপছিল।

"কারণ সত্য এখনও অসম্পূর্ণ মা!" আরিয়ান চিৎকার করে ওঠে। "রাশেদ চৌধুরী ধরা পড়েছে, কিন্তু আসল অপরাধের পুরো সত্যটা যদি না সামনে আসে, তবে বাবার আত্মা কোনোদিন শান্তি পাবে না। বলো মা, সেই চাবি কোথায়?"

মা থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বালিশের নিচে হাত দিয়ে একটি ছোট্ট, পিতলের পুরোনো চাবি বের করে আনেন। আরিয়ান মা-কে কিছু না বলে চাবিটি ছিনিয়ে নেওয়ার মতো করে নেয় এবং সোজা চলে যায় বাবার পুরোনো পড়ার ঘরে। সারাও ব্যাকুল হয়ে তার পেছনে পেছনে যায়।

পড়ার ঘরের একদম পেছনের কাঠের বড় আলমারিটার পেছনে একটা ছোট গোপন দেয়াল সিন্দুক ছিল, যা এতদিন ছবির ফ্রেম দিয়ে ঢাকা ছিল। আরিয়ান ছবিটা সরিয়ে পিতলের চাবিটা সিন্দুকের চাবি ঢোকানোর জায়গায় প্রবেশ করায়। এক হালকা শব্দ করে সিন্দুকের ভারী দরজাটা খুলে যায়।

ভেতরে রাখা ছিল একটি লাল রঙের পুরোনো ডায়েরি এবং একটি ক্যাসেট প্লেয়ারের ফিতা। আরিয়ান কাঁপতে থাকা হাতে সেই ডায়েরিটি বের করে আনে। ডায়েরির প্রথম পাতাতেই রক্ত দিয়ে লেখা কিছু লাইন, আর ভেতরে রাখা কিছু আসল চুক্তিনামা।

কিন্তু ডায়েরি উল্টাতেই যে সত্যটা আরিয়ানের চোখের সামনে উন্মোচিত হলো, তাতে তার বুকের ভেতর হাজারটা বাজ একসাথে ফেটে পড়ল। তার মাথার ভেতরের পৃথিবীটা যেন এক সেকেন্ডে চুরমার হয়ে গেল।

ঘটনার মূল মাস্টারমাইন্ড রাশেদ চৌধুরী ছিল না। রাশেদ ছিল কেবল এক পুতুল! সেই বিশ বছর আগে সারার বাবার সাথে জালিয়াতি, সারার খালাকে প্রলোভন দেখিয়ে নিঃস্ব করা, আর কোম্পানির সব টাকা আত্মসাৎ করার আসল পরিকল্পনাটি ছিল—আরিয়ানের নিজের মায়ের!

আরিয়ানের মা এবং রাশেদ চৌধুরী তরুণ বয়সে একে অপরকে ভালোবাসতেন। কিন্তু অতি লোভে আর টাকার গরমে তার মা আরিয়ানের বাবাকে বিয়ে করেছিলেন কেবল তার সম্পত্তির জন্য। পরে রাশেদের সাথে গোপনে হাত মিলিয়ে সারার পরিবারকে ধ্বংস করার ছক কষেছিলেন তিনিই। সারার খালা যখন সত্যিটা জেনে ফেলেছিলেন, তখন তাকে মানসিকভাবে তছনছ করে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন তার মা-ই। আরিয়ানের বাবা যখন এই শয়তানি চক্রান্তের পুরো সত্যিটা জেনে ফেলেন এবং প্রমাণসহ পুলিশের কাছে যাচ্ছিলেন, তখন আরিয়ানের মা নিজেই রাশেদকে খবর দিয়ে সেই গাড়ি দুর্ঘটনাটি ঘটিয়েছিলেন!

সেই রাতে বাবার গাড়িতে থাকা তৃতীয় ব্যক্তিটি অন্য কেউ ছিল না—ছিলেন আরিয়ানের মা নিজে! তিনি দুর্ঘটনাস্থল থেকে আসল ফাইল আর প্রমাণ চুরি করে পালিয়ে এসেছিলেন, যাতে রাশেদ ও তার পিঠ বাঁচে! পরবর্তীতে রাশেদ একা সব ভোগ করতে চাইলে মায়ের সাথে তার দূরত্ব তৈরি হয়, আর মা আরিয়ানকে নিজের আড়াল বানিয়ে 'অসহায় বিধবা'র অভিনয় করে এতদিন সংসার চালিয়ে এসেছেন!

আরিয়ান স্তব্ধ, নিঃশ্বাসহীন হয়ে কাঠের মেঝেবসে পড়ে। তার চোখ দিয়ে কোনো জল বের হচ্ছিল না, শুধু এক তীব্র, ভয়ানক অবিশ্বাসের শূন্যতা তাকে গ্রাস করছিল। সে যে মাকে এতদিন দেবী মেনে এসেছে, যে মাকে রক্ষা করার জন্য লড়াই করেছে—সেই মা-ই তার বাবার হত্যাকারী? সেই মা-ই সারার পরিবারকে ধ্বংস করা মূল রাক্ষসী?

সারার হাত থেকে ডায়েরিটা পড়ে যায়। সে অবিশ্বাস ভরা চোখে আরিয়ানের দিকে তাকায়। সারার বুকের ভেতরের ভালোবাসার জায়গাটা এক মুহূর্তে ভয়ানক এক যন্ত্রণায় দুমড়ে-মুচড়ে যায়। আরিয়ান যে সত্যটা খুঁজতে গিয়েছিল, সে জানত না সেই সত্যের বিষাক্ত ছোবল তার নিজের অস্তিত্বকেই ধুলোয় মিশিয়ে দেবে।

পড়ার ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ান আরিয়ানের মা। তাঁর চোখে আর কোনো অপরাধবোধের ভান নেই, সেখানে ফুটে উঠেছে এক বিষাক্ত, হিংস্র শীতলতা।

"তুই কোনোদিন এটা খুঁজবি ভাবিনি আরিয়ান," মা ঠাণ্ডা গলায় বললেন। "হ্যাঁ, আমিই করেছিলাম সব। তোর বাবা আমাকে টাকা দিতে পারেনি, তাই আমি রাশেদকে ব্যবহার করে সব কেড়ে নিয়েছিলাম। তুই আরিয়ানের ছেলে হয়ে আমার পাপে বাধা দিচ্ছিস?"

আরিয়ান ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ায়। তার চোখ দুটি তখন রক্তের মতো লাল। সে নিজের গর্ভধারিনী মায়ের দিকে তাকায়, কিন্তু সে চোখে আর কোনো সন্তানের ভালোবাসা ছিল না। সে কাঁপতে কাঁপতে মোবাইল বের করে থানার ওসির নম্বর ডায়াল করে।

"আরিয়ান... তুই নিজের মাকে পুলিশে দিবি?" মা চিৎকার করে ওঠেন।

"তুমি আমার মা নও," আরিয়ানের কণ্ঠস্বর যেন এক মৃত মানুষের মতো শোনায়। "তুমি এক পিশাচ। বিশ বছর আগে যে পিশাচ আমার বাবাকে মেরেছিল, সারার পরিবারকে ধ্বংস করেছিল... আজ তার হিসাব চুকানোর দিন।"

ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পুলিশ এসে আরিয়ানের মাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। পুরো বাড়িটা এক লহমায় এক গভীর শ্মশানের মতো নীরবতায় ডুবে যায়।

পরদিন ভোরে, বৃষ্টিশেষে উদয় হওয়া উদীয়মান সূর্যের আলো এসে পড়ে ধানমন্ডি লেকের ঘাটে। আরিয়ান সেখানে একা বসে ছিল, নিষ্পলক দৃষ্টিতে শান্ত জলের দিকে তাকিয়ে। তার জীবনে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই—বাবার স্মৃতি কলঙ্কিত, মায়ের রূপ নর্দমার চেয়েও ঘৃণ্য।

ঠিক তখনই তার পেছনে এসে দাঁড়ায় সারা।

আরিয়ান মুখ তুলে তাকায় না। "কেন এসেছ সারা? আমার রক্তে যে পাপের বিষ বইছে, তা জেনেও তুমি আমার সামনে এসেছ? আমার মা তোমার পরিবারকে ধ্বংস করেছে... তুমি আমাকে ঘৃণা করো না কেন?"

সারা ধীর পায়ে আরিয়ানের পাশে এসে বসে। সে আরিয়ানের রক্তবর্ণ চোখগুলোর দিকে তাকায়, যেখানে কেবল ভাঙা কাঁচের বেদনা জমে আছে। সারা কোনো কথা না বলে আরিয়ানকে এক শক্ত, গভীর আলিঙ্গনে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে।

সারার শরীরের সেই চিরপরিচিত নিবিড় উষ্ণতা আরিয়ানের সমস্ত রুদ্ধ হয়ে থাকা কান্নাকে বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতো নামিয়ে আনে। আরিয়ান সারার কাঁধে মুখ গুঁজে বাচ্চার মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। সারা তার হাতের আঙুল দিয়ে আরিয়ানের চুলগুলো বিলিয়ে দিতে থাকে, তার ঠোঁট আরিয়ানের ভেজা কপালে, গালে পরম অনুরাগে চেপে বসে।

"পাপ তোমার মায়ের ছিল আরিয়ান, তোমার নয়," সারা ফিসফিস করে বলে, তার চোখ দিয়েও জল ঝরছিল। "তুমি সত্যের জন্য নিজের মাকেও ছাড় দাওনি। এর চেয়ে বড় পবিত্রতা আর কী হতে পারে?"

সারা আরিয়ানের মুখটা নিজের দুই হাতের তালুতে তুলে ধরে। তারপর আরিয়ানের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে—সেই চুম্বনে কোনো অতীত ছিল না, কোনো পারিবারিক অভিশাপের কালো ছায়া ছিল না। সেখানে ছিল দুটি ক্ষতবিক্ষত আত্মার পুনর্জন্মের পরম আকুলতা। সারার তৃষ্ণার্ত, নিবিড় ছোঁয়া আরিয়ানের শরীরের রক্তে আবার বাঁচার ব্যাকুলতা ছড়িয়ে দেয়। আরিয়ান সারাকে আরও শক্ত করে নিজের কাছে টেনে নেয়, যেন এই ভালোবাসাই তার জীবনের একমাত্র আশ্রয়, একমাত্র মুক্তি।

পাপের অন্ধকার রাতের অবসান ঘটেছিল। সমস্ত গোপন চক্রান্ত, প্রতারণা আর মিথ্যার দেয়াল ভেঙে শেষ পর্যন্ত জয় হয়েছিল কেবল সত্যের, আর সেই সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে জন্ম নিয়েছিল আরিয়ান ও সারার এক অপরাজিত ভালোবাসার নতুন ভোর।

 

....
👁 11