একঘেয়ে শহরের বুকে কিছু নীরব নিমন্ত্রণ থাকে, যা কোনো কোনো মানুষের জীবনের দিক বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ঢাকার ধানমণ্ডির একটা চারতলা ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে ঢাকা কলেজের মাস্টার্সের ছাত্র তাহসিনের প্রতিটি সকাল শুরু হয়। তাহসিন খুব হিসেবি ছেলে, লেখাপড়া আর নিজের আঁকাআঁকির জগত ছাড়া অন্য কিছুতে তার মন টানে না। কিন্তু গত কয়েক মাসে তার সেই নিয়মমাফিক জীবনে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত অথচ অদ্ভুত মিষ্টি ছন্দ চলে এসেছে।
সেই ছন্দের নাম পাশের বাড়ির চারতলার বারান্দায় বা জানালায় প্রতিদিন ঠিক বিকেল চারটায় এসে দাঁড়ানো মেয়েটি। তাহসিন জেনেছে তার নাম মিম। নামটা সে জানতে পেরেছিল একদিন নিচে দারোয়ানের সাথে মিমের বাবার কথা বলার সময়। নামটা যেমন ছোট, মেয়েটির শান্ত চোখ দুটো যেন ততটাই গভীর ও রহস্যময়।
প্রতিদিন বিকেল চারটা বাজলেই তাহসিনের মনের ভেতর একটা আনচান অনুভূতি কাজ করে। সে হাতের সব কাজ ফেলে বারান্দায় এসে দাঁড়ায় বা নিজের পড়ার ঘরের জানালার পর্দাটা একটু সরিয়ে দেয়। ওপাশের জানালায় ঠিক তখনই এসে দাঁড়ায় মিম। মিমের পরনে থাকে সাধারণ সুতি সালোয়ার কামিজ, চুলগুলো থাকে আলগা করে পিঠে ফেলা। মিম হয়তো কখনো দূরে তাকিয়ে থাকে, কখনো জানালায় হাত রেখে রোদের ওম নেয়, আবার কখনো এক পলকের জন্য তাকায় তাহসিনের দিকে।
তাদের মধ্যে কখনো একটি অক্ষরেরও বিনিময় হয়নি। কোনো কথা হয়নি, কোনো ইশারাও হয়নি যেটাকে প্রথাগত প্রেম বলা যায়। কিন্তু চোখের সেই নীরব ভাষা যে কত শত অভিধানকে তুচ্ছ করে দিতে পারে, তা তাহসিন প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে উপলব্ধি করে। যখন মিমের চোখ আর তাহসিনের চোখ একবিন্দুতে এসে মেলে, তখন যেন পুরো শহরের কোলাহল এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে যায়। ধানমণ্ডির ব্যস্ত রাস্তার গাড়ির হর্ন, রিকশার টুংটাং শব্দ—সব কিছু ধোঁয়াশার মতো মিলিয়ে যায়। সেখানে শুধু থেকে যায় দুজন মানুষের দুটি জোড়া চোখ এবং এক অনির্বচনীয় ভালো লাগার অনুরণন।
তাহসিন লক্ষ্য করেছে, মিমের চোখের দৃষ্টিতে এক ধরনের গভীর আকুলতা থাকে। সে যেন কিছু বলতে চায়, কিন্তু সমাজ কিংবা নীরবতার কোনো অদৃশ্য দেয়াল তাকে আটকে রাখে। তাহসিনের তুলি ইদানীং শুধু একটা মুখই আঁকতে জানে। তার ক্যানভাসগুলো ভরে উঠতে শুরু করেছে মিমের নানা ভঙ্গিমার ক্যানডিড স্কেচে। কখনও জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে থাকা মিম, কখনও চুলে বাতাস লাগা মিম, আবার কখনও সরাসরি ক্যানভাসের দিকে—অর্থাৎ তাহসিনের দিকে তাকিয়ে থাকা মিম।
তাহসিন ভাবতো, এই তো বেশ চলছে। অনুভূতির এই গোপন নদীর কোনো নাম দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু ভালোবাসা যে কখন চুপিচুপি হৃদয়ের সবচেয়ে গভীর গহীনে শেকড় গেড়ে বসে, মানুষ তা নিজে বেঁচে থাকতে বুঝতে পারে না।
আজও বিকেল চারটা বাজল। দেয়ালঘড়ির কাঁটা যখন চারটার ঘর স্পর্শ করল, তাহসিনের বুকটা বরাবরের মতোই অজানা এক শিহরণে কেঁপে উঠল। সে প্রতিদিনের মতোই এক কাপ চা হাতে নিয়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বিকেলের কনেদেখা রোদ এসে পড়েছে ওপাশের জানালার ওপর। কিন্তু জানালার থাই গ্লাসটা বন্ধ। পর্দাগুলো ভারী হয়ে ঝুলছে, ভেতর থেকে কোনো আলোর রেখাও দেখা যাচ্ছে না।
তাহসিন ভাবল, হয়তো একটু দেরি হচ্ছে। কিন্তু চারটা বেজে পোনে পাঁচটা হলো, তারপর পাঁচটা, সাড়ে পাঁচটা... আস্তে আস্তে শহরের বুক চিরে সন্ধ্যা নেমে এলো। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো জ্বলে উঠল একে একে। ওপাশের বারান্দা বা জানালায় আলো জ্বলল না। মিম এলো না।
পরদিন বিকেল চারটাতেও ঠিক একই ঘটনা ঘটল। জানালাটা বন্ধই রইল। তার পরের দিনও তাই।
টানা চার দিন ধরে মিম আর ওই জানালায় এসে দাঁড়ায়নি। এই চারটে দিন তাহসিনের জন্য কোনো নরকের চেয়ে কম ছিল না। সে রাতের পর রাত ঘুমাতে পারেনি। তার আঁকার ঘরে ক্যানভাসগুলো অসম্পূর্ণ পড়ে রইল, চায়ের কাপ ঠান্ডা হয়ে পড়ে রইল টেবিলে। তাহসিন বুঝতে পারল, এত দিন ধরে সে যে অনুভূতিকে কেবল এক পাক্ষিক মুগ্ধতা বলে ভেবেছিল, তা আসলে তার জীবনের চেয়েও বড় সত্য হয়ে উঠেছে। সে মিমকে ভালোবেসে ফেলেছে—এতটাই গভীরভাবে, যার কোনো তল নেই।
যখন মিম ছিল, তখন তাহসিনের পৃথিবী পূর্ণ ছিল। আজ মিম নেই, আর তাহসিন বুঝতে পারছে, ওই মেয়েটির অনুপস্থিতি তার বুক থেকে কতটা নিঃশ্বাস কেড়ে নিচ্ছে। মিমের সেই মায়াবী চোখ, বাতাসে উড়া চুল আর নিশ্চুপ চাহনি তাহসিনের রক্তের প্রতিটা বিন্দুতে এক তীব্র ভালোবাসার তৃষ্ণা জাগিয়ে তুলে গেছে।
নিস্তব্ধ রাতগুলোতে মানুষের চিন্তাগুলো অনেক বেশি তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। টানা চারদিন ধরে ঘুমহীন চোখ দুটো তাহসিনের তীব্র যন্ত্রণায় জ্বলছে। ধানমণ্ডির এই বহুতল ভবনের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সে যখন রাতের শহরের দিকে তাকায়, তার বুকের ভেতরটা এক অদেখা হাহাকারে দুমড়ে-মুচড়ে যায়। এত দিন ধরে মিমের যে রূপটা সে কেবল চারতলার জানালার ওপার থেকে দেখে এসেছে, তা যেন কেবল এক মায়াবী প্রতিচ্ছবি ছিল না; ছিল তার বেঁচে থাকার একমাত্র অক্সিজেন।
তাহসিনের ঘরের চারপাশ ছেয়ে আছে মিমের নানা ভঙ্গিমার ছবি দিয়ে। কোথাও পেনসিলের টানে মিমের কাজলকালো চোখের সেই বিষাদময় দৃষ্টি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, কোথাও বা বিকেলের আলোয় তার আলগা চুলের ঝালর ক্যানভাসে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তাহসিন বুঝতে পেরেছে, সে কেবল একটা মুখকে ভালোবাসেনি, সে মিমের নাম না জানা তীব্র অনুভূতির প্রেমে পড়েছে। আর এই প্রেম কেবল দূর থেকে দেখার মধ্যে আটকে থাকতে পারে না—একে ছুঁতে হয়, অনুভব করতে হয়, নিজের করে পেতে হয়।
পঞ্চম দিন সকালে তাহসিন আর ঘরে বসে থাকতে পারল না। বুকের ভেতরের ভালোবাসার হাহাকার তাকে বাধ্য করল ঘর থেকে বেরিয়ে পড়তে। সে পাশের বিল্ডিংটির সামনে এসে দাঁড়াল। তার পা দুটো কেমন যেন কাঁপছিল। অপরিচিত এক তরুণীর খোঁজে কারও বাসায় যাওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে ভেবে লাভ নেই; ভালোবাসায় ব্যাকুল মানুষ হিসাব-নিকাশের খাতা সবসময় বন্ধ করে রাখে।
তাহসিন কেয়ারটেকার বোরহান আলীর কাছে গিয়ে একটু দ্বিধান্বিত গলায় জিজ্ঞেস করল, "চাচা, চারতলার ৪/এ ফ্ল্যাটের লোকজন কি কোথাও গেছে? কয়েকদিন ধরে কাউকেই তো দেখছি না।"
বোরহান আলী কপালে হাত দিয়ে একটু চিন্তিত মুখে বলল, "ওহ, ওই ফ্ল্যাটের কথা বলছ বাবা? চারতলার খালেক সাহেবের মেয়েটার তো ভীষণ অসুখ। চারদিন আগে মাঝরাতে হঠাৎ রক্তবমি শুরু হইছিল। বড় ডাক্তার দেখাইতে তড়িঘড়ি কইরা স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করাইছে। পরিবারশুদ্ধ সবাই ওখানেই আছে। মেয়েটার অবস্থা নাকি খুব একটা ভালো না।"
কথাটা শোনামাত্রই তাহসিনের মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তার বুকের ভেতরের রক্ত চলাচলের গতি যেন থমকে গেল। অসুখ? মিমের এত বড় অসুখ, আর সে চারদিন ধরে অজান্তে নিজের ঘরে একলা বসে অভিমান করছিল! তাহসিনের হাত থেকে চায়ের পট বা কাগজের ব্যাগ থাকলে হয়তো তখনই পড়ে যেত। তার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এলো।
সে এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে সোজা স্কয়ার হাসপাতালের দিকে ছোটাল। রাস্তায় তীব্র যানজট, কিন্তু তাহসিনের ভেতরে তখন এক মহাপ্রলয় চলছে। সে মনে মনে শুধু একটাই মিনতি করতে লাগল, "হে পরম করুণাময়, তাকে ভালো রেখো। তাকে আমার ভালোবাসার উত্তর দেওয়ার জন্য হলেও বাঁচিয়ে রাখো।"
হাসপাতালে পৌঁছে আইসিইউ এবং কেবিন ব্লকের কাউন্টারে মিমের বাবার নাম বলে কেবিন নম্বর খুঁজে পেতে তার বেশ খানিকটা বেগ পেতে হলো। অবশেষে সন্ধান মিলল—৪১২ নম্বর কেবিন। তাহসিন ধীর পায়ে চারতলার সেই করিডোর ধরে হেঁটে গেল। করিডোরটা নীরব, হাসপাতালের সেই চেনা ওষুধের কড়া গন্ধ আর হিমশীতল বাতাসের মধ্যে এক গা ছমছমে অনুভূতি।
৪১২ নম্বর কেবিনের বন্ধ দরজার বাইরে রাখা ছোট্ট কাচের খোপের ভেতর দিয়ে তাহসিন ভেতরে তাকাল।
ভেতরের দৃশ্যটা দেখে তার কলিজা যেন ছিঁড়ে এলো। ধবধবে সাদা বিছানায় শুয়ে আছে মিম। সেই মিম, যার রূপের আলোয় ওপাশের জানালা প্রতিদিন ঝলমল করে উঠত, আজ সে কি ভীষণ নিস্তেজ, ফেকাশে! হাতে সেলাইনের চ্যানেল, মুখে অক্সিজেনের মাস্ক, আর কপালে সুক্ষ্ম ঘামের বিন্দু। তার চোখ দুটো বন্ধ, চোখের নিচে গাঢ় কালচে দাগ। মিমের বাবা কেবিনের ভেতরের সোফায় মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন, আর মা একপাশে বসে নীরবে চোখের জল ফেলছেন।
তাহসিনের ইচ্ছা করছিল দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকে মিমের ওই শীতল হাত দুটো নিজের দুহাতে জড়িয়ে ধরে ভেতরের সবটুকু উত্তাপ দিয়ে তাকে জাগিয়ে তোলে। তার ইচ্ছা করছিল চিৎকার করে মিমকে বলতে, "তুমি এভাবে শুয়ে থাকতে পারো না! বিকেল চারটা বেজে গেছে মিম, উঠে দাঁড়াও, জানালার থাই গ্লাসটা সরাও! আমি যে তোমার সেই চোখের ভাষার উত্তর দিতে এসেছি!"
কখন যে তাহসিনের চোখের কোন বেয়ে উষ্ণ জলের ধারা গাল বেয়ে নেমে এসেছে, সে তা টের পায়নি। সে দরজার কাঠের অংশে নিজের কপালটা ঠেকিয়ে রাখল। ভেতরে এক গভীর রোমাঞ্চকর ভালোবাসা এবং হারানোর তীব্র ভয় একসাথে মিশে গিয়ে তাকে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে নিয়ে গেল। এটা যদি রূপকথা হতো, তবে হয়তো রাজকন্যার এক স্পর্শেই সব রোগ দূর হয়ে যেত। কিন্তু এটা নিষ্ঠুর বাস্তব।
তাহসিন পকেট থেকে একটা ছোট্ট স্কেচবুকের পাতা আর কলম বের করল। অতীতে সে কখনো মিমের সাথে কথা বলেনি, কিন্তু আজ আর নিজেকে ধরে রাখা সম্ভব নয়। সে দ্রুত হাতে পাতায় একটা জানালার ছবি আঁকল, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা বিষণ্ণ ছেলের অবয়ব আঁকল, আর নিচে খুব যত্ন করে সুন্দর অক্ষরে লিখল:
"বিকেল চারটা আজও এসেছিল, কিন্তু আমার আকাশটা আজও বন্ধই রইল। আমি জানি, তুমি ফিরে আসবে। যে চোখে এত কথা জমানো ছিল, সে চোখ এত সহজে বন্ধ হয়ে যেতে পারে না। আপনার জন্য অপেক্ষা করছি—জানালার ওপারে থাকা সেই একজোড়া ব্যাকুল চোখ।"
কাগজটি ভাঁজ করে তাহসিন বাইরে থাকা নার্সের হাতে দিল। অত্যন্ত আকুল গলায় বলল, "আপু, রোগী যখন একটু জ্ঞান পাবেন বা সুস্থ বোধ করবেন, দয়া করে এই চিরকুটটা তার হাতে দেবেন। প্লিজ, এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় মিনতি।"
নার্সটি তাহসিনের চোখের আকুতি দেখে আর না করতে পারল না। কাগজটি নিয়ে সে কেবিনের ভেতরে ঢুকে গেল।
তাহসিন হাসপাতালের করিডোরে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে রইল। সে জানত না মিম এই চিঠি পাবে কি না, কিংবা চিঠিটা পড়ার পর তার প্রতিক্রিয়া কী হবে। কিন্তু সে এটুকু নিশ্চিত জানত—আজ থেকে মিমের প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে তার নিজের নিঃশ্বাসও জড়িয়ে গেছে। যদি মিমকে ফিরিয়ে আনতে নিজের প্রাণটাও ঢেলে দিতে হয়, তাহসিন তাতেই প্রস্তুত। গভীর ভালোবাসার এই নতুন লড়াই মাত্র শুরু হলো।
হাসপাতালের হিমশীতল করিডোরে চার ঘণ্টা কেটে গেল। তাহসিন এক মুহূর্তের জন্যও নিজের জায়গা থেকে নড়েনি। প্রতিটা সেকেন্ড তার কাছে এক একটা শতাব্দীর মতো দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। অবশেষে রাত নয়টার দিকে কেবিনের দরজা খুলে ডাক্তার বের হলেন। তাহসিন দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ডাক্তারের মুখের দিকে তাকাল। ডাক্তারের বিষণ্ণ চেহারায় এখন কিছুটা স্বস্তির ছাপ।
ডাক্তার মিমের বাবাকে বললেন, "ভয়ের ধাক্কাটা আপাতত কেটে গেছে। ইন্টারনাল ব্লিডিং বন্ধ করা গেছে। প্রেসার স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে এবং মাত্রই ওনার জ্ঞান ফিরেছে। তবে মানসিকভাবে উনি খুব দুর্বল, আপনারা কেউ এখন তাকে বেশি চাপ দেবেন না।"
কথাগুলো শোনামাত্রই তাহসিনের বুকের ওপর থেকে যেন শতটনের একটা পাথর নেমে গেল। সে দেয়ালে হেলান দিয়ে হাত দুটো জোর করে চোখ বন্ধ করল। পরম করুণাময়ের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতায় তার ভেতরটা ভরে উঠল।
নার্স যখন কেবিনে ঢুকছিল, তাহসিন দূর থেকে দেখল মিম চোখ খুলে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। মিমের দৃষ্টিতে সেই আগের মতোই এক নিঝুম শান্ত ভাব, কিন্তু চেহারা ভিষণ করুণ। নার্স মিমের কাছে গিয়ে রক্তচাপ মেপে মিমের হাতের তালুতে তাহসিনের সেই ভাঁজ করা চিরকুটটি গুঁজে দিল। মিম একটু অবাক হয়ে নার্সের দিকে তাকাল। নার্সটি মুচকি হেসে ইশারায় বাইরের করিডোরের দিকে নির্দেশ করল।
মিম খুব ধীরগতিতে হাতটা তুলে চিরকুটটা খুলল।
ওপাশের কেবিনের কাচের ফাঁক দিয়ে তাহসিন স্পষ্ট দেখতে পেল—মিম কাগজটার দিকে তাকিয়ে আছে। মিম যখন স্কেচটি দেখল এবং নিচে লেখা প্রতিটি লাইন পড়তে শুরু করল, তার শুকনো ঠোঁটে এক অদ্ভুত, অপরূপ অনুভূতির হাসি ফুটে উঠল। মিমের চোখে টলমল করে উঠল দুই ফোঁটা জল, যা গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল ধবধবে সাদা বালিশে। মিম ধীরে ধীরে মুখ তুলে কাচের জানালার দিকে তাকাল।
দুজনের চোখ আবার এক হলো। কিন্তু আজকের এই চোখ মেলানো জানালার ওপার আর এপারের সেই চেনা দৃশ্য নয়। আজ সেই দৃষ্টিতে ছিল স্বীকারোক্তি, ছিল তীব্র হাহাকার আর বছরের পর বছর জমে থাকা ভালোবাসার আকুল প্রকাশ। মিম আইসিইউর বেড থেকে তার দুর্বল, সেলাইনের সূঁচ ফুটানো হাতটা সামান্য তুলে তাহসিনের দিকে বাড়াল। আঙুলগুলো দিয়ে যেন সে বাতাসেই তাহসিনের মুখটা স্পর্শ করতে চাইল।
তাহসিন কাচের দরজায় তার ডান হাতের তালুটা রাখল। কাচের ব্যবধান থাকলেও তাদের আত্মা যেন সেই মুহূর্তে একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। গভীর, নিঃশব্দ এক রোমাঞ্চে তাহসিনের শরীরের প্রতিটা লোমকূপ শিহরিত হয়ে উঠল। এই প্রথমবার মিম কোনো কথা না বলেও তাহসিনকে বুঝিয়ে দিল—বিকেল চারটার সেই নীরব অপেক্ষা শুধু তাহসিনের একার ছিল না, মিমও প্রতিদিন ওই ভালোবাসার আগুনে নিজেকে একটু একটু করে জ্বালিয়েছে।
রাত বাড়ার সাথে সাথে হাসপাতালের গার্ড এসে তাহসিনকে চলে যেতে বলল। অগত্যা তাহসিনকে বাড়ি ফিরতে হলো, কিন্তু তার হৃদয়টা রয়ে গেল ৪১২ নম্বর কেবিনের সেই নিঃসঙ্গ শয্যায়।
পরদিন সকালে তাহসিন আর ঘরে স্থির হয়ে থাকতে পারল না। সে একটি সুগন্ধি কদম ফুল আর তার নিজের হাতে আঁকা মিমের সবচেয়ে সুন্দর পোর্ট্রেটটি সুন্দর করে ফ্রেম বন্দি করে নিয়ে হাসপাতালে হাজির হলো। কিন্তু কেবিনের সামনে গিয়েই তার পা থমকে গেল।
কেবিনের ভেতর এক মধ্যবয়সী, অত্যন্ত গম্ভীর চেহারার পুরুষ দাঁড়িয়ে আছেন। লোকটির পরনে দামী স্যুট, হাতে দামী ঘড়ি। সে মিমের বাবাকে বেশ কড়া সুরে বলছে, "খালেক সাহেব, আমি সায়েমকে স্পষ্ট বলে দিয়েছি—মিমের পড়ালেখা বা এই ধরনের শখ আর সহ্য করা হবে না। আগামী মাসেই সায়েম আর মিমের বিয়ের দিন ধার্য করা হয়েছে। লন্ডন থেকে সায়েম এক সপ্তাহের মধ্যে চলে আসছে। মিম সুস্থ হলেই যেন বিয়ের সব প্রস্তুতি শেষ হয়।"
মিমের বাবা মাথা নিচু করে বললেন, "কিন্তু ভাই সাহেব, মিমের শরীরটা তো এখনও..."
"শরীরের যত্ন নেওয়া হবে। কিন্তু এই অসুস্থতার বাহানায় বিয়ে আটকানো যাবে না।" লোকটির গলায় অহংকার আর নির্দয়তার স্পষ্ট ছাপ।
কথাবার্তা শুনে তাহসিনের হাতের ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটা কেঁপে উঠল। সায়েম? বিয়ে? তবে কি মিম এই জোরপূর্বক সম্পর্কের কারণেই এত দিন মানসিকভাবে তিলে তিলে শেষ হচ্ছিল?
তাহসিন কেবিনের দরজার কাচ দিয়ে মিমের দিকে তাকাল। মিম তখন দরজার দিকেই তাকিয়ে ছিল। মিমের চোখে তখন এক গভীর আতঙ্ক, এক অবর্ণনীয় যন্ত্রণা। মিমের চোখ দুটো যেন তাহসিনকে আর্তনাদ করে বলছিল—"আমাকে এখান থেকে বাঁচাও তাহসিন! আমি এই নির্মম বাঁধনে জড়াতে চাই না, আমি শুধু তোমার সেই নীরব ভালোবাসায় বাঁচতে চাই।"
তাহসিন মুঠো শক্ত করল। বুকের ভেতর ভালোবাসার আগুনটা এখন বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ হয়ে জ্বলতে শুরু করেছে। যে মেয়েটি তাকে না দেখে, না ছুঁয়ে, কেবল চোখের ভাষায় নিজের সর্বস্ব সঁপে দিয়েছে, তাকে সে কোনো অন্যায়ের কাছে বলি হতে দেবে না। ভালোবাসা কেবল অনুভূতির নাম নয়, প্র প্রয়োজনে ভালোবাসার মানুষকে ছিনিয়ে আনার নামই ভালোবাসা।
বিয়ের খবরের আঘাতটা তাহসিনের বুকটাকে ঝাঁজরা করে দিল, কিন্তু তা তাকে দুর্বল করল না। বরং ভালোবাসার চেনা নীরব নদীটা এখন যেন রুদ্র রূপ ধারণ করেছে। মিমের সেই আতঙ্কিত, ব্যাকুল চোখ দুটি তাহসিনের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় আগুন জ্বেলে দিয়েছে। যে মেয়েটি কেবল চোখের চাহনিতে তার সমস্ত অনুভূতি সঁপে দিয়েছে, তাকে কোনো নির্মম সামাজিক বাধ্যবাধকতার বলি হতে দেওয়া যায় না।
হাসপাতালের সেই করিডোরে দাঁড়িয়েই তাহসিন শপথ নিল—যে করেই হোক, মিমকে সে এই বন্দিদশা থেকে মুক্ত করবে।
দুই দিন পর মিম হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরল। কিন্তু তার স্বাধীনতা আগের চেয়েও বেশি খর্ব করা হয়েছে। চারতলার ব্যালকনির দরজা সারাদিন বন্ধ রাখা হয়। জানালার ভারী পর্দাগুলো টানা থাকে। তবে মিম তার ভেতরের তীব্র আকুলতাকে চেপে রাখতে পারেনি। প্রতিদিন ঠিক বিকেল চারটায়, মিম খুব সাবধানে পর্দার একপাশ সামান্য সরিয়ে তাহসিনের দিকে তাকাত।
তাহসিনও জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকত। দুজনের মধ্যে এখন আর কোনো সংশয় নেই, নেই কোনো দ্বিধা। মিমের চোখের কোণ বেয়ে নামা জলবিন্দু আর তাহসিনের চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা—বাতাসেই যেন তাদের ভালোবাসার রোমাঞ্চকর স্পর্শ আদান-প্রদান হতো।
একদিন বিকেলে তাহসিন একটা উপায় বের করল। সে একটি শক্ত কাগজের ওপর বড় বড় অক্ষরে নিজের ফোন নম্বরটা লিখল। তারপর সেটা জানালার ফ্রেমে এমনভাবে আটকে দিল, যাতে ওপাশ থেকে মিম সহজেই পড়তে পারে। মিম পর্দাটা সরাতেই লেখাটি দেখতে পেল। তার চোখে ভেসে উঠল এক অদ্ভুত আলোর ঝিলিক। মিম চোখের পলকে নম্বরটি মুখস্থ করে নিল।
সেদিন রাত ঠিক বারোটায় তাহসিনের ফোনটা কেঁপে উঠল। অজানা একটি নম্বর থেকে মেসেজ এসেছে:
"আমি মিম। আমার ঘরে কেয়ারটেকারের রেখে যাওয়া একটা পুরোনো ফোন ছিল, যা কেউ জানে না। তাহসিন... আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও। সায়েম পরশু লন্ডন থেকে আসছে, আগামী সপ্তাহে আমাদের জোর করে বিয়ে দেওয়ার আয়োজন চলছে। আমি অন্য কারো হতে পারব না। আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমি শুধু তোমার সেই নীরব ভালোবাসার অনুভূতির সাথেই বাঁচতে চাই।"
মেসেজটা পড়ে তাহসিনের সমস্ত শরীর শিউরে উঠল। তার হৃদস্পন্দন থমকে যাওয়ার উপক্রম হলো। এক না-দেখা, না-ছোঁয়া অনুভূতির বন্ধন কতখানি গভীর হলে একটা মেয়ে নিজের পুরো অস্তিত্ব সঁপে দিতে পারে! তাহসিন দ্রুত টাইপ করল:
"তোমার চোখের প্রতিটি আকুতি আমি পড়েছি মিম। তুমি ভয় পেও না। আমি কোনো অন্যায়ের কাছে তোমাকে হারাতে দেব না। কাল রাত ঠিক তিনটায়, যখন পুরো শহর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকবে, তুমি ওই বারান্দার তালাটা সাবধানে খুলতে পারবে? নিচে আমি থাকব।"
ওপাশ থেকে উত্তর এলো: "আমি পারব। কারণ তোমার ভালোবাসার শক্তি আমার মৃত্যুর ভয়কেও জয় করে ফেলেছে।"
পরদিন রাতটা যেন কাটতেই চাইছিল না। সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল। তাহসিন তার প্রয়োজনীয় কিছু জামাকাপড়, আঁকার ক্যানভাস আর জমানো কিছু টাকা একটা ব্যাগে গুছিয়ে নিল। রাত ২:৩০ মিনিটে সে নিঃশব্দে তার ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে এলো।
বাইরে হালকা কুয়াশা আর ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। চারপাশ নিস্তব্ধ, মাঝেমধ্যে শুধু রাতের দূরন্ত বাতাসের শব্দ। তাহসিন মিমদের ভবনের নিচে গিয়ে আঁধারে গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়াল। তার বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা যেন কামারের হাতুড়ির মতো পিটছে। রক্তে তীব্র অ্যাড্রেনালিনের দাপাদাপি।
ঠিক ৩:০০ টে বাজল। চারতলার বারান্দার শিকল নাড়ার হালকা শব্দ হলো।
তাহসিন মুখ তুলে তাকাল। অন্ধকারের মধ্যেও মিমের অবয়ব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মিম বারান্দার গ্রিল ধরে নিচে তাকাল। তাহসিন হাত তুলে ইশারা করল। মিম এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে ভবনের সিঁড়ি দিয়ে ধীরপায়ে নিচে নেমে আসতে লাগল। মিমের পরনে ছিল সাধারণ একটা সুতি সালোয়ার কামিজ, হাতে একটা ছোট ব্যাগ।
কয়েক মিনিটের মাথায় ভবনের পেছনের ছোট পকেট গেট দিয়ে মিম বের হয়ে এলো।
গেট পার হতেই অন্ধকার রাস্তার মাঝে দুজন দুজনের মুখোমুখি দাঁড়াল। এই প্রথমবার তা
দের মাঝখানে কোনো থাই গ্লাস নেই, কোনো জানালার শিক নেই, শত গজ দূরত্ব নেই।
মিম তাহসিনের দিকে তাকাল। তার দুচোখ দিয়ে অনবরত পানি গড়িয়ে পড়ছে, ঠোঁট দুটো কাঁপছে। তাহসিন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে এক পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়ে মিমকে তীব্র ভালোবাসায় নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিল।
মিম তাহসিনের বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার দুহাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরল তাহসিনের টি-শার্ট। তাহসিন মিমের পিঠে হাত রেখে তাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরল। এত দিনের সব জমে থাকা বিরহ, সব না-বলা তীব্র রোমাঞ্চ আর আকুলতা যেন সেই একটিমাত্র গভীর আলিঙ্গনে গলে জল হয়ে গেল। ধানমণ্ডির নির্জন রাস্তায়, নিঝুম রাতের বুকে দুজন ব্যাকুল প্রেমিক-প্রেমিকা এক হয়ে গেল।
তাহসিন মিমের চোখের পানি হাত দিয়ে মুছে দিয়ে তার কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। গভীর অনুভূতির সেই উষ্ণ পরশে মিম চোখ বন্ধ করে ফেলল।
তাহসিন মৃদু স্বরে বলল, "এখন আর কোনো বাঁধা আমাদের আলাদা করতে পারবে না, মিম। চল।"
তাহসিনের হাত শক্ত করে ধরে মিম বলল, "তোমার সাথে আমি পৃথিবীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত যেতে রাজি।"
তারা দ্রুত পায়ে প্রধান সড়কের দিকে হেঁটে গেল, যেখানে একটি সিএনজি অটোরিকশা আগে থেকেই দাঁড়িয়ে ছিল। তারা উঠে বসতেই সিএনজিটি রাতের অন্ধকার চিরে অজানা এক নতুন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছুটে চলল।
সিএনজির পেছনের আসনে বসে তাহসিন ও মিম শক্ত করে একে অপরের হাত ধরে রেখেছিল। বাইরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ঢাকার চেনা পথঘাট পেরিয়ে তারা সাভারের দিকে এগোচ্ছিল, যেখানে তাহসিনের এক বিশ্বস্ত বন্ধুর একটা খালি বাসা রয়েছে। জীবনের সব ঝুঁকি নিয়ে পালিয়ে আসার এই রোমাঞ্চে যেমন এক চিলতে শান্তির ছোঁয়া ছিল, তেমনই বুকের ভেতর দাপাদাপি করছিল এক অজানা শঙ্কা।
মিম তার মাথাটা তাহসিনের কাঁধে রেখে চোখ বন্ধ করে ছিল। এত দিনের রোগভোগ আর মানসিক যন্ত্রণার পর তাহসিনের এই বুকের উষ্ণতা যেন তাকে এক অদ্ভুত জীবনের নিরাপত্তা দিচ্ছিল। মিম অনুচ্চ স্বরে বলল, "তাহসিন, আমরা কি সত্যি মুক্ত? আমার কেন যেন খুব ভয় করছে।"
তাহসিন মিমের গালে হাত রেখে তার চুলগুলো একটু পেছনে সরিয়ে দিল। মিমের গালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে মিষ্টি করে বলল, "ভয় পাওয়ার কিছু নেই, মিম। তোমার ওই চোখে আমি যে ভালোবাসার বিশ্বাস দেখেছি, তা রক্ষা করতে আমি নিজের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়াই করব। এবার কেউ আমাদের আলাদা করতে পারবে না।"
সকাল আটটার দিকে তারা সাভারের সেই ছোট্ট একতলা বাড়িটিতে পৌঁছাল। বাসাটা শহরের ঘিঞ্জি এলাকা থেকে বেশ কিছুটা দূরে, চারপাশ শান্ত ও গাছপালা ঘেরা। বন্ধু রাজীব চাবি দিয়ে আগেই সব গুছিয়ে রেখেছিল।
রুমে ঢুকে তাহসিন যখন দরজাটা বন্ধ করে দিল, তখন তাদের দুজনের দৃষ্টি এক হলো। এবার আর দূর থেকে দেখার ভুল বোঝাবুঝি নেই। ঘরের ছোট্ট আলোর ছায়ায় মিমের ফ্যাকাশে চেহারায় এক অপূর্ব অনুরাগের রক্তিম আভা ফুটে উঠল। তাহসিন ধীর পায়ে মিমের কাছে এগিয়ে গেল। সে মিমের দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বুকের কাছে টেনে আনল। মিমের বুকের ভেতর হৃদস্পন্দনের দ্রুত শব্দ তাহসিন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল।
"কখন যে তোমাকে এত গভীরভাবে ভালোবেসে ফেললাম, মিম... নিজেও টের পাইনি," তাহসিন নিচু কণ্ঠে বলল।
মিম তাহসিনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "আর আমি প্রতিদিন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শুধু প্রার্থনায় একটা জিনিসই চাইতাম—ওপাশের সেই আঁকিয়ে ছেলেটা যেন এক দিন এসে আমার এই বন্ধ জীবনটা খুলে দেয়।"
তাহসিন মিমকে আরও নিবিড়ভাবে কাছে টেনে নিল। মিমের কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। মিম তার দুটি হাত তাহসিনের ঘাড়ে পেঁচিয়ে ধরল। দুজনের নিঃশ্বাসের তীব্র উষ্ণতা মিশে গেল এক অনির্বচনীয় রোমাঞ্চে। ক্যানভাসে ছবি আঁকা শিল্পী আজ সত্যি সত্যি তার জীবন্ত কাব্যকে নিজের বাহুডোরে ধরে রেখেছে। মিমের ভেজা ঠোঁটে তাহসিনের অনুভূতির স্পর্শ যেন তাদের ভেতরের সবটুকু বিরহ মুছে দিল।
কিন্তু এই স্বর্গীয় সুখ খুব বেশি সময় স্থায়ী হলো না।
বেলা একটার দিকে বাইরে হঠাৎ বিকট শব্দে একটা গাড়ির ব্রেক কষার শব্দ হলো। রাজীবের দেয়া সেই গোপন আস্তানায় কীভাবে যেন খবর পৌঁছে গেছে!
তাহসিন চমকে উঠে জানালার পর্দা সামান্য সরিয়ে বাইরে তাকাল। একটা কালো রঙের দামি এসইউভি আর সাথে দুটি মাইক্রোবাস এসে দাঁড়িয়েছে। গাড়ি থেকে নেমে এলো সেই প্রভাবশালী সায়েম, মিমের বাবা খালেক সাহেব এবং কয়েকজন সুঠাম দেহের ভাড়াটে গুন্ডা।
সায়েমের হাতে একটি লোহার রড। সে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, "তাহসিন! বের হয়ে আয় শূয়োরের বাচ্চা! আমার বাগদাত্তাকে চুরি করে এনে ভাবছিস খুব বড় বীর হয়ে গেছিস? তোর আঁকাআঁকির হাত দুটো আমি আজ ভেঙে গুঁড়ো করে দেব!"
মিম ভয়ে তাহসিনের শার্টের হাতা শক্ত করে চেপে ধরল। তার চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেল, "তাহসিন! সায়েম খুব বিপজ্জনক লোক! ও তোমাকে মেরে ফেলবে!"
তাহসিন মিমের কপালে হাত দিয়ে তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল, "তুমি ঘরের কোণে লুকিয়ে থাকো, মিম। দরজা ভেতর থেকে লাগিয়ে দাও।"
"না! আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না!" মিম হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
তাহসিন ঘরের দরজার লকটা লক করে দিয়ে নিজে একটা কাঠের চেয়ারের পায়া হাতে নিয়ে বাইরের দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু তার আগেই গুন্ডারা বাইরের কাঠের প্রধান দরজাটা সজোরে লাথি মেরে ভেঙে ফেলল।
ঘরের ভেতর হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল সায়েম আর তার লোকজন। সায়েমের ইশারায় চার-পাঁচজন লোক একসাথে তাহসিনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তাহসিন একা তাদের সাথে লড়াই করার চেষ্টা করল, কিন্তু শক্তির অসমান লড়াইয়ে সে বেশিক্ষণ টিকতে পারল না। লোহার রডের সরাসর আঘাতে তাহসিনের কপাল ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।
মিম ঘর থেকে চিৎকার করে বের হয়ে এলো, "ছেড়ে দাও ওকে! দোহাই তোমাদের, ওকে আর মেরো না! আমি চলে যাচ্ছি তোমাদের সাথে, দয়া করে ওকে বাঁচতে দাও!"
সায়েম ক্রূর হাসিতে মিমের হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিল, "খুব মায়া, তাই না? এই ফকীর ছেলের প্রেমে পড়েছিস? চল এখন, বিয়ের মণ্ডপ তোর জন্য অপেক্ষা করছে।"
মিম তাহসিনের রক্তাক্ত শরীরের দিকে হাত বাড়িয়ে চিৎকার করতে লাগল, কিন্তু গুন্ডারা তাকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে গেল।
তাহসিন অর্ধচেতন অবস্থায় মেঝেতে পড়ে রইল। তার কপাল বেয়ে আসা লাল রক্ত চোখের সামনে লাল ঝাপসা পর্দা তৈরি করছে। চোখের সামনে থেকে মিমকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আর সে কিছু করতে পারছে না—এই যন্ত্রণা শারীরিক যন্ত্রণার চেয়ে হাজার গুণ বেশি তীব্র।
গাড়িগুলো স্টার্ট নেওয়ার শব্দ হলো। ধুলো উড়িয়ে তারা চলে গেল।
তাহসিন মেঝেতে হাত ঘষে ঘষে সোজা হওয়ার চেষ্টা করল। তার শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে এখন বিষাক্ত যন্ত্রণা, কিন্তু হৃদয়ে এক দাউদাউ করে জ্বলা দাবানল। সে রক্তমাখা হাতে নিজের বুকটা চেপে ধরল। সে মরেনি, সে এখনো বেঁচে আছে। আর যতক্ষণ তার বুকে নিঃশ্বাস আছে, মিমকে সে ওই পশুটোর হাতে তুলে দিতে পারে না।
তাহসিন রক্তাক্ত অবস্থায় উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখন এক ভয়ংকর, আপসহীন প্রতিজ্ঞা।
রক্তাক্ত কপাল আর ভাঙা শরীর নিয়ে তাহসিন যখন উঠে দাঁড়াল, তখন তার চোখের সামনে শুধু মিমের সেই অশ্রুসজল ব্যাকুল মুখটা ভাসছিল। শরীর জুড়ে অসহ্য যন্ত্রণা, কিন্তু মনের ভেতরের ভালোবাসার তেজ সেই যন্ত্রণাকে এক লহমায় তুচ্ছ করে দিল। সে শার্টের হাতা দিয়ে কপাল থেকে গড়িয়ে পড়া রক্ত মুছে নিয়ে সোজা ধানমণ্ডির দিকে রওনা হলো। রাজীবও খবর পেয়ে দ্রুত এসে তাহসিনের সাথে যোগ দিল।
পরদিন সন্ধ্যা। ধানমণ্ডির এক অভিজাত কমিউনিটি সেন্টারে জাঁকজমকপূর্ণ আলোয় সাজানো হয়েছে সায়েম ও মিমের বিয়ের আসর। বাইরে কড়া নিরাপত্তা, সায়েমের নিজস্ব লোকজনের সাথে প্রাইভেট সিকিউরিটি গার্ডরা সতর্ক অবস্থায় পাহারা দিচ্ছে। মিমকে একটা বন্ধ ঘরে বধূবেশে বসিয়ে রাখা হয়েছে। লাল বেনারসি আর ভারী গহনায় সজ্জিত মিমের চোখ দুটো কান্নায় ফুল উঠে লাল হয়ে গেছে। তার হাতে ছিটানো মেহেদির রঙ যেন তার বুকের রক্তক্ষরণের রঙ হয়ে দেখা দিচ্ছে। মিম মনে মনে এক বিষাক্ত সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছিল—সায়েমের সাথে আকদ হওয়ার আগেই সে সাথে আনা কেয়ারটেকারের ঘর থেকে নেওয়া ঘুমের ওষুধের পুরো ফাইলটা গিলে ফেলবে।
ঠিক রাত আটটা। বিয়ের কাজী সাহেব রেজিস্ট্রি খাতা নিয়ে আসরে বসেছেন। সায়েম শেরওয়ানি পরে বিজয়ের হাসি হেসে বরযাত্রীদের সাথে কথা বলছে। মিমের বাবা খালেক সাহেব এক পাশে অপরাধীর মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন।
এমন সময় কমিউনিটি সেন্টারের প্রধান ফটকে এক প্রচণ্ড শোরগোল শুরু হলো।
ভারী কাঠের দরজা দুটো সশব্দে খুলে গেল। ভেতরের আলোয় এসে দাঁড়াল এক তরুণ—যার পরনে কাদা আর শুকনো রক্তের দাগ লাগা শার্ট, কপালে সাদা ব্যান্ডেজ, কিন্তু চোখে প্রলয়ঙ্কারী তেজ। তাহসিন! তার পেছনে বন্ধু রাজীব এবং ধানমণ্ডি এলাকার বেশ কিছু সমবয়সী তরুণ, যাদের তাহসিন ভালোবাসার এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে একাট্টা করে এনেছে।
সায়েম লাফিয়ে উঠে বলল, "তুই আবার এসেছিস? তোকে তো কালকেই মেরে পুঁতে ফেলার কথা ছিল! সিকিউরিটি, ওকে টেনে বাইরে ফেলে দাও!"
কিন্তু এবার সিকিউরিটি গার্ডরা এগোতে পারল না। তাহসিনের সাথীরা তাদের আটকে দিল। তাহসিন ধীর অথচ দৃঢ় পায়ে বিয়ের মঞ্চের দিকে হেঁটে গেল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে যেন এক অপরাজেয় প্রেমিকের হুঙ্কার।
তাহসিন সায়েমের চোখের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল, "ভালোবাসা জোর করে পাওয়া যায় না সায়েম! তুমি টাকা আর পেশীশক্তি দিয়ে একটা মেয়েকে বন্দি করতে পারো, কিন্তু তার মন আর রুহকে কখনো কিনতে পারবে না!"
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের দরজার তালা ভেঙে বের হয়ে এলো মিম। লাল বেনারসি পরা মিমকে দেখে পুরো আসর স্তব্ধ হয়ে গেল। মিমের চোখে পানি, কিন্তু এবার আর তাতে ভয় নেই; আছে এক পরম স্বস্তি। মিম কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে, হাজারো আত্মীয়-স্বজনের বিস্মিত দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে ছুটে এসে তাহসিনের বুকের মধ্যে গিয়ে আছড়ে পড়ল।
তাহসিন রক্তমাখা হাত দিয়েই মিমকে আগলে ধরল। মিম তাহসিনের শার্টের কলার আঁকড়ে ধরে কেঁদে উঠে বলল, "তুমি এসেছ... আমি জানতাম আমার তাহসিন আমাকে এই নরক থেকে নিয়ে যেতে ঠিক আসবে!"
সায়েম রাগে উন্মাদ হয়ে পকেট থেকে একটা রিভলবার বের করে তাহসিনের দিকে তাক করল, "অনেক হয়েছে রোমিওর নাটক! আজ তোকে মেরেই আমি মিমকে ঘরে তুলব!"
কিন্তু সায়েম ট্র্রিগার চাপার আগেই মিমের বাবা খালেক সাহেব এগিয়ে এসে সায়েমের হাতটা সজোরে চেপে ধরলেন। সায়েমের হাতের পিস্তলটা নিচে পড়ে গেল।
খালেক সাহেবের চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরছিল। তিনি কড়া গলায় সায়েমকে বললেন, "অনেক হয়েছে সায়েম সাহেব! আমি আমার টাকার লোভে ভুল করতে বসেছিলাম। কিন্তু এই ছেলেটা নিজের রক্ত দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছে সে আমার মেয়েকে কতটা ভালোবাসে। মিম যদি আজ মরেও যায়, ও তাহসিনের ভালোবাসাতেই মরবে, আপনার ক্ষমতার গোলাম হয়ে বাঁচবে না!"
তিনি তাহসিন আর মিমের দিকে তাকিয়ে গুমরে কেঁদে উঠলেন, "আমাকে মা
ফ করে দিস মা... তোরা চলে যা এখান থেকে। তোদের এই ভালোবাসাকে আটকানোর সাধ্য আর কারও নেই।"
পুরো কমিউনিটি সেন্টারে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। সায়েম অপমানে আর রাগে থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে রইল, কিন্তু জনরোষের ভয়ে আর কিছু করার সাহস পেল না।
তাহসিন মিমের হাত শক্ত করে নিজের হাতের সাথে বাঁধল। তাদের আঙুলগুলো এক হয়ে গেল এক চিরন্তন চুক্তিতে। তাহসিন মিমকে নিয়ে আলোয় ঝলমল করা সেই রাজকীয় ঘর থেকে বের হয়ে এলো খোলা আকাশের নিচে।
বাইরে তখন বিকেলের কনেদেখা রোদ গড়িয়ে মিষ্টি রাত নেমে এসেছে। বাতাস শান্ত, স্নিগ্ধ। তাহসিন আর মিম এসে দাঁড়াল ধানমণ্ডি লেকের পাড়ে।
মিম তাহসিনের কপালে থাকা ব্যান্ডেজের ওপর আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। এক তীব্র অনুভূতির জোয়ারে ভেসে গিয়ে মিম তাহসিনের গলায় বাহু জড়িয়ে ধরে চুপিচুপি বলল, "আমার চিরকালের সেই একজোড়া ব্যাকুল চোখ... আজ থেকে আমি সারাজীবনের জন্য শুধু তোমার ক্যানভাসের একমাত্র ছবি হয়ে রইলাম।"
তাহসিন মিমের কোমর জড়িয়ে তাকে নিজের কাছে টেনে নিল। মিমের ঠোঁটে ঠোঁট রেখে সে তার ভালোবাসার শেষ সীলমোহর এঁকে দিল। আজ আর তাদের মাঝে কোনো ওপাশের জানালা নেই, কোনো থাই গ্লাস নেই, কোনো বাধা নেই।
....