দূরত্বের শেষ সীমানা

অক্টোবরের শেষদিকের বিকেলগুলোতে ঢাকায় এক অদ্ভুত বিষাদ নেমে আসে। ধানমন্ডি লেকের পাড়ে কৃষ্ণচূড়ার পাতা ঝরে ঝরে পড়ছে পিচঢালা রাস্তায়। রাফি লেকের ধারের কাঠের বেঞ্চটাতে বসে ছিল, তার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা। বাতাসের দোলায় লেকের কচুরিপানাগুলো যেমন একদিক থেকে অন্যদিকে ভেসে যায়, রাফির বুকের ভেতরের অনুভূতিগুলোও ঠিক সেভাবেই দোলা খাচ্ছিল। আজ তিন দিন ধরে সে ঘুমাতে পারে না। বুকের ভেতরটা এক নিরবচ্ছিন্ন ব্যথায় টনটন করে।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

আজ নীহার সঙ্গে তার শেষ দেখা। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা, তারপর এই শহরের ছাদ, এই লেকের পাড়, আর নীহার সমস্ত স্মৃতি ফেলে তাকে চলে যেতে হবে অনেক দূরে।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

দূর থেকে একটা হালকা নীল রঙের সুতির সালোয়ার-কামিজ পরে হেঁটে আসতে দেখা গেল নীহাকে। ওড়নাটা কাঁধের ওপর আলতো করে ফেলা, মুখের ওপর হালকা চোটের মতো নেমে এসেছে কয়েক গুচ্ছ চুল। নীহার হাঁটার গতিতে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, আছে এক বুক ভারি হয়ে থাকা নীরবতা। রাফি উঠে দাঁড়াল। নীহা কাছে আসতেই রাফি লক্ষ্য করল, মেয়েটার চোখের চারপাশটা লাল হয়ে আছে—নিশ্চয়ই সারারাত কেঁদেছে।

 

"বসো," রাফির কণ্ঠস্বর কেমন যেন অচেনা শোনাল। নিজের গলার আওয়াজ নিজের কাছেই ভাঙা শোনালো।

 

নীহা বেঞ্চে বসল, তবে রাফির থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখে নয়, বরং গা ঘেঁষে। এতদিনের জমে থাকা অধিকারবোধের এক শেষ নিঃশ্বাস যেন সে নিতে চায়। সে রাফির ডান হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল। নীহার হাত দুটো বরফের মতো ঠান্ডা।

 

"তুমি সত্যি সত্যি চলে যাচ্ছ, রাফি?" নীহার কাঁপানো গলার স্বর লেকের ঝিরঝিরে বাতাসে মিলিয়ে যেতে চাইল।

 

রাফি নীহার দিকে তাকাল। নীহার টানা টানা চোখ দুটোর গভীরে যে ভালোবাসার সমুদ্র সে এতদিন দেখে এসেছে, আজ সেখানে শুধুই এক কুলকিনারাহীন ঝড়। রাফি হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে নীহার গালের ওপর নেমে আসা এক ফোঁটা জল মুছে দিল। আঙুলের আলতো স্পর্শে নীহা চোখ দুটো বুজে ফেলল। এই স্পর্শ, এই উষ্ণতা—আর কিছুদিন পর এসবের কিছুই তার থাকবে না।

 

"আমার আর কী করার আছে বলো, নীহা?" রাফি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "তোমার আব্বা আমাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, একজন সাধারণ প্রাইভেট টিউটর বা ছোটখাটো চাকুরে ছেলের হাতে তিনি তাঁর একমাত্র মেয়েকে তুলে দেবেন না। আমি হাজার চেষ্টা করেছি তাকে বোঝাতে। কিন্তু উনার কাছে মানুষের মর্যাদার চেয়ে টাকার পাহাড় আর বংশমর্যাদা অনেক বেশি দামি।"

 

"আমি আব্বাকে অনেক বুঝিয়েছি, রাফি! অনেক কেঁদেছি, পা ধরেছি!" নীহার গলা এবার ডুকরে উঠল। "আমি বলেছি, আমি তোমার সাথে কুঁড়েঘরে থাকতে রাজি, রাজপ্রাসাদ আমার চাই না। কিন্তু আব্বা শোনেননি। উনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে যদি আমি বিয়েতে রাজি না হই, তবে উনি নিজের প্রাণ শেষ করে দেবেন। আমি কী করব বল? আমি একপাশে আমার ভালোবাসা, আর অন্যপাশে জন্মদাতার জীবন—কাকে বেছে নেব?"

 

নীহা রাফির বুকের মধ্যে মুখ গুজল। রাফি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। দুই বাহু দিয়ে সে নীহাকে শক্ত করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। যেন জগতসংসারের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে নীহাকে ধরে রাখতে চায়, যাতে কালকের সূর্যটা তাদের আলাদা করতে না পারে। নীহার ভেজা নিঃশ্বাস রাফির গলার খাঁজে এসে লাগছিল। ভালোবাসার গাঢ় এক সুবাস নীহার চুল থেকে ভেসে আসছিল, যা রাফির মগজে আগুন ধরিয়ে দেয়।

 

"আমাকে ক্ষমা করে দিও, নীহা..." রাফি নীহার কপালে দীর্ঘ এক চুমু খেল। সেই চুমুতে ছিল তীব্র অনুরাগের সাথে মিশে থাকা একরাশ পরাভব। "আমি তোমাকে ধরে রাখতে পারলাম না। আমার দারিদ্র্য, আমার অযোগ্যতা আমাদের মাঝখানে দেয়াল তুলে দিল।"

 

নীহা মাথা তুলল। রাফির দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল। সে রাফির গালে হাত রাখল, বুড়ো আঙুল দিয়ে রাফির চিবুক ছুঁয়ে দিল। "আমাকে ভুলে যেও না, রাফি। কোনোদিন না। তুমি যেখানেই যাও, জানবে এই পৃথিবীতে নীহা নামে একজন নারী শুধু তোমাকেই ভালোবেসেছিল। এই মন, এই শরীর, এই ভালোবাসা—সব তোমারই ছিল। পরিস্থিতি আমাকে যার কাছেই নিয়ে যাক না কেন, আমার রুহ তোমার কাছেই থেকে যাবে।"

 

রাফি নীহার ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট রাখল। সময় যেন থমকে গেল ধানমন্ডি লেকের সেই নিঃসঙ্গ বেঞ্চে। সেই পরশ যেন শুধুই বিরহের ছিল না, ছিল দুটো আত্মার শেষবারের মতো এক হয়ে যাওয়ার তীব্র আকুলতা। ভালোবাসার এমন এক গাঢ় অনুভূতি, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না—যা কেবল হৃদয়ের সুগভীর কোণে অনুধাবন করা যায়। গাঢ় ভালোবাসার আবেশে নীহা রাফির জামা শক্ত করে চেপে ধরে রাখল, যেন এই মুহূর্তটা পার হয়ে গেলেই পৃথিবীটা ধ্বংস হয়ে যাবে।

 

কিন্তু রাত বাড়ে, আর বাস্তবতা আরও নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। দূরে গাড়ির হর্নের শব্দে তাদের মোহ ভাঙল। নীহা ধীরে ধীরে রাফির বুক থেকে সরে এল। তার চোখের পানি এখন শুকিয়ে এসেছে, সেখানে এখন কেবল এক শূন্য মরুভূমি।

 

"আমাকে এখন যেতে হবে, রাফি। গাড়ি পাঠিয়েছেন আব্বা," নীহা উঠে দাঁড়াল।

 

রাফিও দাঁড়াল, কিন্তু সে আর নীহার দিকে তাকাতে পারছিল না। তাকালেই সে নিজেকে ধরে রাখতে পারবে না, হয়তো নীহাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলবে।

 

"তুমি কোথায় যাবে?" নীহা থামল, পিছন ফিরে জিজ্ঞেস করল।

 

"জানি না," রাফি লেকের পানির দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল। "হয়তো এই শহর ছেড়ে অনেক দূরে। যেখানে তোমার স্মৃতি আমাকে প্রতি মুহূর্তে তাড়া করবে না। চট্টগ্রামে আমাদের এক দূর সম্পর্কের চাচার কাজ আছে, উত্তরবঙ্গে চলে যেতে পারি... কিংবা একদম দেশের বাইরে।"

 

নীহা আর কোনো কথা বলল না। ধীরে ধীরে হেঁটে চলে গেল সে। তার চলে যাওয়ার পায়ের শব্দটা রাফির বুকের ভেতর প্রতিটি পদক্ষেপে আঘাত করছিল।

 

রাফি সেখানে দাঁড়িয়ে রইল দীর্ঘক্ষণ। রাত তখন প্রায় আটটা। লেকের বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে। পকেট থেকে ট্রেনের টিকিটটা বের করল সে। রাত এগারোটার তূর্ণা নিশীতের টিকিট। চট্টগ্রামগামী ট্রেন। এই শহর, এই ভালোবাসার শহর তার জন্য এখন এক বিষাক্ত কারাগার।

 

রাফি তার ব্যাগটা কাঁধে তুলল। স্টেশনের উদ্দেশ্যে হাঁটা দেওয়ার আগে সে শেষবারের মতো শহরের আকাশের দিকে তাকাল। বাতাসে তখনো নীহার গায়ের আতরের সুবাস ভেসে বেড়াচ্ছিল। ভালোবাসার এই তীব্র ব্যাকুলতা আর বুকভাঙা কষ্ট সাথে নিয়ে রাফি অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। সে জানত না, আগামী পাঁচ বছর তার জন্য কী অপেক্ষা করে আছে। সে কেবল জানত, তার ভালোবাসার গল্পটা আজ এখানেই শেষ হয়ে গেল।

 

পাঁচটা বছর সময় হিসেবে খুব কম নয়। দেখতে দেখতে কেটে গেল পাঁচটি দীর্ঘ বছর। কালক্রমে কত কিছু বদলে যায়—শহরের চেহারা বদলায়, অলিগলির পথঘাট বদলায়, মানুষের জীবনের রূপরেখাও পাল্টে যায়। বদলে গেছে রাফিও।

 

সেই পঁচিশ বছরের ছন্নছাড়া, পকেটশূন্য রাফি আর আজকের রাফি এক নয়। চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে সিলেট, সেখান থেকে শেষমেশ মালয়েশিয়া—কঠোর পরিশ্রম আর অমানুষিক মানসিক লড়াইয়ের পর রাফি এখন একটি স্বনামধন্য আইটি ফার্মের আঞ্চলিক পরিচালক। অর্থনৈতিক সচ্ছলতা এসেছে, পরনে দামি স্যুট, চলাফেরায় আভিজাত্যের ছাপ। কিন্তু যে জিনিসটা বদলায়নি, তা হলো তার বুকের ভেতরের সেই বিষণ্ন শূন্যতা।

 

পাঁচ বছর পর বিশেষ একটি ব্যবসায়িক চুক্তির কাজে রাফিকে আবার ঢাকায় ফিরতে হয়েছে। এই ঢাকা শহরকে সে ঘৃণা করতে চেয়েছিল, কিন্তু এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে যখনই শহরের বাতাস বুক ভরে নিল, তার হৃদস্পন্দন থমকে গেল। এই বাতাসের প্রতিটি কণে এখনো যেন নীহার গায়ের চেনা সুবাস লেগে আছে। এতদিন ধরে গড়ে তোলা তার কঠিন আবেগের বরফ এক নিমেষে গলতে শুরু করল।

 

গুলশানের এক বিলাসবহুল ক্যাফেতে মিটিং শেষে রাফি জানালার পাশে বসে কফিতে চুমুক দিচ্ছিল। বিকেলের রোদ এসে পড়েছিল তার টেবিলে। ঠিক তখনই ক্যাফের কাচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল একজন নারী। আর তার হাত ধরে ছিল চার-পাঁচ বছরের একটি ছোট্ট মেয়ে।

 

রাফির হাত থেকে কফির কাপটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। চোখের সামনে দৃশ্যটা দেখে তার মাথার ভেতরটা যেন একমুহূর্তে ফাঁকা হয়ে গেল।

 

নীহা!

 

সেই একই রকম কাজলকালো চোখ, মিষ্টি মুখাবয়ব। তবে চুলে এসেছে খানিকটা পরিবর্তন, আগের চেয়ে সামান্য রোগা দেখাচ্ছে তাকে। পরনে একটি পরিপাটি বেগুনি সুতির থ্রি-পিস। কিন্তু সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা রাফি খেল নীহার পাশে থাকা ওই ছোট বাচ্চাটিকে দেখে।

 

গোলাপী রঙের একটি ফ্রক পরা মেয়েটি, অবিকল নীহার মতোই দেখতে। তার টানা টানা চোখ, তুলতুলে গাল—সবকিছুর মধ্যেই নীহার প্রতিচ্ছবি। বাচ্চাটি নীহার হাত ধরে আধো-আধো গলায় বলছিল, "আম্মু, আমি চকোলেট আইসক্রিম খাব!"

 

'আম্মু!' শব্দটা রাফির কানে গিয়ে যেন কোনো তপ্ত সিসার মতো বিঁধল।

 

রাফির বুকের ভেতরটা চুরমার হয়ে যেতে লাগল। নীহা বিয়ে করেছে, তার একটি সন্তান হয়েছে, সে এখন পুরোদস্তুর একজন গৃহিণী, কারো স্ত্রী, কারো মা—এসব তো রাফি জানতই। নিজেকে সে হাজারবার বুঝিয়েছে। কিন্তু চোখের সামনে যখন সেই বাস্তবতা এসে দাঁড়াল, তখন তার সমস্ত মানসিক শক্তি ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

 

নীহা কাউন্টারের দিকে এগোতেই হঠাৎ তার চোখ পড়ল কোণার টেবিলটায় বসে থাকা রাফির দিকে।

 

নীহার পা দুটো যেন মেঝেতে আটকে গেল। চোখের মনি দুটো বড় বড় হয়ে উঠল তার। পাঁচ বছর! পাঁচটা দীর্ঘ বছর পর সে রাফিকে দেখছে। রাফি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গাম্ভীর্যপূর্ণ, সুন্দর, কিন্তু তার চোখে সেই পুরোনো বিষাদের ছায়া। নীহার বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে উঠল। এতদিনের চেপে রাখা কান্না, যন্ত্রণা আর একরাশ জমে থাকা ভালোবাসা যেন এক নিমেষে বাঁধ ভাঙতে চাইল।

 

নীহা ধীরে ধীরে রাফির টেবিলের দিকে এগিয়ে এল। তার হৃদস্পন্দন এতটাই দ্রুত চলছিল যে মনে হচ্ছিল বুকের ছাতি ফেটে বের

হয়ে আসবে।

 

রাফি চেয়ার ছেড়ে দাঁড়াল। তার চোখে তখন ভালোবাসার বদলে এক ধরণের তাচ্ছিল্য আর তীব্র অভিমানের আগুন জ্বলছিল। সে নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করল।

 

"কেমন আছ, নীহা?" রাফির গলার স্বর বরফের মতো ঠান্ডা।

 

"তুমি... তুমি কবে আসলে? কেমন আছ তুমি?" নীহার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ার উপক্রম হলো। সে রাফির এত কাছাকাছি দাঁড়িয়েও তাকে ছুঁতে পারছে না, এই যন্ত্রণা সওয়া অসম্ভব হয়ে উঠছিল।

 

"আমি ভালোই আছি। দেখতেই পাচ্ছ, বেঁচে আছি," রাফি একপলক নীহার দিকে তাকিয়ে তারপর নজর দিল নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট মেয়েটির দিকে। "তোমার মেয়ে?"

 

নীহা রাফির চোখের দিকে তাকাল। রাফির দৃষ্টিভঙ্গি, তার ভেতরের জমে থাকা কষ্ট আর ভুল বোঝাবুঝি নীহা একমুহূর্তেই টের পেল। সে কিছু একটা বলতে চাইল, তার ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল, "রাফি, আসলে... মেয়েটি..."

 

কিন্তু নীহা থামল। সে কথা শেষ করতে পারল না। তার চোখে এক গভীর রহস্য আর বুকভাঙা কষ্টের ছাপ ফুটে উঠল। যেন এমন কোনো সত্য আছে যা এই মুহূর্তে সে মুখ ফুটে বলতে পারছে না। এক অদৃশ্য শিকল তাকে আটকে রেখেছে।

 

"খুব সুন্দর হয়েছে মেয়েটা," রাফি একটা নিষ্ঠুর হাসির চেষ্টা করল, যদিও তার নিজের ভেতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। "একদম তোমার মতো দেখতে। তোমার সংসার নিশ্চয়ই খুব সুখে কাটছে? একজন ভালো স্বামী, মিষ্টি একটা সন্তান—যা যা তোমার বাবা চেয়েছিলেন, সবই তো পেয়েছ।"

 

রাফির কথার প্রতিটি শব্দ নীহার বুকে তীরের মতো বিঁধছিল। সে বলতে চাইল—'না রাফি! তুমি যা ভাবছ তা নয়! আমি সুখে নেই, আমার কোনো সংসার নেই!' কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। সে শুধু ব্যাকুল চোখে রাফির দিকে তাকিয়ে রইল।

 

বাচ্চাটি নীহার ওড়না ধরে টান দিল, "আম্মু, আইসক্রিম দেবে না?"

 

নীহা চোখ থেকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়তে দিল না। সে নিজেকে সামলে নিয়ে রাফির দিকে তাকাল। সেই চোখে ছিল অপরসীম ভালোবাসা আর এক অজানা আর্তি।

 

"তুমি ভুল ভাবছ, রাফি..." নীহা ফিসফিস করে বলল।

 

"ভুল?" রাফি একটা তিক্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "আমার চোখের সামনে যা দেখছি, সেটাও ভুল? পাঁচ বছর আগে তুমি তোমার বাবার পছন্দকে মেনে নিয়ে আমাকে একলা ফেলে চলে গিয়েছিলে। আজ তোমার হাতে অন্য কারো সংসারের আলো। এখানে ভুল বোঝার আর কী আছে নীহা?"

 

রাফি আর দাঁড়াল না। সে টেবিলের ওপর কফির বিলের টাকা রেখে দ্রুত পায়ে ক্যাফে থেকে বের হয়ে গেল। তার আর সহ্য হচ্ছিল না। এই শহরের ওপর তার ক্ষোভ আরও হাজার গুণ বেড়ে গেল।

 

ক্যাফের কাচের দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে নীহা ব্যাকুল চোখে রাফির চলে যাওয়া দেখছিল। বাচ্চাটি নীহার হাত ধরে জড়িয়ে ধরে বলল, "আম্মু, উনি তোমার ওপর রাগ করলেন কেন? উনি কে?"

 

নীহা হাঁটু গেড়ে বসে বাচ্চাটিকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল। তার চোখের জল এবার আর বাধা মানল না। ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল নীহা। মনে মনে বলল, 'রাফি, তুমি আমায় কতটা ভুল বুঝলে! যদি জানতে পারতে এই বাচ্চাটি কার, যদি জানতে পারতে এই চার বছরে আমি কী নরকযন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছি... তবে হয়তো আজ এভাবে আমাকে ফেলে চলে যেতে পারতে না।'

 

ক্যাফে থেকে বের হয়ে আসার পর রাফির মনটা কোনোভাবেই শান্ত হচ্ছিল না। বৃষ্টির পূর্বাভাস নিয়ে ঢাকার আকাশজুড়ে ছাইরঙা মেঘের ঘনঘটা। হোটেলের এসি ঘরের চারদেওয়ালের ভেতরে রাফির নিঃশ্বাস আটকে আসছিল। যে দৃশ্য সে দেখে এসেছে, তা বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে—নীহা, তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মিষ্টি ছোট মেয়েটি, আর মেয়েটির মুখে 'আম্মু' ডাক।

 

রাফি তার বুকের শার্টের ওপরের বোতাম দুটো খুলে ফেলল। চেনা সেই কষ্টটা আজ আবার পাঁচ বছর পর নতুন করে তাকে গ্রাস করছে। সে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি খেয়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল। রাস্তায় তখন গাড়িঘোড়ার যান্ত্রিক কোলাহল, আর তার মাথার ভেতর ভালোবাসার এক অদ্ভুত আলোড়ন।

 

রাফি নিজেকে হাজারটা যুক্তি দিল—নীহা এখন পরস্ত্রী, তার নিজস্ব একটা জীবন আছে, পরিবার আছে। তার পেছনে ছোটা বা তার ব্যাপারে ভাবা এখন পাপ। কিন্তু মন কি সব সময় মস্তিষ্কের হিসাব মেনে চলে?

 

পরদিন বিকেলে রাফি নিজেকে সামলাতে পারল না। এক অজানা আকর্ষণে সে আবার ছুটে গেল ধানমন্ডি লেকের সেই পুরোনো জায়গাটাতে, যেখানে পাঁচ বছর আগে তাদের শেষ দেখা হয়েছিল। গোধূলির আলো-আঁধারিতে লেকের পানি টলমল করছে। বেঞ্চটার দিকে এগোতেই রাফির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

 

নীহা বসে আছে।

 

একই জায়গায়, একই ভঙ্গিতে। পরনে একটি কালো রঙের সুতির সালোয়ার-কামিজ, গায়ে জড়ানো হালকা চাদর। তার চোখ দুটি লেকের পানির দিকে নিবদ্ধ। বাচ্চাটি আজ তার সাথে নেই, সে একদম একাকী। রাফিকে আসতে দেখে নীহা একটুও অবাক হলো না, যেন সে জানত রাফি ঠিকই এখানে আসবে। এই জায়গাটি যে তাদের সম্পর্কের অমলিন স্মৃতি বহন করে।

 

রাফি এসে শান্ত ভঙ্গিতে নীহার পাশে বসল। কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বলল না। বাতাসে কেবল ঝরঝর করে ঝরতে থাকা পাতার শব্দ আর দূর থেকে ভেসে আসা যানবাহনের ভোঁ ভোঁ আওয়াজ।

 

"আমি জানতাম তুমি আসবে," নীহা ভাঙা গলায় বলল। তার চোখ দুটো বেয়ে একফোটা পানি গাল গড়িয়ে চিবুকে এসে থমকে গেল।

 

"কেন আসলে এখানে, নীহা?" রাফি গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল। "তোমার কি এখন তোমার সংসারে থাকা উচিত নয়? স্বামী, সন্তান ছেড়ে প্রতিদিন এভাবে অতীতে ফিরে আসার মানে কী?"

 

নীহা রাফির দিকে ফিরল। তার চোখের দৃষ্টিতে এত পরিমাণ বেদনা জমা হয়ে ছিল যে রাফি একমুহূর্তের জন্য থমকে গেল।

 

"সংসার?" নীহা একটা তিক্ত হাসল। "রাফি, তুমি আমাকে এতটাই পর ভেবে নিলে যে আমার চোখের পেছনের সত্যটা দেখতে পেলে না? তুমি ভাবলে আমি অন্য কাউকে ভালোবেসে সংসার পেতেছি, মা হয়ে সুখে দিন কাটাচ্ছি?"

 

"আমি তো সেটাই দেখলাম," রাফি দৃষ্টি ঘুরিয়ে বলল। "কালকে ওই ক্যাফেতে মেয়েটি তোমাকে আম্মু বলে ডাকছিল। ও তো তোমারই প্রতিচ্ছবি। অবিকল তোমার মতো দেখতে।"

 

নীহা রাফির কাছাকাছি সরল। তার দুটো হাত বাড়িয়ে রাফির একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। এবার আর রাফি হাত সরিয়ে নিল না। নীহার হাতের সেই চেনা উষ্ণতা রাফির সমস্ত শরীরজুড়ে এক তীব্র অনুভূতির শিহরণ ছড়িয়ে দিল। কতদিন সে এই স্পর্শটার জন্য হাহাকার করেছে!

 

"মেয়েটি আমাকে আম্মু বলে ডাকে, এটা সত্যি," নীহা ফিসফিস করে বলল, তার নিঃশ্বাস রাফির গালে এসে লাগছিল। "কিন্তু ও আমার গর্ভের সন্তান নয়, রাফি। আমি কখনো অন্য কোনো পুরুষের স্ত্রী হইনি। এই শরীর, এই মন—যেদিন তোমার ছিল, আজ পাঁচ বছর পর আজও শুধু তোমারই আছে।"

 

রাফি চমকে উঠে নীহার দিকে তাকাল। "তুমি কী বলছ এসব? তোমার বিয়ে হয়নি মানে? আর ওই মেয়েটি যদি তোমার না হয়, তবে কার?"

 

নীহার চোখে তখন কান্নার বাঁধ ভেঙে গেছে। সে রাফির কাঁধে মাথা রাখল। রাফি অনুভব করল নীহার শরীরটা কান্নায় কাঁপছে। এত বছরের জমে থাকা যন্ত্রণা যেন এই এক স্পর্শে গলে বের হতে চাইছে। রাফি আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। সে তার শক্ত দুটো বাহু দিয়ে নীহাকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

 

"ও কার সন্তান, রাফি... তা যদি তুমি জানতে," নীহা ডুকরে কেঁদে উঠল। "ওর অস্তিত্বের সাথে যে তোমার অতীয় এমনভাবে জড়িয়ে আছে, যা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। কিন্তু আমি তোমাকে এখন কিছু বলতে পারব না। সময় আমাকে এমন এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যা প্রকাশ করলে অনেক কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে।"

 

নীহার উন্মাদের মতো কথাগুলো রাফির মাথার ভেতর বিষম গোলকধাঁধা তৈরি করল। তার হৃদস্পন্দন দ্রুত হতে থাকল। সে নীহার মুখটি নিজের দুই হাতের তালুতে তুলে ধরল। নীহার চোখে চোখ রেখে রাফি বলল, "কী লুকাচ্ছ তুমি আমার কাছে, নীহা? ওই বাচ্চার সাথে আমার অতীতের কী সম্পর্ক? কার সন্তান ও?"

 

নীহা রাফির ঠোঁটের দিকে তাকাল। বিরহের এই গাঢ় মুহূর্তে সব রহস্য যেন একপাশে সরে গিয়ে শুধু তাদের ভালোবাসাটা সত্য হয়ে উঠল। নীহা রাফির চিবুকে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াতেই রাফির ভেতরের সব প্রতিরোধ ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল। রাফি নীহার ঠোঁট নিজের করে নিল এক তীব্র ভালোবাসার আবেগে। ধানমন্ডি লেকের সেই নিঃসঙ্গ সন্ধ্যায় দুই ব্যাকুল হৃদয় পাঁচ বছরের বিরহ ভুলে একে অপরের মাঝে হারিয়ে গেল।

 

পবিত্রময় সেই ভালোবাসার আবেশে নীহা রাফির বুকে নিজের মুখটি লুকিয়ে রাখল। কিন্তু চুম্বন আর ভালোবাসার এই উষ্ণতার আড়ালেও রাফির মনে বিশাল এক প্রশ্নচিহ্ন জেগে রইল—কে ওই ছোট মেয়েটি? আর তার অতীতের সাথে এই বাচ্চার কী এমন কঠিন রহস্য জড়িয়ে আছে?

 

ধানমন্ডি লেকের সেই আবেগঘন মুহূর্তটির পর নীহা দ্রুতই নিজেকে সামলে নিয়েছিল। রাফির হাজার প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর না দিয়ে সে শুধু বলেছিল, "আমাকে কিছুদিন সময় দাও, রাফি। সঠিক সময় এলে আমি নিজেই তোমাকে সব বলব।" এরপর সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায়নি।

 

কিন্তু রাফি আর চুপ করে বসে থাকার পাত্র নয়। যে সত্য তার জীবনের অস্তিত্বকে নাড়িয়ে দিচ্ছে, যা নীহাকে তার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে, সেই রহস্যের শেষ সে দেখেই ছাড়বে।

 

নীহার সেই শেষ কথাগুলো রাফির মাথার ভেতর অনবরত ঘুরপাক খাচ্ছিল—'ওর অস্তিত্বের সাথে তোমার অতীত এমনভাবে জড়িয়ে আছে...'

 

আমার অতীত? রাফি নিজের মনকে প্রশ্ন করে। তার অতীত তো খুব সাদামাটা। গ্রামে সাধারণ এক পরিবারে বেড়ে ওঠা, ঢাকায় এসে কষ্ট করে পড়াশোনা করা, আর তার জীবনের একমাত্র বন্ধু ও ছোট ভাইয়ের মতো অনুজ—আরিফ!

 

আরিফের নামটা মনে পড়তেই রাফির বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল।

 

আরিফ ছিল রাফির খালার ছেলে। ছোটবেলা থেকে এক সাথে বড় হওয়া, পড়াশোনা করা। পাঁচ বছর আগে রাফি যখন ঢাকা ছেড়ে চলে যায়, তখন আরিফও ঢাকায় একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ত। পরবর্তীতে রাফি দেশের বাইরে চলে যাওয়ার পর আরিফের সাথে তার যোগাযোগ কমে আসে। গত তিন বছর আগে দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের মাধ্যমে রাফি খবর পেয়েছিল—আরিফ নাকি এক ভয়ানক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে।

 

রাফির মাথায় ঝিলিক দিয়ে উঠল এক অসম্ভব সন্দেহ। ওই ছোট্ট মেয়েটির মুখাবয়ব, তার টানা টানা চোখ—নীহার মতো দেখতে হলেও, ওর হাসির ধরণ আর থুতনির গঠনটা কি অনেকটা আরিফের মতো নয়?

 

নিজের এই ভাবনাকে সত্যি নাকি উন্মাদনা তা যাচাই করতে রাফি আর দেরি করল না। সে সোজা চলে গেল ঢাকার মোহাম্মদপুরে, যেখানে আরিফ তার বন্ধুদের সাথে মেসে থাকত। পুরানো মেসে গিয়ে আরিফের সন্ধান পাওয়া গেল না, কিন্তু সেখানকার এক পুরানো কেয়ারটেকারের কাছ থেকে পাওয়া গেল আরিফের তৎকালীন সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু রাসেলের ফোন নম্বর।

 

সন্ধ্যায় ধানমন্ডির এক শান্ত রেস্তোরাঁয় রাফি রাসেলের সাথে দেখা করল।

 

রাসেল রাফিকে দেখে অবাক হয়ে বলল, "রাফি ভাই! আপনি এত বছর পর? আরিফ চলে যাওয়ার পর তো আপনার আর কোনো খোঁজই পেলাম না।"

 

"রাসেল, আমাকে একটা সত্য কথা বল," রাফি কোনো ভূমিকা ছাড়াই সরাসরি কাজের কথায় চলে এল। তার গলার স্বর গম্ভীর ও উত্তেজিত। "আরিফের মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল? ওর জীবনে কি কোনো মেয়ে ছিল?"

 

রাসেলের মুখটা নিমেষেই ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সে ইতস্তত করে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল।

 

"আমাকে সত্যিটা বলো, রাসেল!" রাফি রাসেলের হাত চেপে ধরল। "এটা আমার জীবনের মরণ-বাঁচন প্রশ্ন। নীহা... নীহার সাথে আরিফের কী সম্পর্ক ছিল?"

 

রাসেল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখে ফুটে উঠল গভীর অনুশোচনা। "রাফি ভাই, আপনি এত বছর পর এসেছেন, আমি জানি না এসব কথা আপনাকে বলা ঠিক হবে কি না।

কিন্তু আরিফ মরার আগে আপনার কথা খুব মনে করত।"

 

"খুলে বলো আমাকে!" রাফির বুকটা দুরুদুরু করে কাঁপছিল।

 

"রাফি...?" নীহার গলা দিয়ে প্রায় কোনো আওয়াজ বের হলো না।

আরিফ ভাই আপনাকে খুব ভালোবাসত, কিন্তু ও একটা মারাত্মক ভুল করে ফেলেছিল," রাসেল আস্তে আস্তে বলতে শুরু করল। "আপনি যখন ঢাকা ছেড়ে চলে গেলেন, তার কিছুদিন পর আরিফ এক অন্যরকম সংকটে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সহপাঠী মেয়ের সাথে আরিফের সম্পর্ক তৈরি হয়। মেয়েটি খুব সাধারণ ঘরের ছিল। কিন্তু আরিফ যখন জানতে পারে মেয়েটি গর্ভবতী, তখন ভয়ে ও হাত গুটিয়ে নেয়। কারণ আরিফের পরিবার অতটা প্রগতিশীল ছিল না। মেয়েটি একলা, অসহায় হয়ে পড়েছিল।"

 

রাফির চোখের সামনে সব যেন ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল। সে শক্ত হয়ে বসে রইল।

 

রাসেল বলে চলল, "মেয়েটি যখন নিরুপায় হয়ে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়, ঠিক তখনই নীহা ভাবীর সাথে তার দেখা হয়। কীভাবে যেন নীহা ভাবী পুরো ব্যাপারটা জানতে পারেন। নীহা ভাবী জানতেন আরিফ আপনার ভাই। উনি আরিফকে খুব ডেকে বোঝান, কিন্তু আরিফ তখন দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করে। এর কিছুদিন পরেই আরিফ সেই মর্মান্তিক বাইক অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়।"

 

"তারপর?" রাফির কন্ঠস্বর প্রায় রোধ হয়ে আসছিল।

 

"তারপর নীহা ভাবী যা করেছিলেন, তা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব না," রাসেল চোখ মুছে বলল। "আরিফ মারা যাওয়ার পর ওই অসহায় মেয়েটি একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়। কিন্তু প্রসবের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মেয়েটিও মারা যায়। সদ্যজাত ওই এতিম বাচ্চাটিকে কেউ গ্রহণ করতে চায়নি। তখন নীহা ভাবী বাচ্চাটির সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। নিজের পরিবার, সমাজ, আত্মীয়দের সব অপমান আর কুৎসা সহ্য করে উনি বাচ্চাটিকে নিজের পরিচয়ে বড় করতে শুরু করেন। উনি কাউকে জানতে দেননি বাচ্চাটি কার, শুধু নিজের বুকে আগলে রেখেছেন আপনার ভাইয়ের একমাত্র স্মৃতিকে।"

 

কথাগুলো শেষ হতেই রাফির মাথার ওপর যেন এক হাজার ভোল্টের বাজ পড়ে ভেঙে পড়ল।

 

হাতের গ্লাসটা রাফির হাত থেকে ছিটকে মেঝেতে পড়ে চুরমার হয়ে গেল। রাফি স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তার চোখ দিয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।

 

নীহা! তার নীহা এত বড় ত্যাগ স্বীকার করেছে? সে নিজের সমাজ, পরিবার, নিজের ভবিষ্যতের তোয়াক্কা না করে রাফির মৃত ভাইয়ের সন্তানকে নিজের সন্তান হিসেবে আগলে রেখেছে? আর রাফি... রাফি তাকে সন্দেহ করেছে! তাকে চরিত্রহীন ভেবে তাচ্ছিল্য করেছে!

 

পাপবোধ আর অনুশোচনায় রাফির বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যেতে লাগল। সে আর এক মুহূর্তও সেখানে বসল না। পাগলের মতো রেস্তোরাঁ থেকে বের হয়ে রাস্তার দিকে ছুটল। আজ তার নীহার পা ধরে ক্ষমা চাইতে হবে। আজ তাকে সেই ভালোবাসার প্রতিদান দিতেই হবে, যা সে এতদিন ভুল বুঝে দূরে ঠেলে দিয়েছিল।

 

রাসেলের কাছ থেকে সত্যটা জানার পর রাফির পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গিয়েছিল। এক মুহূর্তের জন্যও সে আর দেরি করল না। প্রচণ্ড অপরাধবোধে তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল। সে কীভাবে পারল নীহাকে ওভাবে ভুল বুঝতে? যে নারী নিজের জীবন, যৌবন, সামাজিক সম্মান—সবকিছু বিসর্জন দিয়ে রাফির মৃত ভাইয়ের রক্তকে নিজের বুকে আগলে রেখেছে, তাকেই সে চরিত্রহীন ভেবে তাচ্ছিল্য করেছে!

 

রাফি উন্মত্তের মতো গাড়ি চালিয়ে নীহার বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলো। রাসেলের কাছ থেকেই সে নীহার বর্তমান ঠিকানাটা সংগ্রহ করেছিল। ধানমন্ডির এক নিরিবিলি গলির শেষ মাথায় একটা পুরানো দোতলা বাড়ি।

 

রাত তখন প্রায় নয়টা। মুষলধারে বৃষ্টি নামার উপক্রম হয়েছে আকাশে, থেকে থেকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। রাফি যখন নীহার বাড়ির দরজার সামনে গিয়ে পৌঁছাল, তখন তার সমস্ত শরীর কাঁপছিল। সে কলিংবেল বাজাল।

 

কয়েক মুহূর্ত পর দরজা খুলে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে নীহা। হালকা রঙের একটি সুতির শাড়ি পরা, চুলগুলো পেছনের দিকে সাধারণ একটি ক্লিপে আটকানো। দরজায় রাফিকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নীহার চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল।

 

"রাফি? তুমি এই রাতে এখানে...?"

 

নীহা কথা শেষ করার আগেই রাফি হুট করে নীহার দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। নীহার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল রাফি। তার চোখ দিয়ে তখন ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়ছে।

 

"আমাকে ক্ষমা করে দাও, নীহা... আমাকে ক্ষমা করে দাও!" রাফির কণ্ঠস্বর কান্নায় বুজে আসছিল। "আমি অপরাধী, আমি অন্ধ ছিলাম! আমি তোমার পবিত্রতাকে চিনতে পারিনি, নীহা। আমি তোমাকে এত বড় আঘাত কীভাবে দিলাম?"

 

নীহা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, রাফি সব জেনে গেছে। সে রাফির হাত দুটো ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করল, "রাফি, ওঠো! তুমি কী করছ? এভাবে কেঁদো না..."

 

"না নীহা, আমাকে উঠতে বলো না," রাফি নীহার হাত দুটো নিজের গালে চেপে ধরল। নীহার হাতের ঠান্ডা স্পর্শ রাফির তপ্ত গাল দুটোকে শীতল করে দিচ্ছিল। "রাসেল আমাকে সব বলেছে। আরিফ... আমার ছোট ভাই আরিফের ভুলের শাস্তি তুমি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছ? যে সন্তানকে সমাজ অবৈধ বলে ছুড়ে ফেলে দিত, তাকে তুমি নিজের পরিচয় দিয়ে মা হয়ে আগলে রেখেছ? এত বড় ত্যাগ কেউ কীভাবে করতে পারে, নীহা?"

 

নীহার চোখের কোণ দিয়ে শান্ত এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। সে মৃদু হেসে রাফিকে ধরে তুলল। ঘরের ভেতরে এনে দরজাটা বন্ধ করে দিল।

 

ভেতরের ঘরের বিছানায় তখন ছোট মেয়েটি—আয়রা—শান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছিল।

 

নীহা রাফিকে সোফায় বসিয়ে তার পাশে বসল। সে রাফির মুখের ভেজা জল নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে দিল। ভালোবাসার সেই চরম গাঢ় মুহূর্তে কোনো ক্ষোভ বা অভিমান ছিল না, ছিল কেবল দুই আত্মার মিলন।

 

"আমি কোনো ত্যাগ স্বীকার করিনি, রাফি," নীহা ফিসফিস করে বলল, তার চোখের দৃষ্টি রাফির চোখের গভীরে নিবদ্ধ। "তুমি যখন আমাকে ছেড়ে চলে গেলে, আমার বেঁচে থাকার আর কোনো অবলম্বন ছিল না। বাবা আমাকে অন্য কোথাও বিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। ঠিক তখনই আরিফের এই ঘটনাটা ঘটে। মেয়েটি যখন মারা গেল, আমি একনজরে ওই এক রক্তমাংসের পিণ্ডটিকে দেখলাম... আর দেখতে পেলাম ওর মুখের মধ্যে তোমার প্রতিচ্ছবি।"

 

নীহা রাফির বুকের ওপর নিজের হাতটি রাখল। রাফির হৃদস্পন্দনের তীব্র গতি সে স্পষ্ট অনুভব করতে পারছিল।

 

"আমি জানতাম, এই বাচ্চাটি তোমার পরিবারের রক্ত," নীহা বলে চলল, তার গলার স্বর ব্যাকুল হয়ে উঠল। "তোমার অতীত, তোমার বংশের শেষ স্মৃতি। আমি যদি একে গ্রহণ না করতাম, তবে ডাস্টবিনে অথবা কোনো অনাথ আশ্রমে বড় হতো ও। আমি আব্বাকে পরিষ্কার জানিয়ে দিই—আমি কখনো বিয়ে করব না, আর এই বাচ্চার দায়িত্ব আমিই নেব। আব্বা রেগে গিয়ে আমাকে ত্যাজ্যপুত্র করলেন, সমাজ আমাকে কত কুৎসা দিল! কিন্তু আমার বুকে যখন এই ছোট্ট প্রাণটা জড়িয়ে থাকত, আমার মনে হতো আমি তোমাকেই আমার বুকের ভেতর জড়িয়ে রেখেছি, রাফি।"

 

রাফি আর সহ্য করতে পারল না। সে নীহাকে নিজের বাহুর মধ্যে টেনে নিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। বিরহ, অনুশোচনা আর ভালোবাসার এক তীব্র আবেশে তারা একে অপরকে আঁকড়ে ধরল। রাফি নীহার কপালে, গালে, ঠোঁটে অনুরাগের পরশ এঁকে দিল। সেই স্পর্শে ছিল ক্ষমা চাওয়ার ব্যাকুলতা আর সারাজীবন পাশে থাকার গভীর অঙ্গীকার।

 

নীহা রাফির বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পাঁচ বছর ধরে গড়ে তোলা তার সব কষ্ট, সব একা থাকার যন্ত্রণা আজ রাফির এই উষ্ণ আলিঙ্গনে গলে জল হয়ে গেল। সে অনুভব করল, তার ভালোবাসা কখনো হারায়নি, তা আবার ফিরে এসেছে।

 

"আয়রাকে তুমি গ্রহণ করবে তো, রাফি?" নীহা রাফির চিবুকে হাত রেখে শুধাল।

 

রাফি নীহার ঠোঁটে হালকা চুমু খেয়ে বলল, "আয়রা শুধু আমার ভাইয়ের সন্তান নয় নীহা, ও আমাদের ভালোবাসার প্রথম উপহার। আজ থেকে ও আমার মেয়ে। আর তুমি... তুমি আবার আমার নীহা।"

 

বাহিরে তখন ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। সেই বৃষ্টির শব্দে ঢাকা পড়ে গেল পাঁচ বছরের জমাট বাঁধা সব বিরহ। কিন্তু গল্প তো এখানেই শেষ নয়—নীহার বাবা এবং সমাজের যে কালো ছায়া এখনো তাদের ওপর লেগে আছে, তাকে উপড়ে ফেলে এই পরিবারকে এক ছাদের নিচে আনার চূড়ান্ত লড়াই যে এখনো বাকি।

 

বাইরে ঝুম বৃষ্টি থামার পর রাতের স্তব্ধতা নেমে এসেছিল। ঘরের আবছা আলোয় ঘুমে থাকা ছোট্ট আয়রার দিকে তাকিয়ে রাফির বুকটা এক অদ্ভুত পূর্ণতায় ভরে উঠল। কালকের সেই ভুল বোঝাবুঝি, দূরত্ব আর যন্ত্রণার মেঘ কেটে গিয়ে আজ সেখানে নেমে এসেছে এক শান্ত, স্নিগ্ধ অনুভূতি।

 

নীহা রাফির পাশে এসে দাঁড়াল। রাফি এক হাতে নীহার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। নীহা অবলীলায় রাফির কাঁধে মাথা রাখল। এতগুলো বছর একা একা সংগ্রাম করার পর এই একটা রাত যেন তার জীবনের সব ক্লান্তি মুছে দিচ্ছিল। রাফির বুকের উত্তাপ আর ধুকপুক শব্দ নীহাকে এক পরম নিরাপত্তার আশ্বাস দিল।

 

"কাল সকালেই আমি তোমার আব্বার সাথে দেখা করতে চাই, নীহা," রাফি নীহার কপালে চিবুক রেখে বলল।

 

নীহা মাথা তুলে রাফির দিকে তাকাল, তার চোখে সামান্য উৎকণ্ঠা। "আব্বা কি তোমাকে মেনে নেবেন, রাফি? উনি তো আমাকে ত্যাজ্য করার পর থেকে আর কোনো যোগাযোগই রাখেননি। সমাজ আর নিজের অহংকার ওঁর কাছে সবকিছুর ওপরে।"

 

"পাঁচ বছর আগের রাফি আর আজকের রাফি এক নয়, নীহা," রাফি গম্ভীর অথচ আত্মবিশ্বাসী গলায় উত্তর দিল। "তখন আমার কাছে অনুনয়-বিনয় ছাড়া কিছু ছিল না। কিন্তু আজ আমার কাছে সত্যিটা আছে, তোমার এই মহান ত্যাগের সম্মান আছে। আর সবচেয়ে বড় কথা—আজ তোমাকে হারিয়ে ফেলার কোনো ভয় আমার নেই। আমি তাকে বোঝাব, না বুঝলে তোমাকে আর আয়রাকে সাথে করে নিয়ে যাওয়ার অধিকার আমার আছে।"

 

রাফি নীহার গালে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। নীহা চোখ বন্ধ করে রাফির শার্টের কলারটা শক্ত করে চেপে ধরল। ভালোবাসার গাঢ় এই আবেগে দুজন দুটো হৃদয়কে নতুন করে চিনে নিচ্ছিল। বিরহের অন্ধকার পেরিয়ে তাদের এই মিলন যেন এক রূপকথার মতো মনে হচ্ছিল।

 

পরদিন সকালে সূর্য ওঠার পরপরই রাফি আর নীহা আয়রাকে সাথে নিয়ে নীহার বাবার ধানমন্ডির বাড়িতে পৌঁছাল।

 

পুরোনো বাড়িটার ড্রয়িংরুমে বসে ছিলেন নীহার বাবা—জনাব আশরাফ চৌধুরী। বয়স আগের চেয়ে বেশ বেড়েছে, চুলে পাক ধরেছে অনেকটাই। রাফি, নীহা আর ছোট্ট আয়রাকে একসাথে দরজায় দাঁড়াতে দেখে উনার মুখের এক্সপ্রেশন শক্ত হয়ে গেল। চোখ দুটোতে ফুটে উঠল রাগের দ্যুতি।

 

"তোমরা এখানে কী চাও?" শক্ত কণ্ঠে বললেন আশরাফ চৌধুরী। "নীহা, আমি তোমাকে আগেই বলেছি, আমার বাড়িতে তোমার আর ওই জারজ বাচ্চার কোনো জায়গা নেই। আর তুমি—রাফি! পাঁচ বছর পর আবার আমার মেয়ের জীবন নষ্ট করতে এসেছ?"

 

"আব্বা!" নীহা প্রতিবাদ করতে চাইল, কিন্তু রাফি হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল।

 

রাফি শান্ত পায়ে এগিয়ে গিয়ে আশরাফ চৌধুরীর সামনে দাঁড়াল। উনার চোখে চোখ রেখে বলল, "জনাব চৌধুরী, পাঁচ বছর আগে আপনি আমাকে অযোগ্য বলে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমি চুপচাপ চলে গিয়েছিলাম কারণ তখন আপনাকে দেওয়ার মতো কিছু আমার ছিল না। কিন্তু আজ আমি আপনার কাছে কোনো ভিক্ষা চাইতে আসিনি। এসেছে সত্যটা আপনার সামনে তুলে ধরতে।"

 

রাফি পকেট থেকে একটি পুরানো ডায়েরি আর কিছু কাগজপত্র বের করে আশরাফ চৌধুরীর সামনের টেবিলে রাখল। এগুলো ছিল আরিফের মৃত্যুর পর রাসেলের কাছ থেকে পাওয়া আরিফের নিজস্ব ডায়েরির পাতা, যেখানে সে তার ভুলের কথা স্বীকার করে লিখে রেখে গিয়েছিল।

 

"আয়রা কোনো অনাথ বা পরিচয়হীন বাচ্চা নয়, চৌধুরী সাহেব," রাফির কণ্ঠস্বর দৃঢ় শোনাল। "ও আমার আপন ভাই আরিফের রক্ত। আর আপনার মেয়ে... যাকে আপনি কলঙ্কিনী মনে করে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিলেন, সে আসলে এক মহীয়সী নারী। আপনার ভণ্ড সমাজের মুখ বন্ধ রাখতে আর আমার পরিবারের মর্যাদা রক্ষা করতে সে নিজের পুরো জীবন বাজি রেখেছিল। আপনার মেয়ে যে ত্যাগ স্বীকার করেছে, তার অর্ধেকের যোগ্য সমাজ তো দূরের কথা, আপনি নিজেও নন।"

 

কথাগুলো শুনে আশরাফ চৌধুরীর হাত কাঁপতে লাগল। সে টেবিলে রাখা কাগজগুলোর ওপর চোখ বোলাতে লাগলেন। প্রতিটি লাইনে ফুটে উঠছিল এক মৃত যুবকের অনুশোচনা আর নীহার অমলিন ত্যাগের গল্প।

 

ঠিক তখনই ছোট্ট আয়রা দৌড়ে গিয়ে আশরাফ চৌধুরীর হাঁটুর কাছে দাঁড়িয়ে তার হাত ধরে বলল, "দাদু, তুমি নানুমণিকে বকছ কেন? নানুমণি তো খুব ভালো!"

 

বাচ্চাটির নিষ্পাপ মুখ আর তার সরল ডাক যেন বরফের মতো শক্ত হয়ে থাকা আশরাফ চৌধুরীর হৃদয়টাকে এক নিমেষে গলিয়ে দিল। উনি ধপ করে সোফায় বসে পড়লেন। উনার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগল। উনি আয়রাকে কোল তুলে নিলেন, তারপর ব্যাকুল চোখে নীহার দিকে তাকালেন।

 

"আমাকে মাফ করে দে মা..." কান্নায় বুজে আসা গলায় বললেন আশরাফ চৌধুরী। "আমি আমার মিথ্যা অহংকারের জন্য তোকে কত কষ্ট দিয়েছি! তোকে চিনতে আমার ভুল হয়েছিল মা..."

 

নীহা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে এগিয়ে গিয়ে বাবার পায়ে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। কত বছর পর সে বাবার ভালোবাসা পেল! রাফি এক পাশে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছিল, তার চোখেও তখন তৃপ্তির জল।

 

তিন দিন পর...

 

কাজী অফিসে খুব সাদামাটাভাবে রাফি আর নীহার আকদ সম্পন্ন হলো। কোনো জাঁকজমক ছিল না, ছিল কেবল গুটিকয়েক প্রিয় মানুষ আর অফুরন্ত ভালোবাসা।

 

বিকেলে শুভ্র মেঘের নিচে ধানমন্ডি লেকের সেই একই বেঞ্চে বসে ছিল রাফি আর নীহা। আজ আর তাদের মাঝে কোনো বিরহের দূরত্ব নেই। আয়রা একটু দূরে লেকের পাড়ে ফড়িং তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল।

 

নীহা রাফির কাঁধে মাথা রেখে উন্মুখ হয়ে বলছিল, "জানো রাফি, আমি মাঝে মাঝে ভাবতাম আমার এই জীবনটা হয়তো একলা কেদেই কেটে যাবে। কিন্তু তুমি এসে আমার পুরো পৃথিবীটা আলো দিয়ে ভরিয়ে দিলে।"

 

রাফি নীহার এক হাত নিজের হাতে তুলে নিয়ে উন্মুখ হয়ে বলল, "আলো তো তুমি এনেছ নীহা। যে ভালোবাসায় বিশ্বাস ছিল, ত্যাগ ছিল—তা কখনো হেরে যেতে পারে না। পাঁচ বছর আগে আমাদের গল্পটা অপূর্ণ থেকে গিয়েছিল, আজ থেকে আমাদের নতুন গল্প শুরু হলো।"

 

রাফি নীহার কপালে দীর্ঘ এক চুমু এঁকে দিল। অস্তগামী সূর্যের সোনাঝরা আলো এসে পড়ল তাদের চো

খেমুখে। দীর্ঘ পথচলা, কষ্ট আর ত্যাগের পর অবশেষে রাফি আর নীহার ভালোবাসার তরী এসে পৌঁছাল তার সঠিক ঠিকানায়।

....
👁 12