বাসরঘরের আলোটা তানিয়া একটু কমিয়ে দিয়েছিল। খাটজুড়ে ছড়ানো রজনীগন্ধার সুবাস আর নতুন শাড়ির কড়া গন্ধে দম আটকে আসছিল তার। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজের গলার ভারী নেকলেসটা খোলার চেষ্টা করছিল, কিন্তু বাঁধনটা জট পাকিয়ে গেছে। ঠিক তখনই ঘরের দরজা খোলার শব্দ হলো। আয়নায় ফুটে উঠল নাবিলের অবয়ব। ৬ ফুট লম্বা, সুগঠিত শরীর, পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি। বাহ্যিকভাবে নাবিল এমন এক পুরুষ যাকে দেখে যেকোনো নারীর বুক কাঁপতে বাধ্য। তানিয়ার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি, কিন্তু সেই কাঁপুনিতে ভালোবাসার চেয়ে অচেনা এক হিমশীতল ভয় বেশি ছিল।
নাবিল ঘরে ঢুকে সোজা তানিয়ার পেছনে এসে দাঁড়াল। তার গায়ের দামী পারফিউমের তীব্র সুবাস তানিয়ার নাকে এসে ধাক্কা দিল।
"জট লেগেছে?"—নাবিলের গভীর, নিচু স্বরের কণ্ঠস্বর তানিয়ার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দিল।
তানিয়া শুধু মাথা নাড়ল, "হুঁ।"
নাবিল কোনো কথা না বলে তানিয়ার কাঁধ থেকে শাড়ির আঁচলটা আলতো করে সরিয়ে দিল। তার উষ্ণ হাতের ছোঁয়া তানিয়ার অনাবৃত কাঁধে লাগতেই তানিয়া শিউরে উঠল। বন্ধন ছাড়ানোর বাহানায় নাবিলের আঙুলগুলো অনায়াসে তানিয়ার খালি পিঠে ঘুরে বেড়াতে লাগল। তার প্রতিটা ছোঁয়ায় অগ্নিকণা, অথচ তার চোখের দিকে তাকালে মনে হয় পুরো মানুষটাই বরফে তৈরি। নাবিল তানিয়ার গলার জট ছাড়াল, তারপর খুব ধীরে তানিয়ার ঘাড়ে নিজের তপ্ত ঠোঁট জোড়া রাখল।
সেই গভীর, ব্যাকুল চুম্বনে তানিয়া মুহূর্তের জন্য ভেজা মাটির মতো গলে গিয়েছিল। তার মনে হয়েছিল, নাবিল তাকে ভালোবাসে। কিন্তু পরক্ষণেই যখন নাবিল মুখ সরিয়ে নিল, তার চোখে কোনো তৃপ্তি বা আবেগ দেখা গেল না। নিঃশব্দে তানিয়ার পোশাক আলগা করে, অত্যন্ত যান্ত্রিক কিন্তু তীব্র কামনায় তানিয়াকে নিজের বুকে টেনে নিল নাবিল। সেই রাতের মিলন ছিল গভীর, দামাল এবং তীব্র শরীরী ভালোবাসায় ভরা। তানিয়ার প্রতিটা নিঃশ্বাস, প্রতিটা আর্তনাদ নাবিল শোষণ করে নিয়েছিল চরম উত্তেজনায়। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, সেই তীব্র শারীরিক সম্পর্কের মাঝেও নাবিল তানিয়ার সাথে একটা কথা বলেনি। তানিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে হাসেনি। তানিয়া অনুভব করল, শারীরিক চরম সুখের সাগরে ভাসিয়ে দিয়েও নাবিল তার আত্মাকে ছুঁতে দিচ্ছে না। তার প্রতিটি ছোঁয়ায় গভীর কামুকতা ছিল, কিন্তু ভালোবাসার উষ্ণতা ছিল না। মিলনের পর তানিয়া যখন নাবিলের বুকে মাথা রেখে হাঁপাচ্ছিল, নাবিল তাকে কোনো স্পর্শ না করে সোজা উঠে গিয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল, ঠোঁটে ধরাল একপ্রস্থ সিগারেট।
বিয়ের বয়স দেখতে দেখতে চার মাস পার হয়ে গেল। ঢাকার গুলশানের এই অভিজাত ফ্ল্যাটে তানিয়ার জীবনের রূপরেখা প্রতিদিন একই থাকে। নাবিল তাকে স্ত্রীর সব অধিকার দেয়, সাজানো সংসার দেয়, আর রাতের আঁধারে তাকে এমনভাবে নিজের করে নেয় যেন তানিয়া ছাড়া তার আর কোনো আশ্রয় নেই। রাতের বেলা তাদের বিছানা রূপ নেয় আগ্নেয়গিরিতে। সেখানে কোনো দ্বিধা থাকে না, থাকে গভীর উন্মাদনা। কিন্তু সকাল হলেই নাবিল আবার সেই অপরিচিত, কঠিন মানুষটা হয়ে যায়।
তানিয়া ভেবেছিল সময়ের সাথে হয়তো নাবিলের এই বরফ গলবে। কিন্তু তা হলো না। প্রতিদিন সকালে নাস্তার টেবিলে তানিয়া যখন ধোঁয়া ওঠা চা আর গরম পরোটা গুছিয়ে দেয়, নাবিল পত্রিকায় চোখ রেখে গম্ভীরভাবে বলে, "ধন্যবাদ।" কোনো আলতো স্পর্শ নেই, কোনো মিষ্টি কথা নেই।
একদিন দুপুরে তানিয়ার খালাতো বোন রিভা এলো তাদের বাসায়। তানিয়া তখন রান্নাঘরে খাালার শেখানো বিশেষ খাসির রেজালা তৈরি করছিল। রিভা ড্রয়িংরুমে বসে তানিয়াকে পর্যবেক্ষণ করছিল। তানিয়া যখন চা নিয়ে রিভার সামনে বসল, রিভা নিচু স্বরে বলল, "বোন, তোকে বেশ ক্লান্ত লাগছে। নতুন সংসার কেমন চলছে? জামাই তোকে মাথায় করে রাখে নিশ্চয়ই?"
তানিয়া বিষাদের হাসি হাসল। সে কী করে বোঝাবে যে, যে স্বামী রাতে তাকে চরম আবেগে বুকে জড়িয়ে ধরে, সেই স্বামীই দিনে তার দিকে একবার চোখ তুলে তাকায় না?
তানিয়া চা কাপে চামচ নাড়তে নাড়তে বলল, "সব ভালো রিভা। নাবিল খুব খেয়াল রাখে আমার।"
"শুধু খেয়াল রাখাটাই কি সব তানিয়া?" রিভা তানিয়ার হাত ধরে বলল, "তোর চোখে আমি সেই সুখটা দেখতে পাচ্ছি না রে। ভালোবাসার আলো কই? নাবিল ভাই কি তোকে সত্যিই ভালোবাসে?"
রিভার প্রশ্নটা তানিয়ার বুকে তীরের মতো বিঁধল। সে কথা ঘুরাতে গিয়ে বলল, "ভালোবাসা একেকজনের প্রকাশের মাধ্যম একেক রকম রিভা।"
"না তানিয়া," রিভা গম্ভীর হয়ে বলল, "যে ভালোবাসায় মানসিক দূরত্ব থাকে, তা কেবল একটা চুক্তি। তুই নিজেকে ধোঁকা দিস না।"
রিভা চলে যাওয়ার পর পুরো বাসা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তানিয়া ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে বই পড়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তার মাথায় ঘুরছিল রিভার কথাগুলো। সে কি সত্যিই একটা ধোঁকার মধ্যে বাস করছে?
সন্ধ্যায় হঠাৎ আকাশ মেঘলা করে মুষলধারে বৃষ্টি নামল। নাবিল অফিস থেকে একটু জলদিই ফিরে এলো। তার পরনের শার্ট বৃষ্টির পানিতে খানিকটা ভিজে গায়ের সাথে সেঁটে গিয়েছিল। তানিয়া তোয়ালে নিয়ে এগিয়ে আসতেই নাবিল হঠাৎ তানিয়ার কোমর টেনে ধরে তাকে নিজের একদম কাছাকাছি নিয়ে এলো।
বৃষ্টির আমেজে ঘর অন্ধকার হয়ে আসছিল। নাবিল কোনো কথা না বলে তানিয়ার ঠোঁটে নিজের রুক্ষ ঠোঁট চেপে ধরল। সেই চুম্বনে কোনো মেকি লজ্জা ছিল না, ছিল চরম অধিকারবোধ। নাবিলের ভেজা শার্টের পানি তানিয়ার সুতির শাড়িতে ভিজিয়ে দিচ্ছিল। সে তানিয়াকে শূন্যে তুলে নিয়ে সোজা শোয়ার ঘরে চলে গেল। বৃষ্টির তীব্র শব্দের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগল তাদের গায়ের উত্তাপ।
বিছানায় তানিয়ার শাড়ি খুলে ফেলতে ফেলতে নাবিল ফিসফিস করে বলল, "তুমি এত সুন্দর কেন তানিয়া?"
তানিয়া নাবিলের ভেজা চুলগুলোতে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, "নাবিল... তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?"
নাবিল মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তার গভীর কালো চোখ দুটো যেন এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। কিন্তু সে কোনো উত্তর দিল না। উত্তর না দিয়ে সে আরও বেশি উগ্রতার সাথে তানিয়ার ঠোঁটে আর গলায় ডুবে গেল। তার স্পর্শে উত্তাপের পারদ চরমে উঠল, কিন্তু তানিয়ার হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা প্রশ্নটা অধরাই রয়ে গেল। মিলনের ঝড় শান্ত হওয়ার পর নাবিল যথারীতি তানিয়ার পাশ থেকে সরে শুয়ে পড়ে চোখ বন্ধ করল।
রাতের নিস্তব্ধতায় তানিয়ার চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে বুঝতে পারল, এই তীব্র আকর্ষণ, এই রাতভর শরীরী মাতলামি—এর কোনোটাই ভালোবাসা নয়। এটা হয়তো কেবলই শারীরিক প্রয়োজন, কিংবা কোনো অপরাধবোধ ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা। নাবিল তার শরীরকে চায়, কিন্তু তার হৃদয় অন্য কোথাও আটকে আছে।
তানিয়ার বুকের ভেতর একটা কঠিন সিদ্ধান্ত দানা বাঁধতে শুরু করল। এমন একটা সম্পর্ক যেখানে শরীর মিললেও মন মেলে না, যেখানে চরম কামনার মাঝেও মন থাকে নিঃসঙ্গ, সেই সম্পর্কে বেঁচে থাকা যায় না। কিন্তু তানিয়া তখনও জানত না, এই বরফশীতল নীরবতার পেছনে লুকিয়ে আছে এমন এক ভয়ঙ্কর রহস্য, যা তাদের পুরো জীবনকে এক লহমায় ওলটপালট করে দেবে।
তানিয়ার রাতগুলো যত উম্মাদনায় ভরপুর হতো, সকালগুলো ততই বিষণ্ণতায় ডুবে যেত। প্রতিদিন ভোর হওয়ার আগে নাবিল নিঃশব্দে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে। তানিয়া জেগে থাকলেও চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে। সে অনুভব করতে পারে, নাবিল সোজা ওয়াশরুমে চলে যায়, তারপর তোয়ালে পেঁচিয়ে বের হয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
দিন কেটে যেতে লাগল, কিন্তু তাদের সম্পর্কের সেই অলিখিত দেয়ালটা একটুও সরল না। তানিয়া নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তার মনের গভীর থেকে একটা প্রশ্ন বারবার উঁকি দিত—একজন মানুষ শারীরিক মিলনের সময় এত উগ্র, এত ব্যাকুল হয় কীভাবে, অথচ দিনের আলোয় সেই একই মানুষের চোখ এত নিঃসঙ্গ আর শীতল থাকে কীভাবে?
একদিন বৃহস্পতিবার রাতে নাবিল অফিস থেকে ফিরে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। তার চোখের নিচে কালচে ছাপ, চুলগুলো উসকোখুসকো। সে ঘরে ঢুকে সোজা তানিয়ার দিকে এগিয়ে এলো। কোনো কথা না বলে তানিয়াকে জড়িয়ে ধরে সোফায় বসে পড়ল।
"আজ খুব চাপ গেছে, তানিয়া," নাবিলের গলা ভাঙা শোনাচ্ছিল।
তানিয়া নিজের হাত দুটো নাবিলের চুলে বুলিয়ে দিয়ে বলল, "একটু চা করে দিই? নাকি ফ্রেশ হবে?"
নাবিল জবাব দিল না। সে তানিয়ার শাড়ির ব্লাউজের ফিতাটা আলতো করে খুলে দিল। তার গরম নিঃশ্বাস তানিয়ার পিঠে পড়তে লাগল। তানিয়ার ইচ্ছে করছিল নাবিলকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে, বলতে—"তুমি কি আমাকে শুধু এই শরীরটার জন্যই চাও?" কিন্তু নাবিলের ছোঁয়ায় অদ্ভুত এক সম্মোহন ছিল, যার সামনে তানিয়ার সব অভিমান ভেঙে গুঁড়িয়ে যেত।
সেই রাতে নাবিল যেন আরও বেশি হিংস্র ছিল। তার ছোঁয়ায় গভীর তৃষ্ণা আর একধরনের হাহাকার ছিল। সে তানিয়াকে নিজের শরীরের সাথে শক্ত করে চেপে ধরেছিল, যেন তানিয়া একটু ঢিলে হলেই সে হারিয়ে যাবে। তানিয়ার গায়ে তার আঙুলের ছাপ বসে যাচ্ছিল, কামনার উত্তাপে দুজনেই ঘেমে ভিজে গিয়েছিল। তানিয়ার মনে হচ্ছিল সে এক অগ্নিকাণ্ডের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে নাবিল তাকে পোড়াচ্ছে আবার সেই আগুনেই তাকে বাঁচিয়ে রাখছে।
কিন্তু মাঝরাতে হঠাৎ তানিয়ার ঘুম ভেঙে গেল। পাশে হাত বাড়িয়ে দেখল জায়গাটা খালি। নাবিল বিছানায় নেই। তানিয়া ঘড়ির দিকে তাকাল—রাত ৩টা বেজে ২০ মিনিট।
তানিয়া আস্তে করে বিছানা ছেড়ে উঠল। শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে সে পপায়ে হেঁটে ঘর থেকে বের হলো। পুরো ফ্ল্যাট অন্ধকার। শুধু নাবিলের স্টাডি রুমের দরজার নিচ দিয়ে আলোর একটি সরু রেখা দেখা যাচ্ছে।
তানিয়ার বুকের ভেতরটা ছাৎ করে উঠল। এই স্টাডি রুমটায় নাবিল কাউকে ঢুকতে দেয় না। কাজের লোকটাকেও সে নিজের সামনে রেখে পরিষ্কার করায়। এমনকি তানিয়াকেও কখনো সেই ঘরের দরজার চাবি ছুঁতে দেওয়া হয়নি। নাবিল বলত, সেখানে তার অফিসের অত্যন্ত গোপনীয় ডকুমেন্টস রাখা থাকে।
তানিয়া নিঃশব্দে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দরজাটা পুরোপুরি লাগানো ছিল না, সামান্য ফাঁক হয়ে ছিল। তানিয়া এক চোখ দিয়ে ভেতরে তাকাল।
ভেতরের দৃশ্য দেখে তানিয়ার রক্ত হিম হয়ে গেল।
নাবিল টেবিলে বসে আছে। তার সামনে খোলা একটা কাঠের পুরনো বাক্স। ঘরের লাইট নেভানো, শুধু টেবিল ল্যাম্পের আবছা আলো নাবিলের মুখে পড়েছে। নাবিলের হাতে একটি বাঁধানো ছবি। সে অত্যন্ত যত্ন করে, অদ্ভুত এক ব্যাকুলতায় ছবিটার ওপর আঙুল বোলাচ্ছে। আর সবচেয়ে ভয়ানক বিষয় হলো—যে মানুষটাকে তানিয়া কখনো কাঁদতে দেখেনি, সেই কঠোর, পাথরপ্রতিম নাবিলের চোখের কোণ দিয়ে ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়ছে।
নাবিল ছবিটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। সে ফিসফিস করে কিছু একটা বলছে, যা দরজার ওপাশ থেকে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে না। কিন্তু তার কণ্ঠস্বরের যন্ত্রণা এত তীব্র ছিল যে, তানিয়ার নিজের বুকটাও মোচড় দিয়ে উঠল।
তানিয়া সেখানে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াতে পারল না। দ্রুত পায়ে নিজের ঘরে ফিরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ল। তার হৃৎপিণ্ড তখন হাতুড়ির মতো পিটছে।
কে ওই ছবির নারী? কিসের এত যন্ত্রণা নাবিলের বুকে?
পরদিন সকালে নাবিল যথারীতি সাধারণ ভঙ্গিতেই নাস্তার টেবিলে এল। যেন কাল রাতে কিছুই হয়নি। কিন্তু তানিয়া আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। নাবিল যখন কফিতে চুমুক দিচ্ছে, তানিয়া তার সামনে দাঁড়িয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করল, "তোমার স্টাডি রুমে ওই কাঠের বাক্সে কার ছবি রাখা আছে, নাবিল?"
কফির কাপটা নাবিলের ঠোঁটের কাছে এসেই থমকে গেল। এক মুহূর্তের জন্য পুরো ঘরজুড়ে এক ভয়ঙ্কর নীরবতা নেমে এলো। নাবিলের চোখের দৃষ্টি নিমেষের মধ্যে বরফের মতো কঠিন হয়ে গেল।
সে কফির কাপটা টেবিলে রাখল। কোনো শব্দ না করে ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠল। তানিয়ার একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। নাবিলের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে, চোখের ভেতরের আগুনের শিখা স্পষ্ট।
"আমার ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলানো আমি একদম পছন্দ করি না, তানিয়া," নাবিলের নিচু কিন্তু থমথমে গলা পুরো ঘরে প্রতিধ্বনি তুলল।
"আমি তোমার স্ত্রী, নাবিল!" তানিয়ার গলা কেঁপে উঠল আবেগে, "স্ত্রী হিসেবে আমার কি জানার অধিকার নেই, তুমি রাতে কার ছবি বুকে নিয়ে কাঁদো? কার স্মৃতি তোমাকে প্রতিদিন তিল তিল করে শেষ করছে, অথচ রাতে আমার বিছানায় এসে আমাকে জড়িয়ে ধরো? তুমি কাকে ভালোবাসো নাবিল?"
নাবিল তানিয়ার দুটো হাত শক্ত করে চেপে ধরল। তার হাতের চাপ এত তীব্র ছিল যে তানিয়া ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল। নাবিল তানিয়ার মুখের খুব কাছে ঝুঁকে এসে বলল, "তুমি যা দেখছ, তা সবটা সত্যি নয়। আর স্ত্রী হিসেবে তোমার যতটুকু পাওয়া দরকার—এই বাড়ি, সম্মান, আর রাতের অধিকার—তাতে কোনো কমতি রেখেছি আমি? তাহলে কেন বাড়তি কথা বলছ?"
"শরীরের অধিকার দিয়েই কি সব হয়?" তানিয়া চেঁচিয়ে উঠল, "তুমি আমাকে পাওনা মেটানোর মতো করে পাও! তোমার ছোঁয়ায় কামনা আছে, কিন্তু ভালোবাসা নেই! আমি কোনো খেলনা নই নাবিল!"
নাবিল একঝটকায় তানিয়ার হাত ছেড়ে দিল। তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে। "আর একটা শব্দও নয়, তানিয়া। স্টাডি রুমের ধারেকাছে যদি তোমাকে আর কখনো দেখি, পরিণতি ভালো হবে না।"
কথাটা বলেই নাবিল আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে কোটটা তুলে নিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে বাসা থেকে বের হয়ে গেল। সশব্দে দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার শব্দে তানিয়া মেঝেতে বসে পড়ল।
তার চোখের জল তখন বাঁধ ভেঙেছে। তানিয়ার মনে আর কোনো সন্দেহ রইল না—নাবিলের জীবনে অন্য কোনো নারী ছিল, যাকে সে পাগলের মতো ভালোবাসত। হয়তো এখনো বাসে। আর তানিয়া কেবলই সেই ফাঁকা জায়গাটা পূরণ করার একটা পুতুল মাত্র, কিংবা নাবিলের দৈহিক ক্ষুধা মেটানোর মাধ্যম।
তানিয়া নিজের মনকে শক্ত করল। এমন একটা মিথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সংসারে সে আর থাকবে না। যে পুরুষ অন্য কারও স্মৃতির ছায়ায় বাস করে, তাকে জোড়াতালি দিয়ে আপন করা সম্ভব নয়। তানিয়া ঠিক করল, সে এই রহস্যের শেষ দেখে ছাড়বে। ওই স্টাডি রুমের বন্ধ দরজার পেছনে কী আছে, তা সে জেনেই ছাড়বে—তারপর এই সংসার ত্যাগ করবে।
নাবিল বেরিয়ে যাওয়ার পর পুরো ফ্ল্যাটজুড়ে এক শ্বাসরুদ্ধকর নিস্তব্ধতা নেমে এল। তানিয়া কিছুক্ষণ মেঝেই বসে রইল। তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল, কিন্তু সেই জলের উষ্ণতা এখন জমে বরফ হয়ে গেছে। বুকে জমাট বেঁধেছে এক অদ্ভুত জেদ। তানিয়া আর দুর্বল থাকবে না; এই ধোঁয়াশার ভেতরে সে আর একটা দিনও শ্বাস নেবে না।
তানিয়া সোজা উঠে দাঁড়াল। নাবিল তাড়াহুড়ো করে যাওয়ার সময় তার ব্যবহৃত চাবির তোড়াটা বেডরুমের ড্রয়িং টেবিলে ফেলে গেছে। সম্ভবত খেয়াল করেনি। তানিয়া চাবিটা হাতে নিল। ব্রাসের তৈরি ভারী চাবির রিংটা ধাতব শব্দে কেঁপে উঠল।
পায়ের শব্দ না করে তানিয়া স্টাডি রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। চাবিটা তালায় ঢুকিয়ে ঘোরাতেই 'ক্লিক' করে একটা শব্দ হলো। পনেরো দিন আগে যে দরজার ওপাশে যাওয়া তার জন্য নিষিদ্ধ ছিল, সেই দরজা এখন পুরোপুরি খোলা।
ভেতরে ঢুকতেই পুরোনো বই আর কাঠের একটা আর্দ্র গন্ধ তানিয়ার নাকে এল। ঘরটা ভীষণ পরিপাটি, কিন্তু ছায়াচ্ছন্ন। তানিয়া সোজা গিয়ে দাঁড়াল নাবিলের ভারী সেগুনকাঠের পড়ার টেবিলটার সামনে। ল্যাম্পের পাশে রাখা সেই খোদাই করা কাঠের বাক্সটা জ্বলজ্বল করছে।
তানিয়ার হাত কাঁপছিল। সে ধীরে ধীরে বাক্সের ঢাকনাটা খুলল।
ভেতরে রাখা কিছু পুরোনো চিঠিপত্র, একটা শুকনো গোলাপের পাপড়ি আর নিচে রাখা একটি বাঁধাই করা ছবি। তানিয়া ছবিটা হাতে তুলে নিল।
ছবিতে নাবিলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক অপূর্ব সুন্দরী মেয়ে। সাধারণ সুতির সালোয়ার-কামিজ পরা, চুলগুলো বাতাসে উড়ছে, আর মুখে মায়াবী হাসি। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো—ছবিতে নাবিলের দিকে তাকিয়ে থাকা যায় না। নাবিলের মুখজুড়ে এমন এক প্রাণবন্ত হাসি, যা তানিয়া এই চার মাসে একদিনের জন্যও দেখেনি। এই নাবিল তানিয়ার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা। ছবিতে থাকা নাবিলের চোখে চোখ রাখলে বোঝা যায়, সে এই মেয়েটির প্রেমে কতটা অন্ধ, কতটা মাতাল ছিল।
তানিয়া ছবিটার পেছনে তাকাল। নীল কালিতে ছোট ছোট অক্ষরে লেখা—
"আমার মেঘমালা, তুমিহীন এই জীবন কেবলই মরুভূমি। - নাবিল।"
মেঘমালা!
নামটা তানিয়ার বুকে বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধল। তানিয়া চিঠিগুলো খুলল। চার-পাঁচ বছর আগের চিঠি। তাতে লেখা উন্মাদের মতো ভালোবাসার কথা, একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বেঁচে থাকার আকুতি। তানিয়ার মাথা ঘুরে উঠল। নাবিল তাকে প্রতি রাতে বুকের ভেতর পিষে ফেলে, কামনার চরম শিখরে নিয়ে যায়, কিন্তু সেই উগ্রতার নেপথ্যে আসলে তানিয়া ছিল না—নাবিল হয়তো বন্ধ চোখ দুটোয় প্রতি রাতে এই 'মেঘমালা'কেই খুঁজে বেড়াত! তানিয়া কেবলই একটা রক্ত-মাংসের শরীর, যার মাধ্যমে নাবিল তার হৃদয়ের হাহাকার মেটানোর চেষ্টা করছে।
নিজেকে চরম অপমানিত আর ঘৃণিত মনে হলো তানিয়ার। এই ভাবনায় তার পাকস্থলী উল্টে আসছিল। সে আর এক মুহূর্তও এই ঘরে দাঁড়াল না। বাক্সটা যেমন ছিল তেমন বন্ধ করে রেখে চাবিটা আগের জায়গায় রেখে দিল।
বিকেলে নাবিল যখন ঘরে ফিরল, তার চোখেমুখে কোনো অনুশোচনা ছিল না। তবে সে তানিয়ার থমথমে মুখ দেখে কিছু একটা আঁচ করতে পারল।
নাবিল তানিয়ার দিকে এগিয়ে এসে আলতো করে তার চিবুক ছুঁতে চাইল, "তানিয়া, সকালের জন্য আমি দুঃখিত। আমার মেজাজটা..."
তানিয়া সরু চোখে নাবিলের হাতটা ঝেড়ে ফেলে দিল। "আমাকে ছুঁয়ো না, নাবিল।"
নাবিল ভ্রু কুঁচকাল, "কী হয়েছে তোমার?"
"মেঘমালা কে?"—শব্দ দুটো তানিয়ার মুখ থেকে চাবুকের মতো বেরিয়ে এলো।
নাবিলের মুখ থেকে নিমেষেই সব অভিব্যক্তি মুছে গেল। তার চোয়াল কঠিন হয়ে উঠল, চোখের ভেতরের বরফ যেন এক লহমায় জমে পাথর হয়ে গেল। সে এক পা পিছিয়ে গেল।
"তুমি আবার আমার স্টাডি রুমে ঢুকেছিলে?" নাবিলের গলায় তখন সাপের মতো ফোঁস ফোঁস শব্দ।
"ঢুকেছিলাম! খুব ভালো করেছি ঢুকেছিলাম!" তানিয়া চিৎকারের তোড়ে কেঁদে ফেলল, "অন্তত জানতে পারলাম আমি কার স্থলাভিষিক্ত হতে এসেছি! তুমি একটা প্রতারক নাবিল! তুমি ওই মেঘমালাকে ভালোবাসতে, এখনো বাসো! তাহলে আমাকে কেন বিয়ে করলে? কেন প্রতিদিন রাতে আমাকে তোমার বিছানায় টেনে নাও? কোন অধিকার থেকে?"
নাবিল কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু বিষণ্ণ ও হিংস্র দৃষ্টিতে তানিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
"কথা বলছ না কেন?" তানিয়া নাবিলের বুকে ধাক্কা দিল, "কেন তুমি আমায় ভালোবাসার অভিনয়টুকুও করো না, অথচ রাতে পশুর মতো আমাকে আঁকড়ে ধরে থাকো? তুমি আমার শরীর ব্যবহার করে কার স্মৃতি মেটাও, নাবিল? বলো!"
নাবিল তানিয়ার দুটো কবজি চেপে ধরে তাকে এক টান মেরে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। তানিয়া ছটফট করে ওঠার আগেই নাবিল তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট পিষে দিল। তবে এই চুম্বনে আজ কোনো কোমলতা ছিল না, ছিল চরম দম্ভ আর যন্ত্রণা। নাবিল তানিয়াকে শূন্যে তুলে বেডরুমে নিয়ে গেল এবং সশব্দে দরজা বন্ধ করে দিল।
"তুমি সত্যিটা জানতে চাও, তানিয়া?" নাবিল তানিয়াকে বিছানায় ফেলে দিয়ে তার ওপর উঠে এলো। তার গলার আওয়াজে এক উগ্র মাতলামি, "তুমি জানতে চাও আমি রাতে কেন তোমাকে এভাবে চাই?"
নাবিল দ্রুত হাতে তানিয়ার পোশাক আলগা করতে লাগল। তানিয়া বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু নাবিলের শক্তির সামনে সে সম্পূর্ণ অসহায়। নাবিল তানিয়ার গলায়, বুকে নিজের তপ্ত ঠোঁটের ছাপ বসিয়ে দিতে দিতে উন্মাদের মতো ফিসফিস করে বলল, "কারণ আমি যখন তোমাকে ছুঁই, তখন আমি সব ভুলে যাই! এই শরীর, এই উত্তাপ—এটাই আমার একমাত্র বেঁচে থাকার জ্বালানি! তুমি আমাকে ঘৃণা করো তানিয়া, কিন্তু আমাকে ফেলে তুমি যেতে পারবে না!"
সেই রাতের মিলন ছিল এক তাণ্ডব। ভালোবাসাহীন, কেবলই যন্ত্রণা আর লালসার এক প্রলয়ঙ্করী ঝড়। নাবিল তানিয়ার প্রতিটি আর্তনাদকে নিজের কামনার আগুনে ছাই করে দিচ্ছিল। তানিয়া বুঝতে পারছিল, নাবিল নিজের ভেতরের কোনো এক গোপন রাক্ষস থেকে বাঁচতে তানিয়ার শরীরকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
ভোরে যখন ঝড় শান্ত হলো, নাবিল তানিয়ার খালি গায়ে নিজের হাত দুটো জড়িয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। কিন্তু তানিয়ার চোখে জল ছিল না। তার চোখ দুটি তখন শুকিয়ে গেছে।
তানিয়া আলতো করে নাবিলের হাতটা নিজের ওপর থেকে সরিয়ে দিল। সে আর সহ্য করতে পারছে না। যে সম্পর্কের মূলভিত্তি শুধুই শরীর আর অন্য কারোর স্মৃতি, সেখানে আটকে থাকা আত্মহত্যার শামিল। তানিয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে—সে আর এই গোলকধাঁধায় থাকবে না। কাল সকালেই সে চিরতরে এই ঘর ছেড়ে চলে যাবে।
পরদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই তানিয়া বিছানা ছাড়ল। নাবিল তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তার প্রশান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তানিয়ার বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। রাতে যে মানুষটা তাকে ঝড়ের মতো গ্রাস করেছিল, এখন সে একদম নিষ্পাপ শিশুর মতো ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু তানিয়া জানে, এই শান্ত রূপের পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর অভিনয়।
তানিয়া আলমারি খুলে নিজের দুটো অতি প্রয়োজনীয় শাড়ি আর কিছু জামাকাপড় একটা ছোট ব্যাগে গুছিয়ে নিল। তার কোনো গয়না বা নাবিলের দেওয়া কোনো মূল্যবান উপহার সে সাথে নিল না। টেবিলের ওপর নিজের বিয়ের আংটিটা খুলে রাখল। তারপর একটি ছোট কাগজে লিখল—
"নাবিল,
যে সংসারে শরীর মেলাটাই সব, কিন্তু মনের কোনো স্থান নেই, সেখানে আমি অতিরিক্ত। আমি তোমার 'মেঘমালা'র ছায়া হয়ে বাঁচতে চাইনি, একটা স্বাধীন সত্তা হিসেবে তোমার ভালোবাসা চেয়েছিলাম। কিন্তু তুমি আমাকে শুধু একটা শূন্যতা পূরণের মাধ্যম বানিয়ে রেখেছ। আমি চললাম। আমাকে খোঁজার চেষ্টা করো না।"
কাগজটা আংটির নিচে চাপা দিয়ে তানিয়া আর এক মুহূর্তও পেছন ফিরে তাকাল না। ট্রলি ব্যাগটা হাতে নিয়ে নিঃশব্দে ফ্ল্যাটের বাইরে বেরিয়ে এলো।
সকালের হিমশীতল বাতাসে তানিয়া যখন গুলশানের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, তার মনে হচ্ছিল বুক থেকে একটা বিরাট পাথর নেমে গেছে। সে সোজা চলে গেল তার একমাত্র ভরসা, প্রিয় বান্ধবী তুলির বাসায়। তুলি ধানমন্ডিতে একা একটা ফ্ল্যাটে থাকে।
তানিয়াকে সাতসকালে হাতে ব্যাগ নিয়ে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তুলি অবাক হয়ে গেল। "তানিয়া! তুই এই সকালে? আর তোর চেহারার এ কী হাল?"
তানিয়া আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তুলিকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল। ভেতরে ঢুকে তুলি তাকে শান্ত করল, গরম চা বানিয়ে দিল। তানিয়া কেঁদে কেঁদে গত চার মাসের সব কথা খুলে বলল—নাবিলের অস্বাভাবিক শীতলতা, রাতের বুনো উন্মাদনা, সেই রহস্যময় স্টাডি রুম, কাঠের বাক্সে মেঘমালার ছবি আর গতকাল রাতের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা।
সব শুনে তুলি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার চোখেমুখেও চিন্তার ভাজ। "মেঘমালা? নামটা কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে তানিয়া..."
তানিয়া চোখ মুছে তাকাল, "মানে? তুই চিনিস তাকে?"
তুলি কপালে হাত দিয়ে কিছু একটা মনে করার চেষ্টা করল। "নাবিল ভাইয়া যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত, তখন আমাদের এক সিনিয়র ভাইয়া ছিল নাবিল ভাইয়ার বন্ধু। তাদের মুখেই শুনেছিলাম... দাঁড়া, আমি একটু খোঁজ নিচ্ছি।"
তুলি তার ফোন বের করে কার সাথে যেন আধঘণ্টা ধরে কথা বলল। অন্যদিকে তানিয়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরের ঝুম বৃষ্টি দেখতে লাগল। তার মনটা বারবার গুলশানের সেই ফ্ল্যাটে ছুটে যাচ্ছিল। নাবিল কি এতক্ষণে জেগেছে? সে কি চিরকুটটা পড়েছে? সে কি তানিয়াকে না পেয়ে একটুও ব্যথিত হয়েছে, নাকি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে?
তুলি ফোন রেখে ধীরে ধীরে তানিয়ার পাশে এসে দাঁড়াল। তুলির মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।
"তানিয়া..." তুলির গলায় চরম দ্বিধা, "তুই নাবিল ভাইয়াকে যতটা অপরাধী ভাবছিস, বিষয়টা বোধহয় ততটা সহজ নয়।"
তানিয়া ঘুরে দাঁড়াল, "কী বলতে চাইছিস তুই?"
"আমি নাবিল ভাইয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বন্ধুর সাথে কথা বললাম," তুলি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "মেঘমালা সত্যি নাবিল ভাইয়ার জীবনে ছিল। কিন্তু সে নাবিল ভাইয়ার প্রেমিক ছিল না, তানিয়া।"
তানিয়ার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। "প্রেমিক ছিল না? মানে? তাহলে ওই ছবি, ওই চিঠি, ছবিতে ওদের অত ঘনিষ্ঠতা?"
"মেঘমালা ছিল নাবিল ভাইয়ার আপন ছোট বোন!" তুলি গম্ভীর স্বরে বলল।
তানিয়া থমকে গেল। তার পায়ের নিচের মাটি যেন সরে যাচ্ছে। "বো... বোন? কিন্তু চিঠিতে লেখা ছিল 'আমার মেঘমালা', আর ছবির পেছনে নাবিল লিখেছিল 'তুমিহীন জীবন মরুভূমি'!"
"কারণ মেঘমালা সাধারণ বোন ছিল না," তুলি তানিয়ার হাত দুটো ধরে বলল, "মেঘমালা ছিল নাবিল ভাইয়ার সৎ মায়ের মেয়ে, কিন্তু নাবিল ভাইয়া তাকে নিজের সগর্ব বোনের চেয়েও বেশি ভালোবাসত। ছোটবেলা থেকে তাকে আগলে রেখেছিল। কিন্তু চার বছর আগে... মেঘমালাকে খুব নৃশংসভাবে খুন করা হয়, তানিয়া।"
"খুন?" তানিয়ার গায়ের পশম দাঁড়িয়ে গেল।
"হ্যাঁ," তুলি নিচু স্বরে বলল, "মেঘমালাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। আর সেই অপরাধের পেছনের কারণ নাকি ছিল কোনো এক রাজনৈতিক প্রভাবশালী পরিবারের শত্রুতা। নাবিল ভাইয়া সেই শোকে প্রায় উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল। সে শপথ নিয়েছিল বোনকে বিচার এনে দেবে। কিন্তু আসামিরা এতই শক্তিশালী ছিল যে, পুলিশ কেসটা ধামাচাপা দিয়ে দেয়।"
তানিয়ার বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে উঠল। সে তো এত দিন অন্য এক সমীকরণ ভেবে এসেছিল! সে ভেবেছিল নাবিল অন্য কোনো নারীকে ভালোবাসে, তার সাথে প্রতারণা করছে। কিন্তু এ তো সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপকথার ট্র্যাজেডি!
"তাহলে..." তানিয়া তোতলাতে তোতলাতে বলল, "তাহলে নাবিল আমার সাথে এমন আচরণ কেন করে? কেন দিনে এত দূরত্ব আর রাতে এত উগ্রতা?"
তুলি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "নাবিল ভাইয়ার বন্ধু বলল, মেঘমালার মৃত্যুর পর নাবিল ভাইয়া একদম বদলে যায়। সে নিজেকে অপরাধী মনে করত, কারণ সে তার বোনকে বাঁচাতে পারেনি। সে মানসিকভাবে মারাত্মক ট্রমার মধ্য দিয়ে গেছে। কিন্তু তোর ব্যাপারে আরেকটা অদ্ভুত কথা শুনলাম তানিয়া..."
"কী কথা?" তানিয়া ব্যাকুল হয়ে উঠল।
"মেঘমালা যে রাতে খুন হয়, সেই রাতে তার সাথে নাকি আরেকটা ছোট মেয়ে ছিল, যে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বেঁচে গিয়েছিল। কিন্তু সেই মেয়েটির জীবনও শান্তিতে ছিল না, খুনীরা তাকেও মেরে ফেলার চেষ্টা করছিল। নাবিল ভাইয়া নিজের জীবন বাজি রেখে সেই মেয়েটিকে বছরের পর বছর আড়ালে রেখে বাঁচিয়ে এসেছে।"
তানিয়ার মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। সে টেবিলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
"মেয়েটি কে তুলি?" তানিয়ার গলা শুকিয়ে এসেছে।
তুলি তানিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল, "সেই মেয়েটি আর কেউ নয় তানিয়া... সেই মেয়েটি তুই।"
তুলির মুখের শেষ কথাগুলো তানিয়ার কানে যেন কোনো এক তীব্র শব্দবোমার মতো ফাটল। ঘরটা হঠাৎ ঘুরতে শুরু করল। দেয়াল, জানালা, বৃষ্টি—সবকিছু কেমন ঝাঁপসা হয়ে আসছে।
"আমি?"—তানিয়ার নিজের কণ্ঠস্বরই তার কাছে অপরিচিত মনে হলো। সে ধীর পায়ে পিছিয়ে গিয়ে সোফায় বসে পড়ল। "তুই কী বলছিস তুলি? আমি মেঘমালার মৃত্যুর সাক্ষী? আমি তো... আমার তো ছোটবেলার কিছু স্মৃতি ঝাপসা! আমি শুধু জানি আমি একটা এক্সিডেন্টে আমার স্মৃতি হারিয়েছিলাম!"
তুলি তানিয়ার পাশে এসে বসল, তার দুটো হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলল, "ওটা কোনো এক্সিডেন্ট ছিল না তানিয়া। ওটা ছিল পরিকল্পিত হামলা। তুই তখন রাজশাহী থেকে ঢাকায় ফিরছিলি। মেঘমালাকে যখন আক্রমণ করা হয়, তুই তখন ওর সাথেই ছিলি। মেঘমালা তোকে নিজের জীবন দিয়ে বাঁচিয়েছিল, আর নাবিল ভাইয়া তোকে রক্তের পোকা থেকে তুলে এনে হাসপাতালে ভর্তি করেছিল। কিন্তু তোর মাথায় প্রচণ্ড আঘাত লাগায় তুই পুরোনো স্মৃতির একটা বড় অংশ ভুলে যাস। তোর পরিবার তোকে বাঁচানোর জন্যই ওই শহরের কথা, ওই রাতের কথা সম্পূর্ণ মুছে ফেলেছিল তোর জীবন থেকে।"
তানিয়ার বুকের ভেতরটা তীব্র যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠল। মাথায় হঠাৎ প্রচণ্ড যন্ত্রণা হতে লাগল, যেন শত শত ভাঙা কাঁচের টুকরো একসাথে ফুটছে। আবছা কিছু স্মৃতি মনের কোণে ভেসে উঠতে চাইল—একটা অন্ধকার গলি, মুষলধারে বৃষ্টি, রক্তে ভেসে যাওয়া একটা মেয়ে আর ভয়ানক কিছু চেহারা...
"তাহলে নাবিল..." তানিয়ার গলা ধরে এলো, "নাবিল আমাকে কেন বিয়ে করল? ও কি শুধু আমার করুণা থেকে আমাকে বাঁচানোর জন্য বিয়ে করেছে?"
"না তানিয়া," তুলি দীর্ঘশ্বাস ফেলল, "নাবিল ভাইয়ার বন্ধু বলছিল, সেই ভয়াল রাতের পর থেকে রাজনৈতিক সেই খুনিরা তোকে খুঁজছিল। তুই বেঁচে আছিস আর স্মৃতি ফিরলে ওদের মুখোশ খুলে যাবে—এই ভয়ে ওরা তোকে শেষ করে দিতে চেয়েছিল। নাবিল ভাইয়া জানতে পারে ওরা আবার তোর নাগাল পেয়ে গেছে। তোকে নিরাপত্তা দেওয়ার একমাত্র আইনি ও নিরাপদ উপায় ছিল তোকে নিজের ছায়াতলে নিয়ে আসা। তাই সে নিজের নাম, পরিচয় আর জীবন বাজি রেখে তোকে বিয়ে করে এই কড়া নিরাপত্তায় রেখেছে।"
তানিয়ার চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে এত দিন নাবিলকে পশুর মতো এক হিংস্র, রুক্ষ, প্রতারক মানুষ ভেবে এসেছে! যে মানুষটা প্রতি রাতে তাকে বাহুডোরে আগলে রাখত, সে আসলে কোনো পরকীয়ায় মত্ত ছিল না; সে আসলে তানিয়াকে নিজের অস্তিত্ব দিয়ে পাহারা দিচ্ছিল!
কিন্তু সেই তীব্র শারীরিক আকুলতা? সেই বাসর রাত থেকে শুরু করে প্রতি রাতের বুনো উন্মাদনা?
তানিয়া বুঝতে পারল—নাবিল যখন তাকে স্পর্শ করত, তখন সেই স্পর্শের গভীরে ছিল এক চরম ভয়। তানিয়াকে হারিয়ে ফেলার ভয়! প্রতিদিন আলোর মুখ দেখার পর নাবিল নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখত কারণ সে জানত, তানিয়ার স্মৃতির পাতা খুললে সে হয়তো নাবিলকেও সহ্য করতে পারবে না। নিজের বোনকে না বাঁচাতে পারার যে মহা-অপরাধবোধ নাবিলকে তিল তিল করে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল, সেই অপরাধবোধ থেকেই সে তানিয়াকে চরম ভালোবাসলেও ভালোবাসার কথা মুখে ফুটতে দেয়নি! সে ভাবত, সে ভালোবাসার যোগ্য নয়!
"আমি কী করলাম তুলি!" তানিয়া হাউমাউ করে কেঁদে উঠল, "আমি তাকে কত কী শুনিয়ে এসেছি! আমি তাকে প্রতারক বলেছি! সে নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে আমাকে বাঁচিয়ে এসেছে, আর আমি তাকে ফেলে চলে এলাম!"
তানিয়া এক মুহূর্তও আর দেরি করল না। টেবিল থেকে ব্যাগটা তুলে নিয়ে সে দৌড়ে বের হয়ে গেল তুলির বাসা থেকে।
বাইরে তখন বৃষ্টির মাতলামি আরও বেড়েছে। আকাশ ভেঙে যেন প্রলয় নামছে। তানিয়া একটা সিএনজি ডেকে সোজা গুলশানের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। তার প্রতিটা সেকেন্ড তখন ঘণ্টার মতো দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল সে যদি এখনই নাবিলের কাছে পৌঁছাতে না পারে, তবে অনেক দেরি হয়ে যাবে।
ধানমন্ডি থেকে গুলশান পৌঁছাতে প্রায় এক ঘণ্টা লেগে গেল। তানিয়া লিফটের জন্য অপেক্ষা না করে তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে চারতলায় উঠল। কাঁপতে থাকা হাতে ব্যাগের ভেতর থেকে স্পেয়ার চাবিটা বের করে দরজার তালা খুলল।
ফ্ল্যাটের ভেতরে ঢুকেই তানিয়ার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল।
পুরো ঘরটা তছনছ হয়ে আছে। ড্রয়িং রুমের কাঁচের টেবিলটা ভাঙা, মেঝেকে রক্ত আর কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। সেই খোদাই করা কাঠের ফোটো ফ্রেমটা ভাঙা অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছে।
"নাবিল!" তানিয়া চিৎকার করে উঠল।
কোনো সাড়া নেই। তানিয়া সোজা দৌড়ে গেল তাদের বেডরুমে।
সেখানে গিয়ে তানিয়ার পায়ের তলা থেকে পৃথিবী সরে গেল।
নাবিল মেঝেই বসে আছে, পিঠটা ওয়্যারড্রবের সাথে ঠেকানো। তার ধবধবে সাদা শার্ট রক্তের লাল রঙে ভিজে একাকার হয়ে গেছে। তার ডান হাতের কবজি থেকে রক্ত ঝরছে। হাতে ধরা তানিয়ার ফেলে যাওয়া সেই বিয়ের আংটিটা। নাবিলের চোখ দুটো লাল, চেহারায় এমন এক চরম ধ্বংসস্তূপের ছাপ যা দেখলে যে কারো কলিজা কেঁপে উঠবে।
তানিয়ার ফেলে যাওয়া চিরকুটটা তার রক্তের ছোপ লাগা হাতের পাশেই পড়ে ছিল।
"নাবিল!" তানিয়া হাঁটু গেড়ে নাবিলের সামনে বসে পড়ল। সে নাবিলের শার্ট চেপে ধরে কেঁদে উঠল, "নাবিল, তুমি এ কী করেছ! তোমার হাত দিয়ে রক্ত পড়ছে!"
নাবিল ধীরে ধীরে চোখ তুলল। তার দৃষ্টি ঝাপসা, নেশাচ্ছন্ন এবং বিষাদে আচ্ছন্ন। সে তানিয়ার দিকে তাকাল, কিন্তু তার চোখে কোনো রাগ ছিল না। ছিল কেবলই এক অসীম, ক্লান্ত শূন্যতা।
"তুমি ফিরে এলে কেন, তানিয়া?" নাবিলের স্বর একদম নিচু, যেন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছে, "আমি তো তোমাকে মুক্তি দিয়েছিলাম। আমার মতো এক অভিশপ্ত, নরকতুল্য মানুষের পাশ থেকে তো তুমিিয়েই গিয়েছিলে। কেন আবার ফিরে এলে এই মৃত্যুপুরীতে?"
নাবিলের কণ্ঠের সেই আত্মঘাতী শূন্যতা তানিয়ার বুকটা এক লহমায় ছিঁড়ে ফেলল। সে আর কোনো কথা না ভেবে নিজের পরনের দামি সুতির শাড়ির আঁচলটা সশব্দে ছিঁড়ে ফেলল। তারপর নাবিলের রক্তাক্ত হাতটা নিজের কোলে তুলে নিয়ে ক্ষতস্থানে শক্ত করে বেঁধে দিল। তানিয়ার অশ্রুতে ভিজতে লাগল নাবিলের অবশ হয়ে আসা হাত।
"তুমি বোকা, নাবিল!" তানিয়া কান্নাভেজা গলায় চিৎকার করে উঠল, "তুমি নিজেকে অমানুষ ভাবো? অভিশপ্ত ভাবো? কেন আমাকে বলোনি সত্যিটা? কেন একা একা এই নরকযন্ত্রণা সহ্য করেছ বছরের পর বছর?"
নাবিল নিষ্পলক চোখে তানিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে দুটি ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল। যে কঠোর, পাথর মানবকে তানিয়া কখনো ভাঙতে দেখেনি, সেই নাবিল আজ তানিয়ার হাঁটুর ওপর মাথা রেখে শিশুর মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
"আমি ভয় পেতাম, তানিয়া..." নাবিল ভাঙা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল, "আমার বোন মেঘমালাকে আমি রক্ষা করতে পারিনি। ওকে যখন ওরা শেষ করে দিচ্ছিল, আমি সময়মতো পৌঁছাতে পারিনি। সেদিনের পর থেকে আমি নিজেকে ধিক্কার দিয়েছি। তারপর যখন জানলাম ওরা তোকেও শেষ করে দিতে চায়... আমি স্থির থাকতে পারিনি। তোকে বিয়ে করে এই চার দেয়ালের মাঝে আটকে রেখেছিলাম, কারণ তোকে হারানোর ভয় আমাকে পাগল করে দিত।"
নাবিল তানিয়ার মুখের দিকে তাকাল, তার ভেজা চোখে এক অপার আকুতি, "প্রতি রাতে আমি তোকে উন্মাদের মতো জড়িয়ে ধরতাম, তোকে আঘাত দিতাম... কারণ তোকে স্পর্শ করলে তবেই আমার বিশ্বাস হতো তুই বেঁচে আছিস, তুই আমার কাছে আছিস। কিন্তু দিনের আলো ফুটলেই আমার মনে হতো আমি অপরাধী। যে অপরাধী নিজের বোনকে বাঁচাতে পারেনি, সে কীভাবে ভালোবাসা পাওয়ার দাবি করে? তোকে ছোঁয়ার যোগ্যতাও কি আমার আছে? তাই তোকে দূরে সরিয়ে রাখতাম। তোকে মুক্ত করে দিতে চাইতাম, কিন্তু তোকে ছাড়া বেঁচে থাকার কথা ভাবলেই আমার দম আটকে আসত।"
নাবিলের এই স্বীকারোক্তি তানিয়ার ভেতরের শেষ সংশয়টুকুও ছাই করে দিল। তানিয়া দুই হাতে নাবিলের মুখটা তুলে ধরল। তার চোখের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট স্বরে বলল, "মেঘমালার মৃত্যুর জন্য তুমি দায়ী নও নাবিল। আর আমাকে বাঁচিয়ে তুমি তোমার ঋণের চেয়েও বেশি শোধ করেছ। তুমি আমাকে ভালোবেসেছ তোমার নিজের মতো করে, কিন্তু সেই ভালোবাসাকে তুমি অপরাধবোধের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছিলে।"
"তুমি আমাকে ঘৃণা করো না তানিয়া?" নাবিলের গলায় আকুল প্রশ্ন।
"আমি তোমাকে ভালোবাসি নাবিল," তানিয়া নাবিলের কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল, "এত দিন তোমার ওই বরফশীতল রূপটাকে ভয় পেয়েছি, কিন্তু আজ আমি তোমার ভেতরের আসল মানুষটাকে দেখতে পাচ্ছি। আমি আর কোথাও যাব না। তোমার এই নরক হলেও আমি সেখানেই থাকব।"
কথাটা শুনে নাবিলের চোখের ভেতরের জমাট বরফ এক মুহূর্তে গলে অগ্নিকণায় পরিণত হলো। এতদিন যে আবেগ, যে তীব্র আকুলতা নাবিল নিজের বুকের ভেতর শেকল দিয়ে বেঁধে রেখেছিল, তা যেন বাঁধ ভাঙা বন্যার মতো ভেসে এলো।
নাবিল আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। সে মেঝেই তানিয়াকে টেনে এনে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল। তানিয়ার ঠোঁটে তার রুক্ষ, তপ্ত ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। তবে আজকের এই চুম্বনে কোনো ভয় ছিল না, কোনো লুকোচুরি বা অপরাধবোধ ছিল না—ছিল আত্মনিবেদনের চরম ব্যাকুলতা।
নাবিল তানিয়াকে দুই বাহুতে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। ঘরের বাইরে তখনও মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছিল, আর ঘরের ভেতরে জ্বলছিল বছরের পর বছর ধরে চেপে রাখা ভালোবাসায় উন্মাদ অগ্নিকুণ্ড। নাবিল তানিয়ার পরনের ভিজে যাওয়া শাড়ি আলগা করে দিল। তার প্রতিটি ছোঁয়ায়, প্রতিটি কামুড়িতে আজ কেবলই অধিকার আর গভীর ভালোবাসার সুর।
তানিয়াও আজ নিজেকে গুটিয়ে রাখল না। নাবিলের পিঠে নিজের নখ বসিয়ে, তার ভেজা চুলে আঙুল চালিয়ে সে নাবিলকে আরও নিজের গভীরে টেনে নিল। দুজনের গায়ের উত্তাপ, নিঃশ্বাসের তীব্রতা আর আবেগের মাতলামিতে শোয়ার ঘরটা এক মায়াবী স্বর্গে পরিণত হলো। সেই রাতে তাদের শরীরের প্রতিটি কোণ একে অপরকে চিনে নিল ভালোবাসার চরম ও গভীরতম তৃপ্তিতে। অপরাধবোধের ছাই ভেদ করে জন্ম নিল এক খাঁটি, অবিনশ্বর ভালোবাসা।
পরদিন সকালে যখন ভোরের সোনালী রোদ জানালার পর্দা গলে ঘরে এসে পড়ল, তানিয়ার ঘুম ভাঙল।
নাবিল তাকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে। তবে আজ নাবিলের মুখে সেই পুরোনো বিষাদ বা শীতলতা নেই; তার চেহারায় ফুটে আছে এক অপরিসীম শান্তি। তানিয়া আলতো করে নাবিলের গালে হাত বুলাল। নাবিল চোখ মেলে তাকাল, তারপর তানিয়ার কপালে একটা দীর্ঘ ও মিষ্টি চুমু এঁকে দিল।
"শুভ সকাল, আমার স্ত্রী," নাবিল মৃদু হেসে ফিসফিস করে বলল।
তানিয়া নাবিলের বুকে মুখ লুকিয়ে হেসে উঠল। চার মাসের তীব্র যন্ত্রণার কুয়াশা কেটে গিয়ে আজ তাদের জীবনে নেমে এসেছে এক নতুন ভোর। রক্ত, রহস্য আর কামনার আগুনে পুড়ে ছাই হওয়া সম্পর্কটা আজ রূপ নিয়েছে সত্যি কারের এক ভালোবাসার কাণ্ডে, যা ঝোড়ো বাতাস সহ্য করেও চিরকাল দাঁড়িয়ে থাকবে।
....