নিঝুম রাতের নীরবতা গ্রাস করেছে পুরো ধানমন্ডি এলাকাকে। বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকা রাইসার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছে। বাইরের সোডিয়াম আলোর হালকা হলুদ আলো এসে পড়েছে তার মুখে। ঘড়িতে তখন রাত দুইটা বেজে পনেরো মিনিট। পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ, কিন্তু রাইসার ভেতরের ঝড় যেন সব বাঁধ ভেঙে ফেলতে চাইছে। এই বাড়ি, এই ঘর, আর তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা ওই একজন মানুষ—যার সাথে পাঁচটা বছর ধরে সে এক ছাদের নিচে থেকেও যেন শত আলোকবর্ষ দূরে বাস করছে।
রাফসান ঘরের এক কোণে কাঠের ভারী রিডিং টেবিলটার ওপর হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে কালো রঙের একটি সুতির কার্টুন টি-শার্ট আর অ্যাশ রঙের ট্রাউজার। ঠোঁটের কোণে জ্বলতে থাকা সিগারেটের ধোঁয়া ধীরগতিতে সিলিংয়ের দিকে ভেসে যাচ্ছে। রাফসানের সুগঠিত চওড়া শরীর আর শক্ত চোয়ালের রেখায় থমথম করছে এক অদ্ভুত নীরবতা। বিয়ের পর প্রথম কিছুদিন যে হাসিখুশি রাফসানকে চিনেছিল রাইসা, সে রাফসান যেন বহু আগেই কোনো অজানা অতলে হারিয়ে গেছে। গত কয়েক বছরের লাগাতার ভুল বোঝাবুঝি, একে অপরের প্রতি জমে থাকা ক্ষোভ, আর নীরবতার দেয়াল তাদের সম্পর্কের সুতোটাকে একদম পাতলা করে এনেছে। একে অপরকে সহ্য করতে না পেরে কত রাত তারা আলাদা ঘরে কাটিয়েছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।
হঠাৎ করেই রাফসানের ফোনের তীব্র রিংটোন রাতের এই শ্মশান নীরবতাকে চুরমার করে দিল। রাফসান এক ঝটকায় পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। তার চোখের তারা দুটো মুহূর্তেই ছোট হয়ে এল। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে তার ছোট ভাই ফাইয়াজের নাম। সাধারণ সময়ে রাত দুইটায় ফাইয়াজ কখনোই ফোন দেয় না।
"হ্যালো, ফাইয়াজ?" রাফসানের গলাটা কিছুটা খসখসে শোনাল।
ফোনের ওপাশ থেকে যে খবরটা এল, তা শোনার সাথে সাথেই রাফসানের হাত থেকে সিগারেটটা কার্পেটের ওপর খসে পড়ল। তার মুখের এক্সপ্রেশন এক সেকেন্ডের মধ্যে বদলে গেল চরম আতঙ্কে। ফাইয়াজ ওপাশ থেকে হাপাচ্ছে, কান্নার তোড়ে কথা বলতে পারছে না। তাদের পৈতৃক ব্যবসা এবং গ্রামের বাড়ি সম্পর্কিত একটি জটিল আইনি ও পারিবারিক সংকট এত রাতে রূপ নিয়েছে চরম বিপর্যয়ে। বড় চাচা হঠাৎ মাঝরাতে স্ট্রোক করেছেন, আর তার ছেলেরা এই সুযোগে পরিবারের মূল সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি ভুয়া দলিলে সই করিয়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে। কিছু কাগজপত্র এখনই ঢাকায় রাফসানের লকার থেকে বের করে সিদ্ধান্ত না নিলে তাদের পুরো পরিবার কাল সকালে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াবে।
কথা শেষ করেই রাফসান এক মুহূর্তের জন্য স্থবির হয়ে রইল। রাইসা বারান্দা থেকে ভেতরের দিকে পা বাড়িয়েছিল, রাফসানের চেহারার এই পরিবর্তন দেখে তার বুকের ভেতরটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। সে কোনো দিন রাফসানকে এতটা বিচলিত হতে দেখেনি। রাফসান যে কোনো পরিস্থিতিতে বরফের মতো ঠান্ডা থাকে, সেই মানুষের হাত কাঁপছে।
"কী হয়েছে, রাফসান?" রাইসার কণ্ঠে বহুদিন পর এক ধরনের খাঁটি উদ্বেগ ফুটে উঠল।
রাফসান চোখ তুলে তাকাল রাইসার দিকে। ওই উজ্জ্বল, গভীর দুটি চোখ, যা একসময় রাফসানের সমস্ত জগত জুড়ে ছিল, আজও সেই চোখে তাকালে রাফসানের বুকের কোথাও একটা মোচড় দিয়ে ওঠে। কিন্তু ক্ষোভের বরফ এতটাই শক্ত যে, সে মুখ ফেরাতে বাধ্য হলো।
"আমাদের গ্রামের বাড়ির জমি আর বাবার রেখে যাওয়া ট্রাস্ট নিয়ে বড় চাচারা চরম নোংরামি শুরু করেছে। ফাইয়াজ একা সামলাতে পারছে না। এখনই আমাকে ওই পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আর লকারের কাগজের মূল ফাইলটা রেডি করতে হবে। আর... আর কাল সকাল আটটার আগেই সিদ্ধান্তটা পাঠাতে হবে, নইলে সব শেষ।" রাফসানের কথাগুলো যেন বুলেটের মতো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল।
রাইসা এক মুহূর্ত সময় নিল ভাবার জন্য। এই পারিবারিক বিষয়ে তারও সমান অধিকার এবং কিছু কাগজে তার যৌথ স্বাক্ষর রয়েছে, যা রাফসানের বাবা মৃত্যুর আগে রাইসার নামে ট্রাস্টি হিসেবে লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন। আজ থেকে চার বছর আগে যখন তাদের সম্পর্ক ভালো ছিল, তখন শ্বশুরের এই সিদ্ধান্ত রাইসাকে অভিভূত করেছিল। কিন্তু সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে যাওয়ার পর রাইসা কখনোই সে বিষয়ে নাক গলায়নি।
"লকারের ব্যাকআপ ফাইলটা তো আমাদের এই ঘরের আলমারিতেই থাকার কথা, তাই না?" রাইসা এগিয়ে এসে বলল। তার সুতির হালকা নীল রঙের শাড়িটা মেঝেশোঁয়া গতিতে দুলছিল।
"হ্যাঁ, কিন্তু ওই ফাইলের কোড আর মূল অথরাইজেশন লেটার দুটো আলাদা এনভেলপে রাখা। একটা তোমার কাছে, একটা আমার কাছে। আর কাগজগুলোর সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হলে আমাদের দুজনকে একসাথে বসতেই হবে," রাফসান গম্ভীর গলায় বলল, তার চোখে একটা অদ্ভুত অসহায়তা।
রাইসা আলমারির দিকে এগিয়ে গেল। রাত তিনটে বাজতে চলল। শহরের বাইরে বড় চাচার পরিবারের চক্রান্ত সফল হতে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। তাদের নিজেদের ভেতরের সমস্ত তিক্ততা, ক্ষোভ আর দূরত্বকে অন্তত আজকের এই রাতের জন্য একপাশে সরিয়ে রাখতে হবে।
রাইসা ড্রয়ার খুলে তার অংশের ফাইলটা বের করল। রাফসানও তার ফাইলটা নিয়ে বিছানার ওপর এসে বসল। ঘরের মাঝখানে রাখা কিং সাইজ বেডটা এত দিন ছিল তাদের বিভাজনের প্রতীক। আজ সেই বিছানাই হয়ে উঠল তাদের রণক্ষেত্র, আবার একই সাথে এক হওয়ার একমাত্র আশ্রয়।
"তুমি ওই ক্লাজগুলো পড়ো, আমি ফাইয়াজকে আইনি ড্রাফটটা পাঠাচ্ছি," রাফসান ল্যাপটপ অন করে বলল।
রাইসা এসে রাফসানের ঠিক গা ঘেঁষে বসল। কতগুলো মাস, কতগুলো বছর পর দুজন এত কাছাকাছি! রাফসানের গায়ের পরিচিত পুরুষালি পারফিউমের ঘ্রাণ আর তামাকের হালকা সুবাস রাইসার নাকে এসে ধাক্কা দিল। রাইসার নিঃশ্বাস হঠাৎ যেন ভারী হয়ে এল। রাফসানের শক্ত হাত দুটো যখন পেপারের পাতা ওল্টাচ্ছিল, তখন রাফসানের কনুই দু-একবার রাইসার নরম বাহুতে স্পর্শ করল। প্রতিটা স্পর্শে দুজনের শরীরের ভেতর দিয়ে যেন এক সূক্ষ্ম বিদ্যুতের তরঙ্গ খেলে গেল।
"এই জায়গাটা দেখো," রাইসা আঙুল দিয়ে ফাইলের একটি লেখা দেখিয়ে বলল।
রাফসান ঝুঁকে এল রাইসার দিকে। এত কাছে চলে এল যে, রাফসানের উষ্ণ নিঃশ্বাস রাইসার ঘাড়ের উন্মুক্ত অংশে গিয়ে পড়ল। রাইসার গায়ের রোম খাঁড়া হয়ে উঠল চরম এক শিহরণে। তাদের মাঝের দূরত্বটা কেবল কাগজের ফাইলে আটকে নেই, চারপাশের বাতাস হঠাৎ করেই ভারী ও উষ্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত রাগ, অভিমানের নিচে যে চাপা ভালোবাসা আর লালসা সুপ্ত হয়ে ছিল, তা যেন এই নিঝুম রাতে আগ্নেয়গিরির মতো জেগে ওঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
রাফসান ফাইল থেকে চোখ সরিয়ে এক মুহূর্তের জন্য তাকাল রাইসার ঠোঁটের দিকে। সেই সুগঠিত, আর্দ্র ঠোঁট, যা একসময় শুধু রাফসানের ভালোবাসার অধিকার ছিল। রাইসাও চোখ তুলে তাকাল। দুজনের চোখের ভাষায় এখন আর কোনো ক্ষোভ নেই, আছে এক তীব্র তৃষ্ণা আর হারানো অধিকার ফিরে পাওয়ার অব্যক্ত ব্যাকুলতা। রাত যত গভীর হচ্ছে, বিপদের মেঘ যেমন ঘনীভূত হচ্ছে, তেমনি এই বন্ধ ঘরের ভেতরের উষ্ণতা আর আকর্ষণ সামলানো দুজনের জন্যই অসম্ভব হয়ে উঠছে।
আজকের রাতটা কেবল পারিবারিক সংকট সমাধানের রাত নয়, আজকের রাতটা রাফসান আর রাইসার নিজেদের হিসাব মেটানোর রাত।
ঘরের বড় ফ্যানটা মাথার ওপর ধীরগতিতে ঘুরছে, কিন্তু ভেতরের উষ্ণতা যেন দিন দিন বাড়তেই থাকা কোনো গ্রীষ্মের দুপুরের মতো সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বারান্দা দিয়ে আসা বাতাসটাও আজ থমকে গেছে। ল্যাপটপের পর্দার হালকা আলো আর টেবিল ল্যাম্পের আবছা আলোয় রাফসান আর রাইসার অবয়ব দুটো দেয়ালে আঁকা কোনো রহস্যময় ছবির মতো দেখাচ্ছে।
ফাইলের পাতাগুলো উল্টাতে গিয়ে রাফসানের হাত বারবার স্পর্শ করছিল রাইসার আঙুল। প্রতিটা স্পর্শেই রাইসার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত তোলপাড় সৃষ্টি হচ্ছে। দীর্ঘ চার বছরের জমাট বাঁধা বরফ কি তবে এত সহজে গলতে শুরু করেছে? না কি এটা কেবলই রাতের নির্জনতার তৈরি করা এক মোহ?
"রাইসা, এই চার নম্বর ক্লজটা একটু ভালো করে দেখো," রাফসানের কণ্ঠটা আগের চেয়ে অনেক বেশি নিচু আর গম্ভীর শোনাল।
রাইসা ল্যাপটপের দিকে আরও একটু ঝুঁকে এলো। রাইসার শাড়ির আঁচলটা অসাবধানতাবশত তার কাঁধ থেকে খসে নিচে পড়ে গেল। উন্মুক্ত ফর্সা পিঠ আর মেদহীন কোমর রাফসানের চোখের সামনে উন্মুক্ত হয়ে পড়ল। রাফসানের দৃষ্টি ল্যাপটপের পর্দা থেকে সরে গিয়ে থমকে গেল রাইসার পিঠের ওপর থাকা ছোট্ট কালো তিলটার ওপর। ওই তিলটা... কত রাত রাফসান ওর ঠোঁট দিয়ে স্পর্শ করেছে, কত রাতে ওই তিলটাকে ঘিরে বুনেছে ভালোবাসার স্বর্গ।
রাফসান আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না। ল্যাপটপটা এক পাশে সরিয়ে রেখে সে তার ডান হাতটা ধীরগতিতে বাড়িয়ে দিল রাইসার পিঠের দিকে। রাফসানের খসখসে, উষ্ণ আঙুলগুলো যখন রাইসার পিঠের মসৃণ ত্বক স্পর্শ করল, রাইসা চমকে উঠে একটা হালকা শিউরে উঠল। তার মুখ থেকে একটা মৃদু অস্ফুট শব্দ বের হয়ে এলো।
"রাফসান... তুমি কী করছ?" রাইসার কণ্ঠে নিষেধের চেয়ে আকুলতা বেশি প্রকাশ পেল।
"আমি জানি না রাইসা... আমি সত্যিই জানি না," বলতে বলতেই রাফসান তার মুখটা রাইসার ঘাড়ে নামিয়ে আনল। রাফসানের ঠোঁটের তীব্র স্পর্শ রাইসার ঘাড়ে লাগতেই রাইসার চোখ দুটো বুজে এলো। এত দিন ধরে যে তীব্র লালসা আর অধিকারের তৃষ্ণা তারা চেপে রেখেছিল, এক মুহূর্তে তা আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত লাভাস্রোতের মতো ফেটে পড়ল।
রাইসা ঘুরে দাঁড়িয়ে রাফসানের শার্টের কলারটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার চোখে তখন ভালোবাসার সাথে মেশানো এক বুক ক্ষোভ। "এত বছর কোথায় ছিলে রাফসান? কেন আমাকে এভাবে একা করে রেখেছিলে?" রাইসার গলার আওয়াজ কাঁপছিল।
রাফসান কোনো উত্তর দিল না। উত্তর দেওয়ার মতো কোনো ভাষা তার জানা ছিল না। সে এক ঝটকায় রাইসাকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিল। রাইসার সুগঠিত শরীরটা রাফসানের শক্ত বুকের সাথে মিশে গেল। রাফসান তার ঠোঁট দুটো ডুবিয়ে দিল রাইসার আর্দ্র ঠোঁটে। কত দিন, কত মাস, কত বছর পর এই স্পর্শ! তাদের ঠোঁটের তীব্র মেলবন্ধনে প্রকাশ পেতে লাগল এত দিনের সমস্ত বিরহ, অভিমান আর না-বলা ভালোবাসা।
রাইসা রাফসানের চুলে হাত চালিয়ে দিয়ে তাকে আরও গভীরে টেনে নিল। গভীর ভালোবাসার এক উত্তাল সমুদ্রে দুজন ডুব দিল। রাফসানের হাত জোড়া রাইসার কোমরের বাঁধন আলগা করে শাড়ির ভাঁজগুলো একের পর এক সরিয়ে দিতে লাগল। শাড়িটা ধীরগতিতে কার্পেটের ওপর খসে পড়ল।
বিছানায় গড়ায় তাদের শরীর। নিঝুম ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে আসতে লাগল তাদের ঘন ঘন শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। রাফসানের উত্তপ্ত ঠোঁট রাইসার ঘাড়, গলা পার হয়ে নেমে এলো তার উন্মুক্ত বুকে। রাইসা দুই হাতে বিছানার চাদরটা শক্ত করে চেপে ধরে রাফসানের নাম ধরে ফিসফিস করে ডেকে উঠল। প্রতিটা ভালোবাসার গভীর ছোঁয়ায় তারা যেন হারিয়ে যাচ্ছিল এক অন্য জগতে, যেখানে কোনো ভুল বোঝাবুঝি নেই, নেই কোনো দূরত্বের দেয়াল—আছে শুধু দুটি পিপাসিত আত্মার একাকার হয়ে যাওয়ার তীব্র আকুলতা।
রাইসার স্তব্ধ বুক রাফসানের বুকের ছন্দে দ্রুত ওঠানামা করছিল। রাফসান রাইসার কপালে জমে ওঠা ঘোমের ফোঁটাগুলো তার ঠোঁট দিয়ে মুছে দিল। ঘরের বায়ুমণ্ডল তখন চরম উষ্ণতায় পরিপূর্ণ। একে অপরের শরীরের ঘ্রাণ, নিঃশ্বাসের উত্তাপ আর ভালোবাসার তীব্র আবেশে দুজনই তখন বিভোর।
"তুমি এখনো আমার, রাইসা... শুধু আমার," রাফসান রাইসার চোখের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল, তার কণ্ঠস্বরে গভীর আবেগ আর ভালোবাসার স্পষ্ট ছাপ।
রাইসা রাফসানের মুখটা দুই হাতের তালুতে নিয়ে তার ঠোঁটে আবার একটা হালকা কামড় দিল। "আমি কখনোই অন্য কারো ছিলাম না, রাফসান। কিন্তু তুমিই তো আমাকে দূরে ঠেলে দিয়েছিল।"
এই একটা কথায় রাফসানের হৃদয়ে যেন চাবুকের মতো আঘাত লাগল। ভালোবাসা আর উন্মাদনার এই চরম মুহূর্তেই রাফসানের মনে পড়ে গেল সেই চার বছর আগে
র কালো দিনটার কথা। যে দিনটা তাদের মাঝে এই বিশাল দেয়াল তুলে দিয়েছিল।
রাফসানের শরীরটা হঠাৎ একটু স্থবির হয়ে এলো। সে রাইসার ওপর থেকে সরে গিয়ে পাশাপাশি শুয়ে পড়ল, তার চোখ দুটি সিলিংয়ের দিকে স্থির। রাইসা রাফসানের এই হঠাৎ পরিবর্তন দেখে অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
"কী হলো রাফসান?" রাইসা তার উরু দিয়ে রাফসানের উরু স্পর্শ করে মৃদু কণ্ঠে শুধাল।
রাফসান দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটা হাত কপালে রাখল। "সেই রাতের কথা মনে আছে রাইসা? যে রাতে আমি তোমাকে অন্য কারো সাথে রেস্টুরেন্টে দেখেছিলাম? আর তুমি আমাকে কোনো ব্যাখ্যা দিতে চাওনি?"
রাইসার চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা অশ্রু। এতক্ষণ ধরে তৈরি হওয়া ভালোবাসার যে উত্তাপ ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, সেখানে আবার থমকে দাঁড়াল অতীতে হারিয়ে যাওয়া সেই অন্ধকার অধ্যায়। তবে কি এই তীব্র ভালোবাসা আর শারীরিক ঘনিষ্ঠতাও তাদের ভাঙা সম্পর্ককে জোড়া লাগাতে পারবে না?
বাইরে তখনো অন্ধকার, আর ঘড়ির কাঁটা জানান দিচ্ছে রাত সাড়ে তিনটা।
ঘড়ির কাঁটার টিপটিপ শব্দ যেন এই নিঝুম ঘরের থমথমে পরিবেশকে আরও রহস্যময় করে তুলছিল। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকা রাফসানের চেহারায় অতীতের সেই কষ্টের ছাপ স্পষ্ট। আর তার পাশে অর্ধনগ্ন অবস্থায় শুয়ে থাকা রাইসার চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে নামছে। একটু আগের সেই আগ্নেয়গিরির মতো তীব্র আবেগ আর দৈহিক উন্মাদনা হঠাৎ করেই এক ঠান্ডা স্তব্ধতায় বদলে গেছে।
"তুমি আজও ভাবো আমি তোমাকে ধোঁকা দিয়েছিলাম, তাই না রাফসান?" রাইসার কণ্ঠ জড়িয়ে এলো কান্নায়। সে চাদরটা দিয়ে নিজের শরীরটা আড়াল করার চেষ্টা করল না, বরং সোজা হয়ে বসে রাফসানের বুকের ওপর হাত রাখল।
রাফসান রাইসার দিকে তাকাল। সেই চোখে রাগ নেই, আছে শুধুই গভীর এক বেদনা। "আমি নিজের চোখে দেখেছিলাম রাইসা। অভিজাত ওই রেস্টুরেন্টে তুমি সাকিব সাহেবের সাথে বসে হাসাহাসি করছিলে, আর তার হাতে একটা ফাইল তুলে দিচ্ছিলে। অথচ তার আগের দিনই ওই সাকিব সাহেব আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা জালিয়াতির মামলা করে আমাকে দেউলিয়া করার চক্রান্ত করেছিল। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি শুধু বলেছিলে—'আমার ওপর বিশ্বাস থাকলে কোনো প্রশ্ন কোরো না।' বিশ্বাস? এভাবে বিশ্বাস রাখা যায় রাইসা?"
রাইসা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দীর্ঘ চার বছর ধরে জমে থাকা বিষাদটা আজ রাতের এই সাড়ে তিনটা বাজে যেন উগরে দেওয়ার সময় এসেছে।
"তুমি সত্যিটা কোনো দিন জানতে চাওনি রাফসান," রাইসা নিচু কিন্তু দৃঢ় গলায় বলতে শুরু করল। "তুমি শুধু তোমার অহংকার আর ক্ষোভ আঁকড়ে ধরে বসে ছিলে। সাকিব সাহেব তোমার বিরুদ্ধে যে জালিয়াতির ফাইল তৈরি করেছিল, সেই ফাইলের মূল কপিটা জোগাড় করার জন্য আমাকে তার সাথে দেখা করতে হয়েছিল। আমার এক পুরোনো বান্ধবীর মাধ্যমে আমি তার সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করি। আমি তার সাথে ছলাকলা করে, তার ভুল ধারণা ভাঙিয়ে সেই ফাইলটা হাতিয়ে নিয়েছিলাম—যাতে সে তোমার ক্যারিয়ার নষ্ট করতে না পারে।"
রাফসান চমকে উঠে বিছানায় বসে পড়ল। তার চোখ দুটি গোল গোল হয়ে গেল। "কী বললে তুমি? তুমি আমার জন্য..."
"হ্যাঁ, রাফসান! আমি সেই রাতে সাকিবকে যে ফাইলটা দিয়েছিলাম, সেটা ছিল একটা ভুয়া চুক্তিপত্র। আর তার বিনিময়ে আমি তোমার বিরুদ্ধে থাকা আসল প্রমাণগুলো নিয়ে এসেছিলাম। পরদিন সকালে তোমার উকিল যে হঠাৎ করেই মামলা থেকে রেহাই পেয়েছিল, সেটা আকাশ থেকে পড়েনি! কিন্তু তুমি? তুমি বাড়ি ফিরে আমাকে চরম সন্দেহ করলে। আমাকে অপমান করলে। আমার আত্মসম্মানে এত জোর আঘাত লেগেছিল যে, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম—যে মানুষটা আমাকে সামান্যতম বিশ্বাস করতে পারল না, তাকে আমি সত্যিটা বলে দয়া ভিক্ষা চাইব না।"
রাইসার কথাগুলো শেষ হতেই ঘরের মধ্যে যেন একটা বোমা ফাটল। রাফসান নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। গত চার বছর ধরে সে যে বিষাক্ত সন্দেহ বুকে পুষে রেখেছিল, তা ছিল এক মস্ত বড় ভুল! রাইসা তাকে ধোঁকা দেয়নি, বরং তার সম্মান আর ক্যারিয়ার বাঁচাতে নিজের আত্মসম্মান বাজি রেখেছিল।
"রাইসা... তুমি... তুমি আমাকে আগে বলোনি কেন?" রাফসানের গলা দিয়ে সাউন্ড বের হচ্ছিল না। তার চোখের কোণে জল জমে উঠল।
"বলিনি, কারণ তোমার চোখে আমি ভালোবাসার চেয়ে সন্দেহ বেশি দেখেছিলাম," রাইসা মুখ ফিরিয়ে নিল।
কথাটা শোনামাত্রই রাফসানের ভেতরে থাকা পুরুষালি অহংকার এক মুহূর্তে চুরমার হয়ে গেল। চরম অপরাধবোধে তার মন ভরে উঠল। সে আর সহ্য করতে পারল না। এক ঝটকায় রাইসাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। রাফসানের চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়তে লাগল, যা রাইসার খালি কাঁধে এসে পড়ল।
"আমাকে ক্ষমা করে দাও, রাইসা... আমাকে ক্ষমা করে দাও! আমি কত বড় মূর্খ ছিলাম!" রাফসান কান্নায় ভেঙে পড়ল।
রাইসা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। রাফসানের এই রূপ সে কোনো দিন দেখেনি। রাফসানের বুকের ভেতর নিজের মুখটা লুকিয়ে সেও ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। এত বছরের অভিমান, দূরত্ব আর যন্ত্রণা যেন সেই চোখের পানিতে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার হয়ে যেতে লাগল।
কান্নার তীব্রতা কমতেই ঘরের আবহাওয়া আবার বদলে যেতে শুরু করল। কিন্তু এবার আর কোনো অভিমান বা ক্ষোভ ছিল না, ছিল কেবল অনুশোচনা আর গভীর ভালোবাসার তীব্র আকর্ষণ। রাফসান রাইসার মুখটা তুলে ধরে তার ভেজা চোখে, গালে আর কপালে একের পর পর চুমু দিতে লাগল। তার প্রতিটা চুমুতে ছিল নিঃশর্ত সমর্পণ আর ভালোবাসার বার্তা।
"আমি তোমাকে কতটা ভালোবেসেছি আর কতটা মিস করেছি, তুমি ধারণাও করতে পারবে না," রাফসান ফিসফিস করে বলল।
রাফসান রাইসার শাড়ির অবশিষ্ট অংশ এবং অন্তর্বাসগুলো এক টানে সরিয়ে দিল। এবার তাদের মাঝে কোনো বাধা রইল না। রাফসানের শরীর আবার উষ্ণ হয়ে উঠল পরম তৃষ্ণায়। সে রাইসার মসৃণ উরুতে হাত রেখে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে আনল। রাইসা দুই হাতে রাফসানের পিঠের মাংসপেশি শক্ত করে চেপে ধরল।
রাফসানের ঠোঁট নামল রাইসার স্তনবৃত্তে। গভীর ভালোবাসায় আর উন্মাদনায় রাইসাকে ভরিয়ে তুলতে লাগল সে। রাইসার মুখ থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল এক অদ্ভূত তৃপ্তির গোঙানি। চার বছরের না-পাওয়ার তীব্র ক্ষুধা দুটো শরীরকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেল। বিছানার চাদর দুমড়ে-মুচড়ে একাকার হয়ে গেল তাদের যৌথ শরীরের ওঠানামায়।
রাত চারটে বেজে দশ মিনিট। শহরের বাইরের বিপদের কথা যেন এই মুহূর্তে তাদের মন থেকে একদম মুছে গেছে।
ঘরের বাতাসে তখন শুধু দুটো প্রাণবন্ত শরীরের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস আর চামড়ার সাথে চামড়ার মৃদু ঘর্ষণের শব্দ। চার বছরের জমাটবদ্ধ দীর্ঘশ্বাস আর ভুল বোঝাবুঝির কালো মেঘ কেটে গিয়ে এখন কেবলই উপচে পড়ছে ব্যাকুলতা। রাফসানের শরীরের প্রতিটি পেশি যেন রাইসাকে পুরোপুরি নিজের করে নেওয়ার জন্য আকুল হয়ে উঠেছে, আর রাইসাও তার সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে রাফসানকে সমর্পণ করেছে।
রাফসান তার হাত দুটো রাইসার কোমরের খাঁজে শক্ত করে চেপে ধরে তাকে নিজের ওপর তুলে নিল। রাইসার দীর্ঘ কালো চুলগুলো রাফসানের বুকের ওপর ছড়িয়ে পড়ল। আবছা আলোয় রাইসার মুখের ওপর চুইয়ে পড়া ঘামের বিন্দুগুলোকে নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করতে দেখাচ্ছিল। রাইসা রাফসানের দিকে তাকিয়ে এক পলক হাসল—যে হাসিতে ছিল পরম তৃপ্তি আর চার বছরের কষ্ট ভুলে যাওয়ার এক অপূর্ব আনন্দ।
"রাফসান... তুমি আর কোনো দিন আমাকে ছেড়ে যাবে না তো?" রাইসা রাফসানের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, তার ঠোঁট দুটো রাফসানের কানের লতিতে মৃদু কামড় বসাল।
রাফসান এক চরম আবেশে চোখ দুটো বন্ধ করল। তারপর রাইসার উরু দুটো শক্ত করে ধরে তাকে আরও গভীরে টেনে নিল। রাইসার মুখ থেকে এক তীব্র ভালোবাসার আক্ষেপ বেরিয়ে এল।
"কখনো না, রাইসা। আমার জীবনে মৃত্যু এলেও আমি তোমাকে আর দূরত্ব তৈরি করতে দেব না," রাফসান নিচু কিন্তু পাথরের মতো দৃঢ় গলায় বলল।
রাফসানের উত্তাল গতির সাথে রাইসার শরীর ছন্দ মেলাতে লাগল। বিছানার চাদরটা ইতোমধ্যে তাদের শরীরের নিচে দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা যেন স্ফুটনাঙ্কে পৌঁছে গেছে। রাফসানের ঠোঁট রাইসার ঘাড়, বুক আর নাভির ওপর ভালোবাসার গভীর ছাপ একে দিতে লাগল। প্রতিটা স্পর্শে রাইসা শিউরে উঠছিল, তার নখ রাফসানের শক্ত পিঠে ভালোবাসার গভীর আঁচড় কেটে দিচ্ছিল। সেই আঁচড়ের ব্যথায় রাফসান কোনো কষ্ট পাচ্ছিল না, বরং তা যেন তাকে আরও বেশি উন্মাদ করে তুলছিল।
দীর্ঘ সময় ধরে চলা সেই শরীর ও মনের চরম মেলবন্ধন যখন চূড়ান্ত সীমানায় পৌঁছাল, তখন দুজনই একসাথে এক তীব্র তৃপ্তির সাগরে তলিয়ে গেল। রাফসান রাইসাকে বুকে জড়িয়ে ধাবমান সাগরের মতো আছড়ে পড়ল বিছানায়। রাইসা তার মাথাটা রাফসানের চওড়া বুকের ওপর রেখে হাঁপাতে লাগল। রাফসানের বুকের দপদেপ ধুকপুকানি স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।
কয়েক মিনিটের জন্য ঘরে নেমে এল পরম এক শান্তি। কোনো কথা নেই, কোনো ঝগড়া নেই, কোনো ক্ষোভ নেই—আছে কেবল দুজন মানুষের এক হয়ে থাকার অদ্ভুত নীরবতা। রাফসান তার এক হাত দিয়ে রাইসার ভেজা চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিল এবং তার কপালে একটা দীর্ঘ ঠোঁট বসাল।
হঠাৎ করেই টেবিলের ওপর রাখা রাফসানের ল্যাপটপ আর ফোন দুটো একসাথে বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল ফাইয়াজের মেসেজ আর ফোন কল। রাতের চরম উত্তেজনায় তারা ভুলেই গিয়েছিল যে বাইরে একটা বিশাল পারিবারিক ও আইনি ঝড় অপেক্ষা করছে!
ঘড়িতে তখন রাত পাঁচটা বেজে কুড়ি মিনিট। ভোরের আলো ফুটতে আর বেশি দেরি নেই।
রাফসান এক ঝটকায় নিজেকে সামলে নিয়ে ফোনের স্পিকার অন করল। ওপাশ থেকে ফাইয়াজের ব্যাকুল কণ্ঠ ভেসে এল, "ভাইয়া! বড় চাচার ছেলেরা অলরেডি উকিল নিয়ে গ্রামে তাদের লোক পাঠিয়েছে। সকাল আটটায় তারা ভুয়া দলিলে সই করিয়ে রেজিস্ট্রি অফিসে জমা দেবে! তুমি কি ঢাকার লকার থেকে মূল ট্রাস্টের ফাইল আর পারমিশন লেটারটা রেডি করতে পেরেছ? রাইসা ভাবীর সই ছাড়া কিন্তু আমরা আইনি অ্যাকশনে যেতে পারছি না!"
রাফসান রাইসার দিকে তাকাল। রাইসা ইতোমধ্যে চাদরটা গায়ে জড়িয়ে উঠে বসেছে। তার চোখে এখন আর কোনো দুর্বলতা নেই, আছে এক নতুন শক্তিতে বলীয়ান হওয়ার দীপ্তি।
"ফাইয়াজ, তুই চিন্তা করিস না," রাইসা ফোনটা নিজের হাতে নিয়ে শান্ত কিন্তু বরফের মতো কঠোর গলায় বলল। "ফাইল পুরোপুরি রেডি। আর এই ট্রাস্টের মূল জিম্মাদার হিসেবে আমি নিজেই হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের পেপার ডিজিটাল সাইন করে পাঠিয়ে দিচ্ছি। তোর বড় চাচা বা তার ছেলেরা আমাদের পরিবারের এক ইঞ্চি জমিও ছুঁতে পারবে না।"
রাফসানের চোখ দুটো বিস্ময়ে আর গর্বে বড় হয়ে গেল। যে রাইসাকে সে এতদিন ধরে অভিমানী আর একগুঁয়ে মনে করত, সেই রাইসাই আজ তাদের পরিবারের সবচেয়ে বড় ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
"তুমি সত্যি পারবে তো রাইসা?" রাফসান তার হাতটা রাইসার হাতের ওপর রেখে শুধাল।
রাইসা রাফসানের চোখের দিকে তাকিয়ে একটা রহস্যময় হাসি দিল। "তোমার স্ত্রী এতটাও দুর্বল নয় রাফসান। চল, হাতে সময় খুব কম। কাগজগুলো স্ক্যান করে ইমেইল করতে হবে, আর আমাদের যৌথ স্বাক্ষরগুলো ডিজিটালি অ্যাটাচ করতে হবে।"
দুজনে বিছানা ছেড়ে উঠল। সকালের আলো ফোটার আগের এই শেষ দেড় ঘণ্টা সময় তাদের জন্য এক মহা পরীক্ষার ক্ষেত্র।
ঘড়িতে সকাল ছয়টা বেজে দশ মিনিট। ভোরের আলো ধীরগতিতে ঘরের পর্দা ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করছে। রাতের জমাট বাঁধা অন্ধকার কেটে গিয়ে ঘরজুড়ে এক শুভ্র আলো ছড়িয়ে পড়েছে। তবে সেই আলোর সাথে সাথে রাফসান আর রাইসার ব্যস্ততাও চরম রূপ নিয়েছে।
ঘরের এক পাশে রাখা রিডিং টেবিলে ল্যাপটপ অন করে বসেছে রাফসান। পাশে চাদরটা জড়িয়ে ল্যাপটপের দিকে ঝুঁকে আছে রাইসা। তাদের শরীরে রাতের তীব্র উন্মাদনার চিহ্ন আর কাজের চরম ব্যস্ততা একাকার হয়ে গেছে। ফাইলের পাতায় থাকা জটিল আইনি ধারাগুলো একে একে যাচাই করছে রাইসা। রাফসান একের পর এক ডিজিটাল সিকিউরিটি কোড বসিয়ে ট্রাস্টের মূল ফাইলগুলো লকমুক্ত করছে।
"রাইসা, ক্লাজ ফিফটিন-বি দেখো। এখানে বলা আছে ট্রাস্টি যদি উপস্থিত না থাকে, তবে জরুরি অবস্থায় মূল সম্পত্তির সিদ্ধান্ত স্থগিত করা যাবে
না। বড় চাচার উকিলরা এই ফাঁক গলেই সুযোগ নিতে চাইছে," রাফসান কপালে আঙুল চেপে ধরে বলল।
রাইসা স্মিত হাসল। তার ক্ষুরধার মস্তিষ্ক ইতোমধ্যেই চাল চালতে শুরু করে দিয়েছে। সে ল্যাপটপের কিবোর্ডে দ্রুত হাতে টাইপ করতে করতে বলল, "তারা হয়তো ভুলে গেছে যে বাবার মূল উইলে একটা সাব-ক্লাজ যোগ করা হয়েছিল। সেই ধারা অনুযায়ী ট্রাস্টি বা তার মনোনীত প্রতিনিধি একক সিদ্ধান্ত স্থগিত করার সরাসরি ক্ষমতা রাখেন। আমি এখনই সেই অথরাইজেশন লেটার উইথ ডিজিটাল সিগনেচার ল ইয়ারের কাছে ইমেইল করছি।"
রাইসার এই আত্মবিশ্বাস আর বিচক্ষণতা দেখে রাফসান স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল। গত চারটে বছর ধরে সে যে মানুষকে শুধুই একগুঁয়ে মনে করেছে, তার ভেতরের এই বুদ্ধিমত্তা আর শক্তি সে কোনো দিন উদ্ঘাটন করার চেষ্টাই করেনি। রাইসা কেবল তার ভালোবাসার মানুষ নয়, সে জীবনের প্রতিটা আইনি ও পারিবারিক লড়াইয়ে পাশে দাঁড়ানোর মতো এক অনন্য সঙ্গী।
ইমেইল সেন্ড হওয়ার সাথে সাথেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল—'মেসেজ সেন্ট সাকসেসফুলি'। ফাইয়াজের ইমেইলেও এক কপি সিকিউরড ফাইল চলে গেছে।
ঠিক সাড়ে ছয়টায় ফাইয়াজের ফোন আবার এলো। এবার তার গলায় ভীতি বা ব্যাকুলতা নেই, বরং রয়েছে জয়ের চরম আনন্দ।
"ভাইয়া! ভাবী!" ফাইয়াজ প্রায় চিৎকার করে উঠল। "হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ আর ভাবীর ডিজিটাল সাইনের কপি রেজিস্ট্রি অফিসে পৌঁছানো মাত্রই চাচার উকিলদের মুখ একদম চুন হয়ে গেছে! তারা ভেবেছিল এত রাতে ঢাকা থেকে কোনো কাগজপত্র রেডি করা অসম্ভব। কিন্তু তোমরা পুরো চক্রান্ত পণ্ড করে দিয়েছ! জমি আর ট্রাস্টের সম্পত্তি এখন সম্পূর্ণ নিরাপদ!"
কথাটা শেষ হতেই রাফসান দীর্ঘশ্বাস ফেলে ল্যাপটপের স্ক্রিনটা বন্ধ করল। তাদের ওপর থেকে একটা বিরাট পাহাড় যেন নেমে গেল। রাফসান চেয়ার থেকে উঠে রাইসার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
ভোরের আলোয় রাইসার ফ্যাকাশে মুখটা এক অদ্ভুত সৌন্দর্যে রূপ নিয়েছে। রাইসা চেয়ার ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই রাফসান তাকে টেনে নিজের বুকের কাছে নিয়ে এলো।
"থ্যাঙ্ক ইউ, রাইসা... থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ," রাফসান রাইসার কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল। তার গলায় কান্না জমে এসেছে।
রাইসা রাফসানের বুকে নিজের মুখটা রেখে মিষ্টি করে হাসল। "আমাকে ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই, রাফসান। এটা আমারও সংসার, আমারও দায়িত্ব।"
রাফসান রাইসার মুখটা নিজের দুই হাতের তালুতে তুলে নিল। "আমি চারটে বছর নষ্ট করেছি, রাইসা। একটা চরম ভুল ধারণার পেছনে ছুটে আমাদের ভালোবাসার দিনগুলোকে ছাই করে দিয়েছি। কিন্তু আজকের এই রাতটা না এলে... আমি কোনো দিনই জানতে পারতাম না তুমি আমাকে কতটা ভালোবাসো, আর আমার জীবনের জন্য তুমি কতটা অপরিহার্য।"
রাইসার চোখ দুটো আবার জলে ভরে উঠল, তবে এবার সেই জল কষ্টের নয়, পরম তৃপ্তির। সে রাফসানের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে একটা গভীর কিন্তু শান্ত চুমু দিল।
রাতের সেই উত্তাল সমুদ্র পার হয়ে তারা এখন এসে পৌঁছেছে ভালোবাসার এক শান্ত সুশীতল মোহনায়। ভোরের হালকা ঠাণ্ডা বাতাসে তারা দুজনে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। দূর আকাশে সূর্য উঠছে, ঠিক যেমন তাদের ভেঙে যাওয়া দাম্পত্য জীবনেও দীর্ঘ অন্ধকার শেষে এক নতুন ভোরের উদয় হচ্ছে।
সোডিয়াম আলোর হলুদ আভা পার হয়ে ভোরের প্রথম স্নিগ্ধ রোদ তখন ধানমন্ডির বারান্দাটায় এসে ছড়িয়ে পড়েছে। পাখির কলকাকলিতে চারপাশটা মুখরিত। বাতাসটায় ভোরের এক অপূর্ব সতেজতা, যা চার বছর পর আজ প্রথম রাফসান আর রাইসার ফুসফুসে এক গভীর শান্তির ছোঁয়া এনে দিল।
রাইসা বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার এলোমেলো চুলগুলো ভোরের হাওয়ায় হালকা উড়ছে। শরীরজুড়ে রাতের সেই ঘামের ও ভালোবাসার সুবাসের পর এখন এক ধরনের পরম ক্লান্তি, কিন্তু মনে এক অসীম প্রশান্তি। রাফসান পেছন থেকে এসে রাইসাকে জড়িয়ে ধরল। তার দু-হাত রাইসার পেটের ওপর শক্ত করে বাঁধা, আর থুতনিটা রাইসার কাঁধে রাখা।
"কী ভাবছ?" রাফসান রাইসার কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে মিষ্টি গলায় শুধাল।
রাইসা পেছন ফিরে রাফসানের গলায় নিজের দু-হাত জড়িয়ে ধরল। রাফসানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "ভাবছি, একটা ভুলের জন্য আমরা জীবনের কতগুলো সুন্দর দিন নষ্ট করে ফেলেছি। গত চারটে বছর এই এক ছাদের নিচে থেকেও কত দূরে ছিলাম আমরা। আজকের এই রাতটা যদি না আসত, তবে হয়তো সারা জীবন এভাবেই কেটে যেত।"
রাফসান রাইসার ঠোঁটে একটা আলতো চুমু দিল। "অতীতকে আর টেনে আনার দরকার নেই, রাইসা। সেই অন্ধকার রাতটা শেষ হয়ে গেছে। এখন আমাদের সামনে একটা নতুন সকাল, নতুন জীবন।"
ঘরের ভেতর এসে রাফসান রাইসাকে বাহুডোরে তুলে নিল। রাইসা একটু চমকে উঠে রাফসানের শার্ট শক্ত করে ধরল, তারপর খিলখিল করে হেসে উঠল—কতটা বছর পর রাইসার এই বাঁধভাঙা হাসি শুনল রাফসান! বিছানায় রাইসাকে শুইয়ে দিয়ে রাফসান তার পাশে শুয়ে পড়ল। দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল পরম ভালোবাসায়।
রাফসান রাইসার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, "আজ থেকে আমাদের সম্পর্কে কোনো গোপনীয়তা থাকবে না, কোনো সন্দেহ থাকবে না। কোনো সমস্যা হলে আমরা মুখোমুখি বসে কথা বলব। আর কখনোই একে অপরকে একা ছেড়ে দেব না।"
"প্রতিজ্ঞা করো?" রাইসা তার আইব্রো নাচিয়ে প্রশ্ন করল।
"আমার অস্তিত্বের শপথ, রাইসা। আমি প্রতিদিন, প্রতিটা মুহূর্তে তোমাকে ভালোবাসব," রাফসান গম্ভীর কিন্তু আস্থাপূর্ণ গলায় বলল।
রাইসা নিজেকে রাফসানের বুকের মধ্যে লুকিয়ে ফেলল। রাফসানের বুকের উষ্ণ স্পন্দন রাইসাকে এক পরম নিরাপত্তার অনুভূতি দিল। এতগুলো বছরের জমে থাকা মান-অভিমান, কান্না আর শারীরিক দূরত্ব—সবকিছু যেন ভোরের এই স্নিগ্ধ রোদে ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেছে।
সকালের সূর্য এখন অনেকটাই ওপরে উঠে গেছে। ঘরের পর্দাগুলো বাতাসের দোলায় দুলছে। কাজের ঝুটঝামেলা, আইনি লড়াই আর পারিবারিক চক্রান্ত পেছনে ফেলে দুই পিপাসিত আত্মা এখন একে অপরের বুকে খুঁজে পেয়েছে তাদের আসল ঠিকানা।
আজ সকালে সম্পর্কটা আর আগের মতো নেই—সন্দেহ আর দেয়ালের সম্পর্ক আজ পরিণত হয়েছে এক অবিচ্ছেদ্য, গভীর ও চিরন্তন ভালোবাসার বাঁধনে। এক ঝড়ের রাতে শুরু হওয়া গল্পটা
অবশেষে পৌঁছে গেল এক পূর্ণাঙ্গ ও মধুর পরিণতিতে।
....