শরতের বিকেলে ঢাকার গুলশান লেকের ধারের হাওয়ায় একটা অদ্ভুত শীতলতা থাকে। লেকের পানিতে ডুবন্ত সূর্যের সোনাঝরা আলো নাচছে, আর কচুরিপানার জটলার মাঝখান থেকে থেকে কেঁপে উঠছে মৃদু ঢেউ। লেকের বাঁধানো পাড়ে বসে কাঠের বেঞ্চটায় ঝরা পাতা কুড়াচ্ছিল নুসরাত। তার পরনে হালকা বাসন্তী রঙের সুতির সালোয়ার-কামিজ, কাঁধে এলমেলোভাবে ফেলা ওড়না। বাতাস এসে বারবার তার মুখের ওপর এসে পড়া চুলগুলোকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। আংটিবিহীন অনামিকায় হাতের আঙুলগুলো প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে নুসরাত নিজের হাতের ঘড়ির দিকে তাকাল। বিকেল পাঁচটা বেজে বিশ মিনিট।
পুরোনো বন্ধু সায়েমের সাথে আজ দীর্ঘ সাত বছর পর দেখা হওয়ার কথা। সেই যে এইচএসসি পরীক্ষার পর সায়েম স্কলারশিপ নিয়ে তুরস্কে চলে গেল, তারপর থেকে সম্পর্কের বাঁধনটা যেন সময়ের অতলে আস্তে আস্তে শিথিল হয়ে এসেছিল। প্রথম প্রথম ফোনে কথা হতো, তারপর মেসেজ, আর একসময় ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে দুজন দুদিকে ছিটকে গেল। কিন্তু এতদিন পর পরশু রাতে সায়েম যখন হুট করে ফোন করে বলল—"নুসরাত, আমি ঢাকায় ফিরেছি। পরশু বিকেলে গুলশান লেকপাড়ে আসতে পারবি?"—তখন নুসরাতের বুকের ভেতর একটা অচেনা তোলপাড় শুরু হয়েছিল।
"অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিস?"
হঠাৎ সুগভীর, কিছুটা খসখসে অথচ অদ্ভুত পুরুষালী একটা গলা শুনে নুসরাত চমকে উঠে পেছনে তাকাল।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে কয়েক সেকেন্ডের জন্য নুসরাতের শ্বাস আটকে গেল। এ কি সত্যিই সায়েম? নুসরাতের স্মৃতির অ্যালবামে যে সায়েম ধুলো জমিয়ে বসে ছিল, সে ছিল রোগা-পাতলা, চশমা চোখে দেওয়া এক লাজুক ছেলে। কথা বলতে গেলে যে বন্ধুদের সামনেও তোতলাত, যে কখনো সোজাসুজি কারো চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারত না।
কিন্তু এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক আমূল বদলে যাওয়া পুরুষ। ছয় ফুটের কাছাকাছি সুগঠিত শরীর, চওড়া কাধ, পরনে গাঢ় নীল রঙের ফিটেড শার্ট—যার হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো—আর কালো ট্রাউজার্স। সায়েমের চশমাটা আর নেই, তার বদলে দুটি গভীর, তীক্ষ্ণ চোখ সোজা তাকিয়ে আছে নুসরাতের দিকে। তার চোয়ালের ধারালো গড়ন আর হালকা খোঁচা খোঁচা দাড়ি তাকে এক ধরনের গম্ভীর আর আকর্ষণীয় আভা দিয়েছে। চন্দনের সঙ্গে মৃদু ওডি কোলনের মিশ্রিত ঘ্রাণ সায়েমের শরীর থেকে ভেসে এসে নুসরাতের চারপাশের বাতাসকে এক মুহূর্তে ভারী করে তুলল।
"কী হলো? এভাবে ভূতের মতো দেখছিস কেন?" সায়েমের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে বাঁকা হাসি।
নুসরাত নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু মুখে কোনো কথা সরল না। সাত বছরের ব্যবধান এত সহজে এক মুহূর্তে মিলিয়ে যাওয়া সম্ভব? সে তো নিজের ছোটবেলার সেই ভীরু সায়েমকে খুঁজতে এসেছিল, কিন্তু এ কোন অচেনা ঝড়ের মুখোমুখি দাঁড়াল সে?
"সায়েম... তুই?" নুসরাত অস্ফুটে বলল, তার গলায় খানিকটা ইতস্তত ভাব।
"হুম, আমি। এত বদলে গেছি নাকি যে চিনতেই পারছিস না?" সায়েম এক ধাপ এগিয়ে এলো।
তাদের মধ্যে দূরত্ব এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির। সায়েমের এই সামান্য এগিয়ে আসাতেই নুসরাতের বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডের গতি অদ্ভুতভাবে বেড়ে গেল। সে অনুভব করল, সায়েমের উপস্থিতি আগের চেয়ে অনেক বেশি সংক্রামক, অনেক বেশি তীব্র।
"তুই... অনেকটা বদলে গেছিস," নুসরাত কোনোমতে নিজেকে সামলে বলল। "এতটা লম্বা আর... এমন গম্ভীর হয়ে গেলি কীভাবে?"
সায়েম হালকা হেসে হাত বাড়িয়ে দিল। তবে সাধারণ সৌজন্যমূলক হাত বাড়ানো নয়, সে সরাসরি নুসরাতের ডান হাতটি নিজের সুগঠিত, উষ্ণ হাতের তালুর মধ্যে তুলে নিল। সায়েমের আঙুলের স্পর্শ নুসরাতের চামড়ায় লাগতেই যেন একটা সূক্ষ্ম বিদ্যুতের তরঙ্গ খেলে গেল নুসরাতের সারা শরীরে। সে শিউরে উঠল। সায়েমের হাতের তালু শক্ত, কিছুটা খসখসে, অথচ স্পর্শের ভঙ্গিটা অবিশ্বাস্য রকমের কোমল।
"মানুষ তো বদলায়ই, নুসরাত। কিন্তু কিছু জিনিস একই রকম থেকে যায়," সায়েম নুসরাতের চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বলল। তার চোখের দৃষ্টিতে এত গভীরতা ছিল যে নুসরাত নিজের চোখ সরিয়ে নিতে বাধ্য হলো।
সায়েম তার হাতটা ছাড়ল না, বরং আলতো চাপে ধরে রেখেই লেকের ধারের বেঞ্চে এসে বসল এবং নুসরাতকেও টেনে তার পাশে বসাল। এত কাছাকাছি বসার কারণে সায়েমের শার্টের সুতি কাপড় নুসরাতের বাহু স্পর্শ করছিল। সায়েমের গায়ের ওডি কোলনের উষ্ণ ঘ্রাণ নুসরাতের ঘ্রাণেন্দ্রিয়কে আচ্ছন্ন করে ফেলছিল।
"তোর কথা বল," সায়েম নুসরাতের দিকে সামান্য ঝুঁকে বলল। তার গভীর কণ্ঠস্বর নুসরাতের কানের লতিতে এসে ধাক্কা খেল। "ছবিতে তোকে দেখতাম, কিন্তু সামনাসামনি তোকে যে এত... সুন্দর লাগছে, তা আমি কল্পনাও করিনি।"
নুসরাতের গাল দুটো মুহূর্তে রক্তিম হয়ে উঠল। সায়েমের মুখে এমন সরাসরি প্রশংসা সে আগে কখনো শোনেনি। ছোটবেলায় সায়েম নুসরাতের দিকে তাকাতেও লজ্জা পেত, আর আজ সেই সায়েমই নির্দ্বিধায় তার চোখের দিকে তাকিয়ে তার রূপের প্রশংসা করছে! নুসরাতের বুক ধড়ফড় করতে লাগল। সে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে রইল, যা এখনো সায়েমের শক্ত মুঠোর ভেতর বন্দি।
"তুই কি আমার হাতটা এভাবেই ধরে রাখবি?" নুসরাত হালকা হেসে নিজের লজ্জা ঢাকার চেষ্টা করল, কিন্তু তার গলার কাঁপনটা গোপন রইল না।
সায়েম নুসরাতের আঙুলগুলোর ওপর নিজের বুড়ো আঙুলটা আস্তে বুলাতে বুলাতে বলল, "কেন? তোর কি খারাপ লাগছে? বহু বছর তোকে ছুঁয়ে দেখা হয়নি নুসরাত। আজ যখন হাতটা ধরেছি, মনে হচ্ছে যেন নিজের হারিয়ে যাওয়া কোনো মূল্যবান ধন আবার খুঁজে পেলাম।"
শব্দগুলো সায়েমের মুখ থেকে এত প্রগাঢ় আবেগে বের হলো যে নুসরাতের মনের ভেতরের সমস্ত তর্ক বা যুক্তি এক নিমেষে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল। তার মনে হলো, এই মানুষটা যে শুধু বাইরে থেকে বদলে গেছে তা নয়, তার ভেতরের ব্যক্তিত্বেও এক প্রচণ্ড পুরুষালী আকর্ষণ যুক্ত হয়েছে, যা নুসরাতকে এক অচেনা মোহের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
বাতাস একটু জোরে বইতেই নুসরাতের কয়েক গোছা চুল তার মুখের ওপর এসে পড়ল। চোখ ঢেকে গেল তার। নুসরাত হাত বাড়িয়ে চুলগুলো সরাতে যাবে, তার আগেই সায়েমের বাঁ হাতটা আলতো করে তার গালে স্পর্শ করল। সায়েম নিজের দীর্ঘ আঙুল দিয়ে খুব সাবধানে নুসরাতের মুখ থেকে চুলগুলো সরিয়ে কানের পেছনে গুঁজে দিল।
এই স্পর্শে সায়েমের আঙুলের পেছনের অংশ নুসরাতের তুলতুলে গাল স্পর্শ করে গেল। নুসরাত নিশ্বাস বন্ধ করে ফেলল। সায়েমের চোখের মনি দুটো যেন অন্ধকার সাগরের মতো গভীর হয়ে উঠেছে, যেখানে ডুবে যাওয়া ছাড়া নুসরাতের আর কোনো উপায় নেই। সায়েমের আঙুলগুলো নুসরাতের কানের লতি ছুঁয়ে আস্তে করে তার চিবুক চেপে ধরল।
"তুই এখনো ঠিক আগের মতোই অবুঝ আছিস," সায়েম ফিসফিস করে বলল। তার ঠোঁট নুসরাতের গালের এত কাছাকাছি চলে এসেছিল যে সায়েমের তপ্ত নিশ্বাস নুসরাতের চামড়ায় স্পষ্ট অনুভূত হচ্ছিল। "কিন্তু আমি আর আগের মতো ভীরু নই, নুসরাত।"
নুসরাতের বুকের ভেতর এক অজানা ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হলো। ছোটবেলার সুপ্রিয় বন্ধুটির জন্য তার মনে যে ভালোবাসার সুপ্ত বীজ এত বছর ধরে ঘুমিয়ে ছিল, সায়েমের এই একটিমাত্র স্পর্শে তা যেন রক্ত গোলাপের মতো ফুটতে শুরু করল। কিন্তু সেই সাথে একটা ভয়ও তার মনে সাপের মতো আঁকাবাঁকা হয়ে উঠে এলো—যদি এই অনুভূতির নাম অন্য কিছু হয়? যদি এই নতুন আকর্ষণ, এই তীব্র রোমাঞ্চ তাদের বহু বছরের নিষ্পাপ বন্ধুত্বটাকে চিরতরে জ্বালিয়ে ছাই করে দেয়?
সায়েম নুসরাতের চিবুক ছেড়ে দিয়ে তার হাতটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। সূর্যের শেষ রক্তিম আভা লেকের পানিতে মিশে যেতেই চারপাশটা গোধূলির মায়াবী অন্ধকারে ঢেকে যেতে লাগল।
"চল, তোকে আজ আমার প্রিয় একটা জায়গায় নিয়ে যাব," সায়েম উঠে দাঁড়িয়ে নুসরাতকে আলতো করে টেনে তুলল।
নুসরাত কিছু বলল না, শুধু নিশব্দে সায়েমের পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। তবে সে জানত, আজকের এই সন্ধেটা তাদের জীবনের সব পুরোনো হিসাব-নিকাশ উল্টে দিতে যাচ্ছে। বন্ধুত্বের মোড়কে ঢেকে রাখা ভয় আর এক গোপন, তীব্র কামনার খেলা মাত্র শুরু হলো।
গুলশান লেকপাড় থেকে বেরিয়ে সায়েম নুসরাতকে নিয়ে এলো ধানমন্ডির এক শান্ত, নির্জন ক্যাফেতে। ক্যাফেটির আলো-আঁধারি পরিবেশ আর মৃদু যন্ত্রসঙ্গীতের আবহ পুরো পরিবেশকে এক মায়াবী রূপ দিয়েছে। কোণার দিকের একটি কোজি সোফায় দুজন সামনাসামনি বসল। টেবিলের ওপর জ্বলতে থাকা ছোট্ট মোমবাতির শিখাটা থেকে থেকে কেঁপে উঠছিল, আর সেই আলোয় সায়েমের ধারালো মুখের আদল আরও তীব্র ও আকর্ষণীয় দেখাচ্ছিল।
নুসরাত কিছু বলল না, শুধু নিশব্দে সায়েমের পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। তবে সে জানত, আজকের এই সন্ধেটা তাদের জীবনের সব পুরোনো হিসাব-নিকাশ উল্টে দিতে যাচ্ছে। বন্ধুত্বের মোড়কে ঢেকে রাখা ভয় আর এক গোপন, তীব্র কামনার খেলা মাত্র শুরু হলো।
গুলশান লেকপাড় থেকে বেরিয়ে সায়েম নুসরাতকে নিয়ে এলো ধানমন্ডির এক শান্ত, নির্জন ক্যাফেতে। ক্যাফেটির আলো-আঁধারি পরিবেশ আর মৃদু যন্ত্রসঙ্গীতের আবহ পুরো পরিবেশকে এক মায়াবী রূপ দিয়েছে। কোণার দিকের একটি কোজি সোফায় দুজন সামনাসামনি বসল। টেবিলের ওপর জ্বলতে থাকা ছোট্ট মোমবাতির শিখাটা থেকে থেকে কেঁপে উঠছিল, আর সেই আলোয় সায়েমের ধারালো মুখের আদল আরও তীব্র ও আকর্ষণীয় দেখাচ্ছিল।
নুসরাত এখনো মন থেকে সেই অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। গুলশান লেকের ধারে সায়েমের স্পর্শের উত্তাপ যেন এখনো তার গালে, তার হাতের তালুতে জ্বলজ্বল করছে।
"কী খাবি বল?" সায়েম মেনু কার্ডটা নুসরাতের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল। তার কণ্ঠের গভীরতা এই শান্ত ক্যাফেতে আরও বেশি মাদকতাময় শোনালো।
"তুই যা অর্ডার করবি, তাই," নুসরাত নিচু স্বরে বলল। সে সায়েমের সোজা তাকানো চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারছিল না। চোখ মিললেই বুকের ভেতরের স্পন্দন অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছিল।
সায়েম ওয়েটারকে ডেকে দুটো ক্যাপুচিনো আর রেড ভেলভেট কেকের অর্ডার দিল। ওয়েটার চলে যাওয়ার পর সায়েম নিজের কনুই দুটো টেবিলে রেখে নুসরাতের দিকে আরও কিছুটা ঝুঁকে বসল। তার চোখের আলো যেন নুসরাতের ভেতরের সব গোপন চিন্তা পড়ে ফেলার চেষ্টা করছিল।
"তোর চোখ দুটো এখনো ঠিক আগের মতোই আছে," সায়েম খুব ধীরে, প্রায় ফিসফিস করে বলল। "মিষ্টি, নিষ্পাপ... কিন্তু এখন যেন এগুলোর ভেতরে একঝাঁক প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। কী ভাবছিস নুসরাত?"
নুসরাত এক মুহূর্তের জন্য চাওয়া থামাল, তারপর সায়েমের দিকে তাকিয়ে বলল, "ভাবছি তুই কতটা বদলে গেছিস। সেই যে শান্ত, লাজুক সায়েম ছিল... সে আজ কোথায় গেল? এই সায়েম তো খুব সহজেই যেকোনো মেয়েকে নিজের কথায় বা চোখের ইশারায় ঘায়েল করে ফেলতে পারে।"
কথাটা বলেই নুসরাত জিভে কামড় দিল। এতটা স্পষ্ট করে বলাটা কি ঠিক হলো?
সায়েমের ঠোঁটে এক রাজকীয় হাসি ফুটে উঠল। সে হাত বাড়িয়ে ক্যাফের টেবিলের ওপর রাখা নুসরাতের নরম আঙুলগুলোর ওপর নিজের গরম হাতের তালু রাখল। আলতো করে নুসরাতের আঙুলগুলো নিজের আঙুলের ফাঁকে ঢুকিয়ে দিল। এই ঘনিষ্ঠতায় নুসরাতের পুরো শরীরে আবার সেই পরিচিত বিদ্যুৎ খেলে গেল।
"যেকোনো মেয়েকে ঘায়েল করা আমার উদ্দেশ্য নয়, নুসরাত," সায়েমের চোখ দুটো হঠাৎ যেন অনেক বেশি গাঢ় হয়ে উঠল। সে নুসরাতের হাতটা নিজের ঠোঁটের কাছাকাছি তুলে আনল এবং নুসরাতের হাতের উল্টো পিঠে নিজের উষ্ণ ঠোঁট স্পর্শ করালো।
সেই কোমল অথচ প্রলুব্ধকর চুম্বনে নুসরাতের শ্বাসনালী যেন এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে এলো। তার চোখ দুটো আপনাতেই বুজে এলো নেশাগ্রস্তের মতো। সায়েমের ঠোঁটের উত্তাপ নুসরাতের চামড়া ভেদ করে একেবারে তার হৃদপিণ্ডে গিয়ে পৌঁছাল।
"আমার উদ্দেশ্য শুধু একজনকে ঘায়েল করা... যে সাত বছর ধরে আমার মনের পুরোটা জায়গা দখল করে বসে আছে," সায়েম নুসরাতের গালের কাছে মুখ এনে নিচু গলায় বলল।
নুসরাতের চোখ মুহূর্তেই খুলে গেল। বুকের ভেতরটা তীব্র গতিতে তোলপাড় হতে শুরু করল। সায়েম কি তবে... কিন্তু পরক্ষণেই ভয়ের এক বরফশীতল স্রোত তার মাথায় গিয়ে ধাক্কা মারল। সায়েম কি শুধুই সাময়িক আবেগে এসব বলছে? নাকি সত্যিই তার মনে গভীর কিছু আছে? কিন্তু নুসরাত যদি নিজের ভেতরের এই উথাল-পাথাল চেপে রাখতে না পেরে সায়েমকে ভালোবেসে ফেলে, আর শেষ পর্যন্ত যদি জানতে পারে সায়েমের কাছে এটা শুধুই এক পুরোনো বন্ধুর সাথে কাটানো কিছু রোমাঞ্চকর মুহূর্ত ছিল? তাহলে তো তাদের সুদীর্ঘ বন্ধুত্বের সুন্দর স্মৃতিটাও চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে!
"সায়েম, প্লিজ..." নুসরাত কোনোমতে হাতটা টেনে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। তার গলার আওয়াজ কাঁপছিল। "তুই কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি করছিস। আমরা ভালো বন্ধু, মনে আছে তো?"
সায়েম হাত ছাড়ল না, বরং নুসরাতের চোখের ভীতি আর দ্বিধা আঁচ করতে পেরে তার হাতের মুঠো আরও কিছুটা শক্ত করল, কিন্তু তাতে কোনো জোর ছিল না, ছিল শুধুই এক তীব্র আধিপত্য আর ভালোবাসা।
"বন্ধু?" সায়েম হালকা এক নিঃশ্বাস ফেলল, যার তপ্ত হাওয়া নুসরাতের গলায় গিয়ে লাগল। "সাত বছর আগে আমরা বন্ধু ছিলাম, নুসরাত। কিন্তু বিদেশের ওই যান্ত্রিক জীবনে প্রতিটা রাতে যখন আমি একা চোখ বুজতাম, তখন শুধু তোর চেহারাটা ভেসে উঠত। বন্ধুত্বের সীমা অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। তুই কি সত্যিই সেটা বুঝতে পারছিস না, নাকি না বোঝার ভান করছিস?"
ওয়েটার কফি নিয়ে আসায় সায়েম বাধ্য হয়ে হাত ছেড়ে দিল। নুসরাত দ্রুত নিজের হাতটা কোলে টেনে নিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার হৃদয় আর মস্তিষ্ক দুটো যেন দুই বিপরীত দিকে টানছিল। সায়েমের এই তীব্র আকর্ষণ, এই পুরুষালী রোমান্স তাকে পাগলের মতো টানছে, কিন্তু হারাবার ভয় তাকে পিছু হটাচ্ছে।
কফি খাওয়া শেষ করে সায়েম যখন নুসরাতকে তার বাসায় পৌঁছে দিতে গাড়িতে উঠল, ততক্ষণে বাইরে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আছড়ে পড়ছিল। গাড়ির ভেতরের এসি আর বাইরে ঝরতে থাকা বৃষ্টির শীতলতায় এক অদ্ভুত রোমান্টিক আবহ তৈরি হলো। সায়েম গাড়ি ড্রাইভ করার সময় একদম চুপচাপ ছিল, কিন্তু তার শান্ত ভাবটাই নুসরাতের মনে এক তীব্র উত্তেজনা তৈরি করছিল।
নুসরাতের বাসার গলির মুখে এসে সায়েম গাড়ি থামাল। বাইরের আবছা স্ট্রিটলাইটের আলো গাড়ির কাচ ভেদ করে নুসরাতের ভেজা মুখের ওপর এসে পড়ছিল।
নুসরাত গাড়ির দরজা খুলতে যাবে, অমনি সায়েম ডান হাত বাড়িয়ে নুসরাতের কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের দিকে টেনে আনল। নুসরাত কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিজেকে আবিষ্কার করল সায়েমের একদম বুকের কাছে। সায়েমের হৃদস্পন্দনের শব্দ নুসরাতের কানে স্পষ্টভাবে বাজছিল—দ্রুত, ভারী এবং চঞ্চল।
"সায়েম..." নুসরাত হাঁপিয়ে উঠে সায়েমের চওড়া বুকে নিজের দুর্বল হাত দুটি রাখল।
"আমাকে এত ভয় পাচ্ছিস কেন, নুসরাত?" সায়েম তার মুখটা নুসরাতের গলার ভাঁজে নামিয়ে আনল। তার ঠোঁট নুসরাতের কানের ঠিক পেছনের সংবেদনশীল চামড়া স্পর্শ করতেই নুসরাতের মুখ থেকে এক হালকা সুবাসিত নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো। সায়েম খুব ধীরে তার ঠোঁট বুলাতে লাগল নুসরাতের নরোম গলায়।
নুসরাতের হাতের মুঠো সায়েমের শার্টের কাপড় আঁকড়ে ধরল। তার চোখ বুজে আসছিল, এক অদ্ভুত মায়াবী সুখে সারা শরীর অবশ হয়ে আসছিল। সায়েমের হাত নুসরাতের পিঠের ওপর দিয়ে উঠে এসে তার নরোম চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল।
দুই জোড়া চোখ একবিন্দুতে এসে মিলল। সায়েমের চোখে ছিল অপ্রকাশিত ভালোবাসার এক তীব্র তৃষ্ণা, আর নুসরাতের চোখে ছিল ভয়মিশ্রিত এক গভীর আত্মসমর্পণ। সায়েম আস্তে আস্তে মুখ নামিয়ে আনল নুসরাতের গোলাপি ঠোঁটের কাছাকাছি...
নুসরাতের মনে হলো, আর এক সেকেন্ড, আর একটা ক্ষণ... তার পরেই হয়তো তারা এমন এক সীমানায় পা দেবে যেখান থেকে আর কোনোদিন ফিরতি পথ থাকবে না।
সায়েমের ঠোঁট নুসরাতের কাঁপা ঠোঁটের ঠিক এক মিলিমিটার দূরে এসে থমকে গেল। গাড়ির ভেতরের এসি আর বাইরের বৃষ্টিস্নাত অন্ধকারের মাঝে দুজন মানুষের তপ্ত নিশ্বাস একাকার হয়ে যাচ্ছিল। নুসরাতের হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি এত দ্রুত হচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল বুকের পাঁজর ভেঙে বেরিয়ে আসবে। সে সায়েমের শার্টের কাপড়টা দুহাতে খামচে ধরে রেখেছিল—জানি না ধাক্কা দিয়ে দূরে ঠেলে দেওয়ার জন্য, নাকি আরও কাছে টেনে নেওয়ার আকুলতায়।
কিন্তু শেষ মুহূর্তে নুসরাতের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা ভয়ের দৈত্যটা আবার জেগে উঠল। ভালোবাসা তো শুধু এক রাতের তীব্র আকর্ষণ নয়; যদি সায়েমের এই আবেগ কাল সকালে মিলিয়ে যায়? যদি এই স্পর্শের গভীরতায় তাদের শৈশবের পবিত্র বন্ধুত্বটা চিরতরে হারিয়ে যায়?
"সায়েম... না, প্লিজ!" নুসরাত হঠাৎ মুখটা একপাশে সরিয়ে নিল। তার গলা দিয়ে এক ধরনের আকুল কান্না মিশে থাকা প্রতিরোধ ঝরে পড়ল।
সায়েম সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে থামিয়ে নিল। তার তপ্ত নিশ্বাস নুসরাতের গালের ওপর এসে আছড়ে পড়ছিল। কয়েক সেকেন্ড সায়েম কোনো কথা বলল না, শুধু নিজের এক হাত নুসরাতের কোমর ঘিরে শক্ত করে ধরে রাখল, যেন তাকে একদম ছেড়ে দিতে তার মন সায়েব দিচ্ছে না। সায়েমের চোখের মনি দুটো অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছিল, সেখানে এক অপ্রকাশিত বেদনার ছায়া।
"তুই আমাকে এখনো বিশ্বাস করতে পারছিস না, তাই তো?" সায়েমের গলাটা অস্বাভাবিক রকম খসখসে আর নিচু শোনালো।
সে নুসরাতের কোমর থেকে হাত সরিয়ে আনল, কিন্তু পুরোপুরি দূরত্ব তৈরি করল না। তার দীর্ঘ, উষ্ণ আঙুলগুলো নুসরাতের থরথর করে কাঁপতে থাকা থুতনিতে স্পর্শ করে তার মুখটা আবার নিজের দিকে ঘোরাল।
"তোর কি মনে হয় নুসরাত, আমি বিদেশের শত শত সুন্দরীর ভিড় পেরিয়ে শুধু একটা সাময়িক রোমাঞ্চের জন্য তোর কাছে ফিরে এসেছি?" সায়েমের কণ্ঠস্বরে আক্ষেপ আর ভালোবাসার এমন এক তীব্র মিশ্রণ ছিল যা নুসরাতের বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে দিল। "আমি সাতটা বছর নিজেকে তিল তিল করে গড়ে তুলেছি শুধু তোর যোগ্য হওয়ার জন্য। কিন্তু তুই আজও আমাকে সেই পুরোনো সায়েম ভাবিস, যে নিজের মনের কথা বলতে ভয় পেত।"
"তুই ভুল বুঝছিস সায়েম!" নুসরাত চোখের জল সামলাতে না পেরে মাথা নাড়ল। "আমি তোকে অবিশ্বাস করছি না। আমি ভয় পাচ্ছি... আমাদের এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় পাচ্ছি। যদি ভালোবাসার নাম দিতে গিয়ে আমরা আমাদের সেই সুন্দর অতীতটাকেও হারিয়ে ফেলি? আমি তোকে হারাতে পারব না সায়েম, কিছুতেই না।"
সায়েম নুসরাতের চোখের কোণে জমে থাকা একফোঁটা জল নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে খুব আলতো করে মুছে দিল। তার স্পর্শে এতখানি মমতা ছিল যে নুসরাতের শরীরের সব প্রতিরোধ এক মুহূর্তে খসে পড়ল।
"আমি তোকে হারাতে দেব না নুসরাত," সায়েম অত্যন্ত গম্ভীর ও দৃঢ় স্বরে বলল। "বন্ধুত্ব ছিল আমাদের ভিত, কিন্তু প্রেম আমাদের পরিণতি। তুই চাইলেও এই টান এড়াতে পারবি না।"
সায়েম নুসরাতের নরোম হাতটা আবার নিজের বুকের ঠিক মাঝখানে এনে চেপে ধরল। সায়েমের শক্ত বুকের ছাতি আর তার ভেতরে হাতুড়ির মতো আছড়ে পড়তে থাকা হৃৎস্পন্দন নুসরাত স্পষ্ট অনুভব করতে পারল।
"শুনতে পাচ্ছিস?" সায়েম নুসরাতের চোখের দিকে অপলক তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল। "এই হৃদপিণ্ডটা সাত বছর ধরে শুধু তোর নামেই স্পন্দিত হয়েছে। তুই দূরে যেতে চাইলে যাক, কিন্তু তোর শরীরের প্রতিটা রক্তকণিকা জানে যে তুইও আমাকে ততটাই চাস, যতটা আমি তোকে চাই।"
সায়েমের এই অকাট্য সত্যি আর তার পুরুষালী ব্যক্তিত্বের তীব্র টান নুসরাতের মনের সব বাঁধ ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছিল। নুসরাত অনুভব করল, সায়েম একদম ঠিক বলছে। সে নিজেকে যতই বোঝাক না কেন, সায়েমের এই স্পর্শ, তার এই ঘ্রাণ, তার এই অধিকারবোধের সামনে নুসরাতের আত্মসংযোম সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে।
নুসরাত আর কোনো কথা বলতে পারল না। সে সায়েমের বুক থেকে হাত না সরিয়ে সোজা তার চোখের দিকে তাকাল। সায়েমের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাদময় অথচ প্রলুব্ধকর হাসি। সে আবার নুসরাতের ঝুঁকে এলো।
এবার নুসরাত সরলো না, কিংবা সরতে পারল না।
সায়েম তার ঠোঁট দুটো খুব সাবধানে নুসরাতের কপালে রাখল। এক দীর্ঘ, গভীর চুম্বনে নুসরাতের সমস্ত ভয় আর সংশয় যেন চুষে নিল। তারপর সায়েম তার ঠোঁট নামিয়ে আনল নুসরাতের দুচোখের পাতায়, তার পর গালে... আর শেষমেশ নুসরাতের উন্মুক্ত গলার সুবাসিত চামড়ায়।
সায়েমের প্রতিটি চুম্বনে ছিল এক উন্মাদনা আর তৃষ্ণা। নুসরাতের শরীর শিউরে উঠল, তার হাত দুটো আপনাতেই সায়েমের ঘাড় পেঁচিয়ে ধরল। নুসরাত নিজের অজান্তেই সায়েমের চুলের ভেতর আঙুল চালিয়ে তাকে আরও কাছে টেনে নিল। গাড়ির জানলায়
আছড়ে পড়া বৃষ্টি আর ভেতরের ভালোবাসার ওম—দুটো মিলে যেন এক অলৌকিক মায়াজাল বুনে চলল।
নুসরাত..." সায়েম তার ঠোঁট নুসরাতের ঠোঁটের ঠিক ওপরে এনে অস্ফুটে ডাকল। "আজ রাতে অন্তত অস্বীকার করিস না যে তুই শুধুই আমার।"
নুসরাতের চোখ দুটো নেশাগ্রস্তের মতো বুজে আসছিল। সে সায়েমের তপ্ত গালের সাথে নিজের গাল ঘষে এক অবিশ্বাস্য আবেশে সায়েমের বুকে মাথা গুঁজে দিল।
বাইরের বৃষ্টি তখন আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ঢাকার রাতের রাজপথ এখন নিঝুম, আর সেই নির্জনতার মাঝে দুটো অতৃপ্ত হৃদয় অবশেষে ভালোবাসার প্রথম ঝড়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই ঝড়ের গতি কোথায় গিয়ে থামবে, তা দুজনের কারোরই জানা ছিল না।
বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ তখন অনেকটাই ধীর হয়ে এসেছে, কিন্তু গাড়ির ভেতরের উত্তাপ আর তীব্র আবেগের রেশ একটুও কমেনি। নুসরাত সায়েমের বুকে মুখ গুঁজে অচেনাই এক শান্তির পরশ পাচ্ছিল। সায়েমের বুকের নিয়মিত ধুকপুকানি তাকে একটা অদ্ভুত সুরক্ষার অনুভূতি দিচ্ছিল, যা সে এতদিন কোথাও পায়নি।
সায়েম আলতো করে নুসরাতের পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে তার চুলে নিজের থুতনি ঠেকিয়ে রাখল। নুসরাতের সুবাসিত চুলের গন্ধ সায়েমের মস্তিষ্ককে যেন আরও মাতাল করে তুলছিল।
"কীরে, এখন ভয়টা একটু কমেছে?" সায়েম নিচু, গম্ভীর গলায় ফিসফিস করে বলল।
নুসরাত সায়েমের বুক থেকে ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার গাল দুটো রক্তিম আভায় লাল হয়ে আছে, চোখের কোল ঘেঁষে এক অবুঝ লজ্জার স্পষ্ট ছাপ। সায়েম নুসরাতের এই রূপ দেখে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না। সে নুসরাতের গালের ওপর থেকে এক গোছা ভেজা চুল আলতো করে সরিয়ে কানের পেছনে গুজে দিল। সায়েমের দীর্ঘ আঙুলের ঠান্ডা আর গরমের সংমিশ্রণ নুসরাতের চামড়ায় এক অচেনা শিহরণ জাগাল।
"তুই আমাকে একদম অচল করে দিস, সায়েম," নুসরাত সায়েমের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে বলল, গলায় তার সত্য স্বীকারের স্পষ্ট সুর। "আমি চাইলেও তোর এই টানের সামনে নিজেকে ধরে রাখতে পারছি না। কিন্তু তবুও মনে হয়... যদি সব স্বপ্ন হয়ে যায়? যদি কাল সকালে উঠে দেখি এই সায়েমটা আবার হারিয়ে গেছে?"
সায়েম নুসরাতের কথা শুনে শান্ত কিন্তু অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে তার দুটো হাত নিজের হাতে তুলে নিল। সায়েমের চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই আরও গভীর ও প্রগাঢ় হয়ে উঠল।
"আমি আর কোথাও যাচ্ছি না, নুসরাত," সায়েম গম্ভীর গলায় বলল। "তুরস্কে থাকার সময় প্রতিটা দিন আমি শুধু একটাই স্বপ্ন দেখতাম—কবে ঢাকায় ফিরব, কবে তোকে নিজের শক্ত বাহুডোরে জড়িয়ে ধরে বলব যে তুই শুধু আমার। এই সায়েম আর কোনোদিন তোর কাছ থেকে দূরে যাবে না, যদি না তুই নিজে আমাকে ঠেলে ফেলে দিস।"
কথাগুলো সায়েমের মুখ থেকে এত সত্য আর প্রগাঢ়ভাবে বেরিয়ে এলো যে নুসরাতের মনের সব শেষ দ্বিধাও ধুলোয় মিশে গেল। সায়েম হাত বাড়িয়ে নুসরাতের কোমর চেপে ধরে তাকে আরও একটু নিজের কাছাকাছি টেনে আনল। এবার তাদের মধ্যে আর কোনো ব্যবধান রইল না।
সায়েমের তপ্ত ঠোঁট এসে ঠেকল নুসরাতের চিবুকে। তারপর সেখান থেকে নেমে এসে নুসরাতের ঘাড়ের সংবেদনশীল অংশে নরোম পরশ দিতে লাগল। সায়েমের প্রতিটি চুম্বনে ছিল এক অপরিসীম ক্ষুধা আর বাঁধভাঙা রোমাঞ্চ। নুসরাতের মুখ দিয়ে আলতো এক তৃপ্তির শব্দ বেরিয়ে এলো, সে সায়েমের চওড়া কাঁধ দুটো শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।
"সায়েম..." নুসরাত চোখ বুজে অস্ফুটে ডাকল।
"বল, আমার জান," সায়েম নুসরাতের গলার ভাঁজে মুখ রেখে নিচু স্বরে বলল। তার তপ্ত নিশ্বাস নুসরাতের চামড়ায় একদম আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছিল।
"আমাদের বন্ধুত্বটা কি সত্যি হারিয়ে যাবে?" নুসরাতের কণ্ঠে হালকা শঙ্কা তখনও উঁকি মারছিল।
সায়েম এবার মুখ তুলে নুসরাতের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে এক মায়াবী, প্রলুব্ধকর হাসি। সে নুসরাতের নিচের ঠোঁটটা নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে আলতো করে চেপে ধরে বলল, "বন্ধুত্ব হারিয়ে যাচ্ছে না নুসরাত, ওটা নতুন রূপ নিচ্ছে। আমাদের শৈশবের সেই নিষ্পাপ বন্ধনটা আজ এক প্রাপ্তবয়স্ক, গভীর ভালোবাসার রূপ নিচ্ছে—যেখানে কোনো লুকোচুরি নেই, আছে শুধু এক অপরকে পুরোপুরি নিজের করে নেওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।"
সায়েমের এই কথাগুলোর পর নুসরাত আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে নিজের ভেতরের সব লাজ-লজ্জার প্রাচীর ভেঙে সায়েমের গলায় দুহাত পেঁচিয়ে ধরল এবং সায়েমের গালের সাথে নিজের গাল শক্ত করে চেপে ধরল। নুসরাতের এই অপ্রত্যাশিত সাড়া সায়েমকে যেন এক মুহূর্তে উন্মাদ করে তুলল। সায়েম নুসরাতের পিঠের ওপর নিজের হাত দুটো আরও শক্ত করে চেপে ধরে তাকে একেবারে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল।
গাড়ির ভেতরের আবছা আলোয় দুই জোড়া তৃষ্ণার্ত চোখ আবার একে অপরের খুব কাছাকাছি এলো। সায়েম আস্তে আস্তে ঝুঁকে এলো নুসরাতের কাঁপতে থাকা মিষ্টি ঠোঁট দুটোর ওপর। এবার আর কোনো দ্বিধা বা বাধা নুসরাতকে আটকাতে পারল না। নুসরাত নিজের চোখ দুটো বুজে ফেলে আত্মসমর্পণ করল সেই প্রলুব্ধকর মুহূর্তে।
বাইরের বৃষ্টি তখন একদম থেমে গিয়ে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। স্ট্রিটলাইটের আলোয় ভিজতে থাকা ধানমন্ডির সেই নিঝুম রাস্তা সাক্ষী রইল—বহু বছর ধরে জমে থাকা দুটো বন্ধুর গোপন দীর্ঘশ্বাস কীভাবে আজ রাতে এক তীব্র, গভীর ভালোবাসার মোহনায় এসে মিশে গেল। কিন্তু এই সম্পর্কের পথে যে আরও কিছু জটিল সত্য অপেক্ষা করছিল, তা নুসরাত তখনও পুরোপুরি আঁচ করতে পারেনি।
গাড়ির কাচে জমে থাকা হালকা বাষ্পের ওপর দিয়ে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। রাতের সেই ঝড়ো হাওয়া আর শ্রাবণের টানা বৃষ্টি থেমে গিয়ে এক স্নিগ্ধ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কিন্তু নুসরাতের মনে যেন এক নতুন ঝড়ের পূর্বাভাস দেখা দিতে শুরু করল।
সায়েমের বুকের ওপর নুসরাতের মাথাটা রাখা ছিল। সায়েম খুব আলতো করে নুসরাতের পিঠে আর চুলে হাত বোলাচ্ছিল। তার ছান্দিক হাতের পরশ নুসরাতকে এক অলৌকিক সুখে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু একই সাথে এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছিল।
নুসরাত ধীরে ধীরে সায়েমের বুক থেকে উঠে বসল। সায়েমের দিকে তাকিয়ে দেখল, তার চোখে এক অপরিসীম প্রশান্তি আর ভালোবাসা জ্বলজ্বল করছে। সায়েম হাত বাড়িয়ে নুসরাতের আলগা হয়ে যাওয়া চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল।
"কী ভাবছিস এত?" সায়েমের কণ্ঠস্বর ভোরের হাওয়ার মতোই নরম আর গম্ভীর। "রাতের সব দ্বিধা কি এখনো শেষ হয়নি?"
নুসরাত এক গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। সে সায়েমের হাত দুটি নিজের হাতের মুঠোয় নিল। সায়েমের হাতের উত্তাপ নুসরাতের ভেতরের জমে থাকা অস্বস্তি কিছুটা কমাল, কিন্তু পুরোপুরি মেটাতে পারল না।
"সায়েম, রাতের এই গভীর অনুরাগে আমি নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছি সত্যি... কিন্তু এবার তো আমাদের বাস্তবের মুখোমুখি হতে হবে," নুসরাত নিচু স্বরে বলল, তার গলায় এক অজানা শঙ্কা। "আমাদের পরিবার, আমাদের আত্মীয়স্বজন—তারা সবাই তো আমাদের সেই ছোটবেলার সাধারণ দুই বন্ধু হিসেবেই চেনে। হুট করে এই গভীর প্রেমের রূপটা তারা কীভাবে গ্রহণ করবে? বিশেষ করে আমার বাসা থেকে তো বেশ কিছুদিন ধরেই আমার বিয়ের জন্য পাত্র দেখা শুরু করেছে..."
কথাটা শোনামাত্রই সায়েমের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। সায়েমের চোখের মায়াবী আলোটা মুহূর্তেই এক তীব্র, পুরুষালী আধিপত্য আর সুরক্ষার আশ্বাসে বদলে গেল। সে এক ঝটকায় নুসরাতের কোমর ধরে তাকে নিজের একদম কাছাকাছি টেনে আনল। সায়েমের বুক আর নুসরাতের বুকের মধ্যে এবার এক সুতোরও দূরত্ব রইল না।
"অন্য কারো নাম আমার সামনে বলবি না, নুসরাত," সায়েম নুসরাতের গালে নিজের এক হাত রেখে অত্যন্ত দৃঢ় গলায় বলল। সায়েমের আঙুলগুলো নুসরাতের গালে আলতো চাপ সৃষ্টি করল। "তোর ওপর অধিকার শুধু আর শুধু আমার। পরিবারকে কীভাবে সামলাতে হয়, সেটা আমার ওপর ছেড়ে দে। আমি এত বছর পর দেশে ফিরেছি তোকে অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য নয়, তোকে নিজের ঘরনি করে নিয়ে যাওয়ার জন্য।"
সায়েমের এই একচ্ছত্র অধিকারবোধ আর ভালোবাসার তীব্রতা নুসরাতের বুকের ভেতরটা আবার কাঁপিয়ে তুলল। সায়েম মুখ নামিয়ে নুসরাতের কানের লতিতে নিজের ঠোঁট স্পর্শ করল। তার তপ্ত নিশ্বাসের তোড়ে নুসরাত শিউরে উঠল, তার হাত দুটো সায়েমের চওড়া পিঠের শার্ট খামচে ধরল।
"সায়েম..." নুসরাতের মুখ দিয়ে এক অস্ফুট আর্তনাদ বেরিয়ে এলো, যার মধ্যে তীব্র ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
"আমাকে বিশ্বাস কর, নুসরাত," সায়েম নুসরাতের থুতনি ধরে তার মুখটা নিজের দিকে ফেরাল। সায়েমের ঠোঁট নুসরাতের কাঁপা ঠোঁটের একদম কাছে এনে ফিসফিস করে বলল, "যে সায়েম তোকে শৈশব থেকে ভালোবেসে এসেছে, সে তোকে আগলে রাখতেও জানে। আমাদের ভালোবাসার মাঝে পৃথিবীর কোনো বাধা আসতে পারবে না।"
সায়েম আস্তে আস্তে নিজের ঠোঁট নামিয়ে আনল নুসরাতের ঠোঁটে। রাতের উন্মাদনার পর ভোরের এই প্রথম চুম্বনে ছিল এক অপরিসীম আত্মপ্রত্যয় আর অঙ্গীকার। নুসরাত নিজের সমস্ত শঙ্কা আর ভয় ভুলে সায়েমের বাহুডোরে বিলীন হয়ে গেল। সায়েমের ঠোঁটের স্পর্শ নুসরাতকে বোঝাল যে, এই ভালোবাসার থেকে পিছিয়ে আসার কোনো পথ আর খোলা নেই—সায়েম তাকে শত বাধা পেরিয়েও নিজের করে নেবে।
গাড়ির বাইরে ভোরের নরম সূর্য উঠেছে। ঢাকার রাস্তায় নতুন দিনের কোলাহল শুরু হতে যাচ্ছে। কিন্তু সেই সব কোলাহলকে দূরে ঠেলে দিয়ে সায়েম আর নুসরাত একে অপরের উষ্ণতায় নিমজ্জিত হয়ে রইল—এক অনিশ্চিত কিন্তু প্রগাঢ় ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ানোর সংকল্প নিয়ে।
সূর্যের সোনালি আলো তখন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকার বুদ্বুদময় আকাশে। গাড়ির কাচ পেরিয়ে সেই আলো সায়েম আর নুসরাতের গায়ে এসে পড়তেই যেন এক নতুন সকালের স্নিগ্ধতা ছুঁয়ে গেল তাদের। নুসরাতের মনে এতক্ষণ যে সংশয় আর অনিশ্চয়তার কালো মেঘ জমেছিল, সায়েমের একচ্ছত্র ভালোবাসার কাছে তা শিশিরের মতোই মিলিয়ে গেছে।
সায়েম নুসরাতের কপালে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। তারপর নুসরাতের দুটো হাত নিজের শক্ত দুই হাতের তালুতে তুলে নিয়ে গভীর চোখে তাকাল।
"চল, আজই তোর বাসায় গিয়ে তোর বাবার সাথে কথা বলি," সায়েম অত্যন্ত সহজ কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল।
নুসরাত চমকে উঠে সায়েমের দিকে তাকাল, "আজই? কিন্তু সায়েম... হঠাৎ করে কীভাবে?"
সায়েমের ঠোঁটে ফুটে উঠল সেই পরিচিত আত্মবিশ্বাসী হাসি। সে নুসরাতের গালটা আলতো করে ছুঁয়ে বলল, "তুই এতদিন ভয়ে পেয়েছিস যে আমরা ভালোবাসা প্রকাশ করলে আমাদের পুরোনো বন্ধুত্বটা হারিয়ে যাবে। কিন্তু সত্য হলো, আমাদের শৈশবের সেই নিষ্কলঙ্ক বন্ধুত্বই আজকের এই গভীর প্রেমের সবচেয়ে শক্ত ভিত। আমি কালক্ষেপণ করতে চাই না, নুসরাত। তোকে নিজের স্ত্রী হিসেবে নিজের ঘরে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমি আর একটা দিনও অপেক্ষা করতে রাজি নই।"
সায়েমের এই নির্ভীক উচ্চারণ নুসরাতের বুকের ভেতর এক অপূর্ব শিহরণ জাগাল। সে সায়েমের বুকে মাথা রেখে এক দীর্ঘ, তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলল। সায়েম তার এক হাত নুসরাতের কোমরে পেঁচিয়ে ধরে তাকে বুকের সাথে চেপে রাখল, আর অন্য হাত দিয়ে নুসরাতের সুবাসিত চুলে বিলি কেটে দিতে লাগল।
"তুই সত্যিই অনেক বদলে গেছিস, সায়েম," নুসরাত মুখ তুলে সায়েমের চিবুকে নিজের চোখ মেলাল। "আগের সেই লাজুক সায়েম থাকলে হয়তো আজও মনের কথা না বলে দূরে দূরেই পালিয়ে বেড়াত।"
"ওই বদলটা শুধু তোর জন্যই নুসরাত," সায়েম নুসরাতের চিবুক উঁচিয়ে ধরে গলার কাছে মুখ নামিয়ে আনল। তার উষ্ণ ঠোঁটের পরশ নুসরাতের সংবেদনশীল চামড়ায় লাগতেই নুসরাত আবার শিউরে উঠল। সায়েম নিচু, গভীর স্বরে বলল, "তোকে ভালোবাসার চরম সীমায় নিয়ে যাওয়ার জন্য, তোকে রক্ষা করার জন্য আমার এই বদলে যাওয়াটা খুব দরকার ছিল।"
নুসরাত আর কোনো তর্ক করল না। সে সায়েমের গলায় দুহাত জড়িয়ে ধরে সায়েমকে আরও কাছে টেনে নিল। সায়েমের তপ্ত নিশ্বাস, তার শরী থেকে ভেসে আসা মিষ্টি ঘ্রাণ, আর তার শরীরের প্রবল পুরুষালী উষ্ণতা নুসরাতকে এক অলৌকিক আবেগে ভরিয়ে দিল। নুসরাত বুঝে গেল, এই মানুষটার বুকের ভেতরই তার আসল ঠিকানা।
সায়েম এবার নুসরাতের গোলাপি ঠোঁট দুটো নিজের ঠোঁটের বন্ধনে আগলে নিল। সেই চুম্বনে আর কোনো ভয় ছিল না, ছিল না কোনো দ্বিধা। ছিল শুধু এক অপরকে পুরোপুরি নিজের করে নেওয়ার এক চিরন্তন প্রতিশ্রুতি আর অসীম তৃষ্ণা। ভোরের শান্ত পরিবেশে তাদের দুটো তৃষ্ণার্ত হৃদয় অবশেষে এক হয়ে গেল।
গাড়িটি এবার স্টার্ট দিল সায়েম। ধানমন্ডির নিঝুম রাস্তা পেরিয়ে গাড়িটা এগিয়ে চলল নুসরাতের বাসার দিকে।
নুসরাত সায়েমের কাঁধে মাথা রেখে সায়েমের বাঁ হাতটি নিজের বুকের ওপর শক্ত করে ধরে রাখল। সায়েম ড্রাইভ করতে করতেই মাঝে মাঝে নুসরাতের দিকে তাকিয়ে তার হাতে আলতো চাপ দিচ্ছিল। শৈশবের সেই দূরন্ত বন্ধুত্বের পথ ধরে শুরু হওয়া গল্পটা আজ এক প্রগাঢ়, রোমাঞ্চকর আর অনুরাগময় ভালোবাসার মোহনায় এসে মিলিত হলো—যেখানে কোনো ভয় নেই, আছে শুধু আজীবন একসাথে চলার পরম আশ্বাস।
....