বৃষ্টির রাতে নিষিদ্ধ আলিঙ্গন

শ্রাবণের আকাশটা বিকেল থেকেই থমথমে হয়ে ছিল। সান্ধ্যকালীন বাতাসের আর্দ্রতায় ভেসে আসছিল সোঁদা মাটির তীব্র গন্ধ, যা জানান দিচ্ছিল একটা প্রলয়ঙ্কারী বৃষ্টি খুব বেশি দূরে নয়। রাজধানীর গুলশানের এক বহুতল ভবনের সাততলার আর্ট গ্যালারি থেকে সবাই যখন দ্রুত বেরিয়ে যাচ্ছিল, রাফি তখনো নিজের তৈরি একটা বিশাল তৈলচিত্র গুছিয়ে রাখতে ব্যস্ত। তার ঠিক কয়েক গজ দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল মেহরিন।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

তাদের দুজনের মধ্যকার শীতল সম্পর্কটা আজ নতুন নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ থেকে শুরু করে বর্তমান কর্মজীবন পর্যন্ত, রাফি আর মেহরিনের পরিচয় একটাই—তারা একে অপরের প্রতিযোগী, আর কথাকাটাকাটি ছাড়া যেন তাদের মুখে অন্য কোনো ভাষা ফোটে না।

"তোমার কি যাওয়ার কোনো তাড়া নেই, রাফি?" মেহরিন তার হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বিরক্ত গলায় বলল। তার পরনে একটা গাঢ় লাল রঙের সুতির শাড়ি, যা সন্ধ্যার মৃদু আলোতে তার গায়ের উজ্জ্বল রঙকে যেন আরো বেশি ফুটিয়ে তুলছিল।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

রাফি তুলিটা পরিষ্কার করতে করতে আড়চোখে মেহরিনের দিকে তাকাল। মেহরিনের অভিমানী চোখের দৃষ্টি আর কপালের মাঝখানে ছোট কালো টিপটা সবসময়ই রাফির মনোযোগ কেড়ে নেয়, কিন্তু মুখে সে সবসময়ই কঠিন।

"যাওয়ার তাড়া আমার থাকবে কেন? কাজ তো শেষ করবে তুমি। আর সত্যি বলতে, তোমার মতো ঢিমেতালে কাজ করা মানুষের সাথে এক ছাদের নিচে থাকার ইচ্ছে আমারও নেই," রাফি উত্তর দিল, তবে তার কণ্ঠে ছিল এক ধরনের হালকা টিপ্পনী।

"আমি ঢিমেতালে কাজ করি?" মেহরিন এগিয়ে এল। তার পায়ের নূপুরের শব্দ আর চুড়ির রুনঝুন শব্দে ফাঁকা গ্যালারিটা যেন গমগম করে উঠল। "গত সপ্তাহে ক্লায়েন্টের প্রজেক্টটা আমি না সামলালে তোমার ওই বিশাল অহংকার মাটিতে মিশে যেত!"

"আহা! আত্মপ্রশংসায় তোমার জুড়ি মেলা ভার," রাফি ক্যানভাসটা একপাশে রেখে মেহরিনের খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। রাফির লম্বা চওড়া শরীর, হালকা দাড়ি আর চোখের গভীর দৃষ্টি মেহরিনকে এক মুহূর্তের জন্য থমকে দিল।

ঠিক তখনই বাইরে এক বিকট শব্দে বিজলী চমকে উঠল। পরক্ষণেই যেন আকাশের বুক চিরে নেমে এল এক পশলা ভারী বৃষ্টি। তার সাথে কালবৈশাখীর মতো মাতাল হাওয়া। বাতাসের ঝাপটায় গ্যালারির কাঠের বড় জানালাই শুধু কেঁপে উঠল না, হঠাৎ করে পুরো ভবনের আলো নিভে গেল।

গ্যালারিতে নেমে এল নিকষ কালো অন্ধকার।

"রাফি!" মেহরিন চমকে উঠে এক পা পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু শাড়ির আঁচলে পা আটকে সে নিজের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল।

আঁধারের মধ্যেই রাফির চটপটে হাত দুটো এগিয়ে এল। পড়ে যাওয়ার আগেই মেহরিনের কোমর শক্ত হাতে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল সে।

উষ্ণ এক অদ্ভুত স্পন্দন মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল দুজনের শরীরে। মেহরিনের ব্যাকুল দুটি হাত রাফির চওড়া কাঁধ আঁকড়ে ধরল। চারপাশের ঘোর অন্ধকারে শুধু তাদের দুজনের ঘন শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। বাইরের মুষলধারায় বৃষ্টির শব্দ যেন ভেতরের এই নিস্তব্ধতাকে আরো গাঢ় করে তুলল।

"অন্ধকারকে এত ভয় পাও নাকি?" রাফির ফিসফিসানি স্বর মেহরিনের কানের কাছে এসে বাজল। রাফির মুখের তপ্ত শ্বাস মেহরিনের ঘাড়ে আছড়ে পড়তেই তার সারা শরীরে এক আশ্চর্য শিউরোন খেলে গেল।

"আমি... আমি ভয় পাই না," মেহরিন চেষ্টা করল গলা স্বাভাবিক রাখতে, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল।

"তাহলে এত শক্ত করে আমাকে ধরে রেখেছ কেন?" রাফির গলা কিছুটা নিচু, আরো গহীন শোনালো। তার এক হাত মেহরিনের কোমরের বাঁধন আরো একটু কষে দিল, অন্য হাতটা ধীরে ধীরে মেহরিনের কানের পাশ দিয়ে গিয়ে তার আলগা হয়ে আসা চুলগুলো পেছনে সরিয়ে দিল।

মেহরিন রাফির বুক থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল না, বরং এক অদ্ভুত আকর্ষণে রাফির শার্টের কলারটা চেপে ধরল। তাদের সারাজীবনের ঝগড়া, রাগ, তিক্ততা—সব যেন এই হঠাৎ নেমে আসা অন্ধকার আর বৃষ্টির ঘ্রাণে মিলিয়ে গেল। থেকে গেল শুধু দুটি তরুণ মনের অদম্য এক তৃষ্ণা।

"তুমি সবসময় আমার সাথে এমন করো কেন, রাফি?" মেহরিনের গলার ভেজা সুর রাফির ভেতরের সব সংযম ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।

"আমি কেমন করি, মেহরিন?" রাফির ঠোঁট তখন মেহরিনের চোয়াল ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। রাফির হাতের স্পর্শে মেহরিনের সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসছিল। তার শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে কিছুটা খসে পড়েছে, রাফির উষ্ণ আঙুলগুলো মেহরিনের উন্মুক্ত পিঠে অদ্ভুত এক মানচিত্র আঁকতে শুরু করেছে।

মেহরিন চোখ বন্ধ করে ফেলল। এক অজানা শিহরণে তার ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল। সে রাফির কাঁধে মাথা রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রাফি আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। মেহরিনের থুতনিটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে সে অন্ধকারে খুঁজে নিল মেহরিনের ভেজা, তপ্ত ঠোঁট।

প্রথমে এক গভীর, তৃষ্ণার্ত চুম্বন। এতদিনের জমানো রাগ, আক্ষেপ আর লুকিয়ে রাখা আবেগ যেন সেই চুম্বনের ছন্দে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইল। মেহরিনও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে রাফির গলা জড়িয়ে ধরে তার আবেগে সাড়া দিল। গ্যালারির এক কোণে থাকা সোফাটার দিকে তারা দুজন ধীরপায়ে এগোতে লাগল, বাহুডোরে আবদ্ধ হয়ে।

বৃষ্টির বেগ বাড়ছিল, আর গ্যালারির আধো-অন্ধকারে রাফি আর মেহরিনের ভেতরের উষ্ণতা সব সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার উন্মাদনায় মেতে উঠেছিল। এতদিনের শত্রুতার আড়ালে যে ভালোবাসাটা গোপনে দাবানলের মতো জ্বলছিল, তা আজ রাতের এই ফাঁদে পড়ে পূর্ণতা পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল।


বাইরে তখন অঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরছে। বিজলীর চমক মাঝেমধ্যে ঘরের অন্ধকারের বুক চিরে ক্ষণিকের জন্য তীব্র আলো জ্বেলে দিয়ে যাচ্ছিল। সেই আলো-আঁধারির খেলায় রাফি আর মেহরিনের চোখের দৃষ্টি আটকে গিয়েছিল একে অপরের ওপর। যে চোখ দুটো এতদিন কেবল অমিল আর রাগের আগুন ছড়াত, আজ সেই চোখেই জ্বলছে তীব্র কামনার শিখা।

গ্যালারির কোণে থাকা মখমলের নরম সোফায় মেহরিনকে বসিয়ে দিল রাফি। মেহরিনের বুকটা দুলছিল দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাসের দোলায়। রাফি এক হাঁটু গেড়ে মেহরিনের সামনে বসল। তার হাত দুটো ধীরে ধীরে উঠে এল মেহরিনের গালে। রাফির হাতের উষ্ণ ছোঁয়া পেতেই মেহরিন এক অদ্ভুত শিহরণে চোখ দুটো বুজে ফেলল।

"আজ আর পালিয়ে যেতে দেব না, মেহরিন," রাফির গলার আওয়াজটা ভারী ও মাদকতাময় শোনালো।

মেহরিন কিছু বলল না। সে শুধু তার দুটি কোমল হাত রাফির ঘাড়ে জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের দিকে টেনে নিল। তাদের ঠোঁট দুটো আবার এক হয়ে গেল। এবারের স্পর্শ কেবল আবেগের ছিল না, তাতে ছিল ব্যাকুলতা ও এক মাতাল করে দেওয়া উত্তাপ। রাফির ঠোঁটের গভীর ঘর্ষণে মেহরিন ছোট করে একটি নিঃশ্বাস ছাড়ল, যা রাফির ভেতরের বাঁধনগুলোকে পুরোপুরি চুরমার করে দিল।

রাফির হাত দুটো মেহরিনের শাড়ির আঁচল সরিয়ে দিল পিঠ থেকে। ধীরে ধীরে সে মেহরিনের শাড়ির ব্লাউজের ফিতে খুলতে শুরু করল। প্রতিটি ছোঁয়ায় মেহরিনের শরীরের ত্বক শিউরে উঠছিল। মেহরিন রাফির শার্টের বোতামগুলো একে একে খুলে ফেলল, তার মসৃণ হাত পৌঁছে গেল রাফির চওড়া উন্মুক্ত বুকে। রাফির বুকের ধুকপুকানি মেহরিনের হাতের তালুতে স্পষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছিল।

সোফার ওপর মেহরিনকে শুইয়ে দিয়ে রাফি তার ওপর ভর দিল। ঘরের ভেতরের শীতল বাতাস আর তাদের দুজনের শরীরের উত্তাপ মিলেমিশে এক অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি করেছিল। রাফির তপ্ত ঠোঁট মেহরিনের ঠোঁট ছেড়ে নেমে এল তার গলার কাছে, তারপর ধীরে ধীরে নিচে... কাঁধ আর উন্মুক্ত বুকে। মেহরিন রাফির চুলগুলো আঙুলে চেপে ধরে ক্ষীন কণ্ঠে ফিসফিস করে উঠল, "রাফি... প্লিজ..."

সেটা কি বারণ ছিল, নাকি আরো কাছে পাওয়ার আকুতি—তা বুঝতে রাফির বাকি রইল না। রাফি মেহরিনের পুরো শরীরকে নিজের উষ্ণতায় জড়িয়ে নিল। বৃষ্টির একটানা শব্দের সাথে মিশে যেতে লাগল তাদের ঘন শ্বাস-প্রশ্বাস আর গোপন প্রণয়ের মৃদু শব্দ। সারা রাতের এই অন্ধকার গ্যালারিতে তারা দুজন হারিয়ে গেল এক নিষিদ্ধ, অতল ভালোবাসার গভীরে। জীবনের সব রাগ, ক্ষোভ আর অভিযোগ যেন সেই রাতে গলে জল হয়ে ভেসে গেল।

ভোরের দিকে বৃষ্টির বেগ কমে এল। জানালার কাচ ভেদ করে ভোরের ধূসর আলো এসে পড়ল গ্যালারির মেঝেতে।

সোফার ওপর রাফির বুকের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে ছিল মেহরিন। তার এলোমেলো চুল আর কাঁধ থেকে খসে পড়া শাড়ি তাদের রাতের ভালোবাসার সাক্ষী দিচ্ছিল। মেহরিন ধীরে ধীরে চোখ খুলল। রাফির শান্ত, নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে মেহরিনের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে তৃপ্তির হাসি। এতদিন যাকে সে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে দূরে সরিয়ে রাখতে চেয়েছিল, সে-ই যে তার মনের এত গভীরে জড়িয়ে আছে, তা আজ রাতের পর আর অস্বীকার করার উপায় নেই।

মেহরিন আলতো করে রাফির কপালে একটা চুমু দিয়ে খুব সাবধানে উঠে বসল। নিজের জামাকাপড় গুছিয়ে নেওয়ার সময় তার চোখ পড়ল সোফার পাশে মেঝেতে পড়ে থাকা রাফির মানিব্যাগ আর কিছু কাগজের দিকে। রাতে টানাটানির মধ্যে হয়তো রাফির পকেট থেকে ওগুলো পড়ে গিয়েছিল।

মেহরিন নিচু হয়ে কাগজগুলো কুড়াতে গেল। কিন্তু হাত বাড়াতেই একটা পুরোনো, ভাজ করা চিঠির ওপর তার চোখ আটকে গেল। চিঠির ওপরে মোটা হরফে লেখা—‘রাফির কাছে শেষ অনুরোধ’।

কৌতূহল সামলাতে না পেরে মেহরিন চিঠিটি খুলল। হাতে লেখা হরফগুলো পড়তেই মেহরিনের মুখের হাসির রেখা নিমেষেই মিলিয়ে গেল, গায়ের রক্ত যেন মুহূর্তে হিম হয়ে গেল!

চিঠিটার পাতায় চোখ বোলাতেই মেহরিনের হাত দুটো থরথর করে কেঁপে উঠল। চিরকুটের প্রতিটি শব্দ যেন বিষাক্ত তীরের মতো এসে বিঁধছিল তার হৃদয়ে।

চিঠিটা ছিল রাফির একমাত্র বড় ভাই, প্রয়াত রিয়াদের লেখা। দুই বছর আগে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় রিয়াদ মারা যান। মৃত্যুর ঠিক আগের রাতে রিয়াদ রাফিকে এই চিঠিটি লিখে গিয়েছিলেন। চিঠির সারাংশ ছিল করুণ—রিয়াদ মেহরিনকে গোপনে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। কিন্তু নিজের মনের কথা মেহরিনকে জানিয়ে ওঠার আগেই রিয়াদ বুঝতে পেরেছিলেন, মেহরিন আর রাফির মাঝে এক অদৃশ্য টান রয়েছে। রিয়াদ তার চিঠিতে রাফিকে অনুরোধ করে লিখেছিলেন, “রাফি, তুই আমার ছোট ভাই। কিন্তু মেহরিনকে আমি আমার জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসে ফেলেছি। তুই যদি ওকে গ্রহণ করিস, আমার আত্মা কখনো শান্তি পাবে না। আমাকে কথা দে, তুই কখনো মেহরিনের কাছে যাবি না, ওকে নিজের করে নিবি না।”

মেহরিনের চোখের কোণ বেয়ে একবিন্দু তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল।

হঠাৎ সব দৃশ্য যেন মেহরিনের সামনে পানির মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। কেন রাফি বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বছর থেকে আচমকা মেহরিনের সাথে দূরত্ব তৈরি করেছিল? কেন সে অকারণ ঝগড়া করে মেহরিনকে এড়িয়ে চলত? কেন ভালোবাসা সত্ত্বেও রাফি সবসময় তার সামনে এক পা পিছিয়ে যেত?

সবটাই ছিল এক মৃত ভাইয়ের প্রতি দেওয়া নাছোড়বান্দা প্রতিশ্রুতি!

“মেহরিন?”

রাফির ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। সোফায় উঠে বসে সে শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে মেহরিনের দিকে তাকাল। কিন্তু মেহরিনের ফ্যাকাশে মুখ আর তার হাতের খোলা চিঠিটা দেখেই রাফির গায়ের রক্ত যেন হিম হয়ে গেল। সে বিদ্যুৎবেগে উঠে এসে মেহরিনের সামনে দাঁড়াল।

“তুমি... তুমি এটা পেয়েছ?” রাফির কণ্ঠস্বরে স্পষ্ট অপরাধবোধ আর আতঙ্কের ছাপ।

মেহরিন ধীরেনজ্রে চিঠিটা রাফির বুকের ওপর ছুঁড়ে মারল। তার গলার আওয়াজ রুদ্ধ হয়ে আসছিল, “এইজন্য? এই একটা ভাঙা প্রতিশ্রুতির জন্য তুমি আমাদের চারটে বছর নষ্ট করলে? কাল রাতেও যখন আমার শরীর আর মন তোমার কাছে সঁপে দিলাম, তখনও তোমার মাথায় এই প্রতিশ্রুতির অভিশাপ ঘুরছিল?”

“মেহরিন, আমাকে বোঝানোর সুযোগ দাও!” রাফি আকুল হয়ে মেহরিনের দুটো হাত চেপে ধরতে চাইল, “ভাইয়া মারা যাওয়ার পর আমি মানসিকভাভে ভেঙে পড়েছিলাম। ওই চিঠিটা আমার কাছে একটা শিকল হয়ে গিয়েছিল! আমি অনেক চেষ্টা করেছি তোমার কাছ থেকে দূরে থাকতে, তোমাকে ঘৃণা করতে... কিন্তু কাল রাতে আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। আমি তোমাকে বড্ড ভালোবাসি, মেহরিন!”

“ভালোবাসো?” মেহরিন এক ঝটকায় রাফির হাত সরিয়ে দিল। তার চোখে তখন ভালোবাসার চেয়ে করুণা আর ক্ষোভের আগুন বেশি জ্বলছিল। “যদি ভালোই বাসতে, তবে সত্যিটা আমাকে বলতে পারতে! কিন্তু তুমি ছদ্মবেশ ধরে আমার সাথে ছলনা করেছ। কাল রাতে যা হয়েছে, তা ভালোবাসা ছিল না রাফি... ওটা ছিল তোমার অপরাধবোধ আর কামনার এক করুণ পরাজয়!”

“মেহরিন, প্লিজ এমন বলো না!” রাফি ভেঙে পড়ে মেহরিনের সামনে দাঁড়াল, তার চোখেও জল।

“আর একটা কথাও নয়, রাফি।” মেহরিন নিজের শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে গ্যালারির দরজার দিকে পা বাড়াল। “যে ভালোবাসার ভিত্তি কেবল একটা পুরোনো লাশ আর ভুলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, সেই ভালোবাসায় আমি আর শ্বাস নিতে পারব না। কাল রাতের ঘটনাটাকে একটা ভুল ভেবে ভুলে যাওয়াই ভালো।”

মেহরিন দ্রুত পায়ে গ্যালারি থেকে বেরিয়ে গেল। সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাওয়ার সময় তার সলজ্জ কান্না বৃষ্টিভেজা ভোরের বাতাসে মিলিয়ে গেল। আর গ্যালারির দরজায় হাত দিয়ে নীরব পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল রাফি—তার জীবনের সমস্ত আলো যেন এক লহমায় নিভে গিয়েছিল।

গ্যালারির ঘটনার পর তিনটে দিন কেটে গেছে। আকাশটা এখনো মেঘলা, কিন্তু মেহরিনের ভেতরের আকাশজুড়ে নেমে এসেছে এক প্রলয়ঙ্ককারী নীরবতা। সে নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নিয়েছে। অফিস আর গ্যালারির কাজ সেরে ঘরে ফিরে এসে বাতি নিভিয়ে জানালার পাশে বসে থাকে। বৃষ্টি ঝরলেই কাল রাতের সেই উত্তপ্ত স্পর্শ, রাফির ঠোঁটের ঘর্ষণ আর নিঃশ্বাসের তীব্রতা মেহরিনের গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। কিন্তু পরক্ষণেই ভাইয়ের প্রতিশ্রুতির কথা মনে পড়তেই এক চরম ঘৃণা আর অপরাধবোধ তাকে কুড়ে কুড়ে খায়।

অন্যদেহে রাফির অবস্থাও করুণ। গত তিন দিনে সে এক ফোঁটা ঘুমাতে পারেনি। কাজের অজুহাতে বারবার মেহরিনের টেবিলের সামনে দিয়ে হেঁটে গেছে, কিন্তু মেহরিন তার দিকে একবারের জন্যও চোখ তুলে তাকায়নি। মেহরিনের এই বরফশীতল অবহেলা রাফিকে ভেতর থেকে জ্বালিয়ে ছাই করে দিচ্ছিল।

অবশেষে আর না পেরে চতুর্থ দিন বিকেলে রাফি মেহরিনকে মেসেজ পাঠাল—“আজ সন্ধ্যায় অফিসের ছাদে তোমার সাথে শেষবারের মতো কিছু কথা বলতে চাই। না এলে আমি হয়তো নিজের ক্ষতি করে বসব।”

মেহরিন মেসেজটা দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে ছাদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। সব হিসেব আজ চিরতরে চুকিয়ে দেওয়া দরকার।

সন্ধ্যায় ছাদে কেউ ছিল না। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। ছাদের এক কোণে রেইলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিল রাফি। তার চুলগুলো এলোমেলো, চোখের নিচে কালি, আর গায়ে সেই কালো শার্টটা—যা কাল রাতের স্মৃতি বহন করছিল।

মেহরিন ধীরপায়ে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। “কেন ডেকেছ রাফি? আমার কাছে আর কী চাও তুমি?”

রাফি পেছনে ফিরে তাকাল। মেহরিনকে দেখে তার চোখ দুটো জলে ভরে এল। কোনো কথা না বলে সে এক পা এগিয়ে এসে হুট করে মেহরিনকে জড়িয়ে ধরল। মেহরিন সরে যাওয়ার চেষ্টা করতেই রাফি তাকে আরো শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরল।

“আমাকে ক্ষমা করে দাও, মেহরিন... প্লিজ!” রাফির কণ্ঠস্বর কান্নায় ভেঙে পড়ল। “আমি জানি আমি অপরাধী। কিন্তু কাল রাতের পর থেকে আমি এক মুহূর্তের জন্যও বাঁচতে পারছি না। তোমাকে ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ। ভাইয়ার আত্মা যদি আমাকে অভিশাপও দেয়, তাও আমি সইব, কিন্তু তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না!”

রাফির আবেগঘন স্পর্শে মেহরিনের সমস্ত শরীর আবার কেঁপে উঠল। রাফির গায়ের পরিচিত সুবাস আর তার বুকের ধুকপুকানি মেহরিনের মনকে টালমাটাল করে তুলল। ভালোবাসা আর অভিমানের এক তীব্র সংঘাত শুরু হলো তার হৃদয়ে।

রাফি মেহরিনের মুখটা দুই হাতে উঁচিয়ে ধরল। তার চোখ দুটি মেহরিনের ঠোঁটে গিয়ে আটকে গেল। এক অনিয়ন্ত্রিত কামনার টানে রাফি আবার মেহরিনের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। মেহরিন প্রথমে রাফির বুকে ধাক্কা দিয়ে তাকে সরানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু রাফির বেপরোয়া, ব্যাকুল চুম্বন তার সব প্রতিরোধ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল।

মেহরিন নিজের অজান্তেই রাফির পিঠে হাত রেখে তাকে আরও কাছে টেনে নিল। বৃষ্টির গুঁড়ো তাদের মুখ আর গায়ে এসে পড়ছিল, আর তারা দুজন ছাদের নির্জন অন্ধকারে আবার হারিয়ে যাচ্ছিল সেই নিষিদ্ধ ভালোবাসার আগুনে। রাফির হাত মেহরিনের কোমরের শাড়ি আলগা করে দিয়ে তার ভেজা ত্বকে উত্তাপ ছড়াতে লাগল।

কিন্তু চুম্বনের মাঝপথেই হুট করে মেহরিনের মনে পড়ে গেল রিয়াদের সেই চিঠির কথা—“আমার আত্মা কখনো শান্তি পাবে না...”

মুহূর্তের মধ্যে মেহরিনের গায়ে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল! সে তীব্র শক্তিতে রাফিকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিল।

“না, রাফি! না!” মেহরিন হাঁপাতে হাঁপাতে চিৎকার করে উঠল। তার ঠোঁট দুটো তখনো রাফির চুম্বনে ভেজা, কিন্তু চোখে ফুটে উঠেছে চরম ভীতি আর ঘৃণা। “আমরা পাপ করছি! মরা মানুষের আত্মাকে কষ্ট দিয়ে আমরা কোনোদিন সুখী হতে পারব না!”

“মেহরিন, শোনো—”

“আর কখনো আমার গা ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করবে না, রাফি! আজ থেকে তুমি আমার জন্য মরে গেছ!”

মেহরিন আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে ছাদ থেকে দৌড়ে নিচে নেমে গেল। রাফি বৃষ্টির মধ্যে হাঁটু গেড়ে ছাদের মেঝেতে বসে পড়ল। তার চিৎকারের আওয়াজ বৃষ্টির শব্দে চাপা পড়ে গেল।

ছাদ থেকে নেমে আসার পর মেহরিনের জীবন যেন এক থমকে যাওয়া নদী। অফিসের পরিবেশ তার জন্য শ্বাসরোধী হয়ে উঠেছিল। সে তিনদিনের ছুটি নিয়ে নিজের ঘরে নিজেকে বন্দি করে ফেলল। কিন্তু চার দেয়ালের নির্জনতা তাকে আরও বেশি আচ্ছন্ন করে ফেলল। ঘরের প্রতিটা কোণে, বালিশের সুবাসে, এমনকি রাতের বৃষ্টিভেজা হাওয়ায় সে কেবল রাফির স্পর্শ আর তার মাতাল করা ব্যাকুলতা খুঁজে পাচ্ছিল। যে উন্মাদনায় রাফি তাকে ছুয়েছিল, যে তৃষ্ণায় তাকে বুকের সাথে জড়িয়ে নিয়েছিল—সেই স্মৃতিগুলো মেহরিনের শরীরে বারবার এক গোপন দাবানল জ্বেলে দিচ্ছিল। সে রাফিকে ঘৃণা করতে চেয়েও নিজের ভেতরের এই কামনার আগুনকে নেভাতে পারছিল না।

অন্যদিকে রাফি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল এক অন্ধকার গহ্বরে। মেহরিনের শেষ কথাগুলো—"আজ থেকে তুমি আমার জন্য মরে গেছ"—রাফির অস্তিত্বকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। সে অফিস যাওয়া বন্ধ করে দিল। দিন-রাত নিজের ফ্ল্যাটে বন্দি থেকে সে কেবল বোতল বোতল মদ গিলে নিজের যন্ত্রনা কমানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছিল। ভাই রিয়াদের প্রতি অপরাধবোধ আর মেহরিনকে হারানোর তীব্র জ্বালা—এই দুইয়ের আগুনে সে পুড়ছিল তুষের আগুনের মতো।

ছুটির শেষ দিনে, মেহরিন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। রাফি অফিসে আসছে না শুনে তার ভেতরে এক অজানা শঙ্কা দানা বাঁধল। রাগ, ঘৃণা সব একপাশে সরিয়ে রেখে মেহরিন ছুটে গেল রাফির ফ্ল্যাটে।

ফ্ল্যাটের দরজা খোলাই ছিল। ভেতরে ঢুকতেই এক ভ্যাপসা মদ আর বিষাদের গন্ধ মেহরিনের নাকে এসে লাগল। বসার ঘরের মেঝেতে এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে ক্যানভাসের ফ্রেম আর মদের খালি বোতল। আর ঘরের কোণে সোফায় ঢলে পড়ে আছে রাফি—পরনে ধুলোবালি লাগা জামা, চোখ দুটো রক্তজবার মতো লাল।

"রাফি!" মেহরিন আতঙ্কিত হয়ে রাফির কাছে ছুটে গেল।

মেহরিনের গলার আওয়াজ পেয়ে রাফি ঝাপসা চোখে তাকাল। তারপর এক অদ্ভুত মাতাল হাঁসি হেসে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু ভারসাম্য হারিয়ে সে সোজা মেহরিনের গায়ের ওপর ঢলে পড়ল। মেহরিন তার ভার সামলাতে না পেরে পেছনের দেয়ালে আটকে গেল।

"তুমি এসেছ মেহরিন?" রাফির ফিসফিসানি কণ্ঠে মদের তীব্র গন্ধ আর সীমাহীন আকুতি। সে মেহরিনের দুই গালে নিজের উস্কোখুস্কো মুখটা গুঁজে দিল। "তুমি আমাকে মেরে ফেলেছ, মেহরিন... কিন্তু তাও আমি তোমাকে ছাড়তে পারছি না।"

"রাফি, ছাড়ো! তুমি মাতাল হয়ে আছ!" মেহরিন তাকে সরানোর চেষ্টা করল, কিন্তু রাফির এই এলোমেলো রূপ তার বুকের ভেতর এক তীব্র মোচর দিল।

রাফি শোনল না। সে বেপরোয়া হয়ে মেহরিনের ঘাড়ে আর কানের লতিতে উষ্ণ ঠোঁট চেপে ধরল। তার উন্মত্ত হাতের স্পর্শে মেহরিনের জামার বোতাম খুলে যেতে লাগল। মেহরিন দুর্বলভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেও রাফির এই আগ্রাসী ভালোবাসার কাছে হেরে যাচ্ছিল। রাফির মাতাল চুম্বনের গভীরতা মেহরিনের শরীরের সব প্রতিরোধ এক লহমায় গলিয়ে দিল। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে মেহরিন চোখ বন্ধ করে রাফির চুলে হাত ঢুকিয়ে দিল। তাদের ঘন নিঃশ্বাস আর কামনার উত্তাপ আবার সেই ঘরকে ভরিয়ে তুলল।

কিন্তু চুম্বনের চরম মুহূর্তে, রাফি হঠাৎ থেমে গেল। মেহরিনের ঠোঁট থেকে নিজের ঠোঁট সরিয়ে নিয়ে সে মেহরিনের চোখের দিকে তাকাল। রাফির চোখে তখন জলের ধারা।

"আমি আর পারছি না, মেহরিন..." রাফি ধসে পড়ল মেহরিনের পায়ে। মেহরিনের হাঁটু জড়িয়ে ধরে বাচ্চাদের মতো কেঁদে উঠল সে, "ভাইয়ার প্রতি দেওয়া কথা আমাকে রোজ মারছে, আর তোমার দূরত্ব আমাকে নরকে ঠেলে দিচ্ছে। আমি কোন দিকে যাব?"

পায়ের কাছে রাফির এই করুণ আত্মসমর্পণ দেখে মেহরিনের বুকের ভেতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে অনুধাবন করল, এই যন্ত্রণা শুধু তার একার নয়—রাফিও এই অপরাধবোধের খাঁচায় তিল তিল করে মরছে। কিন্তু এই অন্তহীন অভিশাপ থেকে মুক্তির পথ কোথায়?

রাফিকে হাঁটু গেড়ে কাঁদে দেখে মেহরিন আর নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। সে হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসে রাফির ফ্যাকাশে মুখটা নিজের দুহাতে তুলে ধরল। রাফির চোখের জল মেহরিনের আঙুল ভিজিয়ে দিচ্ছিল।

"রাফি, নিজের সাথে আর কত যুদ্ধ করবে?" মেহরিনের কণ্ঠে এবার কোনো রাগ ছিল না, ছিল কেবল এক গভীর সহানুভূতি আর সমবেদনা। "আমরা নিজেদের অজান্তেই নিজেদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছি।"

রাফি মেহরিনের হাত দুটো আঁকড়ে ধরে গলার রুদ্ধ আওয়াজে বলল, "আমি জানি আমি অন্যায় করেছি, মেহরিন। কিন্তু বিশ্বাস করো, কাল রাতের পর বা আজ তোমাকে কাছে পাওয়ার পর আমার মনে হয়েছে—তোমাকে ছাড়া বেঁচে থাকাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ। ভাইয়া বেঁচে থাকলে হয়তো আমাকে কোনোদিন এইভাবে শেষ হয়ে যেতে দেখতে চাইতেন না।"

মেহরিন কিছু সময় চুপ করে রইল। তারপর এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাফিকে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। ঘরের নীরবতায় তাদের দুজনের হৃদস্পন্দন এক হয়ে বাজতে লাগল।

মেহরিন অনুধাবন করল, রিয়াদের মৃত্যু আর তার অতীত ভালোবাসা কখনোই রাফি আর তার বর্তমানের ওপর শিকল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। যে মৃত স্মৃতির ভার বয়ে তারা বেঁচে ছিল, তা তাদের দুজনকে শুধুই যন্ত্রণা দিয়েছে।

"রাফি," মেহরিন রাফির চোখ থেকে চোখ মিলিয়ে ধীরকণ্ঠে বলল, "তোমার ভাইয়া তোমাকে ভালোবাসতেন, তাই হয়তো অভিমান করে ওই চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু সেই চিঠিকে নিজের জীবনের শেষ কথা বানিয়ে তুমি নিজের পাশাপাশি আমাকেও শাস্তি দিয়েছ। আজ যদি আমরা এই অপরাধবোধ থেকে বের হতে না পারি, তবে আমরা দুজনেই সারা জীবন তিল তিল করে মরব।"

রাফি মেহরিনের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন বহু দিন পর কোনো আঁধার ঘরের জানালা খুলে আলো এসে পড়েছে তার চোখে।

"তুমি কি সত্যি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে, মেহরিন?" রাফির গলার আওয়াজ কাঁপছিল।

মেহরিন উত্তর দিল না। সে রাফির ঠোঁটে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। তবে এবারের ছোঁয়া কোনো কামনার উত্তাপ ছিল না; এতে ছিল মুক্তি, শান্তি আর এক নতুন প্রতিশ্রুতির স্পর্শ।

রাফিও মেহরিনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার মাথায় মুখ গুঁজে দিল। তাদের ভেতরের সব ধোঁয়াশা আর পাপবোধ ভোরের হালকা কুয়াশার মতো মিলিয়ে যেতে লাগল।

বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি কমে এসে হালকা মিহি হাওয়া বইছিল। জানালার পর্দা পেরিয়ে সকালের প্রথম আলো এসে পড়ল তাদের দুজনের শরীরের ওপর। ঘরের মদের গন্ধ আর বিষাদ যেন সেই আলোর স্পর্শে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার হয়ে গেল।

রাফি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মেহরিনের হাতটা নিজের হাতে তুলে নিল। "আজ থেকে আমাদের অতীতের কোনো ছায়াই আর আমাদের মাঝে আসবে না, মেহরিন। আমি তোমার কাছেই আমার সবটুকু ভালোবাসার উত্তর খুঁজে পেয়েছি।"

মেহরিনের মুখে ফুটে উঠল এক মিষ্টি, তৃপ্তির হাসি। তারা দুজন জানালার পাশে গিয়ে পাশাপাশি দাঁড়াল। বৃষ্টিভেজা শহরের বুক চিরে সূর্য উঠতে শুরু করেছে। দীর্ঘ অন্ধকারের পর রাফি আর মেহরিনের ভালোবাসার আকাশ আবার রোদেলা আর সতেজ হয়ে উঠল।

....
👁 14