রহস্যময় স্বামীর গোপন সত্য

রাতের ঢাকা শহর বাইরে থেকে শান্ত মনে হলেও, ধানমন্ডির ছয় নম্বর রোডের সেই চারতলার ফ্ল্যাটটির ভেতরে থমথমে একটা নীরবতা জমে ছিল। ড্রয়িংরুমের কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরের সোডিয়াম বাতির আলো এসে পড়েছে ঘরের এক কোণে। দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দ ছাড়া আর কোনো সাড়াশব্দ নেই। রাত এখন দুটো বেজে পঁতাল্লিশ।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

ফার্নিচারের চকচকে বার্নিশের গন্ধ আর নতুন ঘরের চেনা সুবাস এখনো পুরোপুরি মেলায়নি। আড়াই মাস হলো তাদের বিয়ে হয়েছে। পারিবারিক পছন্দেই বিয়েটা হয়েছিল—আরিফ সাহেবের মেজো মেয়ে ফারিহা আর শিল্পপতি মোস্তফা সাহেবের ছেলে নাবিল। দেখতে শুনতে দুজনেই রূপকথার রাজপুত্র আর রাজকন্যার মতো। কিন্তু এই আড়াই মাসে ঘরের দেয়ালগুলো যতটা কাছাকাছি এসেছে, এই দুটো মানুষ তার চেয়েও বেশি দূরে সরে গেছে।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

ফারিহা ড্রয়িংরুমের নরম সোফায় হাঁটু দুটো বুকের কাছে টেনে বসে ছিল। গায়ে একটা হালকা নীল রঙের সুতির থ্রি-পিস, ডার্ক সার্কেল পড়েছে চোখের নিচে। কয়েকদিন ধরে ঠিকমতো ঘুম নেই তার। পাশের টেবিলটিতে পড়ে থাকা নাবিলের ল্যাপটপটার দিকে ফারিহার চোখ বারবার আটকে যাচ্ছিল। ল্যাপটপটা খোলা, কিন্তু স্ক্রিন অফ হয়ে আছে। ফারিহার ভেতরের সংশয়টা গত কয়েক সপ্তাহে একটা বিষাক্ত বৃক্ষের মতো শাখা-প্রশাখা মেলেছে।

 

নাবিল মানুষটা খুব গম্ভীর। সে খুব একটা কথা বলে না, নিজের মনের ভাব প্রকাশ করায় চরম অনিচ্ছুক। ফারিহা কতদিন চেষ্টা করেছে সহজ হতে, রাতে এক কাপ চা বানিয়ে পাশে গিয়ে বসেছে, কিন্তু নাবিল হয়তো ল্যাপটপে চোখ রেখে বলেছে, "ধন্যবাদ ফারিহা, রেখে দাও। আমার একটু কাজ আছে।" এই যান্ত্রিক ধন্যবাদ আর বরফশীতল দূরত্ব ফারিহার বুকটা দুমড়ে-মুচড়ে দিত। এর ওপর যোগ হয়েছে প্রায় প্রতিদিনই অপরিচিত কিছু নম্বর থেকে নাবিলের ফোনে আসা গভীর রাতের বার্তা আর কল। নাবিল কখনো ফারিহার সামনে সে ফোন তোলে না। ফোনটা সাইলেন্ট করে পকেটে রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় বা বেলকনিতে গিয়ে নিচু স্বরে কথা বলে।

 

একজন স্ত্রীর মনে অবিশ্বাসের বিষ ঢেলে দেওয়ার জন্য এর চেয়ে বেশি কিছুর প্রয়োজন হয় না। ফারিহার মনে শক্ত ধারণা জন্মে গেছে, নাবিলের জীবনে সে ছাড়া অন্য কেউ আছে। হয়তো পুরনো কোনো ভালোবাসা, যাকে নাবিল ভুলতে পারেনি। হয়তো পরিবারের চাপে বাধ্য হয়ে ফারিহাকে বিয়ে করেছে, কিন্তু মনটা পড়ে আছে অন্য কোথাও। এই ভাবনাটুকুই ফারিহাকে ভেতরে ভেতরে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছিল।

 

শয়নকক্ষের দরজা খুলে নাবিল বেরিয়ে এলো। পরনে ডার্ক গ্রে রঙের ট্রাউজার আর কালো টি-শার্ট। নাবিলের চওড়া কাঁধ, পরিচ্ছন্ন দাড়ি আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেকোনো নারীকে এক পলকে আকর্ষিত করার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু ফারিহার কাছে এই মানুষটাই এখন এক গভীর রহস্য। নাবিল ঘরে ঢুকেই ফারিহাকে সোফায় এভাবে বসে থাকতে দেখে থমকে দাঁড়াল।

 

নাবিলের গলায় খানিকটা মৃদু উদ্বেগ ফুটে উঠল, "ফারিহা? তুমি এখনো জেগে? শরীর খারাপ লাগছে নাকি?"

 

ফারিহা চোখ তুলে তাকাল। সেই চোখে কোনো উষ্ণতা ছিল না, ছিল কেবল জমে থাকা বরফ আর একরাশ তীব্র ক্ষোভ। সে সোজা হয়ে বসে শান্ত কিন্তু বিষাক্ত কণ্ঠে বলল, "আমার শরীর একদম ঠিক আছে নাবিল। কিন্তু তোমার মনের খবর কী? সেটা কি ঠিক আছে?"

 

নাবিল এক মুহূর্তের জন্য যেন চমকে উঠল, তবে পরক্ষণেই নিজের চেহারা স্বাভাবিক করে নিল। সে হেঁটে এসে সোফার উল্টো দিকের নিচু টেবিলে গিয়ে বসল। দুহাতে মুখ ঢেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "তুমি আবার শুরু করলে ফারিহা? আমি তোমাকে কতবার বলব, অহেতুক সন্দেহ করে নিজের আর আমার মানসিক শান্তি নষ্ট কোরো না।"

 

"অহেতুক সন্দেহ?" ফারিহা সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছিল, "তুমি এটাকে অহেতুক সন্দেহ বলছ? রাত দিন চব্বিশ ঘণ্টা ফোন সাইলেন্ট রাখা, গভীর রাতে ল্যাপটপ নিয়ে অন্য ঘরে বসে থাকা, আর আমার ছোঁয়া থেকে প্রতিদিন নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা—এগুলো সব অহেতুক? তুমি যদি অন্য কাউকেই ভালোবেসে থাকো, তবে আমাকে কেন বিয়ে করলে? কেন আমার জীবনটা এভাবে ছারখার করছ?"

 

নাবিল সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার চোখে এক অদ্ভুত কষ্ট আর ক্লান্তি ফুট উঠে এলো, যা ফারিহা এই রাগের মাথায় খেয়ালই করল না। নাবিল ফারিহার দিকে এক পা এগিয়ে এসে বলল, "তুমি যা ভাবছ তা নয় ফারিহা। কিছু বিষয় থাকে যা সঠিক সময়ের আগে বলা যায় না। তুমি আমার স্ত্রী, আমার প্রতি তোমার একটু তো বিশ্বাস থাকা উচিত!"

 

"বিশ্বাস?" ফারিহা একটা তিক্ত হাসি হাসল। "যে মানুষটা আমাকে তার হৃদয়ের এতটুকু অংশ দিতে পারেনি, যার চোখে আমি কখনো নিজের জন্য অনুরাগের একবিন্দু আলো দেখিনি, তাকে আমি কীভাবে বিশ্বাস করব নাবিল? তুমি আমার পাশে শুয়ে থেকেও কত আলোকবর্ষ দূরে থাকো, তা কি তুমি জানো? মাঝরাতে যখন তুমি ভেবে নাও আমি ঘুমিয়ে পড়েছি, তখন তোমার ওই ফোনটায় কার বার্তা আসে? কার সাথে তুমি গোপনে কথা বলো?"

 

ফারিহার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়ল। তার গালের ওপর অশ্রুরেখা সোডিয়াম আলোর আলোছায়ায় চমকে উঠল। এতদিনের জমে থাকা অভিমান আর অপমানের তীব্রতা তার পুরো শরীরকে কাঁপিয়ে দিচ্ছিল।

 

নাবিল ফারিহার চোখের জল দেখে স্থির থাকতে পারল না। সে ফারিহার খুব কাছাকাছি চলে এলো। দীর্ঘদেহী নাবিল যখন ফারিহার একদম মুখোমুখি দাঁড়াল, ঘরের তাপমাত্রা যেন এক নিমেষে কয়েক ডিগ্রি বেড়ে গেল। নাবিলের সুবাস—উড আর মাস্কের এক মাতাল করা ঘ্রাণ—ফারিহার নাকে এসে ধাক্কা দিল।

 

নাবিল হাত বাড়িয়ে ফারিহার ভিজে যাওয়া গাল দুটো নিজের দুহাতের চওড়া তালুতে তুলে নিল। নাবিলের হাতের স্পর্শটা অসম্ভব গরম আর পুরুষালী ছিল। ফারিহা সজোরে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু নাবিল তাকে শক্ত করে ধরে রাখল।

 

"ছেড়ে দাও আমাকে!" ফারিহা বিড়বিড় করে উঠল, তার বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছিল। "তোমার এই কৃত্রিম ভালোবাসা আমাকে দেখিও না।"

 

"চুপ করো ফারিহা," নাবিলের কণ্ঠ হঠাৎ গভীর আর ভারী হয়ে উঠল। তার চোখ দুটো সরাসরি ফারিহার ভেজা চোখের দিকে নিবদ্ধ। নাবিলের এই রূপ ফারিহা আগে কখনো দেখেনি। সেখানে কোনো দূরত্ব ছিল না, ছিল এক অপ্রতিরোধ্য তীব্রতা।

 

নাবিল ফারিহার মুখটা আরও কিছুটা কাছে টেনে আনল। দুজনের ঠোঁটের দূরত্ব তখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির। ফারিহা নাবিলের বুকের ধুকপুকানি শুনতে পাচ্ছিল—অসম্ভব দ্রুত আর ব্যাকুল সেই হৃদস্পন্দন। নাবিলের চোখের গভীরে এমন এক বাসনা আর যন্ত্রণা মেশানো আলো ছিল, যা ফারিহাকে এক মুহূর্তে বাকরুদ্ধ করে দিল।

 

"তুমি কি সত্যিই মনে করো আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি?" নাবিল ফারিহার নিচের ঠোঁটে নিজের বুড়ো আঙুল আলতো করে ঘষে দিয়ে নিচু, গম্ভীর গলায় বলল। তার শ্বাসের উত্তাপ ফারিহার গালে এসে পড়ছিল, ফারিহার সমস্ত শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল। "তুমি জানো না ফারিহা, প্রতি রাতে তোমার পাশে শুয়ে নিজেকে আটকে রাখা আমার জন্য কতটা কষ্টের। তুমি জানো না, কতবার আমার ইচ্ছে হয়েছে তোমাকে নিজের বাহুডোরে এভাবে পিষে ফেলি, তোমার ওই অভিমানী ঠোঁট দুটোকে আমার ভালোবাসায় ভরিয়ে দিই।"

 

ফারিহা স্তব্ধ হয়ে গেল। নাবিলের কথাগুলোর প্রতিটি শব্দে যেন বিদ্যুতের মতো স্পর্শ ছিল। তার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসছিল। নাবিল তার এক হাত ফারিহার কোমর পেঁচিয়ে ধরল, ফারিহাকে একদম নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে নিল। ফারিহার নরম শরীরটা নাবিলের শক্ত, বলিষ্ঠ দেহের সাথে মিশে গেল।

 

ফারিহা নাবিলের বুকে দুহাত দিয়ে ঠেলে সরানোর চেষ্টা করতে চাইল, কিন্তু তার নিজের হাত দুটোই যেন বিশ্বাসঘাতকতা করল। তার আঙুলগুলো নাবিলের টি-শার্টের কাপড় খামচে ধরল।

 

"তাহলে... তাহলে কেন দূরত্ব রাখো?" ফারিহা কোনোমতে ফিসফিস করে বলল, তার চোখের জল এখন নাবিলের হাতের তালু ভিজিয়ে দিচ্ছে। "কেন আমাকে তোমার জীবনের অংশ করতে চাও না?"

 

নাবিল ফারিহার কপালে নিজের কপাল ঠেকালো। দুজনের তপ্ত শ্বাস একে অপরের সাথে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। নাবিলের চোখে এক গভীর গোপন সত্যের ছায়া কেঁপে উঠল।

 

"কারণ আমি ভয় পাই ফারিহা," নাবিল ফারিহার ঘাড়ের পেছনের চুলগুলোতে হাত ডুবিয়ে দিয়ে মৃদু চাপ দিল, ফারিহার মাথাটা আরও একটু উঁচিয়ে ধরে বলল, "আমি ভয় পাই, আমার অতীত আর আমার বর্তমান লড়াইয়ে যদি আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলি। কিন্তু আজ রাতে... আর কোনো লুকোচুরি নয়। আজ রাতে তুমি দেখবে আমি আসলে কী গোপন করছিলাম।"

 

নাবিল ফারিহাকে এক মুহূর্তের জন্য ছেড়ে দিল, কিন্তু ফারিহার হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় ধরে রাখল। তারপর তাকে টেনে নিয়ে চলল পড়ার ঘরের দিকে। ফারিহার বুকটা দড়াস করে উঠল। যে ঘরের দরজা সবসময় তালাবন্ধ থাকত, যে ঘরে নাবিল ফারিহাকে কখনো ঢুকতে দেয়নি, আজ সেই রহস্যময় ঘরের সামনে এনে দাঁড় করাল সে।

 

নাবিল পকেট থেকে চাবি বের করে পড়ার ঘরের তালাটা খুলল। দরজার হাতল ঘুরিয়ে ভেতরে আলো জ্বালাতেই ফারিহার চোখ কপালে উঠল। ঘরের ভেতরের দৃশ্য দেখে ফারিহার পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে গেল।

 

পড়ার ঘরের বিশাল টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে একের পর এক নথিপত্র, হাসপাতালের ফাইল, আর দেয়ালে টাঙানো কতগুলো ছবি। কিন্তু ফারিহার নজর কেড়ল টেবিলের একদম মাঝখানে রাখা একটা বাঁধাই করা ডায়রি আর একটি লিগ্যাল ডকুমেন্ট, যার ওপর বড় বড় অক্ষরে লেখা—"গোপন তদন্ত ও মেডিকেল রিপোর্ট"।

 

নাবিল ফারিহার হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, "স্বাগতম আমার আসল জগতে, ফারিহা। যে রহস্যের জন্য তুমি আমাকে পর ভেবেছ, আজ সেই রহস্যই আমাদের সারাজীবনের জন্য এক করে দেবে... অথবা চিরতরে বদলে দেবে।"

 

 

টেবিলের ওপর রাখা ফাইলগুলো আর একের পর এক মেডিকেল রিপোর্টের ওপর ফারিহার চোখ স্থির হয়ে রইল। বাইরের সোডিয়াম আলো তখনো জানালা গলে এসে ঘরের দেয়ালে বিচ্ছুরিত হচ্ছে, কিন্তু ভেতরের পরিবেশ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ফারিহা ধীরপায়ে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। কাঁপা কাঁপা হাতে একটা ফাইল তুলে নিতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল কতগুলো নথিপত্র আর ছবি।

 

ফারিহার বাবা আরিফ সাহেবের একটা ছবি সেখানে পিন দিয়ে আটকানো। আর তার পাশেই রক্তের রিপোর্ট, কিছু ব্যাংকের ট্রানজেকশন পেপার, এবং জটিল এক হৃৎপিণ্ডের অস্ত্রোপচারের কাগজ।

 

"এসব... এসব কী নাবিল?" ফারিহা বিষ্ময় আর বিভ্রান্তিতে ভরা গলায় প্রশ্ন করল। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছিল।

 

নাবিল ফারিহার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াল। তার চওড়া বুকের তপ্ত উত্তাপ ফারিহা নিজের পিঠে অনুভব করতে পারছিল। নাবিল এক হাত বাড়িয়ে টেবিল থেকে ফাইলটি ফারিহার হাত থেকে নিয়ে আবার সযত্নে রাখল। তারপর ফারিহার দু কাঁধে দুটো হাত রাখল। নাবিলের স্পর্শে কোনো দূরত্ব ছিল না, ছিল কেবল এক গভীর নির্ভরতা আর চরম ভালোবাসা।

 

"এগুলো তোমার বাবার চিকিৎসার ফাইল ফারিহা," নাবিলের গলা গভীর আর ভারী শোনালো। "তোমার বাবা তিন মাস আগে জানতে পারেন যে তাঁর হৃদযন্ত্রে অত্যন্ত জটিল একটা ব্লক আছে। অস্ত্রোপচার না করালে তাঁকে বাঁচানো কঠিন। কিন্তু তিনি জানতেন, এই খবর পেলে তুমি ভেঙে পড়বে। তাছাড়া এই অস্ত্রোপচারের খরচ বিপুল, যা তোমার পরিবারের পক্ষে দেওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল।"

 

ফারিহা নিশ্বাস বন্ধ করে নাবিলের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। "বাবা... বাবার হার্টে সমস্যা? কিন্তু উনি তো আমাকে কিছুই বলেননি!"

 

"তিনি বলতে দেননি," নাবিল ফারিহার গালের ওপর নেমে আসা একগোছা চুল আলতো করে কানে গুঁজে দিয়ে বলল। তার বুড়ো আঙুল ফারিহার নরম গাল স্পর্শ করতেই ফারিহার শরীরজুড়ে একটা বিদ্যুত তরঙ্গ খেলে গেল। "ব বিয়ের আগেই তিনি আমার সাথে দেখা করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন তোমার বিয়েটা কোনো ঝামেলা ছাড়াই হয়ে যাক। কিন্তু আমি যখন সত্যিটা জানতে পারলাম, তখন সিদ্ধান্ত নিই—তোমার ওপর বা তোমার পরিবারের ওপর কোনো চাপ আসতে দেব না। আমি নিঃশব্দে আমেরিকার এক বিশেষায়িত হাসপাতালের সাথে যোগাযোগ শুরু করি।"

 

ফারিহার চোখের কোণ থেকে ঝরঝর করে জল নেমে এলো। সে অবিশ্বাস্য চোখে নাবিলের দিকে তাকিয়ে রইল। নাবিল বলতে থাকল, "যে ফোনগুলো গভীর রাতে আসত, সেগুলো ছিল বোস্টনের সার্জনদের। সময়ের পার্থক্যের কারণে আমাকে গভীর রাতেই কথা বলতে হতো। আর যেসব রহস্যময় বার্তা তুমি দেখতে, সেগুলো ছিল আন্তর্জাতিক মেডিকেল ফান্ড ট্রান্সফারের কনফার্মেশন মেসেজ। আমি চেয়েছিলাম সব ব্যবস্থা চূড়ান্ত করে তোমার জন্মদিনের দিন তোমাকে সারপ্রাইজ দেব। তোমাকে বলব—তোমার বাবা একদম সুস্থ হয়ে যাবেন।"

 

কথাগুলো শেষ হতেই ফারিহার মনের ভেতরে জমে থাকা অবিশ্বাসের বরফ নিমেষেই গলে পানি হয়ে গেল। যে মানুষটাকে সে এতদিন পাষাণ, হৃদয়হীন আর প্রতারক ভেবে এসেছে, সে মানুষটা তার বাবাকে বাঁচানোর জন্য নিজের রাত জেগে লড়াই করে গেছে!

 

ফারিহার নিজের প্রতি এক তীব্র অপরাধবোধ জন্ম নিল। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। "তুমি... তুমি আমাকে এত বড় একটা কথা কেন লুকিয়ে রাখলে নাবিল? আমি তোমাকে কত বাজে কথা বলেছি, কত ভুল বুঝেছি! তুমি কেন আমাকে শাস্তি দিলে না?"

 

নাবিল আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে ফারিহার কোমর ধরে এক হ্যাঁচকায় নিজের একদম কাছে টেনে নিল। ফারিহা সোজা এসে নাবিলের বুকে আছড়ে পড়ল। নাবিলের বলিষ্ঠ দু হাত ফারিহার পিঠ আর কোমর শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল, যেন সে আর কখনো ফারিহাকে নিজের থেকে দূরে যেতে দেবে না।

 

"তোমাকে শাস্তি দেব?" নাবিল ফারিহার থুতনি ধরে তার মুখটা ওপরে তুলে ধরল। নাবিলের চোখের গভীরে এখন কেবল আগুনের মতো খাঁটি ভালোবাসা আর তীব্র আকুলতা। "তুমি জানো না ফারিহা, প্রতি রাতে তোমার অবিশ্বাসের চাহনি আমাকে কতটা পোড়াত। কিন্তু আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, যতদিন না আমি সব গুছিয়ে আনছি, ততদিন নিজেকে সংযত রাখব। আমি ভয় পেতাম, তুমি যদি আবেগের বশে ভেঙে পড়ো।"

 

"আমি খুব ভুল করেছি নাবিল, আমাকে ক্ষমা করে দাও..." ফারিহা নাবিলের টি-শার্টের কাপড় দু হাতে খামচে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল।

 

"উহু, কান্নার কোন জায়গা নেই আজ রাতে," নাবিল নিচু, মাতাল কণ্ঠে বলল।

 

নাবিল নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে ফারিহার চোখের জল মুছে দিল। তারপর তার ঠোঁট দুটো নেমে এলো ফারিহার কপালে। এক দীর্ঘ, উষ্ণ স্পর্শ। ফারিহা চোখ বন্ধ করে ফেলল, তার সমস্ত শরীর যেন এক অদ্ভুত আবেশে শিহরিত হয়ে উঠল। কপাল থেকে নাবিলের ঠোঁট নেমে এলো ফারিহার গালে, তারপর তার থুতনিতে।

 

নাবিলের তপ্ত শ্বাসের ছোঁয়া ফারিহার ঘাড়ের সংবেদনশীল ত্বকে লাগতেই ফারিহার মুখ দিয়ে হালকা একটা কোঁকানো শব্দ বের হয়ে এলো। সে নাবিলের জামা আরও শক্ত করে চেপে ধরল। এতদিন যে দূরত্ব তাদের মাঝে ছিল, সেই বাঁধ ভাঙার অনুভূতিতে ফারিহা দিশেহারা হয়ে পড়ল।

 

নাবিল ফারিহার কোমর ধরে তাকে আলতো করে তুলে নিয়ে পড়ার ঘরের টেবিলের ওপর বসিয়ে দিল। এখন ফারিহা আর নাবিলের চোখ একদম সমান্তরালে। নাবিল ফারিহার দু পায়ের মাঝখানে আরও ঘনিষ্ট হয়ে দাঁড়াল। ফারিহার পরনের থ্রি-পিসের ওড়নাটা অলক্ষ্যে মেঝেতে খসে পড়ল।

 

"নাবিল..." ফারিহা ফিসফিস করে উঠল, তার গলায় এক তীব্র অনুরাগের সুর।

 

"আজ আর কোনো অজুহাত নয় ফারিহা," নাবিল ফারিহার ঘাড়ের কাছে নিজের মুখটা ডুবিয়ে দিল। তার ঠোঁট ফারিহার কোমল ত্বকে গভীর স্পর্শ এঁকে দিতে লাগল। ফারিহা তার দু হাত দিয়ে নাবিলের পিঠ জড়িয়ে ধরল। নাবিলের চওড়া পিঠের মাংশপেশির উত্তাপ ফারিহার হাতের তালুতে ফুটে উঠছিল।

 

নাবিলের গভীর স্পর্শ ফারিহার হৃদস্পন্দনকে এক অস্বাভাবিক গতিতে বাড়িয়ে দিল। তার এতদিন ধরে জমা থাকা সমস্ত দুঃখ, অভিমান আর সন্দেহ এক নিমেষে বাষ্প হয়ে উবে গেল। তার বদলে জায়গা নিল এক অপ্রতিরোধ্য রোমান্স আর শারীরিক আকুলতা।

 

নাবিল ফারিহার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে এখন কোনো গোপনীয়তা নেই, আছে কেবল ফারিহাকে নিজের করে পাওয়ার তীব্র ক্ষুধা। নাবিল ধীরে ধীরে ফারিহার মুখের কাছাকাছি এলো। ফারিহা আর চোখ সরাতে পারল না। নাবিলের ঠোঁট যখন ফারিহার ভিজে থাকা ঠোঁটের ওপর নেমে এলো, তখন সমস্ত জগত যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।

 

সেই চুম্বন ছিল যেমন গভীর, তেমনই তৃষ্ণার্ত। আড়াই মাসের সমস্ত তৃষ্ণা, সমস্ত দূরত্ব যেন সেই এক স্পর্শে মুছে যেতে লাগল। ফারিহা নিজের অজান্তেই নাবিলের চুলে হাত ডুবিয়ে তাকে আরও কাছে টেনে নিল। নাবিলের এক হাত ফারিহার পিঠ বেয়ে নিচে নেমে এসে তাকে নিজের শরীরের সাথে আরও নিবিড়ভাবে পিষে ধরল।

 

ঘরের লাইটের আলোয় দুটি ছায়া এক হয়ে মিশে গিয়েছিল। কিন্তু ঠিক তখনই, টেবিলের ওপর রাখা নাবিলের ফোনটা আবার জোরে কম্পিত হতে শুরু করল। সেই একই নাম না জানা আন্তর্জাতিক নম্বর থেকে আবার কল আসছে।

 

নাবিল চুম্বন থামিয়ে খানিকটা হাঁপাতে হাঁপাতে থামল। তার চোখ এখনো নেশাগ্রস্ত। সে ফোনটার দিকে এক পলক তাকাল, আর তার চেহারায় এক মুহূর্তের জন্য উদ্বেগের ছায়া ফুটে উঠল।

 

ফারিহা নাবিলের বুকের ওপর হাত রেখে জিজ্ঞেস করল, "কী হয়েছে নাবিল? কে ফোন করছে?"

 

নাবিল ফোনটা তুলে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "বোস্টন থেকে কল আসছে। হয়তো বাবার অপারেশনের তারিখ ফাইনাল হয়েছে।"

 

কিন্তু নাবিল ফোনটা কানে তুলতেই ওপাশ থেকে যা বলা হলো, তা শুনে নাবিলের হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। তার মুখের রক্তের রঙ যেন এক মুহূর্তে উবে গেল। ফারিহা উৎকণ্ঠিত হয়ে নাবিলের হাত চেপে ধরল, "কী হয়েছে নাবিল? বলো আমাকে!"

 

নাবিলের ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখটার দিকে তাকিয়ে ফারিহার বুকের ভেতরটা ছাৎ করে উঠল। ঘরের থমথমে নীরবতায় নাবিলের শ্বাসের শব্দও যেন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। নাবিল ফোনের ওপাশের কথাগুলো শেষ করে মোবাইলটা ধীরে ধীরে টেবিলের ওপর রেখে দিল।

 

"নাবিল! কী হয়েছে? বাবা ঠিক আছেন তো?" ফারিহা নাবিলের দুটো হাত চেপে ধরে ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল।

 

নাবিল একটা গভীর শ্বাস নিয়ে ফারিহার দিকে তাকাল। তার চোখের সেই মাতাল করা অনুভূতির জায়গায় এখন এক দায়িত্ববোধের তীব্র ছায়া। সে ফারিহার হাত দুটো নিজের গালের সাথে চেপে ধরে বলল, "বাবা ভালো আছেন ফারিহা। কিন্তু বোস্টনের মেডিকেল বোর্ড থেকে জানানো হয়েছে, বাবার হার্টের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তারা আগামী পরশু দিনই অপারেশনের ডেট দিয়েছেন। আমাদের কাল সকালেই প্রথম ফ্লাইটে রওনা হতে হবে।"

 

ফারিহার মনের ভেতর থেকে এক বিশাল পাথরের ভার নেমে গেল, আবার একই সাথে এক অজানা আশঙ্কা এসে ভিড় করল। সে নাবিলের বুকে মাথা গুঁজে দিল। "আমরা কালই যাব নাবিল। তুমি যা বলবে তাই হবে।"

 

নাবিল ফারিহাকে দুই বাহুতে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে চেপে ধরল। সে ফারিহার চুলে মুখ গুঁজে দিয়ে নিচু স্বরে বলল, "আমার আর কোনো ভয় নেই ফারিহা। এতদিন আমি একা এই লড়াইটা লড়ছিলাম, কিন্তু আজ তুমি আমার পাশে আছ। তোমার এই বিশ্বাসটুকুই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি।"

 

কথাটা শেষ করেই নাবিল ফারিহাকে সোজা নিজের কোলে তুলে নিল। ফারিহা আচমকা চমকে উঠে নাবিলের ঘাড় জড়িয়ে ধরল।

 

"নাবিল... কী করছ?" ফারিহা লজ্জায় রাঙা হয়ে ফিসফিস করে উঠল।

 

"যা অনেক আগে করা উচিত ছিল," নাবিল মুচকি হেসে বলল। তার চোখে তখন ভালোবাসার এক অগ্নিকাণ্ড।

 

নাবিল ফারিহাকে কোলে নিয়ে পড়ার ঘর থেকে বেরিয়ে শয়নকক্ষে নিয়ে এলো। ঘরের নরম ডিমা ডিম আলোয় চারপাশটা এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে রেখেছিল। নাবিল ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে ফারিহাকে বেডের নরম তোশকের ওপর শুইয়ে দিল।

 

ফারিহা চোখ তুলে নাবিলের দিকে তাকাল। তার এতদিন জমে থাকা সমস্ত অভিমান, সংশয় আর দূরত্ব নিমেষেই বাষ্প হয়ে গেছে। এখন কেবল রয়ে গেছে তার স্বামীর জন্য এক ব্যাকুল আকুলতা। নাবিল বেডের ওপর এক হাঁটু রেখে ফারিহার গায়ের ওপর ঝুঁকে পড়ল। তার পুরুষালী শরীরের উত্তাপ ফারিহা নিজের প্রতিটা লোমকূপে অনুভব করছিল।

 

"ফারিহা..." নাবিল ফারিহার কানের লতিতে ঠোঁট ছোঁয়াতেই ফারিহার মুখ দিয়ে হালকা একটা শিহরণের শব্দ বের হয়ে এলো।

 

নাবিলের হাত ধীরে ধীরে ফারিহার কামিজের পেছনের ফিতে আর জিপার আলগা করে দিল। ফারিহার ফর্সা, কোমল পিঠে নাবিলের উষ্ণ হাতের তালু ঘষে যেতেই ফারিহা চোখ বন্ধ করে নাবিলের চওড়া কাঁধ দুটো দু হাতে জড়িয়ে ধরল। নাবিলের তপ্ত ঠোঁট ফারিহার থুতনি, ঘাড় আর কলারবোনের ওপর গভীর স্পর্শ একে দিতে লাগল।

 

"আজ রাতে আমি তোমাকে একটুও ছাড়ব না ফারিহা," নাবিল ফারিহার ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট রেখে মাতাল কণ্ঠে বলল। "আড়াই মাসের প্রতিটা সেকেন্ডের হিসাব আজ আমি তোমার কাছ থেকে আদায় করে নেব।"

 

"আমিও আর দূরে থাকতে চাই না নাবিল... আমাকে তোমার করে নাও," ফারিহা নিজের সমস্ত লজ্জা ভুলে নাবিলের ঠোঁটে এক গভীর, তৃষ্ণার্ত প্রতিক্রিয়া জানাল।

 

সেই রাতে ঘরের চার দেয়াল সাক্ষী রইল দুটো ভাঙতে বসা হৃদয়ের এক পূর্ণাঙ্গ পূর্ণতার। অবিশ্বাসের কালো মেঘ সরিয়ে তারা দুজন মিশে গেল ভালোবাসার এক চরম অতল গভীরে। নাবিলের প্রতিটি স্পর্শে ছিল ফারিহার প্রতি তার দীর্ঘদিনের সুপ্ত আকুলতা, আর ফারিহার সারেন্ডারে ছিল স্বামীর প্রতি এক স্বর্গীয় আত্মসমর্পণ। সারাটা রাত কেটে গেল ব্যাকুল আলিঙ্গন, উত্তপ্ত নিশ্বাস আর ভালোবাসার অনুরাগে।

 

সকালের আলো যখন ধানমন্ডির ঘরের জানালায় এসে পড়ল, ফারিহা চোখ মেলে দেখল সে নাবিলের চওড়া বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে। নাবিলের এক হাত ফারিহার কোমর পেঁচিয়ে শক্ত করে ধরে রাখা, যেন ঘুমের মধ্যেও সে ফারিহাকে হারাতে চায় না। ফারিহার ঠোঁটে এক অনাবিল শান্তির হাসি ফুটে উঠল। সে হাত বাড়িয়ে নাবিলের সতেজ গাল আর দাড়িগুলো আলতো করে ছুঁয়ে দিল।

 

নাবিল চোখ না খুলেই ফারিহাকে আরও একটু নিজের দিকে টেনে নিয়ে তার কপালে চুমু খেল। "শুভ সকাল, আমার বেগম।"

 

ফারিহা হেসে ফেলল। "সকাল হয়ে গেছে নাবিল, আমাদের ফ্লাইটের তো বেশি সময় নেই!"

 

"হুম," নাবিল চোখ খুলে ফারিহার দিকে তাকাল, তার চোখে ভালোবাসার গভীর আলো। "প্যাকিং শেষ করতে হবে। আর কিছু ঘণ্টার মধ্যেই আমরা বোস্টনের উদ্দেশ্যে রওনা দেব।"

 

ঘণ্টা তিনেকের মধ্যে তারা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে গেল। ফারিহার বাবা আরিফ সাহেবকে আগেই হাসপাতালে বিশেষ এম্বুলেন্সে করে বিমানবন্দরে নিয়ে আসা হয়েছিল। তিনি নাবিল আর ফারিহাকে একসাথে হাসিমুখে হাতে হাত রেখে আসতে দেখে চোখে জল ধরে রাখতে পারলেন না।

 

সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু ইমিগ্রেশনের সমস্ত ধাপ পার হওয়ার পর, যখন তারা ফ্লাইটে ওঠার ঠিক আগের ওয়েটিং লাউঞ্জে বসেছিল, তখন হঠাৎ তিন-চারজন সুট-পরা লোক এসে নাবিলকে ঘিরে দাঁড়াল।

 

তাদের মধ্যে একজন পকেট থেকে একটা আইডি কার্ড বের করে নাবিলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "মিস্টার নাবিল মোস্তফা? আমরা স্পেশাল ক্রাইম ব্রাঞ্চ থেকে আসছি। আপনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অর্থ পাচার এবং গোপন নথিপত্র চুরির অভিযোগ আছে। আপনাকে আমাদের সাথে যেতে হবে।"

 

ফারিহা বসা থেকে এক ঝটকায় লাফিয়ে উঠল। "কী বলছেন আপনারা? এসব বাজে কথা! নাবিল আমার বাবার চিকিৎসার জন্য টাকা পাঠিয়েছে!"

 

নাবিলের মুখটা এক নিমেষে কঠিন হয়ে গেল। সে ফারিহাকে শান্ত করার জন্য তার হাতটা ধরল, কিন্তু সেই অফিসারটি বলল, "ম্যাডাম, আপনার বাবার চিকিৎসার পেছনের ফান্ড কোনো বৈধ উৎস থেকে আসেনি। মিস্টার নাবিলকে গ্রেপ্তার করার ওয়ারেন্ট আছে আমাদের কাছে।"

 

লাউঞ্জের সবাই তাদের দিকে তাকাচ্ছিল। ফারিহা নাবিলের দিকে দিশেহারা চোখে তাকাল। নাবিল ফারিহার দিকে তাকিয়ে শক্ত কণ্ঠে বলল, "ফারিহা, তুমি বাবাকে নিয়ে ফ্লাইটে ওঠো। আমি কথা দিচ্ছি, আমি সব সা

মলে নিয়ে বোস্টনে তোমার কাছে পৌঁছে যাব।"

 

কিন্তু অফিসাররা নাবিলকে হাতকড়া পরিয়ে টেনে নিয়ে যেতে লাগল। ফ্লাইটের অ্যানাউন্সমেন্ট ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে।

 

এয়ারপোর্টের ওয়েটিং লাউঞ্জের ঠান্ডা সোডিয়াম বাতির নিচে দাঁড়িয়ে ফারিহা তখন এক চরম শূন্যতায় স্থির হয়ে গেছে। একদিকে হুইলচেয়ারে বসা, মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়া বাবা; অন্যদিকে হাতকড়া পরা নাবিলের চওড়া পিঠটা পুলিশ অফিসারদের ভিড়ে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। নাবিল চলে যাওয়ার সময় শেষবার যে দৃষ্টিতে ফারিহার দিকে তাকিয়েছিল—তাতে কোনো ভয় ছিল না, ছিল কেবল ফারিহাকে বাবার সাথে বোস্টন পাঠানোর এক তীব্র মিনতি আর নিঃশব্দ আশ্বাস।

 

ফারিহার চোখের জল শুকিয়ে পাথরের মতো জমে গেল। তার ভেতরে হঠাৎ কোথা থেকে যেন এক বিশাল শক্তির সঞ্চার হলো। নাবিল তার জন্য, তার বাবার জীবনের জন্য নিজের সবকিছু বাজি রেখেছে। এখন পিছিয়ে যাওয়ার সময় নয়। ফারিহা বাবার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বিবিড় করে বলল, "বাবা, তোমাকে আমি কিছু হতে দেব না, আর নাবিলকেও আমি ওই অন্ধকারের মুখে ছেড়ে দেব না।"

 

বাবার ফ্লাইটটা ক্যাবিন অ্যাটেনডেন্টদের বিশেষ তত্ত্বাবধানে টেক অফ করানোর পরপরই ফারিহা ইমিগ্রেশনের সমস্ত বাধা অতিক্রম করে এয়ারপোর্ট থেকে সোজা বের হয়ে এলো। তার মাথা তখন কাজ করছিল না, কিন্তু এক নিমেষেই তার মনে পড়ল ধানমন্ডির সেই রহস্যময় পড়ার ঘরের কথা। বোস্টনের স্পেশাল ফান্ডের যে কাগজপত্র সে কাল রাতে দেখেছিল, সেখানেই কোনো না কোনো সত্য লুকিয়ে আছে। নাবিলকে ফাঁসানো হয়েছে, আর সেই চালটা চেলেছে খুব কাছেরই কেউ।

 

ফারিহা দ্রুত ক্যাব নিয়ে ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে ফিরে এলো। খালি ড্রয়িংরুমটা যেন কাল রাতের সেই উষ্ণতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে ওকে বিদ্ধ করছিল। কিন্তু আবেগ সামলে ফারিহা সোজা চলে গেল পড়ার ঘরে। টেবিলের ফাইলগুলো এলোমেলো হয়ে পড়েছিল। ফারিহা পাগলের মতো নথিপত্রগুলো খুঁজতে লাগল। হঠাৎ একটা গোপন ড্রয়ারের চাবি তার চোখে পড়ল। ড্রয়ারটা খুলতেই বেরিয়ে এলো কতগুলো মেলিং কপি আর নাবিলের নিজস্ব ডায়েরি।

 

কাগজপত্র পড়ে ফারিহার চোখ কপালে উঠল। নাবিল কোনো আন্তর্জাতিক অর্থ পাচারের সাথে জড়িত নয়! আসল অপরাধী নাবিলের সৎ ভাই আর তার বিজনেজ পার্টনার আরমান। আরমান দীর্ঘদিন ধরে মোস্তফা গ্রুপের ফান্ড থেকে টাকা চুরি করছিল এবং সেই দায়টা চতুরতার সাথে নাবিলের ওপর চাপানোর জন্য কিছু ভুয়া ট্রানজেকশন তৈরি করেছিল। নাবিল যখন সেটা ধরে ফেলে এবং ফারিহার বাবার চিকিৎসার জন্য নিজের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা পাঠায়, আরমান সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পুলিশকে ভুল তথ্য দেয়।

 

ফারিহা আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে শহরের প্রখ্যাত আইনজীবী ব্যারিস্টার আনিসুল হকের চেম্বারে ছুটে গেল। ফাইলগুলো আনিসুল হকের সামনে ধরতেই তিনি চশমার উপর দিয়ে ফারিহার দিকে তাকিয়ে বললেন, "ম্যাডাম, এই ডকুমেন্টগুলোই যথেষ্ট নাবিলকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য। কিন্তু ক্রাইম ব্রাঞ্চ ওকে রিমান্ডে নেওয়ার আগেই আমাদের হাইকোর্টে স্টে অর্ডার তুলতে হবে।"

 

দিনভর আইনি লড়াই, দৌড়াদৌড়ি আর পুলিশের বড় বড় কর্তাদের সাথে দরকষাকষির পর রাত তখন পৌনে এগারোটা। আদালতের জরুরি আদেশে নাবিলকে সমস্ত ভুয়া অভিযোগ থেকে সাময়িক মুক্তি দেওয়া হলো। তবে আরমান চতুরতার সাথে সব কিছু নিজের দিকে থেকে ঘুরিয়ে দিতে নাবিলকে আটক রাখার পুরো চেষ্টা চালিয়েছিল। নাবিলকে যখন লালবাগ জোনের ডিবি অফিস থেকে বের করে আনা হলো, তখন তার পরনের কালো টি-শার্টটা খানিকটা কলার ছেঁড়া, হাতের কবজিতে হাতকড়ার লাল দাগ স্পষ্ট ফুটে আছে।

 

ডিবি অফিসের লবিতেই নাবিল দাঁড়িয়ে ছিল। ফারিহাকে সেখানে দেখে সে এক মুহূর্তের জন্য যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। ফারিহা সোজা হেঁটে এসে কোনো কথার অবকাশ না দিয়ে নাবিলের চওড়া বুকে আছড়ে পড়ল।

 

নাবিল শক্ত করে ফারিহার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নিল। তার দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্লান্তি আর লড়াই যেন ফারিহার শরীরে মুখ গুজতেই বাষ্প হয়ে গেল। নাবিল ফারিহার চুলে মুখ গুঁজে নিচু, কাঁপানো গলায় বলল, "তুমি ফ্লাইট ধরোনি ফারিহা? আমি তোমাকে চলে যেতে বলেছিলাম না?"

 

"তোমাকে ওই নরকে রেখে আমি কোথায় যাব নাবিল?" ফারিহা মুখ তুলে নাবিলের চিবুকে হাত দিল, তার চোখে তখন বাঁধভাঙা জল। "যে মানুষটা আমার জন্য নিজের জীবন ছারখার করতে পারে, তাকে ফেলে রেখে চলে যাওয়ার মতো অকৃতজ্ঞ আমি নই।"

 

নাবিল ফারিহার চোখের জল নিজের ঠোঁট দিয়ে গিলে নিল। তাদের দুজনের ঠোঁট যখন ডিবি অফিসের সেই ছায়ামেঘলা করিডোরে এক হয়ে মিশে গেল, তখন চারপাশের পুলিশ কিংবা আইনি কোলাহল সব স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।

 

ফারিহার আইনজীবী আনিসুল হক মৃদু হেসে পাশ থেকে বললেন, "মিস্টার নাবিল, কেস এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি, তবে আপনার স্ত্রী যেভাবে আজ আপনার জন্য লড়েছেন—উনার সামনে আপনার আরমানের কোনো চালই টিকবে না। এবার বাড়ি যান।"

 

ক্যাবে করে ধানমন্ডির বাসায় ফেরার পথে ফারিহা এক মুহূর্তের জন্যও নাবিলের হাত ছাড়েনি। নাবিলের হাতের কবজিতে হাতকড়ার ছিলে যাওয়া লাল দাগটায় ফারিহা বারবার নিজের আঙুল আলতো করে ঘষে দিচ্ছিল। প্রতিটা স্পর্শে ছিল এক গভীর বেদনা আর অপরাধবোধের আগুন।

 

বাসায় ঢুকেই নাবিল সব লাইট বন্ধ করে দিল। ড্রয়িংরুম পেরিয়ে শয়নকক্ষে পা রাখতেই নাবিল দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিল। বেডরুমের একমাত্র ডিম লাইটের হালকা নীলচে আলো ঘরের আবহাওয়াকে এক মাতাল আকুলতায় ভরিয়ে তুলল।

 

নাবিল ফারিহাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। নাবিলের হাঁপানো শ্বাসের গরম বাতাস ফারিহার মুখে এসে লাগছিল। তার দু হাতের চওড়া তালু ফারিহার কোমর খামচে ধরল।

 

"ফারিহা..." নাবিল নিচু, নেশাক্ত গলায় ডাকল, "আজ তুমি যা করলে... আমি জানতাম না তুমি আমাকে এত গভীর থেকে ভালোবাসো।"

 

"আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি তা তুমি কাল রাতেও বোঝোনি নাবিল," ফারিহা নিজের দু হাত তুলে নাবিলের ছেঁড়া টি-শার্টের ভেতর গলিয়ে দিল। নাবিলের তপ্ত, শক্ত বুকের মাংসপেশির ছোঁয়া পেয়ে ফারিহার শরীরজুড়ে অনুরাগের আগুন জ্বলে উঠল। "আজ রাতে যদি তুমি আমাকে তোমার ভালোবাসায় পুড়িয়ে ছাইও করে দাও, তাহলেও আমি এক চুল সরব না।"

 

নাবিল আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে এক ঝটকায় নিজের ছেঁড়া টি-শার্টটা খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিল। তার মেদহীন, বলিষ্ঠ পুরুষালী শরীরটা নীলচে আলোয় চমকাচ্ছিল। নাবিল ফারিহার কামিজের ওড়না টেনে ফেলে দিয়ে তার থুতনি ধরে নিজের ঠোঁটের একদম কাছাকাছি নিয়ে এলো।

 

নাবিলের তপ্ত ঠোঁট ফারিহার ঠোঁটে নেমে আসার সাথে সাথেই ফারিহা এক তীব্র আকুলতায় সাড় দিল। আড়াই মাসের লুকানো কৌতূহল, সারাদিনের বিরহ আর ভয়ের দুঃস্বপ্ন—সবকিছু যেন এই এক গভীর চুম্বনে বিস্ফোরিত হলো। নাবিল ফারিহার কোমর ধরে এক ঝটকায় তাকে তোশকের ওপর ফেলে দিল এবং ক্ষিপ্র গতিতে তার গায়ের ওপর ঝুঁকে পড়ল।

 

নাবিলের ঠোঁট ফারিহার মুখ থেকে নেমে এলো তার গলায়, কলারবোনে, আর কামিজের আলগা হয়ে যাওয়া উন্মুক্ত কাঁধে। ফারিহা সুখে ও কামনায় কোঁকিয়ে উঠে নাবিলের চওড়া পিঠে নিজের নখ বসিয়ে দিল। নাবিলের হাতের তপ্ত স্পর্শ ফারিহার কোমরের বাঁক বেয়ে উরু ছুঁয়ে যাচ্ছিল, আর ফারিহার মেদের কোমলতা নাবিলের শক্ত শরীরের সাথে পিষে একাকার হয়ে যাচ্ছিল।

 

"নাবিল... আর কোনো দূরত্ব নয়, আজ রাতে আমাকে পুরোপুরি তোমার করে নাও..." ফারিহা হাঁপাতে হাঁপাতে ফিসফিস করে উঠল।

 

নাবিল ফারিহার দুটি হাত ধরে বেডের ওপর চাদরের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল। তাদের দুটি নগ্ন বুকের ধুকপুকানি এক ছন্দে বাজতে লাগল। নাবিল ফারিহার চোখে চোখ রেখে বলল, "আজ রাতে আমাদের মাঝে কোনো সত্য ঢাকা থাকবে না, ফারিহা। আজ রাতে আমি তোমাকে সীমানার শেষ পর্যন্ত ভালোবাসব।"

 

সে রাতে তাদের ভালোবাসা কেবল কোনো ক্ষণিকের শারীরিক চাহিদা ছিল না, তা ছিল লড়াই জিতে আসা দুটো আত্মাপীড়িত মানুষের রক্তে ফোটা অনুরাগের চরম বহিঃপ্রকাশ।

 

বোস্টনের ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের লবিতে জমে থাকা ঠান্ডার সাথে ফারিহার হৃদয়ের ভয়টা মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। বাইরের হিমশীতল হাওয়া আর বরফপাত কাঁচের জানালায় আছড়ে পড়ছে। বাংলাদেশ থেকে টানা দীর্ঘ ঘণ্টার ফ্লাইট শেষে তারা যখন এখানে পৌঁছায়, তখন আরিফ সাহেবকে তড়িঘড়ি করে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে।

 

সার্জনদের দীর্ঘ ছয় ঘণ্টার জটিল ওপেন হার্ট সার্জারি শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। প্রধান সার্জন ডক্টর মিলার থিয়েটার থেকে বেরিয়ে এসে চশমাটা খুলে বললেন, "সার্জারি সফল হয়েছে, মিস্টার নাবিল। কিন্তু পেশেন্টের জ্ঞান না ফেরা পর্যন্ত এবং আগামী চব্বিশ ঘণ্টা আমরা তাঁকে শতভাগ ঝুঁকিমুক্ত বলতে পারছি না।"

 

কথাটা শুনেই ফারিহা আইসিইউর কাঁচের দরজার বাইরে ভেঙে পড়েছিল। নাবিল এক মুহূর্তে তাকে নিজের বাহুডোরে জড়িয়ে নিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। নাবিলের চওড়া বুকের উত্তাপ আর মাস্কের মাতাল করা গন্ধ ফারিহাকে কিছুটা স্বাভাবিক করল। নাবিল ফারিহার কপালে ভিজে যাওয়া ভিজে থাকা চুলে ঠোঁট ঠেকিয়ে বলল, "বা

বা লড়ছেন ফারিহা। উনি ঠিক ফিরে আসবেন। তুমি শক্ত হও।"

 

ফারিহা নাবিলের বুকে মুখ গুঁজে বিড়বিড় করে বলল, "তুমি না থাকলে আমি আজ কোথায় ভেসে যেতাম নাবিল! এই লড়াইয়ে তুমি আমার ছায়া হয়ে আছ।"

 

হাসপাতালের ভিআইপি প্রাইভেট কেবিনে রাতটা ছিল থমথমে। বরফ ঢাকা রাত আর রুমের ভেতরের হিটারের উষ্ণ আবহাওয়ায় এক অদ্ভুত মায়াবী নেশা জমাট বেঁধেছিল। ক্লান্তিতে ফারিহার চোখ দুটো বুজে আসছিল, কিন্তু বাবার চিন্তায় সে শুতে পারছিল না। নাবিল হেঁটে এসে ফারিহার পাশে সোফায় বসল। সে ফারিহার ভিজে থাকা চোখ দুটো নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে মুছে দিল, তারপর ফারিহার মেদহীন কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে একদম নিজের কোলে টেনে বসিয়ে নিল।

 

"নাবিল... কী করছ? এটা হাসপাতাল!" ফারিহা হালকা লজ্জা পেয়ে নাবিলের বুকের টি-শার্ট চেপে ধরে বলল।

 

"হাসপাতালের কেবিন লক করা ফারিহা," নাবিল ফিসফিস করে বলল, তার গলা গভীর আর ভারী। সে ফারিহার ঘাড়ের সংবেদনশীল ত্বকে নিজের ঠোঁট নামিয়ে আনল। নাবিলের তপ্ত শ্বাসের স্পর্শ ফারিহার শরীরে এক অদ্ভুত আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে দিল। "সারাদিনের এই মানসিক ঝড় আর তোমার চোখের জল আমি আর দেখতে পারছি না। আমাকে একটু ভালোবাসতে দাও ফারিহা... তোমার এই ভালোবাসাই আমাকে সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়।"

 

ফারিহা আর কোনো প্রতিবাদ করল না। সে নিজের দু হাত দিয়ে নাবিলের পিঠ পেঁচিয়ে ধরল। নাবিলের ঠোঁট ফারিহার থুতনি, কলারবোন আর ঘাড়ের বাঁক বেয়ে তার ঠোঁটে এসে থমকে গেল। তাদের চুম্বন ছিল ধীর, গভীর আর সান্ত্বনায় ভরা। এতদূরে, এক অচেনা দেশে, এই কনকনে ঠান্ডার মাঝে তারা দুজন যেন একে অপরের পরম আশ্রয়। নাবিলের হাত ফারিহার থ্রি-পিসের ভেতরের কোমল ত্বক ছুঁয়ে যেতেই ফারিহা এক মাতাল অনুরাগে নাবিলের চুলে আঙুল ডুবিয়ে দিল। সেই নিঝুম কেবিনে তাদের শারীরিক আর মানসিক সান্নিধ্য আড়াই মাসের সব দূরত্বকে চিরতরে মুছে দিচ্ছিল।

 

কিন্তু ভোর চারটের দিকে সেই মায়াবী পরিবেশ ভেঙে খানখান হয়ে গেল।

 

নাবিলের ফোনে একটা এনক্রিপ্টেড মেসেজ এলো। ঢাকা থেকে নাবিলের বিশ্বস্ত লিগ্যাল হেড তানভীর পাঠিয়েছে। মেসেজের সাথে একটা স্ক্যান করা দলিল আর অডিও ক্লিপ যুক্ত। নাবিল দ্রুত ফারিহাকে কোলে থেকে নামিয়ে ফোনটা ল্যাপটপে কানেক্ট করল।

 

অডিও ক্লিপটা চালু করতেই স্পিকারে ভেজে উঠল মোস্তফা গ্রুপের পার্টনার আরমানের ক্ষিপ্ত কণ্ঠস্বর—"নাবিল বোস্টন পালিয়ে গেছে ভেবেছে? কিন্তু আরিফ সাহেবের নামে যে বোস্টনের হাসপাতালের ফান্ড ট্রান্সফার হয়েছে, সেখানে আমি জালিয়াতির একটা নতুন নথি তৈরি করে ইউএস ফেডারেল এজেন্সিকে মেল করে দিয়েছি। কাল সকালে ওখানকার পুলিশ নাবিলকে ইউএস মানি লন্ডারিং অ্যাক্টে অ্যারেস্ট করবে। আর ওদিকে ধানমন্ডির ফ্ল্যাট আর মোস্তফা গ্রুপের শেয়ার আমি কালই নিজের নামে লিখে নিচ্ছি!"

 

ফারিহা আতঙ্কে শিউরে উঠল। "আরমান... আরমান আবার আমাদের পিছে লেগেছে? ও বাবা আর তোমাকে শেষ করে দিতে চায়!"

 

নাবিল এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। তার চোখের তারায় এবার আর কোনো ভয় ছিল না, ছিল এক হিংস্র পশুর মতো আক্রোশ আর ধূর্ততা। সে ফারিহার দু হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "আরমান ভাবছে সে আমাকে ফাঁদে ফেলেছে। কিন্তু সে জানে না, শিকারী যখন ফাঁদ ফেলে, তখন শিকারও সুযোগ খোঁজে। ও মোস্তফা গ্রুপের শেয়ার আর ধানমন্ডির ফ্ল্যাট দখল করতে চায় তো? আমি ওকেই এবার ওর নিজের খপ্পরে ফেলব।"

 

"কী করবে তুমি নাবিল?" ফারিহা উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল।

 

"ও ব্যাংক জালিয়াতির যে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করেছে, তা ব্যবহার করার আগেই আমাদের ঢাকার আইনি টিমের মাধ্যমে আরমানের আসল ইউএস ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের হিসেবটা উন্মুক্ত করতে হবে। বোস্টনের হাসপাতালে ফান্ডটা ট্রান্সফার হয়েছিল আরমানেরই এক শেল কোম্পানির মাধ্যমে, যা ও নাবিল মোস্তফার নামে চালানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আরমান একটা ভুল করেছে ফারিহা..." নাবিল একটা কুটিল হাসি হাসল।

 

"কী ভুল?"

 

"সেই শেল কোম্পানির ৫০% ডিরেক্টরশিপের পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি আরমানের অজান্তেই আমার নামে সাইন করা ছিল, কারণ মোস্তফা গ্রুপের যৌথ চুক্তিতে এই শর্ত ছিল। আমি আজ রাতেই বোস্টন অডিটরদের মাধ্যমে সেই অ্যাকাউন্ট সম্পূর্ণ ফ্রিজ করে দেব। আরমান সকাল হতে হতে বুঝবে, সে আমাকে জেল খাটানোর চক্রান্ত করতে গিয়ে নিজের বিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্য হারাল!"

 

নাবিল আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ল্যাপটপে তার ডিজিটাল কি (Key) অ্যাক্টিভেট করল এবং আন্তর্জাতিক পুলিশ আর বোস্টনের ফেডারেল ট্রেড কমিশনকে আরমানের তৈরি জালিয়াতির আসল সূত্রগুলো ইমেইল করে দিল।

 

সকাল আটটা। বোস্টনের বাইরে তখনো মৃদু বরফ পড়ছে। হাসপাতালের আইসিইউর দরজাটা খুলে ডক্টর মিলার হাসিমুখে বেরিয়ে এলেন। "কনগ্র্যাচুলেশনস মিস্টার নাবিল! পেশেন্টের জ্ঞান ফিরেছে। তিনি একদম স্ট্যাবল। আপনি আর আপনার ওয়াইফ এখন দেখা করতে পারেন।"

 

ফারিহা খুশিতে কেঁদে ফেলে সোজা আইসিইউর দিকে দৌড়ে গেল। কিন্তু আইসিইউতে ঢোকার ঠিক আগের মুহূর্তে, নাবিলের ফোনে আবার কল এলো।

 

ঢাকা থেকে তানভীরের গলা ভেসে এলো, "ভাই! আরমানকে ধানমন্ডির বাসার সামনে থেকে ডিবি পুলিশ গ্রেফতার করেছে! ও পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু ইউএস ফ্রেডারেল এজেন্সির নোটিশের পর ঢাকার পুলিশ ওকে রেড হ্যান্ডেড ধরে ফেলেছে। মোস্তফা গ্রুপ এখন সম্পূর্ণ আপনার নিয়ন্ত্রণে!"

 

নাবিল ফোনটা রেখে ফারিহার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। ফারিহা ঘুরে তাকিয়ে নাবিলের দিকে তাকাল। দুজনের চোখে এখন কোনো ভয় নেই, কোনো রহস্য নেই, কেবল আছে এক বিজয়ের আলো আর অটুট বিশ্বাস।

 

আইসিইউর বেডে আরিফ সাহেব চোখ মেলে তাদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। নাবিল ফারিহার হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় ধরে বলল, "তোমার বাবাকে বাঁচাতে পেরেছি ফারিহা, আর আমাদের ভালোবাসাকেও জয়ী করেছি।"

 

ফারিহা নাবিলের বুকে নিজের মাথাটা চেপে রেখে বলল, "আমাদের ভালোবাসা তো সেদিনই জিতে গিয়েছিল নাবিল, যেদিন তুমি সব আলো আড়াল করে আমাকে রক্ষা করেছিলে।"

 

তারা দুজনে আরিফ সাহেবের বেডের দিকে এগিয়ে গেল।

 

ঢাকা এয়ারপোর্টের রানওয়েতে যখন চাকা ছুঁলো, তখন বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামছে। দীর্ঘ তিন সপ্তাহ বোস্টনে কাটিয়ে আরিফ সাহেবকে একদম সুস্থ শরীরে সঙ্গে নিয়ে দেশে ফিরেছে নাবিল ও ফারিহা। আইসিইউর অন্ধকার, বোস্টনের কনকনে বরফ আর আইনি লড়াইয়ের পর ঢাকা শহরের সোডিয়াম আলো যেন আজ তাদের কাছে এক নতুন জীবনের প্রতীক হয়ে ফুটে উঠেছে।

 

আরিফ সাহেবকে তাঁর গুলশানের বাসায় নামিয়ে দিয়ে, সমস্ত ক্লান্তি পেছনে ফেলে নাবিল আর ফারিহা ধানমন্ডির সেই চারতলার ফ্ল্যাটটিতে ফিরে এলো। যে ঘর একসময় সন্দেহের বরফ আর নীরবতার দেয়ালে বন্দি ছিল, আজ সেই ঘরের বাতাসে কেবলই অনুরাগের সুবাস।

 

ফ্ল্যাটের মূল দরজা খুলে ভেতরে পা রাখতেই ফারিহা কিছুটা থমকে দাঁড়াল। ড্রয়িংরুমের সবকিছু থমথমে, কিন্তু সোফার পাশের নিচু টেবিলে একটি কালচে খাম রাখা। খামের ওপর ফারিহার নাম লেখা।

 

নাবিল এগোতে গিয়েও ফারিহার থমকে যাওয়া দেখে বলল, "কী হলো ফারিহা?"

 

ফারিহা ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে খামটি তুলে নিল। ভেতরে ছিল ফারিহার বিয়ের আগের কিছু পুরানো আইনি নথিপত্র এবং একটি সংক্ষিপ্ত চিঠি। চিঠিটি আরমানের লেখা, যা সে গ্রেফতার হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে এই ফ্ল্যাটের পিয়নের মাধ্যমে রেখে গিয়েছিল।

 

চিঠিতে লেখা—"ফারিহা, তুমি ভাবছ নাবিল তোমাকে ভালোবেসে জয় করেছে? ইতিহাসটা একটু ভেবে দেখো। নাবিলের বাবা যখন তোমার বাবাকে মোস্তফা গ্রুপের শেয়ার হোল্ডার বানিয়েছিলেন, তার পেছনে ছিল এক বিশাল দেনার হিসেব। তোমার বাবা আমার বাবাকে একটি পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি সই করে দিয়েছিলেন। সেই চুক্তি অনুযায়ী, এই বিয়ে না হলে তোমাদের সমস্ত সম্পত্তি মোস্তফা গ্রুপের বাজেয়াপ্ত হয়ে যেত। নাবিল তোমাকে ভালোবেসে বিয়ে করেনি, নিজের বাবার পাপ আর বাণিজ্যিক চুক্তি ঢাকতেই তোমাকে এই ঘরে এনেছিল।"

 

চিঠির প্রতিটি শব্দ ফারিহার চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে এলো। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো—কাল রাতের সেই ফারিহা আর আজকের ফারিহা এক নয়। তার মনে সন্দেহের কোনো বিষ ছড়ালো না, বরং সে নাবিলের দিকে চিঠিটা বাড়িয়ে দিল।

 

নাবিল চিঠিটা পড়ে এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করল। তার চেহারায় এক গভীর বিষাদ আর কষ্টের ছায়া ফুটে উঠল। নাবিল নিচু স্বরে বলল, "ফারিহা... আরমান পুরো সত্য লেখেনি। এই চুক্তির কথা আমি বিয়ের মাত্র একদিন আগে জেনেছিলাম। আমি আমার বাবার ওই অন্যায়টা মানতে পারিনি বলেই নিজের নামে থাকা মোস্তফা গ্রুপের সমস্ত ব্যক্তিগত শেয়ার তোমার বাবার নামে ট্রান্সফার করার প্রসেস শুরু করি। আরমান সেটা জানতে পেরেছিল বলেই আমার পিছে উঠেপড়ে লাগে। তোমাকে ভালোবেসে কাছে পাওয়ার পেছনে আমার কোনো শর্ত ছিল না ফারিহা... শুধু ছিল তোমাকে রক্ষা করার আকুলতা।"

 

নাবিল কথা শেষ করে ফারিহার চোখ থেকে মুখ ফিরিয়ে ড্রয়িংরুমের কাঁচের জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়াল। তার চওড়া পিঠটা ক্ষোভে আর যন্ত্রণায় কাঁপছিল। সে ভেবেছিল, হয়তো এই পুরনো কাদা ছোঁড়াছুড়িতে ফারিহা আবার তার থেকে দূরে সরে যাবে।

 

কিন্তু ফারিহা পেছন থেকে হেঁটে এসে সোজা নাবিলের চওড়া পিঠ জড়িয়ে ধরল। তার দু হাত নাবিলের বুকের ওপর শক্ত করে পেঁচিয়ে গেল। ফারিহা নিজের গালটা নাবিলের পিঠে চেপে ধরে মৃদু হেসে বলল, "তুমি বড্ড বোকা নাবিল। তুমি ভেবেছ ওই আরমানের এক টুকরো বিষাক্ত চিঠি আমাদের এই গভীর অনুরাগকে ভেঙে দেবে? তোমার চোখ, তোমার হাত, তোমার প্রতিটি স্পর্শ আমাকে যা বলেছে—তার চেয়ে বড় সত্য আর এই পৃথিবীতে কিছু হতে পারে না।"

 

নাবিল এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়াল। ফারিহার চোখে তখন অটুট বিশ্বাস আর অগাধ ভালোবাসার নক্ষত্র জ্বলজ্বল করছে। নাবিল ফারিহার দু গাল নিজের চওড়া তালুতে তুলে নিল। ফারিহার মুখের ওপর নেমে আসা এলোমেলো চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিয়ে নাবিল নিচু, আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে বলল, "তুমি আমাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছ ফারিহা। তুমি না থাকলে আমি হয়তো সারাজীবন এক যান্ত্রিক, হৃদয়হীন মানুষ হয়েই বেঁচে থাকতাম।"

 

"তবে আমাকে সেই ভালোবাসার মূল্য দাও আজ রাতে," ফারিহা ফিসফিস করে বলল, তার কণ্ঠস্বরে এক মাতাল আবেদন। সে নাবিলের শার্টের কলার ধরে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল।

 

নাবিল আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে ফারিহাকে কোমর ধরে শূন্যে তুলে সোজা শয়নকক্ষের দিকে নিয়ে গেল। ঘরের সব আলো নিভিয়ে তারা কেবল একজোড়া মোমবাতি জ্বালিয়ে দিল। মোমের মৃদু, সোনালী আলোয় ঘরের চারপাশটা এক মায়াবী ও অপার্থিব রূপ ধারণ করল।

 

নাবিল ফারিহাকে তোশকের ওপর শুইয়ে দিয়ে তার ওপর ঝুঁকে পড়ল। নাবিলের মেদহীন, বলিষ্ঠ পুরুষালী শরীরের উত্তাপ ফারিহা নিজের প্রতিটা লোমকূপে অনুভব করতে লাগল। নাবিলের ঠোঁট নেমে এলো ফারিহার কপালে, গালে, আর তার পরনের লাল শাড়ির আঁচল সরিয়ে দিয়ে উন্মুক্ত ঘাড়ের সংবেদনশীল ত্বকে।

 

"ফারিহা... আজ রাতে কোনো অতীত নেই, কোনো আরমান নেই, কোনো হিসেব-নিকাশ নেই," নাবিল ফারিহার কানের লতিতে নিজের তপ্ত ঠোঁট ঘষে গদগদ কণ্ঠে বলল। "আজ রাতে শুধু তুমি আর আমি।"

 

নাবিলের হাতের আঙুলগুলো ফারিহার পিঠের শাড়ির ভাজ বেয়ে নিচে নেমে এলো। ফারিহার নরম, উষ্ণ শরীরটা নাবিলের শক্ত শরীরের স্পর্শে শিহরিত হয়ে উঠল। ফারিহা চোখ বন্ধ করে নাবিলের চুলে হাত ডুবিয়ে তাকে নিজের বুকে আরও গভীরভাবে চেপে ধরল।

 

নাবিলের গভীর স্পর্শ, তার তৃষ্ণার্ত চুম্বন আর তপ্ত নিশ্বাসের ছোঁয়ায় ফারিহা সম্পূর্ণ আত্মহারা হয়ে গেল। তাদের দুজনের হৃদস্পন্দন এক হয়ে মিশে গিয়েছিল ধানমন্ডির সেই নিঝুম ঘরের সোনালী আলোয়। এতদিন যে অবিশ্বাসের মেঘ আর বিষাদ তাদের ঘিরে রেখেছিল, তা এই এক রাতে চিরদিনের জন্য বাষ্প হয়ে উবে গেল।

 

ভোরের আলো যখন জানালার পর্দা গলে ঘরের ভেতরের তোশকে এসে পড়ল, তখন ফারিহা নাবিলের বুকে শান্তভাবে মাথা রেখে শুয়েছিল। নাবিল এক হাত ফারিহার পিঠ পেঁচিয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে, অন্য হাতটি ফারিহার আঙুলের সাথে শক্ত করে বাঁধন তৈরি করে রেখেছে।

 

ফারিহা ধীরচোখে নাবিলের শান্ত, সুন্দর মুখের দিকে তাকাল। সে নাবিলের কপালে এক আলতো চুমু এঁকে দিয়ে মনে মনে বলল, "ভুল বোঝাবুঝির নদীটা অনেক বড় ছিল নাবিল, কিন্তু তোমার ভালোবাসার জোয়ারে সেই নদী আজ সাগরে গিয়ে মিশেছে।"

 

নাবিল ঘুম ভেঙে চোখ মেলল। ফারিহার দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটে এক অনাবিল শান্তির রূপালী হাসি ফুটে উঠল। সে ফারিহাকে নিজের সাথে আরও নিবিড়ভাবে পিষে ধরে কপালে চুমু খেল।

 

"না নাবিল! আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না!" ফারিহা কান্নায় ভেঙে পড়ল।

....
👁 19