পুরোনো ঢাকার এক চিলতে শান্ত গলি, যেখানে পুরোনো আর নতুনের মিশেলে এক অদ্ভুত দোলাচল বাস করে। বিকেলের রোদটা যখন লালচে হয়ে রেইনট্রি গাছের পাতার ফাঁক গলে ছাদে এসে পড়ে, তখন চারপাশের বাতাসের আর্দ্রতা হঠাৎ ভারী মনে হয়। আদনানের মেজাজটা আজ সকাল থেকেই বিগড়ে আছে। ড্রইংরুমের মাঝামাঝি জায়গায় রাখা তার বিশালাকার ক্যানভাস, আর তার ওপর ঝুলছে একঝাঁক ধুলোবালি। সে একজন স্থপতি ও ফ্রিল্যান্স ইন্টেরিয়র ডিজাইনার; দিনের অধিকাংশ সময় তার কাটে নিজের মতো করে, গভীর শান্তিতে। অথচ সেই শান্তিতে হানা দিতে চলেছে এক অনাকাঙ্ক্ষিত সাইক্লোন।
জরুরি পারিবারিক কারণে আজ থেকে এই চার কামড়ার পুরোনো ধাঁচের পৈতৃক ফ্ল্যাটটিতে উঠতে হচ্ছে মায়াকে। মায়া—আদনানের দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের মেয়ে, যে কিছুদিন হলো শহরে এসেছে নিজের পড়াশোনা আর চাকুরির খাতিরে। পারিবারিক কিছু আইনি ও অর্থনৈতিক ঝামেলার দরুন আদনানের মা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যতদিন না মায়াদের নতুন বাসার ঝামেলা মেটে, সে এই বাড়িতেই থাকবে। ছেলে হিসেবে আদনানের অমত জানানোর কোনো জো নেই, কিন্তু নিজের ব্যক্তিগত পরিসরে অন্য কারও উপস্থিতি সে মেনে নিতে পারে না।
সিঁড়িতে জুতোর শব্দ হতে না হতেই দরজা খুলে গেল। হাতের ট্রলি ব্যাগটা টেনে ভেতরে ঢুকল মায়া। হালকা নীল রঙের সাধারণ একটা সুতি সালোয়ার-কামিজ, কপালে লেপ্টে থাকা ঘামে ভেজা কয়েকটি চুল, আর গাঢ় দুটো চোখ। চোখের দৃষ্টিতে একটু ক্লান্তি, কিন্তু চোয়ালের গঠনে স্পষ্ট জেদ।
"ভেতরে আসতে পারি, নাকি এখানে দাঁড়িয়েই অনুমতি নিতে হবে?" মায়ার কণ্ঠে কোনো জড়তা নেই, বরং স্পষ্ট একধরনের ঔদ্ধত্য।
আদনান দরজার চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে তাকে আপাদমস্তক পরখ করল। চশমার ওপর দিয়ে তার চোখ দুটো যেন মাপছিল মায়ার প্রতিটি ভঙ্গি।
"যদি বলি না, তাহলেও কি আপনি চলে যাবেন?" আদনান ঠান্ডা গলায় বলল, তার কণ্ঠে এক বিন্দু উষ্ণতা ছিল না।
"অবশ্যই না। এই বাড়ির ওপর আপনার যতটুকু অধিকার, আমার পরিবারও ঠিক ততটাই যুক্ত। সুতরাং খামোখা মেজাজ না দেখিয়ে পথটা ছাড়ুন।"
মায়া ব্যাগটা টেনে ভেতরে ঢুকে একপাশে রেখে দিল। ড্রইংরুমের বিশাল ক্যানভাস আর চারপাশে ছড়ানো স্কেচবুক দেখে তার চোখের কোণে বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল। সে হাত বাড়িয়ে টেবিলের ওপর থেকে আদনানের শেষ করা একটা থ্রিডি নকশা একপাশে সরিয়ে রাখতে যেতেই আদনান দ্রুত এগিয়ে এলো।
"হাত দেবেন না!" আদনানের চড়া গলায় থমকে গেল মায়া।
আদনান একদম মায়ার সামনে এসে দাঁড়াল। তাদের মাঝের দূরত্ব এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির। আদনানের লম্বা, চওড়া শরীরের ছায়া পুরোপুরি ঢেকে দিল মায়াকে। আদনানের গায়ের পুরুষালি সেন্ট আর হালকা সিগারেটের ঘ্রাণ মায়ার নাকে ধাক্কা মারল। মায়া এক মুহূর্তের জন্য যেন একটু থমকে গেল, কিন্তু চোখ নামাল না। সরাসরি আদনানের চোখের দিকে তাকাল।
"আপনি যদি জিনিসপত্র এভাবে মাঝরাস্তায় ছড়িয়ে রাখেন, তবে মানুষের চলাফেরার তাগিদে সরাতেই হবে," মায়া সটান জবাব দিল, যদিও তার বুকের ভেতরের স্পন্দন একটু দ্রুত হয়ে উঠেছিল।
"এটা আমার কাজের জায়গা। এই বাড়িতে আপনার জায়গা একটা নির্দিষ্ট ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। আশা করি, আমার পার্সোনাল স্পেসের মূল্য আপনি বুঝতে পারবেন," আদনান নিচু কিন্তু শক্ত স্বরে বলল।
"পার্সোনাল স্পেস?" মায়া একটু তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। "এই চার দেয়ালের মধ্যে থাকার কোনো বাড়তি আগ্রহ আমারও নেই, আদনান সাহেব। পরিস্থিতি আমাকে এখানে এনেছে। তাই নিজের অহংকারটা একটু কম রাখাই ভালো।"
কথাটা বলেই মায়া তার সুটকেসটা টেনে নিয়ে নির্ধারিত গেস্ট রুমের দিকে পা বাড়াল। দরজায় হাত দিয়ে একবার পেছনে ফিরে তাকাল সে। আদনান তখনও আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখ দুটো মায়ার ওপর আটকে।
প্রথম দিনের প্রথম সংঘর্ষটা এভাবেই শেষ হলেও, তাদের ঘরের বাতাসের চার্জ কমে গেল না। রাত নামার সাথে সাথে বাইরের ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। পুরোনো ঢাকার এই বাড়িগুলোর ছাদ থেকে জল পড়ার টুপটুপ শব্দ আর বাতাসের গর্জন পরিবেশটাকে কেমন যেন এক অদ্ভুত আবহে মুড়ে দিল।
রাত বারোটা। আদনান তার স্টাডি রুমে বসে একটা নতুন প্রেজেক্টের নকশা আঁকছিল। লাইটের টেবিল ল্যাম্পের আবছা আলো তার মেধা আর গাম্ভীর্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। হঠাৎ মনে হলো কিচেন থেকে কিসের যেন শব্দ আসছে। এক ফোঁটা কফি খাবে ভেবে সে ঘর থেকে বের হলো।
রান্নাঘরে গিয়ে সে অবাক হয়ে গেল। অন্ধকারে আধো আলোয় দাঁড়িয়ে আছে মায়া। বৃষ্টির কারণে ঘর কিছুটা ঠান্ডা, তাই মায়া কাঁধের ওপর একটা গাঢ় রঙের চাদর জড়িয়ে নিয়েছে। সে চুলগুলো উঁচু করে বাঁধার চেষ্টা করছিল, কিন্তু কিছু আলগা চুল ঘাড়ের ওপর গড়িয়ে পড়েছিল। কাউন্টারে রাখা ক্যাটলিতে জল ফুটছে।
আদনান দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল। কাঠজুড়ে তার পায়ের হালকা শব্দেই মায়া চকিতে পেছনে তাকাল।
"জল লাগবে আপনার?" মায়া একটু স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে জিজ্ঞেস করল।
"এটা আমার রান্নাঘর। এখানে কি করব না করব, তা জানতে চাওয়াটা বোকামি," আদনান ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকল।
সে মায়ার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াল কফির বয়ামটা নেওয়ার জন্য। তাদের মধ্যে কোনো দূরত্ব থাকল না। আদনানের বুক প্রায় ছুঁয়ে যাচ্ছিল মায়ার পিঠ। আদনানের নিঃশ্বাসের উত্তাপ মায়ার খোলা ঘাড়ে এসে পড়তেই মায়ার সমস্ত শরীর শিহরিত হয়ে উঠল। সে একচুল সরতে গেল, কিন্তু আদনান তার এক হাত কাউন্টারে রেখে মায়ার পথ আটকে দিল।
"কাজে বাধার সৃষ্টি করা আমার পছন্দ নয়," আদনান কফির বয়ামটা তুলে নেওয়ার সময় একেবারে মায়ার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল।
মায়ার বুকের ভেতরটা হঠাৎ তোলপাড় হয়ে উঠল। আদনানের এত কাছে থাকাটা তার শরীরে এক অজানা অনুভূতির সৃষ্টি করল। আদনানের সুগঠিত শরীর, তার উষ্ণ নিঃশ্বাস আর গায়ের সেই অদ্ভুত আকর্ষণীয় ঘ্রাণ—সবকিছু মায়ার মনের মধ্যকার সমস্ত যুক্তি এলোমেলো করে দিচ্ছিল। মায়া ঘুরে দাঁড়াতে চাইল, আর সেই চেষ্টায় সে আদনানের বুকের সাথে আরও চেপে গেল।
আদনানের দৃষ্টি নেমে এল মায়ার ভেজা, কাঁপা ঠোঁটের ওপর। ঘরে জ্বলছিল শুধু রেফ্রিজারেটরের আবছা আলো। সেই আলো-আঁধারিতে আদনানের চোখের দৃষ্টি এতই গভীর আর কামনাময় লাগছিল যে মায়া একমুহূর্তের জন্য শ্বাস নিতে ভুলে গেল।
"আপনি কি সবসময় এরকম উদণ্ড?" আদনানের গলা আগের চেয়ে অনেক বেশি গমগমে শোনালো, যার মধ্যে কোনো রাগ ছিল না, ছিল এক চরম আকর্ষণের টান।
"আমি... আমি সরতে চাইছি," মায়ার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল। তার জেদি স্বভাবটা যেন এই অচেনা উত্তাপের সামনে মোমের মতো গলতে শুরু করেছিল।
আদনান সরলো না। সে মায়ার খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল, তার লম্বা আঙুল দিয়ে মায়ার কানের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়া একগুচ্ছ চুল ধীরে ধীরে পেছনে সরিয়ে দিল। আদনানের আঙুলের স্পর্শ মায়ার নরম ত্বকে লেগে এক বিদ্যুৎ তরঙ্গের সৃষ্টি করল। মায়া চোখ বুজে ফেলল এক অদ্ভুত অনুভূতির তীব্রতায়। আদনানের ঠোঁট মায়ার কানের কাছে নেমে এল, "প্রথম দিনেই এতো কাছে আসা ভালো নয়, মায়া... সামলাতে পারবে তো?"
আদনানের কথার উষ্ণতা আর ঠোঁটের হালকা ছোঁয়া মায়ার কানের লতিতে লাগতেই সে কেঁপে উঠল। আদনানের হাত মায়ার কোমরের চাদরটা আঁকড়ে ধরল, তাকে যেন আরও একটু কাছে টেনে নেওয়ার জন্য। তাদের দুজনার ভেজা নিঃশ্বাস একে অপরের সাথে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। এক তীব্র, দমবন্ধ করা আকর্ষণ তাদের দুজনকে গ্রাস করতে চাইছিল।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরের বিদ্যুতের বিকট শব্দে মায়ার খেয়াল ফিরল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে আদনানের বুকে হালকা ধাক্কা দিয়ে পিছিয়ে গেল।
"নিজের সীমারেখা মনে রাখলেই ভালো হয়, আদনান সাহেব," মায়া হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, যদিও তার চোখের চঞ্চলতা তার ভেতরের তোলপাড়কে লুকিয়ে রাখতে পারছিল না।
আদনান একটু বাঁকা হাসল, তার চোখে এক বিজয়ের তীব্র আলো। সে শান্তভাবে কফির মগে গরম জল ঢালল।
"সীমার কথা তুমিই বললে, মায়া। মনে রেখো, খেলাটা তুমি শুরু করোনি।"
মায়া আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। নিজের গ্লাসের জল নিয়ে দ্রুত নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। ঘরে এসে দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা যেন ফেটে বের হয়ে আসবে। ঘাড়ে আর কানের কাছে আদনানের হাতের স্পর্শ এখনও যেন স্পষ্ট জ্বালাচ্ছে। এক অদ্ভুত কামনার উত্তাপ তার শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে, কিচেনে দাঁড়িয়ে কফির মগে চুমুক দিল আদনান। তার চোখের সামনে এখনও মায়ার সেই কাঁপা ঠোঁট আর চোখ বোজা মুখটা ভেসে উঠছে। এক অপরিচিত কামনার আগুন তার ভেতরে জ্বলতে শুরু করেছে, যা সে চাইলেও নেভাতে পারছে না। এই বাড়ির দিনগুলো যে মোটেও শান্তিপূর্ণ হবে না, তা আদনান বেশ ভালোভাবেই বুঝে গেল। প্রথম পর্বের এই ঝড় কেবল শুরু, যার পেছনে লুকিয়ে আছে আরও তীব্র, আরও গভীর কোনো আকর্ষণ।
রাতের সেই ঘটনাটার পর সকালের আলো ফুটে উঠলেও ঘরের পরিবেশ হালকা হলো না। ভোরের হালকা রোদ যখন ড্রইংরুমের বড় জানালায় এসে পড়ল, তখন চারপাশের নীরবতা আরও বেশি ভারী মনে হচ্ছিল। মায়া রাতে প্রায় ঘুমোতেই পারেনি। প্রতিবার চোখ বুজলেই আদনানের সেই গভীর চোখের চাহনি, তার গায়ের ঘ্রাণ আর কানের কাছে নিঃশ্বাসের উত্তাপ তাকে অস্থির করে তুলছিল।
সকাল আটটায় মায়া ঘর থেকে বের হলো। সুতি শাড়িটা সুবিন্যস্তভাবে পরার চেষ্টা করেছে সে, কাজের উদ্দেশ্যে বের হতে হবে। ড্রইংরুমে আসতেই দেখল আদনান সোফায় বসে আছে। পরনে একটি কালো টি-শার্ট আর ক্যাজুয়াল ট্রাউজার। ল্যাপটপের স্ক্রিনে তার চোখ, হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ। চুলগুলো কিছুটা অগোছালো, যা তাকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলছে।
মায়া তাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে কিচেনের দিকে যেতে চাইল। কিন্তু আদনানের গম্ভীর গলা তাকে থামিয়ে দিল।
"চা বা কফি কোনটা খাবে?"
মায়া থমকে দাঁড়াল। পেছনে না ফিরেই বলল, "ধন্যবাদ, আমি নিজেই বানিয়ে নিতে পারব।"
"আমি অলরেডি বেশি করে বানিয়েছি। ফালতু জেদ না দেখিয়ে টেবিলে এসে বসো," আদনান ল্যাপটপ থেকে চোখ না তুলে শান্ত অথচ নির্দেশাত্মক স্বরে বলল।
মায়া কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অহেতুক ঝগড়া করার মানসিকতা তার নেই। সে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসল। আদনান উঠে এসে দুটো মগ রাখল টেবিলে—একটা কফি, অন্যটা লাল চা।
"আমি জানি তুমি সকালে চা পছন্দ করো," আদনান মায়ার সামনাসামনি বসে কফিতে চুমুক দিল।
মায়া একটু অবাক হলো। আদনান কীভাবে জানল সে চা পছন্দ করে? সে কি তবে মায়ার ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়েছে? মায়ার অস্বস্তি কিছুটা বাড়ল, তবে সে চায়ের কাপে চুমুক দিল। লবঙ্গ আর আদার সুবাসে মনটা একটু শান্ত হলো।
"আজ তোমার অফিসে কতক্ষণ থাকতে হবে?" আদনান হঠাৎ প্রশ্ন করল।
"কেন? আমার সময়ের হিসেবও কি আপনাকে দিতে হবে?" মায়া চায়ের কাপটা রেখে একটু চড়া সুরে বলল।
আদনান টেবিলের ওপর ঝুঁকে এল। তার চোখ দুটো মায়ার চোখের একদম গভীরে গিয়ে বিঁধল। "তোমার হিসেব রাখা আমার শখ নয়, মায়া। কিন্তু এই বাড়ির কিছু নিয়ম আছে। মা আমাকে বলে দিয়েছেন তোমার খেয়াল রাখতে। তাই তুমি কোথায় যাচ্ছ, কখন ফিরছ—এটা জানা আমার দায়িত্ব।"
"আমাকে বাচ্চা ভাববেন না। আমি নিজের খেয়াল নিজে রাখতে পারি," মায়া চোখ ছোট করে বলল।
"তাই নাকি?" আদনান একটু হাসল, সেই হাসিতে এক অদ্ভুত মোহনীয়তা ছিল। "কাল রাতে তো মনে হলো না তুমি নিজেকে সামলাতে পারো। এক ফোঁটা কফির বাটি নিতে গিয়েই তো তোমার শ্বাস আটকে যাচ্ছিল।"
কথাটা শুনে মায়ার মুখের রঙ এক মুহূর্তে বদলে গেল। রাগে আর লজ্জায় তার গাল দুটো লাল হয়ে উঠল। সে চট করে টেবিল থেকে উঠে দাঁড়াল।
"আপনি বড্ড বেশি মুখচালান করছেন, আদনান সাহেব! কাল রাতের ঘটনাটা একটা ভুল ছিল। সেটিকে বারবার সামনে আনবেন না।"
আদনানও ধীরস্থিরভাবে নিজের জায়গা থেকে উঠল। সে লম্বা পদক্ষেপে মায়ার দিকে এগিয়ে এল। মায়া কিছুটা পিছিয়ে ডাইনিং সাইডবোর্ডের সাথে ঠেকে গেল। তার আর পালানোর জায়গা রইল না। আদনান তার দুই পাশে হাত রেখে সাইডবোর্ডে ভর দিল, মায়াকে নিজের বুকের মাঝে বন্দি করে ফেলল।
"ভুল?" আদনান নিচু ও গভীর স্বরে বলল, তার ঠোঁটে এক রহস্যময় তাচ্ছিল্যের হাসি। "যদি ওটা ভুল হয়ে থাকে, তবে তোমার ওই কাঁপা ঠোঁট আর বুকের দ্রুত স্পন্দন কী বলছিল, মায়া? ওটাও কি ভুল ছিল?"
আদনানের গায়ের উত্তাপ মায়াকে আবারও আচ্ছন্ন করতে লাগল। মায়া অনুভব করছিল তার নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাচ্ছে। আদনানের এত কাছে থাকাটা তার ভেতরের সুপ্ত কামনার দাবানলকে উসকে দিচ্ছে। সে আদনানের বুকের ওপর নিজের দুটো নরম হাত রাখল, তাকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু আদনানের শক্ত, পেশিবহুল বুক এক চুলও নড়ল না। উল্টে আদনান মায়ার কোমরে এক হাত জড়িয়ে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল।
"হাত সরাব?" আদনানের আঙুল মায়ার সুতি শাড়ির আঁচল সরিয়ে খালি কোমরের নরম ত্বকে গিয়ে স্পর্শ করল।
মায়ায় শরীর জুড়ে যেন এক তীব্র বিদ্যুতায়িত তরঙ্গ খেলে গেল। সে নিজের অজান্তেই একটা ছোট আকুতি করে উঠল, "আদনান... ছাড়ুন..."
"সত্যিই ছেড়ে দেব?" আদনানের ঠোঁট এখন মায়ার গালে খুব কাছে। মায়ার শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি দ্রুত হয়ে উঠেছে। আদনানের হাতের স্পর্শ মায়ার কোমরের খাঁজে ধীরে ধীরে গভীরে নামছিল, প্রতিটা স্পর্শে মায়ার শরীরের ভেতরের আগুনটা দ্বিগুণ হয়ে ফুটছিল।
মায়া চোখ বুজে ফেলল। তার জেদ, তার অহংকার—সব যেন এই একটি মানুষের পুরুষালি দাপটের সামনে খড়কুটোর মতো উড়ে যাচ্ছিল। আদনানের অন্য হাতটি উঠে এল মায়ার চিবুকে। সে মায়ার মুখটা একটু ওপরে তুলে নিজের ঠোঁট দুটো মায়ার ঠোঁটের ঠিক এক মিলিমিটার ওপরে রাখল। তাদের উভয়ের নিঃশ্বাস মিশে এক তীব্র উত্তপ্ত আবহের সৃষ্টি করল।
"বলো, ছেড়ে দেব?" আদনান আবার ফিসফিস করে বলল, তার ঠোঁট মায়ার ঠোঁটে ঘষে যাচ্ছিল হালকাভাবে।
মায়ায় মুখ থেকে কোনো কথা বের হলো না। সে শুধু আদনানের শার্টের কলারটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। তার এই ভঙ্গিটাই ছিল এক নীরব সম্মতি, এক চরম আকিঞ্চন।
আদনান আর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারল না। সে মায়ার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল—এক তীব্র, ক্ষুধাতুর আর পাওয়ার গভীর তৃষ্ণায়। মায়াও যেন নিজের সমস্ত বাধা ভুলে সেই চুম্বনে সাড়া দিল। তাদের মাঝের সমস্ত রাগ, সমস্ত তিক্ততা এক মুহূর্তে দূর হয়ে গেল, জায়গা নিল এক সীমাহীন শারীরিক আর মানসিক আকর্ষণ।
ঘরজুড়ে শুধুই তখন তাদের ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ। আদনানের হাত মায়ার পিঠ ধরে তাকে আরও শক্ত করে নিজের শরীরে চেপে ধরেছিল, আর মায়াও নিজেকে সঁপে দিয়েছিল সেই নিষিদ্ধ উত্তাপের জোয়ারে।
কিছুক্ষণ পর, যখন দুজনেই শ্বাস নেওয়ার জন্য সামান্য আলাদা হলো, মায়ার ঠোঁট দুটো তখন রক্তিম আর ফোলা দেখাচ্ছিল। তার চোখে এক অচেনা কামনার ঘোর। আদনান মায়ার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "এটাকে অন্তত ভুল বোলো না, মায়া।"
মায়া কোনো উত্তর দিতে পারল না। সে আদনানের বুকের মধ্য থেকে বের হয়ে নিজের ব্যাগটা তুলে নিয়ে প্রায় দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় মায়ার বুকের ভেতরটা প্রচণ্ডভাবে ধুকপুক করছিল। সে বুঝতে পারছিল, এই আদনান নামের মানুষটি তার জীবনের সব সমীকরণ ওলটপালট করে দিচ্ছে। আর আদনান জানালায় দাঁড়িয়ে মায়াকে চলে যেতে দেখে এক গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। সে জানত, এই আকর্ষণের শেষ কোথায় সে জানে না, কিন্তু সে মায়াকে নিজের থেকে আর দূরে পাঠাতে পারবে না।
অফিসে পুরোটা দিন মায়ার কাটল তীব্র অস্থিরতায়। কম্পিউটারের স্ক্রিনে সংখ্যাগুলো ভেসে উঠছিল ঠিকই, কিন্তু চোখের সামনে বার বার ভেসে উঠছিল আদনানের সেই গভীর কৃষ্ণবর্ণ চোখ আর ঠোঁটের স্পর্শ। নিজের গালে হাত দিয়ে মায়া বেশ কয়েকবার শিউরে উঠেছে। শরীরটা কেমন যেন হালকা আর অবশ লাগছিল। জীবনের এতগুলো বসন্তে কোনো পুরুষ তাকে এভাবে তোলপাড় করে তুলতে পারেনি। আদনান কেবল তার শরীরের ওপর অধিকার দেখায়নি, যেন তার আত্মায় এক চরম তোলপাড় সৃষ্টি করে দিয়ে গেছে।
সন্ধ্যা নামার আগেই আকস্মিক মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। কালবৈশাখীর মতো হঠাৎ আসা ঝড় পুরো শহরকে এক নিমেষে থমকে দিল। মায়া যখন ভিজে একাকার হয়ে বাসায় পৌঁছাল, তখন পুরো ফ্ল্যাট অন্ধকারে ডুবে আছে—বিদ্যুৎ চলে গেছে।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই একটা ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা এসে মায়ার গায়ে লাগল।
"আদনান সাহেব?" মায়া অন্ধকারে হাতড়ে ডাকল।
কোনো সাড়াশব্দ নেই। মায়া ড্রইংরুম পার হয়ে নিজের ঘরের দিকে যেতেই হঠাৎ একটা শক্ত হাত তার কবজি আঁকড়ে ধরল। মায়া চমকে উঠে চিৎকার দিতে যাবে, অমনি অন্য একটা হাত এসে তার মুখ চেপে ধরল।
গাড় ঘ্রাণ আর সুপরিচিত উত্তাপ—কথা বলার প্রয়োজন ছিল না, মায়া নিমেষেই চিনে ফেলল তাকে। আদনান তাকে টেনে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নিল।
"শব্দ কোরো না," আদনানের কণ্ঠস্বর এই অন্ধকারে আরও বেশি গম্ভীর আর কামনাময় শোনালো। "বিদ্যুৎ নেই, তার ওপর তুমি একা ভিজে একাকার হয়ে আছো।"
"ছাড়ুন আমাকে... আমি পোশাক বদলে আসব," মায়া মুখ মুক্ত করে ধুঁকতে ধুঁকতে বলল। ভিজা সুতি শাড়িটা তার শরীরের সাথে এমনভাবে লেপ্টে ছিল যে প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গঠন স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।
আদনান অন্ধকারেই দেশলাই জ্বেলে একটা মোমবাতি জ্বালাল। মোমের ক্ষীণ লালচে আলোয় মায়ার ভেজা শরীর, কপাল বেয়ে গাল গড়িয়ে পড়া জলের ফোঁটা আর তার থরথর করে কাঁপা দেখে আদনানের চোখের মনি বড় হয়ে উঠল। সেই আলো-আঁধারিতে মায়াকে কোনো এক অপ্সরীর মতো লাগছিল।
"তুমি কাঁপছো, মায়া," আদনান নিচু গলায় বলল। সে মায়ার ভিজে চটচটে হওয়া আঁচলটা ধরে ধীরে ধীরে টান দিল।
"কী... কী করছেন আপনি?" মায়া নিজের হাত দিয়ে শাড়ির আঁচলটা ধরে রাখার চেষ্টা করল, কিন্তু তার কণ্ঠস্বরে কোনো জোর ছিল না।
"তোমাকে শুকোচ্ছি," আদনান এক হাত দিয়ে মায়ার হাত দুটোকে মাথার ওপরে ধরে দরজার ফ্রেমের সাথে চেপে ধরল। মোমের আলোয় আদনানের সুগঠিত শরীর আর উদোম বুকের স্পষ্ট রূপ দেখে মায়ার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
আদনান তার অন্য হাত দিয়ে এক টুকরো তোয়ালে নিয়ে মায়ার মুখ, গলা আর ঘাড়ে জমেই থাকা জলের ফোঁটাগুলো ধীরে ধীরে মুছে দিতে লাগল। তোয়ালের খসখসে স্পর্শের চেয়েও বেশি মায়ার শরীরে আগুন জ্বালাচ্ছিল আদনানের আঙুলের স্পর্শ। আদনান যখন তোয়ালেটি মায়ার ভেজা ব্লাউজের ওপর দিয়ে তার বুক আর পেটের দিকে নামিয়ে আনল, মায়া চোখ বন্ধ করে এক তীব্র সুখে কঁকিয়ে উঠল।
"আদনান... দয়া করে..." মায়ায় অবশ কণ্ঠ থেকে শুধু এটুকু ফুটল।
"দয়া করতে বলো না, মায়া। আজ রাতে নিজেকে আটকানোর কোনো ইচ্ছে আমার নেই," আদনান ফিসফিস করে বলল।
সে তোয়ালেটা ফেলে দিল। তারপর নিজের ঠোঁট নামিয়ে আনল মায়ার ভেজা ঘাড়ে। উন্মুক্ত ঘাড় আর কাঁধে আদনানের গরম ঠোঁটের স্পর্শ লাগতেই মায়া তার হাত দুটো আদনানের চুলগুলোর মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে তাকে আরও শক্ত করে নিজের দিকে টেনে নিল। আদনানের কামনার তীব্রতা মায়াকে উন্মাদ করে তুলছিল। সে তার সমস্ত আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল।
আদনান মায়ার কোমরের ভাঁজে হাত রেখে তাকে পাজাকোলা করে তুলে নিল। সোজা নিয়ে গেল নিজের শয়নকক্ষে। বিছানায় মায়াকে শুইয়ে দিয়ে সে তার ওপর ঝুকে পড়ল। মোমের আবছা আলোয় দুজনের চোখ মিলল। সেখানে আর কোনো ঘৃণা, কোনো জেদ বা কোনো ঝগড়ার জায়গা ছিল না—ছিল শুধুই এক অমোঘ, নিবিড় আকাঙ্ক্ষা।
আদনান মায়ার ভেজা ব্লাউজের হুকগুলো একে একে খুলতে শুরু করল। মায়া কোনো বাধা দিল না, বরং সে তার শরীরটাকে আদনানের সমর্পণে তুলে দিল। আদনানের ঠোঁট মায়ার গাল, থুতনি গড়িয়ে নেমে এল তার স্তনবৃত্তে। মায়া এক তীব্র শিহরণে পিঠ ধনুকের মতো বাঁকিয়ে ফেলল। আদনানের প্রতিটা চুম্বন, তার দাঁতের হালকা কামড় মায়ার শিরায় শিরায় এক নিষিদ্ধ কামনার জোয়ার এনে দিল।
"তুমি শুধু আমার, মায়া... এই শরীর, এই মন—সব আমার," আদনান গভীর আবেগে ফিসফিস করে বলল, তার হাত মায়ার নগ্ন পিঠ ঘেঁষে কোমরের দিকে নেমে যাচ্ছিল।
মায়া আদনানের পিঠে নিজের নখ বিধিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, "তবে আমাকে নিজের করে নাও, আদনান... আর দূরে রেখো না।"
ঝড়ের রাতে, বাইরের বৃষ্টির ঝমঝম শব্দের সাথে তালে তাল মিলিয়ে ঘরের ভেতর দুটো শরীর এক অদ্ভুত ভালোবাসার আর কামনার আগুনে পুড়তে লাগল। আদনানের প্রতিটি স্পর্শে মায়া হারিয়ে যাচ্ছিল এক অচেনা স্বর্গে, যেখানে কোনো বাস্তবতা নেই, নেই কোনো বাধা। গভীর রাতে যখন দুজনেই ক্লান্ত হয়ে একে অপরের বুকে মাথা রেখে শুয়ে রইল, তখন মায়া অনুভব করল—আদনান কেবল তার শরীরে নয়, তার হৃদয়েও এক দীর্ঘস্থায়ী দাগ কেটে ফেলেছে।
ঝড়ের রাতের সেই ঘন উন্মাদনার পর ভোরের আলো যখন ঘরে এসে পড়ল, তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি মায়াকে জড়িয়ে ধরেছিল। আদনানের শক্ত, উষ্ণ বুকের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে ছিল সে। আদনানের একটি হাত মায়ার উন্মুক্ত কোমর পেঁচিয়ে শক্ত করে বাঁধা। সকালে চোখ খুলেই আদনান মায়ার কপালে এক দীর্ঘ স্পর্শ এঁকে দিল। কাল রাতের সেই চণ্ড রূপ আজ নেই, তার জায়গায় খেলা করছে এক গভীর অনুরাগ আর প্রশান্তি।
"শুভ সকাল," আদনানের কণ্ঠটা ঘুমভাঙা সকালে আরও বেশি মখমলি শোনালো।
মায়া লজ্জা পেয়ে তার বুকের মধ্যে মুখ লুকাল। কাল রাতের প্রতিটি উন্মাদ মুহূর্তের কথা মনে পড়তেই তার সারা শরীরে এক মিষ্টি রোমাঞ্চ খেলে গেল। সে আদনানের বুকে হালকা চাপ দিয়ে বলল, "ছাড়ুন এবার, সকাল হয়ে গেছে। আমাকে উঠতে হবে।"
"এত সহজে মুক্তি নেই, মায়া," আদনান মায়ার থুতনি ধরে নিজের দিকে তুলে এনে তার রক্তিম ঠোঁটে একটা গাঢ় চুম্বন বসাল। "তুমি এখন পুরোপুরি আমার।"
কিন্তু এই মিষ্টি মুহূর্তের মেয়াদ খুব বেশি সময় স্থায়ী হলো না। দুপুর গড়াতেই ফ্ল্যাটের কলিং বেলটা তীব্র আওয়াজে বেজে উঠল।
মায়া ড্রইংরুমে গিয়ে দরজা খুলতেই চমকে উঠল। দরজায় দাঁড়িয়ে ফাহাদ। ফাহাদ মায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো বন্ধু এবং পেশায় একজন উঠতি ব্যবসায়ী। মায়াদের পরিবারের সাথে ফাহাদের দীর্ঘদিনের জানাশোনা, এমনকি মায়ার কঠিন সময়ে ফাহাদ সবসময় পাশে থেকেছে।
"ফাহাদ? তুমি হঠাৎ এই সময়ে?" মায়া অবাক হয়ে বলল।
"হঠাৎ না, মায়া। তোমার নতুন ঠিকানার কাজ গুছিয়ে নেওয়ার জন্যই এলাম," ফাহাদ হেসে ভেতরে ঢুকল। তার হাতে বেশ কিছু ফুলের তোড়া আর মায়ার পছন্দের মিষ্টির প্যাকেট।
ঠিক তখনই নিজের ঘর থেকে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে বের হয়ে এলো আদনান। পরনে শার্ট নেই, কেবল একটা প্যান্ট। তার সুগঠিত চওড়া শরীরে কাল রাতের কিছু কামড় আর আঁচড়ের দাগ স্পষ্ট। আদনান দরজায় ফাহাদকে দেখে থমকে দাঁড়াল। তার শান্ত চোখ দুটো মুহূর্তের মধ্যে হিংস্র হয়ে উঠল।
"মায়া, ইনি কে?" ফাহাদ কিছুটা ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল।
"ও... উনি আদনান সাহেব। এই বাড়ির..." মায়া কথা শেষ করার আগেই আদনান এগিয়ে এল।
আদনান সরাসরি এসে মায়ার পেছনে দাঁড়াল এবং অত্যন্ত অধিকারপ্রবণ ভঙ্গিতে মায়ার কাঁধে এক হাত রাখল। তার চোখ দুটো ফাহাদের ওপর স্থির।
"আমি আদনান। আর আপনি?" আদনানের গলার স্বর বরফের মতো ঠান্ডা ও ধারালো।
"আমি ফাহাদ। মায়ার খুব কাছের বন্ধু... বলতে পারেন পরিবারেরই একজন," ফাহাদ হাত বাড়াল।
আদনান সেই বাড়ানো হাত পুরোপুরি উপেক্ষা করল। মায়ার কাঁদে তার হাতের চাপ আরও শক্ত হলো। "কাছের বন্ধু? ভালো। কিন্তু মায়ার ব্যাপারে যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার এখন শুধুই আমার। সুতরাং আপনার উপস্থিতিটা না বাড়ালেই ভালো হয়।"
"আদনান! এটা কেমন ব্যবহার?" মায়া হতবাক হয়ে আদনানের দিকে তাকাল। ফাহাদের সামনে আদনানের এমন সরাসরি অধিকার দেখানো আর রূঢ় আচরণ তাকে ভীষণ অস্বস্তিতে ফেলে দিল।
ফাহাদ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে বলল, "মায়া, তোমার বাবা আমাকে বলেছিলেন তোমার থাকার অন্য একটা ভালো ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করতে। আমি ধানমন্ডিতে একটা সুন্দর অ্যাপারমেন্ট খালি পেয়েছি। আগামী কালই তুমি সেখানে শিফট করতে পারো। তোমাকে এই অচেনা জায়গায় কষ্টে থাকতে হবে না।"
কথাটা শোনামাত্র আদনানের শরীরের রক্ত যেন মাথায় উঠে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
"কষ্ট?" আদনান তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। সে মায়াকে এক টানে নিজের আরও কাছে টেনে এনে তার কোমরে হাত রাখল। ফাহাদের একদম চোখের সামনে মায়ার সুতি কামিজের ওপর দিয়েই তার কোমরের বাঁকে হাত বুলিয়ে দিল।
মায়া লজ্জায় আর ভয়ে লাল হয়ে উঠল। সে আদনানের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে ফিসফিস করে বলল, "আদনান, কী করছেন? ছাড়ুন!"
"কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নেই," আদনান ফাহাদের দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠল। "মায়া এই বাড়িতেই থাকবে। আমার কাছে, আমার চোখের সামনে। আপনি এখন আসতে পারেন।"
ফাহাদ কিছুটা অপমানিত ও ক্ষুব্ধ বোধ করল। সে মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল, "মায়া, লোকটির আচরণ কিন্তু স্বাভাবিক লাগছে না। তুমি কি সত্যিই এখানে নিরাপদ?"
"মায়া কোথায় নিরাপদ, সেটা আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি," আদনান একপ্রকার হিংস্র ভঙ্গিতে মায়ার হাত ধরে টেনে নিজের ঘরের দিকে নিয়ে যেতে লাগল।
"ফাহাদ, তুমি এখন যাও... আমি পরে তোমার সাথে কথা বলছি," মায়া কোনোমতে বলল, কারণ আদনানের এই হিংস্র আর মাতাল করা রূঢ় রূপ দেখে সে ভেতর থেকে কেঁপে উঠেছে।
ফাহাদ বিরক্তি আর অসন্তোষ নিয়ে বের হয়ে যেতেই আদনান সশব্দে দরজা বন্ধ করে দিল। মায়াকে ঘরের দেয়ালের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল সে। আদনানের চোখে তখন হিংসা, ক্ষোভ আর তীব্র কামনার এক দাবানল জ্বলছে।
"অন্য একজন পুরুষ এসে তোমাকে নিয়ে যাওয়ার কথা বলবে, আর তুমি চুপ করে শুনবে?" আদনান মায়ার দুই চোয়াল এক হাতে শক্ত করে চেপে ধরল।
"ও আমার বন্ধু, আদনান! আপনি এত অভদ্র কেন?" মায়া চেঁচিয়ে উঠল।
"বন্ধু?" আদনান মায়ার কানের কাছে নেমে এসে দাঁত দিয়ে হালকা কামড় দিল। মায়া যন্ত্রণায় ও এক অজানা শিহরণে কঁকিয়ে উঠল। "ওই লোকটার চোখে আমি স্পষ্ট তোমাকে পাওয়ার লোভ দেখেছি, মায়া। কিন্তু সে জানে না, তুমি কার!"
আদনান মায়ার কামিজের কলারটা এক ধাক্কায় কিছুটা ছিঁড়ে দিল। মোমের মতো শুভ্র কাঁধ উন্মুক্ত হতেই আদনান নিজের ক্ষুধাতুর ঠোঁট চেপে ধরল সেখানে। তার প্রতিটা স্পর্শে ছিল তীব্র অধিকার আর ঈর্ষার জ্বালা। মায়া ছটফট করতে লাগল, কিন্তু আদনানের পুরুষালি শক্তির সামনে তার সব শক্তি ব্যর্থ হয়ে গেল।
"আদনান... ছাড়ুন... দয়া করে এত হিংস্র হবেন না," মায়ায় চোখে জল এসে পড়ল।
আদনান থামল না। সে মায়াকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় আছড়ে ফেলল। মায়ার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে তার সমস্ত প্রতিবাদ শুষে নিল। কাল রাতের ভালোবাসার জায়গায় আজ ছিল এক একচ্ছত্র দখলের লড়াই। আদনানের হাত মায়ার শরীরের প্রতিটি খাঁজে ঘুরে বেড়াতে লাগল এক উন্মাদ কামনায়।
মায়া বুঝতে পারছিল, আদনানের এই হিংস্রতার মূলে রয়েছে তাকে হারানোর এক গভীর ভয়। আদনান মুখে স্বীকার না করলেও, ফাহাদের আগমন তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে মায়াকে সে কতটা গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলেছে। কিন্তু সেই ভালোবাসার প্রকাশটা আজ রূপ নিয়েছে এক অদম্য, অনিয়ন্ত্রিত শারীরিক ঝড়ে, যা মায়াকে সম্পূর্ণ অবশ করে দিচ্ছিল।
ঝড়ো বিকেলের সেই তীব্র উন্মাদনার পর ঘরজুড়ে নেমে এসেছিল এক শ্মশান নীরবতা। বিছানার একপাশে এলোমেলো হয়ে শুয়ে ছিল মায়া, তার সুতি পোশাকের কিছু অংশ ছেঁড়া, শরীরে আদনানের দাঁত আর নখের হিংস্র স্পর্শের চিহ্ন স্পষ্ট লাল হয়ে ফুটে আছে। তার চোখ দিয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছিল। আদনান বিছানার কিনারে বসে দুই হাতে মাথা চেপে ধরেছিল। তার হিংসার আগুন যখন নিভে গেল, তখন নিজের করা আচরণের জন্য এক তীব্র অনুশোচনা তাকে গ্রাস করল।
সে মায়ার দিকে তাকাল। মায়ার চোখের জল আর নীরবতা আদনানের বুকে যেন হাজারটা ছুড়ি চালিয়ে দিল। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে মায়াকে ছুঁতে গেল, "মায়া... আমি অত্যন্ত দুঃখিত... আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি..."
মায়া চকিতে তার হাত সরিয়ে নিল। তার চোখের দৃষ্টিতে কাল রাতের ভালোবাসা বা অনুরাগ কিচ্ছু ছিল না, ছিল কেবল চরম আঘাত আর অভিমান।
"আমার কাছাকাছি আসবেন না, আদনান সাহেব," মায়ার কণ্ঠস্বর একদম নিচু কিন্তু বরফের মতো ঠান্ডা। "আপনি ভালোবাসা আর দখলের পার্থক্য বোঝেন না। আপনি ভেবেছেন শরীর দিয়ে আমাকে চেপে রাখলেই আপনি আমাকে জয় করে ফেলেছেন?"
কথাটা আদনানের বুকে এক বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধল। সে মুখ খুলতে চাইল, কিন্তু মায়া তাকে থামিয়ে দিল। মায়া কষ্ট করে উঠে দাঁড়াল, নিজেকে পোশাক দিয়ে আবৃত করে নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজটা আদনানের কানে এসে বাজল এক চরম সতর্কবার্তা হিসেবে।
পরদিন সকাল থেকে মায়ার আচরণ পুরো বদলে গেল। সে আর আদনানের মুখোমুখি হলো না, কোনো তর্ক করল না, এমনকি আদনান যখন কিচেনে বা ড্রইংরুমে এলো, মায়া তাকে সম্পূর্ণ এক অদৃশ্য সত্তা হিসেবে ধরে নিল। এই নীরবতা আদনানের জন্য কালকের হিংস্রতার চেয়েও শতগুণ বেশি যন্ত্রণাদায়ক ছিল। আদনানের কাজের প্রতি মন উঠে গেল। যে ক্যানভাসে সে নকশা আঁকত, সেখানে এখন শুধুই মায়ার করুণ আর অভিমানী চোখের রূপরেখা ফুটে উঠছিল।
দুপুরের দিকে ফাহাদ আবার এলো। সে মায়াকে নেওয়ার জন্য গাড়ি নিয়ে এসেছে। ধানমন্ডির সেই নতুন ফ্ল্যাট তৈরি।
মায়া তার ট্রলি ব্যাগে নিজের জামাকাপড় গোছাতে শুরু করল। আদনান স্টাডি রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার ভেতরটা ধুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল জীবনের সবচেয়ে দামী জিনিসটা তার হাত থেকে বালি ছাঁকার মতো গলে বের হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সে কালকের ভুলের পর আজ আর জোর করে মায়াকে আটকানোর সাহস পেল না। তার অহংকার আজ মায়ার অভিমানের কাছে হার মেনেছে।
মায়া ব্যাগ হাতে ড্রইংরুমে এসে দাঁড়াল। ফাহাদ সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "সব গুছিয়ে নিয়েছ, মায়া? চলো, তোমাকে নিয়ে যাই।"
মায়া একবারও পেছনে ফিরে আদনানের দিকে তাকাল না। সে দরজার দিকে পা বাড়াল।
ঠিক তখনই আদনান হঠাৎ দ্রুত পদে এগিয়ে এসে মায়ার ঠিক সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে জল না থাকলেও চোখের কোণ লাল হয়ে ছিল, মুখজুড়ে কয়েক দিনের না-কামানো দাড়ি। তার চেহারার এই বিধ্বস্ত রূপ মায়া আগে কখনও দেখেনি।
"তুমি সত্যিই চলে যাচ্ছ?" আদনান নিচু, ব্যাকুল গলায় জিজ্ঞেস করল।
"আমার এখানে থাকার কোনো কারণ নেই, আদনান সাহেব," মায়া শক্ত গলায় বলল, যদিও তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে যাচ্ছিল।
আদনান ফাহাদের উপস্থিতির তোয়াক্কা না করে মায়ার দুই হাত চেপে ধরল। সে মায়াকে টেনে নিজের বুকের কাছে আনল। আদনানের হাত দুটি কাঁপছিল।
"আমি ভুল করেছি, মায়া," আদনান ফিসফিস করে বলল, তার গলায় এক চরম আকুতি। "আমি তোমাকে হারানোর ভয়ে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। ফাহাদ যখন তোমাকে নিয়ে যাওয়ার কথা বলল, আমার মনে হয়েছিল আমার অস্তিত্বটাই কেউ কেড়ে নিচ্ছে। কাল রাতে আমি যে হিংস্রতা দেখিয়েছি, তা আমার অহংকার ছিল না... ওটা ছিল তোমাকে না পাওয়ার এক তীব্র ভয়।"
আদনান মায়ার হাতের তালুতে নিজের মুখ গুঁজে দিল। একজন শক্ত, গম্ভীর পুরুষকে এভাবে নিজের সামনে ভেঙে পড়তে দেখে মায়ার বুকের ভেতরের সমস্ত জমে থাকা বরফ গলতে শুরু করল। আদনানের ঠোঁট মায়ার হাতের তালুতে এক আকুল চুম্বন আঁকল।
"আমি জানি আমি ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য নই," আদনান মায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, তার চোখ দুটো কামনায় নয়, ভালোবাসার চরম গভীরতায় ছলছল করছিল। "কিন্তু তুমি চলে গেলে আমি শেষ হয়ে যাব। এই শরীর, এই বাড়ি—সব তোমার ভালোবাসার ছোঁয়ায় জেগে উঠেছে। তুমি চলে গেলে আমি আবার একলা মরুভূমি হয়ে যাব।"
ফাহাদ দরজায় দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। সে একজন পুরুষ হয়ে অন্য পুরুষের চোখের সেই আকুলতা চিনতে পারল। সে বুঝতে পারল, তাদের দুজনের মধ্যে যা তৈরি হয়েছে, সেখানে তার মতো কোনো তৃতীয় ব্যক্তির প্রবেশের স্থান নেই। ফাহাদ মৃদু হেসে পেছনে সরে গেল।
মায়া আদনানের দিকে তাকিয়ে রইল। আদনানের এই রূপ তার ভেতরের সমস্ত ক্ষোভ মুছে দিল। সে ধীরে ধীরে তার অন্য হাতটি আদনানের গালে রাখল। আদনানের দাড়িতে ঢাকা গালে মায়ার আঙুলের স্পর্শ লাগতেই আদনান চোখ বুজে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল।
"আপনি খুব খারাপ, আদনান," মায়া মৃদু গলায় বলল, তার চোখ গড়িয়ে এক ফোঁটা জল আদনানের হাতে পড়ল। "আপনি মানুষকে ভালোবাসতে জানেন না, শুধু কষ্ট দিতে জানেন।"
"আমাকে শিখিয়ে দাও, মায়া..." আদনান মায়াকে টেনে সোজা নিজের বাহুডোরে জড়িয়ে নিল।
মায়ার ট্রলি ব্যাগটা হাত থেকে মাটিতে পড়ে গেল। মায়াও নিজের দুই হাত আদনানের চওড়া পিঠে পেঁচিয়ে ধরে তার বুকে মুখ লুকাল। কাল রাতের সমস্ত যাতনা আর দূরত্ব এক নিমেষে ঘুচে গেল তাদের এই নিবিড় আলিঙ্গনে। আদনানের বুক মায়ার উষ্ণতায় ভরে উঠল, আর মায়াও অনুভব করল, এই মানুষটির বাহুডোর ছাড়া তার আর কোনো নিরাপদ আশ্রয় নেই।
আদনান মায়ার মুখটা ওপরে তুলে তার ঠোঁটে এক পরম ভালোবাসার চুম্বন এঁকে দিল। এই চুম্বনে কালকের কোনো হিংস্রতা ছিল না, ছিল শুধুই সমর্পণ, শ্রদ্ধা আর এক গভীর শারীরিক ও মানসিক অনুরাগের ছোঁয়া।
কিন্তু ঠিক সেই সময়েই, যখন তাদের সম্পর্কের সমীকরণ পুরোপুরি ভালোবাসায় রূপ নিতে যাচ্ছিল, আদনানের ফোনে একটা কল এলো। ফোন স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা দেখে আদনানের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল, আর সেই সাথে মায়ার জীবনে নেমে আসার পূর্বাভাস পেল নতুন এক ঝড়।
আদনানের হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটির আলো নিভে যাওয়ার সাথে সাথেই ঘরের থমথমে ভাবটা কেটে গেল। ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা ছিল ল্যান্ডলর্ড ও আইনি সহায়তাকারীর—মায়াদের পারিবারিক ভিটেমাটি ও অর্থনৈতিক সংকটের যে জটিলতা এতদিন ধরে ঝুলে ছিল, তার সমস্ত আইনি আইটেম মিটে গেছে। আজ সকালেই চূড়ান্ত রায় এসেছে মায়াদের পক্ষে। অর্থাৎ, মায়ার ওপর আর কোনো আইনি হুমকি নেই, সে এখন সম্পূর্ণ মুক্ত। যে বাধ্যবাধকতার কারণে সে এই বাড়িতে পা রেখেছিল, সেই সুতো আজ ছিঁড়ে গেল।
খবরটা শুনে মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার চোখ দুটি থমকে গেল আদনানের মুখের দিকে। আদনান ফোনটা পকেটে রেখে মায়ার দিকে এক পা এগিয়ে এলো। তার চোখে আবার সেই পুরোনো ভয়—যে ভয় হারিয়ে ফেলার, যে ভয় ফাঁকা ঘরের।
"তোমার আর কোনো বাধ্যবাধকতা রইল না, মায়া," আদনান নিচু ও গম্ভীর স্বরে বলল। "আইনি সব ঝামেলা শেষ। এখন তুমি স্বাধীন। চাইলেই এই ঘর, এই মানুষটাকে ছেড়ে নিজের নতুন জগতে ফিরে যেতে পারো।"
মায়া তার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে পড়ে গেল এই বাড়িতে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত—প্রথম দিনের তীব্র ঝগড়া, বৃষ্টির রাতে রান্নাঘরের কানের কাছে আদনানের উষ্ণ নিঃশ্বাস, মোমবাতির আলোয় নগ্ন আবেগের সমর্পণ, আর গতকালের সেই হিংস্র ভালোবাসার পর আজ ভাঙা কাচের মতো গলে যাওয়া এক পুরুষের আকুতি। সে বুঝে গেল, আইনি বাধা হয়তো কেটে গেছে, কিন্তু আদনানের বানানো এক অদৃশ্য ভালোবাসার শিকল তার পুরো অস্তিত্বকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছে।
মায়া ধীরপায়ে ট্রলি ব্যাগটার দিকে এগিয়ে গেল। আদনানের বুকের ভেতরটা এক নিমেষে খালি হয়ে গেল, সে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল হার মেনে নেওয়ার যন্ত্রণায়। কিন্তু মায়া ব্যাগটি তুলে নিয়ে ঘরের এক কোণে গুটিয়ে রেখে দিল।
তারপর সে ঘুরে দাঁড়িয়ে সোজা আদনানের সামনে এসে থামল।
"আপনি ভেবেছেন আইনি ঝামেলা শেষ হলেই আমার আর আপনার কোনো প্রয়োজন নেই?" মায়া চিবুক উঁচিয়ে সটান চোখে তাকাল।
"মায়া...?" আদনানের কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল।
"আমি কোনো পরিস্থিতির চাপে পড়ে এই বাড়িতে থাকিনি, আদনান সাহেব। আমি এতদিন থেকেছি কারণ আমার মনটা এই চার দেয়ালের মাঝে আটকে গিয়েছিল," মায়া আদনানের শার্টের বোতাম ধরে হালকা টান দিয়ে বলল, "এখন যদি আমি যাইও, তবে সেটা হবে আপনার বউ হয়ে, আপনার পুরোপুরি অধিকার নিয়ে। তার আগে এক পা-ও নড়ছি না।"
কথাগুলো শোনামাত্র আদনানের চোখের ভেতরের সমস্ত অন্ধকার কেটে গেল। এক তীব্র রোমাঞ্চ আর অনির্দেশ্য আনন্দে তার শরীর শিউরে উঠল। সে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না। এক ঝটকায় মায়াকে পাজাকোলা করে কোলে তুলে নিল।
....