রাতের নীরব কামনা

আশ্বিনের মেঘমুক্ত আকাশে যখন চাঁদ ওঠে, তখন ঢাকার উত্তরার ফ্ল্যাটটিতে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। চারপাশের কোলাহল থামতেই ঘরে যেন এক ভারী নিঃসঙ্গতা থমকে দাঁড়ায়। এই বিশাল ফ্ল্যাটের মাস্টার বেডরুমে বিশাল এক রাজকীয় বিছানা। বিছানার এক কোনায় বসে মেহরিন তার হাতের রেশমি শাড়ির আঁচলটা বারেবারে আঙুলে পেঁচাচ্ছে। বিয়ের বয়স আজ ছয় মাস পার হতে চলল, কিন্তু এই ঘর, এই বিছানা কিংবা ঘরের মানুষটা—কোনোটাই মেহরিনের আপন হলো না।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

আদিব ড্রেস রুম থেকে বেরিয়ে এলো। পরনে কালো ট্রাউজার্স আর সাদা ক্যাজুয়াল শার্ট, শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা। প্রশস্ত বুক, তীক্ষ্ণ চোয়াল আর গম্ভীর দুটি চোখ। আদিবের এই অবয়ব যেকোনো নারীর হৃদয়ে দোলা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু মেহরিনের দিকে তাকাতেই আদিবের চোখের সেই চেনা শীতলতা ফুটে উঠল। আদিব মেহরিনের একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ চেয়ে রইল।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

আদিবের গায়ের থেকে আসা দামি উড স সেন্ট আর মৃদু পুরুষালী ঘামের এক নেশাক্ত গন্ধ মেহরিনের বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে দিল। কিন্তু মুখে সে কিছুই প্রকাশ করল না। আদিব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেহরিনের পাশে বিছানায় বসল। মেহরিন কিছুটা সরে যেতেই আদিব শক্ত করে মেহরিনের হাতটা ধরে ফেলল।

 

"এত দূরে সরে যাচ্ছ কেন, মেহরিন?" আদিবের গলার স্বর গভীর এবং সামান্য খাদে নামা।

 

মেহরিন মাথা নিচু করে বলল, "তুমি তো সবসময় দূরত্ব বজায় রাখো, আদিব। আজ হঠাৎ এমন করছ কেন?"

 

আদিব মেহরিনের চিবুকটা এক হাতে ধরে উঁচিয়ে ধরল। তার গাঢ় বাদামি চোখের মেজাজ মেহরিনকে ভেতর থেকে কাপিয়ে তুলল। আদিবের আঙুলের স্পর্শে মেহরিনের সমস্ত শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ ছড়িয়ে পড়ল। মেহরিন জানত, তাদের এই বিয়েটা ছিল সম্পূর্ণ পারিবারিক চাপে। আদিবের পরিবার এবং তার নিজের মা-বাবা মিলে সব ঠিক করেছেন। বিয়ের প্রথম দিন থেকেই আদিব মেহরিনের যত্ন নিয়েছে, তার সব চাহিদা পূরণ করেছে, কিন্তু মানসিকভাবে সব সময় এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে রেখেছিল। কখনও মন খুলে কথা বলেনি, কখনোই মেহরিনকে বোঝাতে পারেনি যে মেহরিন তার স্ত্রীর অধিকার রাখে। মেহরিনের মনে এই ধারণাই বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল যে, আদিব তাকে কোনোদিনই নিজের মনে করে গ্রহণ করেনি।

 

আদিব মেহরিনের খুব কাছে সরে এলো। আদিবের তপ্ত নিঃশ্বাস মেহরিনের গলার কাছে এসে পড়ছে। আদিব তার অন্য হাতটা মেহরিনের কোমর জড়িয়ে আনল। রেশমি শাড়ির ওপর দিয়ে আদিবের উষ্ণ হাতের ছোঁয়া মেহরিনের রক্তে এক মাতাল জোয়ার এনে দিল। মেহরিন চোখ বুজে ফেলল, তার ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল।

 

"তুমি সত্যি মনে করো আমি তোমাকে চাইনি, মেহরিন?" আদিব ফিসফিস করে মেহরিনের কানের কাছে বলল। তার ঠোঁট মেহরিনের কানের লতিতে আলতো স্পর্শ করতেই মেহরিন চমকে উঠে আদিবের শার্টের কলারটা শক্ত করে চেপে ধরল।

 

"যদি চাইতেই, তবে প্রতি রাতে আমার এত কাছে এসেও এভাবে দূরে সরে যেতে না," আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলে ফেলল মেহরিন। তার চোখে জল জমে উঠেছে। "পারিবারিক বাধ্যবাধকতায় একটা সম্পর্ক টেনে নিয়ে যাওয়া কঠিন, আদিব। তুমি আমায় কোনোদিন ভালোবাসোনি।"

 

আদিব কোনো উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি আরও গাঢ় হলো। মেহরিনকে এক ঝটকায় বুকের আরও কাছে টেনে নিল আদিব। দুই দেহের মধ্যে ইঞ্চিঘানেক ফাঁকও রইল না। মেহরিন আদিবের বুকের স্পন্দন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল—অত্যন্ত দ্রুত আর অনিয়মিত। আদিব তার ঠোঁট নামিয়ে আনল মেহরিনের কাঁধে। মেহরিনের আঁচলটা হালকা সরে গিয়ে উন্মুক্ত হওয়া কাঁধে আদিবের তৃষ্ণার্ত ঠোঁটের তীব্র স্পর্শ মেহরিনের সারা দেহে বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়ল। মেহরিনের গলা দিয়ে একটা মৃদু উষ্ণ সিৎকার বেরিয়ে এলো। আদিবের হাত দুটো মেহরিনের পিঠ বেয়ে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল তাকে।

 

এই গভীর শারীরিক আকুলতা আর কামনার আবেশে দুজনই ভেসে যাচ্ছিল। আদিবের প্রতিটি ছোঁয়া, তার বাহুডোরের বাঁধন মেহরিনকে এক গভীর ঘোরের মধ্যে নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ঠিক যে মুহূর্তে মেহরিন আদিবের ভালোবাসার উত্তাপে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সঁপে দিতে প্রস্তুত হলো, ঠিক তখনই আদিব থমকে গেল।

 

আদিব মেহরিনের ঠোঁটের ঠিক এক ইঞ্চি দূরে নিজের ঠোঁট থামিয়ে দিল। তার চোখে এক অচেনা যন্ত্রণা আর গহীন রহস্যের কালো ছায়া ফুটে উঠল। মেহরিন চোখ মেলে তাকাল, আদিবের এই হঠাৎ থেমে যাওয়া তার হৃদয়ে মারাত্মক আঘাত করল।

 

আদিব আস্তে করে মেহরিনের বাঁধন আলগা করে দিল। বিছানা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। শার্টের কলারটা একটু ঠিক করে নিয়ে মেহরিনের দিকে না তাকিয়ে বলল, "রাত অনেক হয়েছে। ঘুমে পড়ে যাও, মেহরিন।"

 

আদিব দ্রুত হেঁটে ড্রয়িং রুমের দিকে চলে গেল। ঘরের দরজাটা হালকা শব্দে বন্ধ হয়ে গেল।

 

মেহরিন একা বিছানায় বসে রইল। কাঁধে আদিবের ঠোঁটের সেই উত্তপ্ত স্পর্শ এখনও লেগে আছে, কোমরজুড়ে রয়ে গেছে আদিবের আঙুলের ছাপ, অথচ মেহরিনের ভেতরটা খালি আর শূন্য। চোখের কোণ বেয়ে একবিন্দু জল গড়িয়ে পড়ল তার গালে।

 

মেহরিন নিজেকে নিজে বোঝাল, আদিবের এই তীব্র আকর্ষণ কেবলই শারীরিক কামনার প্রকাশ, কোনো ভালোবাসা নয়। যে মানুষটা প্রতিবার আবেগ আর ভালোবাসার শেষ সীমানায় গিয়ে এক লহমায় পর হয়ে যায়, সে কখনোই তাকে ভালোবাসতে পারে না। পরিবার কেবল জোর করে দুটো মানুষকে এক ঘরে আটকে রেখেছে, কিন্তু আদিবের মনটা অন্য কোনো অধ্যায়ে আটকা পড়ে আছে।

 

মেহরিন বিছানা ছেড়ে উঠল। বুকচাপা কষ্ট আর একরাশ প্রশ্ন নিয়ে সে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।

 

বারান্দার ঠাণ্ডা বাতাসও মেহরিনের ভেতরের জ্বলুনি কমাতে পারল না। রাতে আদিব আর ঘরে ফেরেনি; ড্রয়িং রুমের সোফাতেই শুয়ে রাত পার করে দিয়েছে। সকালে মেহরিন যখন টেবিলে নাশকা সাজাচ্ছিল, আদিব সুট পরে রেডি হয়ে বেরিয়ে গেল। এক নজর মেহরিনের দিকে তাকালও না। মেহরিনের মনে হলো, প্রতিদিন এভাবে তিলে তিলে ক্ষয়ে যাওয়ার চেয়ে সত্যটা মুখোমুখি জানাই ভালো। আদিব যদি তাকে মন থেকে না-ই মেনে নিতে পারে, তবে কেন এই মিথ্যে বন্ধনের অভিনয়?

 

দুপুরের দিকে মেহরিন পুরো বাড়িটা পরিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নিল। নিজেকে কাজে ব্যস্ত না রাখলে মনের ভেতরের অশান্তি দ্বিগুণ হয়ে ওঠে। আদিবের পার্সোনাল স্টাডি রুমটি সচরাচর বন্ধই থাকে, তবে আজ ভুলবশত দরজার লকটা খোলা ছিল। ঘরটি আদিবের খুব প্রিয়—বইয়ের তাক, চিত্রকর্ম আর কিছু পুরোনো স্মৃতিতে সাজানো।

 

মেহরিন ধীরপায়ে ভেতরে ঢুকাল। কাঠের চেনা গন্ধ আর আদিবের পারফিউমের মৃদু ঘ্রাণ ঘরজুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। সে আস্তে আস্তে আদিবের রিডিং টেবিলের ড্রয়ারগুলো গোছাতে শুরু করল। নিচের বড় ড্রয়ারটা খুলতেই তার চোখে পড়ল কাঠের একটা নকশা করা ভারী বাক্স। বাক্সে কোনো তালা লাগানো ছিল না। মেহরিন কৌতূহল সামলাতে পারল না।

 

বাক্সের ঢাকনাটা খুলতেই মেহরিনের বুকটা ধক করে উঠল। ভেতরে বেশ কিছু হলুদ হয়ে যাওয়া চিঠি আর ডায়েরির পাতা। সবগুলোতে আদিবের পরিচিত পরিচ্ছন্ন হাতের লেখা। মেহরিন একটা চিঠি হাতে তুলে নিল। তারিখটা পাঁচ বছর আগের—অর্থাৎ তাদের বিয়ের অনেক আগের।

 

চিঠির ওপরের নামটা দেখে মেহরিনের পা কেঁপে উঠল। সেখানে লেখা—‘আমার মেহরিন’।

 

মেহরিনের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো। কাঁপাকাঁপা হাতে সে চিঠিটা পড়তে শুরু করল:

 

    "মেহরিন, তুমি হয়তো কোনোদিন জানতেই পারবে না, ধানমন্ডি লেকের পাড়ে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে যখন তুমি বন্ধুদের সাথে হাসছিলে, তখন দূর থেকে একটা মানুষ কীভাবে তার পুরো পৃথিবীর ঠিকানা খুঁজে পেয়েছিল। তোমার ওই খোলা চুল, চোখের মায়াবী চাহনি আর মিষ্টি হাসি আমাকে প্রথম দিনেই নিঃশেষ করে দিয়েছিল। আমি তোমাকে ভালোবাসি, মেহরিন। এত গভীরভাবে ভালোবাসি যে, প্রকাশ করার ভাষা আমার জানা নেই। কিন্তু তোমাকে নিজের করে পাওয়ার পথটা যে কতটা কঠিন, তা আজ আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি..."

 

মেহরিনের চোখের কোণ দিয়ে ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে আরও দুটো চিঠি পর পর পড়ল। প্রতিটা চিঠিতেই তার প্রতি আদিবের পাগলামি আর এক গভীর আকুলতার কথা লেখা। চিঠিগুলোর ভাঁজ খুলে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, আদিব কতবার এগুলো পড়ার পর আবার যত্ন করে রেখে দিয়েছে। কিন্তু প্রতিটি চিঠির শেষেই একটা আক্ষেপ আর না-বলা ব্যথার ইঙ্গিত।

 

তবে সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, এই চিঠিগুলো তো কোনোদিন মেহরিনের কাছে পৌঁছায়নি! আদিব কেন তাকে কোনোদিন বলেনি যে সে বিয়ের বহু আগে থেকেই তাকে ভালোবাসত? যদি ভালোবাসাই থাকবে, তবে বিয়ের পর কেন এই বরফশীতল দূরত্ব? কেন এত অবহেলা?

 

হঠাৎ দরজায় পায়ের শব্দ পেয়ে মেহরিন দ্রুত চিঠিগুলো বাক্সে রেখে ঢাকনাটা বন্ধ করতে গেল। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। আদিব দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। হাতে অফিসের ফাইল, চোখে চরম বিস্ময় আর ক্রোধ।

 

"তুমি আমার স্টাডি রুমে কী করছ, মেহরিন?" আদিবের গলার স্বর শুনে পুরো ঘরটা থমকে গেল।

 

মেহরিন বাক্সটা আঁকড়ে ধরে দাঁড়াল। তার চোখে জল আর বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা প্রশ্ন। "এগুলো কী, আদিব? এই চিঠিগুলো কেন এখানে?"

 

আদিব দ্রুত হেঁটে মেহরিনের কাছে চলে এলো। এক ঝটকায় কাঠের বাক্সটা মেহরিনের হাত থেকে কেড়ে নিল সে। তার ফর্সা মুখটা রাগে ও হতাশায় লাল হয়ে উঠেছিল। "তোমার সাহস হয় কী করে আমার অনুমতি ছাড়া আমার ড্রয়ারে হাত দেওয়ার? এগুলো তোমার দেখার বিষয় নয়!"

 

মেহরিন আদিবের শার্টের কলার চেপে ধরল, আজ সে পিছু হটবে না। "আমার দেখার বিষয় নয়? আমার নাম লেখা চিঠিতে, আমার কথা লেখা! তুমি বিয়ের পাঁচ বছর আগে থেকে আমাকে চিনতে, আমাকে ভালোবাসতে? তবে কেন আজ আমাকে এভাবে তিলে তিলে মারছ? কেন এই ভালোবাসার কথা কোনোদিন আমাকে বললে না?"

 

আদিব কিছুক্ষণ চুপ করে রল, তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে মেহরিনের কোমরে শক্ত করে হাত দিয়ে তাকে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরল। দুই দেহের দূরত্ব আবার শূন্য হয়ে গেল। আদিবের চোখ দুটো হিংস্র পশুর

মতো জ্বলছিল, কিন্তু সেই হিংস্রতার গভীরে ছিল এক অসীম যন্ত্রণা।

সব কিছু জানার অধিকার সবার থাকে না, মেহরিন," আদিব চিবিয়ে চিবিয়ে বলল। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস মেহরিনের ঠোঁটে এসে ধাক্কা মারছিল।

 

"আমি তোমার স্ত্রী, আদিব! আমার অধিকার আছে জানার!" মেহরিন কেঁদে উঠল।

 

আদিব মেহরিনের থুতনিটা শক্ত করে ধরে তার ঠোঁটের খুব কাছে মুখ নিয়ে এলো। আদিবের এই তীব্র উপস্থিতি মেহরিনকে আবার অসংলগ্ন করে তুলছিল। আদিব তার ওপর ভেঙে পড়ল, মেহরিনের ঘাড় আর গলার খাঁজে আদিবের ঠোঁটের কামড় আর শক্ত হাতের ছোঁয়া মেহরিনকে এক নেশার জগতে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। আদিবের এই আক্রমণাত্মক কিন্তু তীব্র রোমান্টিক ছোঁয়ায় মেহরিন ব্যাকুল হয়ে উঠল। আদিব মেহরিনের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে এক গভীর, উন্মাদময় চুম্বনে লীন হয়ে গেল।

 

সেই চুম্বনে ভালোবাসার চেয়ে যন্ত্রণার দাহ ছিল বেশি। মেহরিন আদিবের চুলে আঙুল চালিয়ে দিয়ে নিজেকে সঁপে দিল। ঘরের পরিবেশ এক অদ্ভুত কামনায় গরম হয়ে উঠল। মেহরিনের শরীর আদিবের উত্তাপে মোমের মতো গলতে শুরু করেছিল।

 

কিন্তু হঠাৎ আদিব আবার নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। হাঁপাতে হাঁপাতে মেহরিনের দিকে তাকাল। মেহরিনের ঠোঁট তখন আদিবের চুম্বনে রক্তাক্ত, লাল হয়ে আছে।

 

"চিঠিগুলো আমি লিখেছিলাম ঠিকই, মেহরিন। কিন্তু সেগুলো কখনোই তোমাকে পাঠানো হয়নি, আর পাঠানো সম্ভবও ছিল না।" আদিবের গলার স্বর ভারী হয়ে এলো।

 

"কেন? কেন পাঠানো সম্ভব ছিল না?" মেহরিন ব্যাকুল হয়ে প্রশ্ন করল।

 

আদিব মেহরিনের দিকে এক করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, "কারণ আমাদের এই বিয়ের পেছনে একটা কালো সত্যি লুকিয়ে আছে। এমন এক সত্যি, যা তোমার পরিবার বছরের পর বছর ধরে তোমার কাছ থেকে গোপন করে রেখেছে। আর সেই সত্যির কারণে আমি চাইলেও তোমাকে পুরোপুরি আমার স্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে পারি না, আবার তোমাকে ছেড়ে চলেও যেতে পারি না।"

 

কথাটা বলেই আদিব বাক্যাটি নিয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মেহরিন দেওয়াল ধরে নিচে বসে পড়ল। তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল। একদিকে আদিবের বছরের পর বছর ধরে গোপন রাখা গভীর ভালোবাসা, আর অন্যদিকে এক রহস্যময় সত্যের দেয়াল। মেহরিন বুঝতে পারল, তাদের এই সম্পর্কের বন্ধন যতটা সহজ মনে হয়েছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল আর বিপজ্জনক।

 

আদিব ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর পুরো দিনটা মেহরিনের কীভাবে কাটল, সে নিজেও জানে না। মাথাটা যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছিল। আদিবের বলা শেষ কথাগুলো তার কানে ঘণ্টার মতো বাজছিল—“আমাদের এই বিয়ের পেছনে একটা কালো সত্যি লুকিয়ে আছে, যা তোমার পরিবার তোমার কাছ থেকে গোপন করে রেখেছে।”

 

কী সেই সত্যি? মেহরিনের সাধারণ, মধ্যবিত্ত, পরিচ্ছন্ন পরিবারে এমন কী গোপন রহস্য থাকতে পারে, যা আদিবের মতো পুরুষকে এত বড় যন্ত্রণার সাগরে ডুবিয়ে রেখেছে?

 

পরদিন সকালে আদিব অফিসে চলে যাওয়ার পর মেহরিনের আর ধৈর্য রইল না। সে ঠিক করল আজই বাবার বাড়ি যাবে। যদি সত্য কিছু থাকে, তবে তার মা-বাবার চোখ দেখলেই সে তা বুঝতে পারবে।

 

ধানমন্ডির পুরোনো দোতলা বাড়িটায় পা দিতেই মেহরিনের শৈশবের স্মৃতিগুলো ভিড় করে এলো। তার মা, রেহানা বেগম, মেহরিনকে হঠাৎ দেখে চমকে উঠলেন, তবে পরক্ষণেই মুখে হাসি ফুটিয়ে জড়িয়ে ধরলেন।

 

"মেহরিন! তুই হঠাৎ কোনো খবর না দিয়ে? আদিব আসেনি তোর সাথে?"

 

"না মা, আদিব তো অফিসে," মেহরিন নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল। "তোমার আর বাবার কথা মনে পড়ছিল, তাই চলে এলাম।"

 

দুপুরে খাবারের টেবিলে মেহরিনের বাবা, সাইফুর রহমান সাহেব বসতেই মেহরিন সূক্ষ্মভাবে আলোচনাটা অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা করল।

 

"বাবা, আদিবদের পরিবারের সাথে আমাদের পরিচয় কীভাবে হয়েছিল যেন? মানে, আদিবের বাবার সাথে তো তোমার ব্যবসা ছিল, তাই না?"

 

মেহরিনের প্রশ্নটা শুনতেই সাইফুর সাহেবের হাতের চামচটা থালায় পড়ে মৃদু শব্দ হলো। রেহানা বেগমও খানিকটা থমকে গেলেন। মেহরিন তীক্ষ্ণ চোখে মা-বাবার মুখের এক্সপ্রেশন খেয়াল করছিল। বাবার চেহারায় মুহূর্তের জন্য এক অপরাধবোধ আর ভয়ের ছায়া ভেসে উঠে মিলিয়ে গেল।

 

"হাঁ... মানে, পুরোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক," সাইফুর সাহেব গলার স্বর পরিষ্কার করে বললেন। "হঠাৎ এ কথা জিজ্ঞেস করছিস কেন?"

 

"এমনিই বাবা। আদিব বলছিল ওদের পরিবার নাকি আমাদের অনেক আগে থেকেই চিনত। এমনকি আমাদের এই বিয়েটাও নাকি সাধারণ কোনো সম্বন্ধ ছিল না..." মেহরিন চোখ না সরিয়ে বলল।

 

রেহানা বেগম তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, "আরে, আদিব হয়তো মজা করছিল! জামাই মানুষ, সব কথায় কান দিতে হয় নাকি? তুই হাত-মুখ ধুয়ে নে, আমি তোর প্রিয় রুই মাছের ঝোলটা নিয়ে আসি।"

 

বিষয়টা যে মা-বাবা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, তা মেহরিনের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। তারা স্পষ্টভাবে কিছু লুকাচ্ছেন।

 

মেহরিন বিকেলে তার পুরোনো ঘরে গিয়ে বসল। এই ঘরটাতেই তার কৈশোর কেটেছে। ড্রয়ার, আলমারি—সবকিছুই আগের মতো আছে। কিন্তু মেহরিনের মন নাচছিল এক অজানা আশঙ্কায়। সে বাবার স্টাডি রুমে ঢুকল। সাইফুর সাহেব তখন আসরের নামাজ পড়তে মসজিদে গেছেন।

 

বাবার পুরানো কাঠের আলমারিটা মেহরিনের চেনা। এর ভেতরেই পরিবারের সব গুরুত্বপূর্ণ দলিল আর কাগজপত্র থাকে। মেহরিন কাঁপা হাতে আলমারিটা খুলে ফাইলপত্র খুঁজতে শুরু করল। একের পর এক ফাইলের মধ্য থেকে একটা লাল রঙের পুরোনো ফাইল তার হাতে এলো। ফাইলে কোনো লেবেল ছিল না।

 

ফাইলটা খুলতেই কিছু ব্যাংকের পুরোনো স্টেটমেন্ট, একটা অঙ্গীকারনামা এবং আদিবের বাবার স্বাক্ষর করা কিছু লিগ্যাল পেপার বেরিয়ে এলো। নথিপত্রগুলোর ওপর চোখ বোলাতেই মেহরিনের পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল।

 

আজ থেকে সাত বছর আগে, সাইফুর সাহেবের ব্যবসায়িক পার্টনারশিপে বিশাল অঙ্কের তছরুপ হয়েছিল। আর সেই অপরাধে ফাঁসার মুখে পড়েছিলেন সাইফুর সাহেব নিজেই। কিন্তু তাকে জেলখাটা থেকে বাঁচিয়েছিলেন আদিবের বাবা। বিনিময়ে সাইফুর সাহেব আদিবের পরিবারের কাছে এক বিশাল ঋণে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন—শুধু আর্থিক ঋণ নয়, এক বিশাল আত্মসম্মানের ঋণ।

 

ফাইলের একেবারে নিচে ছিল একটা হাতে লেখা বিশেষ চুক্তিপত্র। যেখানে স্পষ্ট লেখা রয়েছে—সাইফুর রহমানের অপরাধের নথি ও প্রমাণ গোপন রাখার বিনিময়ে এবং পরিবারের সম্মান বাঁচাতে, মেহরিনের বয়স প্রাপ্তবয়স্ক হলেই তার বিয়ে আদিবের সাথে সম্পন্ন হবে। যদি মেহরিনের পরিবার এই প্রস্তাবে সম্মত না হয়, তবে আইনি প্রক্রিয়ায় সাইফুর রহমানকে গ্রেপ্তার করানো হবে।

 

মেহরিনের বুক ফুঁড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল তার।

 

তবে কি তার আর আদিবের এই বিয়ে কোনো ভালোবাসার পরিণতি ছিল না? তবে কি এটা ছিল কেবলই এক শর্ত সাপেক্ষ ব্ল্যাকমেইল? কিন্তু আদিব? আদিব তো তাকে ভালোবেসে চিঠি লিখেছিল! তাহলে আদিব কেন এই ব্ল্যাকমেইলের শিকার হলো?

 

কথাগুলো চিন্তা করতেই মেহরিনের হাত থেকে ফাইলটা পড়ে গেল।

 

হঠাৎ পেছন থেকে ঘরের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো। মেহরিন চমকে উঠে পেছনে তাকাল।

 

দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে আদিব। তার পরনে কালো সুট, টাইটা খানিকটা আলগা করা। চোখে এক তীব্র, ভয়ংকর এবং তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি।

 

"আমি জানতাম তুমি এখানে আসবে, মেহরিন," আদিব ধীর পায়ে মেহরিনের দিকে এগিয়ে এলো। তার গলার স্বর বরফের মতো ঠান্ডা, কিন্তু সেই ঠান্ডার নিচে এক অগ্ন্যুৎপাত লুকিয়ে আছে।

 

"আদিব! এগুলো কী?" মেহরিন কাঁপা গলায় কাগজগুলো দেখিয়ে বলল। "আমার বাবা... আমার পরিবার তোমার বাবার কাছে বন্দি ছিল? আর তুমি... তুমি আমায় ভালোবেসেও এই ব্ল্যাকমেইলের অংশ হলে?"

 

আদিব মেহরিনের একদম কাছে এসে থামল। এক ঝটকায় মেহরিনের কোমর ধরে তাকে নিজের শরীরের সাথে পিষে ফেলল। আদিবের শক্ত বুকের ছোঁয়ায় মেহরিনের সমস্ত প্রতিবাদ যেন এক মুহূর্তে অবশ হয়ে গেল।

 

"আমি এই ব্ল্যাকমেইলের অংশ ছিলাম না, মেহরিন," আদিব চিবিয়ে চিবিয়ে বলল। তার ঠোঁট মেহরিনের কানের কাছে নেমে এলো। "আমি তোমার বাবাকে জেল থেকে বাঁচিয়েছিলাম, শুধু একটা শর্তে—যেন তোমাকে অন্য কারো হতে না দেখতে হয়। আমি চেয়েছিলাম তুমি আমাকে ভালোবেসে আমার কাছে আসো। কিন্তু আমার বাবা আর তোমার বাবা মিলে এই খেলাটা খেলেছে। তারা আমাদের ভালোবাসাকে একটা চুক্তিতে পরিণত করে দিয়েছে!"

 

আদিবের হাতের ছোঁয়া মেহরিনের শাড়ির আঁচল সরিয়ে তার উন্মুক্ত পিঠে ছড়িয়ে পড়ল। আদিবের আঙুলের তীব্র চাপ আর উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শ মেহরিনের ঘাড়ে নেমে আসতেই মেহরিন শিহরিত হয়ে উঠল। আদিব যেন আজ সব বাঁধ ভেঙে ফেলতে চায়। তার চুম্বনে ছিল জমানো ক্ষোভ, ব্যাকুলতা আর এক গভীর আধিপত্যের বাসনা।

 

"তুমি ভাবতে, আমি তোমাকে চাইনি?" আদিব মেহরিনের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল, "প্রতিটা রাতে আমি তোমার এত কাছে এসেও নিজেকে আটকে রেখেছি, কারণ আমি জানতাম তুমি আমাকে তোমার স্বামী ভাবো না, ভাবো একটা সামাজিক চাপ! এই সত্যটা জানলে তুমি আমাকে ঘৃণা করবে—এই ভয়ে আমি তিলে তিলে জ্বলেছি!"

 

আদিবের মাতাল করা ভালোবাসা আর তার শরীরের তীব্র ও উষ্ণ রোমান্স মেহরিনকে এক নতুন ঘোরের মধ্যে ফেলে দিল। মেহরিন বুঝতে পারল, আদিব তাকে কখনো ঘৃণা করেনি, বরঞ্চ আদিব নিজে ছিল তাদের মা-বাবার নোংরা চালের এক অসহায় শিকার।

 

কিন্তু সত্যিটা কি কেবল এইটুকুই? নাকি এই চুক্তির আড়ালে আরও কোনো এক ভয়ংকর গোপন অধ্যায় লুকিয়ে আছে, যা আদিবও এখনও জানে না?

 

সাইফুর রহমানের স্টাডি রুমের আবছা আলোয় আদিব ও মেহরিনের মধ্যে নিঃশ্বাসের দূরত্বও রইল না। আদিবের উন্মত্ত স্পর্শ আর তার চোখের অগভীর ক্ষোভ মেহরিনের সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব এক লহমায় জ্বালিয়ে ছাই করে দিল। মেহরিন বুঝতে পারছিল, যাকে সে এতদিন নিষ্ঠুর ও উদাসীন মনে করে এসেছে, সেই আদিব আসলে নিজের ভালোবাসাকে অপরাধবোধের আগুনে তিলে তিলে পুড়িয়েছে।

 

"তুমি সত্যি মনে করেছিলে আমি তোমাকে একটা চুক্তির বিনিময়ে কিনে নিয়েছি, মেহরিন?" আদিবের গভীর কণ্ঠস্বর মেহরিনের কান পেরিয়ে তার হৃদয়ে কাঁপন তুলল। আদিবের এক হাত মেহরিনের উন্মুক্ত পিঠ আঁকড়ে ধরে তাকে আরও নিবিড়ভাবে বুকে টেনে নিল, অন্য হাত দিয়ে চেপে ধরল তার থুতনি।

 

মেহরিনের চোখের কোণে গড়িয়ে পড়া জলের ফোঁটা আদিবের বুড়ো আঙুল দিয়ে মুছে দিল। মেহরিন কাঁপা ঠোঁটে বলল, "তাহলে কেন আমায় কোনোদিন সত্যটা বললে না, আদিব? কেন প্রতি রাতে পাশে শুয়ে থেকেও আমায় অপোরিচিতদের মতো দূরে ঠেলে দিলে?"

 

"কারণ আমি ভয় পেতাম," আদিব তার উষ্ণ ঠোঁট মেহরিনের কানের লতিতে ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল। "আমি ভয় পেতাম, তুমি যদি জানতে পারো তোমার বাবার অপরাধ ঢাকতে তোমাকে আমার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল, তবে তুমি আমাকে ভালোবেসে নয়, কেবল কৃতজ্ঞতা আর বাধ্যবাধকতায় সঁপে দেবে। আমি তোমার দয়া চাইনি, মেহরিন... আমি তোমার মন চেয়েছিলাম।"

 

আদিবের এই সত্য উচ্চারণের সাথে সাথে যেন মেহরিনের ভেতরের সব বাঁধ ভেঙে গেল। এতদিন ধরে জমানো অভিমান, ভুল বোঝাবুঝি আর না-বলা আকুলতা একসাথে বিস্ফোরণ ঘটাল। মেহরিন দুই হাতে আদিবের শার্টের কলার আঁকড়ে ধরে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল।

 

আদিব আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার ঠোঁট দুটো মেহরিনের ঠোঁটের ওপর নেমে এলো এক তীব্র, তৃষ্ণার্ত ব্যাকুলতায়। সেই চুম্বনে ছিল বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা ভালোবাসার দাহ। মেহরিনও আজ আর পিছু হটল না; সে আদিবের ঘাড় জড়িয়ে ধরে তার ভালোবাসার উত্তাপে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বিলীন করে দিল। আদিবের হাত দুটো শাড়ির বাঁধন সরিয়ে মেহরিনের কোমরে নিবিড় হয়ে চেপে বসল। ঘরের বাতাস যেন তাদের তপ্ত নিঃশ্বাস আর তীব্র শারীরিক আকুলতায় ভারী হয়ে উঠল।

 

মেহরিনের নরম স্পর্শ আদিবের এতদিনের শক্ত মনের বরফ গলিয়ে দিল। আদিব তাকে পাঁজা কোল করে তুলে নিয়ে ঘরের কোণের পুরোনো সোফাটিতে গিয়ে বসল, মেহরিনকে নিজের কোলের ওপর রেখেই সে তার গলার খাঁজে ও কাঁধে উষ্ণ ভালোবাসার চিহ্ন একে দিতে লাগল। মেহরিনের মুখ দিয়ে হালকা সিৎকার বেরিয়ে এলো, সে আদিবের চুলে আঙুল চালিয়ে দিয়ে তার বুকের সাথে আরও শক্ত করে মিশে রইল।

 

দীর্ঘ ক্ষণ পর, সেই ভালোবাসার উত্তপ্ত প্লাবন যখন শান্ত হলো, মেহরিন আদিবের বুকে মাথা রেখে হাঁপাচ্ছিল। আদিব মেহরিনের রেশমি চুলে হাত বুলাতে বুলাতে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

 

"কিন্তু আদিব," মেহরিন মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকা কাগজগুলোর দিকে নির্দেশ করে মৃদু কণ্ঠে বলল, "বাবার সেই তছরুপের ঘটনাটা... আমার বিশ্বাস হয় না বাবা এমন কোনো অন্যায় করতে পারেন। বাবা মানুষটা সব সময় নীতিবান ছিলেন।"

 

আদিব মেহরিনের চিবুক উঁচিয়ে ধরে শান্ত দৃষ্টিতে তাকাল। "তুমিও ঠিক ভাবছ, মেহরিন। আমি যখন পাঁচ বছর আগে তোমার খোঁজে তোমার পরিবারের অতীত ঘাঁটতে শুরু করি, তখনই আমার সন্দেহ হয়েছিল। তোমার বাবা কোনো অপরাধ করেননি।"

 

মেহরিন অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে তাকাল, "তাহলে ওই ব্যাংকের কাগজ, নথিপত্র? এগুলো কীভাবে এল?"

 

"পুরো নাটকটা সাজানো হয়েছিল," আদিবের চোখ দুটো আবার কঠোর হয়ে উঠল। "তোমার বাবার সরলতার সুযোগ নিয়ে তার বিজনেসের অ্যাকাউন্ট থেকে বিশাল অঙ্কের টাকা সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। আর এই চক্রান্তের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন আমার নিজের বাবা—ইশতিয়াক চৌধুরী।"

 

মেহরিনের মুখের ভাষা হারিয়ে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে আদিবের দিকে চেয়ে রইল।

আদিব থামল না, চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, "আমার বাবা চেয়েছিলেন তোমার বাবাকে দেউলিয়া বানিয়ে তার ব্যবসার পুরো শেয়ার দখল করতে। কিন্তু আমি যখন সেই ষড়যন্ত্রের আসল সত্যটা জেনে ফেলি, তখন আমার বাবা আমাকে থামানোর জন্য অন্য চাল চালেন। তিনি জানতেন আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি। তাই তিনি তোমার বাবাকে জেলের ভয় দেখিয়ে এই বিয়ের চুক্তিটা করান, যাতে আমি বাবার বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ না নিই। অর্থাৎ, তোমাকে পাওয়ার লোভে যেন আমি আমার বাবার অপরাধ চেপে যাই।"

 

মেহরিনের বুকটা আবার ধক করে উঠল। এত বড় চক্রান্ত? তার বাবা নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও নিজের সম্মান আর মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে অপরাধীর মতো মাথা নত করেছিলেন! আর আদিব... আদিব তার ভালোবাসাকে বাঁচাত গিয়ে নিজের বাবার পাপের বোঝা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল!

 

"তাহলে তুমি এতদিন নীরব থেকেছ এই নথির জন্য?" মেহরিন কাঁপা গলায় বলল।

 

"না," আদিব শক্ত গলায় বলল, "আমি এতদিন অপেক্ষা করেছি উপযুক্ত প্রমাণের জন্য। কিন্তু কাল রাতে আমি এমন একটা খবর পেয়েছি, যা সব হিসাব বদলে দিয়েছে। তোমার বাবা শুধু একা এই ষড়যন্ত্রের শিকার নন, এই চুক্তির পেছনে আসল উদ্দেশ্য শুধু ব্যবসা দখল করা ছিল না... এর সাথে জড়িয়ে আছে এমন এক তৃতীয় ব্যক্তির নাম, যাকে তুমি খুব ভালোভাবে চেনো।"

 

আদিবের কথা শেষ হওয়ার আগেই স্টাডি রুমের দরজায় একটা কড়া নাড়ার শব্দ হলো। দরজার বাইরে থেকে সাইফুর রহমানের ভীত কণ্ঠ ভেসে এলো, "আদিব... বাবা, তুমি ভেতরে আছ? উনি চলে এসেছেন... উনি এখনই চুক্তি বাতিল করে সব নথিপত্র পুলিশকে দিতে চান!"

 

মেহরিন আর আদিব দুজনেই চমকে দরজার দিকে তাকাল।

 

সাইফুর রহমানের কাপাসিয়া গলার আওয়াজ শুনে আদিব এক লহমায় সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। মেহরিনের এলোমেলো শাড়ি ও চুল তড়িঘড়ি ঠিক করে দিয়ে আদিব তার হাতটা শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিল। মেহরিন আদিবের চোখের দিকে তাকাল—সেখানে এখন আর কোনো বিভ্রান্তি নেই, আছে কেবল এক ভয়ংকর প্রতিজ্ঞার ঝিলিক।

 

"ভয় পেও না, মেহরিন। আজ সব মুখোশ খুলে ফেলার দিন," আদিব নিচু কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল।

 

তারা দুজন ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই দেখতে পেল সাইফুর রহমান এক কোনায় মাথা নিচু করে বসে আছেন, আর রেহানা বেগম ভয়ে থরথর করে কাঁপছেন। আর সোফার মূল আসনে গা এলিয়ে বসে আছেন এক বয়স্ক কিন্তু বেশ প্রভাবশালী চেহারার লোক—সোহরাব চৌধুরী, আদিবের নিজের কাকা!

 

আদিবের বাবা ইশতিয়াক চৌধুরী অসুস্থ হয়ে দীর্ঘদিন ধরে শয্যাশায়ী, তাই ইশতিয়াক চৌধুরীর সমস্ত ব্যবসা আর ক্ষমতার রাশ এখন এই সোহরাব চৌধুরীর হাতে।

 

সোহরাব চৌধুরী হাতে একটা দামি সিগার নিয়ে ধোঁয়া ছাড়ছিলেন। মেহরিন আর আদিবকে একসাথে হাত ধরে নামতে দেখে তার ঠোঁটে এক কুটিল হাসির রেখা ফুটে উঠল।

 

"বাহ্, আদিব! তুই তো তোর স্ত্রীর হাত একদম শক্ত করে ধরে রেখেছিস," সোহরাব চৌধুরী ঠাট্টার ছলে বললেন। "কিন্তু আফসোস, এই আঁকড়ে ধরা বেশি সময় টিকবে না। সাইফুর সাহেব, আমার ধৈর্য কিন্তু শেষ হয়ে আসছে। আজ রাতের মধ্যেই যদি আপনার পুরোনো টেক্সটাইল মিলের শেষ জমিটুকু আমার নামে রেজিস্ট্রি না করে দেন, তবে আগামীকাল সকালেই ব্যাংকের জালিয়াতি আর অর্থ আত্মসাতের পুরোনো মামলাটা পুলিশের কাছে চলে যাবে।"

 

সাইফুর রহমান আকুল হয়ে বললেন, "সোহরাব ভাই, আপনি তো জানেন আমি নির্দোষ ছিলাম! ইশতিয়াক ভাই আর আপনি মিলে আমাকে ফাঁদে ফেলেছিলেন। আমার মেহরিনের জীবনটা তো আপনার ভাতিজার হাতে সঁপে দিয়েছি, আর কত নেবেন?"

 

"চুপ করুন সাইফুর সাহেব!" সোহরাব চৌধুরী গর্জে উঠলেন। "কাগজে-কলমে আপনি অপরাধী। আর আমার বড় ভাই ইশতিয়াক চৌধুরী আপনাকে বাঁচিয়েছিলেন একটা শর্তে। আদিব হয়তো ভেবেছিল বিয়ের পর সব মিটে গেছে, কিন্তু আসল চাল তো আমার হাতে!"

 

মেহরিনের রক্ত যেন হিম হয়ে গেল। সে আদিবের দিকে তাকাল। আদিব কিন্তু একটুও চমকাল না। তার ফর্সা মুখটা রাগে থমথম করছে।

 

আদিব মেহরিনের হাত ছেড়ে দিয়ে ধীর পায়ে সোহরাব চৌধুরীর মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল। আদিব দীর্ঘকায়, তার সুগঠিত শরীরের ছায়ায় সোহরাব চৌধুরীকে হঠাৎ বেশ ক্ষুদ্র মনে হলো।

 

"কাকা, তুমি ভেবেছিলে তোমার এই পুরোনো চালটা সবসময় কাজ করবে?" আদিব পকেট থেকে তার মোবাইল ফোনটা বের করে টেবিলে রাখল। "আমার বাবা যখন সাইফুর চাচাকে ব্ল্যাকমেইল করেছিলেন, তখন তিনি শুধু চেয়েছিলেন আমি যেন মেহরিনকে পাই। কিন্তু তুমি সেই সুযোগে সাইফুর চাচার মিলের জমিগুলো আত্মসাত করার নতুন ছক কষেছিলে। বাবার অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে গত পাঁচ বছর ধরে তুমি যে গোপন ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো চালিয়েছ, তার সব নথিপত্র এখন আমার কাছে।"

 

সোহরাব চৌধুরীর হাতের সিগারটা নিভে গেল। তার চোখে আত্মবিশ্বাসের জায়গায় ফুটে উঠল অচেনা আতঙ্ক। "তুই... তুই কী বলছিস আদিব? আমি তোর নিজের কাকা!"

 

"যে কাকা আমার ভালোবাসাকে একটা ব্যবসায়িক চাল বানিয়ে আমার আর মেহরিনের জীবনটা বিষিয়ে তুলেছে, তাকে কাকা বলতে আমার ঘৃণা হয়," আদিব ক্ষিপ্ত চিতা বাঘের মতো গর্জে উঠল।

 

আদিব সোহরাব চৌধুরীর শার্টের কলার ধরে তাকে এক ঝটকায় সোফা থেকে দাঁড় করিয়ে দিল। "পাঁচ বছর ধরে আমি মেহরিনকে নিজের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছি কেবল তোমার মতো একটা পশুর ব্ল্যাকমেইলের প্রমাণের খোঁজে! আমি চেয়েছিলাম যেদিন মেহরিনের সামনে দাঁড়াব, সেদিন তাকে কোনো দেনা বা শর্তের শিকলে নয়, একদম মুক্ত আকাশে আমার ভালোবাসার অধিকার দেব!"

 

মেহরিনের বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত আনন্দে ও যন্ত্রণায় তোলপাড় করে উঠল। সে জলভরা চোখে আদিবের দিকে তাকিয়ে রইল। আদিব তার জন্য এত বছর ধরে এই নরকযন্ত্রণা সহ্য করেছে! প্রতিটি রাতে তার এত কাছে এসেও দূরে সরে গেছে, কারণ আদিব চেয়েছিল আগে মেহরিনের পরিবারকে এই বিষাক্ত চক্রান্ত থেকে মুক্ত করতে!

 

আদিব ফোন থেকে একটা অডিও রেকর্ড অন করল। ঘরজুড়ে ভেসে উঠল সোহরাব চৌধুরীর গলা, যেখানে তিনি এক ব্যাংক ম্যানেজারকে ঘুষ দিয়ে সাইফুর রহমানের নামে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলার নির্দেশ দিচ্ছেন।

 

সোহরাব চৌধুরীর মুখ চুন হয়ে গেল। তিনি কাঁপা গলায় বললেন, "আদিব... তুই এটা করিস না। পুলিশ জানলে চৌধুরী পরিবারের সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে!"

 

"সম্মান?" আদিব উপহাসের হাসি হাসল। "যে সম্মানের তলে একজন নির্দোষ মানুষের জীবন আর দুটো নিষ্পাপ মনের ভালোবাসা পঙ্গু হয়ে যায়, সেই সম্মান ধুলোয় মিশে যাওয়াই ভালো। আধঘণ্টার মধ্যে র‍্যাব আর পুলিশ এই বাড়িতে আসছে, কাকা। তোমার জায়গা এখন জেলে।"

 

সোহরাব চৌধুরী হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়লেন। সাইফুর রহমান আর রেহানা বেগম অবিশ্বাসের চোখে আদিবের দিকে চেয়ে রইলেন।

 

আদিব আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে পেছনে ফিরে মেহরিনের কাছে এলো। মেহরিন তখন অঝোরে কাঁদছে—তবে এ কান্না দুঃখের নয়, এক অনাবিল মুক্তি আর অনুশোচনার কান্না।

 

আদিব মেহরিনের কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে এক ঝটকায় নিজের বুকের খুব কাছে টেনে নিল। সবার সামনেই আদিব মেহরিনের কপালে আর গালে উন্মাদের মতো তপ্ত চুমু দিতে লাগল। মেহরিনও আদিবের বুকে মুখ লুকিয়ে তার শার্ট শক্ত করে চেপে ধরল। আদিবের তপ্ত নিঃশ্বাস মেহরিনের গলার কাছে এসে আঁচড় কাটতেই মেহরিন এক অদ্ভুত আবেশে চোখ বুজল।

 

"সব শেষ মেহরিন," আদিব মেহরিনের ঠোঁটের কাছে ফিসফিস করে বলল, তার গলার স্বর আবেগে ধরে এসেছিল। "আমাদের মাঝের সেই কালো দেয়াল আজ আমি চিরতরে ভেঙে ফেলেছি। তুমি আর কোনো দেনার দায়ে আমার স্ত্রী নও... তুমি কেবলই আমার ভালোবাসা।"

 

আদিব মেহরিনকে কোল তুলে নিল। সাইফুর রহমান আর রেহানা বেগম চোখের জলে তাদের দোয়াপূত হাত তুলে দিলেন।

 

আদিব মেহরিনকে নিয়ে বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির দিকে হেঁটে গেল। বৃষ্টি নামার পূর্বাভাস নিয়ে ঢাকার আকাশে তখন মেঘ জমেছে, কিন্তু মেহরিনের মনে এখন কেবলই এক উত্তপ্ত ভালোবাসার রোমাঞ্চকর জোয়ার। তবে শেষ হিসাব চুকানো এবং এই সম্পর্কের নতুন ভোরের চূড়ান্ত অধ্যায়টি যে আরও গভীর আর মাতাল হতে যাচ্ছে, তা তারা দুজনেই অনুভব করছিল।

 

গাড়ির পেছনের সিটে বসে মেহরিন আদিবের কাঁধে মাথা রেখেছিল। বাইরের মুষলধারে নামা বৃষ্টি ঢাকার রাজপথকে এক অন্যরকম মায়ায় মুড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু গাড়ির ভেতরের আবহাওয়াটা ছিল একদম অন্যরকম—উষ্ণ, ঘনীভূত আর ব্যাকুলতায় ভরা।

 

এতগুলো বছর ধরে যে অন্ধকার মিথ্যা, যে অপমান আর কুটিলতার শৃঙ্খলে তাদের জীবন আচ্ছন্ন হয়ে ছিল, আজ তার চূড়ান্ত নিপাত ঘটেছে। সোহরাব চৌধুরীকে পুলিশে সোপর্দ করে আদিব তার শ্বশুরকূলকে সমস্ত আইনি ঝামেলা থেকে চিরতরে মুক্ত করে এনেছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, মেহরিনের হৃদয় থেকে আজ সব সংশয় ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেছে।

 

উত্তরায় নিজেদের ফ্ল্যাটে ফেরামাত্রই আদিব দরজার লকটা আটকে দিল। ঘরের ভেতর আবছা আলো আর বারান্দার কাঁচ ছুঁয়ে যাওয়া বৃষ্টির শব্দ।

 

আদিব মেহরিনের দিকে ঘুরতেই মেহরিন আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে নিজেই এগিয়ে গিয়ে আদিবের গলায় দুই বাহু জড়িয়ে ধরল। মেহরিনের এই স্বতঃস্ফূর্ত ব্যাকুলতা দেখে আদিবের চোখে এক তীব্র কামনার আগুন জ্বলে উঠল।

 

"অনেক অপেক্ষা করিয়েছ, আদিব..." মেহরিনের গলার স্বর আবেগে কেঁপে উঠল। "প্রতিটা রাতে পাশে শুয়ে থেকে আমায় তিলে তিলে পুড়িয়েছ। আজ আর কোনো দূরত্বের অযুহাত আমি শুনব না।"

 

আদিব মেহরিনের কোমর দু-হাতে আঁকড়ে ধরে তাকে এক ঝটকায় কাঠের দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। আদিবের তপ্ত নিঃশ্বাস মেহরিনের ঠোঁটে এসে আঁচড় কাটছিল।

 

"আজকের পর আমাদের মাঝে আর কোনো দেয়াল নেই, মেহরিন," আদিব গহীন ও খাদে নামা গলায় বলল। "যে ভালোবাসাকে আমি বছরের পর বছর বুকে চেপে রেখেছি, আজ তার পুরোটা আমি তোমাকে দেব। তুমি সহ্য করতে পারবে তো?"

 

মেহরিন কোনো কথা না বলে আদিবের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। মেহরিনের এই প্রথম আগবাড়িয়ে দেওয়া চুম্বনে আদিবের ভেতরের সব সংযমের বাঁধ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। আদিব উন্মাদের মতো মেহরিনকে নিজের শরীরে পিষে নিতে লাগল। আদিবের তৃষ্ণার্ত ঠোঁট মেহরিনের ঠোঁট থেকে নেমে এলো তার চিবুকে, তারপর উন্মুক্ত গলার গাঢ় খাঁজে।

 

আদিব এক হাতে মেহরিনের রেশমি শাড়ির আঁচলটা পুরোপুরি খসিয়ে দিল। কাঁধের ওপর থেকে ব্লাউজের ফিতাটা সরিয়ে নিয়ে আদিব তার উষ্ণ ঠোঁটের তীব্র স্পর্শ একে দিতে লাগল মেহরিনের প্রতিটি ইঞ্চি ত্বকে। মেহরিনের সারা দেহে এক অদ্ভুত মায়াবী শিহরণ খেলে গেল। তার গলা দিয়ে মৃদু, মাতাল করা সিৎকার বেরিয়ে এলো। সে আদিবের চুলগুলোতে আঙুল শক্ত করে চেপে ধরে তাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল।

 

আদিব মেহরিনকে কোলে তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে বিছানায় নিয়ে এলো। নরম তোষকের ওপর মেহরিনকে শুইয়ে দিয়ে সে তার ওপর নেমে এলো। আদিবের প্রশস্ত বুক আর শক্ত বাহুডোরের নিচে মেহরিন নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিল। ঘরের আবহাওয়া দুজনের দ্রুত নিঃশ্বাস আর শারীরিক উত্তাপে ক্রমশ গরম হয়ে উঠছিল।

 

আজ তাদের এই সমর্পণে কোনো সামাজিক শর্তের দাসত্ব ছিল না, ছিল না কোনো অপরাধবোধের বোঝা। ছিল কেবল দুটো ভালোবাসার আকুল আত্মার দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এক হয়ে যাওয়ার তীব্র দাহ। আদিবের প্রতিটি নিবিড় ছোঁয়া, তার ঠোঁটের উগ্র কিন্তু ভালোবাসায় ভরা চুম্বন মেহরিনকে এক অচেনা স্বর্গের আনন্দে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। সারা রাত ধরে বৃষ্টির টাপুরটুপুর শব্দের সাথে মিশে রইল দুটো তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতির মাতলামি।

 

পরদিন সকালে বারান্দা দিয়ে মিষ্টি রোদ এসে পড়ল রাজকীয় বিছানাটার ওপর।

 

মেহরিন চোখ মেলে তাকাল। তার সারা শরীরজুড়ে এক মিষ্টি ক্লান্তি, কিন্তু মনে অপূর্ব এক পরম শান্তি। সে দেখল আদিব তার পাশেই শুয়ে আছে, এক বাহু মেহরিনের কোমরে জড়িয়ে তাকে শক্ত করে বুকের সাথে ধরে রেখে। ঘুমন্ত আদিবের মুখে আজ আর সেই চেনা শীতলতা বা যন্ত্রণার ছায়া নেই—সেখানে ফুটে আছে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি।

 

মেহরিন আলতো করে আঙুল বুলিয়ে দিল আদিবের তীক্ষ্ণ চোয়ালে। আদিব অমনি চোখ মেলল। গাঢ় বাদামি চোখে সকালের প্রথম আলো ফুটতেই সে মেহরিনের কপালে এক দীর্ঘ, উষ্ণ চুমু আঁকল।

 

"শুভ সকাল, আমার মেহরিন," আদিব ফিসফিস করে বলল।

 

"শুভ সকাল, আমার আদিব," মেহরিন মুচকি হেসে আদিবের বুকে মাথা গুঁজে দিল।

 

যে চিঠিগুলো কোনোদিন ডাকবাক্সে পৌঁছায়নি, যে ভালোবাসা এতদিন এক অন্ধকার ছায়ায় বন্দি ছিল—আজ সকালে সেই চিঠিগুলো রূপ নিয়েছে এক রঙিন বাস্তবে। অতীতের সব গ্লানি ধুয়ে মুছে গিয়ে আদিব আর মেহরিনের জীবনে সূচনা হলো এক নতুন, নিখাদ আর ভালোবাসায় ভরা পথচলার।

....
👁 10