হৃদয়ের গোপন অঙ্গীকার

ফুলশয্যার রাতের সেই সুবাসটা আজও ঘরের বাতাসে কিছুটা হলেও যেন ঝুলে আছে, অথচ সময়ের হিসেবে পার হয়ে গেছে দীর্ঘ আটটি মাস। আটটা মাস—একটা ছাদের নিচে দুটো মানুষের একসাথে থাকার জন্য খুব কম সময় নয়। কিন্তু এই সুবিশাল ঘরটার চার দেয়ালের মাঝে নাবিল আর ফারিহার দূরত্বটা একদিনের জন্যও কমেনি, বরং অদৃশ্য এক দেয়াল প্রতিদিন একটু একটু করে উঁচু হয়েছে।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

ফারিহা ড্রিসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে কাচের চুড়িগুলো একের পর এক খুলে রাখছিল। কাচে কাচে লেগে তৈরি হওয়া টুংটাং শব্দটা এই নিঝুম রাতে অদ্ভুত এক বিষণ্নতা তৈরি করছে। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল সে। পরিপাটি করে আঁকা কাজল, গাঢ় রঙের লিপস্টিক, আর শাড়ির ভাঁজে নিজেকে আজ খুব অচেনা মনে হচ্ছে। যার জন্য এই সাজগোজ, সে তো ঘরের এক কোণে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে চোখ রেখে বসে আছে। যেন এই ঘরে ফারিহা নামের কোনো মানুষের অস্তিত্বই নেই।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

নাবিল চৌধুরী—পেশায় একজন সফল আর্কিটেক্ট। গাম্ভীর্য আর নীরবতা তার ব্যক্তিত্বের মূল অস্ত্র। বাহ্যিক শক্ত খোলসের আড়ালে কী লুকিয়ে আছে, তা বোঝা সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে। ফারিহা ভেবেছিল, বিয়ের পর হয়তো এই মানুষটার ভিতরের আসল রূপটা সে দেখতে পাবে। কিন্তু আট মাস পার হয়ে যাওয়ার পরও নাবিল তার কাছে এক রহস্যময় অচেনা পুরুষ ছাড়া আর কিছুই নয়।

 

"আজকেও কি সারা রাত ল্যাপটপের দিকে তাকিয়েই কাটিয়ে দেবে?" ফারিহার কণ্ঠস্বরে অভিমানের চেয়েও বেশি ছিল এক ধরনের ক্লান্তি।

 

নাবিল ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই গম্ভীর গলায় বলল, "একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের ডিজাইন ফাইনাল করতে হবে ফারিহা। কাল সকালে ক্লায়েন্টের সাথে মিটিং।"

 

ফারিহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শাড়ির আঁচলটা হাত দিয়ে চেপে ধরে সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল নাবিলের টেবিলের দিকে। ল্যাপটপের আলোয় নাবিলের ধারালো চোয়াল, পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল আর চোখের নিচে জমে থাকা হালকা কালচে দাগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মানুষটাকে এত কাছ থেকে দেখেও যেন অনেক দূরের মনে হয়।

 

"তোমার এই ক্লায়েন্ট আর প্রজেক্ট কি কখনোই শেষ হবে না নাবিল?" ফারিহার গলায় জমে থাকা ক্ষোভ এবার ফুট কেটে বের হলো। "বিয়ের পর থেকে দেখে আসছি, তুমি হয় অফিসে ব্যস্ত, না হয় এই ঘরের কোণে মুখ গুঁজে বসে আছ। আমার সাথে দুটো কথা বলার সময়ও কি তোমার নেই?"

 

নাবিল চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল। তারপর দুহাতে মুখ ঢেকে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার এই নীরবতা ফারিহাকে আরও বেশি ক্ষিপ্ত করে তোলে।

 

"তুমি চুপ করে আছ কেন? কথা বলছ না কেন?" ফারিহার গলার স্বর এবার একটু চড়ে গেল। "আমি জানি তুমি কেন আমার থেকে দূরে দূরে থাকো। তোমার জীবনে তো অন্য কেউ ছিল, তাই না? যাকে তুমি ভুলতে পারোনি, অথচ পরিবারের চাপে পড়ে আমাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছ!"

 

নাবিল হুট করে চোখ তুলে তাকাল। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য যেন কিসের এক গভীর যন্ত্রণা ফুটে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিল। মুখমণ্ডল আবার আগের মতোই থমথমে আর শক্ত হয়ে গেল।

 

"ফারিহা, ফালতু কথা বলো না। রাত অনেক হয়েছে, গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো," শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল নাবিল।

 

"ফালতু কথা?" ফারিহা তেচ্ছা হেসে উঠল। হাসিটার মাঝে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল শুধুই বুকভাঙা কষ্ট। "এটা ফালতু কথা নয় নাবিল। আমি বোকা নই। আমি প্রতিদিন দেখি, তুমি গভীর রাতে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে কার ছবি দেখো। তোমার ফোনে যখন রাত দুপুরে অচেনা নম্বর থেকে বার্তা আসে, তুমি বদলে যাও। তোমার চোখের সেই চাহনি আমি চিনি। তুমি আমাকে কোনোদিন তোমার স্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে পারোনি, কারণ তোমার মনে অন্য কারো অধিকার লেখা হয়ে গেছে।"

 

নাবিল চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ছ ফুট লম্বা মানুষটি যখন ফারিহার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল, ঘরের আবহাওয়া মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠল। ফারিহা এক পা পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু নাবিল দ্রুত হাত বাড়িয়ে ফারিহার কবজিটা ধরে ফেলল। শক্ত মুঠো, কিন্তু তাতে কোনো হিংস্রতা ছিল না—ছিল এক আকুল আকুতি, যা ফারিহার চোখ এড়িয়ে গেল তার ক্ষোভের কারণে।

 

"তুমি যা ভাবছ, বিষয়টা তেমন নয় ফারিহা," নাবিলের কণ্ঠস্বর হঠাৎ নিচু হয়ে এল, একদম বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা একটা খসখসে স্বর। "সবকিছু এতটা সহজ নয়, যতটা তুমি ভাবছ।"

 

"তাহলে সহজ করে বুঝিয়ে দাও না আমাকে!" ফারিহার চোখে জল জমে উঠেছে। সেই জল গাল বেয়ে নামার আগেই নাবিলের বুকের ওপর হাত দিয়ে তাকে ঠেলে সরানোর চেষ্টা করল সে। "কেন তুমি আমার ছোঁয়া থেকে দূরে সরে যাও? কেন তুমি মাঝরাতে জেগে উঠে দীর্ঘশ্বাস ফেলো? বল আমাকে! যদি অন্য কাউকে ভালোবেসে থাকো, তবে আমাকে কেন এই বন্দিদশায় আটকে রেখেছ? কেন প্রতিদিন আমাকে এভাবে তিল তিল করে মারছ?"

 

নাবিল ফারিহার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে জলের ধারা দেখে নাবিলের বুকের ভিতরটা যেন মোচড় দিয়ে উঠল। ফারিহার নরম কবজিটা তার মুঠির মধ্যে কাঁপছিল। ফারিহা জানে না, এই আটটা মাস ধরে নাবিল নিজের সাথে কতটা যুদ্ধ করছে। ফারিহা জানে না, প্রতিদিন রাতে যখন সে ঘুমিয়ে পড়ে, নাবিল কীভাবে তার চাঁদের মতো মুখের দিকে তাকিয়ে রাত পার করে দেয়। কীভাবে ফারিহার আলুথালু চুলে হাত বোলানোর ইচ্ছেটা বুকে চেপে ধরে সে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

 

কিন্তু কিছু কথা মুখে আনা যায় না। কিছু অনুভূতির ওপর অতীতের কালো ছায়া ফেলে রাখা থাকে, যা প্রকাশ করলে হয়তো ফারিহাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলতে হবে।

 

নাবিল ফারিহার কবজি ছেড়ে দিল। এক পা পিছিয়ে গিয়ে বলল, "আমার জীবনে তুমি ছাড়া অন্য কোনো নারী নেই ফারিহা। আর ছিলও না।"

 

"ঝুট!" ফারিহা কেঁদে ফেলল। "তুমি মিথ্যে বলছ। তোমার চোখ মিথ্যে বলছে। যদি তোমার মনে অন্য কেউ না থাকে, তবে তোমার এই দূরত্বের কারণ কী? কেন আমাদের সম্পর্কের মাঝে কোনো উষ্ণতা নেই? বিয়ের আট মাস পরও কেন আমি তোমার কাছে একজন অপরিচিত মানুষের মতো?"

 

ফারিহার প্রতিটি শব্দ নাবিলের বুকে তীরের মতো বিঁধছিল। ফারিহা ঠিকই বলেছে। একটা সম্পর্কের জন্য ভালোবাসার মতোই প্রয়োজন অনুভূতির প্রকাশ। কিন্তু নাবিল যে নিজের ভালোবাসাকেই ভয় পায়! তার ভেতরের অতীতের কোনো গোপন সত্য তাকে ফারিহার কাছে যেতে বাধা দেয়। সে চায় না তার জীবনের অশুভ বাতাস ফারিহার মতো নিষ্পাপ মেয়েকে স্পর্শ করুক।

 

"ফারিহা, প্লিজ... আজ রাতে আর কোনো কথা বলো না। তুমি গিয়ে শুয়ে পড়ো," নাবিল যেন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছিল।

 

"না, আমি আজ উত্তর না নিয়ে যাব না," ফারিহা নাছোড়বান্দা। সে নাবিলের জামার কলার চেপে ধরল। ফারিহার গায়ের বেলি ফুলের আতরের সুবাস নাবিলের নিঃশ্বাসে মিশে যেতে লাগল। এত কাছে ফারিহাকে পেয়ে নাবিলের মাথার ভেতরের সমস্ত সংযমের বাঁধ যেন ভেঙে যেতে চাইল।

 

নাবিল ফারিহার কোমরে হাত দিয়ে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। মুহূর্তের মধ্যে ফারিহার সাথে তার দূরত্ব শূন্যে নেমে এল। ফারিহা চমকে উঠে নাবিলের মুখের দিকে তাকাল। নাবিলের চোখের গহীনে আজ আর সেই গাম্ভীর্য বা গাম্ভীর্যের বরফ নেই—সেখানে জ্বলছে এক তীব্র, ব্যাকুল তৃষ্ণা।

 

"তুমি সত্যিই জানতে চাও ফারিহা, কেন আমি তোমার থেকে দূরে থাকি?" নাবিলের ফিসফিসে কণ্ঠ ফারিহার কানে এসে বাজল। নাবিলের তপ্ত নিঃশ্বাস ফারিহার গালে, ঘাড়ে গিয়ে আছড়ে পড়ছিল। ফারিহার বুকটা দ্রুত ওঠানামা করতে শুরু করল। রাগ, অভিমান আর তীব্র অনুভূতির এক অদ্ভুত মিশেল তার পুরো শরীরে বিদ্যুতের মতো খেলে গেল।

 

"নাবিল..." ফারিহা নামটুকু উচ্চারণ করতেই পারল না, তার আগেই নাবিল তার বুড়ো আঙুল দিয়ে ফারিহার ঠোঁট স্পর্শ করল।

 

"তুমি জানো না ফারিহা, তোমাকে এত কাছে পাওয়ার পর নিজেকে ধরে রাখা আমার জন্য কতটা কষ্টের," নাবিল ফারিহার গালে হাত রাখল। তার আঙুলের স্পর্শে ফারিহার শরীর শিহরিত হয়ে উঠল। "কিন্তু আমি তোমাকে অসম্পূর্ণ কোনো ভালোবাসা দিতে চাইনি। আমি চেয়েছিলাম আগে আমার বুকের ভেতরের সেই বিষাক্ত সত্যটাকে শেষ করতে, যা আমাকে রাতে ঘুমাতে দেয় না।"

 

ফারিহার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। "কিসের সত্য নাবিল? কী লুকাচ্ছ তুমি আমার কাছে?"

 

নাবিল জবাব দিল না। ফারিহার চোখের কোণ থেকে গড়িয়ে পড়া একবিন্দু জল সে নিজের ঠোঁট দিয়ে মুছে দিল। স্পর্শটা এতই গভীর আর গভীর আবেগে ভরা ছিল যে, ফারিহার পুরো শরীর অবশ হয়ে এল। এতদিন ধরে জমে থাকা সব অভিমান যেন নাবিলের এই একটি স্পর্শে বাষ্প হয়ে উড়ে যেতে লাগল। কিন্তু একই সাথে, নাবিলের চোখের গভীরে ফুটে ওঠা সেই রহস্যময় কষ্ট ফারিহার মনে এক অজানা ভয়ের জন্ম দিল।

 

নাবিল ফারিহাকে আলতো করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। ফারিহা শুনতে পাচ্ছিল নাবিলের হৃদপিন্ডের দ্রুত স্পন্দন। এত তীব্র অনুভূতির প্রকাশ ফারিহা আগে কখনো নাবিলের মাঝে দেখেনি।

 

"আজ নয় ফারিহা," নাবিল ফারিহার চুলে মুখ গুঁজে ফিসফিস করে বলল, "খুব শিগগিরই তুমি সব সত্যি জানতে পারবে। কিন্তু তার আগে তোমাকে বিশ্বাস করতে হবে, এই বুকে যদি কারো নাম লেখা থাকে, তবে সেটা শুধু তোমার।"

 

নাবিল ফারিহাকে ছেড়ে দিল, কিন্তু তার চোখের চাহনিতে রয়ে গেল এক অদ্ভুত প্রতিশ্রুতি। ফারিহা সেখানে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নাবিল টেবিল থেকে তার ফোনের ড্রয়ারের চাবিটা তুলে নিল। তারপর আলমারির একদম নিচের গোপন ড্রয়ারটা খুলল।

 

ফারিহা দেখল, ড্রয়ারের ভেতর রাখা আছে একটা পুরনো কাঠের বাক্স আর কিছু নথিপত্র। নাবিল সেই বাক্সের দিকে তাকিয়ে এক গভীর শ্বাস নিল। ফারিহা বুঝতে পারল, এই বাক্সের ভেতরেই লুকিয়ে আছে তাদের এই ভাঙা-গড়ার মূল রহস্য। যে সত্যিটা আজ রাতে প্রকাশ পেতে চলেছে, তা তাদের সম্পর্ককে ভালোবাসার এক চরম মুহূর্তে নিয়ে যাবে, না

কি চিরতরে ধ্বংস করে দেবে—সেটা ভাবতেই ফারিহার বুকটা কেঁপে উঠল।

 

রাত তখন অনেক। বাইরে রিমঝিম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। টিনের চাল না থাকলেও, জানালার কাচে বৃষ্টির ফোটা আছড়ে পড়ার শব্দটা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। এই কালবৈশাখীর রাতে ঘরের ভিতরের পরিস্থিতিও ঝড়ের রূপ নিতে যাচ্ছে।

 

বাইরের বৃষ্টির শব্দটা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। জানালার কাচ চুইয়ে জলের ধারা গড়িয়ে পড়ছে নিচের দিকে, যেন ঘরের ভেতরের জমে থাকা দমবন্ধ নীরবতাকে কাটিয়ে ওঠার এক আকুল চেষ্টা। ঘরের মধ্যখানে টেবিলের ওপর রাখা পুরনো মেহগনি কাঠের বাক্সটা যেন এক জীবন্ত রহস্যের মতো দাঁড়িয়ে আছে। লালচে আলোয় বাক্সটির ওপরের খোদাই করা নকশাগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

 

ফারিহা নিশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। তার হৃদস্পন্দনের শব্দ নিজের কানেই ভারী হয়ে বাজছে। নাবিল চাবিটা হাতে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল। তার আঙুলগুলো সামান্য কাঁপছিল, যা সচরাচর গম্ভীর আর আত্মবিশ্বাসী নাবিল চৌধুরীর ক্ষেত্রে একেবারেই অবিশ্বাস্য।

 

"নাবিল..." ফারিহার গলার স্বর বুজে এল, "যদি এই বাক্সটা খুললে আমাদের মাঝে আরও বড় কোনো দেয়াল তৈরি হয়, তবে থাক। আমার আর কিছু জানার দরকার নেই।"

 

ফারিহার কথায় নাবিল হালকা মুখ তুলে তাকাল। তার চোখে তখন এক অদ্ভুত বিষাদ আর গভীর এক ভালোবাসার আলো জ্বলছে। সে ধীরে ধীরে হেঁটে এসে ফারিহার একদম মুখোমুখি দাঁড়াল। ফারিহার থুতনিটা নিজের ডান হাতের দুটি আঙুল দিয়ে আলতো করে ওপরে তুলল। নাবিলের স্পর্শে ফারিহার ভেতরের সমস্ত সংশয় এক মুহূর্তে থমকে গেল।

 

"দেয়াল আর নতুন করে তৈরি হবে না ফারিহা," নাবিল খুব নিচু কিন্তু গভীর স্বরে বলল, "যে দেয়াল এতদিন আমাদের মাঝে ছিল, সেটাকে আজ গুঁড়িয়ে দেওয়ার সময় এসেছে। তুমি আমাকে ভুল বুঝেছ, তাতে আমার কোনো কষ্ট নেই। কষ্ট শুধু এটাই, আমি তোমাকে বোঝাতে পারিনি যে এই হৃদয়ে তোমার স্থান কোথায়।"

 

নাবিল বাক্সের তালাটিতে চাবি ঘোরাল। একটা মৃদু শব্দ করে তালাটি খুলে গেল। ঢাকনাটা তুলতেই ভেতরে রাখা কয়েকটা পুরনো খাম, একটা ডায়েরি আর কিছু আইনি নথিপত্র বেরিয়ে এল। বাক্সটি খুলতেই একটা শুকনো বেলি ফুলের মৃদু সুবাস আর পুরনো কাগজের গন্ধ ভেসে এল ঘরের বাতাসে।

 

নাবিল একটা হলুদ হয়ে যাওয়া খাম তুলে নিল। তারপর সেটা ফারিহার দিকে বাড়িয়ে দিল।

 

"এটা পড়ো," নাবিল শান্ত গলায় বলল, "যে নামহীন ছায়াকে তুমি আমার জীবনে তৃতীয় ব্যক্তি মনে করতে, এটা তার পরিচয়।"

 

ফারিহা কাপা কাঁপা হাতে খামটা নিল। ভেতর থেকে চিঠিটা বের করতেই তার নজর গেল নিচের তারিখের দিকে—আজ থেকে ঠিক চার বছর আগের। চিঠিটি কোনো নারীর লেখা নয়, বরং একটা হাসপাতালের অফিশিয়াল রিপোর্ট আর একটি অঙ্গীকারনামা। চিঠিটি লিখেছেন নাবিলের মরহুম বাবা, যিনি তিন বছর আগে মারা গেছেন।

 

চিঠির প্রতিটা লাইন পড়তে পড়তে ফারিহার চোখের পাতা স্থির হয়ে গেল। চিঠিতে স্পষ্ট লেখা আছে, নাবিলের বাবার ব্যবসায়িক ভুলের কারণে তাদের পুরো পরিবার একসময় দেউলিয়া হতে বসেছিল। আর সেই কঠিন সময়ে নাবিলের বাবাকে আইনি ও আর্থিকভাবে রক্ষা করতে গিয়ে নাবিলের এক নিকট আত্মীয় নিজের সমস্ত সম্পত্তি বন্ধক রেখেছিলেন। কিন্তু সেই আত্মীয়ের অকালমৃত্যুর পর তার ঋণ পরিশোধের সমস্ত দায়ভার এসে পড়ে নাবিলের ঘাড়ে। নাবিলের বাবা মৃত্যুর আগে নাবিলকে একটা চরম কসম দিয়ে গিয়েছিলেন—যেকোনো মূল্যে সেই ঋণ শোধ করতে হবে এবং সেই আত্মীয়ের রেখে যাওয়া একমাত্র অনাথ ছোট বোনটির সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিতে হবে, যার পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নাবিলের ওপর নির্ভর করছে।

 

ফারিহা চোখ তুলে তাকাল। "তার মানে... তুমি যাকে গোপনে টাকা পাঠাতে, যার সাথে গভীর রাতে ফোনে কথা বলতে..."

 

"সে আমার ছোট বোনের মতো, ফারিহা," নাবিল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফারিহার আরও কাছে এল। সে ফারিহার দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল। "রাহাত চাচা যখন মারা যান, তার মেয়ে মালিহা তখন মাত্র বারো বছরের এক এতিম শিশু। আমার বাবা মৃত্যুর আগে আমার হাত ধরে কসম খাইয়েছিলেন, আমি যেন মালিহাকে নিজের বোনের মতো আগলে রাখি এবং রাহাতের ঋণ শোধ করি। মালিহা এখন মালয়েশিয়ায় পড়াশোনা করছে। তার হোস্টেল ফি, চিকিৎসার খরচ—সব দায়িত্ব আমাকেই পালন করতে হয়। আমি রাতের পর রাত জেগে ক্লায়েন্টদের বাড়তি কাজ করতাম শুধু সেই ঋণ আর খরচগুলো মেটানোর জন্য।"

 

ফারিহার হাতের বাঁধন আলগা হয়ে এল। তার চোখের কোণ বেয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল নাবিলের হাতের ওপর। "তাহলে... তুমি আমাকে এ কথা আগে বলোনি কেন? কেন নিজেকে এত একা করে রেখেছিলে?"

 

"কীভাবে বলতাম ফারিহা?" নাবিলের গলায় আকুলতা ঝরে পড়ল। সে ফারিহার গালের ওপর গড়িয়ে পড়া চোখের জলটুকু নিজের আঙুল দিয়ে মুছে দিল। তার স্পর্শে ছিল এক ব্যাকুল তৃষ্ণা। "আমাদের বিয়ের সময় আমার মাথায় কয়েক কোটি টাকার ঋণের বোঝা ছিল। আমি জানতাম না আমি এই সংকট থেকে বের হতে পারব কি না। আমি ভয় পেতাম, তোমাকে আমার জীবনের এই অভিশাপের অংশ বানাতে। আমি চাইনি আমার কষ্টের ছায়া তোমার ওপর পড়ুক। তাই আমি তোমার থেকে দূরত্ব বজায় রাখতাম, যাতে তুমি আমার প্রতি আসক্ত না হয়ে পড়ো... যদি কোনোদিন আমি সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে যাই, তবে যেন তোমাকে মুক্তি দিতে পারি।"

 

"তুমি কতটা বোকা নাবিল!" ফারিহা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে দুই হাতে নাবিলের জামার কলার শক্ত করে চেপে ধরল। তার বুকের ভেতরের জমে থাকা আট মাসের ক্ষোভ আর ভালোবাসা এক হয়ে বেরিয়ে এল। "তুমি মনে করেছ আমি শুধু তোমার রূপ আর টাকাকড়ি দেখে তোমাকে বিয়ে করেছি? একটা মেয়ে যখন কারো সাথে বাঁচার স্বপ্ন দেখে, সে তার সুখের পাশাপাশি তার দুঃখের অংশীদারও হতে চায়! তুমি আমাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছ, কিন্তু অর্ধাঙ্গিনী ভাবোনি!"

 

নাবিল ফারিহার আকুলতা দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল। ফারিহার চোখে আজ আর কোনো সন্দেহ নেই, আছে কেবল ভালোবাসার এক অগাধ সমুদ্র। নাবিল আর সামলাতে পারল না নিজেকে। সে এক হ্যাঁচকায় ফারিহাকে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিল।

 

নাবিলের বাহু দুটি ফারিহার কোমর শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল। তাদের বুকের ধুকপুকানি যেন একে অপরের সাথে মিশে এক হয়ে গেল। ফারিহা নাবিলের বুকে মুখ গুঁজে কেঁদে ফেলল। আট মাসের জমানো বরফ গলে একাকার হয়ে যাচ্ছে এই ঝোরের রাতে।

 

"আমাকে ক্ষমা করে দাও ফারিহা," নাবিল ফারিহার চুলে মুখ গুঁজে ফিসফিস করে বলল। তার তপ্ত নিশ্বাস ফারিহার ঘাড়ে আছড়ে পড়ছিল। "আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি। প্রতিদিন তোমাকে এত কাছে দেখেও হাত বাড়িয়ে ছুঁতে না পারার যন্ত্রণায় আমি প্রতি রাতে তিল তিল করে জ্বলেছি। তুমি যখন ঘুমিয়ে পড়তে, আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। আমার ইচ্ছে করত তোমাকে বাহুডোরে আটকে রেখে সারা রাত তোমার ওই মিষ্টি ঠোঁটে ভালোবাসার পরশ এঁকে দিই। কিন্তু আমার ভয়ে আমি নিজেকে আটকে রেখেছিলাম।"

 

নাবিলের এই অনাবিল স্বীকারোক্তি ফারিহার পুরো শরীরে এক অদ্ভুত ভালোলাগার অনুভূতির সৃষ্টি করল। ফারিহা মাথা তুলে নাবিলের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে আজ কোনো লুকোচুরি নেই, আছে এক গভীর আদিম তৃষ্ণা আর অগাধ প্রেম।

 

নাবিল ফারিহার মুখটি দুহাতে তুলে ধরল। তার চোখ দুটি ফারিহার গোলাপী ঠোঁটের ওপর এসে আটকে গেল।

 

"এখনও কি তোমার মনে হয় আমার হৃদয়ে অন্য কেউ আছে?" নাবিলের কণ্ঠস্বর কাঁপছিল।

 

ফারিহা কোনো কথা বলল না। সে কেবল আলতো করে মাথা নেড়ে 'না' বোঝাল। তার চোখের পলকে ফুটে উঠল এক নীরব সম্মতি।

 

নাবিল আর দেরি করল না। সে ফারিহার কপালের ওপর নিজের ঠোঁট স্পর্শ করল। এক দীর্ঘ, গভীর চুমু। ফারিহা চোখ বন্ধ করে ফেলল, তার শরীরটা হালকা কাঁপছিল। নাবিলের ঠোঁট কপাল থেকে নেমে এল তার চোখের পাতায়, গালে, আর তারপর থুতনিতে। ফারিহা নাবিলের কাঁধ শক্ত করে ধরে নিজেকে সঁপে দিল সেই ব্যাকুল আবেগের স্রোতে।

 

বাইরের কালবৈশাখী ঝড় তখন আরও প্রলয়ংকরী হয়ে উঠেছে, কিন্তু এই বন্ধ ঘরের ভেতরে এখন আর কোনো ঝড় নেই। সেখানে কেবল দুটো তৃষ্ণার্ত আত্মার মিলন ঘটতে যাচ্ছে।

 

নাবিল ফারিহাকে আলতো করে কোলে তুলে নিল। ফারিহা তার গলা জড়িয়ে ধরে বুকের মাঝে মুখ লুকাল। বিছানার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে নাবিল অনুভব করল, আজ রাতে তাদের জীবনের নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে—যেখান থেকে ফিরে আসার আর কোনো পথ নেই।

 

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে, ঘরের টেবিলে রাখা নাবিলের ফোনটা ভীষণ জোরে কেঁপে উঠল। আর ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল এক অচেনা নম্বর, যা এই গভীর রাতে এক নতুন ঝড়ের ইঙ্গিত দিচ্ছিল...।

 

ফোনের কর্কশ শব্দে ঘরের মেহগনি কাঠের আসবাবগুলোও যেন এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল।

 

নাবিল ফারিহাকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে আলতো হাতে তার কপাল স্পর্শ করল। ফারিহার চোখে তখনও নেশাগ্রস্তের মতো ব্যাকুলতা, নাবিলের স্পর্শে তার পুরো শরীর শান্ত এক আবেশে থমকে আছে। কিন্তু ফোনের ক্রমাগত স্পন্দন সেই মায়াবী মুহূর্তটাকে এক লহমায় গুঁড়িয়ে দিল।

 

নাবিল একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। ফারিহা বিছানার চাদরটা হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে তাকাল নাবিলের পিঠের দিকে। ক্ষণিকের জন্য ফারিহার মনে হলো, সুখের এত কাছাকাছি এসেও যেন বারবার কোনো অজানা ভাগ্য তাদের মাঝখানে প্রাচীর তুলে দিচ্ছে।

 

ল্যাপটপের পাশে রাখা ফোনটা হাতে নিতেই নাবিলের ভ্রু কুঁচকে গেল। স্ক্রিনে কোনো নাম নেই, শুধু একটা অচেনা বিদেশি নম্বর ভেসে উঠছে। নম্বরটা দেখে নাবিলের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, চোখের কোণে ফুটে উঠল এক গভীর উদ্বেগ।

 

"কে ফোন করেছে এই রাতে, নাবিল?" ফারিহার বুজে আসা কণ্ঠে স্পষ্ট শঙ্কা।

 

নাবিল সঙ্গে সঙ্গে কলটা রিসিভ করল না। সে কয়েক মুহূর্ত ফারিহার দিকে তাকাল, তারপর ফোনের স্পিকার বন্ধ করে স্পেশাল এনক্রিপ্ট অ্যাপে কলটা ধরে কান থেকে কিছুটা দূরে রাখল। ওপাশ থেকে একটা উত্তেজিত এবং হাঁপাতে থাকা কণ্ঠ ভেসে এল।

 

"নাবিল ভাই! মালিহা বলছি... ওরা আমাদের বাসার নিচে চলে এসেছে! পুলিশ সেজে কয়েকজন লোক ঢোকার চেষ্টা করছে। আমি খুব ভয় পাচ্ছি নাবিল ভাই!"

 

মালিহার কান্নার শব্দে ঘরের ভেতরের শান্ত আবহাওয়া মুহূর্তে হিম হয়ে গেল। নাবিল এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "মালিহা, শান্ত হও। একদম প্যানিক করবে না। ঘরের ভেতরের সিকিউরিটি লক অন করে দাও। ব্যালকনির লাইট বন্ধ করে ভেতরের সেফ রুমে ঢুকে যাও। আমি এখনই লোক পাঠাচ্ছি।"

 

কলটা কেটে দিয়েই নাবিল দ্রুত কয়েকটা নম্বর ডায়াল করতে শুরু করল। তার আঙুলের গতি আর গম্ভীর ফিসফিসানি নির্দেশ করছিল, পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ।

 

ফারিহা বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সে ধীর পায়ে নাবিলের পেছনে এসে দাঁড়াল। মালিহার গলার স্বর সে-ও শুনতে পেয়েছে। নাবিলের দায়িত্ববোধ আর এই গভীর রাতের সংকট—সবকিছু মিলিয়ে ফারিহার ভেতরের সমস্ত অভিমান বা চাওয়া-পাওয়া এক লহমায় মিলিয়ে গেল।

 

"কী হয়েছে নাবিল? মালিহা ঠিক আছে তো?" ফারিহা নাবিলের বাহুতে হাত রাখল।

 

নাবিল ফোনটা পকেটে রেখে ফারিহার দিকে ঘুরল। তার চোখে ভালোবাসার গভীরতার পাশাপাশি এখন ফুটে উঠেছে চরম দায়িত্ব আর দুশ্চিন্তার ছায়া। সে ফারিহার দুহাত নিজের হাতের তালুতে নিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল।

রাহাত চাচার যে পুরনো দেনাগুলো ছিল, সেগুলোর পেছনে আসলে কোনো সাধারণ মহাজন ছিল না," নাবিল নিচু স্বরে বলল, "ওটা ছিল একটা আন্তর্জাতিক পাচারকারী সিন্ডিকেটের ব্ল্যাকমেইল মানি। বাবা মারা যাওয়ার আগে সবটা বুঝতে পেরেছিলেন, কিন্তু দেরি হয়ে গিয়েছিল। মালিহা যে মালয়েশিয়ার যে ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে, সেখানে ওই চক্রের নজর পড়েছে। ওরা চায় রাহাত চাচার সিক্রেট ডায়ারিটা, যা আমার কাছে ওই কাঠের বাক্সে আছে।"

 

ফারিহার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। "তার মানে... তুমি এতদিন ধরে এই বিপজ্জনক গোপনীয়তা নিজের বুকে চেপে রেখেছ? আর আমি ভেবেছি তুমি আমাকে গুরুত্ব দাও না?"

 

নাবিল ফারিহার গালে হাত রেখে আলতো স্পর্শে আঙুল বোলাল। "তোমাকে নিরাপদে রাখাই আমার সবচেয়ে বড় গুরুত্ব ছিল, ফারিহা। আমি চাইনি এই বিষাক্ত ছায়া কোনোদিন তোমাকে স্পর্শ করুক। কিন্তু আজ রাতে ওরা মালিহাকে ভয় দেখিয়ে ওই ফাইলগুলো হাসিল করতে চাইছে।"

 

নাবিল ড্রয়ার থেকে একটি বিশেষ পেনড্রাইভ আর কিছু ফাইল বের করে দ্রুত নিজের ওভারকোটের পকেটে পুরে নিল। ফারিহা নাবিলের শার্টের আচল ধরে টেনে ধরল।

 

"তুমি কোথায় যাচ্ছ?" ফারিহার গলায় কান্না আর আতঙ্কের সুর। "এই ঝড়ের রাতে তোমাকে আমি যেতে দেব না! ওদের কোনো ভরসা নেই, নাবিল!"

 

নাবিল ফারিহার খুব কাছাকাছি এল। তার তপ্ত নিঃশ্বাস ফারিহার কপালে আছড়ে পড়ল। সে আলতো করে ফারিহার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট টিপে ধরল—ছোট্ট, কিন্তু এক অবিশ্বাস্য আবেগে ভরা চুমু।

 

"আমাকে যেতেই হবে ফারিহা," নাবিল ফারিহার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, "যাকে বোন বলে ছায়া দিয়েছি, তাকে বিপদে ফেলে এই ঘরে আমি শান্তিতে তোমার সাথে ভালোবাসার উৎসব করতে পারি না। তুমি আমার শক্তি, ফারিহা। তুমি ভেঙে পড়লে আমি হেরে যাব।"

 

ফারিহা নাবিলের বুকের ওপর মুখ রাখল। নাবিলের শরীরের উষ্ণতা আর তার ধুকপুকানি ফারিহাকে এক অদ্ভুত সাহস দিল। ফারিহা চোখ মুছে নাবিলের চোখের দিকে তাকাল।

 

"আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব নাবিল," ফারিহার গলার স্বর এবার বেশ দৃঢ়। "তুমি মালিহাকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করো। কিন্তু প্রমিস করো, তুমি নিজেকে কোনো বিপদে ফেলবে না।"

 

নাবিল মুচকি হাসল—যে হাসিতে ছিল পরম তৃপ্তি আর গভীর অনুরাগ। সে ফারিহার কপালে শেষবারের মতো ঠোঁট ছুঁইয়ে দরজার দিকে পা বাড়াল।

 

দরজা খুলে বাইরে পা রাখার ঠিক আগের মুহূর্তে নাবিল পেছনে ফিরে তাকাল। ল্যাম্পের আলোয় ফারিহাকে এক অপরূপা দেবীর মতো মনে হচ্ছে, যার চোখে তার জন্য সীমাহীন ভালোবাসা আর অপেক্ষা।

 

"ঘর ভেতরের দিক থেকে লক করে দাও ফারিহা," নাবিল বলল, "আজ রাতের ঝড় থামলেই আমি ফিরব। আর তারপর... আমাদের মাঝে কোনো অতীত, কোনো রহস্য বা দূরত্ব অবশিষ্ট থাকবে না।"

 

দরজা বন্ধ হয়ে গেল। ঘরে আবার নেমে এল সেই নিঝুম নীরবতা। বাইরে ঝড়ের তাণ্ডব তখনও কমেনি। বৃষ্টির ফোটাগুলো জানালার কাচে আছড়ে পড়ছে অনবরত।

 

ফারিহা ধীর পায়ে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিচে একটা কালো গাড়ি দ্রুত গতিতে রাজপথ ধরে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল। ফারিহা বুকজুড়ে হাত জড়িয়ে ওপরের দিকে তাকাল। তার মনে এক অচেনা ভয় আর ভালোবাসার তীব্র তোলপাড়।

 

টেবিলের ওপর এখনও খোলা পড়ে আছে সেই মেহগনি কাঠের বাক্সটা। ফারিহা বাক্সের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ভেতরে চোখ পড়তেই সে দেখতে পেল, নথিপত্রগুলোর একদম নিচে একটা ছোট নীল খাম পড়ে আছে, যা এতক্ষণ নাবিলের বা ফারিহার নজরে আসেনি।

 

ফারিহা খামটা হাতে নিল। খামের ওপর লেখা রয়েছে: "ফারিহার জন্য—যদি আমি কখনো মুখ ফুটে বলতে না পারি।"

 

ফারিহার বুকটা কেঁপে উঠল। সে কাঁপা হাতে খামটা ছিঁড়ে ভেতরের চিরকুটটা বের করল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের বিজলি বাতিটা দপ করে নিভে গেল, পুরো ঘর ডুবে গেল এক ঘন আঁধারে...।

 

আঁধারটা যেন মুহূর্তের মধ্যেই পুরো ঘরটাকে গিলে খেল। শুধু জানালার কাচ ভেদ করে আসা দূরের ল্যাম্পপোস্টের হালকা ঝাপসা আলো ফারিহার মুখের ওপর এসে পড়ছিল। বাইরে ঝড়ের তীব্রতা আরও বেড়েছে; বিদ্যুতের চমকানিতে মাঝে মাঝেই পুরো ঘরটা এক পলকের জন্য আলোয় ভেসে উঠছে, আবার নিমেষেই ডুবে যাচ্ছে ঘুটঘুঁটে অন্ধকারে।

 

ফারিহা মেঝের ওপর বসে পড়ল। তার হাতে সেই নীল খাম থেকে বের করা চিরকুটটা। বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে অনবরত। ফোনটা বের করে ইমার্জেন্সি ফ্ল্যাশলাইটটা অন করল সে। মোবাইলের সেই সরু আলোতে চিরকুটের ওপর নাবিলের পরিচিত সোজা সোজা হাতের লেখাগুলো ফুটে উঠল।

 

চিঠিটা পড়ার সময় যেন নাবিলের সেই গম্ভীর, অথচ প্রচ্ছন্ন ব্যাকুলতায় ভরা স্বরটা ফারিহার কানে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল—

 

"ফারিহা,

আমি জানি না এই চিঠিটা কোনোদিন তোমার হাতে পৌঁছাবে কি না। হয়তো পৌঁছাবে সেই দিন, যখন আমি আর আমার গোপনীয়তার ভার সহ্য করতে পারব না, অথবা যেদিন তুমি আমাকে পুরোপুরি ভুল বুঝে চিরতরে দূরে চলে যাবে। আমি মুখে কোনোদিন অনুভূতির প্রকাশ ঘটাতে পারিনি। শব্দগুলো আমার গলায় এসে আটকে যায়। কিন্তু আজ সত্যিটা লিখে যেতে চাই।

 

তোমাকে প্রথম যেদিন আমাদের পারিবারিক এক অনুষ্ঠানে দেখেছিলাম, সেদিনই বুঝেছিলাম ভালোবাসা কাকে বলে। তোমার ওই প্রাণোচ্ছল হাসি, তোমার চোখ—সবকিছু আমাকে এক নিমেষে ভুলিয়ে দিয়েছিল আমার চারপাশের কঠিন বাস্তবতাকে। কিন্তু ঠিক তার পরপরই বাবার সেই অশুভ দেনা আর দায়িত্বের পাহাড় আমার কাঁধে এসে পড়ে। আমি জানতাম, আমার জীবন একটা বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। এমন পরিস্থিতিতে তোমাকে বিয়ে করাটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বার্থপরতা।

 

কিন্তু আমি লোভ সামলাতে পারিনি ফারিহা। তোমাকে নিজের করে পাওয়ার লোভ আমি সংবরণ করতে পারিনি। তাই পরিবার যখন আমাদের বিয়ের প্রস্তাব আনল, আমি এক বাক্যে রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, তোমাকে আমার ছায়ায় এনে নিরাপদে রাখব। কিন্তু বিয়ের পর যখন দেখলাম আমার ওপর চেপে থাকা বিপদ আর ঋণের ছায়া তোমার ওপর পড়তে পারে, তখন ভয়ে পিছিয়ে গেলাম। তোমাকে নিজের কাছে টেনে নিলে যদি তোমাকে হারিয়ে ফেলি? এই ভয়েই আমি তোমার থেকে দূরত্ব তৈরি করেছি।

 

প্রতিটি রাতে তুমি যখন ঘুমিয়ে পড়তে, আমি তোমার চুলগুলো ছুঁয়ে দিতাম। তোমার কপালে নিঃশব্দে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলতাম—'আমাকে ক্ষমা করে দাও।' আমি তোমাকে ভালোবেসেছি ফারিহা, কোনো শর্ত ছাড়া, কোনো চাওয়া ছাড়া। কিন্তু আমার অপরাধ, আমি তোমাকে সেই ভালোবাসার অধিকারটুকু দিতে পারিনি। যদি কখনো আমাকে ক্ষমা করতে পারো, তবে বুঝে নিও—এই নাবিল চৌধুরীর প্রতিটি নিঃশ্বাস শুধু তোমারই নাম জপেছে..."

 

চিঠিটা পড়া শেষ হতে হতে ফারিহার চোখের জলে চিরকুটের কালি কিছুটা লেপে গেল। মোবাইল হাত থেকে খসে মেঝের ওপর পড়ে গেল। ফারিহা দুহাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠল।

 

কত বড় ভুল বুঝেছিল সে এই মানুষটাকে! যে মানুষটা নিজের সব কষ্ট, সব বিপদ বুকচাপা দিয়ে তাকে আগলে রাখতে চেয়েছে, তাকে সে ভেবেছে কঠোর, হৃদয়হীন আর বিশ্বাসঘাতক! নাবিল তাকে আঘাত দেয়নি, বরং নিজেকে তিল তিল করে শেষ করেছে ফারিহাকে এক অচেনা বিপদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য।

 

হঠাৎ মেঝের ফোনটা আবার জোরে কেঁপে উঠল।

 

ফারিহা দ্রুত চোখের জল মুছে ফোনটা হাতে নিল। নাবিলের নম্বর! ফারিহা সাথে সাথে কলটা রিসিভ করে কান ধরল।

 

"নাবিল! নাবিল, তুমি কোথায়? তুমি ঠিক আছো তো?" ফারিহার গলায় আকুলতা ঝরে পড়ল।

 

ওপাশ থেকে নাবিলের হাঁপানোর শব্দ ভেসে এল। বৃষ্টির শব্দ আর গাড়ির হর্নের সাথে সাথে নাবিলের কণ্ঠস্বরটা বেশ কাঁপছিল।

 

"ফারিহা... আমি ঠিক আছি," নাবিল বলল। তবে তার গলার স্বরে এক অদ্ভুত ক্লান্তি। "মালিহাকে সিকিউরিটি টিম রিসেপশন থেকে নিরাপদে বের করে এনেছে। ও এখন হাই কমিশনের হেফাজতে আছে। আমি অচিরেই ফিরছি।"

 

"নাবিল, আমি তোমার চিঠিটা পড়েছি..." ফারিহা আর নিজেকে সামলাতে পারল না, তার কথা আটকে গেল কান্নায়। "তুমি এত বোকা কেন নাবিল? কেন আমাকে সবটা বললে না? তুমি কোথায় এখন? প্লিজ তাড়াতাড়ি ফিরে এসো, আমার খুব ভয় করছে!"

 

ওপাশে কয়েক সেকেন্ডের স্তব্ধতা। তারপর নাবিলের একটা গভীর, তপ্ত শ্বাস শোনা গেল।

 

"তুমি... চিঠিটা পড়েছ?" নাবিলের স্বর অদ্ভুত কোমল হয়ে এল। "ফারিহা, আমি এখন ফ্লাইওভারের ওপর। বৃষ্টি খুব বেশি হচ্ছে, রাস্তা প্রায় ফাঁকা। আমি বিশ মিনিটের মধ্যে ঘরে পৌঁছাচ্ছি। আজ রাতে আমি তোমাকে আর কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহের মাঝে রাখব না। যা লিখেছি, আজ রাতে তা তোমাকে নিজের মুখে বলব।"

 

"তাড়াতাড়ি এসো নাবিল, আমি তোমার জন্য দরজা খুলে অপেক্ষা করছি," ফারিহা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল।

 

"আমি আসছি ফারিহা... আই লাভ ইউ—"

 

কথাটা শেষ হতে পারল না। হঠাৎ ফোনের ওপাশ থেকে এক বিকট শব্দ ভেসে এল! ধাতব কিসের যেন মারাত্মক সংঘর্ষের শব্দ, তারপর কাচ ভাঙার তীব্র আওয়াজ আর নাবিলের এক আর্তচিৎকার—"ফারিহা!"

 

তারপরই সব নিস্তব্ধ। কলটা কেটে গেল।

 

ফারিহার হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল মেঝের ওপর। ঘরের ভেতরের সমস্ত বাতাস যেন এক মুহূর্তে খালি হয়ে গেল। ফারিহার মাথার ভেতরে কেবল সেই বিকট এক্সিডেন্টের শব্দটা ঘুরপাক খেতে লাগল।

 

"নাবিল!" ফারিহা চিৎকার করে উঠল।

 

বৃষ্টির ঝাপটা জানালার কাচে আছড়ে পড়ছে অনবরত। ঘরের আঁধারে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ফারিহা, যার বুকের ভেতরটা তখন এক অজানা আশঙ্কায় শতখণ্ডে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে...।

 

পায়ের নিচের মাটিটা যেন আচমকা সরে গেল। ঘরের আঁধারটা এক মুহূর্তে আরও গভীর, আরও প্রলয়ংকরী রূপ ধারণ করল। ফারিহার মাথার ভেতরে কেবল একটা শব্দই অনবরত হাতুড়ির মতো বিঁধছিল—সেই বিকট ধাতব শব্দ আর নাবিলের শেষ আর্তনাদ।

 

"না... এমনটা হতে পারে না! নাবিল!"

 

ফারিহা মেঝের ওপর খসে পড়া ফোনটা তুলে নিল। তার হাত কাঁপছিল উন্মাদের মতো। সে বারবার নাবিলের নম্বরে ডায়াল করতে লাগল, কিন্তু ওপাশ থেকে কেবল ভেসে এল সেই নিষ্ঠুর স্বর—"গ্রাহক এই মুহূর্তে সাড়া দিচ্ছেন না..."

 

ফারিহা আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে নিয়ে সে ছুটল ঘরের বাইরে। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় সে কয়েকবার আছাড় খেতে গিয়েও নিজেকে কোনোমতে সামলে নিল। দারোয়ান বাধা দেওয়ার আগেই সে সোজা গিয়ে দাঁড়াল বৃষ্টিভেজা মাঝরাস্তার ওপর। কালবৈশাখীর ঝাপটায় মুহূর্তের মধ্যে ফারিহা ভিজে একাকার হয়ে গেল।

 

কোনোমতে একটা খালি সিএনজি খুঁজে পেয়ে সে ড্রাইভারকে চিৎকার করে বলল, "ফ্লাইওভারের দিকে চলুন! দ্রুত!"

 

রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য। গাড়ির জানালার কাচে বৃষ্টির জলের তোড় আছড়ে পড়ছে। ফারিহার দুচোখ বেয়ে নোনা জল অনবরত গড়িয়ে পড়ছিল। সে দুহাত জোর করে প্রার্থনা করতে লাগল। যে মানুষকে সে আটটা মাস ভুল বুঝেছে, যাকে মনের গভীর থেকে ভালোবাসার স্বকীয়তা দিতে গিয়েও থমকে গেছে—আজ যখন সেই মানুষটা তার সমস্ত আবেগ উজার করে তার কাছে ফিরছিল, তখন কেন ভাগ্য তাদের সাথে এমন নিষ্ঠুর খেলা খেলল?

 

ফ্লাইওভারের ওপর উঠতেই সিএনজি ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে দিল। সামনে পুলিশের বেশ কয়েকটা গাড়ি সাইরেন বাজাচ্ছে। লাল-নীল আলো বৃষ্টিভেজা কালচে পিচঢালা রাস্তায় প্রতিফলিত হয়ে এক ভয়াল পরিবেশ তৈরি করেছে।

 

ফারিহা গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে গেল অকুস্থলের দিকে। ভিড় ঠেলে সামনে যেতেই তার বুকের রক্ত যেন হিম হয়ে জমাট বেঁধে গেল।

 

নাবিলের কাল রঙের গাড়িটা ফ্লাইওভারের ডিভাইডারের সাথে সজোরে ধাক্কা খেয়ে দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে আছে। সামনের কাচ চুরমার হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। রাস্তার ওপর কালচে রক্তের দাগ—যা বৃষ্টির জলে ধুয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে নিচের ড্রেনের দিকে।

 

"নাবিল!" ফারিহার গলার স্বর ফুঁসে উঠল এক আর্তনাদে। সে গাড়িটার দিকে ছুটতে চাইল, কিন্তু দুজন পুলিশ অফিসার তাকে ধরে ফেলল।

 

"ম্যাডাম, ভেতরে যাবেন না! ড্রাইভারকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে!" একজন পুলিশ অফিসার তাকে সামলানোর চেষ্টা করলেন।

 

"আমার জামাই কোথায়? ও কোথায়?" ফারিহা পুলিশের শার্ট ধরে ঝাঁকাতে লাগল, তার চোখে তখন পাগলামি। "নাবিল চৌধুরী! কোথায় নিয়ে গেছেন ওকে?"

 

"উনাকে সেন্ট্রাল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, ম্যাডাম। উনার অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক..."

পুলিশের কথা শেষ হওয়ার আগেই ফারিহা উল্টো ঘুরে আবার ছুটতে শুরু করল। সে কোনো গাড়ি বা সিএনজির জন্য অপেক্ষা করল না। বৃষ্টির মধ্যে কাদাপানি পায়ে মাড়িয়ে সে দৌড়াতে লাগল হাসপাতালের দিকে। তার প্রতিটি পদক্ষেপে যেন বেঁচে থাকার আকুতি, তার প্রতিটি নিশ্বাসে নাবিলের নাম।

 

হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের সাদা করিডোরটা অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। ধবধবে সাদা টাইলসের ওপর রক্তমাখা পায়ের ছাপ রেখে ফারিহা এসে দাঁড়াল ওপারেশন থিয়েটারের সামনে।

 

বাইরে দাঁড়িয়ে আছে নাবিলের বন্ধু ও আইনি পরামর্শক তানভীর। ফারিহাকে দেখে সে এগিয়ে এল, তার চোখে তীব্র দুশ্চিন্তা।

 

"ফারিহা... তুমি এখানে?" তানভীরের গলার স্বর নিচু।

 

"নাবিল কেমন আছে, তানভীর ভাই?" ফারিহা ওপারেশন থিয়েটারের কাচের দরজায় হাত রেখে হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করল। "ও ভালো আছে তো? বলুন না, ও ঠিক আছে?"

 

তানভীর চোখ নামিয়ে নিল। "গাড়িটা একটা লরির ধাক্কায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল ফারিহা। নাবিলের মাথায় আর বুকে গুরুতর আঘাত লেগেছে। ভেতরের রক্তক্ষরণ থামানো যাচ্ছে না। ডাক্তাররা চেষ্টা করছেন, কিন্তু..."

 

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ওপারেশন থিয়েটারের দরজার ওপরের লাল বাতিটা নিভে গেল। একজন প্রবীণ ডাক্তার মাস্ক খুলতে খুলতে বাইরে বেরিয়ে এলেন। তার মুখের বিষণ্ণ ভাব দেখে ফারিহার পায়ের তলদেশ থেকে মাটি যেন পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেল।

 

"ডাক্তার সাহেব! আমার নাবিল?" ফারিহা ডাক্তারের হাত দুটো চেপে ধরল।

 

ডাক্তার একটা গভীর শ্বাস ফেলে বললেন, "আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। পেশেন্টের কন্ডিশন খুব ক্র সংকটজনক। মাথার আঘাতটা গভীর। উনি জ্ঞান হারানোর আগে কেবল একটা নামই বারবার বলছিলেন—'ফারিহা'।"

 

ফারিহার চোখের জল শুকিয়ে যেন পাথর হয়ে গেল। সে ডাক্তারকে ঠেলে সরিয়ে সোজা ঢুকে গেল ওপারেশন থিয়েটারের ভেতরে।

 

ঘরের মধ্যখানে সাদা চাদরে ঢাকা পড়ে আছে নাবিল চৌধুরী। সেই ধারালো চোয়াল, পরিপাটি চেহারা আজ রক্তে রাঙানো। কপালে সাদা ব্যান্ডেজ, যার ওপর দিয়েও রক্ত চুইয়ে পড়ছে। মুখে অক্সিজেনের মাস্ক। মেশিনের একঘেয়ে 'বিপ বিপ' শব্দ জানান দিচ্ছে, একটা জীবন কতটা সূক্ষ্ম সুতোয় ঝুলে আছে।

 

ফারিহা ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। সে চাদরটা সরিয়ে নাবিলের বরফের মতো ঠান্ডা ডান হাতটা নিজের দুহাতে তুলে নিল। সেই হাত—যা কয়েক ঘণ্টা আগেও তাকে স্পর্শ করার জন্য আকুল হয়েছিল, যা তার চোখের জল মুছে দিয়েছিল—আজ অবশ হয়ে পড়ে আছে।

 

ফারিহা নাবিলের হাতের তালুতে নিজের মুখ গুঁজে কেঁদে উঠল। তার চোখের জল নাবিলের ক্যানুলা লাগানো হাতে গিয়ে পড়তে লাগল।

 

"তুমি আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে না, নাবিল?" ফারিহা ফিসফিস করে বলল, তার স্বর থরথর করে কাঁপছিল। "তুমি বলেছিলে, আজ রাতে ফিরে এসে তুমি আমাকে নিজের মুখে সব বলবে। তুমি বলেছিলে, আমাদের মাঝে আর কোনো দূরত্ব থাকবে না। তবে কেন এভাবে চুপ করে আছ?"

 

নাবিলের অবশ আঙুলগুলোতে কোনো সাড়া নেই। হৃদস্পন্দনের মনিটরে দাগগুলো ক্রমশ সোজা হয়ে যাওয়ার উপক্রম করছে।

 

ফারিহা উঠে দাঁড়িয়ে নাবিলের রক্তের দাগ লাগা কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। তারপর নাবিলের কানের একদম কাছে মুখ এনে অত্যন্ত গভীর, ব্যাকুল স্বরে বলল, "তুমি আমাকে ছেড়ে যেতে পারো না নাবিল। আমি তোমার চিঠি পড়েছি। আমি জেনেছি তুমি আমাকে কতটা ভালোবাসো। আজ যদি তুমি চোখ না খোলো, তবে আমি চিরতরে হারিয়ে যাব। তোমাকে ফিরতেই হবে... আমার জন্য, আমাদের ভালোবাসার জন্য!"

 

ফারিহার ব্যাকুল অশ্রু নাবিলের চোখের কোণে গিয়ে পড়ল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে, মনিটরের একঘেয়ে শব্দে হঠাৎ একটা পরিবর্তন এল। নাবিলের হাতটা সামান্য কেঁপে উঠল, আর তার অবশ আঙুলগুলো আলতো করে আঁকড়ে ধরতে চাইল ফারিহার হাত...।

 

মনিটরের তীব্র ‘বিপ বিপ’ শব্দে মুহূর্তেই পাল্টে গেল ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের থমথমে পরিবেশ। রক্তে ভেজা অবশ আঙুলগুলো যখন ফারিহার হাতের মুঠোয় সামান্য কেঁপে উঠল, তখন মনে হলো এক অলৌকিক পরশ স্পর্শ করে গেল ঘরটাকে।

 

ফারিহা নিশ্বাস আটকে নাবিলের মুখের দিকে তাকাল। নাবিলের চোখের পাতাগুলো খুব ধীরে ধীর কেঁপে উঠছে। কপালে লেগে থাকা জমানো রক্ত আর সাদা ব্যান্ডেজের নিচে সে যেন ভীষণ এক যুদ্ধ জয় করে ফিরছে বাস্তবতার পৃথিবীতে।

 

"ডাক্তার সাহেব! দেখুন, উনি সাড়া দিচ্ছেন!" ফারিহা ব্যাকুল কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল।

 

বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মেডিকেল টিম মুহূর্তের মধ্যে ওপারেশন থিয়েটারে ঢুকে পড়ল। ডাক্তাররা দ্রুত মনিটর আর নাবিলের পাল্স চেক করতে শুরু করলেন। জ্যেষ্ঠ ডাক্তার সাহেব নাবিলের চোখে আলো ফেলে পরীক্ষা করে ফারিহার দিকে ফিরে তাকালেন। তার চোখে তখন চরম বিস্ময় আর স্বস্তির ঝিলিক।

 

"ইটস এ মিরাকেল!" ডাক্তার মৃদু হেসে বললেন, "পেশেন্টের ব্রেন অ্যাক্টিভিটি রিগেইন করছে। উইথড্রয়াল সিম্পটমগুলো কাটিয়ে উঠছে। উনার সারভাইভাল উইল অবিশ্বাস্য রকমের প্রবল। মনে হচ্ছে, আপনার ডাক উনি শুনতে পেয়েছেন।"

 

ফারিহা দুই হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলল। তবে এ কান্না আর কোনো কষ্টের কান্না নয়—এ হলো বহু কাঙ্ক্ষিত মুক্তির জোয়ারে ভেসে যাওয়া পরম স্বস্তির অশ্রু।

 

পরের দুটো দিন কেটে গেল এক তীব্র উৎকণ্ঠা আর দোলাচালের মধ্য দিয়ে। ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে নাবিলকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হলো। মালিহা ততক্ষণে বাংলাদেশে পৌঁছে গেছে। নাবিলের বেডের এক পাশে ফারিহা আর অন্য পাশে মালিহা বসে ছিল। ফারিহা মালিহাকে জড়িয়ে ধরেছিল এক আপন বোনের মতোই; দুজনের চোখের অলিখিত ভাষার বিনিময় ভেঙে দিয়েছিল অতীতের সব ভুল বোঝাবুঝির পাহাড়। মালিহার কাছে ফারিহা যেন এক নতুন ছায়া খুঁজে পেল, আর ফারিহা বুঝল—নাবিলের জীবনের ত্যাগ কোনো মিথ্যা অভিনয় ছিল না, তা ছিল এক খাঁটি দায়িত্ববোধের রূপ।

 

তৃতীয় দিনের সকালে, যখন পুবের আকাশে রক্তিম সূর্য উঠছে, কেবিনের কাচ ভেদ করে একরাশ রোদের আলো এসে পড়ল সাদা ধবধবে বিছানাটার ওপর।

 

নাবিল ধীরে ধীরে চোখ খুলল। চোখের সামনের ঝাপসা আলোটা আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়ে উঠল। প্রথম যে দৃশ্যটি তার দৃষ্টিসীমানায় স্থির হলো, তা হলো ফারিহা। ফারিহা তার ডান হাতটা দুহাতে চেপে ধরে বেডের পাশে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে। তার চোখে আঁকা কালচে দাগ আর শুকিয়ে যাওয়া চোখের জলের রেখা জানান দিচ্ছে—বিগত কত ঘণ্টা সে এক মুহূর্তের জন্যও এই চোখের পলক ফেলেনি।

 

নাবিল খুব কষ্ট করে তার কাঁপা হাতটা ফারিহার মাথায় রাখল। তার আঙুলগুলো আলতো করে ফারিহার এলোমেলো চুলে মিশে গেল।

 

সেই মায়াবী স্পর্শে ফারিহার ঘুম ভেঙে গেল। সে দ্রুত মাথা তুলে তাকাল। নাবিল চৌধুরী তার দিকে তাকিয়ে আছে—তার সেই গভীর, তৃষ্ণার্ত আর অগাধ ভালোবাসায় ভরা চোখ দুটো দিয়ে।

 

"ফারিহা..." নাবিলের গলার স্বর খুব নিচু, খসখসে। মাস্ক সরিয়ে সে ফিসফিস করে উঠল।

 

ফারিহার চোখে আবার জল টলমল করে উঠল, কিন্তু ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক স্বর্গীয় হাসি। সে নাবিলের কপালে নিজের কপাল ঠেকাল।

 

"তুমি আবার কোনোদিন আমাকে এভাবে ছেড়ে যাওয়ার চিন্তা করবে না, নাবিল," ফারিহার ফিসফিসে কণ্ঠস্বরে ভালোবাসার মিষ্টি হুমকি। "তুমি জানো না, এই দুটো দিন আমি কীভাবে বেঁচে ছিলাম।"

 

নাবিল ক্ষীণ হেসে ফারিহার হাতটা নিজের বুকের বাঁ পাশে নিয়ে রাখল—ঠিক যেখানে তার হৃদপিন্ডটা নিয়মিত ছন্দে স্পন্দিত হচ্ছে।

 

"তুমি না ডেকে পাঠালে... হয়তো ফিরে আসা হতো না, ফারিহা," নাবিলের চোখে জলের বিন্দু চকচক করে উঠল। "আমি ভেবেছিলাম, আমার অতীতের অভিশাপ তোমাকে আমার থেকে কেড়ে নেবে। কিন্তু তোমার ভালোবাসা আমাকে মৃত্যুর দুয়ার থেকেও টেনে ফিরিয়ে আনল।"

 

"আমাদের মাঝে আর কোনো অতীতের অভিশাপ নেই নাবিল," ফারিহা আবেগপ্লুত হয়ে নাবিলের গালে হাত রাখল। "রাহাত চা চা আর তোমার বাবার ঋণ তুমি শোধ করেছ নিজের দায়িত্ব দিয়ে। মালিহা এখন নিরাপদে আছে। পুলিশের মাধ্যমে সেই চক্রকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখন শুধুই তুমি আর আমি।"

 

নাবিল ফারিহার হাতের তালুতে নিজের ঠোঁট টিপে ধরল। এক দীর্ঘ, গভীর চাদরে ঢাকা পরশ। সেই স্পর্শে কোনো ভয় ছিল না, কোনো সংকোচ ছিল না—ছিল শুধুই এক অখণ্ড অধিকার।

 

এক মাস পর...

 

বৃষ্টিহীন এক শান্ত বিকেল। নীল আকাশে হালকা সাদা মেঘের আনাগোনা। বাড়ির ব্যালকনিতে বসে আছে নাবিল আর ফারিহা। নাবিল এখন অনেকটাই সুস্থ, তবে কপালে এক টুকরো হালকা কাটার দাগ এখনও তার সেই ঝড়ের রাতের স্মৃতি বহন করছে।

 

ফারিহা এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা এনে নাবিলের হাতে দিল। নাবিল চা না নিয়ে ফারিহার হাতটা ধরে টান দিয়ে তাকে নিজের একদম কাছে এনে বসাল। ফারিহা লজ্জা মেশানো হাসিতে নাবিলের বুকের ওপর মাথা রাখল।

 

"তুমি জানো ফারিহা?" নাবিল ফারিহার চুলে মুখ গুঁজে বলল, "আট মাস ধরে এই ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আমি প্রতিদিন শুধু একটা প্রার্থনাই করতাম।"

 

"কী প্রার্থনা?" ফারিহা মুখ তুলে নাবিলের চিবুকে হাত রাখল।

 

"প্রার্থনা করতাম—যেন কোনো এক দিন তোমার ওই চোখ দুটোতে আমার জন্য কোনো ক্ষোভ বা সন্দেহ না থাকে। যেন আমি তোমাকে বুকভরে ভালোবাসতে পারি, কোনো দায় বা ভয়ের প্রাচীর ছাড়া।"

 

ফারিহা মুচকি হেসে নাবিলের শার্টের বোতাম নিয়ে খেলতে লাগল। "আর আমি প্রার্থনা করতাম, যেন এই নীরব শক্ত মানুষটার ভেতরের ভালোবাসার অগ্নিকাণ্ডটা আমি কোনোদিন নিজের চোখে দেখতে পাই।"

 

নাবিল ফারিহার চিবুকটা আলতো করে ধরে তার ঠোঁটের কাছাকাছি নিয়ে এল। দুজনের নিশ্বাস এক হয়ে গেল কালবৈশাখীর পর আসা এক স্নিগ্ধ শান্ত বাতাসে।

 

"তুমি আমার শেষ ঠিকানা, ফারিহা। তোমার থেকে শুরু, তোমাতেই শেষ।"

 

নাবিলের তপ্ত ঠোঁট ফারিহার ঠোঁটে মিশে গেল। এবার তাদের মাঝে কোনো বাধা নেই, কোনো অসম্পূর্ণতা নেই, আর নেই কোনো বন্ধ বাক্সের কালির দাগ। ভালোবাসার এক নতুন ভোরে তারা দুজন হারিয়ে গেল একে অপরের পরম আশ্রয়ে—যেখান থেকে আর কোনোদিন আগের সেই দূরত্বে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়।

....
👁 16