অপরাধ স্বীকারের রাত

ঢাকা শহরের যানজট যখন ক্লান্তিতে রূপ নেয়, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামে, তখন সাব্বির আর মুনিয়ার ছোট নীল রঙের ড্রয়িং রুমটায় নেমে আসে এক অদ্ভুত নীরবতা। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে খটমট তাদের নতুন কিছু নয়। কখনও সাব্বিরের অফিসের কাজে দেরি করে ফেরা, কখনও মুনিয়ার বানিয়ে রাখা চা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, কিংবা সাব্বিরের একটু অমনোযোগ—এসব নিয়েই মুনিয়ার কাঁচের গ্লাসের মতো অভিমান জমতে থাকে। কিন্তু সাব্বির খুব ভালো করেই জানে মুনিয়ার সেই অভিমান ভাঙানোর কৌশল। একটু পিছু ধাওয়া করা, একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরা, আর ঠোঁটের ছোঁয়ায় তার বিষাদকে নিমিষে উড়িয়ে দেওয়া—সাব্বির কখনও মুনিয়াকে নিজের থেকে দূরে বেশি সময় থাকতে দেয় না।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

কিন্তু আজকের সন্ধ্যাটা অন্যরকম। আজ যে ঝগড়াটা হয়েছে, তা অন্য দিনগুলোর মতো সাধারণ নয়। সাব্বিরের পুরনো এক সহকর্মীর সঙ্গে অতিরিক্ত হাসিখুশি আলাপ আর মুনিয়াকে কথা দিয়েও একসাথে সময় না দেওয়াটা মুনিয়ার ভেতরের আত্মসম্মান ও অধিকারবোধে প্রকাণ্ড আঘাত হেনেছে। মুনিয়া কোনো চেঁচামেচি করেনি, রাগ দেখায়নি; শুধু নিজের ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে সাব্বিরের দিকে এমন এক দৃষ্টিতে তাকিয়েছে, যার মধ্যে ছিল গভীর কষ্ট আর প্রত্যাখ্যান। এরপর সে সোজা গিয়ে বেডরুমের দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিয়েছে।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

রাত এগারোটা। পুরো অ্যাপার্টমেন্ট নিঝুম। বাইরে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে, জানালার কাচে ফোঁটা ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ার এক ঝমঝম শব্দ পুরো ঘর ছেয়ে ফেলেছে। সাব্বির সোফায় বসে বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টা করেছিল নিজের কাজ করতে, কিন্তু তার নজর আর মন—দুটোই বারবার আটকে যাচ্ছিল বেডরুমের বন্ধ দরজাটার দিকে। বুকের ভেতর একটা তীব্র খালি ভাব, একধরনের অচেনা ভয় আর গভীর আকুলতা তাকে তাড়া করে ফিরছে। সে আর সহ্যের সীমা রাখতে পারল না। সোফা থেকে উঠে সে সোজা হেঁটে গেল ঘরের দরজার সামনে।

 

দরজায় কয়েকবার মৃদু কড়া নাড়ল সাব্বির।

"মুনিয়া... দরজাটা খোলো না, প্লিজ? কথা বলো একবার।"

 

ভেতর থেকে কোনো উত্তর এল না। মুনিয়ার এই স্তব্ধতা সাব্বিরকে আরও অস্থির করে তুলল। সে পকেট থেকে মাস্টার কি বের করে অত্যন্ত সাবধানে লক ঘুরিয়ে দরজাটা খুলল।

 

ঘরের ভেতরের পরিবেশটা সম্পূর্ণ থমথমে। টিমটিম করে জ্বলছে বেডসাইড ল্যাম্পের হালকা হলুদ আলো, যা ঘরের আবহকে আরও রহস্যময় আর গাঢ় করে তুলেছে। মুনিয়া বারান্দার খোলা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইরের হালকা বৃষ্টির ছাঁট আর ঠান্ডা বাতাস এসে তার পরনের পাতলা সুতির হালকা নীল শাড়িটাকে একদম গায়ের সঙ্গে জড়িয়ে ধরেছে। খোলা চুলগুলো তার পিঠের ওপর ভিজে এলমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে। বৃষ্টির ছাঁটে তার ঘাড়, গলার ভাঁজ আর পিঠের ওপর জলের ছোট ছোট ফোঁটা চকচক করছে।

 

সাব্বির নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে তার ঠিক পেছনে দাঁড়াল। মুনিয়ার শরীর থেকে ভেসে আসা ভিজে শ্যাম্পুর সুবাস আর বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ মিলিয়ে এক মাতাল করা মাতম তৈরি করেছে সাব্বিরের স্নায়ুতে। সাব্বির আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে পেছনে থেকে আস্তে করে মুনিয়ার উন্মুক্ত কোমরে দুহাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

 

মুনিয়া চমকে উঠে এক ধাক্কায় সাব্বিরকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, "ছাড়ো সাব্বির! আমার একদম কাছে আসবে না। দূরে থাকো!"

 

কিন্তু সাব্বির আজ পিছু হটার পাত্র নয়। সে তার দুহাত দিয়ে মুনিয়ার কোমর আরও শক্ত করে চেপে ধরে তাকে নিজের বুকের সঙ্গে একবারে মিশিয়ে নিল। সাব্বিরের তপ্ত নিঃশ্বাস এসে পড়তে লাগল মুনিয়ার কাঁধ আর ভিজে ঘাড়ের ওপর।

 

"কোথায় দূরে যাব, বলো? তুমি রাগ করলে আমার পুরো পৃথিবীটা থমে যায় মুনিয়া," সাব্বির তার গভীর, ভারী গলায় বিড়বিড় করে বলল।

 

"তোমার কোনো অজুহাত আজ আমি শুনব না! তোমার এই প্রতিদিনের একই নাটক আমি আর সহ্য করতে পারছি না," মুনিয়া কড়া গলায় বলতে চাইলেও তার গলার স্বর কাঁপছিল। সাব্বিরের শরীরের তপ্ত উত্তাপ আর এই গভীর উপস্থিতি তার শরীরের প্রতিটা শিরায় এক ধরনের অদ্ভুত শিহরণ জাগাচ্ছিল।

 

সাব্বির ধীরে ধীরে মুনিয়ার ভিজে চুলগুলো সরাতে সরাতে তার ঠোঁট দুটো এনে রাখল মুনিয়ার ঘাড়ের ঠিক নরম খাঁজটায়। এক অতৃপ্ত, গভীর চুমু বসিয়ে দিল সেখানে। মুনিয়ার শরীরটা মুহূর্তের মধ্যে শিউরে উঠল, সে দুচোখ বন্ধ করে ফেলে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল যাতে মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের না হয়ে যায়।

 

"সাব্বির... না...", খুব ক্ষীণ শোনালো মুনিয়ার প্রতিবাদ।

 

সাব্বির মুনিয়াকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। বেডসাইড ল্যাম্পের সেই আবছা আলোয় মুনিয়ার অভিমানী, ভেজা চোখ দুটো অপার্থিব সুন্দর লাগছিল। তার কাঁপতে থাকা পাতলা ঠোঁট দুটোতে যেন জমা হয়ে আছে সব না-বলা আক্ষেপ। সাব্বির এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে মুনিয়ার চিবুকটা একটু উঁচিয়ে ধরে সরাসরি নিজের ঠোঁট চেপে ধরল মুনিয়ার নরম ঠোঁটের ওপর।

 

প্রথমে মুনিয়া একটু প্রতিরোধ করার চেষ্টা করল, সাব্বিরের বুক ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইল। কিন্তু সাব্বিরের ব্যাকুল আর তৃষ্ণার্ত ভেজানো আদর তাকে নিমিষেই দুর্বল করে ফেলল। সাব্বির পরম আবেগে, গভীর ভালোবাসায় মুনিয়ার ঠোঁট দুটো চুষে নিতে লাগল। তার এক হাত মুনিয়ার পিঠের শাড়ির আঁচল সরিয়ে খালি চামড়ায় চেপে বসাল, অন্য হাত দিয়ে চেপে রাখল মুনিয়ার মাথার পেছনে, যাতে সে কোনোভাবেই দূরে সরতে না পারে।

 

বৃষ্টির শব্দ আর দুজনের তপ্ত নিঃশ্বাসের শব্দে ঘরটা ভারী হয়ে উঠল। সাব্বির তার জিভ দিয়ে মুনিয়ার ঠোঁটের নরম কোণগুলো ভিজিয়ে দিয়ে গভীরতর এক চুমুতে ডুব দিল। মুনিয়া আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, তার হাতের মুঠো শিথিল হয়ে জড়িয়ে ধরল সাব্বিরের চওড়া কাঁধ। সাব্বিরের এই উন্মাদ ভালোবাসা, এই গভীর আকুলতা মুনিয়ার ভেতরের সমস্ত অভিমানের দেওয়াল গুঁড়িয়ে দিতে চাইছে।

 

সাব্বির ধীরে ধীরে চুমুটা নামিয়ে আনল মুনিয়ার থুতনি, গাল হয়ে তার গলার খাঁজে। তার তপ্ত ঠোঁট আর কামড় মুনিয়ার উন্মুক্ত বুকের ওপর ভিজে থাকা শাড়ির সীমানা ছাড়িয়ে চামড়ায় এক ধরনের শিহরণ আর জ্বালা তৈরি করছিল। মুনিয়া হালকা একটা আর্তনাদ করে উঠে সাব্বিরের চুলে আঙুল গলিয়ে দিয়ে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল।

 

"তুমি খুব খারাপ সাব্বির... খুব খারাপ..." মুনিয়া সাব্বিরের বুকের ওপর মাথা রেখে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।

 

সাব্বির মুনিয়াকে এক ঝটকায় বাহুডোরে তুলে নিয়ে গিয়ে সোজা বিছানায় শুইয়ে দিল। নিজের ভারী শরীর দিয়ে মুনিয়াকে সম্পূর্ণ ঢেকে ফেলে তার চোখের দিকে তাকাল সাব্বির। সাব্বিরের চোখে আজ কেবল কামনার আগুন নয়, তার চেয়েও অনেক বেশি জমে আছে মুনিয়াকে হারানোর এক তীব্র ভয় আর ভালোবাসা।

 

মুনিয়ার বুকের ওঠা-নামা সাব্বিরের বুকের সঙ্গে তাল মেলাচ্ছে। সাব্বির পরম আদরে মুনিয়ার কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল, তারপর তার ভেজা গাল বেয়ে নেমে এসে আবার চেপে ধরল সেই রসালে ঠোঁটে। কিন্তু এবার আর শুধু শারীরিক আকর্ষণ নয়, মুনিয়ার চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা জলের জলচ্ছাপ।

 

চুমুর মাঝেই সাব্বির টের পেল সেই নোনতা স্বাদ। সে থামল। আবছা আলোয় দেখল মুনিয়ার চোখে জল। প্রতিবার এমন আদরে মুনিয়ার অভিমান গলে যায়, কিন্তু আজ যেন এই গভীর প্রেমের ভেতরেও এক গভীর কষ্ট আটকে আছে। মুনিয়া সাব্বিরের চোখের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল, "তুমি ভেবেছ প্রতিবার আমাকে এভাবে জড়িয়ে ধরে আর চুমু খেয়ে মন ভুলিয়ে দেবে? কিন্তু আমার মনের ভেতরের ক্ষতে তোমার এই আদরের মীনাবাজার কী সত্যিই কোনো মলম লাগাতে পারছে সাব্বির? তুমি কি সত্যিই বুঝতে পারছ আমি ঠিক কতটা ভেঙে পড়েছি?"

 

সাব্বির স্তব্ধ হয়ে গেল। মুনিয়ার এই কথাটা যেন একটা তীক্ষ্ণ ছুরির মতো তার বুকে গিয়ে বিধল। প্রতিবার সে এভাবেই তার গভীর শারীরিক আর মানসিক আবেগ দিয়ে মুনিয়াকে ফিরিয়ে আনে, কিন্তু আজ প্রথমবার সে মুনিয়ার চোখের জলে নিজের চরম ব্যর্থতা দেখতে পেল। সাব্বির বুঝতে পারল, এবারের ঝড়টা শুধু গভীর আদরে থামবে না; এই সম্পর্কের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া ভুলটাকে শোধরাতে তাকে এমন কিছু করতে হবে যা সে আগে কখনও করেনি—নিজের ইগো ভুলে প্রথমবার সম্পূর্ণ ভুল স্বীকার করা।

 

সাব্বির মুনিয়ার ওপর থেকে সামান্য সরে এসে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।

 

ভোরের কালচে আলো যখন বারান্দার গ্রিল গলে বেডরুমে এসে পড়ল, তখনো ঢাকার আকাশ মেঘলা। বাইরে ঝিরঝির করে বৃষ্টি ঝরছে। বিছানার একপাশে শুয়ে আছে মুনিয়া, দেয়ালের দিকে মুখ করে। আর সাব্বির বসে আছে বিছানার এক কোণে, দুহাতে মাথা চেপে।

 

গতকালের রাতের সেই চরম উত্তাপ আর আবেগঘন মুহূর্তগুলোর পরেও মনের ভেতরের জমাট বাঁধা পাথরটা একটুও সরেনি। সাব্বির ভেবেছিল প্রতিবারের মতো কাল রাতেও মুনিয়াকে বুকের মধ্যে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, তার ঠোঁটে ঠোঁট রেখে সব দূরত্ব মুছে দেবে। কিন্তু মুনিয়া কাল রাতে যে নোনতা জলটুকু ফেলেছিল, তা সাব্বিরের হৃদয়ে গভীর দাগ কেটে গেছে। প্রথমবার সে বুঝতে পারল, শারীরিক সান্নিধ্য আর গভীর ভালোবাসা দিয়ে সব ক্ষতে প্রলেপ দেওয়া যায় না, যখন বিশ্বাসের কিংবা সম্মানের জায়গায় ঘা লাগে।

 

সাব্বির ধীরে ধীরে মুনিয়ার দিকে তাকাল। মুনিয়া হয়তো ঘুমাচ্ছে না, শুধু চোখ বন্ধ করে পড়ে আছে। তার এলোমেলো চুলগুলো বালিশে ছড়িয়ে আছে, পরনের শাড়িটা এখনও খানিকটা অমলিন। সাব্বির ঝুঁকে এসে মুনিয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে নরম গলায় ডাকল, "মুনিয়া... চা খাবে?"

 

মুনিয়া কোনো উত্তর দিল না। নিজের শরীরটা আরও একটু গুটিয়ে নিল কেবল।

সাব্বির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। রান্নাঘরে গিয়ে নিজ হাতে চা বানাল সে। মুনিয়া চায়ে একটু চিনি বেশি পছন্দ করে, আর এলাচের সুবাস। সাব্বির নিখুঁতভাবে চা বানিয়ে দুটি কাপ ট্রেতে করে ঘরে নিয়ে এলো। বেডসাইড টেবিলে কাপ রেখে সে মুনিয়ার পাশে গিয়ে বসল। খুব সাবধানে মুনিয়ার খালি কাঁধে হাত রাখল। মুনিয়ার চামড়া এখনো রাতের সেই উষ্ণ শিহরণ ধরে রেখেছে, কিন্তু তার মনের দূরত্ব এখন শত মাইল।

 

"মুনিয়া, প্লিজ আর এভাবে চুপ করে থেকো না। তুমি আমাকে বকো, গালাগাল করো, কিন্তু এই স্তব্ধতা আমি সহ্য করতে পারছি না," সাব্বির তার আকুল কণ্ঠ লুকাতে পারল না।

 

মুনিয়া আস্তে আস্তে চোখ খুলল। তার চোখের কোল দুটো ফোলা, সারারাত না ঘুমানোর ছাপ স্পষ্ট। সে বিছানায় উঠে বসল। আঁচলটা টেনে বুকে জড়িয়ে নিয়ে সাব্বিরের দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন কত অচেনা এক মানুষ সামনে বসে আছে।

 

"তুমি সত্যি বুঝতে পারছ না সাব্বির, নাকি বোঝার ভান করছ?" মুনিয়ার কণ্ঠস্বর শান্ত, কিন্তু তীক্ষ্ণ। "তুমি ভাবো, তোমার ওই তীব্র ভালোবাসা, আমাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরা, আর আমার ঠোঁটে তোমার ঠোঁট চেপে ধরে সব ভুলিয়ে দেওয়াটাই জীবনের সব? ভালোবাসা কি শুধু বেডরুমের ওই চার দেয়ালের উন্মাদনাতেই আটকে থাকে?"

 

সাব্বির থমকে গেল। "আমি তো তোমাকে ভালোবাসি মুনিয়া! কাল রাতেও আমি তো তোমাকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে..."

 

"কাল রাতে তুমি যা করেছ, তা তোমার অধিকারের প্রকাশ ছিল সাব্বির, কিন্তু আমার কষ্টের মলম ছিল না!" মুনিয়া সাব্বিরের চোখে চোখ রেখে বলল। "কালকে পার্টিতে সবার সামনে তোমার ওই সহকর্মীর সঙ্গে আমার উপস্থিতিকে যেভাবে এড়িয়ে গেলে, যেভাবে আমাকে একা দাঁড় করিয়ে রেখে তুমি ঘন্টার পর ঘন্টা গল্পে মেতে রইলে—তাতে আমার আত্মসম্মানে কতটা আঘাত লেগেছে তুমি টের পেয়েছ? আমি তোমার স্ত্রী, কোনো খেলনা নই যে রাতে ঘরে এসে একটু আদর করলেই আমার সব অপমান দূর হয়ে যাবে।"

 

মুনিয়ার এই সোজা কথাগুলো সাব্বিরের অহংকারে সোজাসুজি আঘাত করল। পুরুষালি ইগো চট করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। সাব্বির কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বলল, "তুমি ছোট বিষয়কে বড় করছ মুনিয়া! ও আমার পুরনো বন্ধু, বহু দিন পর দেখা। তাই বলে তুমি আমাকে এভাবে অভিযুক্ত করবে? আর রাতে আমি তো তোমার কাছেই এসেছি, অন্য কোথাও যাইনি!"

 

মুনিয়া এক তিক্ত হাসি হাসল। "ঐ তো! তুমি এখনো ভাবছ ভুলটা আমার। তুমি মনে করছ আমি অহেতুক ঈর্ষা করছি। তুমি তোমার ভুলটা দেখতেই পাচ্ছ না।"

 

মুনিয়া বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে পড়ল। "আমি কয়েকদিনের জন্য নিজের মতো থাকতে চাই সাব্বির। আমি আমার আম্মার বাসায় যাচ্ছি।"

 

"কী বললে?!" সাব্বির ঝটকা দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। "তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে? সামান্য একটা কথা নিয়ে তুমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে?"

 

সাব্বির এক পা এগিয়ে এসে মুনিয়ার দুটো বাহু শক্ত করে ধরে ফেলল। মুনিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে সাব্বিরের ভেতরের সুপ্ত কাম আর হারানোর ভয় একসাথে জেগে উঠল। সে মুনিয়াকে নিজের বুকের সাথে দেয়াল ঘেঁষে চেপে ধরল।

 

"তুমি কোথাও যাবে না মুনিয়া! আমি তোমাকে যেতে দেব না," সাব্বিরের গলার স্বর ভারী আর রুদ্ধ হয়ে এলো। সে মুনিয়ার ঘাড়ের কাছে নিজের মুখটা গুজে দিল। তার তপ্ত নিঃশ্বাস মুনিয়ার খোলা বুকের চামড়ায় গিয়ে আঁচড় কাটল। সাব্বিরের হাত মুনিয়ার কোমরের ভাঁজে চেপে বসল, গভীর আকুলতায় সে মুনিয়ার ঠোঁটে আবার নিজের অধিকার বসাতে চাইল।

 

কিন্তু এবার মুনিয়া নিজেকে সমর্পণ করল না। সে সাব্বিরের বুকে হাত দিয়ে পুরো শক্তি দিয়ে তাকে ঠেলে সরিয়ে দিল।

 

"থামো সাব্বির!" মুনিয়া চিৎকার করে উঠল না, কিন্তু তার কণ্ঠের গাম্ভীর্য সাব্বিরকে থমকে দিল। "আজ আর তোমার এই শরীরী ভালোবাসার জালে আমি জড়াব না। তুমি যদি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো, তবে আমার মনকে সম্মান করতে শেখো। শুধু আমার শরীরকে জয় করে তুমি আমাকে ধরে রাখতে পারবে না।"

 

মুনিয়ার চোখের সেই কঠিন দৃষ্টি দেখে সাব্বির স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত দুটি শিথিল হয়ে পাশে নেমে এলো। জীবনে প্রথমবার সাব্বির অনুভব করল, মুনিয়া তার খুব কাছে দাঁড়িয়ে থেকেও কত শত আলোকবর্ষ দূরে সরে গেছে।

 

মুনিয়া আলমারি খুলে একটা ছোট ব্যাগ গোছাতে শুরু করল। সাব্বির নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল। তার ভেতরের সমস্ত অহংকার, রাগ আর উত্তেজনা যেন এক মুহূর্তে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। কিন্তু তার জায়গায় এক বিশাল শূন্যতা এসে চেপে বসল। সে মুনিয়াকে ভালোবাসে, তাকে ছাড়া তার অস্তিত্ব কল্পনা করা অসম্ভব। কিন্তু প্রতিবার নিজের ভুল ঢেকে রাখা আর জোর করে আবেগ চাপিয়ে দেওয়ার অভ্যাসটা আজ তাকে এই চরম সত্যের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে।

 

মুনিয়া ব্যাগটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। বারান্দা দিয়ে বৃষ্টি তখন আরও অঝোরে ঝরছে। দরজার গোড়ায় দাঁড়িয়ে মুনিয়া একবার পেছনে তাকাল।

 

"আমি চলে যাচ্ছি সাব্বির। যেদিন তুমি বুঝতে পারবে জোর করে জয় করা আর ভালোবেসে সম্মান জানানোর মধ্যে পার্থক্য কী, সেদিন হয়তো আমার কাছে এসো।"

 

দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। এক গভীর নীরবতা গ্রাস করল পুরো ড্রয়িং রুমটাকে। সাব্বির ধপ করে সোফায় বসে পড়ল। ঘর ভর্তি মুনিয়ার সুবাস, তার স্পর্শের স্মৃতি—কিন্তু মুনিয়া নেই। সাব্বির নিজের বন্ধ হাতের দিকে তাকাল। যে হাত কাল রাতেও মুনিয়ার উন্মুক্ত শরীরকে তৃষ্ণার্তের মতো স্পর্শ করেছিল, আজ সেই হাত দুটো একদম খালি।

 

মুনিয়া চলে যাওয়ার পর টানা তিনটে দিন কীভাবে কেটেছে, সাব্বির তা নিজেও গুনে বলতে পারবে না। ড্রয়িংরুমের সোফায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে তার জামাকাপড়, সিঙ্কে জমে আছে এঁটো কাপ-ডিস, আর পুরো বেডরুমটায় যেন এক নিঃশ্বাসের ভারী নীরবতা জাঁকিয়ে বসেছে। ঢাকা শহরের ব্যস্ত রাস্তাঘাট, গাড়ির হর্ন, বৃষ্টির একঘেয়ে শব্দ—কোনো কিছুই আর সাব্বিরের কান পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না। তার মাথায় শুধু ঘুরপাক খাচ্ছে মুনিয়ার শেষ কথাগুলো: "শুধু আমার শরীরকে জয় করে তুমি আমাকে ধরে রাখতে পারবে না।"

 

সাব্বির চিরকাল বিশ্বাস করে এসেছে, ভালোবাসা মানেই একধরনের তীব্র আকর্ষণ, অধিকারবোধ আর আবেগ দিয়ে অন্যকে নিজের করে রাখা। মুনিয়া অভিমান করলে সে তাকে কাছে টেনে নিত, তার নরম শরীরে নিজের অধিকার ফুটিয়ে তুলে সব অভিযোগ ভুলিয়ে দিত। কিন্তু এবার যেন মুনিয়া তার সমস্ত পুরোনো হিসেব-নিকাশ এক লহমায় ওলটপালট করে দিয়ে গেছে।

 

রাত বারোটা। আকাশে হালকা মেঘ থাকলেও বৃষ্টি থামেনি। সাব্বির বেডরুমে গিয়ে বসেছে। আলো নেভানো, শুধু জানালার বাইরে দিয়ে আসা রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো এসে পড়েছে ড্রেসিং টেবিলের আয়নায়। সেখানে এখনও রাখা আছে মুনিয়ার লিপস্টিক, ক্লিপ, আর টিপ। সাব্বির ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। ড্রেসিং টেবিলে হাত রাখতেই তার মনে পড়ে গেল মুনিয়ার সেই মন মাতানো সুবাসের কথা।

 

সে আর সহ্য করতে পারল না। সোজা হেঁটে গেল মুনিয়ার আলমারির দিকে। কাঁচের পাল্লাটা খুলতেই ভেতরে গুছিয়ে রাখা মুনিয়ার শাড়িগুলোর ওপর তার নজর আটকে গেল। সাব্বির কাঁপা হাতে একটা গাঢ় লাল রঙের ঢাকাই জামদানি শাড়ি বের করে আনল। এই শাড়িটা পরে মুনিয়াকে যখন প্রথম দেখেছিল, সাব্বিরের নিঃশ্বাস আটকে এসেছিল।

 

শাড়িটা নাকের কাছে এনে শক্ত করে চেপে ধরল সাব্বির। মুনিয়ার প্রিয় পারফিউম আর তার গায়ের এক অদ্ভুত মিষ্টি সুবাস এখনও লেগে আছে কাপড়ের প্রতিটা সুতোয়। সাব্বির এক অদ্ভুত উন্মাদনায় চোখ বন্ধ করল। তার মনে হতে লাগল, মুনিয়া যেন খুব কাছেই দাঁড়িয়ে আছে।

 

হঠাৎই এক প্রবল কাম আর হাহাকার এসে গ্রাস করল সাব্বিরকে। সে শাড়িটা বুকে চেপে ধরে বিছানায় শুয়ে পড়ল। নিজের দুচোখ বুজে সে কল্পনা করতে লাগল মুনিয়ার সেই মায়াবী উপস্থিতি। মুনিয়ার খোলা চুল, তার নরম চিবুক, গলার নিচে কামড় বসালে তার মৃদু কুঁকড়ে যাওয়া—সবকিছু যেন সাব্বিরের স্নায়ুতে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। সাব্বির শাড়ির আঁচলটা নিজের মুখে চেপে ধরে বিড়বিড় করে উঠল, "মুনিয়া... তুমি কেন বুঝছ না, আমি তোমাকে কতটা চাই? আমার শরীর, মন—সবকিছু যে তোমার জন্য ছটফট করছে..."

 

বিছানায় গড়াতে গড়াতে সাব্বির শাড়িটা দিয়ে নিজের মুখ আর বুক ঢেকে ফেলল। মুনিয়ার খালি পিঠের স্পর্শ, তার পাতলা ঠোঁটের উষ্ণতা, কোমরের খাঁজে সাব্বিরের আঙুলের সেই অনায়াস যাতায়াত—প্রতিটা স্মৃতি আজ স্মৃতির চেয়েও বেশি জীবন্ত আর যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠেছে। সাব্বিরের শ্বাস দ্রুত হয়ে এলো, বুকের তরঙ্গ যেন বাঁধ ভাঙতে চাইছে। সে উন্মাদ হয়ে শাড়ির কাপড়ে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল, ঠিক যেমনটা সে মুনিয়ার ঠোঁটে ধরত।

 

কিন্তু কয়েক মুহূর্তের সেই চরম উত্তেজনার পর যখন সাব্বির চোখ খুলল, দেখল হাতে ধরা শুধুই একখণ্ড নিথর কাপড়। বিছানার পাশটা খালি, ঘরটা শুনশান।

 

এক তীব্র সত্যি হঠাৎ এসে আঘাত করল তার বুকে। এই আকুলতা, এই শরীরী তৃষ্ণা—সবটাই একতরফা! আজ মুনিয়া পাশে নেই, আর এই কাপড়ের সুবাস তাকে এক ফোঁটাও আরাম দিতে পারছে না। উল্টে এক গাঢ় অনুশোচনা তার গলা টিপে ধরল।

 

সাব্বির শাড়িটা বুকে জড়িয়ে ধরে ধপ করে বিছানার ওপর বসে পড়ল। তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল জল।

 

না, এটা ভালোবাসা হতে পারে না। শুধু নিজের প্রয়োজন, নিজের তৃষ্ণা মেটানো আর অধিকার ফলায় যাওয়ার নাম ভালোবাসা হতে পারে না। মুনিয়া তো কোনো শরীর মাত্র নয়, সে এক সম্পূর্ণ মানুষ—যার একটা আলাদা মন আছে, আত্মসম্মান আছে, অভিমান করার অধিকার আছে। সে এত বছর ধরে শুধু মুনিয়ার ওপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে এসেছে, কিন্তু কখনো থামে ভেবে দেখেনি মুনিয়া কী চায়। মুনিয়াকে জয় করতে গিয়ে সে বারবার মুনিয়ার মনটাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে।

 

সাব্বির শাড়িটা খুব সাবধানে ভাজ করে আবার আলমারিতে রাখল। তারপর ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল। আয়নায় ভেসে ওঠা নিজের চেহারা দেখে তার নিজেরই লজ্জা হতে লাগল। চোখে চরম ক্লান্তি, আর মুখে অপরাধবোধের স্পষ্ট ছাপ।

 

আজ প্রথমবার সাব্বিরের পুরুষালি অহংকার বা ইগো পুরোপুরি চূর্ণ হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, মুনিয়াকে ফেরাতে হলে তাকে এবার কোনো খেলা খেলতে হবে না, জোর করে কাছে টানতে হবে না। তাকে এবার একেবারে খালি হাতে, নত মাথায় মুনিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। নিজের সমস্ত ভুলগুলো হাত জোর করে মেনে নিতে হবে।

 

সাব্বির মোবাইলটা হাতে নিল। রাত এখন প্রায় দুটো। মুনিয়ার নম্বরে ডায়াল করার সাহস তার হলো না। সে একটা দীর্ঘ মেসেজ লিখতে শুরু করল।

 

"মুনিয়া, আজ প্রথমবার আমি সত্যিটা দেখতে পাচ্ছি। আমি এতকাল তোমাকে ভালোবাসার নামে শুধু নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে এসেছি। তোমার শরীরকে আঁকড়ে ধরে ভেবেছি সব ঠিক করে ফেলেছি, কিন্তু তোমার মনটা যে ভেঙে ছারখার হয়ে যাচ্ছিল, তা বোঝার মতো চোখ আমার ছিল না। আমি অপরাধী মুনিয়া। আমার এই অহংকার আর ভুলের জন্য আজ আমি সত্যি নিঃস্ব। যদি পারো, আমাকে একটা শেষ সুযোগ দিয়ো—নিজের ভুলটা শুধরে নেওয়ার জন্য..."

 

মেসেজটা সেন্ড বাটনে চেপে সাব্বির ফোনটা টেবিলে রাখল। জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল সে। ভোরের আলো ফুটতে আর বেশি বাকি নেই। কিন্তু সাব্বিরের মনের ভেতরে আজ যে অনুসূচনার আগুন জ্বলছে, তা নিভতে এবার সময় লাগবে। সে সিদ্ধান্ত নিল, কাল সকালেই সে মুনিয়ার বাপের বাড়ি যাবে—অহংকার ভেঙে নিছক এক অপরাধী হিসেবে তার ক্ষমা চাইতে।

 

পরদিন সকালে ঢাকার আকাশ খানিকটা পরিষ্কার হলেও সাব্বিরের মনের ভেতরের মেঘ এতটুকু কাটেনি। রাতে মেসেজটা পাঠানোর পর থেকে হাজার বার মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েছে সে, কিন্তু মুনিয়ার কোনো উত্তর আসেনি। সাব্বির আর অপেক্ষা করতে পারল না। হালকা নীল রঙের একটা শার্ট গায়ে জড়িয়ে, চুলগুলো কোনোমতে গুছিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল মুনিয়ার বাপের বাড়ির উদ্দেশ্যে।

 

ধানমন্ডির চারতলা পুরোনো ধাঁচের বাড়িটার সামনে যখন সাব্বির এসে দাঁড়াল, তখন বেলা ১১টা। বুকটা যেন কোনো অজানা আশঙ্কায় ধড়ফড় করছে। এত বছর ধরে সে মুনিয়ার অভিমানকে হালকাভাবে দেখে এসেছে, কিন্তু আজকের এই শান্ত মুনিয়া তার কাছে এক অগম্য পাহাড়ের মতো মনে হচ্ছে।

 

সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে দরজায় টোকা দিল সে। বেল বাজানোর সাহসও পাচ্ছিল না। কয়েক মুহূর্ত পর দরজা খুলল মুনিয়ার মা। শাশুড়ি তাকে দেখে কিছুটা অবাক হলেন, তবে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন, "সাব্বির? এসো ভেতরে এসো। হুট করে এই সময়ে?"

 

"আম্মা... মুনিয়া কি ঘরে আছে?" সাব্বিরের কণ্ঠস্বর অস্বাভাবিকরকম নিচু আর কাঁপছিল।

 

"হ্যাঁ, ও ওর পুরোনো ঘরেই আছে। শরীরটা নাকি ভালো লাগছে না বলে শুয়ে আছে," আম্মা চিন্তিত মুখে বললেন।

 

সাব্বির আর দেরি না করে ধীর পায়ে মুনিয়ার ঘরের দিকে হেঁটে গেল। দরজার পর্দাটা সামান্য সরানো ছিল। ভেতরের দৃশ্য দেখে সাব্বিরের পা যেন মাটিতে জমে গেল।

 

মুনিয়া জানালার পাশে রাখা কাঠের পুরোনো খাটটায় শুয়ে আছে। গায়ের ওপর একটা সুতির সাদা চাদর জড়ানো। তার মুখটা দরজার দিকে ঘোরানো, চোখ দুটি বোজা। জানালার বাইরে থেকে আসা রোদের এক চিলতে আলো এসে পড়েছে তার ফ্যাকাশে গালে। কত নির্ভার, অথচ কত বিষণ্ণ দেখাচ্ছে তাকে!

 

সাব্বির নিঃশব্দে ঘরের ভেতর ঢুকল। দরজার সিটকিনিটা টেনে দিয়ে সে ধীর পায়ে খাটের পাশে এসে বসল। কাঠের খাটের সামান্য মচমচ শব্দে মুনিয়া চোখ খুলল। সামনে সাব্বিরকে দেখে তার চেহারায় এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় ফুটে উঠলেও, পরক্ষণেই তা এক ঠান্ডা নিস্পৃহতায় পরিণত হলো।

 

"তুমি এখানে কেন এসছ সাব্বির?" মুনিয়া উঠে বসার চেষ্টা করতে করতে বলল।

 

সাব্বির তাকে সাহায্য করতে হাত বাড়াতে গেল, কিন্তু মুনিয়া আলতো করে নিজেকে সরিয়ে নিল। সাব্বিরের হাতটা শূন্যে ভেসে থেকে আবার নিচে

নেমে এলো।

পড়েছি," মুনিয়া এক গম্ভীর চোখে সাব্বিরের দিকে তাকাল। "কিন্তু কথার চেয়ে কাজের মূল্য অনেক বেশি সাব্বির। শুধু মেসেজে অপরাধ স্বীকার করলেই সব রাতারাতি বদলে যায় না।"

 

সাব্বির মুনিয়ার মুখোমুখি হাঁটু গেড়ে মেঝের ওপর বসে পড়ল। একজন আত্মঅভিমানী, অহংকারী পুরুষ যেভাবে ভালোবাসার মানুষের সামনে নতজানু হয়, সাব্বির আজ ঠিক সেভাবেই বসল। সে মুনিয়ার দুটো ঠাণ্ডা হাত নিজের দুহাতে চেপে ধরল। এবার আর কোনো অধিকার বা কামনার জোরালো চাপ ছিল না, ছিল শুধু চরম আকুতি আর ক্ষমা চাওয়ার ব্যাকুলতা।

 

"আমি জানি মুনিয়া, আমার ক্ষমা পাওয়ার কোনো যোগ্যতা নেই," সাব্বির তার চোখ দুটি মুনিয়ার কোলে রেখে বিড়বিড় করে বলল। "আমি এতদিন ভেবেছি তোমাকে শারীরিক আর মানসিকভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখাই ভালোবাসা। কিন্তু কালকের রাতটা আমাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ফাঁকা ঘরে তোমার ওই সুবাসি শাড়িটা বুকে চেপে ধরে যখন আমি তোমাকে খুঁজেছি, তখন প্রথমবার আমি অনুধাবন করেছি—শরীর দিয়ে মনকে কেনা যায় না।"

 

মুনিয়া স্তব্ধ হয়ে রইল। সে সাব্বিরের মাথার ওপর নিজের নজর রাখল। সাব্বিরের পুরো শরীর কাঁপছে, আর তার চোখের জল মুনিয়ার হাতের তালু ভিজিয়ে দিচ্ছে। যে সাব্বির কখনো নিজের ভুল মানতে চাইত না, যে সাব্বির সবসময় নিজের জিদ আর পুরুষালি তেজ দিয়ে সব ঢেকে রাখত—সেই মানুষটা আজ তার পায়ের কাছে বসে শিশুর মতো কাঁদছে।

 

"আমি তোমার আত্মসম্মানকে আঘাত করেছি মুনিয়া," সাব্বির চোখ তুলে তাকাল। তার লাল হয়ে যাওয়া চোখে স্পষ্ট ফুটে উঠছে ভেতরের তীব্র যন্ত্রণা। "তুমি আমাকে যা শাস্তি দিতে চাও দাও। তুমি যদি চাও আমি প্রতিদিন তোমার দরজায় এসে অপরাধী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকব, তাহলেও রাজি। কিন্তু আমাকে তোমার মন থেকে একেবারে মুছে ফেলো না। প্লিজ..."

 

সাব্বির আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে মাথাটা মুনিয়ার কোলের ওপর নামিয়ে দিয়ে মুনিয়ার কোমর দুটো দুহাতে আস্তে করে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু এবার সেই আবেশে কোনো আগ্রাসন ছিল না, ছিল এক পরম আশ্রয় খোঁজার ব্যাকুলতা। সে মুনিয়ার সুতির শাড়ির ওপর মুখ গুঁজে ফোঁপাচ্ছিল।

 

মুনিয়ার ভেতরের বরফ জমা দেওয়ালটায় যেন বড় একটা ফাটল ধরল। সে দেখতে পাচ্ছিল, সাব্বির আজ কোনো নাটক করছে না। সাব্বিরের এই চোখের জল আর আকুলতার পেছনে কোনো ছলনা নেই, আছে এক বুক খাঁটি অনুশোচনা।

 

মুনিয়া ধীরে ধীরে তার কাঁপতে থাকা হাতটা তুলল। তারপর সাব্বিরের ঘন চুলে আলতো করে হাত বোলাতে শুরু করল। তার আঙুলগুলো সাব্বিরের চুলের ভাঁজে হারিয়ে গেল।

 

"তুমি সত্যি বুঝতে পেরেছ সাব্বির?" মুনিয়ার গলায় কান্না জমে এলো। "আমি কখনো তোমার কাছে দামি কিছু চাইনি। শুধু চেয়েছিলাম তোমার পাশে নিজের যোগ্য সম্মান আর একটু মনোযোগ। তুমি যখন আমাকে এড়িয়ে চলো, আবার রাতে এসে আদরে ভরিয়ে দিতে চাও—তখন নিজেকে খুব সস্তা মনে হয় আমার।"

 

"আর কখনো এমন হবে না মুনিয়া, আমি শপথ করছি," সাব্বির মুখ তুলে মুনিয়ার দিকে তাকাল। সে মুনিয়ার এক হাত এনে নিজের ঠোঁটে চেপে রাখল। পরম আদরে, ভক্তি ভরে সে মুনিয়ার হাতের তালুতে এক গভীর চুমু বসাল।

 

মুনিয়ার চোখ থেকেও গড়িয়ে পড়ল জল। সাব্বির হাত বাড়িয়ে অত্যন্ত সাবধানে মুনিয়ার গালের জলটুকু নিজের আঙুলে মুছে নিল। তারপর সাব্বির ঝুঁকে এসে মুনিয়ার কপালে নিজের ঠোঁট রাখল। সে চুমু ছিল যেমন দীর্ঘ, তেমনই পবিত্র। তাতে কোনো অধিকারের দাপট ছিল না, ছিল শুধু সমর্পণ।

 

মুনিয়া নিজের দুহাত দিয়ে সাব্বিরের গাল দুটো ধরে তাকে আরও কাছে টেনে নিল। তাদের ঠোঁট দুটো কাছাকাছি এলো, কিন্তু এবার সাব্বির নিজে থেকে এগোলো না। সে অপেক্ষা করছিল মুনিয়ার সম্মতি আর ভালোবাসার জন্য।

 

মুনিয়া নিজেই সামান্য ঝুঁকে সাব্বিরের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। খুব কোমল, মিষ্টি আর আবেগে ভরা এক চুমু। যেন সব দূরত্ব আর অভিমানের মেঘ এক লহমায় কেটে গিয়ে নতুন এক ভোরের আলো ফুটল।

 

ধানমন্ডির পুরোনো বাড়ির সেই ছোট ঘরের বাতাসে এখন আর কোনো তিক্ততা নেই, জমা হয়ে আছে শুধু এক গাঢ়, ভারী প্রেম। মুনিয়ার ঠোঁটের নরম ছোঁয়া সাব্বিরের পুরুষালি হৃদয়ে যেন জীবনের নতুন এক স্পন্দন এনে দিল। সাব্বির এতকাল প্রেমকে জয় করতে চেয়েছিল নিজের বাসনা আর তৃষ্ণা দিয়ে, কিন্তু আজ মুনিয়ার এই স্বতঃস্ফূর্ত আত্মসমর্পণ তাকে শেখাল—সত্যিকারের ভালোবাসার শক্তি কতটা গভীর হতে পারে।

 

সাব্বির মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসেই মুনিয়ার দুই হাত নিজের মুখের কাছে ধরে রাখল। সে পরম আদরে মুনিয়ার হাতের আঙুলগুলোর ডগায় একের পর এক চুমু বসাতে লাগল। প্রতিটি চুমুতে যেন লেগে ছিল একেকটি না-বলা অনুশোচনার বাণী।

 

"ঘরে চলো মুনিয়া," সাব্বির নিচু, ভারী গলায় আর্জি জানাল। "আমাদের সেই ফাঁকা নীল ঘরটা তোমার উপস্থিতি ছাড়া একদম মরে গেছে। আমি তোমাকে নতুন করে ভালোবাসতে চাই, কোনো অধিকারের দাপট ছাড়াই।"

 

মুনিয়া সাব্বিরের কপালে হাত রেখে মিষ্টি করে হাসল। সেই হাসিতে কোনো জমে থাকা মেঘ ছিল না, ছিল শুধু ভালোবাসার রোদ। "তুমি সত্যি বড্ড পাগল সাব্বির! চলো, তবে আজ কিন্তু আমি নিজের শর্তে বাড়ি ফিরব।"

 

"তোমার সব শর্ত আমার মাথায় ওপর মুনিয়া," সাব্বির সহাস্যে জবাব দিল।

 

বিকেলে ধানমন্ডির বাসা থেকে বের হয়ে যখন তারা নীল রঙের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে এলো, তখন ঢাকার আকাশে সন্ধ্যার গাঢ় আবছায়া নেমে এসেছে। বারান্দার বাইরের বৃষ্টি থামলেও ঠান্ডা বাতাস সোঁদা গন্ধ বহন করে আনছিল। সাব্বির ঘরে ঢুকেই দরজার সিটকিনিটা আটকে দিল।

 

আজ ড্রয়িংরুম বা বেডরুমের আলো অতটা উজ্জ্বল নয়। সাব্বির টিভি ট্রলির ওপর রাখা দুটো লাল মোমবাতি জ্বালিয়ে দিল। মোমের সেই হালকা শিখার কাঁপুনিতে ঘরের পরিবেশ এক মায়াবী, গাঢ় আকর্ষণে রূপ নিল।

 

মুনিয়া শাড়ি পাল্টাতে বেডরুমের দিকে এগোতে চাইল, কিন্তু সাব্বির পেছন থেকে এসে অত্যন্ত সাবধানে তার হাতটা ধরে থামাল। এবার আর কোনো জবরদস্তি বা তীব্র চাপ ছিল না। সাব্বির মুনিয়াকে নিজের মুখোমুখি ঘোরালো।

 

"আজ আমি তোমাকে স্পর্শ করব মুনিয়া, কিন্তু আজ তা কেবল তোমার মনকে ছোঁয়ার জন্য," সাব্বিরের কণ্ঠের গভীরতা মুনিয়ার ভেতরের প্রতিটা স্নায়ুকে আবার জাগ্রত করে তুলল।

 

সাব্বির ধীর হাতে মুনিয়ার ঢাকাই শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে নামিয়ে দিল। লাল মোমের আলোয় মুনিয়ার খোলা ঘাড়, চিবুকের নিচের অংশ আর উন্মুক্ত কোমরের ভাঁজ যেন রূপকথার ছবির মতো সুন্দর দেখাচ্ছিল। সাব্বির একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। তার গরম নিঃশ্বাস এসে পড়ছিল মুনিয়ার গালের কোণে।

 

সাব্বির হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুনিয়ার গালের নরম চামড়ায় আলতো করে ঘষে দিল। তারপর তার ঠোঁট দুটো এনে রাখল মুনিয়ার কানের ঠিক নিচে, কানের লতির ওপর। সেখানে এক দীর্ঘ, উষ্ণ ছোঁয়া দিয়ে সে আস্তে আস্তে নেমে এলো মুনিয়ার গলার দিকে।

 

"সাব্বির...", মুনিয়া এক হালকা শিহরণে চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার দুহাত সাব্বিরের শার্টের ওপর গিয়ে শক্ত হয়ে চেঁপে বসল।

 

সাব্বির এবার তড়িঘড়ি করল না। সে মুনিয়ার ঘাড়ের ভাঁজে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে ধীরগতিতে চুষে নিতে লাগল। তার প্রতিটা চুমুর স্পর্শ ছিল নিবিড় আর গভীর। মুনিয়ার শরীরের প্রতিটি লোমকূপ যেন সেই উষ্ণতায় শিহরিত হয়ে উঠল। সাব্বিরের এক হাত ধীরে ধীরে নেমে এলো মুনিয়ার কোমরে। সে আঁচলটা সরিয়ে দিয়ে নিজের খালি হাতের তালু চেপে ধরল মুনিয়ার নাভির ওপর।

 

মুনিয়ার শরীর থেকে এক মৃদু ব্যাকুলতার শব্দ বের হয়ে এলো। সে মাথাটা পেছনের দিকে হেলিয়ে দিতেই সাব্বির তার উন্মুক্ত গলায় নিজের দাঁতের হালকা ছোঁয়া দিল। সেই মৃদু কামড়ের জ্বালায় আর চরম সুখে মুনিয়া সাব্বিরের শার্টের কলার আঁকড়ে ধরে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে আনল।

 

"তুমি আজ আমাকে নতুন করে পাগল করে দিচ্ছ সাব্বির...", মুনিয়া হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।

 

সাব্বির কথা বলল না। সে সোজা মুনিয়াকে কোলে তুলে নিল। এবার আর কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কেবল এক অদ্ভুত সংযম আর অনুরাগের ভারসাম্য। সে মুনিয়াকে বিছানায় খুব সাবধানে শুইয়ে দিল। মোমের আলো এসে বেডরুমের দেয়াল ছুঁয়ে যাচ্ছে।

 

সাব্বির মুনিয়ার ওপর ঝুঁকে এলো। তার দুহাত রাখা ছিল মুনিয়ার মাথার দুপাশে। মুনিয়ার দিকে চেয়ে সে দেখল, মুনিয়ার চোখে আজ কোনো ভয় বা ক্ষোভ নেই—সেখানে জ্বলছে এক অতল প্রেমের আলো। সাব্বির তার ঠোঁট এনে ফেলল মুনিয়ার নরম ঠোঁটের ওপর।

 

এই চুমুটা আগের যেকোনো দিনের চেয়ে আলাদা। এতে কোনো একক আধিপত্য ছিল না, ছিল দুটো আত্মার সমান লেনদেন। সাব্বির গভীর আবেগে মুনিয়ার ওপরের ঠোঁট চুষে নিতে লাগল, আর মুনিয়াও সমান উন্মাদের মতো সাব্বিরের নিচের ঠোঁট নিজের কামড়ে আটকে ফেলল। তাদের জিভের মৃদু ছোয়ায় এক পরম তৃপ্তি পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ল।

 

সাব্বিরের হাত মুনিয়ার শাড়ির ব্লাউজের ফিতা আর বোতামের ওপর নেমে এলো। পরম যত্নে, নিখুঁত আবেগে সে শাড়ির বাঁধন আলগা করতে শুরু করল। মুনিয়াও নিজের হাত সাব্বিরের শার্টের ভেতরে গলিয়ে দিল। সাব্বিরের শক্ত, তপ্ত পিঠের চামড়ায় মুনিয়ার আঙুলের নখগুলো আঁচড় কাটতে শুরু করল এক অজানা তৃষ্ণায়।

 

সাব্বির মুনিয়ার বুকের ওপর নিজের তপ্ত ঠোঁট আর মুখ ডুবিয়ে দিল। তার গভীর আদর মুনিয়ার উন্মুক্ত শরীরে এক তড়িৎ প্রবাহ চালনা করছিল। মুনিয়া দুচোখ বুজে সাব্বিরের মাথাটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে রইল।

 

আজকের এই শারীরিক মিলনের ব্যাকুলতায় কোনো অহংকার ছিল না, ছিল শুধুই একে অপরের ভেতরে পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার এক তীব্র বাসনা। সাব্বির অনুভব করল, শরীর পেরিয়ে তারা দুজন আজ এক অপার্থিব অনুভূতির সীমানায় পা রাখছে। কিন্তু এই পরম অনুরাগের রাত কি সত্যি তাদের সম্পর্কের সব পুরনো ক্ষত চিরতরে মুছে দিতে পারবে? নাকি ভোরের আলো ফুটতেই কোনো নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে তাদের?

 

মোমবাতির নিভু নিভু আলো বেডরুমের কোণে এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে রেখেছিল। জানালার কাচে ঝমঝম বৃষ্টির শেষ ফোঁটাগুলো আছড়ে পড়ার শব্দ, আর ঘরের ভেতরে জমে থাকা গভীর নিস্তব্ধতা—দুটো মিলে যেন এক অন্য জগৎ রচনা করেছে। বিছানায় একে অপরের বাহুডোরে হারিয়ে ছিল সাব্বির আর মুনিয়া।

 

শরীরের সমস্ত উত্তাপ আর আবেগের তীব্রতার পর এখন তাদের শরীর ও মন দুটোই শান্ত, তৃপ্ত। সাব্বিরের বুকের ওপর মাথা রেখে শুয়েছিল মুনিয়া। তার এলোমেলো ভিজে চুলগুলো ছড়িয়ে ছিল সাব্বিরের চওড়া বুকে। সাব্বির অত্যন্ত সুক্ষ্ম আর নরম আদরে মুনিয়ার পিঠের উন্মুক্ত চামড়ায় আঙুল বোলাচ্ছিল। এই স্পর্শে আর কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, ছিল এক পরম নিশ্চিন্তির অনুভব।

 

মুনিয়া মুখ তুলে তাকাল। আবছা আলোয় সাব্বিরের চোখের দিকে তাকাতেই সে দেখতে পেল সেই অপরিসীম ভালোবাসা, যা সে এতদিন ধরে খুঁজে ফিরছিল।

 

"কী দেখছ এভাবে?" মুনিয়া মিষ্টি করে হেসে নিচু স্বরে জিগ্যেস করল।

 

সাব্বির তার ঠোঁট দুটো এনে মুনিয়ার কপালে রাখল। এক দীর্ঘ, গভীর ছোঁয়া শেষে সে বলল, "দেখছি আমার সেই হারিয়ে যাওয়া মুনিয়াকে, যাকে আমি নিজের বোকামি আর অহংকার দিয়ে প্রায় মেরেই ফেলেছিলাম। আজ নিজেকে কত ভাগ্যবান মনে হচ্ছে জানো?"

 

"কেন?" মুনিয়া সাব্বিরের বুকের লোমে আঙুল পেঁচাতে পেঁচাতে শুধাল।

 

"কারণ তুমি আমাকে একটা সুযোগ দিয়েছ নিজেকে শোধরানোর। আজ আমি বুঝতে পেরেছি, ভালোবাসায় আধিপত্য কিংবা জোর করার চেয়ে সমর্পণ করার আনন্দ কত বেশি। তোমাকে জেতার চেয়ে তোমার কাছে হেরে যাওয়াতেই আমার আসল মুক্তি," সাব্বিরের গলায় ভেসে উঠল এক অদ্ভুত পরিপক্কতা।

 

মুনিয়ার বুকটা এক অদেখা আনন্দে ভরে উঠল। এতদিন ধরে যে অভিমান, যে কষ্ট আর অপমানের বোঝা সে বহন করে আসছিল, তা সাব্বিরের এই একটা কথায় পুরোপুরি গলে জল হয়ে গেল। সে আর কিছু না বলে সাব্বিরের গলা জড়িয়ে ধরে তার বুকের সঙ্গে আরও শক্ত করে নিজেকে মিশিয়ে নিল।

 

সাব্বির মুনিয়ার চিবুকটা সামান্য উঁচিয়ে ধরে আবার তার ঠোঁটে ঠোঁট রাখল। তবে এবার সে চুমু ছিল পরম ধীরগতির, এক অনন্ত তৃপ্তির ছোঁয়া। মুনিয়াও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিল। তাদের শারীরিক আর মানসিক মিলনের এই শেষ অধ্যায়ে আর কোনো বাধা, কোনো দ্বিধা রইল না।

 

ভোরের প্রথম আলো যখন পর্দা গলে ঘরের ভেতরে এসে পড়ল, তখনো ঢাকার আকাশ স্নিগ্ধ আলোয় ভেসে যাচ্ছে। মিষ্টি একটা হাওয়া জানালার পর্দা টপকে ভেতরে ঢুকে ছুঁয়ে গেল তাদের দুজনকেই। সাব্বির আগে ঘুম থেকে উঠে পড়ল। সে বিছানা থেকে উঠে মুনিয়ার গায়ে সুতির চাদরটা খুব আদরে জড়িয়ে দিল। তারপর রান্নাঘরে গিয়ে নিজেই বানিয়ে আনল দুই কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম চা।

 

চা নিয়ে সে যখন ঘরে ফিরল, মুনিয়া তখনো ঘুমে আচ্ছন্ন। তার মুখে এক অপূর্ব প্রশান্তির ছাপ। সাব্বির বেডসাইড টেবিলে কাপ রেখে মুনিয়ার পাশে বসে তার ভিজে চুলে আঙুল গলিয়ে দিল।

 

মুনিয়া আস্তে আস্তে চোখ খুলল। সামনে সাব্বিরকে দুহাতে চায়ের কাপ নিয়ে মুচকি হাসতে দেখে সেও হেসে ফেলল।

 

"এখনো বিছানা ছাড়োনি কেন ম্যাডাম? চা কিন্তু ঠান্ডা হয়ে যাবে," সাব্বির দুষ্টুমি করে বলল।

 

মুনিয়া উঠে বসে চাদরটা বুকে টেনে জড়িয়ে নিল। "তোমার হাতের তৈরি চা না খেলে কি সকাল শুরু হয় বল?"

 

সাব্বির এক কাপ চা মুনিয়ার হাতে তুলে দিল আর অন্য কাপটা নিজের হাতে নিল। দুজনের চায়ের কাপে এক হালকা টুং শব্দ হলো। বারান্দার ওপারে ততক্ষণে ফুটতে শুরু করেছে নতুন ভোরের আলো।

 

আজ সাব্বির আর মুনিয়ার সম্পর্কের নীল খাতাটায় একটা পুরোনো অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। যেখানে শুধু শারীরিক তৃষ্ণা বা আধিপত্যের জায়গা ছিল না, বরং জন্ম নিল সম্মান, আত্মসমর্পণ আর ভালোবাসার এক অটুট বন্ধন।

অভিমানের মেঘ কেটে গিয়ে তাদের সংসারে এখন নীল দিগন্তের মতো এক অনন্ত প্রশান্তি আর পূর্ণতা নেমে এসেছে।

 

"মুনিয়া... আমি মেসেজটা পাঠিয়েছিলাম। তুমি হয়তো পড়োনি," সাব্বির নিচু গলায় বলল।

....
👁 10