শেষ দেখা থেকে চিরমিলন

ঢাকা শহরের বিকেলের আলোটা কেমন যেন ঘোলাটে আর করুণ হয়ে নেমে আসে ধানের ছড়ার মতো নরম মেঘের আড়াল থেকে। এই শহর প্রতিদিন হাজারো ব্যস্ততার গল্প লেখে, আবার চুপিসারে মুছে দেয় বহু নিঃশব্দ হাহাকার। ধানমন্ডির এক নিরিবিলি ক্যাফের কোণের টেবিলটায় বসে ছিল ইমরান। গ্লাসের বরফ-গলা পানির দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হচ্ছিল, তার নিজের জীবনটাও ঠিক ওই বরফকুচির মতোই খুব ধীরে ধীরে গলে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। আঙুলের খাঁজে জ্বলতে থাকা অর্ধেক ধোঁয়া ওঠা সিগারেটটার কথা সে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

তানিয়া আসবে। দীর্ঘ তিন বছর পর তাদের আবার দেখা হতে যাচ্ছে। তিন বছর—যে সময়টা হয়তো মহাকালের কাছে কিছুই নয়, কিন্তু ভালোবাসা আর বিরহের দাঁড়িপাল্লায় মাপতে গেলে প্রতিটা সেকেন্ডকে এক একটা যুগের মতো দীর্ঘ মনে হয়।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

ইমরান আর তানিয়ার গল্পটা অন্য আটদশটা সাধারণ গল্পের মতো ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সবুজ ক্যাফেটেরিয়া, কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে রোদ-ছায়ার খেলা, আর একসাথে হেঁটে যাওয়া বৃষ্টিভেজা রাস্তা—সবকিছুর মাঝে তাদের টানটা ছিল বড্ড বেশি গভীর, বড্ড বেশি উথাল-পাথাল। ভালোবাসার গভীরতা কতটা হতে পারে, তা হয়তো তানিয়াকে না ছুঁলে ইমরান কখনো জানতেও পারত না। কিন্তু আমাদের এই মধ্যবিত্ত সমাজ আর দুই পরিবারের দীর্ঘদিনের আভিজাত্য আর সামাজিক সম্মানের অদৃশ্য দেয়াল তাদের টেনে আলাদা করে দিয়েছিল।

 

ইমরানের কোনো বড় ডিগ্রি বা টাকার পাহাড় ছিল না যা দিয়ে সে তানিয়ার বাবার অহংকারকে কিনে নিতে পারত। তানিয়ার পরিবার তাদের এই সম্পর্কের কথা জানার পর যে ঝড় তুলেছিল, তাতে ভালোবাসার অমূল্য ফসলটুকু রক্ষা করার ক্ষমতা তানিয়ারও ছিল না। শেষপর্যন্ত নিজের পরিবারের অবাধ্য না হতে পেরে, বাবার সম্মান বাঁচাতে তানিয়া এক চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—আলাদা হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত। আর আজ? আজ থেকে ঠিক চারদিন পর তানিয়ার আকদ। এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের বিলেতফেরত ইঞ্জিনিয়ারের সাথে তার জীবন বেঁধে দেওয়া হচ্ছে।

 

হঠাৎ ক্যাফের দরজার বেলটা টুং করে বেজে উঠল। ক্যাফের ঠাণ্ডা বাতাসের সাথে মিশে গেল পরিচিত এক সুবাস—বেলির মৃদু সুবাস আর সুগন্ধি আতরের এক মোলায়েম মিশ্রণ। ইমরান চোখ তুলে তাকাল।

 

দরজায় দাঁড়িয়ে আছে তানিয়া।

 

একমুহূর্তের জন্য মনে হলো পুরো ক্যাফে, আসবাবপত্র, ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজা মৃদু সুর আর আশেপাশের মানুষের কোলাহল—সবকিছু এক নিমেষে থমকে গেছে। সময় যেন তার নিজস্ব গতি হারিয়ে থমকে দাঁড়াল।

 

তানিয়ার পরনে হালকা নীল রঙের একটা জামদানি শাড়ি, আঁচলে সূক্ষ্ম রুপালি সুতোর কাজ। তিন বছর আগের সেই চঞ্চল, চশমা পরা মেয়েটির মধ্যে আজ এক ভারী, পরিপক্ব বিষাদ জমা হয়ে আছে। তার ডাগর দুটি চোখের নিচে স্পষ্ট কালো ছায়া—যে ছায়া বলে দেয় কত শত নির্ঘুম রাত কেটেছে তার চোখের পানি আড়াল করতে করতে। ইমরান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার বুকের ভেতরটা এক অজানা তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে, যেন বহু বছর পর কোনো তৃষ্ণার্ত মরুভূমি একফোঁটা বৃষ্টির ছোঁয়া পেল।

 

তানিয়া ধীর পায়ে এগিয়ে এলো টেবিলের দিকে। ইমরানকে দেখে তার পা জোড়া যেন এক মুহূর্তের জন্য শ্লথ হয়ে এল। তারা দুজন মুখোমুখি দাঁড়াল, কিন্তু কারো মুখেই কোনো ভাষা ফুটল না। ভালোবাসার গভীরতা যেখানে সীমাহীন, সেখানে শব্দেরা খুব অসহায় হয়ে পড়ে।

 

"কেমন আছো, ইমরান?"—তানিয়ার কণ্ঠটা কেঁপে উঠল। খুব মৃদু, যেমন শরতের হাওয়া হুট করে এসে ঝরে পড়া পাতায় কাঁপন ধরিয়ে দেয়।

 

ইমরান একটু বিষাদের হাসি হাসল। যে হাসিতে কোনো আলো নেই, আছে শুধুই এক অদ্ভুত যাতনা। "ভালো থাকা কি আর আমাদের সাজে, তানিয়া? বোসো।"

 

তানিয়া উল্টোপাশের চেয়ারটায় বসল। তার হাত দুটো কানাই কানাই কাঁপছিল। সে শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে চেপে ধরল। ইমরান তার এই অস্থিরতাটুকু খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছিল। এই তো সেই হাত, যা একসময় নিঃসংকোচে ইমরানের হাতের মুঠোয় জমা থাকত। যে হাতের উষ্ণতা ইমরানকে পৃথিবীর সমস্ত ঝড়-ঝাপটা থেকে আড়াল করে রাখত। আজ সেই হাত দুটো কত কাছে, অথচ কত অলঙ্ঘনীয় দূরত্বে অবস্থান করছে!

 

"আমাকে কেন ডেকেছ, ইমরান? আর মাত্র চারদিন বাকি... তুমি জানো আমার বাড়িতে এখন কী অবস্থা? আমি খুব কষ্টে আলো-আঁধারির মাঝে সময় কেটে এখানে এসেছি," তানিয়া নিচের দিকে তাকিয়ে বলল। তার কণ্ঠে অনুযোগের চেয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের আকুতিই বেশি প্রকাশ পেল।

 

"জানি," ইমরান সোজা তানিয়ার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে তাকাতেই তানিয়া কেঁপে উঠল। ইমরানের চোখের গহীনে এক অগাধ সমুদ্র লুকিয়ে আছে—যে সমুদ্রে আজ কোনো অভিমান নেই, শুধু আছে এক বুক তৃষ্ণা আর হারাবার আগে শেষবার আঁকড়ে ধরার ব্যাকুলতা। ইমরান নিচু কণ্ঠে বলল, "আমি জানি তোমার আকদ চারদিন পর। আমি কোনো হট্টগোল করতে চাইনি, তোমার নতুন জীবনে বাধা হতেও আসিনি। কিন্তু তানি, শেষবারের মতো তোমাকে একবার না দেখলে, তোমার ওই চোখের পাজরে আমার নামটা এখনো লেখা আছে কি না না জানলে—আমি হয়তো বাঁচতে পারতাম না।"

 

তানিয়া ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে নিল সে, যাতে কান্নার শব্দ ক্যাফের অন্য কেউ শুনতে না পায়। তার বুকের ভেতরটা দলা পাকিয়ে আসছিল। "কেন করছ এমন? তুমি কেন বোঝো না, আমাদের আর কোনো উপায় ছিল না! আব্বা যদি জানতে পারে আমি আজ তোমার সাথে দেখা করতে এসেছি, তবে তিনি বেঁচে থাকবেন না। আমার যে কোনো পথ খোলা ছিল না, ইমরান!"

 

ইমরান টেবিলের ওপর দিয়ে নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল। আলতো করে তানিয়ার কাঁ his হাত দুটোকে নিজের হাতের উষ্ণতায় গলে যেতে দিল। ছোঁয়া লাগতেই তানিয়া যেন এক বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হরিণীর মতো শিউরে উঠল, কিন্তু তার হাতটা স সরিয়ে নিল না। কতদিন পর এই স্পর্শ! কত কোটি বছর পর যেন দুজন দুটো মন আবার এক বিন্দুতে এসে মিলল।

 

ইমরান তানিয়ার হাত দুটিকে নিজের দুই হাতের মুঠোয় চেপে ধরল। তানিয়ার আঙুলগুলো কাঁপছিল। ইমরান তার থামার জায়গায় আলতো করে নিজের আঙুল বোলাল, তানিয়ার হাতের তালুতে ফুটে থাকা কোমল ত্বকে নিজের স্পর্শের চিহ্ন এঁকে দিতে চাইল।

 

"উপায় সব সময়ই থাকে, তানি," ইমরানের গলার আওয়াজটা আরও গভীর, আরও আবেগাক্রান্ত হয়ে উঠল। "শুধু সাহস রাখতে হয়। তুমি কি সত্যি মনে করো, অন্য কারোর বুকে মাথা রেখে তুমি আমাকে ভুলে থাকতে পারবে? তুমি কি পারবে তোমার এই নরম শরীর, তোমার এই স্পর্শ, তোমার এই মিষ্টি অনুভূতিগুলো অন্য কোনো অচেনা পুরুষের নামে সঁপে দিতে?"

 

তানিয়া চোখ তুলে ইমরানের দিকে তাকাল। তানিয়ার চোখে এখন অশ্রুর প্লাবন, কিন্তু সেই সাথে এক অদ্ভুত উন্মাদনা। ইমরানের এই গভীর কথাগুলো তার বুকের ভেতর একদম শরের মতো গিয়ে বিঁধল। ইমরানের স্পর্শের যে উত্তাপ তার রগে রগে ছড়িয়ে পড়ছিল, তা তাকে মুহূর্তের মধ্যে ফিরিয়ে নিয়ে গেল সেই পুরোনো দিনগুলোয়—যেখানে কোনো ভয় ছিল না, কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না, ছিল শুধুই তাদের একে অপরের প্রতি উম্মাদ ভালোবাসার তীব্র টান।

 

"ইমরান... থামো, দয়া করে থামো," তানিয়া ফিসফিস করে বলল, তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছিল। "তুমি আমাকে দুর্বল করে দিচ্ছ। আমি তো এই সিদ্ধান্তটা মেনে নিয়েছিলাম..."

 

"না, তুমি মেনে নাওনি," ইমরান এবার তানিয়ার হাতটা একটু শক্ত করে টানল। তাদের মুখের দূরত্ব কমে এল অনেকটাই। ক্যাফের আবছা আলোয় ইমরানের চোখের ভেতরের আগ্নেয়গিরিটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল তানিয়া। "তুমি শুধু পালিয়ে যাচ্ছ। তুমি তোমার মনকে মিথ্যা বলছ। তোমার এই চোখ, তোমার এই ভেজা ঠোঁট, তোমার প্রতিটি নিঃশ্বাস এখনো শুধু আমাকেই খোঁজে। বলো, মিথ্যা বলছি?"

 

তানিয়া উত্তর দিতে পারল না। তার ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছিল। ইমরানের গা থেকে আসা অতি পরিচিত সেই তামাক আর পুরুষালি সুবাস তার চেতনাকে ঝাপসা করে দিচ্ছিল। তানিয়ার মনে হলো, সে একটা ঘূর্ণিস্রোতে তলিয়ে যাচ্ছে—যে স্রোত তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ইমরানের নিষিদ্ধ ভালোবাসার এক চরম গভীরে।

 

বাইরে তখন হঠাৎ করেই কালবৈশাখীর মেঘ জমতে শুরু করেছে। বিকালের সোনাঝরা আলো ঢেকে গিয়ে নেমে এসেছে এক কালচে অন্ধকারের চাদর। বাতাসের তোড়ে ক্যাফের কাঁচের জানালাগুলো থরথর করে কেঁপে উঠল। ঢাকা শহরের ওপর নামতে যাচ্ছে এক বিষাদময় ঝড়—ঠিক যেমনটা নেমে এসেছে ইমরান আর তানিয়ার জীবনে।

 

তানিয়া ইমরানের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, চারদিন পরের আকদ, সুসজ্জিত মণ্ডপ, সমাজ, পরিবার—সবকিছু এক নিমেষে ছাই হয়ে যাক। এই মুহূর্তে তার শুধু এই লোকটিকে প্রয়োজন, যে তাকে পাগলের মতো ভালোবাসতে পারে, যে তার অস্তিত্বের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে।

 

ইমরান তানিয়ার চোখের একফোঁটা জল আঙুল দিয়ে মুছে দিল। তার পর আলতো করে তানিয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, "আমাদের এই দেখা হওয়াটা কোনো শেষ নয়, তানি। এটা হয়তো এক নতুন ভুলের শুরু... অথবা সব ভুল শুধরে নেওয়ার শেষ সুযোগ।"

 

তানিয়া চোখ বন্ধ করে ফেলল। ইমরানের ঠোঁটের গরম নিঃশ্বাস তার গালে এসে লাগতেই তার সারাদেহে এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল। তাদের পুরোনো সিদ্ধান্তগুলো, যা এতকাল পাথরের মতো জমে ছিল, হঠাৎ করেই এক তীব্র ভালোবাসার ধাক্কায় গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যেতে শুরু করল।

 

ক্যাফের বাইরে তখন মেঘের গর্জন গাঢ় হয়ে এসেছে। কালবৈশাখীর মাতাল হাওয়া ধানমন্ডির লেকের ধারের গাছগুলোকে মড়মড় শব্দে দুলিয়ে দিচ্ছে। কড়া বিদ্যুৎ চমকানোর আলো কাঁচের দেওয়াল ভেদ করে এসে তানিয়ার মুখটায় ঠিকরে পড়ল। তানিয়া চোখ মেলে ইমরানের দিকে তাকাল। সেই চোখে আর ভয়ের ছায়া নেই, তার জায়গায় খেলা করছে এক আদিম আকুলতা—যে আকুলতা দমন করতে গিয়ে সে এতদিন নিজের আত্মাকে তিল তিল করে মেরে ফেলেছে।

 

"তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ, ইমরান?" তানিয়া নিচু কিন্তু কম্পিত গলায় বলল।

 

ইমরান তার হাত দুটি আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিল। সে তানিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল, "যেখানে আমাদের অতীত আমাদের বিচার করবে না। যেখানে সমাজ আর পরিবারের এই কৃত্রিম নিয়মগুলো বাতাস হয়ে উড়ে যাবে।"

 

ইমরান বিল মিটিয়ে দিয়ে তানিয়াকে নিয়ে ক্যাফে থেকে বের হয়ে এল। বাইরে তখন প্রবল বর্ষণ শুরু হয়ে গেছে। বৃষ্টির মোটা মোটা ফোঁটা রাজপথের পিচকে ভিজিয়ে দিয়ে এক মাতাল মাটির সোঁদা গন্ধ ছড়িয়ে দিচ্ছে চারপাশে। তানিয়া ছাতা খোলার অবকাশ পেল না। বৃষ্টিতে তার শাড়ির আঁচল মুহূর্তের মধ্যে ভিজে গায়ের সাথে সেঁটে গেল। ইমরান তানিয়ার হাত ধ

রে টেনে নিয়ে এল কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা তার পুরনো গাড়িটার দিকে।

গাড়ির পেছনের দরজা খুলে সে তানিয়াকে ভেতরে বসিয়ে দিল এবং নিজেও ঝটপট উঠে বসে দরজাটা সশব্দে বন্ধ করে দিল।

 

বাইরের ঝুম বৃষ্টির শব্দের মাঝে গাড়ির ভেতরটা তখন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। বাইরে জলের ধারা কাঁচের ওপর দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে, যেন বাইরের পুরো পৃথিবীর সাথে তাদের সম্পর্ক কেটে গেছে। গাড়ির আবছা অন্ধকারে তানিয়ার ভিজে যাওয়া শাড়ির ফাঁক দিয়ে উন্মুক্ত হওয়া ত্বকের ওপর বৃষ্টির জলবিন্দুগুলো হিরের টুকরোর মতো জ্বলজ্বল করছিল। তার ভিজে যাওয়া চুলে লেপ্টে থাকা মুখের রূপ দেখে ইমরানের বুকের ভেতরের সুপ্ত তপ্ত শ্বাস আরো দ্রুত হয়ে উঠল।

 

তানিয়া শীতে কাঁপছিল, কিন্তু সে কম্পন শুধু বৃষ্টির জন্য নয়—ইমরানের এত কাছের উপস্থিতি, তার চোখের গভীর চাহনি তানিয়ার প্রতিটা রগে রগে এক অচেনা উত্তাপ জ্বালিয়ে দিচ্ছিল।

 

"ইমরান..." তানিয়া ফিসফিস করে উঠল, তার গলা ধরে এসেছে।

 

ইমরান কোনো কথা বলল না। সে ধীরে ধীরে তানিয়ার দিকে এগিয়ে এল। তার হাতটা গিয়ে থামল তানিয়ার ভেজা গালে। আঙুলের ছোঁয়ায় তানিয়া শিহরিত হয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। ইমরানের বুড়ো আঙুল তানিয়ার ফোলা দুটো ঠোঁটের ওপর ধীরে ধীরে ভেসে চলল। তিন বছর ধরে জমানো সব অভিমান, সব কান্না, আর তীব্র ব্যাকুলতা যেন এই একটি মাত্র স্পর্শে গলে জল হয়ে যেতে চাইল।

 

"তুমি জানো তানি, এই তিনটে বছর আমি প্রতিদিন কীভাবে মরেছি?" ইমরানের গলার আওয়াজ ভারী হয়ে এল। তার তপ্ত নিঃশ্বাস তানিয়ার কানের লতিতে এসে লাগতেই তানিয়া শিউরে উঠে ইমরানের শার্টের কলারটা দুই হাতে আঁকড়ে ধরল।

 

"আমি চেষ্টা করেছিলাম ইমরান... আমি قسم খেয়ে বলছি, আমি তোমাকে ভুলে থাকার অনেক চেষ্টা করেছি," তানিয়ার চোখ দিয়ে আবার জলের ধারা গড়িয়ে পড়ল, যা মিশে গেল বৃষ্টির জলের সাথে। "কিন্তু যতবার আমি চোখ বন্ধ করেছি, ততবার আমি শুধু তোমার এই ছোঁয়া, তোমার এই কণ্ঠ আর তোমার এই গভীর চোখের ভালোবাসাই দেখতে পেয়েছি। আব্বা আমাকে মেরে ফেললেও হয়তো আমি এত কষ্ট পেতাম না, যত কষ্ট আমি তোমার থেকে দূরে থেকে পেয়েছি।"

 

ইমরান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে তানিয়ার ভেজা মুখখানা নিজের দুই হাতের তালুতে তুলে নিয়ে তার কপালে এক দীর্ঘ, গভীর চুমো আঁকল। সেই স্পর্শে যেন তানিয়ার আত্মায় এক অদ্ভুত তৃপ্তি নেমে এল। তানিয়া নিজের মাথাটা ইমরানের চওড়া বুকের ওপর রেখে দিল। ইমরানের হৃদস্পন্দনের দ্রুত ধুকপুকানি তানিয়ার কান ছুঁয়ে যাচ্ছিল—যে শব্দটা একসময় তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়ের জায়গা ছিল।

 

ইমরানের হাতের স্পর্শ এবার নেমে এল তানিয়ার পিঠের উন্মুক্ত অংশে, শাড়ির আঁচল সামান্য সরে গিয়ে যেখানে বৃষ্টির শীতল জল জমা হয়েছিল। ইমরানের হাতের চরম উত্তাপে তানিয়ার গায়ের কাঁটা দিয়ে উঠল। সে ইমরানের বুকে নিজের মুখটা আরো গভীরভাবে লুকিয়ে ফেলল।

 

"আমাকে নিয়ে চলো ইমরান... আমাকে এই মিথ্যে বন্ধন থেকে বাঁচাও," তানিয়া ফিসফিস করে বলল, তার প্রতিটি শব্দে ছিল আত্মসমর্পণের তীব্র আকুতি। "চারদিন পর আমি যার হতে যাচ্ছি, তাকে আমি কখনো ভালোবাসতে পারব না। আমার এই মন, আমার এই শরীর—সবকিছু তো বহু আগেই তোমার হয়ে গেছে। তুমি ছাড়া অন্য কারোর স্পর্শ আমাকে অপবিত্র করে দেবে।"

 

ইমরান তানিয়ার চিবুক ধরে মুখটা ওপরে তুলল। তার চোখে এখন ভালোবাসার সাথে সাথে এক প্রতিজ্ঞার আগুন জ্বলছে। সে আলতো করে তানিয়ার ভেজা ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। এক চরম উত্তেজনায় তানিয়ার চোখ বন্ধ হয়ে গেল, তার আঙুলগুলো ইমরানের চুলে জড়িয়ে গেল গভীর আকর্ষণে। বহু বছরের জমা বিরহ, না পাওয়ার যন্ত্রণা আর তীব্র ভালোবাসার তৃষ্ণা যেন সেই একটি দীর্ঘ চুম্বনে উপচে পড়ল।

 

গাড়ির বাইরে কালবৈশাখীর তোড় বাড়ছিল, আর গাড়ির ভেতরে দুটি ভাঙা মন এক নতুন আবেগের সমুদ্রে তলিয়ে যাচ্ছিল। তানিয়া ভুলেই গিয়েছিল চারদিন পরের আকদের কথা, তার বাবার প্রতিশ্রুতির কথা, আর সমাজের রক্তচক্ষুর কথা। তার কাছে এখন সত্য বলতে শুধু ইমরানের এই বাহুডোর, এই বুকের ধুকপুকানি আর তাদের অনির্বাণ ভালোবাসার গভীর অনুভূতি।

 

ইমরান তানিয়ার ঠোঁট থেকে নিজের ঠোঁট সরিয়ে নিয়ে তার চোখের দিকে তাকাল। তানিয়ার চোখের গভীরে এখন শুধুই নির্ভরতা।

 

"যদি আমি তোমাকে আজ রাতে নিয়ে দূরে কোথাও পালিয়ে যাই?" ইমরান তানিয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, "যদি আমি তোমাকে আর কখনো এই বিষাক্ত শহরের আলোয় ফিরতে না দিই?"

 

তানিয়া ইমরানের হাত দুটো নিজের বুকের কাছে টেনে নিয়ে চেপে ধরল। তার কাঁপতে থাকা ঠোঁটে ফুটে উঠল এক ম্লান কিন্তু তৃপ্তির হাসি। "তবে সেটাই হবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় মুক্তি। তুমি যেখানে নিয়ে যাবে, আমি সেখানেই যাব... শুধু আমাকে আর কখনো ছেড়ে যেও না।"

 

কিন্তু তাদের এই আবেগের জোয়ারের মাঝেই হঠাৎ করে বাজে তানিয়ার ফোনটা। গাড়ির নীরবতা ভেঙে দিয়ে ফোনের রিংটোনটা যেন এক নির্দয় বাস্তবতার চাবুক হয়ে তাদের ওপর আছড়ে পড়ল। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে—'আব্বা'।

 

ফোনের কর্কশ সুরটা গাড়ির ভেতরের তপ্ত আর গভীর আবহকে এক নিমেষে গুঁড়ো গুঁড়ো করে দিল। স্ক্রিনের আলোর দিকে তাকিয়ে তানিয়ার মুখ থেকে রক্ত নিংড়ে নেওয়া ফ্যাকাশে ভাব ফুটে উঠল। 'আব্বা' নামটা যেন কোনো ভালোবাসার বন্ধন নয়, বরং এক অদৃশ্য শিকল, যা তাকে প্রতিনিয়ত টান মেরে ফিরিয়ে আনে এক নির্মম বাস্তবতায়।

 

ইমরান তানিয়ার কাঁপতে থাকা হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় আরও শক্ত করে চেপে ধরল। সে দেখতে পাচ্ছিল, তানিয়ার চোখের সেই ব্যাকুল আলোটা কীভাবে ধীরে ধীরে ভয়ের গভীর তিমিরে তলিয়ে যাচ্ছে।

 

"ফোনটা ধরো, তানি," ইমরান নিচু কিন্তু শান্ত স্বরে বলল।

 

তানিয়া কাঁপতে থাকা আঙুলে কলটা রিসিভ করে কানে তুলল। ওপাশ থেকে তার বাবার কড়া আর উদ্বিগ্ন কণ্ঠ ভেসে এল, "তানিয়া! কোথায় তুমি? বাইরে এমন ঝড়-বৃষ্টি, আর তোমার কোনো খোঁজ নেই! গাড়িচালক জানাল সে তোমাকে ক্যাফের সামনে নামিয়ে দিয়ে আসার পর থেকে তোমাকে খুঁজে পাচ্ছে না। মাঝরাস্তায় কোথায় আটকে আছ?"

 

তানিয়া ঢোক গিলল। ইমরানের বুক থেকে মাথা সরিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে বসল সে, কিন্তু ইমরানের ডান হাতটা তখনো তানিয়ার কোমর পেঁচিয়ে তার ভিজে যাওয়া জামদানির ওপর এক উষ্ণ স্পর্শ রেখে গেছে। সেই স্পর্শ তানিয়াকে সত্য বলতে বাধা দিচ্ছিল।

 

"আব্বা... আমি এক বান্ধবীর সাথে আছি," তানিয়া নিজের গলার কাঁপন ঢাকার প্রাণপণ চেষ্টা করল। "বৃষ্টির জন্য গাড়ি পাচ্ছিলাম না। একটু পর বাড়ি ফিরছি।"

 

"তাড়াতাড়ি ফেরো। তোমার শাশুড়ি আর রিয়াদ ফোন করেছিল। ওরা কাল সকালে আসাদ এভিনিউয়ের বাড়িটায় এসে তোমার সাথে বাকি কেনাকাটার ব্যাপারে কথা বলতে চায়। এই সময়ে বাইরে থাকা একদম ঠিক নয়। ড্রাইভারকে পাঠাচ্ছি, তুমি কোথায় আছ বলো?"

 

"না না আব্বা! ড্রাইভার পাঠাতে হবে না, আমি নিজেই চলে আসছি," তানিয়া দ্রুত বলে ফোনটা কেটে দিল।

 

ফোন রেখে তানিয়া স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে বসে থাকা ইমরানের দিকে তাকাল। বাইরে বৃষ্টির বেগ কিছুটা কমে এসেছে, কিন্তু তাদের মনের ভেতরের ঝড়টা তখন দ্বিগুণ শক্তিতে রূপ নিয়েছে। 'রিয়াদ'—তানিয়ার হবু বরের নামটা উচ্চারণ না হলেও অদৃশ্য এক ছায়ার মতো তাঁদের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে।

 

"রিয়াদ..." ইমরান বিড়বিড় করে নামটা বলল। তার কণ্ঠে তীব্র তিক্ততা। সে তানিয়ার দিকে মুখ ফেরাল। "তুমি কি সত্যিই ওই অচেনা লোকটার কাছে নিজেকে বিলিয়ে দিতে পারবে, তানি? কাল সকালে যে এসে তোমার ওপর নিজের অধিকার ফলাবে? তোমার এই নরম চুলে হাত রাখবে, তোমার এই ভেজা ঠোঁটে নিজের নিঃশ্বাস ফেলবে... তুমি সহ্য করতে পারবে?"

 

"ইমরান, দয়া করে এমন করে বোলো না!" তানিয়া চিৎকার করে উঠল, তার গলা কান্নায় বুজে এল। সে ইমরানের শার্টের কলারটা ধরে নিজের দিকে টানল। তাদের মুখের দূরত্ব আবার কমে শূন্যে নেমে এল। "তুমি কি মনে করো আমি স্বর্গে আছি? প্রতিদিন রাতে যখন আমি ভাবি যে অন্য কেউ আমাকে ছোঁবে, আমার গা শিউরে ওঠে! আমার দম বন্ধ হয়ে আসে! আমি শুধু তোমার ইমরান... শুধু তোমার!"

 

তানিয়া আর নিজের আবেগ সংবরণ করতে পারল না। সে ইমরানের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল—এক মাতাল, বিশৃঙ্খল আর তীব্র আবেগে। এই চুম্বনে কোনো সামাজিক নিয়মের ভয় ছিল না, ছিল শুধুই না পাওয়ার হাহাকার আর এক চরম ব্যাকুলতা। ইমরানও তানিয়াকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল প্রচণ্ড শক্তিতে। তার হাতের আঙুলগুলো তানিয়ার ভিজে থাকা খোলা চুলে পেঁচিয়ে গেল। তানিয়ার পিঠের উন্মুক্ত ত্বকে ইমরানের তপ্ত হাতের স্পর্শ লেগে এক অচেনা আগুনের সৃষ্টি হলো।

 

গাড়ির পেছনের সিটে দুজন দুটো তৃষ্ণার্ত প্রাণ যেন বহু যুগ পর একে অপরকে খুঁজে পেল। তানিয়ার নিঃশ্বাসের গতি দ্রুত হয়ে উঠেছিল, তার বুকের ওঠা-নামা ইমরানের বুকের সাথে ধাক্কা খাচ্ছিল। তানিয়া ইমরানের কানে ফিসফিস করে বলল, "আমাকে তোমার করে নাও ইমরান... অন্তত এই একটা রাতের জন্য। চারদিন পর যা-ই ঘটুক না কেন, এই রাতটা যেন আমার পুরো জীবনের তৃষ্ণা মিটিয়ে দেয়।"

 

ইমরানের হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তানিয়ার এই আত্মসমর্পণ তাকে এক গভীর দোলাচলে ফেলে দিল। তার ভেতরে থাকা পুরুষটি তানিয়াকে এখনই সম্পূর্ণ নিজের করে নিতে চাচ্ছে, কিন্তু তার সত্য ভালোবাসা তানিয়াকে কোনো ভুলের সাগরে ডুবিয়ে দিতে রাজি হচ্ছিল না।

 

ইমরান তানিয়ার মুখখানা নিজের দুই হাতের তালুতে নিয়ে আলতো করে পিছিয়ে এল। তানিয়ার ভেজা চোখে তখন নেশাতুর এক গভীর আকুতি।

 

"না, তানি," ইমরান হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, তার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছিল। "এক রাতের ভিক্ষা আমি তোমার কাছ থেকে চাই না। আমি তোমাকে সারাজীবনের জন্য চাই। তোমাকে এই লুকিয়ে, ভয়ের ছায়ায় নিজের করে নিলে আমি তোমার বাবার মতোই অন্যায় করব।"

 

"তাহলে কী করবে তুমি?" তানিয়া ডুকরে কেঁদে উঠল। "তুমি কি আমাকে ওই লোকটার হাতে সঁপে দেবে?"

 

"কখনোই না," ইমরানের কণ্ঠে এক চরম প্রতিজ্ঞার সুর ফুটল। সে তানিয়ার চোখের জল আলতো করে নিজের ঠোঁট দিয়ে শুষে নিল। "কাল সকালে তুমি যখন আসাদ এভিনিউয়ের বাড়িতে কেনাকাটার জন্য যাবে, আমি সেখানে থাকব। আমি তোমার বাবার মুখোমুখি হব, রিয়াদের মুখোমুখি হব। সব সত্যি তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলব।"

 

তানিয়া আতঙ্কে শিউরে উঠল। "তুমি জানো না আব্বা কী করতে পারে! সে তোমাকে ধ্বংস করে দেবে, ইমরান! আমাদের পরিবার সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না!"

 

"যে সমাজে ভালোবাসার কোনো দাম নেই, সেই সমাজের মুখের তোয়াক্কা আমি করি না," ইমরান তানিয়ার কপালে নিজের ঠোঁট রাখল দীর্ঘক্ষণ। "যদি কাল তুমি আমার হাত ধরে সবার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারো যে তুমি আমাকে চাও, তবে পৃথিবীর কোনো শক্তি আমাদের আলাদা করতে পারবে না। কিন্তু যদি তুমি কাল ভয় পাও... তবে কালই হবে আমাদের শেষ দেখা।"

 

তানিয়া ইমরানের দিকে চেয়ে রইল। ইমরানের বাঘের মতো দৃঢ় চোখ দুটো তাকে এক অদ্ভুত শক্তি দিচ্ছিল, আবার একই সাথে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছিল।

 

বৃষ্টি এখন অনেকটাই থেমে এসেছে। গাড়িটা ধানমন্ডির সড়ক ছেড়ে তানিয়াদের বাড়ির গলির মুখে এসে থামল।

 

তানিয়া গাড়ির দরজা খোলার আগে শেষবারের মতো ইমরানের দিকে তাকাল। ইমরানের স্পর্শের উত্তাপ তখনো তার সারা শরীরে জ্যান্ত হয়ে রয়েছে। তানিয়া ইমরানের হাতটা নিজের গালে চেপে ধরে বলল, "আমি আসব, ইমরান। কাল আমি সব বাধা ভেঙে তোমার কাছে আসব। কিন্তু যদি না পারি... তবে বুঝে নিও তানিয়া আর বেঁচে নেই।"

 

তানিয়া গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত বাড়ির ভেতরে চলে গেল। ইমরান অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল, তার বুকে

জ্বলতে থাকা ভালোবাসার আগুন আর কালকের অনিশ্চিত যুদ্ধের ভয় তাকে গ্রাস করতে লাগল।

পরদিন সকালের সূর্যটা ধানমন্ডির আকাশ জুড়ে এক অদ্ভুত তপ্ত রোদ ছড়িয়ে দিল। গতকাল রাতের ঝড়ের কোনো চিহ্ন যেন আর রাজপথে নেই, কিন্তু তানিয়ার বুকের ভেতর কালবৈশাখী তার আসল তাণ্ডব শুরু করেছে।

 

আসাদ এভিনিউয়ের দ্বিতল অভিজাত বাড়িটি রিয়াদদের। হালকা সোনালি রঙের কাঁচের জানালায় রোদের আলো প্রতিফলিত হয়ে এক চোখধাঁধানো আভিজাত্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। বাড়ির ভেতরের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ড্রয়িংরুমে দামি চামড়ার সোফায় বসে আছেন তানিয়ার বাবা শওকত সাহেব, উল্টোপাশে রিয়াদ এবং তার মা। রিয়াদের পরনে সুতির হালকা নীল শার্ট, মুখে মার্জিত হাসি। কিন্তু সেই হাসির পেছনে এক চরম আভিজাত্যের অহংকার স্পষ্ট।

 

তানিয়া ঘরে ঢুকে একপাশে গিয়ে বসল। তার পরনে লালচে বেগুনী রঙের শাড়ি। কাল রাতের নির্ঘুম রাত আর ইমরানের স্পর্শের স্মৃতি তার মনকে তীব্রভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। তার বুকের ভেতরটা দড়দড় করে কাঁপছিল—ইমরান কি সত্যি আসবে? সে কি এই সমাজের বড় বড় সিংহদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের অধিকার দাবি করার দুঃসাহস দেখাবে?

 

"তানিয়া, তোমার শরীরটা কি খারাপ?" রিয়াদের মিষ্টি কিন্তু কৃত্রিম কণ্ঠ তানিয়ার চিন্তার সুতো ছিঁড়ে দিল। "তোমাকে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছে। কাল রাতের ঝড়ে কোনো সমস্যা হয়নি তো?"

 

"না... আমি ঠিক আছি," তানিয়া নিচু স্বরে উত্তর দিল, নিজের চোখের কোল আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে।

 

ঠিক তখনই দরজার বাইরের বেলটা বেজে উঠল।

 

তানিয়ার বুকের ভেতরে যেন একটা বড়সড় ভূমিকম্প হয়ে গেল। সে চকিতে দরজার দিকে তাকাল। কাজের লোক গিয়ে দরজা খুলে দিতেই ভেতরে প্রবেশ করল ইমরান।

 

সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট পরনে, মুখজুড়ে হালকা দাড়ি আর চোখের গভীরে এক শান্ত কিন্তু দৃঢ় আগ্নেয়গিরি। ইমরানের উপস্থিতি যেন মুহূর্তের মধ্যে ড্রয়িংরুমের অভিজাত ঠাণ্ডা বাতাসকে এক তপ্ত তাপে ভরিয়ে দিল।

 

শওকত সাহেব চমকে উঠলেন। তিনি চশমাটা নাকের ওপর সোজা করে ধরে রাগে কটমট করে তাকিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। "তুমি! এখানে তুমি কী করছ, ইমরান? তোমার সাহস তো কম নয়! এই বাড়িতে তুমি ঢোকার অনুমতি পেলে কীভাবে?"

 

রিয়াদ আর তার মা অবাক হয়ে শওকত সাহেবের এই আকস্মিক রাগের কারণ বোঝার চেষ্টা করছিলেন। রিয়াদ প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে ইমরানের দিকে তাকাল।

 

ইমরান কারো রাগকে পাত্তা দিল না। সে ধীর পায়ে ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি সোজা গিয়ে পড়ল তানিয়ার ওপর। তানিয়াও চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু সেই চোখে আজ আর শুধু ভয় নয়, আছে এক গভীর ব্যাকুলতা আর নির্ভরতা।

 

"আমি কোনো অনধিকার প্রবেশ করতে আসিনি, শওকত সাহেব," ইমরানের কণ্ঠস্বর অসম্ভব গম্ভীর আর পরিষ্কার শোনালো। "আমি এসেছি চারদিন পর হতে যাওয়া এই প্রহসনের বিয়েটা থামাতে। আর এসেছে তানিয়ার প্রতি আমার ভালোবাসার শেষ জবাব চাইতে।"

 

"চুপ করো!" শওকত সাহেব চিৎকার করে উঠলেন, তার হাতের লাঠিটা মেঝেতে ঠুকে দিয়ে। "একদম মুখ সামলে কথা বলো! রিয়াদ, এই ছেলেটা একটা বখাটে... একসময় তানিয়াকে উত্ত্যক্ত করত। ওর কোনো যোগ্যতা নেই আমার মেয়ের দিকে তাকানোর।"

 

"উত্ত্যক্ত করতাম?" ইমরান একটা বিষাদের কিন্তু শক্ত হাসি হাসল। সে এবার রিয়াদের দিকে ঘুরল। "শুনুন রিয়াদ সাহেব, আপনার কাছে হয়তো শওকত সাহেবের এই নাম-ডাক আর সম্পত্তি অনেক বড় পরিচয়। কিন্তু আপনার এই হবু স্ত্রী—তানিয়া, আপনাকে ভালোবাসে না। তার মন, তার আত্মা আর তার প্রতিটি নিঃশ্বাস বহু বছর আগে আমার নামে সঁপে দেওয়া হয়ে গেছে।"

 

"ইমরান! থামো!" তানিয়া ডুকরে কেঁদে উঠল, কিন্তু তার কণ্ঠে এবার ইমরানের নামটা এক অদ্ভুত ভালোবাসায় ধ্বনিত হলো।

 

রিয়াদের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল, তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে তানিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, "তানিয়া, এসব কী শুনছি? কে এই লোক? আর ও যা বলছে তা কি সত্যি?"

 

ঘরের মধ্যে থমথমে নীরবতা নেমে এল। ড্রয়িংরুমের এসি থেকে আসা ঠাণ্ডা বাতাসও যেন জমাট বেঁধে গেছে। শওকত সাহেব তানিয়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে তার হাত শক্ত করে চেপে ধরলেন। "তানিয়া! বলো একে! বলো তুমি একে চেনো না! বলো এটা মিথ্যা! নতুবা আজ আমি এই ঘরেই নিজের মাথায় গুলি করব!"

 

তানিয়া তার বাবার লাল হয়ে যাওয়া চোখের দিকে তাকাল, তারপর তাকাল ইমরানের দিকে।

 

ইমরান হাত দুটি বাড়িয়ে দিল তানিয়ার দিকে। ইমরানের সেই চোখে কাল রাতের মতো কোনো ছলনা নেই, আছে শুধু এক গভীর সমুদ্রের আহ্বান। "তানি, কাল রাতে তুমি আমাকে বলেছিলে, তুমি মুক্ত হতে চাও। তুমি বলেছিলে অন্য কারোর ছোঁয়া তোমাকে অপবিত্র করে দেবে। আজ সময় এসেছে বেছে নেওয়ার—তোমার জীবনের ভীরু সত্যি, নাকি বাবার এই কৃত্রিম সম্মান?"

 

তানিয়া থরথর করে কাঁপছিল। তার সামনে এখন দুটো রাস্তা। একপাশে বাবার মিথ্যা মর্যাদা আর সারাজীবনের জন্য এক মৃত আত্মার অস্তিত্ব, আর অন্যপাশে ইমরানের বুক—যেখানে আছে খাঁটি ভালোবাসা, রোমাঞ্চ, উন্মাদনা আর চরম সততা।

 

তানিয়া নিজের হাতটা বাবার মুঠো থেকে এক নিমেষে ছাড়িয়ে নিল।

 

শওকত সাহেব চমকে উঠলেন। "তানিয়া?!"

 

তানিয়া ধীর পায়ে এগিয়ে গেল ইমরানের দিকে। প্রতিটি পদক্ষেপে তার ভেতরের ভীরু মেয়েটি মরে গিয়ে জন্ম নিচ্ছিল এক সম্পূর্ণ প্রেমে উন্মাদ নারী। সে গিয়ে দাঁড়াল ইমরানের একদম মুখোমুখি। ইমরানের শার্টের কলারটা নিজের দুই হাতে শক্ত করে চেপে ধরে সে ইমরানের চোখে চোখ রাখল।

 

"আমি অনেক ভুল করেছি ইমরান... আমি অনেক পালিয়েছি," তানিয়ার গলার আওয়াজ কাঁপছিল, কিন্তু তার চোখে তখন জ্বলছিল এক দুর্নিবার ভালোবাসার আগুন। "আর না। আজ এই পৃথিবীর সামনে আমি সত্যিটা মেনে নিচ্ছি—আমি শুধু তোমাকেই ভালোবাসি। তোমাকে ছাড়া এই রিয়াদ কিংবা অন্য যেকোনো পুরুষের স্পর্শ আমার কাছে মৃত্যুর চেয়েও ভয়ানক।"

 

কথাটা শেষ করেই তানিয়া ইমরানকে জড়িয়ে ধরল সবার সামনে। ঘরের ভেতরের কাল্পনিক সামাজিক নিয়মগুলো যেন কাঁচের মতো চুরমার হয়ে গেল। ইমরানের বুকের সাথে নিজের বুক মিলিয়ে তানিয়া যেন খুঁজে পেল তার আসল ঠিকানা।

 

ইমরানও দুই হাত দিয়ে তানিয়ার কোমর পেঁচিয়ে তাকে নিজের শরীরের সাথে শক্ত করে পিষে ধরল। তাদের এই গভীর, অনমনীয় আলিঙ্গন ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সবাইকে স্তব্ধ করে দিল।

 

"তানিয়া!" শওকত সাহেব নিজের বুকে হাত দিয়ে সোফায় বসে পড়লেন, তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। রিয়াদ চরম অপমানে আর রাগে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল, আর তার মা গালাগালি দিতে দিতে পিছু নিল।

 

ইমরান তানিয়ার চিবুক ধরে তার মুখটা ওপরে তুলল। তারপর সবার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আলতো করে তানিয়ার ভেজা ঠোঁটে এঁকে দিল এক তীব্র, আধিপত্যকামী চুমু। তানিয়া চোখ বন্ধ করে ইমরানের বাহুডোরে হারিয়ে গেল—সব ভয়, সব দ্বিধা পেছনে ফেলে।

 

শওকত সাহেবের বুক চেপে ধরে সোফায় বসে পড়া, রিয়াদের বিষাক্ত দৃষ্টি নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া—সবকিছু আসাদ এভিনিউয়ের সেই প্রাসাদোপম বাড়ির দেওয়ালে এক অচেনা ভীতি ছড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ইমরান আর তানিয়ার কাছে তখন পৃথিবীর আর কোনো কিছুরই অস্তিত্ব ছিল না।

 

শওকত সাহেবের তীব্র চিৎকার আর আত্মীয়দের ভর্ৎসনাকে পেছনে ফেলে ইমরান তানিয়ার হাত ধরে সেই ঘর থেকে বের হয়ে এল। তানিয়া পেছনে ফিরে তাকায়নি। যে বাঁধন এতকাল তাকে তিল তিল করে শেষ করে দিচ্ছিল, তা ছিন্ন করার পর তার ভেতরে আর কোনো অপরাধবোধ অবশিষ্ট ছিল না; ছিল শুধুই এক অদ্ভুত হালকা অনুভূতি আর ইমরানের ছোঁয়ায় ফুটে ওঠা এক মাতাল তৃপ্তি।

 

ঢাকা শহরের তপ্ত রোদ পেরিয়ে ইমরানের পুরোনো গাড়িটা ছুটিয়ে চলল শহরের সীমানা ছাড়িয়ে এক নিভৃত প্রান্তের দিকে। মুন্সীগঞ্জের কাছে মেঘনা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এক নিরিবিলি কটেজে এসে গাড়ি থামল। ইমরান তানিয়াকে নিরাপদ রাখতে আর কিছু সময়ের জন্য এই কোলাহলময় দুনিয়া থেকে আড়াল করতে আগে থেকেই এই জায়গার ব্যবস্থা করে রেখেছিল।

 

কটেজের চারপাশে বিশাল বিশাল মেহগনি আর বটগাছ। সামনেই মেঘনার প্রকাণ্ড রূপালী জলরাশি হাওয়া ভেসে ভেসে কটেজের বারান্দায় আছড়ে পড়ছে। বিকাল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যার রূপালী আর বেগুনি আলো নদীর জলে এক অচেনা সৌন্দর্য তৈরি করেছে।

 

তানিয়া কটেজের কাঠের ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। তার জামদানির আঁচল নদীর বাতাসে উড়ছিল। ইমরান পেছন থেকে এসে ধীর পায়ে দাঁড়াল। সে তানিয়ার কোমর পেঁচিয়ে তার পেটের ওপর নিজের দুটো শক্ত হাত রাখল, আর তার থুতনিটা এনে স্থাপন করল তানিয়ার কাঁধে।

 

তানিয়া নিজের মাথাটা পেছনে হেলিয়ে দিল ইমরানের বুকের ওপর। ইমরানের কানের কাছে থাকা উষ্ণ নিঃশ্বাস তার ঘাড়ে এক শিহরণ ছড়িয়ে দিল।

 

"ভয় করছে, তানি?" ইমরান ফিসফিস করে তানিয়ার কানের লতিতে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল।

 

তানিয়া চোখ বন্ধ করে ফেলল। ইমরানের হাতের আঙুলগুলো তার শাড়ির ভাঁজ ভেদ করে উন্মুক্ত কোমর আর পেটের ত্বকে আলতো করে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। সেই স্পর্শের উত্তাপ তানিয়ার রগে রগে এক মাতাল করা দোলা দিল।

 

"ভয়?" তানিয়া ঘুরল ইমরানের দিকে। তার দুই হাত উঠে এল ইমরানের ঘাড়ে। সে ইমরানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "যখন তোমার কাছে ছিলাম না, তখন প্রতিটা মুহূর্ত মৃত্যুকে ভয় পেতাম। আজ তোমার বাহুডোরে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, মৃত্যু এলেও আমি হেসে তাকে জড়িয়ে নিতে পারব। আমি শুধু একটা জিনিসই জানি ইমরান... আমি আর কখনো ওই অন্ধকার জগতে ফিরব না।"

 

ইমরান তানিয়ার উন্মুক্ত কপালে, তারপর চিবুকে নিজের ঠোঁটের চিহ্ন একে দিল। তানিয়ার শরীর শিউরে উঠল। চারদিনের অনিশ্চয়তা, পরিবারের অপমান আর সমাজচ্যুত হওয়ার সমস্ত গ্লানি তারা ধুয়ে মুছে ফেলতে চাইল এই নিভৃত রাতের নিস্তব্ধতায়।

 

কটেজের ঘরের ভেতর একটি মাত্র আবছা হলুদ বাতি জ্বলছিল। বাইরে রাতের অন্ধকার ঘন হওয়ার সাথে সাথে মেঘনার জলরাশির গর্জন আরও গভীর হচ্ছিল। ঘরের ভেতরের শীতল বাতাসের মাঝে তাদের দুজনের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ এক ভারী আবহ তৈরি করল।

 

ইমরান তানিয়াকে পাঁজা কোল তুলে নিয়ে গিয়ে বসাল খাটের ওপর। তানিয়ার চোখের গভীরে তখন এক অনির্বাণ তৃষ্ণা। সে নিজেই ইমরানের শার্টের বোতামগুলো একে একে খুলতে শুরু করল। তার কাঁপতে থাকা আঙুলগুলোর ছোঁয়া লাগতেই ইমরানের বুকের ভেতরের আগুনটা দ্বিগুণ শক্তিতে জ্বলে উঠল।

 

ইমরান তানিয়ার চুলে ঢাকা মুখখানা আলতো করে ধরল, তারপর তার ঠোঁটে ঠোঁট রেখে এক দীর্ঘ, মাতাল চুম্বনে হারিয়ে গেল। তানিয়ার পুরো শরীর ইমরানের বাহুডোরে নুয়ে পড়ল। ইমরানের তপ্ত হাতের স্পর্শ তানিয়ার পিঠের উন্মুক্ত অংশ থেকে শাড়ির আঁচল সরিয়ে দিল। তাদের প্রতিটি স্পর্শে ছিল না পাওয়ার সব আক্ষেপ মিটিয়ে নেওয়ার এক প্রচণ্ড তীব্রতা।

 

"তুমি শুধুই আমার, তানি," ইমরান উন্মাদের মতো ফিসফিস করে বলল, তার ঠোঁট তখন তানিয়ার গাল, ঘাড় আর কানের পেছনের অংশ উন্মত্তের মতো ছুঁয়ে যাচ্ছিল।

 

"আমি তোমারই, ইমরান... তোমারই ছিলাম, তোমারই থাকব," তানিয়ার গলা রুদ্ধ হয়ে এল এক চরম সুখ আর আবেগে। সে ইমরানের চুলে আঙুল চালিয়ে তাকে আরও গভীরে নিজের কাছে টেনে নিল।

 

সেই রাতে মুন্সীগঞ্জের ওই ছোট্ট কটেজে সমাজ, পরিবার আর কোনো কৃত্রিম বাধ্যবাধকতা তাদের ছুঁতে পারল না। দুজন তৃষ্ণার্ত প্রেমিক-প্রেমিকা তাদের প্রেম আর শারীরিক চরম আসক্তিতে এক হয়ে গেল। বিরহের তপ্ত মরুভূমির পর তারা যেন এক অতল সমুদ্রে ডুব দিল।

 

কিন্তু রাতের অন্ধকার যখন শেষের দিকে, আর ভোরের আলো ফোটবার মুখে, ঠিক তখনই কটেজের বাইরে হঠাৎ বেশ কয়েকটি গাড়ির ব্রেক কষার কর্কশ শব্দ নীরবতা চুরমার করে দিল। দরজা ধাক্কানোর বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে গেল তানিয়া আর ইমরানের।

 

কটেজের দরজায় যেন কোনো হিংস্র পশুর আক্রমণ শুরু হয়েছে। কাঠ ফাটানো বিকট শব্দের সাথে সাথে ভেসে এল শওকত সাহেবের গম্ভীর চিৎকার আর একাধিক অপরিচিত পুরুষের গলা। বাইরে গাড়ির হেডলাইটের প্রখর আলো কটেজের জানালার কাঁচ ভেদ করে ঘরের ভেতর এক রক্তিম আবহ তৈরি করছিল।

 

তানিয়া দ্রুত চাদরটা গায়ে জড়িয়ে বুক চেপে ধরে উঠে বসল। তার চোখে রূপ নিয়েছে এক চরম আতঙ্ক। কাল রাতের প্রেম, স্পর্শ আর অনাবিল শান্তির রাজ্য যেন এক মুহূর্তেই কাঁচের টুকরোর মতো ভেঙে ছিন্নভিন্ন হতে চলেছে।

 

"ইমরান! ওরা আমাদের খুঁজে পেয়েছে!" তানিয়ার গলা কাঁপছিল, তার ঠোঁট দুটো ফ্যাকাশে হয়ে এসেছে। "আব্বা পুলিশ আর গুন্ডা নিয়ে এসেছে... ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে!"

 

ইমরান বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। দ্রুত নিজের শার্টটা গায়ে গলিয়ে নিয়ে সে তানিয়ার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। তানিয়ার থরথর করে কাঁপতে থাকা দুটো হাত নিজের হাতের শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে সে সোজা তার চোখের দিকে তাকাল। ইমরানের চোখে আজও কোনো ভয় নেই, সেখানে ঝুলছে এক অপ্রতিরোধ্য সংকল্পের জ্যোতি।

 

"আমার দিকে তাকাও, তানি," ইমরান শান্ত কিন্তু বজ্রকঠিন স্বরে বলল। "কাল রাতে তুমি আমাকে তোমার জীবনের শেষ ঠিকানা বানিয়েছ। আজ যদি মৃত্যুও আমার সামনে এসে দাঁড়ায়, তবে সে আমাকে তোমার থেকে আলাদা করতে পারবে না। শুধু আমাকে বিশ্বাস করো।"

 

ইমরান তানিয়ার কপালে এক দীর্ঘ, গভীর বিশ্বাসী চুমু এঁকে দিল। তারপর তানিয়াকে নিজের পেছনের আগলে রেখে সে ধীর পায়ে গিয়ে কটেজের প্রধান দরজার হুকটা এক টানে খুলে দিল।

 

দরজা খুলতেই হুড়মুড় করে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করল কয়েকজন সশস্ত্র পুরুষ। সবার সামনে দাঁড়িয়ে শওকত সাহেব। লাল হয়ে যাওয়া চোখ, উস্কোখুস্কো চুল আর হাতে শক্ত করে ধরা একখানা লোহার ছড়ি। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন স্থানীয় থানার কজন পুলিশ কর্মকর্তা আর রিয়াদের কিছু নিজস্ব ক্যাডার।

 

"হারামজাদা! তোর এত বড় সাহস!" শওকত সাহেব গর্জে উঠলেন। তিনি লাঠি তুলে ইমরানের দিকে এগোতে চাইলেন, কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তা তাকে হাত ধরে থামিয়ে দিলেন।

 

"অফিসার! এই লোকটা আমার মেয়েকে অপহরণ করেছে! ওকে গুলি করুন, নতুবা পুলিশ কেসে আমি আপনাদের নাম ঢুকিয়ে দেব!" শওকত সাহেব উন্মত্তের মতো চিল্লাচ্ছিলেন।

 

ইমরান এক চুলও নড়ল না। সে পুলিশের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে বলল, "অফিসার সাহেব, আমি কোনো অপরাধ করিনি। কাউকে অপহরণও করিনি। আপনি নিজে গিয়ে ভেতরের মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করুন, সে নিজের ইচ্ছায় এসেছে কি না।"

 

তানিয়া ধীর পায়ে ইমরানের পাশে এসে দাঁড়াল। তার জামদানির আঁচল লুটোপুটি খাচ্ছিল মাটিতে, কিন্তু তার চেহারায় কাল রাতের সেই ভয় আর ছিল না। সে শওকত সাহেবের দিকে তাকাল। সেই চোখে আর বাবার প্রতি ভীরু আনুগত্য নেই, আছে এক একজন পূর্ণাঙ্গ নারীর নিজের অধিকার রক্ষার সাহস।

 

"আব্বা," তানিয়ার গলার আওয়াজ পুরো ঘরটাকে স্তব্ধ করে দিল। "আমাকে ইমরান জোর করে আনেনি। আমি নিজের ইচ্ছায়, নিজের ভালোবাসার টানে ওর সাথে এসেছি।"

 

"চুপ কর অসতী!" শওকত সাহেব হাত তুললেন মারার জন্য। "তুই আমার সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিস! ওই রিয়াদের পরিবার আমাদের মুখে থুথু দিয়ে চলে গেছে! এখনো সময় আছে, তুই ঘরে চল... আমি তোকে বিষ খাইয়ে মারব, তাও এই ভিখারির হাতে সঁপে দেব না!"

 

"আমি কোথাও যাব না," তানিয়া এক পা এগিয়ে এসে ইমরানের হাতটা শক্ত করে নিজের আঙুলে পেঁচিয়ে নিল। "তুমি যাকে সম্মান বলো, তা আসলে তোমার অহংকার আর সমাজের মিথ্যে মুখোশ! যে সম্পর্কে কোনো ভালোবাসা নেই, সেখানে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার চেয়ে এই নদীর জলে ডুবে মরাও ভালো। আমি ইমরানের স্ত্রী হিসেবে মরে যেতে রাজি, কিন্তু তোমার ওই রিয়াদের অর্ধাঙ্গিনী হয়ে এক মুহূর্তও বাঁচব না!"

 

পুলিশ কর্মকর্তা পরিস্থিতি বুঝতে পেরে শওকত সাহেবের দিকে ফিরে বললেন, "স্যার, মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক। ও যদি নিজের ইচ্ছায় এই যুবকের সাথে এসে থাকে, তবে আমরা এই ছেলেকে গ্রেপ্তার করতে পারি না। এটা আইনি অপরাধ হবে।"

 

"আইন?!" শওকত সাহেব ফুঁসে উঠলেন। "আমার টাকার সামনে তোমার এই আইন ধুলোর মতো উড়ে যাবে!"

 

"টাকা দিয়ে আপনি সমাজ কিনতে পারেন শওকত সাহেব, কিন্তু তানিয়ার মন কোনোদিন কিনতে পারেননি," ইমরান এবার শওকত সাহেবের একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। তাদের চোখের লড়াই শুরু হলো। "আপনি আমাদের আলাদা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ভু

লে গিয়েছিলেন যে খাঁটি ভালোবাসা কোনো শিকলে বন্দি থাকে না। আজ তানিয়া আমার। আপনি চাইলেও আর কোনোদিন এই বাঁধন ভাঙতে পারবেন না।"

তানিয়া নিজের ব্যাগ থেকে একটা সাদা কাগজ বের করে শওকত সাহেবের দিকে বাড়িয়ে দিল। কাল রাতেই তারা মুন্সীগঞ্জের কাজি ডেকে তাদের আকদ সম্পন্ন করে নিয়েছিল—যেখানে কোনো আড়ম্বর ছিল না, ছিল শুধুই দুটো আত্মার এক হয়ে যাওয়ার এক পবিত্র কাবিননামা।

 

কাগজটার দিকে তাকিয়ে শওকত সাহেবের হাত থেকে লোহার ছড়িটা খসে পড়ল। তিনি যেন এক নিমেষে দশ বছর বয়স্ক এবং নিঃশ্ব হয়ে গেলেন। তার অহংকারের প্রকাণ্ড অট্টালিকা ধুলোয় মিশে গেল। তিনি আর একটি শব্দও উচ্চারণ না করে ধীরে ধীরে পেছনের দিকে হেঁটে গিয়ে গাড়িতে উঠলেন। বাকি ক্যাডার আর পুলিশও এক এক করে কেটে পড়ল।

 

ভোরের রক্তিম আলো তখন মেঘনা নদীর শান্ত বুকে সোনা ছড়িয়ে দিতে শুরু করেছে। পাখির কলকাকলিতে বাতাস মুখরিত হয়ে উঠেছে।

 

কটেজের বারান্দায় এসে দাঁড়াল ইমরান আর তানিয়া। নদীর শীতল হাওয়া তাদের গায়ে এসে এসে ধাক্কা মারছিল।

 

তানিয়া নিজের মাথাটা ইমরানের চওড়া বুকের ওপর এলিয়ে দিল। ইমরান তার এক হাত দিয়ে তানিয়ার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল, আর অন্য হাতে তানিয়ার থুতনি তুলে ধরে তার ভেজা, মেটে গোলাপি ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মেলাল। এই চুম্বনে আর কোনো ভয়ের তাড়াহুড়ো ছিল না, ছিল সারাজীবনের এক নিশ্চিত আশ্রয়ের সুখ আর অনন্ত রোমাঞ্চ।

 

"আমরা জিতে গেলাম, তাই না ইমরান?" তানিয়া ইমরানের ঠোঁটের ওপর ফিসফিস করে বলল।

 

ইমরান তানিয়ার চোখে চোখ রেখে এক মিষ্টি হাসি হাসল। "না তানি, আমরা জিতিনি... আমাদের ভালোবাসা জয়ী হয়েছে। এই শহরের বিষাক্ত অন্ধকার হারিয়ে গেছে, আর আমাদের সামনে এখন শুধুই এক নতুন ভোরের আলো।"

 

তারা দুজন হাত ধরে দাঁড়িয়ে রইল নদীর তীরে। সামনের দিগন্ত জুড়ে ছড়িয়ে থাকা নতুন সকালের সোনাঝরা রোদে রচিত হলো তাদের এক অমর আর অবিচ্ছেদ্য ভালোবাসার শেষ অধ্যায়।

....
👁 12