অচেনা হৃদয়ের বন্ধন

হেমন্তের শেষ বিকেলে কুয়াশার পাতলা চাদর নামছিল মেহেরপুরের ছোট উপজেলা শহরটির ওপর। টিনের চালে ঝরে পড়া অশ্বত্থ গাছের শুকনো পাতার শব্দ আর দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসা মাগরিবের আজানের সুরে পুরো পরিবেশটা কেমন যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। কাঠফাটা খরা আর হুট করে আসা কিছু পার পারিবারিক জটিলতার জেরে রায়হান আর তামান্নার আকদটা শেষ হলো মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে। কোনো সানাই বাজেনি, কোনো আলোর রোশনাই ছিল না, এমনকি ফুল দিয়ে সাজানো হয়নি নতুন ঘরটাও।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

রায়হান তখনো নিজের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে উসকোখুসকো চুলে হাত বুলাচ্ছিল। তার বয়স আঠাশ, শান্ত, গম্ভীর আর কিছুটা চাপা স্বভাবের মানুষ। স্থানীয় এক সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের প্রবাসক হিসেবে তার একটা আলাদা সুনাম আছে। কিন্তু আজকের এই আচমকা পরিবর্তন তাকেও কেমন যেন দিশেহারা করে দিয়েছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও যে মেয়েটি তার কাছে শুধুই পরিচিত এক দূর সম্পর্কের দূরবর্তী আত্মীয়ের নাম ছিল, সে এখন তার বিবাহিতা স্ত্রী। তামান্না। বয়স একুশ, সদ্য অনার্সে ভর্তি হওয়া চঞ্চল এক মেয়ে, যার চোখে থাকে একরাশ মুগ্ধতা আর ঠোঁটের কোণে অভিমানের মেঘ।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

ঘরের ভেতর খাটের এক পাশে কাচুমাচু হয়ে বসে ছিল তামান্না। তার পরনে লাল রঙের একটি সুতির শাড়ি, যা তাড়াহুড়ো করে কাকিমারা পরিয়ে দিয়েছেন। ওড়না দিয়ে মুখ কিছুটা ঢাকা, চোখের কোণে এখনো শুকিয়ে যাওয়া জলের দাগ স্পষ্ট। হঠাৎ অচেনা একটা পরিবেশে, কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই নতুন একটা সম্পর্কে বাঁধা পড়ে যাওয়ার ভয় তার বুকের ভেতর ধুকপুক করছিল। ঘরের মাঝে জ্বালানো হারিকেনের হালকা হলুদ আলোয় তার ছায়াটা দেওয়ালে কেঁপে উঠছিল বারবার।

 

রায়হান ধীর পায়ে ঘরে ঢুকল। দরজার শব্দ হতেই তামান্না একটু শিউরে উঠে শাড়ির আঁচলটা আরো চেপে ধরল। রায়হান ঘরের মাঝখানে এসে থমকে দাঁড়াল। মেয়েটির এই জড়সড় রূপ দেখে তার মনে এক ধরনের মায়া আর এক বিষণ্ন অনুভূতির জন্ম হলো। সে জানে, এই বিয়েটা তামান্নার কাছেও একটা ধাক্কার মতো।

 

"তুমি... তুমি কি পোশাকটা বদলে নেবে? এভাবে বসে থাকলে কষ্ট হবে," রায়হান গলা খাকারি দিয়ে বেশ নিচু স্বরে বলল। তার গলার আওয়াজে এক ধরনের অস্বাভাবিক গম্ভীরতা থাকলেও তাতে কোনো কর্কশতা ছিল না।

 

তামান্না মাথাটা সামান্য নাড়ল, কিন্তু মুখ খুলল না। তার হাত দুটো শাড়ির ওপর থরথর করে কাঁপছিল।

 

রায়হান কাঠের আলমারিটা খুলে নিজের একটা হালকা সুতির ট্রাউজার আর ঢিলেঢালা টি-শার্ট বের করে টেবিলের ওপর রাখল। তারপর তামান্নার দিকে তাকিয়ে বলল, "তোমার ব্যাগটা ওপাশে রাখা আছে। কাপড় বদলে নাও। আমি বাইরে আছি।"

 

রায়হান আর কথা না বাড়িয়ে বারান্দায় চলে গেল। বারান্দার বাঁশের বেড়ায় হাত রেখে দূর আকাশের একফালি চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইল সে। ঠাণ্ডা বাতাস এসে গায়ে লাগছিল, কিন্তু তার মাথার ভেতরে চলছিল নানা চিন্তা। কীভাবে সে এই মেয়েটিকে নিজের ঘরে মানিয়ে নেবে? কীভাবে এই অচেনা দূরত্ব পার হবে তারা?

 

প্রায় মিনিট পনেরো পর রায়হান আবার ঘরে ঢুকলো। তামান্না ততক্ষণে তার নিজের একটা নীল রঙের থ্রি-পিস পরে নিয়েছে। ভেজা চুলগুলো পিঠের ওপর খোলা, আর মুখটা আগের চেয়ে কিছুটা হালকা দেখাচ্ছে। সে খাটের এক কোণে হাঁটু মুড়ে বসে ছিল।

 

রায়হান খাটের অন্য পাশে গিয়ে বসল। দুজনের মাঝে অন্তত চার ফুটের দূরত্ব। কাঠের খাটের পুরোনো চাদরে হাত রেখে রায়হান মৃদু স্বরে বলল, "তামান্না... আমি জানি আজকের দিনটা তোমার জন্য কতটা কঠিন ছিল। পরিস্থিতি আমাদের দুজনকে এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যার জন্য আমরা কেউ প্রস্তুত ছিলাম না। কিন্তু আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, এই ঘরে তুমি সম্পূর্ণ নিরাপদ। তোমার ওপর কোনো সিদ্ধান্ত আমি চাপিয়ে দেব না।"

 

তামান্না প্রথমবারের মতো চোখ তুলে রায়হানের দিকে তাকাল। হারিকেনের নরম আলোয় রায়হানের ধারালো মেদহীন মুখ, ঘন ভুরু আর চোখের ভেতরের গভীর সততা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। তামান্নার বুকের ভেতরের জমে থাকা শঙ্কাটা যেন মুহূর্তের জন্য একটু হালকা হয়ে গেল। সে তো ভেবেছিল এক কঠিন, নির্দয় পুরুষকে সহ্য করতে হবে তাকে। কিন্তু এই মানুষটার গলার আওয়াজে এত মায়া কেন?

 

"আমার কোনো আপত্তি নেই..." তামান্না খুব অস্পষ্ট স্বরে বলল। তার কণ্ঠ এতই মৃদু ছিল যে রায়হানকে একটু ঝুঁকে শুনতে হলো।

 

"কী বললে?" রায়হান একটু কাছে সরে এল।

 

তামান্না আবার মাথা নিচু করে ফেলল। তার গালে হালকা লাজুক লালচে আভা ফুটে উঠল, যা হারিকেনের আলোতেও চোখ এড়ালো না রায়হানের। "বলছিলাম, আপনার কথা আমি শুনেছি।"

 

রায়হান ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসল। এই প্রথম তামান্না তার দিকে তাকিয়ে কথা বলল। তার নীল পোশাকের নরম সুবাস আর খোলা চুল থেকে ভেসে আসা নারকেল তেলের ঘ্রাণ রায়হানের চারপাশের বাতাসকে এক অদ্ভুত নেশায় ভরিয়ে দিচ্ছিল। রায়হান আরো খানিকটা কাছে সরে এলো। এবার তাদের মধ্যে দূরত্ব কয়েক ইঞ্চির।

 

"আমাকে 'আপনি' করে বলতে হবে না," রায়হান তামান্নার চিবুকে আলতো করে হাত রাখল। তামান্না চামড়া যেন বিদ্যুতের ছোঁয়ায় শিউরে উঠল। রায়হান ধীর আঙুলে তার চিবুকটা একটু ওপরে তুলে ধরল, যাতে তাদের চোখাচোখি হয়। "আমরা এখন একই নৌকার যাত্রী, তামান্না। আমাকে রায়হান বলেই ডাকতে পারো।"

 

তামান্নার চোখের তারা দুটো কেঁপে উঠল। রায়হানের হাতের স্পর্শে তার শরীরের ভেতর এক অজানা তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। রায়হানের আঙুলের ওম আর তার চোখের সেই নিবিড় চাহনি তামান্নাকে যেন বাকরুদ্ধ করে দিল।

 

"আমি... চেষ্টা করব," তামান্না নিঃশ্বাস আটকে কোনোমতে বলল।

 

রায়হান তার অন্য হাত দিয়ে তামান্নার খোলা চুলগুলো আলতো করে কানের পেছনে গুঁজে দিল। আঙুলের ডগা তামান্নার কানের লতিতে ঠেকতেই তামান্না চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। এক অজানা শিহরণ তার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল। অচেনা এক পুরুষ, অথচ তার ছোঁয়ায় কেমন এক গভীর জাদুকরী টান!

 

"আজ অনেক রাত হয়েছে। শুয়ে পড়ো," রায়হান তামান্নার খুব কাছে মুখ এনে নিচু স্বরে বলল। তার গরম নিঃশ্বাস তামান্নার গালে এসে লাগছিল।

 

তামান্না চোখ না খুলেই মাথা নাড়ল। রায়হান ধীরে ধীরে সরে গিয়ে বাতিটা নিভিয়ে দিল। ঘরের ভেতর নেমে এলো এক মায়াবী আঁধার, আর সেই আঁধারে দুজন অচেনা মানুষের বুকের স্পন্দন যেন এক নতুন সুরের কাব্য লিখতে শুরু করল।

 

ভোরের মিষ্টি আলো যখন ঘরের বাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে এসে তামান্নার মুখে পড়ল, তখন তার ঘুম ভাঙলো। এক অদ্ভুত উষ্ণতার অনুভূতিতে গা শিউরে উঠল তার। চোখ মেলে সে থমকে গেল—তামান্না শুয়ে আছে রায়হানের বুকের খুব কাছাকাছি। রাতের যেকোনো এক ফাঁকে, অজান্তেই সে রায়হানের শার্টের হাতা শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিল। রায়হানের এক হাত তামান্নার কোমর আলতো করে বেষ্টন করে আছে। ধীর, ছন্দময় শ্বাসের সাথে রায়হানের বুকটা উঠছে আর নামছে।

 

তামান্নার বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে গেল। এত কাছে কখনো কোনো পুরুষের ছোঁয়া সে পায়নি। রায়হানের সুগঠিত শরীর আর বুক থেকে আসা পুরুষালি ঘ্রাণে তামান্না কেমন যেন ঝিম মেরে রইল কিছুক্ষণ। সরে আসার মন চাইছিল, আবার রায়হানের এই নিবিড় আশ্রয় ছেড়ে যেতেও বুকটা কেমন যেন কেঁপে উঠছিল।

 

সে খুব সাবধানে, যাতে রায়হানের ঘুম না ভাঙে, হাতটা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু সরতে গিয়েই রায়হান হঠাৎ একটা মৃদু উসখুস শব্দ করে তামান্নাকে আরো খানিকটা নিজের দিকে টেনে নিল। তামান্নার থুতনি এসে ধাক্কা খেল রায়হানের শক্ত বুকে।

 

তামান্নার দম বন্ধ হয়ে আসার জোগাড়। সে নিষ্পলক চোখে রায়হানের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। গাঢ় পাপড়ি, ঘুমন্ত চোখের শান্ত ভাব আর কপালে ফেলে রাখা কয়েক গুচ্ছ চুল—রায়হানকে এখন খুব নির্দোষ আর আপন মনে হচ্ছে। তামান্না নিজের অজান্তেই হাত বাড়িয়ে রায়হানের কপালে ছড়ানো চুলগুলো আঙুল দিয়ে পাশে সরিয়ে দিল।

 

ঠিক তখনই রায়হান চোখ মেলল।

 

চোখে চোখ পড়তেই তামান্না লজ্জায় জমে গেল। সে হাতটা টেনে নেওয়ার চেষ্টা করতেই রায়হান ঝটপট তার হাতটা ধরে ফেলল নিজের হাতের মুঠোয়। দুজনের চোখাচোখি হলো। ঘরের ভেতর শেষ রাতের ঠাণ্ডা বাতাস বইছিল, কিন্তু তাদের দুজোড়া চোখের উষ্ণতায় পুরো ঘরটা যেন সহসা উত্তপ্ত হয়ে উঠল।

 

"শুভ সকাল," রায়হান ঘুমজড়ানো নিচু গলায় বলল। তার কণ্ঠস্বর ছিল অদ্ভুত এক গভীরতায় ভরা।

 

তামান্না লাজুক চোখে নজর নামিয়ে নিলো, "সকাল হয়ে গেছে... হাতটা ছাড়ুন, উঠে পোরো বাসি কাজ করতে হবে।"

 

"ছাড়ব না," রায়হানের ঠোঁটে মৃদু দুষ্টুমির হাসি ফুটল। সে তামান্নার হাতটা টেনে নিয়ে নিজের ঠোঁটের কাছে তুলে ধরল। তারপর তামান্নার নরম হাতের তালুতে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ালো।

 

এক অদ্ভুত শিহরণ তামান্নার সমস্ত শরীরে বিদ্যুতের মতো খেলে গেল। সে শিরদাঁড়ায় একটা অচেনা তোলপাড় অনুভব করল। তামান্না তো তো করে বলল, "রায়হান... কী করছেন? কেউ দেখে ফেলবে!"

 

"কার সাধ্যি আমাদের ঘরে ঢোকে?" রায়হান আরও খানিকটা সরে এসে তামান্নার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ল। রায়হানের ঘন নিঃশ্বাস এখন তামান্নার ঠোঁটে এসে আছড়ে পড়ছে। "আর তা ছাড়া, তুমি তো কাল বললে আমার নাম ধরে ডাকবে, আর এখন আবার সেই 'করছেন' 'বলছেন' করে দূরত্ব তৈরি করছ?"

 

তামান্না চোখ বন্ধ করে ফেলল। সে রায়হানের এই অনাকাঙ্ক্ষিত কাছে আসা সহ্য করতে পারছিল না, অথচ এক অমোঘ আকর্ষণে সে রায়হানের কাছে বন্দি হয়ে যাচ্ছিল। "আমি... আমি চেষ্টা করছি তো। ছেড়ে দিন না, পিসি আর কাকিমারা কী ভাববেন?"

 

"আহা, ভুলে যাচ্ছ কেন? এখানে তোমার কাকিমা বা পিসিরা নেই," রায়হান মৃদু হেসে তামান্নার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল। "এটা আমাদের বাড়ি। এখানে শুধু তুমি আর আমি।"

 

তামান্নার গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। রায়হানের ঠোঁট এবার তামান্নার কানের লতি ছুঁয়ে ঘাড়ে নেমে এলো। তামান্না ছোট একটা আহাজারির মতো শব্দ করে রায়হানের কাঁধ দুটো শক্ত করে চেপে ধরল। অনভিজ্ঞ এক নারীদেহে অচেনা পুরুষের এমন ব্যাকুল স্পর্শ এক নতুন অনুভূতির জন্ম দিচ্ছিল। তামান্না নিজেকে সামলাতে না পেরে রায়হানের পিঠে নিজের আঙুলগুলো বসিয়ে দিল।

 

রায়হান তামান্নার এই নরম সাড়া টের পেয়ে আরো মত্ত হয়ে উঠল। সে তামান্নার মুখটা নিজের দুই হাতের অঞ্জলিতে তুলে নিয়ে সোজা তার দিকে তাকালো। তামান্নার নীল চোখের মনি দুটো তখন লজ্জায় আর কামনায় কাঁপা কাঁপা।

 

"তামান্না... তোমার কি ভয় করছে?" রায়হান তামান্নার গালে আলতো থাম্ব দিয়ে ঘষতে ঘষতে জিজ্ঞেস করল।

 

তামান্না কেবল মাথা নাড়ল—না। ভয় নয়, এ এক অজানা রোমাঞ্চ, এক গভীর আত্মসমর্পণ।

 

রায়হান আর এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজের ঠোঁট দুটো তামান্নার কপালে চেপে ধরল। তারপর ধীরে ধীরে নেমে এলো তার চোখের পাতায়, গালের টোলে এবং সবশেষে তামান্নার কাঁপতে থাকা পাতলা ঠোঁটের ওপর। প্রথম স্পর্শেই দুজন দুজনকে এক গভীর সাগরে তলিয়ে যেতে দেখল। তামান্না রায়হানের গলার পেছনের চুলগুলো আঁকড়ে ধরে তার আরো কাছাকাছি সরে এলো। হারিকেনের নরম আলো আর ভোরের কুয়াশাকে সাক্ষী রেখে দুই অচেনা সত্তা যেন এক নতুন ভালোবাসার বন্ধনে মিশে যেতে শুরু করল।

 

সকাল আটটার দিকে যখন তামান্না রান্নাঘরে গেল, তখন তার সমস্ত শরীরে যেন এক মায়াবী আলো চুইয়ে পড়ছিল। উঠোনে রোদের মিষ্টি কিরণ ছড়িয়ে পড়েছে। বাড়ির ছাদ থেকে একটা জোড়া শালিক ডেকে উঠল।

 

তামান্নার শাশুড়ি মেহেরুন্নেসা রান্নাঘরে চা বানাচ্ছিলেন। তামান্নাকে দেখে হাসিমুখে বললেন, "বৌমা, উঠেছ? শরীর ঠিক আছে তো? কাল রাতের ঘটনার পর তো তোমার ওপর অনেক ঝড় গেছে।"

 

তামান্না তড়িঘড়ি করে মাথা নিচু করে বলল, "জি আম্মা, আমি একদম ঠিক আছি। আমি চা-টা করে দিচ্ছি, আপনি বসুন।"

 

"না না, আজ প্রথম দিন, তোমার কিছু করতে হবে না। রায়হান কোথায়? উঠেনি এখনো?"

 

"উনি... উনি উঠছেন," তামান্না লাজুক মুখে চুল গোছানোর ভান করল।

 

ঠিক তখনই রায়হান লুঙ্গি আর সুতির গেঞ্জি পরে হাত মুখ ধুয়ে রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। সে তামান্নার দিকে এক পলক তাকাল। তামান্নার ঘাড়ের কাছে চুল সরাতেই দেখা যাচ্ছিল একটা হালকা লালচে দাগ, যা রাতের গোপন ভালোবাসার স্মৃতি বহন করছে। রায়হানকে দেখে তামান্না তড়িঘড়ি আঁচল টেনে ঘাড় ঢেকে ফেলল, যা দেখে রায়হানের ঠোঁটের কোণে আবার সেই দুষ্টু হাসিটা ফুটে উঠল।

 

"আম্মা, এক কাপ চা পাব?" রায়হান তামান্নার দিকে চোখ রেখে বলল।

 

"দাঁড়া, দিচ্ছি," আম্মা বললেন।

 

রায়হান রান্নাঘরের ভিটিতে বসে পড়ে তামান্নার দিকে একটা অর্থপূর্ণ দৃষ্টি হানল। তামান্না আম্মার পেছনে দাঁড়িয়ে পা দিয়ে মাটিতে দাগ কাটছিল, আর মনে মনে ভাবছিল—যে মানুষকে কাল পর্যন্ত সে চিনত না, আজ তার উপস্থিতি এত মিষ্টি আর ব্যাকুল করে তুলছে কেন তার চারপাশ? ভালোবাসা কি তবে এত দ্রুত নিজের শেকড় ছড়ায়?

 

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আকাশের মুখ কালো হয়ে এলো। হেমন্তের আমেজ ভেদ করে হঠাৎই একপশলা অসময়ের মেঘ জমে উঠল মেহেরপুরের আকাশে। কিছুক্ষণ আগের উজ্জ্বল রোদ ঢেকে গিয়ে চারপাশ জুড়ে এক গাঢ়, সোঁদা গন্ধ ভেসে এলো। দুপুর গড়াতেই ঝুমঝুম করে বৃষ্টি নামল টিনের চালে। গ্রাম্য নিস্তব্ধতার বুকে সেই বৃষ্টির শব্দ যেন এক অন্যরকম মাদকতা ছড়িয়ে দিচ্ছিল।

 

রায়হান তার কলেজের কিছু খাতা কাটার কাজে পড়ার ঘরে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু বারান্দায় আছড়ে পড়া জলকণার দিকে চেয়ে তার মন বারবার বিচলিত হয়ে উঠছিল। মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল আজ ভোরের সেই মুহূর্তগুলো—তামান্নার কাঁপতে থাকা ঠোঁট, তার অনভিজ্ঞ ছোঁয়া আর চোখেমুখে লুকিয়ে থাকা গভীর ব্যাকুলতা।

 

ঠিক তখনই তামান্না ঘরে ঢুকল। হাতে ধোঁয়া ওঠা দুটি মেলামাইনের কাপে আদা-এলাচ দেওয়া চা। বৃষ্টির জন্য সে একটা গাড় সুতির নীল শাড়ি পরেছে, যার আঁচলটা কোমরে জড়ানো। চুলগুলো আলগা করে একটি খোঁপা করা, আর কপালে ফুটে আছে একটা ছোট টিপ।

 

"আপনার... মানে, তোমার চা," তামান্না একটু তোতলালো, এখনো রায়হানকে 'তুমি' বলতে তার বুকটা দুরুদুরু করে।

 

রায়হান খাতা থেকে চোখ তুলে তাকাল। শাড়ির নীল রঙে তামান্নার ফর্সা তনু যেন আরও রূপময় হয়ে উঠেছে। রায়হান খাতাটা বন্ধ করে পেনের ক্যাপ লাগাল। তারপর ধীরপায়ে উঠে গিয়ে তামান্নার হাতের চায়ের কাপ দুটো টেবিলের ওপর রেখে দিল।

 

"চা পরে খাওয়া যাবে," রায়হান এক পা এগিয়ে তামান্নার খুব কাছে এসে দাঁড়াল।

 

তামান্না চমকে উঠে পিছাতে চাইল, কিন্তু পেছনেই ছিল কাঠের ভারি আলমারি। পিঠ আলমারিতে ঠেকে যেতেই সে আটকে গেল। রায়হান দুই হাত আলমারির গায়ে রেখে তামান্নাকে পুরোপুরি নিজের দুই বাহুর বৃত্তে বন্দি করে ফেলল।

 

"রায়হান... চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে," তামান্না ধুকপুকি সামলে নীচু স্বরে বলল। তার বুকের ওঠা-নামা এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

 

"চা ঠান্ডা হোক, কিন্তু আমাদের ভেতরের এই উত্তাপটা ঠান্ডা হতে দেওয়া যাবে না," রায়হান এক হাত বাড়িয়ে তামান্নার খোপায় থাকা কাঁটাটা সাবধানে খুলে দিল। নিমেষেই তামান্নার ঘন, কালো চুলের রাশ ছড়িয়ে পড়ল তার পিঠ আর কাঁধ জুড়ে।

 

বাইরে বৃষ্টির তীব্রতা আরও বাড়ল। চালের ওপর বৃষ্টির ঝমঝম শব্দে ঘরের ভেতরের নিস্তব্ধতা যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠল। রায়হান হাতের আঙুল দিয়ে তামান্নার ভেজা চুলের একগুচ্ছ সরিয়ে নিয়ে তার ঘাড়ের কাছে নিজের মুখটা রাখল। রায়হানের উষ্ণ নিঃশ্বাস আর ঠোঁটের মৃদু ছোঁয়া পেতেই তামান্নার ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে আলতো করে রায়হানের জামাটা হাত দিয়ে চেপে ধরল।

 

"রায়হান... দিনদুপুরে কেউ যদি দেখে ফেলে?" তামান্নার কণ্ঠস্বর এবার পুরোপুরি বুজে এলো।

 

"কেউ দেখবে না। দরজা বন্ধ, আর বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি," রায়হান তামান্নার চিবুক ধরে নিজের দিকে ফেরাল। তামান্নার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। সেই নীলচে চোখে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল এক ব্যাকুল আবেদন, যা কোনো ভাষার তোয়াক্কা করে না।

 

রায়হান ধীরে ধীরে তামান্নার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট রাখল। এবারের স্পর্শ ভোরের মতো অতটা শান্ত ছিল না, এতে ছিল বৃষ্টির মতো এক উদ্দাম আকুলতা। রায়হানের এক হাত তামান্নার কোমর পেঁচিয়ে তাকে নিজের শরীরের সঙ্গে পুরোপুরি মিশিয়ে নিল। তামান্না নিজের সমস্ত লজ্জা আর দ্বিধা ভুলে রায়হানের গলায় হাত পেঁচিয়ে ধরল।

 

রায়হানের পুরুষালি হাতের স্পর্শে তামান্নার শরীরের প্রতিটা অঙ্গ যেন জাগ্রত হয়ে উঠছিল। রায়হান তামান্নাকে শূন্যে তুলে নিয়ে খাটের দিকে নিয়ে গেল। তামান্নার শাড়ির আঁচল মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। খাটে তামান্নাকে শুইয়ে দিয়ে রায়হান তার ওপর ঝুঁকে পড়ল।

 

তামান্নার চোখের পাতায় তখন গভীর তৃষ্ণা। রায়হান তার কপাল, গাল আর গলার খাঁজে একের পর এক ব্যাকুল চুমু এঁকে দিতে লাগল। তামান্নার হাত দুটো রায়হানের পিঠে শক্ত করে বসে গেল। তাদের দুজনের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ টিনের চালে পড়া বৃষ্টির সুরকে ছাপিয়ে এক হয়ে যাচ্ছিল। অচেনা দুই মনের এই মিলন যেন বৃষ্টিভেজা এই নীরব দুপুরকে এক পরম অনুভূতির রঙে রাঙিয়ে দিল।

 

বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ থামল সন্ধ্যানাগাদ। গ্রামের মেঠো পথগুলোতে জল জমে আয়নার মতো জ্বলজ্বল করছে, আর চারপাশের গাছে গাছে জমে থাকা জলবিন্দুগুলো বাতাসে ঝরে পড়ে মৃদু শব্দ তৈরি করছে। ঘরজুড়ে এখন এক ধরনের স্যাঁতসেঁতে শান্ত পরিবেশ। রান্নাঘর থেকে চা আর গরম পেঁয়াজু ভাজার সোঁদা সুবাস ভেসে আসছে।

 

তামান্না আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুল গোছাচ্ছিল। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে তার নিজেরই লজ্জা লাগছিল। তার চোখের নিচে হালকা ক্লান্তি, কিন্তু ঠোঁটের কোণে আর গালে ছড়িয়ে আছে এক অনাবিল তৃপ্তির রক্তিম আভা। দুপুরে বৃষ্টির মধ্যে রায়হানের সেই বেপরোয়া সোহাগ, তার বাহুডোরের বাঁধন আর ঘন নিঃশ্বাসের স্পর্শ এখনো যেন তামান্নার সারা শরীরে শিহরণ জাগিয়ে তুলছে।

 

ঠিক তখনই রায়হান ঘরে ঢুকল। তার গায়ে একটা পাতলা চাদর জড়ানো। আয়নায় তামান্নার চোখ পড়তেই রায়হান পেছন থেকে এসে নিঃশব্দে তাকে জড়িয়ে ধরল। নিজের দুই হাত তামান্নার পেটের ওপর রেখে চিবুকটা রাখল তার কাঁধে।

 

"কী দেখছ অত মন দিয়ে?" রায়হান তামান্নার আয়নার প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল।

 

তামান্না একটু ইতস্তত করে নিজের নজর সরিয়ে নিল, "কিছু না... ছাড়ো তো, আম্মা চা নিয়ে ডাকবেন এখন।"

 

"ডাকুক। স্ত্রীকে নিজের বাহুতে ধরে রাখার অধিকার তো শাশুড়িও কেড়ে নিতে পারবেন না," রায়হান মৃদু হেসে তামান্নার ঘাড়ে আলতো করে নিজের নাক ঘষল।

 

তামান্না একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শিউরে উঠল। সে ঘুর দাঁড়াতে চাইল, কিন্তু রায়হান বাঁধন আরও শক্ত করল। তামান্না তখন মুখ একটু হাঁড়ি করে বলল, "তুমি খুব বাজে, রায়হান। দুপুরে আমাকে যেভাবে..." কথা শেষ না করে সে লাজুক মুখে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে রইল।

 

"যেভাবে কী?" রায়হান তামান্নার চিবুক উঁচিয়ে ধরে দুষ্টুমির সুরে বলল, "নিজের বউকে ভালোবেসেছি, এতে বাজে হওয়ার কী আছে? নাকি তোমার ভালো লাগেনি?"

 

তামান্নার মুখ একদম লাল হয়ে গেল। সে রায়হানের বুকে একটা ছোট্ট কিল মেরে বলল, "তুমি সত্যি খুব অসভ্য হয়ে গেছ। আমি আর তোমার সাথে কথাই বলব না।"

 

তামান্না নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে খাটের কোণে গিয়ে পা গুটিয়ে বসল। এই কৃত্রিম অভিমানটুকু রায়হানের মনকে আরও বেশি দোলা দিল। সে ধীরপায়ে খাটে গিয়ে তামান্নার গা ঘেঁষে বসল। তারপর হাত বাড়িয়ে তামান্নার এক হাত নিজের বুকের ওপর চেপে ধরল। রায়হানের হৃদপিণ্ডের দ্রুত স্পন্দন তামান্নার হাতের তালুতে স্পষ্ট অনুভূত হলো।

 

"শোনো," রায়হান হঠাৎ খুব গম্ভীর ও পরম মায়ায় বলল, "তোমার এই অভিমানী মুখটা আমার ভীষণ প্রিয়, তামান্না। কাল পর্যন্ত যে মানুষটা আমার কাছে অচেনা এক ছায়া ছিল, আজ সে আমার এই বুকের ভেতরটা জুড়ে একা রাজত্ব করছে। বিশ্বাস করো, তোমাকে এই অল্প কদিনে কতটা আপন করে ফেলেছি, তা আমি নিজেও বোঝাতে পারব না।"

 

রায়হানের এই অতর্কিত আর গভীর স্বীকারোক্তিতে তামান্নার মনের ভেতরের সব অভিমান মুহূর্তেই ধুয়েমুছে গেল। তার চোখ দুটো টলমল করে উঠল ভালোবাসার শান্ত জলে। যে ভয় আর দ্বিধা নিয়ে সে এই অচেনা সংসারে পা রেখেছিল, রায়হানের এই অকৃত্রিম যত্ন আর তীব্র ভালোবাসা সেই সব শঙ্কাকে এক নিমেষে উধাও করে দিয়েছে।

 

তামান্না আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে নিজেই এগিয়ে গিয়ে রায়হানের বুকে মুখ লুকালো। রায়হান হাসিমুখে তামান্নাকে জড়িয়ে ধরে তার মাথায় নিজের গাঢ় চুমু এঁকে দিল।

 

ঘরের কোণে মোমবাতির শিখাটা মিটমিট করে জ্বলছিল। তামান্না রায়হানের বুকের উত্তাপ নিতে নিতে মনে মনে অনুধাবন করল—কখনো কখনো হুট করে আসা জড়িয়ে পড়া সম্পর্কগুলোই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ও মিষ্টি সত্যি হয়ে ওঠে।

 

রাতের খাঁ খাঁ নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন মেহেরপুরের গ্রামটি। বিকালের মেঘ কেটে গিয়ে আকাশে এখন এক বিশাল রূপালী থালার মতো পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে। জোৎস্নার ধবধবে মেখে যাওয়া আলোয় বারান্দার টিনের চাল, সুপারি গাছের সারি আর দূরের বাঁশঝাড় যেন কোনো জাদুকরী রূপকথার রাজ্য তৈরি করেছে।

 

রান্নাঘরের কাজ সেরে তামান্না যখন ঘরে ফিরে এলো, তখন রায়হান বারান্দার কাঠের চেয়ারে বসে বাইরের রূপালী আলোর দিকে তাকিয়ে ছিল। তামান্না তার চুলগুলো খুলে দিয়ে পিঠে ছড়িয়ে রেখেছিল। তার গায়ে একটি সাদা সুতির শাড়ি, যার লাল পাড়টি পূর্ণিমার আলোয় এক অদ্ভুত মাদকতা ছড়াচ্ছিল।

 

তামান্না ধীরপায়ে রায়হানের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাতাসে তার ভেজা চুলের ঘ্রাণ আর শাড়ির সোঁদা গন্ধ ভেসে এলো রায়হানের নাকে। রায়হান মাথা তুলে তাকাল। জোৎস্নার আলো তামান্নার মুখে পড়ে তাকে যেন কোনো রূপসী অপসরীর মতো দেখাচ্ছে।

 

"তুমি এখনো ঘুমাওনি?" তামান্না বেশ নরম গলায় জিজ্ঞেস করল। এখন আর তার গলায় আগের মতো জড়তা বা দ্বিধা নেই, সেখানে ফুটে উঠেছে এক পরম অধিকারের সুর।

 

রায়হান তামান্নার হাতটা চেপে ধরে তাকে টেন নিজের কোলে বসিয়ে নিল। আচমকা এই টানে তামান্না একটু ভড়কে গিয়ে রায়হানের গলা জড়িয়ে ধরল।

 

"এত সুন্দর একটা রাত, আর আমার পাশে আমার এত মিষ্টি একটা বউ... ঘুম কি অত সহজে আসে, তামান্না?" রায়হান তামান্নার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল।

 

তামান্না লাজুক হেসে রায়হানের বুকে মাথা রাখল। চারপাশের নিস্তব্ধতায় কেবল তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ আর দূরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছিল। রায়হান তার আঙুল দিয়ে তামান্নার শাড়ির লাল পাড়টা জড়িয়ে ধরে বলল, "জানাতো, তামান্না? প্রথম দিন যখন তোমাকে দেখেছিলাম, তখন ভেবেছিলাম কীভাবে তোমার এই চঞ্চল মনটাকে আমি সামলাব। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, এই মনের ভেতরে হারিয়ে যাওয়াটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।"

 

তামান্না মাথা তুলে রায়হানের দিকে তাকাল। জোৎস্নার আলো রায়হানের গাঢ় কালো চোখের ভেতর প্রতিফলিত হচ্ছিল। সেই চোখের ভেতরে কেবল ভালোবাসা আর এক অদম্য আকুলতা।

 

"আর আমি ভেবেছিলাম আপনি খুব কড়া একজন মানুষ হবেন," তামান্না একটু হেসে বলল। "আমাকে হয়তো সারাদিন নিয়ম মেনে চলতে হবে। কিন্তু আপনি তো আমাকে আপনার ভালোবাসায় বন্দি করে ফেললেন।"

 

"এখনো বন্দি করতে পেরেছি কি?" রায়হানের কণ্ঠ গভীর থেকে আরও গভীরতর হয়ে উঠল। সে তামান্নার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। "তোমার এই চোখে তো আমি এখনও এক অচেনা তৃষ্ণা দেখতে পাচ্ছি।"

 

কথাটা বলেই রায়হান তামান্নার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট নামিয়ে আনল। জোৎস্নার আলোর নিচে,খোলা বারান্দার মায়াবী বাতাসে তাদের প্রথম পূর্ণিমার এই চুম্বন ছিল গভীর, অনুরাগে ভরা এবং অত্যন্ত নিবিড়। তামান্না নিজের সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে রায়হানকে আঁকড়ে ধরল। রায়হানের হাত তামান্নার পিঠ বেয়ে কোমর স্পর্শ করল। শাড়ির আলগা বাঁধন গলে রায়হানের উষ্ণ আঙুলগুলো তামান্নার মসৃণ ত্বকে এক নতুন অনভূতির সৃষ্টি করল।

 

রায়হান তামান্নাকে কোলে তুলে নিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে দরজার শিকল তুলে দিল। ঘরের হারিকেনটা আজ নেভানো ছিল, কেবল জানালা দিয়ে পূর্ণিমার আলো এসে আছড়ে পড়েছিল খাটের ওপর।

 

রায়হান তামান্নাকে খাটে শুইয়ে দিয়ে তার ওপর নেমে এলো। তার ঘন নিঃশ্বাস আর অনবরত চুমুর ছোঁয়ায় তামান্নার শরীর একে একে উন্মুক্ত হতে লাগল। তামান্নার প্রতিটি শিহরণ, তার অধরের আকুলতা আর রায়হানের ব্যাকুল পুরুষালি স্পর্শে ঘরটি হয়ে উঠল এক তীব্র ভালোবাসার পূজাবেদী। কোনো কৃত্রিমতা বা ভয় ছাড়াই দুটি অচেনা প্রাণ সেই রাতে নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে এক পরম বন্ধনে বিলীন হয়ে গেল।

 

ভোরের আলো ফোটার ঠিক আগের মুহূর্তটায় পুরো মেহেরপুর গ্রাম যেন এক অপার প্রশান্তিতে নিঝুম হয়ে ছিল। জানালার ফাঁক গলে আসা ভোরের আবছা ধূসর আলোয় দেখা যাচ্ছিল তামান্না রায়হানের বুকে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। কাল রাতের তীব্র অনুরাগের পর দুজনের শরীরেই এক গাঢ় ক্লান্তি, অথচ হৃদয়ে অদ্ভুত এক স্থিৰতা। রায়হানের এক হাত তামান্নার নগ্ন পিঠ আলতো করে বেষ্টন করে ছিল, আর অন্য হাতের আঙুলগুলো খেলা করছিল তামান্নার ছড়িয়ে থাকা ঘন কালো চুলে।

 

রায়হানের হালকা নড়াচড়াতে তামান্নার ঘুম ভেঙে গেল। সে চোখ মেলে তাকাতেই রায়হানের সহাস্য, তৃপ্ত মুখের মুখোমুখি হলো। তামান্নার গালে মুহূর্তেই এক পশলা লাজুক লালচে আভা ছড়িয়ে পড়ল। সে চট করে রায়হানের বুকের চাদরটা আরও খানিকটা ওপরে টেনে নিয়ে মুখ লুকানোর চেষ্টা করল।

 

"এখনো লজ্জা পাচ্ছ?" রায়হান নিচু, গভীর গলায় হেসে উঠল। সে তামান্নার চিবুকটা আলতো করে ধরে মুখটা ওপরে তুলে আনল। "কাল রাতে তো এই লাজুক মেয়েটাকে কোথাও খুঁজে পাইনি। যে মেয়ে আমার বুকে নিজের সমস্ত অধিকার দাবি করছিল, সে এখন মুখ লুকাচ্ছে?"

 

"রায়হান! প্লিজ, চুপ করো..." তামান্না কানের কাছে হাত চাপা দিতে গিয়েও পারল না, কারণ রায়হান তার দুটো হাতই নিজের এক হাতের মুঠোয় ধরে ফেলল।

 

"আমি সত্যি বলছি, তামান্না," রায়হানের গলার স্বর এবার একদম বদলে গেল, তাতে ফুটে উঠল পরম আকুলতা। সে তামান্নার কপালে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখল। "হঠাৎ করেই জীবনের মোড় ঘুরে তোমাকে পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম হয়তো মানিয়ে নিতে অনেক সময় লাগবে। কিন্তু এই কটা দিনে তুমি যেভাবে আমার ঘর, আমার মন আর আমার অস্তিত্ব জুড়ে মিশে গেছ—এখন তোমাকে ছাড়া একটা মুহূর্তের কথাও আমি ভাবতে পারি না।"

 

তামান্না রায়হানের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো অস্পষ্টতা ছিল না, ছিল কেবল এক খাঁটি ও গভীর ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি। তামান্নার নিজের বুকের ভেতরটাও ভালোবাসার জোয়ারে ভেসে যাচ্ছিল। সে মুক্ত হাতটি বাড়িয়ে রায়হানের গালে রাখল, তার আঙুলের আলতো ছোঁয়ায় লুকিয়ে ছিল এক নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের গল্প।

 

"আমিও তো আপনাকে... সরি, তোমাকে ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারি না," তামান্না ধীরস্বরে, পরম মায়ায় বলল। "যে অনাত্মীয় মানুষটাকে ভেবে ভয় পেয়েছিলাম, আজ সেই মানুষটাই আমার জীবনের সবচেয়ে আপন, সবচেয়ে বড় আশ্রয়।"

 

রায়হান আর কথা বাড়াল না। সে তামান্নার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মিলিয়ে দিল এক দীর্ঘ, আবেগঘন চুম্বনে। সেই স্পর্শে ছিল না কোনো তাড়া, ছিল কেবল সারাজীবন একসাথে থাকার এক নীরব অঙ্গীকার।

 

সকালের মিষ্টি রোদ যখন ঘরের মেঝেময় ছড়িয়ে পড়ল, তখন তামান্না শাড়ি পেঁচিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। বাতাসে ধানখেতের সোঁদা গন্ধ আর পাখির কলকাকলি। পেছন থেকে রায়হান এসে নিঃশব্দে তাকে জড়িয়ে ধরে কোমর পেঁচিয়ে দাঁড়াল, নিজের চিবুকটা রাখল তামান্নার কাঁধে।

 

তামান্না রায়হানের হাতে নিজের হাত রেখে মুচকি হাসল। আকস্মিক এক পরিস্থিতিতে যে যাত্রার শুরু হয়েছিল, আজ তা পৌঁছে গেছে এক চিরন্তন অনুরাগের মোহনায়। দুটি অচেনা মন আজ আর আলাদা নয়—তারা এখন একে অপরের আত্মায় লীন হয়ে যাওয়া এক সম্পূর্ণ দম্পতি।

....
👁 15