জেদের শেষে আত্মসমর্পণ

বর্ষার বিকেলটা আজ একটু বেশিই মেঘলা। ধানমন্ডি লেকের পাড়ে কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল শাওন। হালকা বৃষ্টির ছাঁটে তার নেভি ব্লু শার্টের হাতার একাংশ ভিজে উঠেছে। হাতঘড়িতে ঠিক বিকেল সাভে চারটা। নাবিলার আসার কথা ছিল চারটায়। সবসময়ই ও এই এক কাজ করে—দেরি করে এসে একটা চ চড়াও ভাব নিয়ে দাঁড়াবে। শাওনের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। ছোটবেলা থেকেই এই মেয়েটাকে ও চেনে, আর চেনা মানেই হলো একধরনের হার-জিতের লড়াই।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

স্কুলের ক্লাসে ফার্স্ট বয় আর ফার্স্ট গালর্সের লড়াই থেকে শুরু করে কলেজের ডিবেটিং ক্লাবের ফাইনাল পর্যন্ত—শাওন আর নাবিলা ছিল যেন দুটো সমান্তরাল রেললাইন, যারা পাশাপাশি চলে কিন্তু কখনো মিলেমিশে এক হতে পারে না। নাবিলা যেমন একবুলুদে জেদী, শাওনও তেমনই একগুঁয়ে। আজ দীর্ঘ দুই বছর পর আবার দেখা হচ্ছে। দুজনেই এখন করপোরেট জগতে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ছেলেমানুষি প্রতিযোগিতাটা কি সত্যিই শেষ হয়েছে?

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

"কী গো, খুব বেশি অপেক্ষা করিয়ে ফেললাম?"

 

পেছন থেকে পরিচিত সুতীক্ষ্ণ কিন্তু মধুর কণ্ঠস্বরটা ভেসে আসতেই শাওন ঘুরে দাঁড়াল। নাবিলা দাঁড়িয়ে আছে। পরনে গাঢ় বেগুনি রঙের একটি সাধারণ সুতির সালোয়ার-কামিজ, কপালে ছোট একটা কালো টিপ, আর চুলগুলো হালকা ভিজে কাঁধে ছড়িয়ে আছে। বৃষ্টির ফোঁটা ওর গালে এসে জমেছে, যা লেকের পাশের সোডিয়াম আলোর ম্লান আলোয় হিরের টুকরোর মতো চমকাচ্ছে। শাওন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। নাবিলা আগের চেয়ে অনেক বদলে গেছে, বা হয়তো শাওনই তাকে নতুন করে দেখছে।

 

"সময়মতো আসার অভ্যাসটা অন্তত এই দুই বছরে শিখতে পারতে, নাবিলা," শাওন নিজের কণ্ঠস্বরে কৃত্রিম গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তুলে বলল।

 

নাবিলা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। সেই পরিচিত দাম্ভিক হাসি। "যে জেতে, তাকে একটু অপেক্ষা করাতে হয় শাওন। এটা বিজয়ী পক্ষের অধিকার।"

 

"বিজয়ী? লাস্ট বার্ষিক সাধারণ সভায় আমাদের প্রজেক্টটা যে সেরা হয়েছিল, সেটা বোধহয় ভুলে গেছ?" শাওন এক পা এগিয়ে এলো।

 

"ওটা স্রেফ ভাগ্যের জোরে হয়েছিল। আজ এই কফি শপে ডিলটা কে আগে ক্র্যাক করে, সেটাই দেখার বিষয়," নাবিলাও শাওনের চোখের দিকে তাকিয়ে এক পা এগিয়ে এল।

 

ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো মুহূর্তের মধ্যে। লেকের পাড়ের বাঁধানো বেঞ্চগুলোর সব মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য দৌড়াতে লাগল। কিন্তু শাওন আর নাবিলা সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। মেঘের গর্জন আর বৃষ্টির শব্দে চারিদিক মুখরিত। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে নাবিলা দ্রুত লেকের পাড়ের ছোট্ট একটা শেডের নিচে গিয়ে দাঁড়াল। শেডটা এতটাই ছোট যে দুজন মানুষের একসাথে দাঁড়ানো কঠিন। শাওন বাধ্য হয়ে নাবিলার একেবারে কাছে এসে দাঁড়াল।

 

বাতাসে ভিজে ওঠা কাঠগোলাপের সুবাস আর নাবিলার গায়ের এক অদ্ভুত মাদকতাময় গন্ধ শাওনের নিঃশ্বাসে মিশে গেল। শেডের ছোট পরিসরে নাবিলার উষ্ণ শরীর শাওনের একেবারে ঘেঁষে রয়েছে। বৃষ্টির ঠান্ডা বাতাসেও নাবিলাকে ছুঁয়ে থাকা এই সামান্য দূরত্বটুকু শাওনের বুকের ভেতর এক অজানা উত্তাপ ছড়িয়ে দিল।

 

"তুমি কি এখনো অতটাই অহংকারী আছো, শাওন?" নাবিলার গলার আওয়াজটা হুট করেই নরম হয়ে এলো। ও শাওনের চোখের দিকে তাকাল। বৃষ্টিতে ভিজে নাবিলার চোখের পাতাগুলো ভারী হয়ে এসেছে। ঠোঁট দুটো সামান্য কাঁপছে ঠান্ডায়, নাকি অন্য কোনো তীব্র অনুভূতির টানে?

 

শাওন নাবিলার চোখের স্থির দৃষ্টি দেখে নিজের ভেতরের সব আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছিল। এতদিন ধরে ও যাকে শুধুই এক প্রতিপক্ষ মনে করত, এই মূহূর্তে সেই প্রতিপক্ষ এক তীব্র আকর্ষণে রূপ নিয়েছে। শাওন একধাপ আরো এগিয়ে এলো, তাদের বুকের মধ্যকার সামান্য দূরত্বটুকুও মিলিয়ে গেল।

 

"আমি অহংকারী, নাকি তুমি আমাকে বোঝো না?" শাওনের নিচু, গভীর স্বর নাবিলার কানের কাছে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করল।

 

শাওনের নিঃশ্বাসের গরম বাতাস নাবিলার ঘাড়ে এসে লাগতেই নাবিলা চোখ বুজে ফেলল। তার হৃদস্পন্দন ত্বরান্বিত হচ্ছে। ছোটবেলা থেকে শাওনের সাথে ঝগড়া করেছে, একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করেছে, কিন্তু কখনো এত কাছে আসেনি। শাওনের শক্ত হাতটা নাবিলার ভেজা কোমরের ওপর আলতো করে চেপে বসল। সেই স্পর্শে নাবিলা শিউরে উঠল। শরীরের ভেতরে এক অভূতপূর্ব শিহরণ ভেসে গেল ওর।

 

"শাওন... এটা..." নাবিলার কণ্ঠস্বর আটকে গেল। সে প্রতিবাদ করতে চাইল, কিন্তু শাওনের ডান হাতের আঙুলগুলো যখন ওর ভিজে যাওয়া চুল সরিয়ে ঘাড়ে স্পর্শ করল, নাবিলার সমস্ত জেদ এক মুহূর্তে ধূলিসাৎ হয়ে গেল।

 

"বলো নাবিলা, আজও কি তুমি আমাকে হারাবে? নাকি আজ হেরে যেতে ইচ্ছে করছে?" শাওনের কণ্ঠস্বরে একধরনের গভীর, তীব্র মাদকতা।

 

শাওনের চোখ নামল নাবিলার ভেজা লাল ঠোঁট দুটোর ওপর। বৃষ্টির ফোটা গড়িয়ে পড়ছে ওর চিবুক বেয়ে। শাওন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ঝুঁকে এসে নাবিলাকে নিজের বাহুবন্ধনে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। শাওনের ভিজে যাওয়া শক্ত বুক আর উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শ নাবিলাকে এক অচেনা জগতে নিয়ে গেল। নাবিলার হাত দুটো স্বতঃস্ফূর্তভাবে আঁকড়ে ধরল শাওনের পিঠের শার্ট। বর্ষার মূষলধারে বৃষ্টির শব্দের মাঝে দুটো ক্ষুব্ধ, প্রতিযোগিতামূলক মন হঠাৎ করেই এক গভীর, তীব্র আবেগের উত্তাপে বিলীন হতে শুরু করল।

 

শেডের নিচে দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ আর বৃষ্টির পতনের শব্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। নাবিলা বুঝতে পারছিল, শাওনের প্রতিটি স্পর্শের পেছনের আকুলতা আর এতদিনের গোপন ক্ষোভ যেন এক প্রবল কামনায় রূপ নিচ্ছে। শাওন ওর ঠোঁট দুটোকে নিজের ভালোবাসায় আর অধিকারে ভরিয়ে দিচ্ছিল, যেন এতদিন ধরে জমিয়ে রাখা সব প্রতিযোগিতার শেষ পরিণতি এটাই।

 

বেশ কিছুক্ষণ পর, যখন শাওন আস্তে করে সরে এলো, নাবিলার চোখে তখন আর কোনো অহংকার ছিল না। ছিল এক অজানা লজ্জা আর উন্মাদনা। ও হাঁপাচ্ছিল, বুকের ভেতরটা যেন তোলপাড় হচ্ছে।

 

"এটা কি শুধুই খেলায় জেতার আরেকটা চাল ছিল, শাওন?" নাবিলা চোখ তুলে শাওনের দিকে তাকাল, ওর গলার স্বর কাঁপা কাঁপা।

 

শাওন নাবিলার ভিজে যাওয়া গাল দুটো দুই হাতে ধরে মৃদু হেসে বলল, "এই খেলায় আমরা দুজনেই হেরে গেছি, নাবিলা। অথবা হয়তো... দুজনেই জিতে গেলাম।"

 

বৃষ্টির দাপট তখনও কমেনি। কিন্তু ঢাকা শহরের সেই ছোট্ট শেডের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন মানুষ বুঝে গেছে—যে যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল বহু বছর আগে, তা আজ রূপ নিয়েছে এক অদম্য, গভীর ভালোবাসায়।

 

ঝুম বৃষ্টির পর ঢাকার রাস্তাঘাট তখন থমথমে। ফুটপাতে জমে থাকা জলে সোডিয়াম আলোর হলুদ প্রতিফলন এক অদ্ভুত বিষণ্ণ অথচ ছায়াঘেরা পরিবেশ তৈরি করেছে। লেকের পাড়ের সেই শেড থেকে বেরিয়ে দুজন যখন গাড়িতে গিয়ে বসল, তখনো দুজনের কেউই কোনো কথা বলতে পারছিল না।

 

গাড়ির এসি চালানো, অথচ ভেতরের তাপমাত্রা যেন অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ। ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা শাওন স্টিয়ারিং হুইলে হাত রেখে একদৃষ্টে সামনের কাচের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার হাত দুটো মৃদু কাঁপছে। পাশে বসে থাকা নাবিলা জানালার কাচে মাথা হেলিয়ে বাইরের ভেজা শহর দেখছিল। কিন্তু ওর সমস্ত নজর ছিল শাওনের দিকে।

 

"কফি খাবে?" শাওন নীরবতা ভেঙে প্রথম কথা বলল। গলার স্বরটা এখনও গভীর ও কিছুটা ভারী।

 

নাবিলা শাওনের দিকে ঘুরল। ওর ভিজে যাওয়া পোশাক এখনও শরীরে লেপ্টে আছে, চুল থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি গড়িয়ে পড়ছে ওর উন্মুক্ত কাঁধে। "না। আমাকে ঘরে পৌঁছে দাও।"

 

"ঘরে?" শাওন এক পলকের জন্য নাবিলার দিকে তাকাল। নাবিলার চোখের ভাষায় এমন কিছু ছিল, যা কোনো সাধারণ প্রত্যাখানের বার্তা বহন করছিল না। বরং সেখানে ছিল এক তীব্র আহ্বান, যা দুই বছর ধরে জমে থাকা নীরবতার উত্তর খুঁজছিল।

 

শাওন গাড়ি স্টার্ট দিল, কিন্তু পথটা নাবিলার বাসার দিকে গেল না। গাড়ি গিয়ে থামল ধানমন্ডির এক শান্ত গলির মুখে, শাওনের নিজস্ব ফ্ল্যাটের নিচে। ব্যাচেলর হিসেবে এই ফ্ল্যাটেই ও একা থাকে।

 

নাবিলা বুঝতে পারল এটা কোথায়, কিন্তু ও কোনো বাধা দিল না। কোনো প্রশ্নও করল না। ছোটবেলা থেকে শাওনের সাথে ও অনেক লড়াই করেছে, কিন্তু আজ রাতে ও নিজের মনের সাথেই হেরে যেতে চাচ্ছে।

 

লিফটে ওঠার সময় দুজন দুজনের একদম কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিল। লিফটের ছোট বদ্ধ জায়গায় নাবিলার ভিজে যাওয়া শরীরের উষ্ণতা আর সুবাস শাওনের স্নায়ুগুলোকে আবার উত্তেজিত করে তুলছিল। লিফট চারতলায় গিয়ে থামতেই শাওন চাবি দিয়ে দরজা খুলল। অন্ধকার ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই শাওন ভেতর থেকে লক করে দিল।

 

ঘরের ভেতর হালকা মৃদু আলো ছড়িয়ে পড়ল, যখন শাওন এক কোণে থাকা টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে দিল।

 

"তোমার জামাকাপড় ভিজে গেছে, নাবিলা," শাওন নাবিলার একেবারে সামনে এসে দাঁড়াল।

 

"তোমারও," নাবিলা শাওনের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে উত্তর দিল। ওর কণ্ঠস্বরে এবার আর কোনো লজ্জা বা দ্বিধা ছিল না, ছিল এক অজানা তীব্রতা।

 

শাওন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। এক হেঁচকায় নাবিলাকে নিজের দিকে টেনে আনল। নাবিলা এসে আছড়ে পড়ল শাওনের চওড়া বুকে। শাওনের দুহাত নাবিলার পিঠ বেয়ে নিচে নেমে এলো, কোমর আঁকড়ে ধরে ও নাবিলাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল।

 

নাবিলার নিঃশ্বাস দ্রুত হতে শুরু করল। শাওনের উত্তপ্ত ঠোঁট এবার নেমে এলো নাবিলার থুতনি হয়ে গাঢ় ঘাড়ে। প্রতিটি কামড় আর চুমুতে শাওন যেন এতদিন দূরে থাকার সব রাগ আর ব্যাকুলতা সুদে-আসলে উসুল করে নিচ্ছিল। নাবিলা চোখ বুজে শাওনের চুলে আঙুল চালিয়ে দিল, ওকে আরও কাছে টেনে নিল।

 

"তুমি আমাকে পাগল করে দিচ্ছ, নাবিলা," শাওন ভেজা গলায় ফিসফিস করে বলল। ওর হাত চলে গেল নাবিলার কামিজের পেছনের ফিতার দিকে।

 

"তুমিই তো আমাকে এই পথে টেনে আনলে, শাওন," নাবিলা শাওনের কানের লতিতে আলতো কামড় দিয়ে বলল।

 

ঘরের নীরবতায় তখন শুধু তাদের দ্রুত নিঃশ্বাসের শব্দ আর জামাকাপড় খুলে পড়ার খসখস আওয়াজ। শাওনের উন্মুক্ত শক্ত বুকের সাথে নাবিলার কোমল, উত্তপ্ত শরীরের মিলন ঘটতেই ঘরের আবহাওয়া যেন আগুনে রূপ নিল। শাওন নাবিলাকে কোলে তুলে নিয়ে সোজা বেডরুমের দিকে হেঁটে গেল।

 

নাবিলাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে শাওন ওর ওপর ভর দিল। ঘরের আধো-আলো ছায়ায় নাবিলার তন্বী শরীরটা যেন এক অপূর্ব শিল্পকর্মের মতো দেখাচ্ছিল। শাওনের হাতের স্পর্শ যেখানেই লাগছিল, সেখানেই নাবিলার শরীরে এক তীব্র শিহরণ জেগে উঠছিল। শাওনের শক্ত আঙুলগুলো নাবিলার উরু বেয়ে ওপরে উঠতেই নাবিলা এক অদ্ভুত সুখে চোখ বন্ধ করে শাওনের নাম ধরে ডেকে উঠল।

 

"আজকে কে জিতবে, নাবিলা? তুমি, নাকি আমি?" শাওন নাবিলার বুকের ওপর নিজের মুখ গুঁজে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।

 

নাবিলা দুহাতে শাওনের মুখটা ওপরে তুলে আনল। শাওনের ঠোঁটে তীব্র ভালোবাসা দিয়ে নিজের ঠোঁট মিলিয়ে দিয়ে বলল, "আজ আমাদের দুজনেরই হারার রাত, শাওন... আজ আমায় সম্পূর্ণ করে নাও।"

 

শাওন আর কোনো কথা বলল না। ভালোবাসার তীব্র প্রভাবে দুজনের শরীর এক হয়ে গেল। শাওনের প্রতিটি গভীর আঘাতেই নাবিলা নতুন করে নিজেকে খুঁজে পাচ্ছিল, আর নাবিলাকে আকড়ে ধরে শাওন নিজের অস্তিত্বকে সঁপে দিচ্ছিল। কাম আর ভালোবাসার এক অপূর্ব মিশেলে তারা মেতে উঠল রাতের সেই উদ্দাম খেলায়। ক্লাসরুমের সেই ফার্স্ট বয় আর ফার্স্ট গা

র্ল আজ রাতের অন্ধকারে সব প্রতিযোগিতার সীমানা ছাড়িয়ে এক পরম তৃপ্তির সাগরে ডুবে গেল।

ভোরের দিকে যখন বৃষ্টির দাপট কমে এসেছে, তখন শাওনের বুকের ওপর মাথা রেখে শুয়ে ছিল নাবিলা। শাওনের একটা হাত নাবিলার উন্মুক্ত পিঠে আলতো করে ঘুরছিল।

 

"এখন থেকে আমরা কী, শাওন?" নাবিলা মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করল।

 

শাওন নাবিলার কপালে আলতো চুমু খেয়ে বলল, "আমরা এখন আর প্রতিপক্ষ নই, নাবিলা। আমরা এখন একজন অন্যজনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।"

 

ভোরের নরম আলো শাওনের শোবার ঘরের পর্দা টপকে বিছানায় এসে পড়েছে। ঘরের আবহাওয়ায় এখনও জমে আছে রাতের সেই উত্তপ্ত, গভীর মুহূর্তগুলোর আমেজ। শাওনের বুকের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে ছিল নাবিলা। শাওনের একটা হাত নাবিলার উন্মুক্ত কোমরে জড়ানো, অন্য হাত দিয়ে ও নাবিলার এলোমেলো চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিচ্ছিল।

 

নাবিলা আস্তে আস্তে চোখ খুলল। শাওনের চোখের দিকে তাকাতেই রাতের সব উদ্দাম স্মৃতির কথা মনে পড়ে ওর গালে মৃদু লাজুক লালিমায় ছেয়ে গেল। ও শাওনের বুকে নিজের মুখটা আরও একটু লুকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?"

 

"তোমাকে দেখছি," শাওন নাবিলার থুতনিটা ধরে মুখটা ওপরে তুলে আনল। "যে মেয়েটা কাল বিকেল পর্যন্ত আমার সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল, সে এখন আমার বুকের ভেতর শুয়ে আছে... ভাবলেই অদ্ভুত লাগে।"

 

নাবিলা মৃদু হেসে শাওনের বুকে এক ছোট কামড় বসিয়ে দিল। "শত্রু এখনও আছি শাওন! বিজনেসের টেবিলে আমি তোমাকে এক ইঞ্চি ছাড় দেব না।"

 

"তাই নাকি?" শাওন এক ঝটকায় নাবিলাকে নিজের নিচে নিয়ে এলো। নাবিলার ওপর ভর দিয়ে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "বোর্ডের টেবিলে কী করবে জানি না, কিন্তু এই বিছানায় তোমাকে কীভাবে কাবু করতে হয়, তা আমার জানা হয়ে গেছে।"

 

শাওনের হাতের উষ্ণ স্পর্শ আবার নাবিলার উরু বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল। নাবিলা এক তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে শাওনের গলায় হাত জড়িয়ে ধরল। সকালের আলোয় আবার দুটো শরীর মেতে উঠল এক গভীর, অনুরাগী মিলনে। রাতের কামনার পর সকালের এই আদর যেন ছিল আরও বেশি মিষ্টি, আরও বেশি গভীর।

 

তবে মিষ্টি এই মুহূর্তগুলো বেশি সময় স্থায়ী হলো না। দুপুর গড়াতেই নাবিলার ফোনে একটার পর একটা কল আসতে শুরু করল। কলটা ছিল নাবিলার অফিসের ম্যানেজিং ডিরেক্টরের।

 

ফোনটা রিসিভ করে নাবিলার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। শাওন বিছানায় বসে শার্টের বোতাম লাগাচ্ছিল, নাবিলার মুখের পরিবর্তন দেখে ও কাছে এগিয়ে এলো।

 

"কী হয়েছে, নাবিলা?"

 

নাবিলা ফোনটা রেখে শাওনের দিকে তাকাল। ওর চোখে পুরোনো সেই প্রতিযোগিতার আগুন আর সংশয়ের ছায়া। "আমাদের নতুন প্রজেক্টের সিক্রেট ফাইলটা লিক হয়ে গেছে। আর মজার বিষয় হলো, ইনফরমেশনটা নাকি তোমাদের কোম্পানি পেয়েছে।"

 

শাওন থমকে গেল। "মানে? তুমি কি বলতে চাইছ আমি..."

 

"আমি কিছু বলছি না, শাওন," নাবিলা বিছানা থেকে উঠে নিজের পোশাক ঠিক করতে করতে বলল। ওর গলার স্বর হুট করেই ঠান্ডা হয়ে এলো। "কিন্তু কাল রাতে আমি তোমার ফ্ল্যাটে ছিলাম, আর আজ সকালেই আমাদের প্রজেক্টের সব ডেটা ফাঁস হয়ে গেল? এটা কি শুধুই কাকতালীয়?"

 

শাওনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। ও নাবিলার কাছে গিয়ে ওর বাহু দুটো শক্ত করে চেপে ধরল। "নাবিলা! তুমি সত্যিই ভাবছ আমি তোমার সাথে শোয়ার ছলে তোমার কোম্পানির ইনফরমেশন চুরি করব? তুমি আমাকে এতটা নীচ মনে করো?"

 

নাবিলা শাওনের চোখের দিকে তাকাল। ওর ভেতরে ভালোবাসার অনুভূতির পাশাপাশি পুরোনো জেদ আর সন্দেহ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল। করপোরেট ওয়ার্ল্ডে বেঁচে থাকতে হলে কাউকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করা যায় না—এই শিক্ষা ও ছোটবেলা থেকেই পেয়ে এসেছে।

 

"আমি জানি না শাওন... আমি সত্যিই কিছু বুঝতে পারছি না," নাবিলা নিজেকে শাওনের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিল। "কাল রাতে যা হয়েছে, সেটা হয়তো আমাদের এক মুহূর্তের আবেগ ছিল। কিন্তু ব্যবসা আর পেশাদারিত্বের জায়গায় কোনো আপস হবে না।"

 

"এক মুহূর্তের আবেগ?" শাওনের গলার স্বর কেঁপে উঠল এক অজানা ক্ষোভে। "কাল রাতে যা হলো, সেটা তোমার কাছে স্রেফ এক মুহূর্তের আবেগ ছিল?"

 

নাবিলা জবাব দিল না। ও দ্রুত নিজের ব্যাগটা গুছিয়ে দরজার দিকে হেঁটে গেল। দরজার হাতলে হাত রেখে পেছন ফিরে শাওনের দিকে তাকাল। "যদি প্রমাণ হয় এই ডেটা লিকের পেছনে তোমার বা তোমার কোম্পানির হাত আছে, তবে মনে রেখো শাওন... আমি তোমাকে ধ্বংস করে দেব।"

 

নাবিলা ঘর থেকে বেরিয়ে দরজাটা সজোরে বন্ধ করে দিয়ে চলে গেল।

 

অন্ধকার ঘরে একাকী দাঁড়িয়ে রইল শাওন। ওর বুকের ভেতরটা রাগে আর অপমানে জ্বলছিল। যে মেয়েটিকে ও মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও নিজের সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছিল, সে এক নিমেষে সবকিছুকে ব্যবসায়িক চাল বানিয়ে দিল?

 

শাওন নিজের ফোনটা তুলে নিয়ে ওর পিএ-কে কল দিল। "হ্যালো, এখনই অফিসে আমাদের সব ডেটা লগ চেক করো! কেউ যদি নাবিলাদের প্রজেক্ট ফাইল আমাদের সার্ভারে আপলোড করে থাকে, তাকে খুঁজে বের করো।"

 

শাওনের চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছিল। ও মনে মনে শপথ নিল, এই চক্রান্তের পেছনে যে-ই থাকুক না কেন, তাকে ও ছাড়বে না। আর নাবিলা? নাবিলা যদি এই খেলাটাই খেলতে চায়, তবে শাওনও এবার তাকে বুঝিয়ে দেবে—জেদের খেলায় শাওন কখনো হারতে শেখেনি।

 

অফিসের বিশাল কাচের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল শাওন। গুলশানের জাঁকজমকপূর্ণ করপোরেট টাওয়ারের ১৬ তলা থেকে পুরো ঢাকা শহরটাকে একটা বিষাদময় ক্যানভাস বলে মনে হচ্ছে। শাওনের হাতের ল্যাপটপে তখন তদন্ত কমিটির রিপোর্ট খোলা।

 

রিপোর্টে পরিষ্কার লেখা—নাবিলাদের প্রজেক্ট ফাইল চুরির পেছনে শাওন বা তার কোম্পানির কোনো হাত নেই। বরং নাবিলারই এক বিশ্বস্ত সহকর্মী, যে শাওনদের কোম্পানির আইটি হেডকে ফাঁসানোর জন্য এই ভুয়া আইপি ট্রেস তৈরি করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—শাওন আর নাবিলার যৌথ উদ্যোগকে ধ্বংস করা এবং দুজনকে মুখোমুখি দাঁড় করানো।

 

নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার স্বস্তি শাওনের মনে শান্তি আনতে পারল না। কারণ নাবিলার সেই বিকেলের কথাগুলো, তার অনাস্থা আর তড়িঘড়ি করে শাওনের চরিত্রকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোটা শাওনের পুরুষত্ব আর ভালোবাসায় গভীর এক আঘাত হেনেছিল।

 

"তুমি আমার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারোনি, নাবিলা," শাওন নিজের মধ্যে গজরাতে থাকা রাগটাকে শান্ত করার চেষ্টা করল। "এবার তোমাকে তোমার ভুলের মাশুল গুনতেই হবে।"

 

পরদিন সন্ধ্যায় ধানমন্ডির এক অভিজাত ক্লাব প্রাঙ্গণে বিজনেসের এক জমকালো পার্টি। আলোর রোশনাই, শ্যাম্পেইনের গ্লাসের টুংটাং শব্দ আর দামি পারফিউমের গন্ধে বাতাস ভারি। নাবিলা সেখানে উপস্থিত হয়েছিল রাজকীয় বেশে। পরনে গাঢ় লাল রঙের একটি সিল্কের শাড়ি, যার পিঠের দিকটা বেশ উন্মুক্ত। চুলগুলো উঁচু করে খো খোঁপা করা, ঘাড়ে শোভা পাচ্ছে পাতলা ডায়মন্ডের নেকলেস।

 

কিন্তু নাবিলার চেহারায় কোনো আত্মবিশ্বাসের আলো ছিল না। আজ সকালেই সে সত্যটা জানতে পেরেছে। সে জানতে পেরেছে শাওন সম্পূর্ণ নির্দোষ, আর সে নিজের ভুল ধারণার বশে শাওনকে কতটা অপমান করেছে। অপরাধবোধে ওর ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল।

 

পার্টির এক কোণে দাঁড়িয়ে গ্লাসে চুমুক দিচ্ছিল নাবিলা, হঠাৎ পেছনে এক পরিচিত উষ্ণ অবয়ব এসে দাঁড়াল।

 

"পার্টিতে বেশ একা একা মনে হচ্ছে, মিস নাবিলা?"

 

শাওনের ভরাট, গম্ভীর কণ্ঠ শুনে নাবিলা চমকে ঘুরে দাঁড়াল। শাওন পরনে ব্ল্যাক টাকসিডো, তার চোয়াল শক্ত এবং চোখে এক অদ্ভুত, হিসেবি শিকারির চাহনি।

 

"শাওন... আমি..." নাবিলার গলার স্বর আটকে গেল। সে ক্ষমা চাইতে চাইল, কিন্তু শাওন তাকে সে সুযোগ দিল না।

 

শাওন এক পা এগিয়ে এসে নাবিলার একদম গা ঘেঁষে দাঁড়াল। পার্টির গোলমালের মাঝেও শাওন নাবিলার একদম কাছে ঝুঁকে এলো। ওর হাত আলতো করে গিয়ে পড়ল নাবিলার উন্মুক্ত পিঠের ওপর। শাওনের গরম হাতের তালু নাবিলার নগ্ন চামড়া স্পর্শ করতেই নাবিলা শিউরে উঠল। শরীরের ভেতরে এক অচেনা বিদ্যুতের ঝলকানি খেলে গেল।

 

"এখানে সবাই দেখছে, শাওন... ছাড়ো," নাবিলা হাঁপাতে হাঁপাতে ফিসফিস করে বলল, যদিও তার শরীর শাওনের স্পর্শ প্রত্যাখ্যান করতে পারছিল না।

 

"দেখুক," শাওন নাবিলার কোমর শক্ত করে চেপে ধরে তাকে ভিড়ের আড়ালে একটা অন্ধকার ব্যালকনির দিকে টেনে নিয়ে গেল।

 

ব্যালকনির ঠাণ্ডা বাতাস আর ভেতরের উষ্ণতার মাঝে শাওন নাবিলাকে দেয়ালের সাথে আটকে দিল। শাওনের শক্ত শরীর নাবিলার নরম শরীরের সাথে লেপ্টে রইল।

 

"শাওন, আমি সত্যিটা জেনেছি... আই অ্যাম সরি," নাবিলা হাত বাড়িয়ে শাওনের গালে হাত রাখতে চাইল।

 

কিন্তু শাওন নাবিলার দুটো হাত ধরে দেয়ালের সাথে ওপরে তুলে চেপে ধরল। শাওনের চোখে তখন ভালোবাসার চেয়ে অনুযোগ আর তীব্র কামনার আগুন বেশি।

 

"ক্ষমা এত সহজে পাওয়া যায় না, নাবিলা," শাওন এক হিংস্র অনুরাগে নাবিলার ঘাড়ে আর কানের লতিতে কামড় বসাল।

 

নাবিলার মুখ থেকে এক আক্ষেপের চিৎকার বেরিয়ে আসতে চাইল, কিন্তু শাওন নিজের ঠোঁট দিয়ে নাবিলার ঠোঁট জোড়া শক্ত করে চেপে ধরল। এ কোনো শান্ত, সমর্পণের চুম্বন ছিল না; এ ছিল এক অধিপত্য বিস্তারের লড়াই। শাওন তার কামড় আর গভীর চুমুর মাধ্যমে নাবিলাকে বুঝিয়ে দিচ্ছিল—কাকে সে সন্দেহ করেছিল!

 

নাবিলা প্রথমে কিছুটা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও শাওনের উন্মাদ ভালোবাসার কাছে তার সব প্রতিরোধ ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল। শাওনের একটি হাত নাবিলার শাড়ির আঁচল সরিয়ে ডেবুটের ভাঁজে নেমে এলো। নাবিলার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল সুখে আর তীব্র যন্ত্রণায়। ও শাওনের পিঠে নখ বসিয়ে দিল।

 

"তুমি আমাকে ভালোবাসো, নাকি শাস্তি দিচ্ছ?" নাবিলা শাওনের ঠোঁটের ফাঁকে হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করল।

 

শাওন নাবিলার ঠোঁট থেকে সরে এসে ওর চোখের দিকে তাকাল। শাওনের চোখের কোণে একফোঁটা জল আর ঠোঁটে এক নিষ্ঠুর হাসি।

 

"দুটোই, নাবিলা। তুমি আমার বিশ্বাস ভেঙেছ, কিন্তু আমার শরীর আর মন এখনও তোমার দাস। তোমাকে এত সহজে ছেড়ে দেব ভাবলে কীভাবে?"

 

নাবিলাকে ব্যালকনিতে এক চরম উত্তেজনার সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে শাওন আস্তে করে সরে এলো। নাবিলার শাড়ি এলোমেলো, ঠোঁট দুটো শাওনের কামড়ে লাল হয়ে ফুলে উঠেছে, বুক দ্রুত ওঠানামা করছে।

 

শাওন নিজের স্যুটটা ঠিক করতে করতে বলল, "আজ রাতে আমার ফ্ল্যাটে আসবে। তুমি নিজে হেঁটে আসবে নাবিলা, তোমার ভুলের প্রাইস পে করতে। আর যদি না আসো... তবে কাল সকালে আমাদের যৌথ প্রজেক্ট বাতিল।"

 

শাওন এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে পার্টির ভিড়ে হারিয়ে গেল। ব্যালকনির অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা নাবিলা নিজের কাঁপতে থাকা শরীরটাকে সামলানোর চেষ্টা করতে লাগল। ও বুঝতে পারছিল, শাওনের এই রূপ সে আগে কখনো দেখেনি। এই হিংস্র, তীব্র প্রেমিককে সে যেমন ভয় পাচ্ছে, তেমনই তার শরীর আর মন শাওনের এই প্রতিশোধের কাছে সমর্পণ করার জন্য আকুল হয়ে উঠেছে।

 

রাত বারোটা। শহরের কোলাহল থমে গিয়ে চারপাশ এখন নিঝুম। শাওনের ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে কোনো আলো জ্বলছে না, শুধু কাচের জানালার বাইরে থেকে আসা সোডিয়াম আলোর এক চিলতে হলুদ আভা ঘরজুড়ে অদ্ভুত এক মোহময় পরিবেশ তৈরি করেছে।

 

সোফায় বসে ড্রিংকসের গ্লাসে শেষ চুমুক দিচ্ছিল শাওন। তার পরনের টাকসিডো খোলা, শার্টের ওপরের দুটো বোতাম উন্মুক্ত, যার ফাঁক দিয়ে তার চওড়া বুকের একাংশ দেখা যাচ্ছে। সে জানত নাবিলা আসবে। নাবিলার জেদ আর তার অনুশোচনা—দুটোই তাকে এখানে টেনে আনবে।

 

ঠিক বারোটা বাজে দশ মিনিটে দরজার কলিংবেলটা বেজে উঠল।

 

শাওন উঠে গিয়ে দরজা খুলল। দরজায় দাঁড়িয়ে নাবিলা। পরনে কালো রঙের এক অতি সাধারণ সুতির শাড়ি, কোনো মেকআপ নেই, চোখে মুখে এক অদ্ভুত ধরনের শান্ত সমর্পণ। এতদিনের দাম্ভিক নাবিলা যেন আজ সব অহংকার বিসর্জন দিয়ে শাওনের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।

 

"ভেতরে এসো," শাওনের কণ্ঠস্বর বরফের মতো ঠান্ডা।

 

নাবিলা নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকল। দরজা বন্ধ করার শব্দ হতেই নাবিলা পেছনে ফিরল। সে সরাসরি শাওনের চোখের দিকে তাকাল।

 

"তুমি চেয়েছিলে আমি আসি। আমি এসেছি শাওন। এবার বলো, তুমি কী চাও?" নাবিলার গলার স্বর কাঁপল না, কিন্তু তার চোখে ছিল এক গভীর আকুতি।

 

শাওন এক পা এগিয়ে এলো। নাবিলার কালো শাড়ির আঁচলটা ধরে আলতো টানে তার কাঁধ থেকে ফেলে দিল। নাবিলার সুঠাম শরীরটা হালকা আলোয় যেন এক স্বপ্নাতীত সৌন্দর্য নিয়ে ফুটে উঠল। শাওন নাবিলার থুতনিটা উঁচু করে ধরল, ওর ভেজা ঠোঁটের ওপর নিজের বুড়ো আঙুল বুলিয়ে দিল।

 

"আমি তোমাকে চাই, নাবিলা। তবে বিজয়ী হিসেবে নয়... একজন নিঃস্ব প্রেমিক হিসেবে, যে তোমার কাছে সম্পূর্ণ হার মানতে চায়," শাওনের স্বর হুট করেই নরম হয়ে এলো। তার চোখের সেই হিংস্রতা গলে গিয়ে উপচে পড়ল সীমাহীন ভালোবাসা।

 

নাবিলা চমকে শাওনের দিকে তাকাল। সে ভেবেছিল শাওন তাকে অপমান করবে, তার ওপর শারীরিক বা মানসিক প্রতিশোধ নেবে। কিন্তু শাওনের এই ব্যাকুলতা, এই ভালোবাসার প্রকাশ নাবিলার ভেতরের শেষ বাঁধ ভেঙে দিল।

 

"শাওন..." নাবিলা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ও শাওনের গলায় দুহাত জড়িয়ে ধরে তার বুকে মুখ গুঁজে কেঁদে ফেলল। "আমি দুঃখিত শাওন... আমি কীভাবে পারলাম তোমাকে সন্দেহ করতে? আমি জানি না করপোরেট দুনিয়ার এই বিষ আমাকে কতটা অন্ধ করে দিয়েছিল। প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দাও..."

 

নাবিলার চোখের জল শাওনের উন্মুক্ত বুকে এসে পড়তেই শাওন বুকভরে নিঃশ্বাস নিল। সে নাবিলাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার বুকের রক্তক্ষরণ যেন এক মুহূর্তে বন্ধ হয়ে গেল।

আমি তোমাকে কখনো ক্ষমা করব না নাবিলা... যদি না তুমি আজ রাতে আমাকে পুরোপুরি তোমার করে নাও," শাওন নিচু স্বরে বলল।

 

শাওন নাবিলাকে কোলে তুলে নিল। মাস্টার বেডরুমে তাকে নিয়ে গিয়ে নরম বিছানায় শুইয়ে দিল। ঘরের আলো নেভানো, শুধু চাঁদের আলো এসে পড়েছে তাদের ওপর।

 

শাওন নাবিলার ওপরে নেমে এলো। তবে এবারের স্পর্শে কোনো প্রতিশোধের তাড়না ছিল না, ছিল এক গভীর, উন্মাদময় অনুরাগ। শাওনের ঠোঁট নাবিলার চোখ, গাল, গলা হয়ে নেমে এলো তার কলার বোনের ওপর। প্রতিটি চুমুতে শাওন যেন তার বিরহ আর ভালোবাসার চিহ্ন একে দিচ্ছিল। নাবিলা সুখে আর আবেগে শিউরে উঠে শাওনের চুল শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।

 

"তুমি শুধুই আমার, নাবিলা। এই পৃথিবী, এই ব্যবসা, এই প্রতিযোগিতা—সব কিছুর উর্ধ্বে তুমি শুধু আমার," শাওন নাবিলার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল।

 

"হ্যাঁ শাওন... আমি শুধু তোমার," নাবিলা হাঁপাতে হাঁপাতে উত্তর দিল। সে তার শরীরকে পুরোপুরি শাওনের হাতে সঁপে দিল।

 

রাতের অন্ধকারে দুটো তৃষ্ণার্ত শরীর আবার এক হয়ে গেল। কোনো জেদ নেই, কোনো শর্ত নেই, কোনো অতীত বা ভবিষ্যতের হিসাব নেই—ছিল শুধু দুটো আত্মার চরম মিলন। শাওনের প্রতিটি গভীর প্রহার আর স্পর্শে নাবিলা নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করছিল। তাদের দ্রুত নিঃশ্বাস আর বিছানার মৃদু শব্দ রাতের নীরবতাকে এক তীব্র কামনার সংগীতে রূপ দিল। ভালোবাসার এই উদ্দাম খেলায় দুজনেই আজ নিজেদের হারিয়ে ফেলল।

 

পরদিন সকালে যখন ভোরের আলো ফুটল, নাবিলা শাওনের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে শুয়ে ছিল। শাওন নাবিলার কপালে মিষ্টি একটা চুমু খেয়ে তার চুল গুছিয়ে দিচ্ছিল।

 

"সবকিছু কি ঠিক হয়ে গেল শাওন?" নাবিলা চোখ না খুলেই জিজ্ঞেস করল।

 

"হয়তো," শাওন আলতো করে হাসল। "কিন্তু আমাদের অফিসের লোকজনকে কী জবাব দেব? কাল তো বোর্ডের মিটিং।"

 

নাবিলা এবার চোখ খুলে শাওনের দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমির হাসি হাসল। "বোর্ডের মিটিংয়ে আমি তোমাকে এক ইঞ্চি ছাড় দেব না, মি. শাওন!"

 

বোর্ডের মিটিং রুমের পরিবেশ থমথমে। টেবিলের একপাশে বসে আছেন শাওনের বাবা, অন্যপাশে নাবিলার বাবা। দুই পরিবারের বহু পুরোনো ব্যবসায়িক শত্রুতা আজ এক টেবিলে এসে দাঁড়িয়েছে। মাঝে বড় প্রজেক্টের চুক্তিপত্র, আর দুই প্রান্তে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শাওন আর নাবিলা। ঘরের ভেতরের শীতল বাতাসও তাদের টানটান উত্তেজনায় গরম হয়ে উঠেছে।

 

"আমি এই যৌথ প্রজেক্ট মানি না," শাওনের বাবা টেবিল চাপড়ে বলে উঠলেন। "একসময়ের শত্রুদের সাথে ব্যবসা করার মতো ভুল আমি করব না।"

 

নাবিলার বাবাও শক্ত গলায় বললেন, "আমারও কোনো আগ্রহ নেই। নাবিলা, চুক্তি বাতিল করো।"

 

মিটিং রুমে থাকা বাকি শেয়ারহোল্ডাররা অস্বস্তিতে মুখ চাওয়াচাওই করতে লাগলেন। শাওন শান্ত পায়ে হেঁটে নাবিলার পাশে এসে দাঁড়াল। তারপর সবার চোখের সামনেই নাবিলার ডান হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় তুলে নিল। তাদের আঙুলগুলো একে অপরের সাথে দৃঢ়ভাবে আটকে গেল।

 

পুরো রুম জুড়ে এক মুহূর্তের জন্য যেন নিস্তব্ধতা নেমে এলো।

 

"ব্যবসা বন্ধ হবে না, বাবা," শাওন সোজা তার বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল। "আর আমাদের মধ্যকার যে দেওয়াল তোমরা বছরের পর বছর ধরে তুলে রেখেছ, আজ সেটা ভাঙার সময় এসেছে।"

 

নাবিলা নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে এক ধাপ এগিয়ে বলল, "আমরা ছোটবেলা থেকে একে অপরের প্রতিযোগী ছিলাম। কিন্তু সেই লড়াই আমাদের একে অপরের কাছে টেনে এনেছে। আমরা যদি একসাথে কাজ করি, তবে আমাদের হারানোর ক্ষমতা কারো নেই।"

 

"তুমি... তুমি এই ছেলেটাকে বিশ্বাস করছ নাবিলা?" নাবিলার বাবা হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

 

নাবিলা শাওনের দিকে তাকাল। শাওনের গভীর, তৃপ্ত চোখের চাহনিতে ফুটে উঠছে রাতের সেই সব স্মৃতি—যেখানে কোনো অবিশ্বাস ছিল না, ছিল শুধু এক পরম আত্মসমর্পণ। নাবিলা মৃদু হেসে জবাব দিল, "আমি শুধু বিশ্বাস করি না বাবা, আমি শাওনকে ভালোবাসি। আর ও-ও আমাকে ভালোবাসে।"

 

দুই পরিবারের প্রধান কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। শাওন আর নাবিলার চোখের সেই অদম্য তেজ আর ভালোবাসা দেখে তাদের পুরোনো ক্ষোভ যেন নিমেষেই ফিকে হয়ে গেল। চুক্তিস্বাক্ষর শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন হলো, দুই শত্রু পরিবার আজ নতুন এক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ইঙ্গিত পেল।

 

মিটিং শেষ হতেই শাওন নাবিলাকে নিয়ে সোজা চলে এলো তার ফ্ল্যাটের সেই চেনা ব্যালকনিতে। বিকালের সূর্যটা তখন বুড়িগঙ্গার ওপারে রক্তিম আলো ছড়িয়ে ডুব দিচ্ছে। হালকা ঠান্ডা বাতাস স্পর্শ করে যাচ্ছে তাদের শরীর।

 

নাবিলা ব্যালকনির রেলিং ধরে দাঁড়িয়েছিল। শাওন পেছন থেকে এসে নাবিলার পেটে দুহাত জড়িয়ে তাকে নিজের শক্ত বুকে টেনে নিল। শাওনের উষ্ণ ঠোঁট গড়িয়ে পড়ল নাবিলার ঘাড়ের ভাঁজে, হালকা কামড় আর চুমুর ছোঁয়ায় নাবিলাকে আবার শিউরে তুলল।

 

"সবাইকে জেতানো এত সহজ ছিল না, নাবিলা," শাওন নাবিলার কানের কাছে গভীর স্বরে ফিসফিস করে বলল।

 

নাবিলা ঘাড় বাঁকিয়ে শাওনের চোখের দিকে তাকাল, ওর ঠোঁটে ভেসে উঠল এক মায়াবী, কামনাময় হাসি। "কিন্তু তুমি তো হারতে শেখোনি, মি. শাওন।"

 

"আমি তোমার কাছে বারবার হারতে রাজি," শাওন নাবিলাকে এক ঝটকায় নিজের দিকে ঘুরিয়ে আনল।

 

নাবিলার শাড়ির আঁচল ব্যালকনির বাতাসে উরে গিয়ে নিচে পড়ে গেল। শাওনের এক হাত নাবিলার নগ্ন কোমর আঁকড়ে ধরল, অন্য হাত চলে গেল তার চুলের ভিড়ে। আর কোনো কথা নয়—শাওনের তৃষ্ণার্ত ঠোঁট জোড়া গ্রাস করে নিল নাবিলার ব্যাকুল ঠোঁট দুটিকে। এ যেন সব যুদ্ধ শেষে বিজয়ী দুই বীরের চরম আনন্দের উদযাপন।

 

নাবিলা দুহাতে শাওনের শার্ট ধরে ওকে আরও কাছে টেনে নিল। সূর্যাস্তের গাঢ় লাল আলোয় তাদের দুটো অবয়ব মিশে গেল এক হয়ে।

 

ছোটবেলার যে ঝগড়া আর প্রতিযোগিতার সূচনা হয়েছিল ধানমন্ডির লেক পাড়ে, তা আজ ঢাকার এই উঁচু বারান্দায় এসে এক তীব্র, গভীর ভালোবাসা আর কামনার বন্ধনে পূর্ণতা পেল।

....
👁 19