বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরানো আমবাগানের শেষ সীমানায় সূর্যটা যখন এলিয়ে পড়ছিল, তখন চারপাশের বাতাস ভরে উঠেছিল এক ধরনের ভেজা মাটির গন্ধে। ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর থেকে বয়ে আসা হিমেল হাওয়া ছুড়ে মারছিল শুকনো মেহগনি পাতা। সেই ঝরা পাতার ওপর পা দিয়ে হাঁটছিল রিদয়ান আর মায়া। দুজনের নীরবতার মাঝে কেবল শুকনো পাতার মুচমুচে শব্দটুকুই ছিল একমাত্র ভাষা।
রিদয়ান একটু পিছিয়ে হাঁটছিল। মায়ার কাঁধ ছুঁই-ছুঁই করে থাকা কালো রেশমি চুলের থোকা বাতাস পেলেই উড়ে এসে রিদয়ানের মুখে লাগছিল। সেই চুলের চেনা শ্যাম্পু আর তাজা রোদের সুবাস রিদয়ানের বুকের ভেতরে প্রতিবার এক অচেনা তোলপাড় সৃষ্টি করে। ছয়টা দীর্ঘ বছর—বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ক্লাস থেকে শুরু করে আজকের এই পড়ন্ত বিকেল পর্যন্ত—রিদয়ান কেবল মায়ার ছায়া হয়েই পাশে রয়ে গেছে।
"রিদয়ান, তুই কি আজকে সত্যি কিছু বলবি না?" মায়া হুট করে দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরে তাকাল।
তার কাজলপরা দুটো বড় বড় চোখ রিদয়ানের চোখের ওপর স্থির হলো। মায়ার এই হরিণচোখে এক ধরনের অদ্ভুত মোহ আছে, যা রিদয়ানকে প্রতিমুহূর্তে নিঃশ্বাসে আটকে ফেলে। মায়ার পরনে ছিল হালকা নীল রঙের এক সুতি শাড়ি, আঁচলটা একপাশে আলগা করে জড়ানো। দখিনা হাওয়ায় শাড়ির আঁচল সরে গিয়ে বারবার তার ক্ষীণ কোমর উন্মুক্ত হয়ে পড়ছিল।
রিদয়ান নিজের দৃষ্টি সামলে নিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করল। "কী বলব বল? তোর তো সব কথাই জানা।"
"সব কথা জানা থাকলে আর তোকে এভাবে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হতো না," মায়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একধাপ এগিয়ে এল।
মায়ার এই আচমকা কাছে চলে আসাটা রিদয়ানের হৃদস্পন্দন একলাফে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিল। মায়ার শরীরের উষ্ণতা, তার তাজা ত্বকের সুবাস এখন খুব কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে। মায়া রিদয়ানের টি-শার্টের হাতাটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার আঙুলের মৃদু স্পর্শ রিদয়ানের চামড়ায় যেন এক বিদ্যুৎ তরঙ্গ খেলে গেল।
"আমার বাড়িতে কাল থেকে মানুষ আসা শুরু করবে, রিদয়ান," মায়ার কণ্ঠে এক ধরনের আকুলতা আর অভিমান মেশানো। "বাবা-মা যার কথা বলছে, সে মস্ত বড় ইঞ্জিনিয়ার। পাত্র পক্ষ কাল সন্ধ্যায় আংটি পরাতে আসবে। তুই তো জানিস, আমি এসবের কিছুই চাইনি।"
রিদয়ানের মনে হলো কেউ যেন তার বুকের ভেতর ধারালো কোনো ছুরি ঢুকিয়ে মোচড় দিচ্ছে। মায়াকে অন্য কারো হয়ে যেতে দেখার কল্পনাটাও তার রক্ত জমাট বাঁধিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। অথচ সে মুখ ফুটে বলতে পারছে না যে, এই বুকে কেবলই তার রাজত্ব।
"তুই কি চাস আমি অন্য কারো হই?" মায়া এবার রিদয়ানের বুকের ওপর দুটো হাত রাখল।
আঙুলগুলোর নরম স্পর্শে রিদয়ান আক্ষরিক অর্থেই কেঁপে উঠল। মায়ার ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে, চোখের কোণে একফোঁটা জ্বলজ্বলে জল। রিদয়ান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। মায়ার ডান হাতটা নিজের বুকের বাঁ-পাশে টেনে নিল, যেখানে তার হৃদপিণ্ডটা পাগলের মতো আছাড় খাচ্ছে।
"শুনতে পাচ্ছিস?" রিদয়ানের কণ্ঠস্বর এক অদ্ভুত গভীর আর ভারী শোনালো। "প্রতিটা স্পন্দন শুধু একটা নামই জপ করে। কিন্তু আমি তোকে বন্ধনে বাঁধতে চাইনি, মায়া। আমি চেয়েছিলাম তুই তোর মতো করে আমায় ভালোবাসবি।"
মায়া রিদয়ানের দিকে চেয়ে রইল, তার চোখে তখন এক আশ্চর্য মাতাল আলো। সে রিদয়ানের গালে নিজের এক হাত রাখল। মায়ার হাতের তালুর চরম উষ্ণতা রিদয়ানের গালে ছড়িয়ে পড়ল। রিদয়ান চোখ বন্ধ করে ফেলল। সেই স্পর্শে কোনো বন্ধুত্ব ছিল না, ছিল দুটো অতৃপ্ত আত্মার তীব্র আকর্ষণ।
"বোকা একটা!" মায়া ফিসফিস করে বলল।
সে রিদয়ানের একদম কাছে সরে এল। এত কাছে, যে রিদয়ানের ঠোঁটে এসে লাগছিল মায়ার উত্তপ্ত নিঃশ্বাস। মায়ার দুই ঠোঁটের স্বাভাবিক লালচে আভা আর তার নিঃশ্বাসের তাপ রিদয়ানের ভেতরের সমস্ত সংযম এক মুহূর্তে ছারখার করে দিল। রিদয়ান ডান হাত দিয়ে মায়ার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের সাথে একদম লেপ্টে টেনে নিল।
মায়ার মুখ থেকে একটা মৃদু হাঁপ ছাড়ার শব্দ বের হলো। সে ভাবেনি শান্ত-শিষ্ট রিদয়ান কখনো এতখানি উগ্র হতে পারে। রিদয়ানের শক্ত দুটো বাহুর বাঁধনে মায়ার শরীরটা মিশে গেল। রিদয়ানের অন্য হাতের আঙুলগুলো মায়ার চুলের ভেতর ঢুকে গেল, মায়ার মাথাটা নিজের দিকে একটু কাত করে নিয়ে সে মায়ার ঠোঁটের একদম কাছে গিয়ে থামল।
দুজন মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দ ব্রহ্মপুত্রের পাড়ের বাতাসকেও যেন উত্তপ্ত করে তুলল।
"যদি বলি, কাল তোকে আমি অন্য কারো হতে দেব না?" রিদয়ানের কণ্ঠস্বরে একধরনের গভীর নেশা আর একগুঁয়েমি ঝরে পড়ল।
মায়ার চোখ দুটো আংশিক বুজে আসছিল। রিদয়ানের এই রূপ তার সম্পূর্ণ অজানা, অথচ এই রূপেই সে যেন ব্যাকুল হয়ে উঠছিল। মায়া রিদয়ানের কাঁধ দুটো দুহাতে শক্ত করে চেপে ধরে নিজের শরীরটাকে আরও বেশি রিদয়ানের ওপর সমর্পণ করে দিল। তার খোলা বুক রিদয়ানের বুকের সাথে ঘষা খাচ্ছিল, আর প্রতিটা স্পর্শেই এক অচেনা কামনার আগুন জ্বলে উঠছিল দুজনের মাঝে।
"তাহলে আটকে রাখ আমায়..." মায়া রিদয়ানের একদম কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল। তার ভেজা ঠোঁটের স্পর্শ রিদয়ানের কানের লতিতে লাগতেই রিদয়ান শিউরে উঠল। "আটকে রাখ, যেন কোনো ঝড় এসে আমাকে তোর কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে যেতে না পারে।"
রিদয়ান আর দেরি করল না। মায়ার কোমর ধরে তাকে সোজা আমগাছের মোটা গুঁড়িটার সাথে চেপে ধরল। গাছের ছায়ায় ঘেরা সেই নির্জন কোণে রিদয়ানের ঠোঁট গিয়ে নামল মায়ার উন্মুখ ঠোঁটের ওপর। প্রথম স্পর্শেই এক তীব্র আবেশ ছড়িয়ে পড়ল দুজনের শিরায় শিরায়। রিদয়ানের ঠোঁটের আকুল চোষণ আর ব্যাকুলতা মায়াকে উন্মাদ করে তুলল। মায়া রিদয়ানের পিঠের টি-শার্ট আঁকড়ে ধরে তার আরো গভীরে তলিয়ে যেতে চাইল।
রিদয়ানের ঠোঁট মায়ার ঠোঁট ছেড়ে নেমে এল তার চিবুকে, তারপর ধীরে ধীরে লম্বা গলা বেড়ে নিচে নামতে লাগল। মায়ার সুতি শাড়ির আঁচলটা গাছতলার নরম ঘাসে খসে পড়ল। রিদয়ানের গরম নিঃশ্বাস আর ঠোঁটের স্পর্শে মায়ার গলার ওপরে ফুটতে থাকা শিহরণের দাগগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল। মায়ার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এল, সে মুখ ফুটে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিদয়ানের চুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরল।
"রিদয়ান... প্লিজ..." মায়ার মুখ দিয়ে কেবল একটা অস্পষ্ট শব্দ বের হলো। সে জানত না সে কী চাইছে, কিন্তু রিদয়ানের এই প্রগাঢ় ছোঁয়া তার ভেতরে জমে থাকা বহুদিনের সুপ্ত পিপাসাকে জাগিয়ে তুলেছে।
রিদয়ান মায়ার থরথর করে কাঁপা শরীরটাকে আরো শক্ত করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে রাখল। বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলা এই গভীর, উন্মাদ আলিঙ্গন আর ঠোঁটের স্পর্শ শেষ হলে তারা দুজনই দীর্ঘশ্বাস ফেলে থামল। রিদয়ানের কপালটা ঠেকে রইল মায়ার ভিজতে থাকা কপালে।
দুজনেরই শ্বাসের গতি তখন তীব্র। মায়ার খোলা বুকের ওঠানামা আর রিদয়ানের ভারী নিঃশ্বাস একে অপরের সাথে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল।
"আজ রাতে আমি কোনো উত্তর দেব না, মায়া," রিদয়ান মায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে ধীর কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল, "কিন্তু কাল সন্ধ্যায় যখন পাত্র পক্ষ তোকে দেখতে আসবে, তখন তুই দেখবি তোর পাশটিতে অন্য কেউ নয়, আমি দাঁড়িয়ে আছি। তোকে হারাতে আমি দেব না।"
মায়া কোনো কথা বলল না, শুধু রিদয়ানের বুকের ভেতর নিজের মুখটা আরও শক্ত করে গুঁজে দিল। তার চোখের জল রিদয়ানের টি-শার্ট ভিজিয়ে দিল, কিন্তু সেই জল ছিল এক অদ্ভুত স্বস্তির।
কিন্তু তারা কেউ জানত না, কালকের সন্ধ্যাটা এত সহজে আসবে না। মায়ার পরিবারে ইতিমধ্যেই ঘনিয়ে এসেছে এক বিশাল ঝড়, যা এই ভালোবাসাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিতে তৈরি। আর রিদয়ানের কাছে আসতে চলেছে এমন এক ফোন কল, যা তাদের এই গভীর সম্পর্কের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
আমবাগানের অন্ধকার ঘন হওয়ার আগেই মায়াকে তার হোস্টেলের সামনে নামিয়ে দিয়ে এল রিদয়ান। বাইকে ওঠার পর থেকেও মায়ার কোনো কথা ছিল না, কেবল রিদয়ানের পিঠে তার দুটো হাত ছিল শক্ত করে জড়ানো। গন্তব্যে পৌঁছানোর পরও মায়াকে কেমন যেন এক ঘোরের মধ্যে দেখাচ্ছিল। রিদয়ানের ঠোঁটের উগ্র ছোঁয়া আর গলার নিচে চেপে আসা উত্তাপ এখনো মায়ার সারা শরীরে এক মিষ্টি জ্বলন তৈরি করে রেখেছে।
হোস্টেলের ঘরে ঢুকে মায়া দরজাটা লক করে দিল। হাত থেকে ব্যাগটা নিচে পড়ে গেল। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তার নিজের চেহারা দেখে নিজেই শিউরে উঠল সে। আয়নায় প্রতিফলিত মায়ার দুই ঠোঁট তখনও খানিকটা ফোলা, চোখের কোণে এক অদ্ভুত নেশাতুর চাহনি। সুতি শাড়ির আঁচলটা একটু সরতেই চোখে পড়ল তার গলার ঠিক নিচে রক্তিম শিহরণের তাজা দাগ—রিদয়ানের শক্ত ঠোঁটের ছাপ।
মায়া হাত দিয়ে দাগটা ছুঁল। এক তীব্র রোমাঞ্চ তার শিরদাঁড়া বেয়ে নিচে নেমে গেল। ছয়টা বছর সে যার শীতল, মেপে চলা স্বভাব দেখে এসেছে, সেই রিদয়ান যে ভেতর থেকে এতখানি উগ্র, এতখানি কামনার আগুনে জ্বলছে—তা মায়া কল্পনাতো দূরে থাক, স্বপ্নেও ভাবেনি। মায়াও কি মনে মনে এই দিনটার জন্যই অপেক্ষা করছিল?
হঠাৎ টেবিলের ওপর রাখা মায়ার ফোনটা বিকট শব্দে বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল ‘বাবা’ নামটা। মায়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা কানে তুলল।
"হ্যাঁ, বাবা?"
"কোথায় তুই, মায়া?" ওপাশ থেকে বাবার কর্কশ ও গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল। "তোর পড়ালেখা শেষ। কালকে জাবেদ সাহেব তাঁর ছেলেকে নিয়ে আসবেন। জামাই নামকরা আর্কিটেক্ট, ঢাকায় দুটো ফ্ল্যাট আছে। কোনো ওজর-আপত্তি আমি শুনব না। সকালে গাড়ি পাঠাচ্ছি, তুই বাড়ি চলে আয়।"
"বাবা, আমি এখন বিয়ে করতে চাই না..." মায়ায় কণ্ঠে প্রতিবাদের সুর।
"কথা বাড়াবি না!" বাবার কণ্ঠে তীব্র ধমক। "তুই কার সাথে মেলামেশা করিস, না করিস—সব খবর আমার কাছে আসে। ওই বেকার রিদয়ানের পেছনে ঘুরে জীবন নষ্ট করতে দেব না। কাল সন্ধ্যায় আংটি বদল হবে, ব্যাস!"
ফোনটা কেটে গেল। মায়া হাঁটু মুড়ে মেঝেই বসে পড়ল। তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। রিদয়ানকে যে তার বাবা পছন্দ করেন না, তা সে জানত। কিন্তু এত দ্রুত সব কিছু ঘটিয়ে ফেলবেন, তা ভাবেনি।
অন্যদিকে, শহরমুখী রাস্তায় বাইক ছুটিয়ে যাচ্ছিল রিদয়ান। বাতাসের তীব্র ধাক্কাও তার ভেতরের উত্তাপ কমাতে পারছিল না। মায়ার সুবাস, তার কোমরের নরম অনুভূতির ছোঁয়া তখনও রিদয়ানের হাতের তালুতে লেগে আছে। মায়াকে ছাড়া অন্য কোনো নারীর কল্পনাও তার কাছে পাপের মতো।
বাইকটা নিজের মেসে এনে থামাতেই রিদয়ানের ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে কল এল।
"হ্যালো, রিদয়ান বলছ?" ওপাশ থেকে এক ভারী, অপরিচিত কণ্ঠস্বর।
"হ্যাঁ, বলছি। আপনি কে?"
"আমি মায়ার বাবা। বেশি কথা বলব না, সংক্ষেপে শোন। কালকের পর থেকে যদি তোকে মায়ার আশেপাশে দেখি, তবে তোর বিরুদ্ধে এমন পুলিশ কেস দেব যে বাকি জীবন জেলখানায় কাটাতে হবে। আর তোর যে ছোট বোনটা ময়মনসিংহে পড়ে, তার হোস্টেলের ঠিকানাও আমার জানা আছে। নিজের আর নিজের পরিবারের ভালো চাইলে কাল সকালের মধ্যে শহর ছাড়বি।"
ঠাস করে ফোনটা কেটে গেল। রিদয়ানের হাতের মুঠোয় ধরা ফোনটা থরথর করে কাঁপতে লাগল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল, চোখের কোণে ফুটে উঠল তীব্র হিংস্রতা। মায়ার বাবা তাকে হুমকি দিচ্ছে! তার বোনকে জড়িয়ে ভয় দেখাচ্ছে!
রিদয়ান মেঝের ওপর সজোরে লাথি মারল। রক্তের ভেতরের রাগে আর অপমানে সে যেন অন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু পরক্ষণেই মায়ার সেই করুণ মুখের কথা মনে পড়ল—“আটকে রাখ আমায়... যেন কোনো ঝড় এসে আমাকে তোর কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে যেতে না পারে।”
রিদয়ান আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে সোজা মায়াদের হোস্টেলের পেছনের দেয়ালের দিকে ছোটাল তার বাইক।
রাত তখন আনুমানিক সাড়ে এগারোটা। হোস্টেলের পেছনের দিকে বেশ নির্জন, আমগাছের ডালগুলো একদম দোতলার বারান্দা ছুঁই-ছুঁই করছে। রিদয়ান কোনো কিছু না ভেবে গাছ বেয়ে তরতর করে উঠে গেল দোতলার পেছনের বারান্দায়। মায়ার ঘরের জানালার গ্রিল ধরে আস্তে করে টোকা দিল সে।
মায়া তখনো ঘরের লাইট নিভিয়ে বিছানায় একা শুয়ে কাঁদছিল। টোকা দেওয়ার শব্দ শুনে সে চমকে উঠে দাঁড়াল। জানালার দিকে এগোতেই দেখতে পেল আঁধারে দাঁড়িয়ে থাকা রিদয়ানের অবয়ব।
মায়া জলদি জানালাটা খুলে দিল। "রিদয়ান! তুই এখানে? মাথা খারাপ হয়েছে তোর? কেউ দেখে ফেললে..."
কথা শেষ করার সুযোগ দিল না রিদয়ান। এক টানে জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকে সে মায়াকে জড়িয়ে ধরে সোজা দরজার লকটা আবার পরীক্ষা করে নিল। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে এক ঝটকায় মায়াকে নিজের বুকে টেনে নিল।
"রিদয়ান... কী করছিস?" মায়ায় কণ্ঠ রোধ হয়ে এল রিদয়ানের তীব্র বাঁধনে।
"চুপ!" রিদয়ানের কণ্ঠে কোনো কোমলতা ছিল না, ছিল এক আদিম, অপ্রতিরোধ্য অধিকারবোধ। "তোর বাবা আমাকে হুমকি দিয়েছে। কাল তোকে জোর করে নিয়ে যাবে। কিন্তু তুই শুধু আমার, মায়া। সম্পূর্ণ আমার।"
রিদয়ানের চোখ দুটো অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছিল। মায়া আর কোনো কথা বলতে পারল না। রিদয়ানের এই ভয়াল অথচ প্রচণ্ড ব্যাকুল রূপ দেখে তার ভেতরের সমস্ত ভয় গলে জল হয়ে গেল। সে নিজের দুটো হাত রিদয়ানের গলায় পেঁচিয়ে ধরল।
রিদয়ান এক টানে মায়াকে খাটটার ওপর ফেলে দিল। অন্ধকারের মধ্যেও মায়ার শরীরের প্রতিটি বাঁক রিদয়ানের জানা। রিদয়ান মায়ার ওপর নেমে এল। তার ভারী শরীরটা মায়ার নরম শরীরের ওপর চেপে বসতেই মায়ায় মুখ থেকে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল।
রিদয়ান আর সময় নষ্ট করল না। সে মায়ার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট নামিয়ে আনল এক উগ্র, ক্ষুধার্থ আনন্দে। মায়াও এবার আর কোনো দ্বিধা রাখল না। সে নিজের পা দিয়ে রিদয়ানের কোমর পেঁচিয়ে ধরল, রিদয়ানের চুলগুলো টেনে ধরে তার ঠোঁটের গভীরতা আরও বাড়িয়ে দিল।
রিদয়ানের হাত চলে গেল মায়ার কামিজের ফিতার দিকে। এক টানে ফিতা আলগা হতেই উন্মুক্ত হয়ে পড়ল মায়ার ধবধবে ফর্সা পিঠ আর বুক। রিদয়ানের গরম হাতের তালু মায়ার মসৃণ পিঠে ঘষা খেতেই মায়া শিউরে উঠে রিদয়ানের ঘাড় কামড়ে ধরল। রক্তে তখন কামনার তীব্র তোলপাড়। রিদয়ানের ঠোঁট মায়ার ঠোঁট ছেড়ে নেমে এল তার গলায়, তারপর আরও নিচে—বুকের খাঁজে।
"রিদয়ান... আমায় তোর করে নে..." মায়া ফিসফিস করে উঠল, তার গলা থরথর করে কাঁপছিল, "এমনভাবে তোর করে নে, যেন কাল সকালে কেউ আমায় আলাদা করতে না পারে।"
রিদয়ানের ঠোঁট আর হাতের চরম উত্তাপে ঘরের ভেতরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। দুজন অতৃপ্ত মানুষ অন্ধকারের চাদর গায়ে জড়িয়ে এক চরম ও অনাস্বাদিত সুখে তলিয়ে যেতে লাগল, যেখানে বাইরের পৃথিবীর কোনো নিয়ম, কোনো বাবার হুমকি বা সমাজ আর অবশিষ্ট রইল না।
কিন্তু রাতের শেষ প্রহরে, যখন উত্তেজনার পারদ শিখরে, ঠিক তখনই হোস্টেলের নিচে শোনা গেল ভারী বুটের শব্দ আর চাবির ঝনঝনানি।
দরজায় সজোরে ধাক্কা পড়ল। “মায়া! দরজা খোল! হোস্টেল সুপার আসছেন, জলদি খোল!” বাইরে থেকে কেয়ারটেকারের তীক্ষ্ণ গলার আওয়াজ আর সাথে বেশ কজন মান্যগন্য মানুষের পায়ের শব্দে ঘরের মধ্যকার উত্তপ্ত নীরবতা নিমেষেই চুরমার হয়ে গেল।
বিছানার ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মায়ার শাড়ি আর কামিজের আলগা ফিতাগুলো তখন এক অবিন্যস্ত বাসনার সাক্ষী দিচ্ছিল। মায়ায় শরীর তখনও কামনার তীব্র আবেশে শিউরে উঠছে, বুকের ওঠানামা থামেনি। রিদয়ান এক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে গেল। মায়ার চোখের দিকে তাকাতেই দেখল, সেখানে ভয়ের লেশমাত্র নেই—বরং রয়েছে এক অদ্ভুত মাতাল স্থিরতা।
রিদয়ান দ্রুত মায়ার কামিজের ফিতাগুলো বেঁধে দিল, আঁচলটা গুছিয়ে মায়ার খালি কাঁধে তুলে দিয়ে নিজের শার্টটা সামলে নিল। তারপর মায়ার কপালে একটা অতৃপ্ত, উত্তপ্ত চুম্বন এঁকে ফিসফিস করে বলল, “ভয় পাবি না। আমি আছি।”
“আমি ভয় পাচ্ছি না, রিদয়ান,” মায়া রিদয়ানের হাত দুটো চেপে ধরে বলল, “তুই বারান্দা দিয়ে বের হয়ে যা। ওরা তোকে দেখলে তোর ক্ষতি করবে।”
“তোর বাবার লোক এসেছে, আমি জানি,” রিদয়ানের গলার আওয়াজ নিচু হলেও তাতে ছিল হিংস্র তেজ। “তোর গায়ে কেউ হাত দেওয়ার সাহস পাবে না।”
“প্লিজ রিদয়ান, আমার কথা শোন!” মায়া রিদয়ানের গালের দুপাশে হাত রেখে তীব্র আকুতিতে বলল। “এখন ধরা পড়লে ওরা তোকে পুলিশে দেবে। কালকের দিনটা আমাদের বাঁচতে হবে। তুই যা!”
দরজার ওপর ধাক্কার তীব্রতা বাড়ছিল। রিদয়ান আর কথা বাড়াল না। মায়ার ফোলা, রক্তিম ঠোঁটে শেষবারের মতো একটা গভীর কামড় বসিয়ে সে বারান্দার দিকে পা বাড়াল। এক ঝটকায় আমগাছের ডাল ধরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল সে।
মায়া আয়নার দিকে না তাকিয়েই ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে গিয়ে লক খুলে দিল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন হোস্টেল সুপার, আর তাঁর পেছনে দুজন পুলিশ সদস্য ও মায়ার বাবা নিজে!
মায়ার বাবা ঘরের ভেতরে ঢুকেই চারপাশটা এক হিংস্র নজরে দেখলেন। ঘরের এলোমেলো পরিবেশ, মায়ার বিশৃঙ্খল চুল আর গলার কছে ফুটে থাকা তাজা কামড়ের রক্তিম দাগ তাঁর চোখ এড়ালো না। রাগে তাঁর রক্ত চড়ে গেল।
“মেয়েকে তো খুব মাথায় তুলেছ!” মায়ার বাবা সুপারের দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠলেন। “এই জন্য একে ইউনিভার্সিটিতে পড়তে পাঠিয়েছিলাম? নির্লজ্জ, বেহায়া মেয়ে!”
মায়া কোনো উত্তর দিল না। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বাবার চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন কোনো অনুশোচনা ছিল না, ছিল কেবল এক ধরনের অনড় জেদ।
“গাড়িতে ওঠ!” মায়ার বাবা তার হাত শক্ত করে চেপে ধরলেন। হাতের মোচড়ে মায়ার হাতের চামড়া লাল হয়ে গেল, কিন্তু সে একটা শব্দও করল না। “আজ রাতেই তোকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হবে। কাল সকালে জাবেদ সাহেবের ছেলের সাথে তোর আকদ হবে। দেখি তোর ওই রিদয়ান তোকে কীভাবে বাঁচায়!”
মায়াকে জোর করে টেনে নিচে নামিয়ে একটা কালো কাঁচের গাড়িতে তুলে দেওয়া হলো। গাড়িটা ঝড়ের গতিতে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
এদিকে গাছের আড়ালে লুকিয়ে সবটা দেখছিল রিদয়ান। মায়াকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যেতে দেখে তার ভেতরের পশুটা যেন এক নিমেষে জেগে উঠল। কিন্তু সে জানে, এই মুহূর্তে খালি হাতে পুলিশের সাথে গোলমাল করতে গেলে মায়াকে চিরতরে হারাতে হবে।
রিদয়ান সোজা দৌড়ে নিজের মেস-এ গেল। সেখান থেকে তার জমানো কিছু টাকা, বাইকের চাবি আর ড্রয়ারে রাখা বাবার পুরোনো ছোট একটা চাকু পকেটে পুরে নিল। তার মাথায় এখন একটাই চিন্তা—ঢাকার জহুরুল ইসলাম সিটির সেই বাসাটা, যেখানে মায়াদের নিজস্ব ফ্ল্যাট আছে। মায়ার বাবা নিশ্চয়ই ওকে সেখানেই নিয়ে যাচ্ছেন।
রাত আড়াইটা। রাজপথ তখন প্রায় শুনশান। রিদয়ান তার বাইকের এক্সিলারেটর একদম শেষ সীমা পর্যন্ত চেপে ধরল। বাইকের গতি একশো ছাড়িয়ে গেল। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর রাতের আঁধার চিরে সে ছুটে চলল ঢাকার দিকে। তার চোখের সামনে কেবল ভেসে উঠছিল মায়ার উন্মুক্ত পিঠ, গলার নিচে তার কামড়ের দাগ আর রিদয়ানের কানে ফিসফিস করে বলা সেই কথাটা—“এমনভাবে তোর করে নে, যেন কাল সকালে কেউ আমায় আলাদা করতে না পারে।”
রিদয়ানের রক্তে তখন ফুটন্ত লাভার মতো আগুন জ্বলছে। সে জানে, এই লড়াইয়ে আর কোনো পেছনে ফেরার পথ নেই।
সকাল ছয়টায় রিদয়ান ঢাকায় পৌঁছাল। শরীর ধুলোবালি আর ক্লান্তিতে শেষ, কিন্তু চোখের দৃষ্টি চিতার মতো ধারালো। সে মায়াদের আফতাবনগরের ফ্ল্যাটের অদূরে বাইক থামিয়ে নজর রাখতে লাগল।
সকাল আটটার দিকে মায়াদের ফ্ল্যাটের গেটে কতগুলো দামি গাড়ি এসে থামল। জাবেদ সাহেব আর তাঁর ছেলে, বর সেজে আসা সেই নামজাদা ইঞ্জিনিয়ার গাড়ি থেকে নামল। দরজায় ফুলের তোড়া, ভেতরের পরিবেশ উৎসবমুখর।
রিদয়ান দেয়াল ঘেরা চত্বরের এক কোণ দিয়ে কৌশলে ভবনের ভেতরে ঢুকে পড়ল। সার্ভিস লিফট ব্যবহার করে সে সোজা ছয় তলায় উঠে গেল। মায়াদের ফ্ল্যাটের পেছনের কিচেনের দিকের বেলকনিটা খোলা ছিল। রিদয়ান বিড়ালের মতো চুপিসারে বেলকনি টপকে ভেতরে প্রবেশ করল।
বাড়ির ভেতরের ঘরে তখন সাজানো হচ্ছে মায়াকে।
মায়া একটা টকটকে লাল বেনারসি পরে বসে আছে খাটের ওপর। তার মুখে ভারী মেকআপ, কিন্তু চোখের নিচে কালি আর ঠোঁটে জমাট বাঁধা নীরবতা। ঘরে আর কেউ ছিল না, বিউটিশিয়ান কেবল বের হয়ে গেছে।
ঠিক তখনই পেছনের বাথরুমের দরজা খুলে বের হয়ে এল রিদয়ান।
মায়া চমকে উঠে দাঁড়াল। সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই ধুলোমাখা, রক্তচক্ষু মানুষটাকে। “রিদয়ান! তুই...”
রিদয়ান এক টানে মায়াকে জড়িয়ে ধরে তার দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দিল। মায়ার লাল বেনারসির ভারী আঁচল খসে পড়ল মেঝেই।
“বলেছিলাম না, তোকে অন্য কারো হতে দেব না?” রিদয়ানের কণ্ঠ গভীর ও হাঁপাচ্ছিল।
মায়ায় চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে রিদয়ানের মুখটা দুহাতে চেপে ধরে এক তীব্র উন্মাদের মতো তার ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে দিল। মেকআপ, দামি বেনারসি, আর বাইরের মানুষের শোরগোল—সবকিছু ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেল সেই এক চুম্বনে।
রিদয়ানের হাত চলে গেল মায়ার বেনারসির ব্লাউজের হুকের দিকে। এক ধাক্কায় ব্লাউজের ওপরের দুটো হুক খুলে গেল। রিদয়ান মায়ার উন্মুক্ত বুকের ওপর নিজের উত্তপ্ত ঠোঁট চেপে ধরল, এক চরম ক্ষুধার্ত ভালোবাসায় সে যেন মায়ায় শরীরে নিজের নাম লিখে দিচ্ছিল।
“আমায় নিয়ে চল, রিদয়ান...” মায়া সিঁটিয়ে উঠে ফিসফিস করে কেঁদে ফেলল, “এরা এখনই আমার আকদ করিয়ে দেবে। আমায় নিয়ে পালিয়ে যা!”
বাইরে থেকে তখন মায়ার মায়ের গলা পাওয়া গেল, “মায়া! কাজি সাহেব এসেছেন, তোকে নিচে নিয়ে যেতে হবে। রেডি হয়েছিস?”
দরজার হাতলটা বাইরে থেকে ঘুরে উঠল!
দরজার হাতলটা মোচড় খাওয়ার সাথে সাথে রিদয়ানের চোখের মণি তীব্র হিংস্রতায় ছোট হয়ে এল। এক মুহূর্তের বিলম্ব মানেই সব শেষ। সে মায়ার মুখটা দুহাতে চেপে ধরে তার চোখে চোখ রাখল।
"এক ফোঁটা ভয় পাবি না," রিদয়ানের ফিসফিসানি মায়ার কানে পৌঁছাতেই মায়া মাথা নাড়ল।
দরজাটা খোলার আগেই রিদয়ান মায়াকে এক টানে পেছনে সরিয়ে নিয়ে দরজার ঠিক আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল। পকেট থেকে বের করে নিল সেই ধারালো ছোট চাকুটা।
মায়ার মা ভেতরে ঢুকেই থমকে গেলেন। মায়ার বেনারসির হুক খোলা, চুল উস্কোখুস্কো, আর বুকের ওপর লালচে দাগ স্পষ্ট। "এ কী হাল করে রেখেছিস মায়া? কাজি সাহেব নিচে অপেক্ষা করছেন, জাবেদ সাহেবরা রাগ করছেন—"
কথা শেষ করার সুযোগ পেলেন না তিনি। রিদয়ান দরজার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে এক হাতে মায়ার মায়ের মুখ চেপে ধরল, আর অন্য হাতে চাকুটা তাঁর গলার একদম কাছে চেপে ধরল।
"একটা টু শব্দ করলে কিন্তু ভালো হবে না, খালাম্মা," রিদয়ানের চোখ দুটো তখন লাল রক্তের মতো জ্বলছিল।
মায়ার মা আতঙ্কে থরথর করে কাঁপতে লাগলেন। রিদয়ান তাঁকে কোনো আঘাত না করে খাটের পাশে থাকা একটা ওড়না দিয়ে তাঁর হাত-মুখ শক্ত করে বেঁধে বিছানার ওপর শুইয়ে দিল। তারপর মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল, "চল!"
মায়া আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। সে নিজের এলোমেলো বেনারসিটা কোনোমতে গুটিয়ে নিয়ে রিদয়ানের হাত শক্ত করে চেপে ধরল। দুজন চুপিচুপি করিডোর দিয়ে পেছনের এমার্জেন্সি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল।
কিন্তু ভাগ্য তাদের অত সহজে রেহাই দেওয়ার মেজাজে ছিল না। তিন তলার সিঁড়ির গোড়ায় পৌঁছাতেই সামনে এসে দাঁড়াল জাবেদ সাহেবের দুই বিশালদেহী সিকিউরিটি গার্ড। রিদয়ান আর মায়াকে একসাথে নামতে দেখে তারা সতর্ক হয়ে গেল।
"এই! মেয়েটাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস?" একজন গর্জে উঠে রিদয়ানের দিকে তেড়ে এল।
রিদয়ান মায়াকে নিজের পেছনে ঠেলে দিয়ে প্রথম গার্ডের পেটে সজোরে এক লাথি বসাল। গার্ডটা সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে নিচে পড়ে গেল। কিন্তু দ্বিতীয় গার্ডটা রিদয়ানের জামার কলার ধরে তাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল এবং সজোরে একটা ঘুষি মারল রিদয়ানের মুখে।
রিদয়ানের ঠোঁট ফেটে তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ল।
"রিদয়ান!" মায়া চিৎকার করে উঠল। সে আর সহ্য করতে পারল না। পাশে থাকা একটা পিতলের তোড়া তুলে নিয়ে মায়া সজোরে আঘাত করল গার্ডের মাথায়। লোকটা টাল সামলাতে না পেরে নিচে পড়ে গেল।
রিদয়ান আর মায়া এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। রক্তাক্ত ঠোঁট মুছে রিদয়ান মায়ার হাত ধরে এক টানে নিচে নেমে এল। ভবনের পেছনের গলি থেকে তারা সোজা বের হয়ে এসে পার্ক করে রাখা বাইকে গিয়ে উঠল।
বাইক যখন স্টার্ট নিল, তখন আফতাবনগরের প্রধান সড়কে হুলস্থুল পড়ে গেছে। মায়ার বাবা আর জাবেদ সাহেবের লোকজন গাড়ি নিয়ে তাদের পেছনে তাড়া করতে শুরু করেছে।
রিদয়ান ঢাকার জ্যাম আর সরু গলিগুলোকে কাজে লাগিয়ে বাইক ছোটাতে লাগল। পেছনে তিন-চারটে দামি গাড়ি তাদের পিছু নিয়েছে। সাইরেনের শব্দ, হর্ন আর চেঁচামেচিতে ঢাকার রাস্তা উত্তপ্ত হয়ে উঠল।
মায়া রিদয়ানের পেছনে বসে তার রক্তাক্ত ঠোঁটে নিজের এক হাত রাখল। "রিদয়ান, তোর রক্ত পড়ছে..."
"তোর বেনারসির চেয়ে এই রক্ত বেশি লাল নয়, মায়া," রিদয়ান বাইকের গতি বাড়িয়ে আয়নায় পেছনের গাড়িগুলোকে দেখে বলল। "আজ তোকে আমি এই শহরের সীমানা পার করে নিয়ে যাব। কেউ আটকাতে পারবে না।"
মায়া কোনো কথা বলল না। সে রিদয়ানের ভেজা, ঘেমে যাওয়া পিঠে নিজের বুক লেপ্টে দিয়ে তাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। মৃত্যুর ভয় তাদের মন থেকে উবে গিয়েছিল, রয়ে গিয়েছিল কেবল এক আদিম, অপ্রতিরোধ্য পাওয়ার তৃষ্ণা।
বাইকটি সোজা গিয়ে উঠল পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়েতে। ঢাকার কোলাহল পেছনে ফেলে ফাঁকা রাস্তার দিকে বাইক ছুটছিল তীরের মতো। কিন্তু পেছনের একটা কালো এসইউভি গাড়ি তাদের পিছু ছাড়েনি। গাড়িটি বাইকের একদম কাছাকাছি চলে এসে পাশ থেকে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করল।
রিদয়ান বাইকের নিয়ন্ত্রণ সামলাতে গিয়ে একপাশে কাত হয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে সামনের একটা লরির সাথে সংঘর্ষ এড়াতে রিদয়ান বাইকটাকে রাস্তার একপাশের মাটির ঢালে ছিটকে ফেলে দিল।
দুজনেই গড়িয়ে গিয়ে পড়ল ঝোপঝাড়ের ভেতর। বাইকটা চুরমার হয়ে গেল।
মায়ার বেনারসি জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে, কনুই ছড়ে রক্ত বের হচ্ছে। রিদয়ানের কপাল ফেটে রক্ত চোখ বেয়ে নিচে নামছিল। কিন্তু তারা থামল না। পেছনের গাড়ি থেকে লোকজন নেমে আসার আগেই রিদয়ান মায়াকে কোলে তুলে নিয়ে এক্সপ্রেসওয়ের পাশের গভীর জঙ্গল আর নিচু বিলের দিকে দৌড়াতে শুরু করল।
দুপুর গড়িয়ে তখন বিকেল নামছে। পূর্বাচলের শেষ মাথার এক নির্জন, ঘন কাশবন আর মেহগনি গাছের জঙ্গলে এসে তারা থামল। চারপাশে কেউ নেই, কেবল বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর দূরে বয়ে যাওয়া নদীর গর্জন।
রিদয়ান ধপ করে একটা গাছের গুঁড়িতে বসে পড়ল। তার শরীর থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সে হাঁপাচ্ছিল।
মায়া কেঁদে ফেলল। সে নিজের ছেঁড়া বেনারসির আঁচল থেকে খানিকটা কাপড় ছিঁড়ে রিদয়ানের কপালের রক্ত মুছে দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। "কেন এত করছিস আমার জন্য? কেন এত কষ্ট পাচ্ছিস?"
রিদয়ান মায়ার হাতটা চেপে ধরে নিজের বুকের ওপর রাখল। "তোর জন্য রক্ত দিতে পারি, মায়া... কিন্তু তোকে অন্য কারো বিছানায় দেখতে পারি না।"
মায়ার চোখের জল বাঁধ মানল না। এই রক্ত, এই ক্ষত, আর এই তীব্র উন্মাদ ভালোবাসা তাকে পুরোপুরি নিঃশেষ করে দিচ্ছিল। সে কোনো কথা না বলে রিদয়ানের রক্তাক্ত মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ল।
মায়ার নরম, ভেজা ঠোঁট নামল রিদয়ানের ফেটে যাওয়া ঠোঁটের ওপর। রক্তের নোনা স্বাদ আর মায়ার ঠোঁটের মিষ্টি সুবাস মিশে একাকার হয়ে গেল। রিদয়ান এক হাতে মায়ার ঘাড় চেপে ধরে সেই চুম্বনকে গভীর থেকে গভীরতর করে তুলল।
কাdirectory বনের নির্জনতায় দুটো রক্তাক্ত শরীর আবার একে অপরের সাথে লেপ্টে গেল। রিদয়ানের হাত মায়ার ছেঁড়া বেনারসি পার হয়ে তার উন্মুক্ত কোমরে গভীরে চেপে বসল। মায়াও নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে রিদয়ানকে আঁকড়ে ধরে তার বুকের ভেতর নিজেকে বিলীন করে দিতে চাইল।
"আজ রাতে আমরা কোথাও যাব না," মায়া রিদয়ানের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, তার শরীরটা রিদয়ানের উত্তাপে কাঁপছিল। "এই আকাশ আর এই মাটির সামনে তুই আমায় পুরোপুরি তোর বানিয়ে নে... যেন কাল সূর্য উঠলে ওরা শুধু আমার লাশ পায়, অন্য কারো মায়া নয়।"
রিদয়ান মায়ার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে ছিল আত্মসমর্পণের তীব্র আলো।
কাশবনের ওপর বিকেলের লালচে রোদ যখন নিভে আসছিল, তখন চারপাশের বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছিল এক ধরনের থমথমে নীরবতা। মেহগনি গাছের ছায়ায়, ঝরে পড়া পাতার বিছানায় রিদয়ান আর মায়া তখন একে অপরের বাহুডোরে আবদ্ধ।
মায়ার ছেঁড়া বেনারসির লাল আঁচলটা মাটিতে বিছানো। তার খালি ফর্সা পিঠে রিদয়ানের আঙুলের আঁচড় আর গলার কাছে তাজা ক্ষতের মতো ফুটে থাকা কামড়ের দাগগুলো যেন কোনো রাজকীয় অলংকার। রিদয়ানের শার্টটা সম্পূর্ণ খোলা, বুকের ওপর জমাট বাঁধা রক্ত আর মায়ার লাল লিপস্টিকের ছোপ একাকার হয়ে গেছে। রিদয়ানের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস মায়ার উদর আর বুকে আছড়ে পড়ছিল, আর মায়াও আবেশে চোখ বন্ধ করে রিদয়ানের চুলে আঙুল চালিয়ে তাকে আরও গভীরে টেনে নিচ্ছিল।
"রিদয়ান..." মায়ার গলা জড়িয়ে আসছিল এক গভীর কামনার আবেশে। "ওরা আমাদের খুঁজে পাবে না তো?"
রিদয়ান মায়ার গালে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল, তারপর ধীর গতিতে নেমে এল তার চিবুক পেরিয়ে গলার খাঁজে। "পাক না... আজ এই কাশবনে আমি তোকে এমনভাবে নিজের মধ্যে শুষে নেব, যেন মৃত্যুর পর আমাদের ছাইও আলাদা না করা যায়।"
মায়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিদয়ানকে নিজের দিকে আরও উঁচিয়ে তুলে ধরল। তাদের দুটো শরীর যখন চরম এক কামাসক্ত আবেশে মিশে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই কাশবনের নীরবতা চুরমার করে এক বিকট শব্দ ভেসে এল।
ডিয়াং!
কাছেই কোনো শুকনো ডাল ভাঙার শব্দ। তারপরই বেশ কিছু ভারী বুটের শব্দ আর মানুষের ফিসফিসানি।
"স্যার, এই দিকে বাইকের চাকার দাগ এসেছে! ঝোপের ভেতরে রক্তের ফোঁটাও আছে!" এক পুলিশ অফিসারের কর্কশ গলা কাশবনের বাতাস চিরে দিল।
মায়া এক মুহূর্তে সজাগ হয়ে উঠল। রিদয়ান মায়াকে নিজের বুকের নিচে চেপে ধরে এক হাত তার ঠোঁটের ওপর রাখল। রিদয়ানের চোখের মণি আঁধারে হিংস্র হয়ে উঠেছে। সে কান পেতে শোনার চেষ্টা করল শত্রুর অবস্থান।
মায়ার বাবার গলা শোনা গেল, "যেভাবেই হোক ওই বেকার ছেলেকে গুলিশ কর! আর মেয়েকে জ্যান্ত তুলে নিয়ে আয়! জাবেদ সাহেব পুলিশ কমিশনারকে ফোন করেছেন, কোনো দয়া দেখানোর দরকার নেই!"
রিদয়ান বুঝল, ওরা এখন পুরোপুরি ফাঁদে পড়েছে। কাশবনের চারপাশ পুলিশ আর মায়ার বাবার ভাড়াটে গুন্ডারা ঘিরে ফেলছে। অন্ধকার নেমে আসছে, কিন্তু সার্চলাইটের কড়া আলো কাশবনের ওপর দিয়ে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেছে।
রিদয়ান আস্তে করে মায়ার ওপর থেকে সরে এসে নিজের শার্টটা গায়ে চাপিয়ে নিল। মায়ার ছেঁড়া বেনারসিটা সাবধানে জড়িয়ে দিয়ে তার কপালে এক তীব্র স্পর্শ এঁকে দিল।
"মায়া, শোন," রিদয়ানের কণ্ঠ অদ্ভুত শান্ত, কিন্তু সেই শান্ততার পেছনে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ংকর ঝড়। "আমি ওদের অন্যদিকে নিয়ে যাচ্ছি। সার্চলাইটের আলো যখন ওই বাঁশের ঝাড়ের দিকে ঘুরবে, তুই সোজা পেছনের বিলের দিকে দৌড় দিবি। বিলে অনেক ডিঙি নৌকা বাঁধা থাকে। তুই সাতার কাটতে পারিস, একটা নৌকায় উঠে ওপারে চলে যাবি।"
"না!" মায়া রিদয়ানের হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরল, তার চোখ দিয়ে দরদর করে জল গড়িয়ে পড়ল। "আমি তোকে ছেড়ে কোথাও যাব না রিদয়ান! মারলে আমাদের একসাথেই মারবে!"
"বোকামি করিস না মায়া," রিদয়ান মায়ার ঠোঁটে নিজের এক আঙুল চেপে ধরল। "আমি বেঁচে থাকলে তোকে ঠিক খুঁজে বের করব। কিন্তু আজ যদি তুই ধরা পড়িস, ওরা তোকে জোর করে ওই শয়তানটার সাথে বিয়ে দিয়ে দেবে। তুই কি চাস আমি জীবন্ত মরে যাই?"
মায়া কেঁদে উঠে রিদয়ানের বুক আঁকড়ে ধরল। রিদয়ান মায়াকে শেষবারের মতো এক পরম আবেগে বুক চেপে ধরে তার ওড়না দিয়ে মায়ার হাতটা নিজের হাতের সাথে পেঁচিয়ে ধরল।
"এই স্পর্শটা মনে রাখবি," রিদয়ান ফিসফিস করে বলল, তার চোখের কোণে একফোঁটা জল কিন্তু মুখে এক হিংস্র হাসি। "এই শরীর শুধু তোর। আর তোর শরীর কেবলই আমার।"
রিদয়ান এক ঝটকায় বাঁধনটা খুলে ফেলল। তারপর পকেট থেকে সেই রক্তমাখা ধারালো চাকুটা বের করে অন্য হাতে একটা বড় পাথরের টুকরো তুলে নিল।
"তুই এখন দৌড় দিবি!" রিদয়ান আদেশসূচক গলায় বলল।
কথাটা শেষ করেই রিদয়ান কাশবনের উল্টো দিকে চিৎকার দিয়ে দৌড়াতে শুরু করল। "এই যে এখানে! তোদের বাপের ক্ষমতা থাকলে আয় ধরে দেখা!"
মুহূর্তের মধ্যে সব সার্চলাইটের আলো আর পুলিশের বুটের শব্দ রিদয়ানের পেছনে ধাওয়া করল।
"ওই তো ছোকরা! গুলি কর!" মায়ার বাবার হিংস্র গর্জন শোনা গেল।
ঠাস! ঠাস!
হাঁটু সমান উঁচু কাশবনের ভেতর গুলির শব্দ কেঁপে উঠল।
মায়া বুকের ভেতর জমে থাকা আর্তনাদ চেপে রেখে পেছনের বিলের দিকে দৌড়াতে লাগল। তার পা কেটে রক্ত ঝরছিল, শাড়ির আঁচল কাঁটাঝোপে আটকে ছিঁড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু সে থামল না। পে পেছনে ফিরে তাকাতেই তার হৃদয় হিম হয়ে গেল।
সার্চলাইটের প্রখর আলোয় মায়া দেখতে পেল—রিদয়ান দুজন পুলিশ সদস্যকে একাই বাঘের মতো আক্রমণ করেছে। তার এক হাতে চাকু, মুখে রক্ত। সে যেন এক জ্যান্ত শয়তান হয়ে উঠেছে। কিন্তু ঠিক তখনই একটা কালো এসইউভি গাড়ি থেকে মায়ার বাবা নেমে এলেন, আর তাঁর হাতের রিভলভারটা সোজা তাক করলেন রিদয়ানের বুকের দিকে।
ডিসুম!
এক রক্তহিম করা গুলির শব্দ কাশবনের রাতকে স্তব্ধ করে দিল।
মায়ায় পা আটকে গেল। সে পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখল, রিদয়ানের বিশাল শরীরটা হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে। তার সাদা শার্টের বুকের মাঝখানটা তাজা লাল রক্তে ভেসে যাচ্ছে।
"রিদয়ান—!" মায়ার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না, কেবল এক বুকফাটা নীরব হাহাকার বের হয়ে এল।
মায়ার বাবা রিদয়ানের ঢলে পড়া শরীরের কাছে গিয়ে বুট জুতো দিয়ে তার রক্তাক্ত বুকে লাথি মারলেন। "উচ্ছন্নে যাওয়া ছোটলোকের বাচ্চার এই পরিণতিই হওয়ার কথা ছিল।"
মায়া আর সইতে পারল না। তার চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এল। কিন্তু সে থামল না, রিদয়ানের শেষ আদেশ মনে করে সে বিলের পচা জলে ঝাঁপ দিল। বরফের মতো ঠাণ্ডা পানি তার শরীর ছুঁয়ে গেল, কিন্তু তার ভেতরের আগুনের তীব্রতায় সেই পানি যেন বাষ্প হয়ে যাচ্ছিল।
বিলের হিমশীতল পানি চিরে মায়া যখন নদীর ওপারে গিয়ে পৌঁছাল, তখন রাতের অন্ধকার শেষ হয়ে পূব আকাশে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। মায়ার সারা শরীর পলিমাটিতে মাখামাখি, ছিঁড়ে যাওয়া বেনারসির খণ্ডগুলো তার ভেজা শরীরে লেপ্টে আছে। গায়ের কনুই আর পায়ের পাতা কেটে রক্ত জমাট বেঁধে গেছে, কিন্তু তার চেতনার কোনো অংশেই এই শারীরিক যন্ত্রণার কোনো স্থান ছিল না। তার চোখের সামনে কেবল ভেসে উঠছিল রিদয়ানের বুকে গুলি লাগার পর মাটিতে লুটিয়ে পড়ার দৃশ্যটা।
মায়া ধুলোমাখা মাটিতে হাঁটু মুড়ে বসে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। সেই কান্নায় কোনো শব্দ ছিল না, ছিল এক বুকফাটা নীরব হাহাকার। কিন্তু হঠাৎই তার মনে ভেসে উঠল কাল রাতের কাশবনে রিদয়ানের শেষ ফিসফিসানি—“আমি বেঁচে থাকলে তোকে ঠিক খুঁজে বের করব... এই স্পর্শটা মনে রাখবি।”
মায়া হাত দিয়ে নিজের ঠোঁট আর গলার সেই লালচে দাগগুলো ছুঁল। না, রিদয়ান তাকে ছেড়ে যেতে পারে না। তাদের এই বাঁধন, এই শরীরের তীব্র উত্তাপ এত সহজে বাতাসে মিলিয়ে যেতে পারে না। মায়া গায়ের সমস্ত শক্তি এক করে উঠে দাঁড়াল।
দিন কেটে গেল। তিন দিন পর—ঢাকা শহরের উপকণ্ঠে এক গোপন ও পুরাতন জীর্ণ হাসপাতালের পেছনের অন্ধকারের ঘুপচি কামরা।
ঘরের ভেতর হালকা লাইটের হলুদ আলো জ্বলছে। স্যালাইনের বোতল থেকে ফোঁটা ফোঁটা ওষুধ প্লাস্টিকের নল বেয়ে ঢুকছে রক্তশূন্য একটা শরীরে। খাটের ওপর শুয়ে থাকা অবয়বটার বুকের বাঁ পাশে ব্যান্ডেজের ওপর এখনো রক্তের তাজা ছাপ। মনিটরের বিটগুলো অনবরত কিন্তু ধীরগতিতে বেজে চলেছে।
হঠাৎ দরজার পুরোনো কবাটটা শব্দ করে খুলল। ভেতরে ঢুকলো একটা ছায়ামূর্তি। পরনে কালো চাদর, মুখটা পুরোপুরি ঢাকা।
ছায়ামূর্তিটি ধীর পায়ে বিছানার কাছে এসে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে চাদরটা সরাতেই উন্মোচিত হলো মায়ার করুণ, শুকিয়ে যাওয়া মুখ। সে গত তিন দিন ধরে না খেয়ে, শহরের নানা প্রান্তে ঘুরে অবশেষে রিদয়ানের খোঁজ পেয়েছে।
মায়ার বাবা আর জাবেদ সাহেবের লোক ভেবেছিল পুলিশ দিয়ে গুলি চালিয়ে রিদয়ানকে মেরে কাশবনেই পুঁতে ফেলেছে। কিন্তু রিদয়ানের বন্ধুরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গভীর রাতে কাশবনের বিল থেকে রক্তাক্ত, আধমরা রিদয়ানকে তুলে এনে এই গোপন হাসপাতালে ভর্তি করে। গুলিটা রিদয়ানের হূদপিণ্ডের মাত্র কয়েক ইঞ্চি পাশ কাটিয়ে গেছে।
মায়া রিদয়ানের ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া গালে নিজের কাঁপা কাঁপা হাতটা রাখল। তার হাতের ছোঁয়া পেতেই খাটের ওপর শুয়ে থাকা রিদয়ানের চোখের পাতা দুটো কাঁপতে লাগল। মনিটরের হৃদস্পন্দনের গতি আচমকা বেড়ে গেল।
রিদয়ান ধীরে ধীরে চোখ খুলল। রক্তশূন্য, লালচে চোখে সে মায়াকে দেখতে পেল। তার শুকিয়ে যাওয়া ফেটে যাওয়া ঠোঁটে ফুটে উঠল এক মৃদু, জয়ী হাসি।
"বলেছিলাম না..." রিদয়ানের গলা দিয়ে একদম ক্ষীণ, ভাঙা আওয়াজ বের হলো, "তোকে আমি... হারিয়ে যেতে দেব না..."
মায়া আর ধরে রাখতে পারল না নিজেকে। সে রিদয়ানের ব্যান্ডেজ করা বুকের ওপর আলতো করে নিজের মাথাটা রাখল। তার চোখের গরম জল রিদয়ানের ব্যান্ডেজের ওপর গিয়ে পড়ল।
"তুই পাগল... একটা আস্ত পাগল তুই রিদয়ান..." মায়া অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে ফিসফিস করে বলল।
রিদয়ান নিজের ডান হাতটা তুলে মায়ার পিঠের ওপর রাখল। বহু দিন পর, বহু ঝড় পার করে এই ছোঁয়া আবার তাদের ব্যাকুল করে তুলল। রিদয়ান মায়াকে টেনে নিজের মুখের একদম কাছে নিয়ে এল। রিদয়ানের ভেজা নিঃশ্বাস মায়ার ঠোঁটে লাগতেই মায়ার শরীর আবার শিউরে উঠল।
রিদয়ান দুর্বল হাতে মায়ার ঘাড়ে হাত রেখে তাকে নিজের দিকে নামিয়ে আনল। দুজনের ফেটে যাওয়া, শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট আবার এক হয়ে গেল। কোনো তাড়া ছিল না সেই চুম্বনে, ছিল এক আজন্ম তৃষ্ণা মেটানোর প্রগাঢ় শান্তি। রক্ত, যন্ত্রণা, মৃত্যু—সব কিছু অতিক্রম করে তাদের দুটো ঠোঁটের উগ্র মিলনে ঘরের ভেতরের বাতাস যেন আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠল।
মায়া আলতো করে রিদয়ানের ওপর উঠে এল, অত্যন্ত সাবধানে যেন রিদয়ানের বুকের জখমে কোনো চাপ না লাগে। সে রিদয়ানের গলার কছে নিজের মুখটা ডুবিয়ে দিল। রিদয়ানের হাত মায়ার উন্মুক্ত কোমর পেঁচিয়ে ধরল, সেই চেনা, ভালোবাসার শক্ত বাঁধনে।
"তোর বাবা ভেবেছিল আমাকে মেরে শেষ করে দেবে," রিদয়ান মায়ার কানের লতিতে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল, "কিন্তু সে জানে না, তোর ভেতরের এই আগুন আমাকে হাজার বার মরার পর আবার বাঁচিয়ে তুলবে।"
"আমরা কোথায় যাব রিদয়ান?" মায়া রিদয়ানের বুকের ওপর নিজের মুখ ঘষে বলল। "ওরা তো আমাদের সারা দেশ জুড়ে খুঁজছে।"
"সীমানা পার হব," রিদয়ানের চোখ দুটো অন্ধকারে জিতের নেশায় জ্বলজ্বল করে উঠল। "এমন এক জায়গায় যাব যেখানে কোনো বাবা, কোনো সমাজ, কোনো জাতের বাঁধন আমাদের ছোঁবে না। সেখানে শুধুই তুই থাকবি, আর আমি থাকব।"
পরদিন শেষ রাতে, ভোরের আলো ফোটার আগেই, একটা পুরানো ট্রাকে চেপে রিদয়ান আর মায়া টেকনাফের সীমানার উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
ট্রাকের পেছনের ত্রিপল দিয়ে ঢাকা অন্ধকার ঘরে রিদয়ান শুয়ে ছিল, আর তার বুকের ওপর মাথা রেখে মায়া শুয়েছিল নিশ্চিন্তে। রিদয়ানের এক হাত মায়ার খোলা চুল আর পিঠে গভীর ভালোবাসায় ঘুরে বাড়াচ্ছিল।
বাইরে তখন ভোরের নতুন আলো ফুটছে। রক্তক্ষয়ী সেই রাত, বন্দুকের গুলি আর তাড়া করে ফেরা ভয়ের দিনগুলো সব পেছনে পড়ে রইল। মায়া রিদয়ানের বুকে নিজের ভেজা ঠোঁটের একটা পরম রোমাঞ্চকর স্পর্শ দিয়ে চোখ বন্ধ করল।
আজ তারা মুক্ত। সমাজের সমস্ত বাধা, হিংস্রতা আর রক্তক্ষরণকে জয় করে তারা আজ এক হয়ে গেছে। এ এমন এক ভালোবাসা, যাকে হত্যা করার মতো কোনো গুলি বা কোনো ক্ষমতা এই পৃথিবীতে তৈরি হয়নি।
....