পুরান ঢাকার একটা একশ বছরের পুরোনো বনেদি বাড়ি। বিশাল কাঠের দরজা, চুন-সুরকির দেয়াল আর লম্বা বারান্দায় পুরোনো দিনের আভিজাত্য ফুঁটে ওঠে। তবে সেই আভিজাত্যের আড়ালে মেহজাবিনের জন্য ঘরটা এক বিরাট বন্দিশালা হয়ে উঠেছিল। বিশাল সেই শোবার ঘরের মাঝখানে রাখা ভারী সেগুন কাঠের খাটটার এক পাশে বসেছিল সে। পরনে ভারী লাল জামদানি শাড়ি, হাতভর্তি কাচের চুড়ি আর গলায় সোনার গহনা।
আজ তাদের বাসর রাত। কিন্তু মেহজাবিনের মনে কোনো আনন্দ বা শিহরণ ছিল না, ছিল এক ধরণের চাপা ক্ষোভ আর অসন্তোষ।
এই বিয়েটা ওর বা বাবা-মায়ের জোড়াজোড়িতে হয়েছিল। সাদিক চৌধুরী—পরিবারের বড় ছেলে, গম্ভীর, শান্ত আর সবসময় নিজের গণ্ডির মধ্যে থাকা এক ব্যক্তিত্ব। সম্পর্কের দিক থেকে দূরসম্পর্কের আত্নীয় হলেও মেহজাবিন কোনোদিন সাদিকের সামনাসামনি হয়নি। সে জানত সাদিক তাকে অপছন্দ করে না, আবার পছন্দও করে না। বিয়েটা স্রেফ দুপক্ষের পারিবারিক সম্মতিতে বাধ্য হয়ে করা।
দরজা খোলার শব্দে মেহজাবিন চট করে মাথা তুলল।
সাদিক ঘরে ঢুকল। পরনে সাদা সিল্কের পাঞ্জাবি আর পায়জামা। তার সুগঠিত শরীর, চওড়া কাঁধ আর তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত ভারিক্কি ভাব। ঘরে ঢুকেই সে দরজাটা আটকে দিল। মেহজাবিনের দিকে একবার তাকাল, কিন্তু সেই চাহনিতে না ছিল কোনো প্রেম, না ছিল কোনো আগ্রহ।
সাদিক পাঞ্জাবির বোতাম খুলতে খুলতে ড্রেসিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। ঘড়িটা খুলে টেবিলের ওপর রেখে আয়নায় মেহজাবিনের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল।
"তুমি জামাকাপড় বদলে নিতে পারো। শাড়ি পরে বসে থাকার দরকার নেই," একদম স্বাভাবিক ও ঠান্ডা গলায় বলল সাদিক।
মেহজাবিন ওর কথার উত্তর দিল না। সে চুপচাপ শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে চেপে ধরে রইল। মনে মনে ভাবল, লোকটা অন্তত একবারও ভদ্রতার খাতিরে সৌজন্যমূলক কিছু বলতে পারত! এত অহংকার কিসের?
সাদিক নিজের একটা টি-শার্ট আর ট্রাউজার নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। মেহজাবিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলমারি থেকে নিজের একটা হালকা সুতি থ্রি-পিস বের করে নিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সাদিক বের হয়ে সোজা সোফার দিকে এগিয়ে গেল। খাটের দিকে ফিরেও তাকাল না।
মেহজাবিন ওয়াশরুমে গিয়ে শাড়ি বদলে, গহনাগুলো একে একে খুলে ফেলল। মুখ ধুয়ে যখন সে ঘরে ফিরে এল, দেখল সাদিক সোফায় শুয়ে একটা বই পড়ার চেষ্টা করছে।
"আপনি সোফায় ঘুমাচ্ছেন কেন?" মেহজাবিন শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, যদিও ওর কণ্ঠে এক ধরণের বিরক্তি স্পষ্ট ছিল।
সাদিক বই থেকে চোখ না তুলেই বলল, "কারণ আমি চাই না তুমি অস্বস্তিতে পড়ো। এই বিয়েটা আমাদের দুজনের কারোরই ইচ্ছায় হয়নি। তাই জোর করে স্বামী-স্ত্রীর অভিনয় করার কোনো মানে হয় না।"
মেহজাবিন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। লোকটার স্পষ্টবাদী আচরণ ওকে কিছুটা চমকে দিল, কিন্তু পরক্ষণেই ওর অহংকারে লাগল। সে মনে মনে বলল, 'বাহ! যেন আমিই ওর সাথে শোবার জন্য মরিয়া হয়ে আছি!'
"ভালো কথা," মেহজাবিন সোজা গিয়ে খাটের একপাশে শুয়ে পড়ে পাশ ফিরে শুল। "আমিও চাই না আমার সীমানায় কেউ প্রবেশ করুক।"
ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শুধু দেওয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দ আর এসি-র হালকা বাতাসের আওয়াজ ছাড়া কিচ্ছু ছিল না। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতার আড়ালে দুটো মানুষ এক অদৃশ্য প্রাচীর গড়ে তুলছিল।
পরদিন সকাল থেকেই বাড়িতে নতুন বউয়ের খাতিরদারি শুরু হলো। সাদিকের আম্মা, ফুপু আর খালাদের ভিড়ে মেহজাবিনকে সারাদিন নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে যেতে হলো। সাদিক সকালে অফিসে চলে গিয়েছিল, কোনো কথা না বলেই। মেহজাবিনের মেজাজ আরো খারাপ হলো। একটা মানুষ কতটা পাষাণ হলে বিয়ের পরদিনই স্ত্রীকে ফেলে অফিসে চলে যায়!
বিকেলের দিকে মেহজাবিন দোতলার বিশাল বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে ছিল। পুরান ঢাকার ছাদগুলো সব পাশাপাশি জোড়া লাগানো। পড়ন্ত বিকালের সোনাঝরা রোদ ওর চুলে এসে পড়ছিল। হালকা লাল রঙের একটা থ্রি-পিস পরা ছিল ওর গায়ে।
হঠাৎই অলসভাবে চোখ বোলাতে গিয়ে মেহজাবিনের নজরে পড়ল পাশের বাড়ির ছাদ। পাশের বাড়ির এক তলার ছাদ থেকে একজন লোক একটানা মেহজাবিনের দিকে তাকিয়ে আছে। লোকটার চোখে-মুখে এক ধরণের অশ্লীল আর কুৎসিত চাহনি। মেহজাবিন অস্বস্তি বোধ করে সরে দাঁড়াতে চাইল, কিন্তু লোকটা কোনো সংকোচ না করে শিস দিয়ে উঠল।
মেহজাবিনের রক্ত গরম হয়ে উঠল। কিন্তু নতুন বাড়িতে এসে কোনো ঝামেলা করতে চাইল না বলে সে ভেতরের দিকে পা বাড়াল।
রাত আটটা বাজে। সাদিক তখনও ফেরেনি। মেহজাবিন ঘরে বসে নিজের ল্যাপটপে কিছু কাজ করছিল। সে পড়াশোনা শেষ করে একটা ডিজাইনিং ফার্মে ইন্টার্নশিপ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। হঠাৎ বাইরে ঝড়ের পূর্বাভাস দেখা দিল। পুরান ঢাকার আকাশ কালো হয়ে মেঘ ডাকতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো ভারী বৃষ্টি।
ঠিক তখনই ঘরের আলো নিভে গেল। লোডশেডিং।
মেহজাবিন অন্ধকারে কিছুটা ভয় পেয়ে গেল। পুরান ঢাকার এই পুরোনো বাড়িটা এমনিতে বিশাল, তার ওপর অন্ধকারে ঘরের প্রতিটি আসবাবপত্র যেন কোনো রহস্যময় ছায়া তৈরি করছিল। সে ফোনটা খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু টেবিল থেকে হাত ফসকে ফোনটা নিচে পড়ে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের দরজায় পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। কেউ একজন নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকছে।
মেহজাবিন ভয় পেয়ে বুক চেপে ধরল। "কে... কে ওখানে?"
কোনো উত্তর এলো না। শুধু অন্ধকারের মধ্য দিয়ে একটা দীর্ঘ ছায়া তার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগল।
মেহজাবিনের হৃদস্পন্দন দ্রুত হতে শুরু করল। সে পিছিয়ে গিয়ে দেয়ালের সাথে ঠেকে গেল। অন্ধকারের মধ্যে সেই অবয়বটা এক পা এক পা করে একদম মেহজাবিনের কাছে চলে এল। সে লোকটার গায়ের কড়া সুবাস পাচ্ছিল—জাসমাইন আর দামী পারফিউমের একটা তীব্র ককটেল।
"কে আপনি? উত্তর দিচ্ছেন না কেন?" মেহজাবিনের গলা কেঁপে উঠল।
ঠিক তখনই একজোড়া শক্ত আর উষ্ণ হাত মেহজাবিনের দুই কোমর চেপে ধরল।
মেহজাবিন শিউরে উঠল। তীব্র এক শিহরণ ওর শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল। লোকটার হাতের স্পর্শে যে জোর আর উষ্ণতা ছিল, তা কোনো অপরিচিত লোকের হতে পারে না। কিন্তু পরক্ষণেই লোকটা মেহজাবিনকে দেয়ালের সাথে আরো শক্ত করে চেপে ধরল।
মেহজাবিন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। লোকটার নিঃশ্বাসের উত্তাপ ওর ঘাড়ে এসে পড়ছিল। অন্ধকারের মধ্যেই সে অনুভব করল লোকটার ঠোঁট ওর কানের লতির খুব কাছে নেমে এসেছে।
"তোমার কি মনে হয়, আমি তোমাকে এত সহজে ছেড়ে দেব, মেহজাবিন?" অন্ধকারের আড়াল
থেকে ভেসে এল এক চেনা কিন্তু গভীর, নেশাক্ত কণ্ঠস্বর।
সাদিক!
মেহজাবিন হাঁপাতে হাঁপাতে ধাক্কা দিয়ে সাদিককে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু সাদিকের শরীরের গঠনের সামনে ওর গায়ের জোর কিছুই নয়। সাদিক ওর দুটো হাত মাথার ওপর এক হাতে শক্ত করে ধরে ফেলল। অন্য হাতটা মেহজাবিনের পেটের ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে পিঠের দিকে উঠে গেল।
"ছাড়ুন আমাকে! এসব কী পাগলামি?" মেহজাবিন ফিসফিস করে রুদ্ধশ্বাসে বলল।
"পাগলামি?" সাদিকের কণ্ঠস্বরে এক অদ্ভুত মাদকতা আর প্রচ্ছন্ন অধিকারবোধ। সে মেহজাবিনের ঘাড়ে ওর গরম ঠোঁটের স্পর্শ দিল। মেহজাবিনের শরীর এক অদ্ভুত আবেশে জমে গেল। সে নিজেকে ছাড়াতে চাইল, কিন্তু মনের ভেতরে এক গভীর আকুলতা ওকে অবশ করে দিচ্ছিল। সাদিকের এই রূপ সে কোনোদিন দেখেনি। সারাদিন যে লোকটা বরফের মতো ঠান্ডা থাকে, রাতের অন্ধকারে সে এতটা উত্তপ্ত কীভাবে হতে পারে?
সাদিক ওর ঠোঁট মেহজাবিনের গাল বেয়ে নামিয়ে এনে ওর চিবুক ধরে নিজের দিকে তুলল। অন্ধকারের মধ্যেই দুটো জোড়া চোখ একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। সাদিকের হাতের বুড়ো আঙুল মেহজাবিনের নিচের ঠোঁটে আলতো ঘষা দিল।
"তুমি মনে করো আমি তোমাকে গুরুত্ব দিই না, তাই না?" সাদিক মেহজাবিনের একদম কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, ওর নিঃশ্বাস মেহজাবিনের ঠোঁট ছুঁয়ে যাচ্ছিল। "তুমি ভাবো এই বিয়েটা আমার কাছে স্রেফ একটা চুক্তি?"
মেহজাবিন কিছু বলতে চাইল, কিন্তু শব্দগুলো ওর গলায় আটকে গেল। সাদিকের স্পর্শের এই গভীর উন্মাদনা ওর চিন্তা-ভাবনা স্তব্ধ করে দিয়েছিল।
সাদিক মেহজাবিনের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ঘষতে ঘষতে হঠাৎ থমকে গেল।
আইপিএস-এর লাইট জ্বলে উঠল এক মুহূর্তের ব্যবধানে। পুরো ঘর হালকা হলুদ আলোয় ভরে গেল।
লাইটের আলো ফুটতেই সাদিক চট করে মেহজাবিনকে ছেড়ে এক পা পিছিয়ে গেল। ওর চেহারার সেই উত্তাপ, সেই নেশাক্ত চাহনি মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে গেল! আবার সেই আগের মতো গম্ভীর, বরফশীতল আর নির্বিকার মুখাবয়ব।
মেহজাবিন এলোমেলো চুল আর কাঁপতে থাকা শরীর নিয়ে দেয়ালের সাথে ঠেকে রইল। সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে কয়েক সেকেন্ড আগে এই লোকটাই তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল!
সাদিক জামার কলারটা ঠিক করল। তারপর খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, "সরি, তোমাকে ভয় দেখানোর ইচ্ছা ছিল না। ঘরে অন্ধকার ছিল তাই।"
মেহজাবিন হাঁপাচ্ছিল। ওর চোখ দুটো বিস্ময়ে আর রাগে বড় হয়ে গেল। "তুমি... তুমি আমার সাথে এমন নাটক করলে কেন? কী চাও তুমি?"
সাদিক মেহজাবিনের দিকে ঠান্ডা চোখে তাকাল। "আমি কিছুই চাই না, মেহজাবিন। শুধু নিশ্চিত হতে চাইছিলাম, তুমি এই বাড়িতে কতটা সুরক্ষিত। কারণ..." সাদিক থামল, ওর চোখ দুটো হিংস্র হয়ে উঠল, "পাশের বাড়ির ওই ছেলেটা তোমাকে বারান্দা থেকে দেখছিল, তাই না?"
মেহজাবিন চমকে উঠল। "তুমি কীভাবে জানলে?"
সাদিক পকেট থেকে নিজের মোবাইলটা বের করে সোফায় ছুঁড়ে ফেলল। "আমি পুরান ঢাকার ছেলে, মেহজাবিন। এখানে দেয়ালেরও চোখ আছে। আর আমার জিনিসপত্রের ওপর কেউ চোখ তুললে, আমি সেটা সহ্য করি না—সেটা আমার অপছন্দের জিনিস হলেও।"
মেহজাবিন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সাদিকের মুখের শেষ কথাটা ওর বুকে যেন তীরের মতো বিধল। 'আমার অপছন্দের জিনিস হলেও!'
সাদিক ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা ছোট খাম বের করল। খামটা মেহজাবিনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "কাল সকালে আমাদের সিলেটের ফ্লাইটের টিকিট। হানিমুনের নামে বাড়ির লোক পাঠাচ্ছে। আমি মানা করতে পারিনি। তাই গুছিয়ে নিও।"
মেহজাবিন খামটা ধরল না। সে সাদিকের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। এই লোকটা আসলে কে? দিনের আলোয় বরফ, আর রাতের অন্ধকারে আগুন?
সাদিক খামটা টেবিলের ওপর রেখে ওয়াশরুমের দিকে হাঁটা দিল। কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে সে হঠাৎ থামল। মেহজাবিনের দিকে না ফিরেই বলল, "আর হ্যাঁ, একটা কথা মনে রেখো মেহজাবিন... এই বিয়েটা তুমি যতই অনিচ্ছায় করে থাকো না কেন, এখন তুমি সাদিক চৌধুরীর স্ত্রী। আর আমার এই ঘরে... আমার অনুমতি ছাড়া ভালোবাসা বা ঘৃণা—কোনোটাই আধুরা রাখা যায় না।"
সাদিক ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা আটকে দিল।
মেহজাবিন ধপ করে খাটের ওপর বসে পড়ল। ওর হ্রদস্পন্দন তখনও স্বাভাবিক হয়নি। ও বুঝতে পারছিল, সাদিক চৌধুরী যতটা সরল ভেবেছিল, সে আসলে ততটা সরল নয়। এই মানুষটার আড়ালে অনেক বড় কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে। আর সেই রহস্যের জালে মেহজাবিন ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ছে।
এক অদ্ভুত সত্যি তখনও মেহজাবিনের অজানা ছিল। যে লোকটাকে সে শুধু অহংকারী আর নির্দয় ভেবে ভুল বুঝছিল, তার ডায়েরির প্রতিটা পাতায় লেখা ছিল মেহজাবিনের নাম—বিয়ের বহু বছর আগে থেকেই!
সকাল সাতটার ফ্লাইট ধরে তারা সিলেট এসে পৌঁছাল। পুরো যাত্রাপথে সাদিক একবারের জন্যও মেহজাবিনের সাথে আগ বাড়িয়ে কথা বলেনি। প্লেনে মেহজাবিন জানালার পাশে বসেছিল, আর সাদিক কানে ইয়ারফোন গুঁজে ল্যাপটপে কী যেন টাইপ করছিল। ওর এই নিরুত্তাপ ভাব মেহজাবিনকে ক্ষণে ক্ষণে রাগে রি রি করে তুলছিল। কাল রাতের সেই রহস্যময়, তীব্র স্পর্শ আর উত্তাপ কি তবে মেহজাবিনের কল্পনা ছিল? লোকটা এত জলদি নিজেকে এত বরফের মতো জমাট বানিয়ে ফেলে কীভাবে?
শ্রীমঙ্গলের এক বিলাসবহুল রিসোর্টে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রিসোর্টটি পাহাড় আর চা বাগানের একেবারে কোল ঘেঁষে। চারপাশে গাঢ় সবুজ আর পাহাড়ি বাতাসের এক সতেজ ঘ্রাণ। রিসোর্টের যে কটেজটি তাদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল, সেটির কাচের দেয়াল দিয়ে বাইরের বিস্তৃত চা বাগান স্পষ্ট দেখা যায়।
কটেজে ঢুকেই মেহজাবিন ক্লান্ত হয়ে সোফায় বসে পড়ল।
সাদিক লাগেজগুলো একপাশে রেখে রিসোর্টের বয়কে কিছু টিপস দিয়ে বিদায় করল। তারপর মেহজাবিনের দিকে না তাকিয়েই বলল, "সোফায় বসে না থেকে হাত-মুখ ধুয়ে নাও। খাবার রেডি করতে বলেছি।"
মেহজাবিন চট করে মাথা তুলল। "আমার যখন ইচ্ছা আমি হাত-মুখ ধোব। আপনি আমাকে আদেশ দেওয়ার কে?"
সাদিক ধীরপায়ে মেহজাবিনের দিকে এগিয়ে এল। ওর গায়ে একটা গাঢ় নীল রঙের ক্যাজুয়াল শার্ট, হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটানো। সাদিক মেহজাবিনের একদম সামনে এসে দাঁড়াল, তারপর হঠাৎ দুই হাত সোফার দুপাশে রেখে মেহজাবিনের ওপর ঝুঁকে পড়ল।
মেহজাবিন চমকে পেছনে সরতে চাইল, কিন্তু সোফার হেলান ছাড়া আর যাওয়ার জায়গা ছিল না। সাদিকের শরীরের ভারী আর পুরুষালী উপস্থিতি ওকে এক নিমেষে বন্দি করে ফেলল।
"আমি তোমার বর, মেহজাবিন," সাদিকের গলায় এক অদ্ভুত গভীরতা। "আর বর হিসেবে কিছু অধিকার বা আদেশ দেওয়া আমার এক্তিয়ারেই পড়ে। অন্তত যতক্ষণ আমরা এই চার দেয়ালের ভেতরে আছি।"
মেহজাবিনের বুক ধকধক করে উঠল। সাদিকের চোখ দুটো এত কাছে যে সে সেখানে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পাচ্ছিল। সাদিকের দৃষ্টি ধীরে ধীরে মেহজাবিনের ভিজা ঠোঁটে নেমে এল।
"আপনি... আপনি সবসময় এমন কেন করেন?" মেহজাবিন কোনোমতে গলার স্বর ধরে রেখে বলল। "কখনো একদম পর, আবার কখনো..."
"কখনো কী?" সাদিক ওর আরও কাছে সরে এল। ওদের নাকের ডগা প্রায় ছুঁইছুঁই। সাদিকের গরম নিঃশ্বাস মেহজাবিনের মুখে আছড়ে পড়ছিল। "কখনো তোমার এত কাছে আসি যে তোমার দম আটকে আসে? তাই তো?"
সাদিকের এক হাত উঠে এসে মেহজাবিনের থুতনি আলতো করে স্পর্শ করল। বুড়ো আঙুল দিয়ে সে মেহজাবিনের ঠোঁটের কোণ সামান্য টিপে ধরল। মেহজাবিনের শরীর শিউরে উঠল, এক অজানা ব্যাকুলতা ওর রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। সে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
সাদিক মেহজাবিনের ঘাড়ের কাছে নিজের মুখ নিয়ে গিয়ে নিচু স্বরে বলল, "তুমি আমায় ভুল ভাবো, মেহজাবিন। তুমি মনে করো আমি তোমাকে জোর করে বাঁধতে চেয়েছি। কিন্তু সত্যিটা হলো... তুমি ছাড়া আমার এই জীবনে আর কোনো চাওয়া ছিলই না।"
কথাটা শেষ করেই সাদিক মেহজাবিনের কানের লতিতে ওর গরম ঠোঁটের স্পর্শ দিল। হালকা কিন্তু তীব্র এক কামড়!
মেহজাবিন ছোট একটা চিৎকার দিয়ে সাদিকের শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরল। কিন্তু সাদিক সেখানেই থামল না। সে মেহজাবিনের গলার ভাঁজে মুখ গুঁজে দিল। উন্মাদ করা সেই ভেজা স্পর্শ মেহজাবিনের সব প্রতিরোধ মুহূর্তে গুড়িয়ে দিল। মেহজাবিন নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে সাদিকের চুলে আঙুল চালিয়ে দিল, ওকে আরও কাছে টেনে নিল।
পুরো ঘরে তখন এক গভীর, তীব্র আর গভীর ভালোবাসার উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। সাদিকের হাত মেহজাবিনের পিঠের সুতি জামার ওপর দিয়ে নিচে নেমে আসছিল। মেহজাবিনের রুদ্ধশ্বাস হাঁপানি আর সাদিকের গভীর নিঃশ্বাস কটেজের নিরবতাকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছিল।
ঠিক তখনই—মেহজাবিনের ফোনটা বিকট শব্দে বেজে উঠল।
হঠাৎ যেন জাদু কেটে গেল।
সাদিক মুহূর্তের মধ্যে মেহজাবিনকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। ওর চেহারায় আবার সেই কঠিন, স্পর্শাতীত ভাবটা ফিরে এল। মেহজাবিন হাঁপাতে হাঁপাতে সোফায় সোজা হয়ে বসল, ওর জামাকাপড় কিছুটা এলোমেলো, চোখ দুটো নেশায় আচ্ছন্ন।
সাদিক ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। ডিসপ্লেতে একটা অপরিচিত নম্বর ভাসছে। সাদিক ফোনটা তুলল না, কেটে দিল। কিন্তু ওর মুখের অবয়ব এক নিমেষে গম্ভীর থেকে হিংস্র হয়ে উঠল।
"তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও," সাদিক আর মেহজাবিনের দিকে তাকাল না। সে সোজা বেলকনির দিকে হেঁটে গেল।
মেহজাবিন বিস্ময় আর অপমানে লাল হয়ে উঠল। লোকটা ওকে এভাবে এক অদ্ভুত আবেশে ভাসিয়ে দিয়ে মাঝপথে ফেলে চলে যায় কীভাবে? ও কি স্রেফ একটা পুতুল? যখন ইচ্ছা ছুঁয়ে দেবে আর যখন ইচ্ছা দূরে ঠেলে দেবে?
সন্ধ্যায় বৃষ্টি নেমেছিল। পাহাড়ি বৃষ্টি যেন থামতেই চায় না।
মেহজাবিন ঘরের কফি টেবিলে বসে কফি খাচ্ছিল আর বাইরে বৃষ্টি দেখছিল। সাদিক বিকেল থেকে কটেজের বাইরে ছিল, কিছুক্ষণ আগে ফিরে এসে সোজা স্টাডি টেবিলে বসে কিছু ফাইলপত্র দেখছে।
মেহজাবিনের মনে নানা প্রশ্ন ঘুড়পাক খাচ্ছিল। কাল রাতের পুরান ঢাকার সেই লম্পট ছেলেটার কথা, সাদিকের সেই অদ্ভুত মন্তব্য, আর আজ সকালে সাদিকের মুখে 'তুমি ছাড়া আমার জীবনে আর কিছু চাওয়ার ছিল না' কথাটা।
মেহজাবিন কফির কাপটা টেবিলে রেখে সাদিকের টেবিলে গিয়ে দাঁড়াল।
"আমার কিছু প্রশ্নের উত্তর চাই," মেহজাবিন শক্ত গলায় বলল।
সাদিক ফাইল থেকে চোখ না তুলেই বলল, "এখন না মেহজাবিন। আমি একটা জরুরি কাজ করছি।"
"না, এখনই!" মেহজাবিন হাত বাড়িয়ে সাদিকের হাত থেকে ফাইলটা টেনে নিল।
সাদিক চশমাটা খুলে টেবিলে রাখল। তারপর চেয়ারে হেলান দিয়ে মেহজাবিনের দিকে তাকাল। "কী জানতে চাও?"
"আপনি কাল রাতে বলেছিলেন যে পাশের বাড়ির ছেলেটা আমাকে দেখছিল। আপনি কীভাবে জানলেন? আর আপনি কি সত্যিই আমাকে অপছন্দ করেন? যদি অপছন্দই করেন, তবে কেন আমাকে এভাবে স্পর্শ করেন? কেন এমন নাটক করেন?" মেহজাবিনের চোখ দিয়ে রাগ আর ক্ষোভ ঠিকরে বের হচ্ছিল।
সাদিক কিছুক্ষণ চুপ করে মেহজাবিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোজা হয়ে বসল।
"আমি কোনো নাটক করি না, মেহজাবিন," সাদিকের গলায় আজ এক অন্যরকম সততা। "আর ওই ছেলেটার কথা বলছ? ওই ছেলেটা পুরান ঢাকার এক গ্যাংস্টারের ছোট ভাই। ও এক সপ্তাহ ধরে তোমার ওপর নজর রাখছিল। আমি বিয়ে করার আগেই ওকে সতর্ক করেছিলাম, কিন্তু ও শোনে নাই।"
মেহজাবিন চমকে উঠল। "মানে? বিয়ের আগেই?"
সাদিক হালকা হাসল, তবে সে হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না। "তুমি কি সত্যিই ভাবো এই বিয়েটা শুধুই আমাদের অভিভাবকদের কথায় হয়েছে? তোমার কি ধারণা, আমি এতই দুর্বল পুরুষ যে বাড়ির লোক জোর করে একটা মেয়েকে আমার গলায় ঝুলিয়ে দেবে আর আমি চুপচাপ মেনে নেব?"
মেহজাবিনের পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল। "আপনি... আপনি কী বলতে চাইছেন?"
সাদিক ড্রয়ার খুলে নিজের পার্সোনাল ডায়েরিটা বের করল। মেহজাবিনের দিকে ডায়েরিটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "তুমি ভেবেছিলে আমরা অচেনা? পাঁচ বছর আগে, ভার্সিটির সেই বাদল দিনে... যখন তোমার ছাতাটা বাতাসে উড়ে গিয়েছিল আর তুমি বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলে, তখন থেকেই তুমি এই হৃদয়ে আছো।"
মেহজাবিনের হাত কাঁপতে শুরু করল। পাঁচ বছর আগে? ভার্সিটির প্রথম বছর!
"আমি তোমাকে ভালোবেসেছি মেহজাবিন," সাদিক উঠে দাঁড়িয়ে মেহজাবিনের দিকে এক পা এগোল। "কিন্তু আমি যখনই তোমার কাছে আসার কথা ভেবেছি, তখনই জেনেছি তোমার জীবনে অন্য কেউ ছিল। তোমার সেই ভার্সিটির বন্ধু—আরিয়ান।"
আরিয়ানের নাম শুনতেই মেহজাবিন থমকে গেল। আরিয়ান ওর ভার্সিটির খুব ভালো বন্ধু ছিল, কিন্তু তিন বছর আগে একটা অ্যাক্সিডেন্টে সে মারা যায়।
"আমি জানতাম তুমি আরিয়ানকে ভালোবাসতে," সাদিক মেহজাবিনের একদম কাছে এসে ওর মুখটা তুলে ধরল। "তাই আমি কখনো তোমার সামনে আসিনি। আমি চেয়েছিলাম তুমি তোমার মতো সুখী হও। কিন্তু আরিয়ানের মৃত্যুর পর যখন তুমি নিজেকে গুটিয়ে নিলে, তোমার পরিবার তোমাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠল, তখন আমি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি। আমি বাবা-মাকে বাধ্য করেছি তোমার পরিবারে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে।"
মেহজাবিনের চোখে পানি এসে জমেছিল। সে তো এতদিন ভেবে এসেছে সাদিক এক পাষাণ, অহংকারী মানুষ যে বাধ্য হয়ে ওকে বিয়ে করেছে!
"তাহলে আমার সাথে এত দূরত্ব কেন বজায় রাখতেন?" মেহজাবিন কেঁদে ফেলল। "কেন নিজেকে এত আড়ালে রাখতেন?"
"কারণ আমি তোমার দয়া চাইনি মেহজাবিন!" সাদিকের চোখ দুটো লাল হয়ে উঠল। "আমি চেয়েছিলাম তুমি আমাকে সাদিক হিসেবে ভালোবাসো, কোনো ভুল বোঝাবুঝি বা বাধ্যবাধকতা থেকে নয়। কিন্তু তোমার ওই অপলক, উদাসীন চোখ দুটো আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিত, তুমি আমাকে এখনো তোমার স্বামী বলে মেনে নিতে পারোনি।"
মেহজাবিন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে সাদিকের বুকে আছড়ে পড়ল। সাদিকের শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। এতদিন ধরে জমা থাকা সব মান-অভিমান, সব ভুল বোঝাবুঝি এক মুহূর্তে গলে পানি হয়ে গেল।
সাদিক শক্ত করে মেহজাবিনকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরল। ওর চুলে মুখ গুঁজে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"তুমি সত্যি একটা পাগল..." মেহজাবিন ফিসফিস করে বলল, ওর কান্নাভেজা মুখ সাদিকের বুকে ঢাকা।
"তোমার জন্যই পাগল," সাদিক মেহজাবিনকে বাহুডোরে তুলে নিল।
সোজা খাটের দিকে হেঁটে গেল সাদিক। মেহজাবিন ওকে বাধা দিল না, বরং সাদিকের গলায় নিজের দু-হাত শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল। খাটটিতে মেহজাবিনকে শুইয়ে দিয়ে সাদিক ওর ওপর নেমে এল।
বাইরে তখন বৃষ্টির মাতম। ঘরের আবছা আলোয় সাদিকের ঠোঁট মেহজাবিনের চোখের জল মুছে দিল। তারপর পরম ভালোবাসায় সে ডুব দিল মেহজাবিনের ঠোঁটে। এবারের স্পর্শে কোনো রাগ বা ক্ষোভ ছিল না, ছিল বছরের পর বছর ধরে জমিয়ে রাখা গভীর তৃষ্ণা আর উন্মাদের মতো ভালোবাসা। মেহজাবিনও আজ নিজেকে পুরোপুরি সমর্পণ করে দিল তার এই অচেনা, রহস্যময় স্বামীর কাছে।
কিন্তু ভালোবাসার এই চরম মুহূর্তে, কটেজের বাইরে বৃষ্টির আড়ালে এক বিষাক্ত জোড়া চোখ তাদের দিকেই তাকিয়ে ছিল। আর সাদিকের ফোনে ডেস্কে পড়ে থাকা খামে জ্বলজ্বল করছিল একটা চিঠি—যার ওপরে লেখা ছিল, "তুমি মেহজাবিনকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছ সাদিক, কিন্তু ওর আসল সত্যিটা তুমি এখনো জানো না।"
বাইরে তখন বৃষ্টির বেগ আরও বেড়েছে। কটেজের কাচের জানালায় জলবিন্দুর আঁকিবুঁকি। কিন্তু ঘরের ভেতরের পরিবেশ ছিল তীব্র উষ্ণে ভরা। ভালোবাসার এক নিবিড় আবেশে
দুজন যখন একে অপরের মধ্যে হারিয়ে যেতে বসেছে, ঠিক তখনই হুট করে বাইরের বারান্দায় ভারী কিছু একটা ভেঙে পড়ার বিকট শব্দ হলো।
এক নিমেষে থমকে গেল সাদিক।
মেহজাবিনের ঠোঁট থেকে নিজের ঠোঁট সরিয়ে নিয়ে সে চট করে মাথা তুলল। তার তীক্ষ্ণ চোখ দুটো দরজার দিকে নিবদ্ধ হলো। মেহজাবিন হাঁপাতে হাঁপাতে সাদিকের বুকে হাত রেখে জিজ্ঞেস করল, "কী... কীসের শব্দ ওটা?"
সাদিক মেহজাবিনকে কিছু না বলে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। দ্রুত টি-শার্টটা গায়ে গলিয়ে ঘরের লাইট বন্ধ করে দিল। পুরো ঘর এক গভীর অন্ধকারে ডুবে গেল।
"সাদিক, আপনি আলো নেভালেনে কেন? আমার ভয় করছে..." মেহজাবিনের কণ্ঠে আতঙ্ক স্পষ্ট।
সাদিক অন্ধকারের মধ্যেই মেহজাবিনের কাছে এসে তার ঠোঁটে একটা আঙুল রাখল। "একদম চুপ, মেহজাবিন। বিছানা থেকে নামবে না। আমি বাইরেটা দেখে আসছি।"
সাদিক সাইড টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা ছোট কিন্তু ধারালো রিভলবার বের করে নিল। মেহজাবিন অন্ধকারের মধ্যেও ধাতব বস্তুটার চকচকে আলো দেখতে পেয়ে আঁতকে উঠল। সে কোনোদিন কল্পনাও করতে পারেনি সাদিক সাথে অস্ত্র নিয়ে ঘোরে! এই লোকটা আসলে কে? স্রেফ একজন সাধারণ ব্যবসায়ী, নাকি তার আড়ালে অন্য কোনো বিপজ্জনক পরিচয় আছে?
সাদিক নিঃশব্দে কাচের স্লাইডিং ডোরটা একটু সরিয়ে বারান্দায় বের হয়ে গেল। বৃষ্টিতে ভেজা পাহাড়ি বাতাসে তার শার্ট ভিজে যেতে লাগল। বারান্দার কোণে রাখা একটা বড় টব ভেঙে চুরমার হয়ে পড়ে আছে। কিন্তু আশেপাশে কেউ নেই।
তবে সাদিকের অভিজ্ঞ চোখ মিস করল না—মাটিতে তাজা কিছু রক্তের ফোঁটা পড়ে আছে, যা বৃষ্টির জলে ধুয়ে যাচ্ছে। কেউ একজন বারান্দা দিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছিল, কিন্তু কাচ ভাঙতে গিয়ে কেটে গেছে।
সাদিক পিস্তলটা শক্ত করে ধরে রিসোর্টের চারপাশটা স্ক্যান করে নিল। নাহ্, লোকটা পালিয়ে গেছে।
সে আবার ঘরের ভেতরে ঢুকে দরজাটা আটকে দিল। লাইট জ্বালাতেই দেখল মেহজাবিন বিছানায় হাঁটু দুটো বুকে চেপে ধরে বসে আছে, তার চোখ দুটো ভয়ে বড় বড় হয়ে উঠেছে।
"সাদিক... আপনার হাতে ওটা কী? আর ওই শব্দটাই বা কিসের ছিল?" মেহজাবিনের গলা কাঁপছিল।
সাদিক পিস্তলটা আবার ড্রয়ারে ঢুকিয়ে লক করে দিল। তার চেহারার সেই কিছুক্ষণ আগের পরম ভালোবাসার নরম ভাবটা উধাও, সেখানে আবার ফিরে এসেছে এক কঠিন, হিসেবি রূপ।
"কিছু না, একটা বুনো বিড়াল হয়তো টব ফেলে দিয়েছে," সাদিক খুব স্বাভাবিক গলায় মিথ্যা বলল।
"আপনি আমার সাথে মিথ্যা বলছেন!" মেহজাবিন গলার স্বর উঁচিয়ে বলল। "বিড়াল টব ফেললে আপনি ড্রয়ার থেকে বন্দুকে হাত দেন? আপনি আমার কাছে কী লুকাচ্ছেন সাদিক? আপনি কে?"
সাদিক শান্ত পায়ে মেহজাবিনের কাছে এসে বিছানার ধারে বসল। মেহজাবিনের দু-হাত নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, "মেহজাবিন, কিছু প্রশ্নের উত্তর না জানাই ভালো। তবে এতটুকু বিশ্বাস রাখো, আমার যা কিছু পরিচয়ই থাক না কেন, আমার এই প্রাণ থাকতে তোমার কোনো ক্ষতি হতে দেব না।"
মেহজাবিনের চোখে পানি চলে এল। "কিন্তু আমি তো আপনাকে জানতে চাই! আমি আপনার স্ত্রী, তাই না? আপনি আমাকে পাঁচ বছর ধরে ভালোবাসেন বললেন, অথচ আপনার জীবনের এই রহস্যগুলো থেকে আমাকে কেন দূরে রাখছেন?"
সাদিক মেহজাবিনের চোখের জল আলতো করে মুছে দিল। তারপর পরম মমতায় ওকে কাছে টেনে এনে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরল। মেহজাবিনের মাথাটা তার বুকের ওপর রেখে কপালে চুমু খেল।
"সময় আসুক, সব বলব। এখন চুপচাপ ঘুমাও। কাল সকালে আমাদের ঢাকা ফিরতে হবে," সাদিক ফিসফিস করে বলল।
সাদিকের বুকের উষ্ণতা আর তার চেনা সুবাস মেহজাবিনকে এক অদ্ভুত নিরাপত্তাবোধ দিল। তবে মনের ভেতরের অশান্তি আর কৌতুহলটা একদম মেটাল না। সে সাদিকের বুকে মুখ গুঁজে শুয়ে রইল, কিন্তু তার ঘুম এলো না।
পরদিন দুপুরেই তারা ঢাকায় ফিরে এল।
সাদিক মেহজাবিনকে পুরান ঢাকার বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে বলল তার অফিসে একটা জরুরি মিটিং আছে, ফিরতে রাত হবে। মেহজাবিনের মনটা খারাপ হয়ে গেল, কিন্তু সে কিছু বলল না।
নিজের ঘরে এসে ল্যাপটপ আর লাগেজ গোছানোর সময় মেহজাবিনের নজর পড়ল সাদিকের ফেলে যাওয়া কফি টেবিলটার দিকে। সেখানে কাল রাতের সেই খামটা পড়েছিল—যেটা সাদিক শ্রীমঙ্গল নিয়ে গিয়েছিল কিন্তু খোলেনি।
মেহজাবিনের মনে কৌতুহল জেগে উঠল। সে ধীরে ধীরে খামটার দিকে এগিয়ে গেল। মনে মনে একটা অপরাধবোধ কাজ করছিল, অন্যের চিঠি পড়া ঠিক নয়। কিন্তু কাল রাতের ঘটনা আর সাদিকের হাতের পিস্তল তাকে বাধ্য করল।
মেহজাবিন খামটা খুলে ভেতর থেকে সাদা কাগজটা বের করল। চিঠিটা দেখে তার শরীরের রক্ত হিম হয়ে গেল!
লাল কালি দিয়ে বড় বড় হরফে লেখা:
"তুমি মেহজাবিনকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছ সাদিক, কিন্তু ওর আসল সত্যিটা তুমি এখনো জানো না। আরিয়ান মেনিয়ার মতো সাধারণ অ্যাক্সিডেন্টে মরেনি। ও বেঁচে আছে! আর মেহজাবিন আজও শুধু ওকেই ভালোবাসে। তোমার এই জোর করে তৈরি করা সংসার আমি গুঁড়িয়ে দেব।"
চিঠির নিচে একটা অস্পষ্ট ছবি সংযুক্ত করা ছিল—একটা হসপিটালের বেডে শুয়ে থাকা রক্তাক্ত এক যুবকের মুখ। মুখটা আবছা হলেও মেহজাবিনের চিনতে এক সেকেন্ডও লাগল না।
আরিয়ান!
মেহজাবিনের হাত থেকে চিঠিটা পড়ে গেল। মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল তার। আরিয়ান বেঁচে আছে? যে আরিয়ানকে সে তিন বছর আগে মৃত বলে জেনে এসেছিল, সে বেঁচে আছে? আর সাদিক... সাদিক কি তবে এটা জানত?
মেহজাবিনের পুরো পৃথিবী যেন এক লহমায় ওলটপালট হয়ে গেল। কাল রাতে সাদিক বলেছিল সে আরিয়ানের কথা জানে। কিন্তু আরিয়ান যে বেঁচে আছে, সেকথা কি সাদিক জানে? নাকি সাদিক নিজেই আরিয়ানকে লুকিয়ে রেখেছে?
ঠিক তখনই মেহজাবিনের মোবাইলে একটা অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল।
মেসেজটা খুলতেই মেহজাবিনের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।
"যদি আরিয়ানকে জ্যান্ত দেখতে চাও, তবে এখনই সাদিকের ডায়েরির শেষ পাতাটা পড়ো। আর আজ রাত আটটায় পুরান ঢাকার ওই পুরোনো নদীর ঘাটে একা এসো। সাদিককে কিচ্ছু বলবে না, বললে আরিয়ানের লাশও খুঁজে পাবে না।"
মেহজাবিনের হাত-পা কাঁপতে শুরু করল। সে ছুটে গেল সাদিকের স্টাডি টেবিলে রাখা সেই কালো ডায়েরিটার দিকে। ডায়েরিটা খুলে দ্রুত শেষ পাতাটা বের করল।
শেষ পাতায় সাদিকের হাতের লেখায় লেখা ছিল কয়েকটা লাইন, যা পড়ে মেহজাবিনের পায়ের তলার মাটি একবারে ধসে গেল:
"আরিয়ানকে আমার রাস্তা থেকে সরাতে হতো। মেহজাবিনকে পাওয়ার জন্য আমি যেকোনো حد পর্যন্ত যেতে পারি। যদি আরিয়ান আবার ফিরে আসে, তবে এবার তাকে আমি চিরতরে শেষ করে দেব..."
মেহজাবিন ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরে মাটিতে বসে পড়ল। চোখের জল উপচে পড়ছিল তার।
তাহলে কি এতদিন যাকে সে নিঃস্বার্থ প্রেমিক ভাবছিল, যে সাদিক তাকে কাল রাতে ভালোবাসার সমুদ্রে ভাসিয়েছিল... সে আসলে এক নৃশংস খুনি? যে নিজের ভালোবাসাকে পাওয়ার জন্য তার প্রিয় বন্ধুকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে?
মেহজাবিনের ভালোবাসা মুহূর্তের মধ্যে এক তীব্র ঘৃণা আর ভয়ে রূপান্তরিত হলো। সে ডায়েরিটা বন্ধ করে শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছল। দেওয়াল ঘড়িতে তখন বেলা চারটে বাজে। আটটা বাজতে আর মাত্র চার ঘণ্টা বাকি।
মেহজাবিন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল। সে ঘাটে যাবে। তাকে আরিয়ানের সত্যিটা জানতেই হবে, আর এই ভালোবাসার মুখোশ পরা রাক্ষসটার হাত থেকে নিজেকে ও আরিয়ানকে বাঁচাতে হবে।
কিন্তু মেহজাবিন জানত না, এই চিঠির পেছনে আর সাদিকের ডায়েরির ওই পাতার পেছনে লুকিয়ে আছে এমন এক মারাত্মক ষড়যন্ত্র, যা তার ধারণারও বাইরে!
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই পুরান ঢাকার সরু গলিগুলোতে ঘুটঘুঁটে অন্ধকার নেমে এলো। বৃষ্টির পর বাতাসে এক ধরনের স্যাঁতসেঁতে সোঁদা গন্ধ। বুড়িগঙ্গার তীরের পুরোনো, পরিত্যক্ত কাঠপোট্টি ঘাটটা এমনিতেই রাতের বেলা নির্জন থাকে। ঘাটের ভাঙা ইট আর ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করা পুরোনো কাঠের পাঠাতনের ওপর এসে দাঁড়াল মেহজাবিন। গায়ে জড়ানো কালচে নীল রঙের ওড়না দিয়ে মুখটা অর্ধেক ঢাকা, বুকটা ধড়ফড় করছে ভয়ে।
ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় রাত আটটা।
"তুমি অবশেষে এলে, মেহজাবিন..." অন্ধকারের মধ্যে একটা ছায়া থেকে কাপা কাপা কিন্তু অচেনা এক কণ্ঠ ভেসে এলো।
মেহজাবিন শিউরে উঠে পেছনে ফিরল। জরাজীর্ণ এক খুপরি ঘরের পাশ থেকে বের হয়ে এলো এক ব্যক্তি। তার মুখটা আলো-আঁধারিতে ঠিক চেনা যাচ্ছিল না, তবে পরনে মলিন পোশাক।
"কে আপনি? আরিয়ান কোথায়? আমাকে টেক্সট কে পাঠিয়েছে?" মেহজাবিনের গলা ভয়ে কাঁপলেও সে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল।
লোকটা কুটিল হেসে এগোতে লাগল। "আরিয়ান কোথায় তা জানতে চাও? যে মানুষটাকে তুমি স্বামী ভেবে রাতে বুকে টেনে নিচ্ছ, সেই সাদিক চৌধুরীই তোমার আরিয়ানকে জ্যান্ত কবর দিয়েছে!"
মেহজাবিনের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। ডায়েরির সেই পাতাটার কথা মনে পড়তেই বুকটা ফেটে যেতে লাগল। "না... সাদিক এত বড় প্রতারক হতে পারে না!"
"বিশ্বাস হচ্ছে না?" লোকটা পকেট থেকে আরেকটা তাজা ছবি বের করে মেহজাবিনের সামনে ধরল। সেখানে আরিয়ান এক অন্ধকার ঘরের মেঝেতে শিকল দিয়ে বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে। "সাদিক চৌধুরী এক হিংস্র পশুর মতো ওকে বন্দি করে রেখেছে। আজ রাতে যদি তুমি আমার সাথে না যাও, তবে সাদিক আরিয়ানকে মেরে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেবে।"
মেহজাবিন হাত বাড়িয়ে ছবিটা দেখতে যাবে, ঠিক তখনই চারপাশের বাতাস যেন থমকে গেল।
অন্ধকারের মধ্য থেকে ধীর, ভারী আর পরিচিত পায়ের শব্দ ভেসে এলো।
ঘাটের দিকে হেঁটে আসছে এক সুগঠিত পুরুষালী অবয়ব। গায়ে কালো শার্ট, হাতা গুটানো। হাতে একটি জলন্ত সিগরেট, যা থেকে আবছা ধোঁয়া উড়ছে। আলোয় তার মুখটা স্পষ্ট হতেই মেহজাবিন স্থির হয়ে গেল।
সাদিক!
সাদিকের মুখটা যেন পাথর দিয়ে খোদাই করা—ভয়ানক, কঠিন আর হিংস্র। সে সিগরেটে একটা শেষ টান দিয়ে সেটা নদীতে ছুঁড়ে ফেলল।
"তুমি এখানে কী করছ, মেহজাবিন?" সাদিকের কণ্ঠস্বর বরফের চেয়েও ঠান্ডা, কিন্তু ভেতরে অগ্নেয়গিরির উত্তাপ।
মেহজাবিন এক পা পিছিয়ে গেল। "সাদিক... তুমি... তুমি এখানে কীভাবে?"
সাদিক মেহজাবিনকে এড়িয়ে গিয়ে সেই অচেনা লোকটার দিকে তাকাল। সাদিকের চোখের চাহনি দেখে লোকটার মুখে ফুটে উঠা কুটিল হাসি মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল।
"আমি তোমাকে মানা করেছিলাম না, রফিক?" সাদিক শান্ত পায়ে লোকটার দিকে এগিয়ে গেল। "আমার স্ত্রীর কাছ থেকে দূরে থাকতে বলেছিলাম।"
"সাদিক ভাই! আমাকে মাফ করে দেন..." লোকটা কাঁপতে কাঁপতে হাত জোড় করল।
"থামো!" মেহজাবিন হঠাৎ চিৎকার করে উঠল। সে দৌড়ে গিয়ে সাদিক আর ওই লোকটার মাঝে দাঁড়িয়ে গেল। মেহজাবিনের চোখে অশ্রু আর তীব্র ঘৃণা। "অনেক হয়েছে নাটক সাদিক! আর কত মিথ্যা বলবে? আমি সব জেনে গেছি। তোমার ডায়েরির ওই পাতা, আরিয়ানের এক্সিডেন্ট—সব তোমার চক্রান্ত! তুমি ভালোবাসার নাটক করে আমাকে ফাঁদে ফেলেছ!"
সাদিক থমকে গেল। মেহজাবিনের মুখের এই গভীর ঘৃণা ওর বুকে কোনো বিষাক্ত তীরের মতো বিধল।
"মেহজাবিন, তুমি যা ভাবছ..." সাদিক নরম গলায় বলতে চাইল।
"একদম ছুঁবে না আমাকে!" মেহজাবিন সাদিকের দিকে আঙুল তুলল। "তুমি একটা খুনি! একটা মুখোশধারী রাক্ষস! কেন করলে এমন? আরিয়ান তো তোমার কোনো ক্ষতি করেনি!"
সাদিকের মুখের সব নরম ভাব এক লহমায় হারিয়ে গেল। ওর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, চোখ দুটো হিংস্র লালচে হয়ে গেল। সে হুট করে মেহজাবিনের কবজি চেপে ধরল। টান মেরে ওকে নিজের বুকের খুব কাছে নিয়ে এল।
মেহজাবিন ছাড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু সাদিকের পোহাটের গ্রিপ লোহার মতোই শক্ত।
"তুমি এখনও ওর জন্যই কাঁদছ, তাই না?" সাদিক মেহজাবিনের মুখে নিজের তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলল, ওর গলার স্বর রাগে থরথর করে কাঁপছিল। "পাঁচ বছর ধরে আমি তোমাকে ভালোবেসেছি। এই হৃদয়ের প্রতিটি রন্ধ্রে তোমাকে বসিয়েছি। আর তুমি আজ এক অচেনা চিঠির কথায় আমাকে খুনি বানিয়ে দিলে?"
"আমার কাছে প্রমাণ আছে!" মেহজাবিন গর্জে উঠল। "তোমার ডায়েরির লেখা!"
"ডায়েরি?" সাদিক এক অদ্ভুত কুটিল হাসি হাসল। সে হুট করে পকেট থেকে ডায়েরির সেই ছিঁড়ে ফেলা পাতাটা বের করল। "এই পাতার হাতের লেখা আমার, মেহজাবিন। কিন্তু তুমি কি এর পেছনের গল্পটা পড়েছ? তুমি কি শেষ লাইনটার নিচে কী লেখা ছিল সেটা খেয়াল করেছ?"
মেহজাবিন থমকে গেল।
সাদিক মেহজাবিনের মুখটা নিজের দুই হাতের তালুতে শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর গাঢ় ভালোবাসায় আর তীব্র ক্ষোভে মেহজাবিনের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। সেই স্পর্শে পরম অধিকার আর উন্মাদনা ছিল। মেহজাবিন আঁতকে উঠে সাদিককে ধাক্কা দিতে চাইল, কিন্তু সাদিক ওকে আরও শক্ত করে নিজের শরীরে চেপে ধরল।
এক দীর্ঘ, রুদ্ধশ্বাস কামনার আবেশ শেষে সাদিক মেহজাবিনের ঠোঁট ছেড়ে দিল। মেহজাবিন হাঁপাচ্ছিল, ওর গাল দুটো লজ্জায় আর ক্ষোভে লাল হয়ে উঠেছিল।
"তুমি আমাকে ঘৃণা করো মেহজাবিন, কোনো সমস্যা নেই," সাদিক মেহজাবিনের কানে ফিসফিস করে বলল, "কিন্তু তোমার এই ঘৃণা আর ভালোবাসার মালিক শুধুই আমি। অন্য কেউ না।"
সাদিক হাত বাড়িয়ে মুহূর্তের মধ্যে রফিক নামের ওই লোকটার শার্টের কলার চেপে ধরল এবং শক্ত এক লাথিতে ওকে মাটিতে ফেলে দিল। লোকটা ব্যথায় কোঁকাতে লাগল।
সাদিক লোকটার বুকের ওপর পা দিয়ে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে রিভলবারটা বের করল। বন্দুকের নালটা সোজা লোকটার কপালে ঠেকাল।
"সাদিক! না!" মেহজাবিন ভয়ে চিৎকার করে উঠল।
সাদিক মেহজাবিনের দিকে না তাকিয়ে রফিকের দিকে তাকিয়ে বলল, "বল রফিক, আমার ডায়েরিটা কে চুরি করে পেজের ওই অংশটুকু কেটে মেহজাবিনের ঘরে রেখেছিল? বল, কার কথায় আরিয়ানের এই ভুয়া ছবি বানিয়ে মেহজাবিনকে এখানে ডেকেছিস?"
মেহজাবিনের মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। ভুয়া ছবি?
রফিক কাঁপতে কাঁপতে কেঁদে ফেলল। "সাদিক ভাই... আমাকে মারবেন না! আমি সব বলছি! আপনার ফুপাতো ভাই জাবেদ ভাই আমাকে টাকা দিয়েছিল! উনিই আপনার রুম থেকে ডায়েরি চুরি করে ফটোকপি করে লেখা জোড়া লাগিয়েছেন! আরিয়ান সত্যি তিন বছর আগে মারা গেছে, উনি স্রেফ ছবিটা এডিট করিয়েছেন আপনার আর মেহজাবিন ভাবীর মধ্যে দূরত্ব তৈরি করতে!"
মেহজাবিন স্তব্ধ হয়ে গেল। জাবেদ? সাদিকের নিজের ফুপাতো ভাই?
সাদিক লোকটাকে একটা ঝাটকা দিয়ে ফেলে দিল। তারপর ধীরপায়ে মেহজাবিনের সামনে এসে দাঁড়াল।
"আরিয়ান তিন বছর আগে যখন অ্যাক্সিডেন্ট করে, তখন ও হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়ছিল," সাদিক শান্ত ও গভীর গলায় বলল। "আমি ওকে বাঁচানোর জন্য নিজের রক্ত দিয়েছিলাম, মেহজাবিন। বিদেশে চিকিৎসার টাকাও আমি পাঠিয়েছিলাম। কারণ আমি জানতাম ওকে ছাড়া তুমি বাঁচবে না। কিন্তু ও বাঁচেনি। আর ডায়েরিতে আমি লিখেছিলাম—যদি আরিয়ান ফিরে আসে আর তোমাকে সুখী রাখতে পারে, তবে আমি চিরতরে তোমাদের জীবন থেকে সরে যাব।"
সাদিকের প্রতিটি শব্দ মেহজাবিনের কানে বাজাতে লাগল। সে কী শুনছে এসব? সাদিক আরিয়ানকে মারেনি, বরং বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল?
"কিন্তু তুমি..." সাদিকের চোখে জল ছলছল করে উঠল, যা মেহজাবিন এই প্রথম দেখল। "তুমি আমার ওপর এতটুকু বিশ্বাস রাখতে পারলে না মেহজাবিন? এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো না যে তোমার এই স্বামী তোমাকে পাওয়ার জন্য এতটা নিচু হতে পারে না?"
মেহজাবিনের পায়ের নিচের জমিন যেন পুরোপুরি ধসে গেল। তীব্র অপরাধবোধ আর অনুশোচনায় ওর দম আটকে আসতে লাগল। সে কী ভুলটাই না করে ফেলেছে! যে লোকটা নিজের ভালোবাসা বিসর্জন দিয়ে ওর খুশির জন্য এত কিছু করল, তাকেই সে এত বড় অপবাদ দিল?
"সাদিক... আমি..." মেহজাবিন কান্না চেপে কিছু বলতে চাইল।
কিন্তু সাদিক আর কিছু শুনল না। সে ঠাণ্ডা গলায় বলল, "বাড়ি চলো।"
সাদিক মেহজাবিনের হাত না ধরে একা একাই গাড়ির দিকে হেঁটে গেল। মেহজাবিন কান্নাভেজা চোখে ওর চলে যাওয়া দেখতে লাগল। সে বুঝতে পারল, আজ সে সাদিকের শরীর নয়, তার আত্মাকে আঘাত করেছে।
হঠাৎ করেই ঘাটের পেছনের ঝোপঝাড় থেকে আরেকটা ছায়া বের হয়ে এলো। তার হাতে একটা ভারী লোহার রড। লোকটা সোজা দৌড়ে গিয়ে গাড়ির দিকে পিঠ দিয়ে থাকা সাদিকের মাথার পেছনে আঘাত করতে গেল!
"সাদিক পেছনে সামলান!" মেহজাবিন আর্ত চিৎকার করে উঠল।
মেহজাবিনের বিকট চিৎকারে সাদিকের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন এক সেকেন্ডে সতর্ক হয়ে উঠল।
মাথার পেছনে ভারী লোহার রডের আঘাতটা নেমে আসার ঠিক আগের মুহূর্তে সাদিক চট করে পাশ কাটালো। কিন্তু পুরোপুরি এড়াতে পারল না—রডের ধারালো কোণটা সাদিকের ডান কাঁধে গিয়ে তীব্র শক্তিতে লাগল।
শব্দ হলো এক হাড় কাঁপানো মচকা দেওয়ার। সাদিক যন্ত্রণায় একটা ছোট গর্জন করে উঠলেও এক চুলও পিছাল না। উল্টো বাঁ হাতের এক প্রচণ্ড ঘুসি বসিয়ে দিল আক্রমণকারীর মুখে।
লোকটা ছিটকে মাটিতে পড়ে গেল। মেহজাবিন দৌড়ে এসে সাদিককে ধরে ফেলল। সাদিকের চোখ-মুখ যন্ত্রণায় নীল হয়ে উঠেছে, ডান হাতটা নিস্তেজ হয়ে ঝুলে পড়েছে।
"সাদিক! আপনার রক্ত পড়ছে!" মেহজাবিন কেঁদে উঠল, ওর দুই হাত রক্তে ভেসে যাচ্ছিল।
কিন্তু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিল। ঘাটের চারপাশের অন্ধকারের আড়াল থেকে আরও চার-পাঁচজন লোক অস্ত্র হাতে বের হয়ে এলো। তাদের সবার সামনে এসে দাঁড়াল জাবেদ—সাদিকের চেনা ফুপাতো ভাই। জাবেদের মুখে এক বিষাক্ত, কুৎসিত হাসি।
"বাহ্ ভাইজান, রিফ্লেক্স তো দারুণ!" জাবেদ পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরাল। "কিন্তু আজ আর বেঁচে ফিরতে পারছ না। পুরান ঢাকার এই বনেদি বংশের বিশাল সম্পত্তির একমাত্র ওয়ারিশ তুমি। তুমি মরলে, আর মেহজাবিন যদি জেলে যায় তোমার খুনের দায়ে... তবে সব সম্পত্তি এমনিতেই আমার হাত বাড়িয়ে লুফে নেবে।"
মেহজাবিন শিউরে উঠল। জাবেদের মাথায় এত বড় ষড়যন্ত্র চলছিল!
সাদিক যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখেও মেহজাবিনকে নিজের শক্ত শরীরের আড়ালে ঠেলে দিল। মেহজাবিনকে এক হাত দিয়ে পেছনে চেপে ধরে সে শান্ত, কিন্তু হিংস্র গলায় বলল, "তোর সাহস ভালো জাবেদ। কিন্তু তুই ভুলে গেছিস, সাদিক চৌধুরীকে পিছন থেকে আঘাত করা যায়, সামনে দাঁড়িয়ে হারানো যায় না।"
সাদিক বাঁ হাত দিয়ে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে রিডায়াল বাটনে স্রেফ একটা চাপ দিল।
পর মুহূর্তেই চারপাশের গলি থেকে একসাথে চারটে কালো রঙের স্পোর্টস ইউটিভি আর বাইকের হেডলাইটের আলো এসে পড়ল তাদের ওপর। কানের পর্দা ফেটে যাওয়া ইঞ্জিনের গর্জনে পুরান ঢাকার নিরবতা চুরমার হয়ে গেল। ডজনখানেক সাদিকের বিশ্বস্ত লোক নেমে এসে জাবেদের গুন্ডাদের ঘিরে ফেলল।
জাবেদের মুখের হাসি মুহূর্তে হাওয়া হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, সাদিক এখানে একা আসেনি, ব্যাকআপ রেডি করেই এসেছিল।
"এদের সবাইকে আইনের হাতে তুলে দে," সাদিক ঠান্ডা গলায় ওর লোকদের নির্দেশ দিল। জাবেদ আর তার লোকজনকে মুহূর্তে পরাস্ত করে ধরে ফেলা হলো। জাবেদ চিৎকার করতে লাগল, কিন্তু সাদিকের এক ইশারায় ওকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হলো।
রাত এগারোটা।
সাদিকদের শোবার ঘর। ফুপু আর আম্মা নিচে কেঁদে আকুল, জাবেদের এমন হীন কাজ তারা বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। কিন্তু সাদিক কাউকেই ওপরে আসতে দেয়নি।
ঘরের ভেতরে নিস্তব্ধতা।
সাদিক খাটের ওপর খালি গায়ে বসে আছে। ওর ডান কাঁধে ব্যান্ডেজ বাঁধা। ডক্টর এসে ফাস্টএইড দিয়ে গেছেন, তবে ব্যথানাশক ওষুধের প্রভাবে তার চোখ দুটো লাল হয়ে আছে।
মেহজাবিন ধীরপায়ে ঘরে ঢুকল। তার হাতে গরম দুধের গ্লাস আর স্যাভলন-তুলা। মেহজাবিনের চোখ দুটো কেঁদে কেঁদে ফুলে লাল হয়ে গেছে। সে সাদিকের পাশে এসে হাঁটু গেড়ে বসল।
সাদিক চোখ বন্ধ করে খাটের হেলানে মাথা দিয়ে ছিল। মেহজাবিনের উপস্থিতি টের পেলেও সে চোখ খুলল না, কোনো কথাও বলল না। এই নিরবতা মেহজাবিনের বুকে তীরের মতো বিঁধছিল।
মেহজাবিন কাঁপতে থাকা হাতে তুলা দিয়ে সাদিকের পিঠের ও কাঁধের সামান্য জমে থাকা রক্তের দাগ মুছতে শুরু করল।
"সাদিক..." মেহজাবিন ফিসফিস করে ডাকল, ওর গলা কান্নায় বুজে আসছিল। "আমাকে ক্ষমা করে দিন... আমি এত বড় একটা ভুল কীভাবে করলাম? আমি অন্যের কথায় আপনাকে শয়তান ভাবলাম, অথচ আপনি..."
সাদিক চোখ খুলল। তার দৃষ্টিতে কোনো রাগ ছিল না, ছিল এক গভীর ক্লান্তি আর নিঃসঙ্গতা।
সাদিক শান্ত গলায় বলল, "তুমি ভুল করোনি মেহজাবিন। ভুলটা আমারই ছিল। আমি ভেবেছিলাম ভালোবাসা দিয়ে জোর করে মন জয় করা যায়। কিন্তু যে মনে অন্য কারও স্মৃতি আর সন্দেহ জড়িয়ে থাকে, সেখানে ভালোবাসার কোনো মূল্য নেই।"
কথাটা বলেই সাদিক সোজা হয়ে বসার চেষ্টা করল, কিন্তু যন্ত্রণায় ওর মুখ বিকৃত হয়ে গেল।
মেহজাবিন চট করে সাদিককে ধরে ফেলল। "নড়বেন না! প্লিজ..."
মেহজাবিন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে সাদিকের বুকের ভালো দিকটায় নিজের মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ওর চোখের জলে সাদিকের বুকের ছাতি ভিজে যেতে লাগল।
"আমি আরিয়ানকে ভালোবাসতাম, সেটা অতীতের কথা সাদিক!" মেহজাবিন কেঁদে কেঁদে বলল, ওর দুই হাত সাদিকের পিঠ শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল। "কিন্তু আমি আজ যা অনুভব করি... এই যে আপনার কষ্টে আমার দম আটকে আসছে, এই যে আপনার দূরত্ব আমাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে—এটা কোনো অতীত নয়! এটা আমার বর্তমান, এটা আমার ভবিষ্যৎ! আমি আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি সাদিক... খুব ভালোবেসে ফেলেছি!"
সাদিক যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না মেহজাবিনের মুখের কথাগুলো।
মেহজাবিন মাথা তুলল। ওর গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে, চোখ দুটো উন্মাদ ভালোবাসায় চকচক করছে। সে সাদিকের চোয়াল ধরে নিজের দিকে ঝুকিয়ে আনল।
"আপনি বলতেন না... আপনার এই ঘরে আপনার অনুমতি ছাড়া ভালোবাসা বা ঘৃণা—কোনোটাই আধুরা রাখা যায় না?" মেহজাবিন রুদ্ধশ্বাসে বলল, "আজ আমি কোনো বাধ্যবাধকতা থেকে নয়, নিজের সর্বস্ব দিয়ে আপনার হতে চাই। আমাকে ফিরিয়ে দেবেন না সাদিক..."
মেহজাবিন আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না। সে নিজে এগিয়ে গিয়ে সাদিকের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল।
এই প্রথম মেহজাবিন নিজে থেকে সাদিককে নিবিড়ভাবে স্পর্শ করল। সেই স্পর্শে কোনো ভয় ছিল না, ছিল এক তীব্র ব্যাকুলতা আর সমর্পণের আগুন।
সাদিকের ব্রেন যেন কাজ করা বন্ধ করে দিল। এক লহমায় তার ভেতরের সব রাগ, সব অভিমান ধুলিসাৎ হয়ে গেল। সাদিক তার সুস্থ বাঁ হাতটা মেহজাবিনের কোমরে পেঁচিয়ে ওকে নিজের ওপর টেনে নিল।
সাদিকের নেশাক্ত গরম নিঃশ্বাস মেহজাবিনের ঠোঁট আর গালে ছড়িয়ে পড়ল। সে মেহজাবিনকে নিজের সাথে আরও শক্ত করে পিষে ধরল।
"মেহজাবিন..." সাদিক মেহজাবিনের ঠোঁটের ওপর ফিসফিস করে বলল, ওর গলার স্বর গভীর ও উন্মাদনায় কাঁপছিল। "একবার যখন এই সীমানায় ঢুকেছ, আর কোনোদিন বের হওয়ার রাস্তা পাবে না।"
"আমি বের হতেও চাই না..." মেহজাবিন উত্তর দিল, ওর আঙুলগুলো সাদিকের চুলে জড়িয়ে গেল।
সাদিক মেহজাবিনকে পরম যত্নে খাটের নরম তোশকে শুইয়ে দিল। ঘরের আলো আবছা হয়ে এলে দুটি তপ্ত শরীর আর মন একাকার হয়ে যেতে লাগল। ভালোবাসার এক গভীর, তীব্র আর মাতাল করা সুবাসে পুরো ঘর মেতে উঠল। এতদিন ধরে জমতে থাকা সব রহস্য আর বাধার দেয়াল ভেঙে তারা দুজন এক আত্মায় পরিণত হলো।
কিন্তু... রাত যখন শেষ হয়ে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল, সাদিকের ফোনের স্ক্রিনে একটা অচেনা নম্বর থেকে এক গোপন ফাইল রিসিভ হলো।
ফাইলের শিরোনামে লেখা—"মেহজাবিনের আসল পরিচয় ও ৫ বছর আগের সেই বৃষ্টিভেজা দিনের গোপন সত্যি।"
সাদিক ঘুমন্ত মেহজাবিনের দিকে একবার তাকাল, তারপর ফোনটা হাতে নিয়ে ফাইলটা খুলল। আর সেটা পড়ার সাথে সাথে সাদিকের মুখের রঙ পুরোপুরি সাদা হয়ে গেল!
ভোরের ফ্যাকাশে আলো কাচের জানালা গলে ঘরে এসে পড়ছে। মেহজাবিন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ওর চুলে সাদিকের হাতের স্পর্শ এখনও যেন লেগে আছে। কিন্তু সাদিক খাটের পাশে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখ দুটো মোবাইল স্ক্রিনের দিকে নিবদ্ধ।
স্ক্রিনে খোলা ফাইলটি কোনো ক্ষতিকর তথ্য ছিল না, বরং ছিল পাঁচ বছর আগের একটি পুলিশের কেস রিপোর্ট আর হাসপাতালের পুরোনো কিছু আর্কাইভ নথি।
নথিতে পরিষ্কার লেখা—পাঁচ বছর আগে ভার্সিটির সেই বৃষ্টিভেজা দিনে মেহজাবিনকে একদল বখাটে ছেলে তাড়া করেছিল। আর মেহজাবিনকে বাঁচাতে গিয়ে সেদিন এক অচেনা তরুণ নিজের জীবন বাজি রেখে গুন্ডাদের সাথে লড়াই করেছিল। লড়াইয়ে সেই তরুণ মারাত্মক আহত হয় এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়। মেহজাবিন অচেতন সেই ছেলেকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছিল এবং নিজের জমানো সব টাকা দিয়ে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে নাম না জানিয়ে চলে এসেছিল।
আর সেই অচেনা তরুণটি আর কেউ নয়—সাদিক নিজেই!
যে ঘটনা সাদিক এতদিন ভেবে এসেছে কেবলই তার একতরফা ভালোবাসা, যে বৃষ্টিভেজা দিনে সে প্রথম মেহজাবিনকে দেখে প্রেমে পড়েছিল—সেদিন আসলে সাদিক মেহজাবিনকেই বাঁচিয়েছিল। মেহজাবিন তার প্রাণ বাঁচিয়েছিল বলেই সেদিন সাদিক বেঁচে ফিরেছিল, কিন্তু রক্তক্ষরণের কারণে সাদিক তখন জ্ঞান হারিয়ে ফেলায় মেহজাবিনের মুখটা মনে রাখতে পারেনি। সে শুধু মনে রেখেছিল লাল জামদানি পরা একটা মেয়ের ছায়া, যাকে সে পরবর্তীতে ভার্সিটিতে খুঁজে পায়।
সাদিকের চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। ও এতদিন ধরে ভেবে এসেছে সে মেহজাবিনকে একতরফা ভালোবেসে নিজের করে পেয়েছে। কিন্তু ভাগ্য তাদের বহু আগেই একই সুতোয় বেঁধে দিয়েছিল! তাদের এই মিলন কোনো অন্যায় বা জোরজবরদস্তি নয়, এটা ছিল পাঁচ বছর আগে শুরু হওয়া এক অসমাপ্ত ভালোবাসার পরিণতি।
সাদিক মোবাইলটা বন্ধ করে স্লাইড টেবিলে রাখল। ধীরপায়ে খাটের কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসল।
মেহজাবিন ধীরে ধীরে চোখ খুলল। ভোরের আলোয় সাদিকের মুখটা দেখে ওর ঠোঁটে এক স্বর্গীয় হাসি ফুটে উঠল। সে হাত বাড়িয়ে সাদিকের গালে হাত রাখল।
"এত সকালে উঠে দাঁড়িয়ে আছ যে?" মেহজাবিন আলতো গলায় জিজ্ঞেস করল।
সাদিক মেহজাবিনের হাতটা ধরে নিজের ঠোঁটে চেপে ধরল। গভীর আবেগে ওর কণ্ঠ বুজে আসছিল। "মেহজাবিন... পাঁচ বছর আগে হাসপাতালে একটা ছেলেকে তুমি নিজের গহনা বিক্রি করে আর জমানো টাকা দিয়ে বাঁচিয়ে এসেছিলে, মনে আছে?"
মেহজাবিন থমকে গেল। চোখ দুটি বড় বড় করে সে সাদিকের দিকে তাকাল। "তুমি... তুমি কীভাবে জানলে? আমি তো ওকথা কাউকে কোনোদিন বলিনি! ওই ছেলেটার খোঁজ আমি পরে অনেক করেছি, কিন্তু হাসপাতালে কোনো নাম লেখা ছিল না..."
সাদিক মেহজাবিনের কপালে নিজের মাথা ঠেকালো। "কারণ সেই ছেলেটার নাম ছিল সাদিক চৌধুরী। যে মেয়েটি আমার প্রাণ বাঁচিয়ে নাম না জানিয়ে হারিয়ে গিয়েছিল, সে আর কেউ নয়... তুমি, মেহজাবিন।"
মেহজাবিনের বুক ধক করে উঠল। অতীতে হারিয়ে যাওয়া সেই ধোঁয়াশা দৃশ্যগুলো এক লহমায় ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল! সে যে অচেনা ছেলেটিকে বাঁচানোর জন্য বৃষ্টিতে ভিজে রক্তে ভেজা হাত নিয়ে হাসপাতালে কেঁদেছিল... সে আর কেউ নয়, তার এই স্বামী!
"ইয়া আল্লাহ্..." মেহজাবিন রুদ্ধশ্বাসে কেঁদে ফেলল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। দুই বাহু দিয়ে সাদিকের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মুখ গুঁজে দিল।
"আমি যাকে সারা জীবন খুঁজেছি, সে আমার এত কাছে ছিল?" মেহজাবিন ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। "আর আমি তোমাকে কত ভুল বুঝলাম সাদিক! কত আঘাত দিলাম!"
সাদিক মেহজাবিনকে কোলে তুলে সোজা নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। মেহজাবিনের ওড়না খসে পড়ল, এলোমেলো চুলগুলো ছড়িয়ে পড়ল সাদিকের কাঁধে। সাদিক পরম ভালোবাসায় মেহজাবিনের ঘাড়, গাল আর ঠোঁটে গভীর স্পর্শ দিয়ে ওকে শান্ত করার চেষ্টা করল।
"কোনো ভুল বোঝাবুঝি আর আমাদের মাঝে নেই, মেহজাবিন," সাদিক মেহজাবিনের চোখে চোখ রেখে ফিসফিস করে বলল, ওর গলার স্বরে উন্মাদ ভালোবাসা। "আমাদের শুরুটা হয়তো ঝড়ের মধ্যে হয়েছিল, কিন্তু আমাদের শেষটা শুধুই ভালোবাসার।"
মেহজাবিন সাদিকের চোখে চোখ রেখে মুচকি হাসল। ওর চোখ দিয়ে তখনও আনন্দের জল গড়িয়ে পড়ছে। সে সাদিকের ভেজা ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। এবারের স্পর্শে কোনো সংশয় ছিল না, ছিল না কোনো অতীতের ছায়া। ছিল কেবল একে অপরের প্রতি সম্পূর্ণ সমর্পণ আর এক অনন্ত ভালোবাসার অধিকার।
কয়েক মাস পর...
পুরান ঢাকার সেই একশ বছরের পুরোনো বনেদি বাড়ির বিশাল বারান্দা। বৈকালের মিষ্টি সোনাঝরা রোদ এসে পড়েছে বারান্দায়।
মেহজাবিন বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে হালকা নীল রঙের একটা জামদানি শাড়ি, চুলে তাজা বেলি ফুলের গজরা। ওর চেহারায় এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা আর মাতৃত্বের আভা।
হঠাৎ পেছন থেকে একজোড়া শক্ত আর উষ্ণ হাত মেহজাবিনের কোমর পেঁচিয়ে ধরল। সাদিক পেছন থেকে মেহজাবিনকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে ওর ঘাড়ে নিজের চিবুক রাখল।
"কী দেখছ এত মনোযোগ দিয়ে?" সাদিক মেহজাবিনের কানের লতিতে আলতো কামড় দিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
মেহজাবিন শিউরে উঠে সাদিকের বুকের ওপর হেলান দিল। ওর এক হাত চলে গেল নিজের পেটের ওপর, যেখানে এক নতুন প্রাণের স্পন্দন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে।
"দেখছি... কীভাবে একটা ভুল বোঝাবুঝির সম্পর্ক আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হয়ে উঠল," মেহজাবিন হেসে বলল, তারপর সাদিকের দিকে মুখ ফিরিয়ে ওর গাল ছুঁয়ে দিল। "জানেন সাদিক চৌধুরী? আমি আপনাকে প্রথম দিকে সত্যি খুব ঘৃণা করতাম।"
সাদিক মেহজাবিনের কোমর আরও একটু শক্ত করে চেপে ধরে ওকে নিজের দিকে ঘোরালো। সাদিকের চোখের দৃষ্টিতে সেই পরিচিত নেশাক্ত আর মাতাল করা আলো।
"আর এখন?" সাদিক মেহজাবিনের ঠোঁটের একদম কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল।
"আর এখন... এই প্রাণটা বন্ধ হয়ে গেলেও সাদিক চৌধুরীর প্রতি আমার ভালোবাসা থামবে না," মেহজাবিন চোখ বন্ধ করে বলল।
সাদিক আর কোনো কথা বলল না। বিকেল ঘনিয়ে আসা রোদ তাদের দুজনকে এক পরম শান্তিতে ঢেকে দিল, আর সাদিক ডুবে গেল তার জীবনের একমাত্র আশ্রয়—মেহজাবিনের ঠোঁটের গভীরে। যে গল্প শুরু হয়েছিল অনিচ্ছা আর দূরত্বের ছায়া দিয়ে, তা শেষ হলো
জন্ম-জন্মান্তরের এক অবিচ্ছেদ্য রক্তের বন্ধনে।
....